প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২০
সাইদা মুন
আজকের প্রথম ক্লাস ছিল হায়ারম্যাথ। কিন্তু স্যার অসুস্থ থাকায় আসতে পারেননি। আর সেটাই যেন ক্লাসে এক অদ্ভুত আনন্দের ঢেউ তুলে দিলো। ক্লাস হবে না মানে, পুরো পঁয়তাল্লিশ মিনিটের স্বাধীনতা। বন্ধুবান্ধবদের সাথে ইচ্ছে মতো আড্ডা, বকবক, গান, হাসাহাসি, কেউ বারণ করবে না।
যেই ভাবা সেই কাজ, শেষের দুইটা বেঞ্চ দখল করে একদল ছেলে শুরু করে দিয়েছে গানের আসর। অন্যদিকে সামনের সারির মেয়েরা ঘুরে বসে পেছনের মেয়েদের সাথে খেলছে চোর-পুলিশ। কেউ আবার গোল হয়ে বসে গল্পে মশগুল, কেউ বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা জ্ঞানী সাজছে, আর কিছু পণ্ডিত বন্ধুদের বোঝাচ্ছে ক্যালকুলাসের রহস্য। মুহূর্তেই পুরো ক্লাসরুমটা পরিণত হলো একদম মাছের বাজারে।
মেহরীনরাও বসে গল্প করছে, সঙ্গে আরও কয়েকজন স্টুডেন্ট। আজকের তাদের আলোচ্য বিষয়, টিচাররা।
–আরে ওই বাংলা তবলাভণ্ডকে কেউ-ই সহ্য করতে পারে না। প্রিন্সিপাল স্যারই পারলে এতদিনে উনাকে উড়িয়ে দিতো। আত্মীয় বলে নাকি রেখেছে!
মেয়েটার কথা শুনে রাফি হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
–আমার কি মনে হয় জানিস…
সবাই কৌতূহল নিয়ে তাকাল তার দিকে।
–কী?
রাফি মুখটা রহস্যময় করে বলল,
–মানুষের ব্রেইন থাকে মাথায়।
পাশ থেকে ফারিন তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,
–তুই কি বলতে চাস, স্যারের ব্রেইন হাটুতে?
রাফি ধীর গলায় উত্তর দিল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
–আরে না, স্যারের ব্রেইন ওই বিশাল ভুঁড়িতে. তাই তো ব্রেইন উল্টা-পাল্টা কাজ করে। এক লাইন পড়ায়, দশ লাইন গুলিয়ে ফেলেন।
তার কথা শেষ হতেই তাদের মধ্যে হাসির বিস্ফোরণ ঘটে। সবাই হেসে উঠে, কেউ স্বভাবগত টেবিলে চাপড় মেরে মেরে হাসছে, তো কারো হাসতে হাসতে চোখে জল আসার উপক্রম। তাদের এতো হাসাহাসি দেখে পাশের বেঞ্চেররাও কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়, “কী হয়েছে?”। এক মেয়ে রাফির উক্তিটা বলতেই তারাও হেসে লুটোপুটি। আবার তাদের হাসতে দেখে অন্যরাও জানতে ইচ্ছুক হয় এভাবেই কয়েক সেকেন্ডে পুরো ক্লাস জুড়ে কথাটি ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো ক্লাসে হাসির রুল পড়ে যায়। একেকজন হাসছে, কেউ আবার রাফির কথায় সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছে।
কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ টিকল না। মাত্র দুই মিনিটের মাথায় পাশের আর্সের ক্লাসের ম্যাম দরজায় এসে হাজির। তখনো সবাই হাসিতে ব্যস্ত উনাকে খেয়াল করেনি কেউ। তবে উনার ভাড়ি গলায় হঠাৎ সবাই থেমে গেল সব, গলা শুকিয়ে একসাথে তাকাল দরজার দিকে,
–কি হচ্ছেটা কি এই ক্লাসে?
ম্যামকে দেখে তড়িঘড়ি হাসি চেপে সবাই নিজের জায়গায় গিয়ে সোজা হয়ে বসে পড়ল। রাফি নিচু গলায় মুখ ফসকে বলে ফেলল,
–এইরে আজরাইলের বইন নাজরাইল ইজ কামিং!
তবে মেহরীনরা ঠিকই শুনেছে, আর হাসি চেপে রাখতে পারেনি তারা। জুড়েই হেসে উঠল, তাদের হাসি শুনে সামনের বেঞ্চের তারাও নিজেদের হাসি কন্ট্রোল করতে পারেনি। ব্যস এভাবেই হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল পুরো ক্লাসে। মুহূর্তেই আবারও ক্লাস ফেটে পড়ল হাসিতে। ওইযে কথায় আছে না সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে তাদের অবস্থা তাই।
কিন্তু এবার ম্যাম আর চুপ রইলেন না রেগে গমগম করতে করতে বললেন,
–চুপ! একদম চুপ বেয়াদবের দল। তোদের হিহি হাহার জন্যই ক্লাস নেওয়া যাচ্ছে না। আবার আমার সামনেই হাসছিস? দাঁড়া, এখনই একজন স্যারকে পাঠাচ্ছি!
বলেই তিনি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অফিসরুমের দিকে চলে গেলেন। তার ধমকে পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ। সবাই এবার রাগী চোখে তাকাচ্ছে রাফির দিকে। রাফি ঢোক গিলে বলল,
–কী? এভাবে তাকাচ্ছিস কেন তোরা?
সবাই এবার চিৎকার করে উঠল,
–তুই-ই তো হাসালি। তোর জন্য এখন ক্লাস করতে হবে ধুর।
রাফি হতভম্ব,
–এহ! এখন সব দোষ আমার! আমি কি বলেছি, এই হাস, এই হাস, এই হাসসস? হুহহহ যত্তসব…
মুখ মোরা মেরে সে নিজের সিটে বসল। এরমধ্যেই বাংলা স্যার তাঁর তবলার মতো পেটটা নিয়ে ধুমধুম শব্দ করে ক্লাসে এসে হাজির হলেন। তাঁকে দেখামাত্র সবাই আতঁকে উঠল, তিনি এসেছেন মানে তাদের কানের বারোটা বাজাবেন। জ্ঞান দিয়ে দিয়ে ঝালাপালা করে দেবেন একদম। তবুও ভদ্রতার খাতিরে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। স্যার সালামের উত্তর নিয়ে সামনের পাতানো চেয়ারে বসে পড়লেন, সঙ্গে সঙ্গেই কাঠের চেয়ারটা হালকা শব্দ করে উঠল। তা শুনে তাহিয়া অবিলম্বে বলে উঠল,
–এই রে, ভেঙে গেল…
তার কথাটা শুনতেই মেহরীন দ্রুত তার মুখ চেঁপে ধরল। তবে এতে কাজ হলোনা যা শুনার স্যার শুনে ফেলেছেন। রেগে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে চিল্লিয়ে বললেন,
–এই এই কে রে? কোন বেয়াদব এই কথা বলেছে? এখনি বল, বল বলছি। কার এতো সাহস?
ক্লাসের একেকজনের হাত-পা কাঁপছে, তবে কেউই তাহিয়াকে দেখাচ্ছে না। কারণ তাকে দেখালে স্যার আরও চিল্লাবেন। ফারিন কটমটে কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
–শা*লি, এতো জোরে বললি কেন? তবলা বাজাতে ভালো লাগে তোর?
তাহিয়া টেনশনে ডান হাতের নখ কামড়াতে-কামড়াতে বলল,
–আরে আমি তো মনে মনে বলছিলাম, কেমনে যে জোরে বলে ফেললাম!
মেহরীন দুজনকে থামিয়ে বলল,
–হইছে, এবার চুপ যা, নয়তো কথা বলতে দেখলে আরও ভাষণ দিবে।
এদিকে স্যার ইচ্ছে মতো চিল্লিয়ে বললেন,
–বস, গণিতের বই বের কর সবাই।
স্যারের মুখে গণিত শব্দটি শুনে একেকজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। একজন মিনমিনিয়ে বলল,
–স্যার, এখন তো আমাদের উচ্চতর গণিত ক্লাস…
স্যার সে কথায় পাত্তা না দিয়ে, মাথা ঘুরিয়ে দেখে দেখে রাফিকে ডাকলেন। রাফি বেচারাটা ভয়ে-ভয়ে উঠে দাঁড়াল, না জানি কি চলছে এই স্যারের মাথায়।
–আজকে আমি তোদের উচ্চতর গণিত পড়াবো। তো, উচ্চতর গণিত মানে বুঝিস?
রাফি মাথা এদিক সেদিক নাড়ল। তা দেখে স্যার গম্ভীর গলায় বললেন,
–কি? তোরা বুঝিস না? তাহলে স্যার তোদের পড়িয়েছেটা কি? এইভাবে ফাঁকি দিয়ে পড়ালে তো চলবে না, আজই প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলতে হবে।
রাফি বিরক্ত হয়ে বলল,
–স্যার, আশামিই চিহ্নিত করতে পারিনা, পুলিশকে চিনে কি হবে?
স্যার তার কথার মানে বুঝতে না পেরে কপাল কুচকে প্রশ্ন করলেন,
–মানে?
রাফি আমতা আমতা করে বলল,
–মানে হল, স্যার বলতে চেয়েছি, উচ্চতর গণিতের সূত্রই বুঝি না, নামকরণ বুঝে কি হবে?
স্যার তাকে হাতের ইশারায় বসতে বললেন,
–ঝামেলা তো এখানেই। সাবজেক্টের নামকরণই বুঝিস না, তাই সূত্রও বুঝিস না। আজকে তোদের উচ্চতর গণিতের নামকরণের ব্যাপারে বলব।
মুহুর্তেজ সকলে ঝিমিয়ে গেল, তারা জানে স্যার এখন থেমে থেমে কতোগুলো ‘লেকচার’ দেবেন। যা তাদের জোরপূর্বক হজম করতে হবে। স্যার বোর্ডে লিখে লিখে ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন,
–উচ্চতর গণিত বলতে বোঝায়, সাধারণ বা প্রাথমিক গণিতের চেয়ে জটিল ও গভীর স্তরের গণিত। অর্থাৎ, ‘উচ্চতর’ শব্দটি এখানে বিশেষণের ভূমিকায় ‘গণিত’ নামক বিশেষ্যকে বিশেষিত করছে…
স্যার গনিতের নামকরণ বোঝাতে-বোঝাতে যেন ব্যাকরণে চলে যাচ্ছেন। কয়েকজন পণ্ডিত স্টুডেন্ট ছাড়া বাকিরা ফুসুর ফুসুর করে নিজেদের মতো গল্পগুজব করতে লাগল। স্যার যে একটানা কত লেকচার দেবেন, তা সবাই জানে। একপর্যায়ে স্যার একটু চুপ হলেন। হয়তো তিনি নিজেও বুঝলেন গাণিতিক লাইনে এসে বাংলা ব্যাকরণে ঢুকে পরেছেন। তাই বোর্ডে লিখলেন, ১৬ মাইনাস ১১। এরপর টেবিলে বাড়ি দিয়ে শব্দ তুলে প্রশ্ন করলেন,
–বল তো, ষোল থেকে এগারো বিয়োগ করলে কমে না বাড়ে?
সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলল, কমে। স্যার বললেন,
–সঠিক বলেছিস তোরা। আসলে বিয়োগ একটা স্বার্থপর চিহ্ন, যা শুধু কেটে নিতে জানে। নিজের চেয়ে বেশি বুঝতে পারে না, অতন্তই নিম্নচিন্তার কাজের ফল…
বলেই তার লেকচার আবার শুরু, রাফি পেছন থেকে বিরক্তি কন্ঠে বলল,
–লে, শা*লার লেকচার আবার শুরু। ভেবেছিলাম এবার হয়তো চুপচাপ গাণিত করবে।
ফারিন হামি দিতে দিতে বলল,
–এর তো এফএম রেডিও, সারা রাত চার্জ হয়। আর সকাল সকাল কলেজে এসে চালু হয়।
স্যার এদিক সেদিক হাঁটতে-হাঁটতে কথা বলছেন, মেহরীন হাসতে হাসতে ফিসফিস করে বলল,
–দেখ দেখ, স্যারের ভুঁড়িটা কেমন থলবল থলবল করে নড়ছে।
তার কথায় বাকিরাও খেয়াল করে হেসে উঠল। কিন্তু তাহিয়া চিন্তায় বিভোর, কিছু একটা ভাবছে সে। তাকে ভাবনায় দেখে রাফি পেছন থেকে কলম দিয়ে গুতা মেরে বলল,
–কিরে, কি এতো ভাবছিস? বল তো আমাদেরও বল।
তাহিয়া চিন্তিত কন্ঠে উত্তর দিল,
–আরে ভাবছিলাম স্যারের ওই ভুঁড়িতে কি কি আছে। গোপালভাড়ের নাহয় বুদ্ধি ছিল, কিন্তু স্যারের এই তবলায় কি আছে?
–আরে ওখানে ফুড ডিপার্টমেন্ট আছে বুদ্ধু।
তাদের কথা-হাসাহাসি এসব চলছে লুকিয়ে লুকিয়ে। এরমাঝে স্যার আবার মানুষ নিয়ে বক্তব্য রাখতে শুরু করলেন,
–মানুষ বড়ই স্বার্থপর, মানুষকে ষোল আনা দিয়ে করলে, বিপরীতে তোমাকে এক আনাও ফেরত দিবে না।
তার কথার মাঝে পেছন থেকে ফারিনরা উঠে বলল,
–স্যার আমাদের ষোল আনা স্বর্ন দিয়েই দেখুন, আপনাকে এক না চার আনা ফেরত দিবো প্রমিস…
তৎক্ষনাৎ সবাই চাপা হাসিতে মেতে উঠল। এতক্ষণ ধরে একেকটা গল্পে মশগুল থাকলেও স্যার তা পাত্তা দেয়নি। তবে স্যারের কথার মাঝে বাধা দেওয়ায় যেন তিনি তীব্র ক্ষিপ্ত হয়ে পড়লেন। রেগে চিল্লিয়ে বললেন,
–বেয়াদবের দল! তোদের ক্লাস করাবো না, একটাও মনোযোগী নেই। হুদাই আমার মূল্যবান বক্তব্য নষ্ট করছি।
বলতে বলতেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে চলে গেলেন। এদিকে বাকিরা যেন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, ক্লাসে আবারও অস্থিরতার মাঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেমে এলো। এভাবেই হাসি-ঠাট্টা মাঝে মাঝে একটি ঝিমিয়ে পরা সব মিলিয়ে শেষ হলো আজকের সব ক্লাস।
ছুটির পর গেট পেরিয়ে বের হতেই ফুচকার দোকানে চোখ আটকে গেল মেহরীনের। টক-মিষ্টি গন্ধে মনটা যেন নেচে উঠল। কিন্তু সামনে তালহা দাঁড়িয়ে, তাকে দাঁড় করিয়ে তো আর ফুচকা খেতে পারবে না, আবার ফুচকার কথা বললে ঝারি মারবে। তাই একটু মন খারাপ করেই গাড়িতে উঠে বসল সে। তবুও চোখ বারবার ছুটে যাচ্ছে ফুচকার দোকানের দিকেই।
তারা গাড়িতে উঠলেও তালহা তখনো ওঠেনি। দু’জনেই জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে তালহার পানে, তালহা রোড পেরিয়ে সোজা ফুচকারওয়ালার দিকে যাচ্ছে। ফুচকাওয়ালার সাথে দু’একটা কথা বলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর দু’প্লেট ফুচকা হাতে নিয়ে ফের গাড়ির দিকে এগিয়ে এল। জানালা খুলে এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
–ধর।
তাহিয়া আর মেহরীন দু’জনেই অবাক। তালহা তো স্ট্রিট ফুড একদমই পছন্দ করে না, তাহলে আজ নিজে থেকেই, হঠাৎ এমন কী হলো? তবে অবাক হওয়ারও সময় নেই, ফুচকা তো পাওয়া গেছে। দু’জনেই খুশিতে খেতে শুরু করল।
তালহা তখনো বাইরে, গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেহরীন খেতে খেতে হঠাৎ কী মনে করে এক হাতে একটা ফুচকা তুলে এগিয়ে দেয় তালহার দিকে,
–নিন, আপনিও খান।
তালহা তখন ফেসবুকে স্ক্রল করছিলো। মেহরীনের ডাকে চোখ তুলে পাশে তাকায়, তখনই নজরে এলো তার ফর্সা হাতটা। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, হয়তো কিছু একটা ভাবছে। মেহরীন আবার ডাকতেই ধ্যানভঙ্গ হয় তার। কোনো কথা না বলেই এগিয়ে গিয়ে মুখে নিয়ে নেয় ফুচকাটা।
তাতেই তালহার ঠোঁট ছুঁয়ে যায় মেহরীনের আঙুলে।মুহূর্তেই মেহরীনের শরীর হালকা কেঁপে ওঠে। চোখ বন্ধ হয়ে আসে তার, এক অচেনা আবেশে। পাশ থেকে তাহিয়া বিস্ময়ে সবটা দেখে যাচ্ছে। মেহরীন নিজেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, তালহা তার হাতে খেয়েছে। ভেবেছিল বকবে, বা না করবে। কিন্তু সে এতো শান্তভাবে খেয়ে নিল। এ কোন তালহা? প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে থাকে মেহরীনের মনে।
খাওয়া শেষ হতেই তালহা বিল মিটিয়ে এসে গাড়িতে ওঠে। নিরবে গাড়ি স্টার্ট দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে অফিসের পথে রওনা হয় সে।
সাততলা বিশিষ্ট বিল্ডিংয়ের উপরের চারতলা তাদের অফিসের অন্তর্ভুক্ত। বাকি অংশ ভাড়া দেওয়া হয়েছে হোটেল ও রেস্টুরেন্টের জন্য। তালহা দাঁড়িয়ে আছে ছয়তলায় অবস্থিত নিজের কেবিনে। অফিসের বাইরের পুরোটাই কাচ দিয়ে ঘেরা। কাচের ওপার থেকে সে ব্যস্ত ঢাকা শহরের ছায়া-আলোয় মোড়া মানচিত্র দেখছে।
হঠাৎ দরজা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে কয়েকজন ঢুকে পড়ল তার কক্ষে৷ তালহা একই ভঙ্গিতে দাঁড়িইয়ে, কাচের প্রতিফলনে দেখতে পাচ্ছিল কে কে এসেছে।
তূর্য, সামী আর রিশাদ, তিনজনেই তার পেছনে এসে ভাউ করে উঠল। কিন্তু তালহার মুখে কোনো ভাবান্তর না দেখে তূর্য হতাশ গলায় বলল,
—শা*লা! তোর হৃদয়টা কি দিয়ে বানানো রে? ভয়ও পাস না তুই!
তালহা পেছন ঘুরে হালকা হেসে ওর পাশে এসে বসে বলল,
—গ্লাসে তোদের আগেই দেখে ফেলেছি, ভয় পাবো কিভাবে?
সামী পাশের চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল,
—তোর চারদিকে এতো চোখ থাকে কেমনে? দেখে তো মনে হলো কারো চিন্তায় ডুবে আছিস।
রিশাদ হেসে বলল,
—আরে ওর বউয়ের চিন্তাতেই তো ডুবে আছে। বেচারা গভীর জলে ফেসে গিয়েছে, শুধু স্বীকার করতে পারছে না।
তূর্য বলল,
–সে কি রে! এখনো কিছু ঠিক হয়নি তোদের মাঝে?
তালহা শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
–ঠিক হওয়ার মতো কিছুই নেই আমাদের। আমি তাকে মানি না।
সামী কপাল কুঁচকে বলল,
—কি আজেবাজে বলছিস? এখনো মনের কথা বলিসনি?
তূর্যও অবাক হয়ে বলল,
—তুই কি বাচ্চা? আমরাই স্পষ্ট তোর চোখে তার জন্য মায়া দেখি। মেহরীনের প্রসঙ্গ উঠলেই তোর সুর বদলে যায়, তারপরও তুই বুঝছিস না…
তালহা এবার বিরক্ত স্বরে বলে উঠল,
—শাট আপ! কিসের মনের কথা হ্যাঁ? কিসের? কোনো মনের কথা নেই। মেহরীন আর আমার বয়সের ফারাক অনেক। আমি তাকে স্ত্রী হিসেবে মানি না। She is nothing for me… just my responsibility, understand?
রেগে-ফুসে কথাগুলো বলতেই তিনজনই চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে তার ভেতরে চলছে কি। রিশাদ ধীরে প্রশ্ন করল,
—কিছু হয়েছে নাকি?
তালহা কপালে দুই আঙুলে স্লাইড করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—বলেছিলাম না, ওর বয়সটাই আবেগের বয়স। আমি জানতাম, এই আবেগ সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে। তাই-ই হয়েছে।
কথাটুকু শুনতেই সবাই অবাক হয়ে তাকায়। সামী ফিসফিস করে বলল,
—মানে কি? মেহরীন অন্য কাউকে..?
তালহা চোখ বন্ধ করে নেয়, চোয়াল শক্ত করে মাথা নাড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারও মুখে কোনো কথা নেই। যেন কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না। রিশাদ আস্তে করে বলল,
—হয়তো তুই ভুল বুঝছিস…
তালহা তাক্কে থামিয়ে দিয়ে বলল,
—তাহসানকে চিঠি লিখেছে ও। সেদিন সেজেছিল তার জন্যই… আমি ভেবেছিলাম, আমা…
বাকিটুকু আর শেষ করতে পারল না। বুক ভার হয়ে এলো, জুড়ে নিঃশ্বাস নিয়ে চুপ হয়ে গেল।
রিশাদ তখনো অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল,
—মেহরীন এমনটা করতে পারে না। আমি স্পষ্ট দেখেছি, তার চোখে তোর জন্য ভালোবাসা ছিল।
তালহা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
—ওসব আবেগ। আমারই ভুল, নিজের স্টেটমেন্ট থেকে নড়চড় হওয়া…
তূর্য রেগে উঠল,
—বোকা**** নিজের বউয়ের প্রতি অনুভূতি জন্মানো কোনো ভুল নয়। আর কিসের স্টেটমেন্ট ওই সা*উয়ার স্টেটমেন্টের কোনো দাম আছে? বিয়ে করার পর নাকি বলে বউ হিসেবে মানে না। এসব বাদ দিয়ে বরং এখন তোর উচিত নিজের অধিকার দেখানো। মেহরীন কিন্তু পরকিয়া কর…
বাকিটুকু বলার আগেই তালহার চোখ-মুখ কঠিন হয়ে উঠল। মুহুর্তেই রেগে উঠল সে। ধপ করে তূর্যের কলার ধরে ফেলল,
—আর একটাও বাজে কথা বলবি, তো জানে মেরে ফেলব।
পাশ থেকে রিশাদ তাকে বাজিয়ে দেখতে বলল,
–তাতে তোর কী? মেহরীনকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই বলবে ও। তুই তো তাকে নিজের কেউ মনেই করিস না, তাকে ভালোবাসা তো দূর।
তালহা এবার কলার ছেড়ে দিল। নিজেকে শান্ত করে চুপচাপ বসে রইল। রিশাদ এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রেখে ধীরে বলল,
—যদি মেহরীন সত্যিই এমন কিছু করে থাকে। তাহলে আমি বলব, এখানে মেহরীনের কোনো দোষ নেই। তুই ওকে আজ অব্দি তেমন পাত্তা দিসনি। আর এই বয়সের মেয়েরা একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়। যারা একটু মনোযোগ দেয়, তাদের প্রতি-ই একটা সফট কর্নার তৈরি হয়। তাই বলছি সময় থাকতে নিজেকে ঠিক করে নে, তালহা। নিজের টা নিজে বুঝে নে। সে ভুল করলে তাকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আন।
রিশাদের কথায় তালহা কোনো উত্তর-ই দিল না। এরপর চার বন্ধু এসব বাদ দিয়ে নিজেদের মতো করে গল্পে সময় কাটিয়ে দেয়।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে তালহা বাড়ি ফিরে এলো। তার হাতে ছোট একটা প্যাকেট, তবে সেটা আড়াল করে রেখেছে। ঘরে ঢোকার আগে সে একবার তাহিয়ার রুমে উঁকি দিল। মেহরীনকে দেখে তাকে রুমে আসতে বলল, তারপর নিজ রুমে চলে গেল।
মেহরীন-তাহিয়া তখন পড়ার টেবিলে বসে গল্প করছিল। তালহার ডাকে চমকে উঠল মেহরীন। তালহা নিজে থেকে ডাকছে, বিষয়টা তার কাছে বেশ ভয়ংকরই লাগল। আবার ভালো ও লাগলো একটু তো কথা বলা যাবে। তাই সাহস সঞ্চয় করে তার রুমের উদ্দেশ্যে গেল।
রুমে ঢুকতেই অবাক সে, তালহা দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
তবে মনে মনে নিজেকে বুঝালো , না না আমি তো এমন কেউ নই যে ও আমার জন্য অপেক্ষা করবে। হয়তো এমনি দাঁড়িয়ে ছিলো। তালহা তাকে দেখতেই হাতে থাকা ছোট প্যাকেটটা এগিয়ে দিল।
মেহরীন প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল,
—এটা কি?
—খুলে দেখো…
কথামতো প্যাকেট খুলতেই ভেতরে পেল একটা চুড়ির বক্স। তা খুলতেই একজোড়া চিকন সোনার বালা। অবাক হয়ে দেখে বলল,
—এগুলো কার?
তালহা কোনো কথা না বলে মেহরীনের হাত থেকে বালাগুলো নিয়ে তার দুই হাতে পরিয়ে দিল। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৯
—এগুলো সবসময় পরে থাকবে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে, তোমার মায়ের স্মৃতি ছিল আমার কাছে। এখন নিজের কাছে রাখতে ইচ্ছে করেছে, তাই রেখেছো। বুঝেছো আমি কী বলেছি?
মেহরীন চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে। তালহা তাকে মিথ্যে বলতে বলছে, অবিশ্বাস্য! এদিকে তার কোনো প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করেই তালহা তোয়ালে হাতে ওয়াশরুমে চলে যায়। মেহরীন নিজের হাতে থাকা বালার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজেদের রুমে ফিরে যায়। তাহিয়া তাকে দেখতেই জিজ্ঞেস করলে, মেহরীন আমতা আমতা করে তালহার বলা কথাই বলল।
তাহিয়া হেসে বলল,
—তবে যাই বলিস তোকে বেশ বিবাহিত বিবাহিত লাগছে…..
