প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২২
সাইদা মুন
সিকদার ভিল্লা সকাল সকাল মেতে উঠেছে আনন্দ-উৎসবে। বাড়ির বড় মেয়েকে দেখতে আসবে আজ, সেই জন্য তো আয়োজনের শেষ নেই। বাড়ির কর্তারা সোফায় বসে চা-নাশতায় খোশগল্পে মেতে আছেন। আর কর্তিরা যেন রান্নার প্রতিযোগিতা লেগেছে, গুনে গুনে দশ রকমের আইটেমের লিস্ট করেছে, একে একে সব রান্না বসিয়েছেও। তাদের একটাই কথা, বিয়ে হোক না হোক, সিকদার বাড়ির গিন্নিদের হাতের রান্না খেয়ে যেন আঙুল চেটেই যায়!
সামান্য পাত্রী দেখতে আসবে, এতেই তাদের এতো এলাহি কান্ড দেখে মেহরীন অবাক। যেন আজই বিয়ে। তাদের গ্রামে তো পাত্র দেখতে আসলে জল-নাস্তা খাইয়েই বিদায় করত, আর বিয়ের দিন দুই/তিন পদের রান্না, সাথে পোলাও। পরমুহূর্তেই নিজেকে ধাতস্থ করে নেয় সে,
—বড়লোকের আলাদা কারবার। নিজেদের সাথে তাদের তুলনা করে কি লাভ।
তাহিয়া নাস্তা খেয়ে আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে। মেহরীন এতক্ষণ রুমেই ছিল, তবে ভালো লাগছে না আর বসে থাকতে। তাই নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়। তালহার দরজা পেরোতে পেরোতে কয়েকবার উঁকিঝুঁকি দেয় ঘরে। তবে অন্ধকার, জানালা বন্ধ। আজ নাস্তার টেবিলেও তাকে পায়নি, মনটা আনচান আনচান করছে, তাকে একটু দেখবে বলে। শুক্রবারে তালহার এই এক অভ্যাস, বেলা করে ঘুমানো।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তালহাকে নিয়ে নানা কথা ভাবতে ভাবতে দরজা ছাড়িয়ে যেই সিঁড়িতে পা রাখবে, অমনি মোবাইলের রিংটোনে থেমে যায়। পেছন ফিরে বোঝার চেষ্টা করে শব্দটা কোথা থেকে আসছে। একটু এগিয়েই বুঝতে পারে, তালহার রুম থেকেই। তা দেখেই দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দরজার ধারে দাঁড়িয়ে পড়ে। এখন নিশ্চয় কল ধরবে, আর ঘুম-ঘুম কণ্ঠে কথা বলবে। কথাটা ভাবতেই আরও ঝুঁকে দাঁড়ায়, আজ সে শুনবেই! “ছেলেদের ঘুম-ঘুম গলা নাকি নেশালো হয়, ভয়েস হয় অনেক সুন্দর” এই কথাটা ফারিনের মুখে শোনার পর থেকেই বহু চেষ্টা করেছে তালহার ওই কণ্ঠটা শোনার। কিন্তু বেচারি মেহরীনের আগে আগেই তালহা ঘুম থেকে উঠে যায়।
হঠাৎ রিংটোন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মনে হয় ধরেছে। কিন্তু আফসোস, তালহা কল কেটে আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে। এক মিনিট অপেক্ষা করে মেহরীন বুঝতে পারে, কল কাটা পড়েছে। মনটা খারাপ হয়ে যায়, একটু কণ্ঠ শুনবে ভেবেছিল, তা আর হলো না। তার হতাশার মাঝেই আবারও রিংটোন বাজতেই আবার আনন্দে কান পাতে। এবার কল ধরেছে তালহা। হঠাৎ ঘুম-ঘুম কণ্ঠে ভীষণ কোমল স্বরে বলে উঠল,
—উমম.. হ্যালো, কে…?
—……..
—সন্ধ্যায় বের হবো, আজ বাড়িতে একটু কাজ আছে, তোরা যা না…
—……
—হু, ওকে…
বলেই কল কেটে দেয়। এদিকে মেহরীন দরজার আড়াল থেকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে সেই মায়াভরা কণ্ঠ শোনছে। আহ্, কী নরম, কী হালকা স্বর। বুকের ভেতর ধকধক করছে, মনে হচ্ছে কণ্ঠে কোনো মায়াবী টান আছে, যা তাকে অবচেতনে কাছে টেনে নিচ্ছে।
ফারিনের কথার সত্যতা প্রমান পেতেই চোখ বড় বড় হয়ে যায়। আসলেই, ঘুমন্ত কণ্ঠের একটা আলাদা জাদু আছে। ইশ! যদি তাদের বিয়েটা সবাই মেনে নিত, তাহলে প্রতিদিন সকালেই ঘুম থেকে উঠে এই কণ্ঠ শুনতে পারত। কথাটা ভাবতেই মুখে লাজুক হাসি ছড়িয়ে পড়ে। মুখে হাত দিয়ে হাসে। ঠিক তখনই তালহার গলা ফোড়ন কাটে তার ভাবনায়,
—স্টপ লাফিং, এদিকে আসো।
ভয় পেয়ে যায় মেহরীন তাকে দেখে ফেলেছে সে। কিন্তু কিভাবে। পা পেছাতে চাইলেও সাহস হয় না। দেখেই তো ফেলেছে। ভয়ে ভয়ে রুমে ঢুকতেই চোখ পড়ে তালহার বিছানার দিকে। খালি গায়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে, ব্ল্যাংকেটটা কোমর পর্যন্ত দেওয়া, পুরো পিঠ দৃশ্যমান। এমন পুরুষালী উদাম পিঠ দেখে কিছুটা লজ্জায় চোখ সরিয়ে নেয়। আরও দু’কদম এগিয়ে গিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
—জি.. বলুন কিছু লাগবে?
তালহা ঘুরে ব্ল্যাংকেট টেনে বুক পর্যন্ত নেয়, দুই হাত মাথার নিচে দিয়ে ছোট ছোট চোখ করে তাকায়। শান্ত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,
—জ্বর উঠেছিল?
মেহরীন অবাক হয়ে তাকায়,
—জ্বর? কেনো উঠবে?
—নাক ফোড়ানোর ব্যথাটা তো ছিল…
—ওহ্, ওইটা? না, ওসব ব্যথায় জ্বর আসে না।
তালহা হালকা হাসে, খুবই ক্ষীণ, যা মেহরীন বুঝতেও পারে না। মেয়েটা বেশ বুঝদার, কিন্তু ইমোশনাল দিক থেকে একেবারে বাচ্চা। তপ্ত শ্বাস ফেলে ফের প্রশ্ন করে,
—ব্যথা আছে?
মেহরীন মাথা নাড়িয়ে না বলে। তালহা পাশে রাখা টিশার্ট গায়ে দিতে দিতে বলে,
—এক কাপ কফি দিয়ে যেতে বল খালাকে।
মেহরীন মাথা নেড়ে সায় দেয়। ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে হঠাৎ থেমে যায়,
—আচ্ছা, আপনি তো উল্টো দিক ফিরে ঘুমাচ্ছিলেন। আমাকে দেখলেন কিভাবে?
তালহা চুল ঠিক করতে করতে দরজার পাশে থাকা আয়নাটার দিকে ইশারা করে। মেহরীন সেদিকে তাকিয়েই চমকে উঠে, “এই রে! আয়না থেকে তো দরজার পুরোটা সরাসরি দেখা যায়! ছি ছি, আড়িপাততে গিয়ে ধরা খেয়ে গেলাম!” মনে মনে বিরবির করতে করতে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায়। তার চোখ-মুখের অবস্থা দেখে ফিক করে হেসে ফেলে তালহা।
মেহরীন সরাসরি রান্নাঘরে আসে। তিন গিন্নিসহ খালাও ব্যস্ত রান্নায়। সে ঘুরঘুর করতে থাকে, কীভাবে কফির কথা বলবে ভাবছে। চুলোও খালি নেই। তিতলি বেগম দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
—কিছু লাগবে?
মেহরীন বলল,
—হুম, একটা চুলো একটু খালি করে দিতে পারবেন?
—কী করবি?
—তোমার ছেলে কফি খাবে, আমি নিজেই করে নিবোনে।
—তালহা উঠে পড়েছে? ভালোই তো, নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে। এই চুলোয় বসিয়ে দে মা, বারোটা বেজে যাচ্ছে এখনো অর্ধেক রান্না শেষ হয়নি।
মেহরীন মাথা নাড়ে, এরপর একটু ইতস্তত করে বলল,
—আন্টি, আমি একটু হেল্প করি?
তিতলি বেগম ধমক দিয়ে উঠলেন,
—বেশি পাকনামি শিখেছিস? কতোবার বলেছি রান্নাঘরের কিছুতে হস্তক্ষেপ না করতে! কফিটা তালহাকে দিয়ে সরাসরি ঘরে গিয়ে তাহিয়াকে উঠিয়ে গোসল করিয়ে পরিপাটি হয়ে নিবি। বারোটা বাজে, একটু পরেই মেহমান চলে আসবে।
এতোগুলো শোনে আর কিছু না বলে চুপচাপ কফি বানিয়ে তালহার ঘরে দিয়ে আসে। তাহিয়া তখনও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। মেহরীনের মাথায় এবার শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। ছোট কাগজের টুকরো নিয়ে চিকন কাঠির মতো বানিয়ে, বিছানায় উঠে তাহিয়ার পাশে বসে তার হাতে পাউডার রাখে বেশ খানিকটা। এবার নাকের কাছে কাগজটা ঘুরাতে থাকে। হঠাৎ নাকে শুরশুরি পেয়ে তাহিয়া মাথা নাড়ে, আবার ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আবারও হওয়ায় বিরক্ত হয়ে থাপ্পড় মারে মুখে সঙ্গে সঙ্গে কিছু পড়ে চোখ-মুখে, চমকে উঠে বসে পড়ে। নিজের হাতে পাউডার দেখে হতবাক। তখনই খিলখিলিয়ে হাসির শব্দে তাকিয়ে দেখে, মেহরীন। এবার তার আর বুঝতে বাকি থাকে না কার কাজ। “মেহরীনের বাচ্চা!” বলেই দৌড় দেয়। শুরু হয় ছোটাছুটি। দুইজনই রুমের এদিক-ওদিক ছুটছে। শেষমেশ তাহিয়া ধরে ফেলে, পুরো পাউডারের ডিব্বা ঢেলে দেয় মেহরীনের মাথায়। দুজনই দস্তাদস্তিতে পাউডার মেখেটেখে সাদা ভূত! একসময় ক্লান্ত হয়ে থেমে গিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে।
দুপুর দুইটা বাজে।
বাড়ি জুড়ে একধরনের উত্তেজনা আর ব্যস্ততার আমেজ। সবাই নিজেদের মতো গুছিয়ে নিচ্ছে, কুশন ঠিক করছে, নাস্তা সাজাচ্ছে, সবার চোখেই একই প্রত্যাশা, পাত্রপক্ষ আসার। তারা এখনো পৌঁছায়নি, তবে ফোন করে জানিয়েছে, আর বেশি দূরে না, কাছেই এসে গেছে।
রান্নাঘরে তখন তিতলি বেগম শরবত বানাতে ব্যস্ত, পাশে তানিয়া বেগম দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তাকে বেশ অন্যমনস্ক লাগছে, চোখে যেন অন্য জগতের ছায়া। তা দেখে তিতলি বেগম হালকা ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—কিরে, কি নিয়ে ভাবছিস?
তানিয়া ধীরে মাথা তুলল, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল,
—দেখছো ভাবি, সেই ছোট্ট মেয়েটা, সেদিন প্রথম হাটতে শিখে মাটিতে উল্টে পড়ে কান্না করেছিল, আজ কতো বড় হয়ে গেছে। তাকে এখন কনে দেখতে আসবে।
তার কণ্ঠে কিছুটা ভয়, মেয়ে দিয়ে দেওয়ার ভয়, চোখে চিকচিক করছে জল। তিতলি বেগম হেসে বললেন,
—ধুর গাধি, আনন্দের মুহূর্তে কাঁদতে নেই। এটাই তো পৃথিবীর নিয়ম রে, মেয়েমানুষের নিয়ম, একঘর থেকে আরেকঘরে চলে যাওয়া।
তাদের কথোপকথনের মধ্যেই ছোট গিন্নি হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল,
—আরে ভাবি, হয়েছে? ছেলেরা তো এসে পড়েছে চলো চলো।
এই শুনে তিতলি বেগম দ্রুত শরবতের ট্রে হাতে নিলেন, তানিয়া বেগমও এগিয়ে এলেন। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখে, পাত্রপক্ষ থেকে এসেছে পাঁচজন। ছেলের বাবা-মা, ছোট বোন আর দাদি। সবাইকে হাসিমুখে আপ্যায়ন করে বসানো হয়। পরিবেশটা প্রথমে বেশ মিষ্টিই গেলো । ছেলের বাবা-মা ভদ্রভাবে কথা বলছেন, ছেলেটিও বিনয়ী। তালহা গিয়ে ছেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে টুকটাক কথা বলে। আর বৃদ্ধা মহিলাটি অর্থাৎ ছেলের দাদি রুদ্রের দাদির সঙ্গে এমন আলাপে মেতে উঠলেন যেন বহুদিনের চেনা। চারদিকে হাসির গুঞ্জন, গল্পের রেশ, নাস্তার সুগন্ধ। গিন্নিরা একের পর এক নাস্তা পরিবেশন করছেন টেবিল যেন রঙে গন্ধে ভরে গেছে। এমন সময় ছেলের মা হঠাৎ নাক কুঁচকে বললেন,
—এমা! নাস্তা খাইয়েই পেট ভরাবেন নাকি?
কথাটুকু যেন এক নিমিষে পুরো পরিবেশ বদলে দেয়। সবাই থতমত খেয়ে যায়, এমন কথা কেউ আশা করেনি। সিকদার বাড়ির লোকদের মুখে মুহূর্তেই বিব্রত হাসি। তিতলি বেগমের মুখের কোণ শুকিয়ে যায় সাথে তার বাকি ঝা-দেরও। অবস্থা বুঝে ছেলেটি গলা খাঁকারি দিয়ে হেসে বলে,
—ও কিছু মনে করবেন না, আমার মা একটু রসিকতা করতে ভালোবাসেন তল।
বলেই কড়া চোখে তাকাতেই মহিলাটিও হেসে মাথা নেড়ে যোগ করলেন,
—মানে ওই আরকি হিহি।
সবাই তখন বাধ্য হয়ে হেসে ওঠে, যেন অস্বস্তিটা ঢেকে দেওয়া যায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অচেনা দাগ রেখে যায় কথাটা। ছেলের মা ঠিক মন জোগায় না, তার ভেতরে একধরনের দাম্ভিকতা, অহংকারের রেশ। বারবার নিজের ছেলের কৃতিত্বের কথা টেনে আনছেন, বড়বড় আলাপ দিচ্ছেন, আমার ছেলে এই করেছে, ওটা করেছে। তার বিপরীতে বাকিরা বেশ আন্তরিক, সহজভাবেই মিশছে।
একটু পরেই তারা বললেন,
—চলেন, এবার মেয়েকে ডেকে আনা যাক।
তালহা উঠে যায় উপরে, তাহিয়াদের ডেকে বলে,
—রিতুকে নিয়ে নিচে এসো।”
রিতু তখন সাজগোজ করে প্রস্তুত। পিংক আর হোয়াইটের মিশ্রণে সুন্দর কারুকাজ করা থ্রি-পিস পরেছে, মাথায় হালকা ওড়না টানা, মুখে স্বাভাবিক কিন্তু একটু উত্তেজিত ভাব। সে একা একাই সিঁড়ি পর্যন্ত এসে থামে না একাই নিচে নামতে শুরু করে। তা দেখে দু’বোন দৌড়ে গিয়ে তার হাত ধরে ফিসফিসিয়ে বলে,
—আরে আপু, দাঁড়াও। এত তাড়া কিসের? এভাবে গেলে ওরা ভাববে মেয়ে তো বিয়েপাগল।
রিতু বোনেদের কথায় চোখ গরম করে তাকায়। তারপর তাদের হাত ধরে নামতে থাকে। অন্য পাশে মেহরীনও ধীরে ধীরে নামছে, কিন্তু রিতুকে ধরার সাহস পাচ্ছে না যেই রাগী এই মেয়ে। নিচে পৌঁছাতেই তানিগা বেগম ইশারা করেন, তা দেখে রিতু সবাইকে মুখে সালাম দেয়। ছেলের দাদি খুশি হয়ে তাকে পাশে বসায়। টুকটাক প্রশ্ন করলে সবগুলোর উত্তর দেয় রিতু, খুব বিনয়ী ভঙ্গিতে। তারপর হঠাৎ ছেলের দাদি বলে ওঠেন,
—আমার বউ পছন্দ।
মুহূর্তেই লজ্জায় রিতুর মুখ লাল হয়ে ওঠে, মাথা নিচু করে ফেলে। ছেলের মা-বাবাও হাসি মুখে একে একে সম্মতি দেন। এবার আলাপ এগোয়, কথা বাড়ে, শর্ত-প্রস্তাব সবই আলোচনা হয়। তবে তালহা জানায় আগে তাড়া দেখবে তারপর তাদের পক্ষ থেকে উত্তর যাবে। একপর্যায়ে ছেলে-মেয়েকে আলাদা করে কিছুক্ষণের জন্য কথা বলতে পাঠানো হয়। ছেলের মা তখন কৌতূহলভরে জানতে চান,
—ওই যে ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল তিনজন মেয়ে, ওরা কে?”
তিতলি বেগম হেসে উত্তর দেন,
—“একটা আমার মেয়ে, আরেকটা রিতুর বোন আর ওটা আমার বোনের মেয়ে।”
কথাটা শুনে মেহরীন এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে যায়, তার চোখে বিস্ময়ের ছায়া। দ্রুত চোখে তাকায় উনার দিকে। তিতলি বেগমের চোখে তখন একরাশ মায়া, চোখের দৃষ্টিতে যেন বললেন, চিন্তা করিস না, তুইও আমারই মেয়ে। তা দেখে মেহরীন মৃদু হাসল কৃতজ্ঞতার হাসি।
এভাবেই কেটে যায় আরও দুই ঘণ্টা। সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়ার পর আড্ডার পরিবেশ যেন আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মূলত সাদির দাদি, মানে ছেলের দাদি সব নাতি-নাতনিদের একত্র করেছে, সাথে তাদের দাদিও উপস্থিত। দুই দাদি যেন এক মঞ্চের দুই প্রধান অভিনেত্রী, হাসি-ঠাট্টায় গল্প করতে করতে সবাইকে আনন্দিত করে তুলছে দুজনেই।
পাশের সিঙ্গেল সোফায় তালহা নীরবে বসে ফোনে ব্যস্ত। মেহরীন ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে তালহার দিকে নজর রাখে। আজ তালহা সাদা পাঞ্জাবি পড়েছে, চুল কপালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুধু তাই নয়, আজ যেন একটু বেশি উড়াউড়ি করছে এদিক-সেদিক, হয়তো শ্যাম্পু করেছে চুলে। চোখে মোটা ফ্রেমের পাওয়ারি চশমা, যা দেখলেই বোঝা যায় মোবাইল বা ল্যাপটপের সঙ্গে তার কতটা ঘনিষ্ঠতা।
মোবাইলের স্ক্রিন চশমায় হালকা প্রতিফলিত হয়ে দেখা যাচ্ছে, মেহরীন সেটাই লক্ষ্য করে চোখ ছোট ছোট কুঁচকে বেশি দেখার চেষ্টা করে, তবুও দূর থেকে কি করছে বুঝে ওঠা কষ্টসাধ্য। হঠাৎ তালহা চোখ তুলে তাকাতেই, দুইজনের চোখ মিলে গেল। মেহরীন কিছুটা থমকে যায়। তালহা স্বরে ব্রু উচিয়ে “কি?” জিজ্ঞেস করতেই, মেহরীন মাথা এদিক-সেদিক করে কিছুনা ইশারা করে চোখ নামিয়ে নেয়।
দাদিরা গল্পের মোর ঘুরিয়ে হঠাৎ তাদের নিজস্ব বিয়ের গল্পে চলে এসেছে, কে কিভাবে বিয়ে করেছে, কী কাহিনী ছিল, সবই মনোযোগ দিয়ে শোনা হচ্ছে বাকিদের। তালহার দাদির কথার পালা শেষ হতে না হতেই সাদির দাদি উঠে পড়ে তার বিয়ের কথাটা বলার জন্য। তিনি খানিক পান চিবিয়ে বলতে লাগলেন,
—আমার বিয়ের কথা শুনে বেশ মজা পাবে, আমার তো কট খেয়ে বিয়ে হ…
বাকিটুকু আর বলতে পারল না, দুপাশ থেকে হঠাৎ কাশির শব্দ উঠে থেম্ব যান। এক সঙ্গে কাশির শব্দে পরিবেশ হঠাৎ নিরব হয়ে যায়। সকলেই কথাবার্তা থামিয়ে তাদের দিকে চেয়ে। তালহা আর মেহরীন দুজনই তা বুঝতে পেরে চট করে কণ্ঠ একটু নিচু করে আনে। একে অপরের দিকে চোরাচোখে তাকাতেই সঙ্গে সঙ্গে আবার চোখ সরিয়ে নেয়।
মেহরীন কাশতে কাশতে মাথায় হালকা চাপড় দেয়, দেখা মাত্রই তালহার দাদি দ্রুত তার পিঠে ঘষতে লাগেন, আর তিতলি বেগম ছুটে যায় ছেলের কাছে।
—আজব তো, দুটো একসাথে ভীষম খেলি কি করে। কিছু তো খাচ্ছিলিও না, এই তাহিয়া পানি আন মা তাড়াতাড়ি।”
তিতলি বেগমের ফরমায়েশ শুনে তাহিয়া-মেহেদি দৌড়ে গিয়ে পানি আনল। পানি খেয়ে তালহা ঝটপট উঠে দাঁড়াল, আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা ঘরে চলে গেল। মেহরীনও, আমতা আমতা করে উপরে চলে গেল
ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেহরীন। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের বদলে যেন ভেসে উঠছে তাদের বিয়ের সেই মুহূর্তগুলো, সেই লজ্জা, সেই অনিশ্চয়তা, সেই ঝড়ের ভেতর হঠাৎ পাওয়া এক নিরাপত্তা। হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা আসে, তখন যদি তালহাদের না পেতো, তাহলে আজ তার কী হতো? ডাকাতদলের হাতে পড়লে হয়তো…। ভাবতে গিয়েই বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়। ধর্ষণ করে মেরেও ফেলতো ওরা। সেই দৃশ্যটা কল্পনাতেই কেমন ভয়ঙ্কর লাগছে আর বাস্তবে হলে তো।
এবার মেহরীন আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের মুখটা পরখ করে। আগের মতো আর কঙ্কালসার মুখটা নেই, চেহারাটা এখন একটু ভরেছে, গালের হাড়গুলোতে আগের তুলনায় একটু বেশি নরম মাংসের রেখা এসেছে। স্বাস্থটাও আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে। চোখে একরাশ আলো, তাতে জীবনের ছোঁয়া। মনে পড়ে যায় অতীতটা, নিজের আপন চাচার ঘরে দুই বেলা কোনোমতে খেতে পেলেও, পরের বেলায় দাদি লুকিয়ে খাবার দিতেন। সেই বাড়িটা যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় কারাগার ছিল। আর আজ, অচেনা এই বাড়িতে একবেলা না খেলেই তিতলি বেগম চিন্তিত হয়ে পড়েন। কি অদ্ভুত না জীবনটা? পর আপন অথচ আপন পর। কথাটা কেমন ছন্নছাড়া তবুও সত্য। সে ওখানে অএয়েছে আতংক,আর এখানে পাচ্ছে নিরাপত্তা, যত্ন। তবে কি আল্লাহ তার কষ্ট সহ্য করার জন্য উপহার হিসেবে এগুলো দিয়েছেন। তবে কতোদিন থাকবে এই সুখ।
মেহরীন আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকায়।
এই যাংজট ঢাকা শহরে এখন একা হাঁটার কথা ভাবলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে। আর তখন? তখন কিনা একা নিজের জীবন সুন্দর করার আশায় পালিয়ে এসেছিল সে। ভাবলে হাসিও পায়, তখন কতটা সরল ছিল সে। একা থেকে জীবন সুন্দর করা যায় বুঝি? তখন তো একটুখানি ভাবনাও আসেনি,সে কি নিজের দায়িত্ব নিতে পারবে? নিজেকে সামলাতে পারবে? ভাবতে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
একটা হালকা স্রোতের মতো অনুভব বুকের ভেতর বয়ে যায়, তালহা না থাকলে হয়তো আজ “মেহরীন” নামটাই হারিয়ে যেত কোথাও। তালহাই তাকে বাঁচিয়েছে, শুধু জীবন নয়, নিজের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।
এক ঝাপটা পানি মুখে ছিটিয়ে ভেসিনে হাত রেখে দাঁড়ায় সে।চোখে এক অদ্ভুত ঝলক, ঠোঁটে কেঁপে ওঠে একটুখানি হাসি,
—আপনি আমার জীবনের শুভাকাঙ্ক্ষী হলেও, আমি আপনার সবচেয়ে বড় ঝামেলা।
কথাটা উচ্চারণ করতেই নিজেই হালকা হেসে ওঠে। তবে সেই হাসির আড়ালে চোখ ভরে ওঠে পানিতে। গাল বেয়ে টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ে জল। মৃদু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলে,
—এই পৃথিবীতে আমার একটাই আপনি,
এই আপনিটাকেই আমি পাগলের মতো ভালোবাসি। বিশ্বাস করেন, আপনি আমার আবেগ নন, আপনি আমার ভালোবাসা, যাকে বলে সত্যিকারের, নিখাঁদ ভালোবাসা।
এই কথাগুলোর পরপরই তার চোখে নেমে আসে এক নিঃস্তব্ধতা। শুধু আয়নায় নিজের ভেজা চোখের প্রতিবিম্বটা দেখে মনে হয়, ভালোবাসা হয়তো ঠিক এমনই হয়, যা মানুষকে ধ্বংসও করে, আবার বাঁচিয়েও দেয়। সে যে এমন একজনকে মন দিয়ে বসেছে যে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
হালকা ফুপিয়ে উঠে মেয়েটি। এতোদিন তার জীবনে কোনো পিছুটান ছিল না। এক দাদি ছিল, সেও নেই। জীবনটা বেশই তো কাটছিল। তাহলে কেন এই তালহা এলো? কেন এমনভাবে এল যে, তার ভেতরটাকেই ওলটপালট করে দিল? ভাবতে ভাবতে বুকটা ভার হয়ে আসে। বারবার মনে হচ্ছে, সেদিন ওদের হাতে পরে যদি মরে যেতো, তাহলে হয়তো এ পৃথিবী থেকে একটা ঝামেলা বিদায় নিতো। তাহলে হয়তো এই ছোটলোকি মনটা আজ এত বড় ধাপ দিতো না।
তালহার বিয়ে হলে তার কি হবে? সে কি সহ্য করতে পারবে সেই দৃশ্যটা? তালহা অন্য কারো পাশে দাঁড়িয়ে আছে, অন্য কারো নামের সঙ্গে জুড়ে আছে তার নাম? মুহূর্তেই বুকের মধ্যে একটা জিদ, এক অজানা তীব্রতা দপ করে জ্বলে ওঠে।
নিজেরই অজান্তে ঠোঁট কেঁপে উঠে বলে ফেলে,
—আপনি অন্য কারো হলে আমি তাবিজ করে আপনার সংসার নষ্ট করে দিবো।
কথাটা মুখ থেকে বেরোতেই নিজেই আঁতকে ওঠে। এই সে কি বলল? সে যে জানে কারো খারাপ চাওয়া পাপ, আর সেই কিনা নিজের ভালোবাসারই খারাপ চাইলো। এটা তো মহাপাপ। অপরাধবোধে বুকটা হুহু করে ওঠে। নিজের মনকেই ঘৃন্না লাগে ঘৃন্য মনোভাবে জন্য। মানুষ যখন যোগ্যতার বেশি কিছু পেয়ে যায়, তখন যেমন অহংকারে ভরে ওঠে মন। তার কাছে মনে হচ্ছে তার মনটাও ঠিক তেমনই লোভী হয়ে উঠেছে।
নিজের অবস্থান কোথায় তা যেন ভুলেই বসেছে। তালহা যে বড্ড দামী, এই চিন্তাটা ঘুণাক্ষরেও তার মাথায় এল না। তালহার যোগ্য সে নয়, এই চরম সত্যিটা যেন হঠাৎ আঘাত করল মাথায়। তার মন তা মানতে নারাজ তবে তার মস্তিষ্ক বলছে তাই। দুই হাতে চুল টেনে ধরে বাথরুমের দরজার পাশে বসে পড়ে। পাগলের মতো লাগছে নিজেকে। জীবনটা কেমন যেন গুলিয়ে গেছে, আবেগ, যুক্তি, ঠিক-ভুলের সীমা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বিরবিরিয়ে বলে ওঠে,
—না না মেহরীন, তুই তার খারাপ চাইতে পারিস না। উনি যেন অনেক ভালো থাকে, অনেক সুখী হয়..
বেশ কিছুক্ষণ নিজের সাথে বোঝাপড়ার পর উঠে দাঁড়ায়। সাওয়ার অন করে সাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে স্থির হয়ে। পানির প্রতিটা ফোঁটা তাকে ধুয়ে দিচ্ছে, সাথে যেন সব অপরাধবোধ, সব জ্বালা মিশে যাচ্ছে সেই পানির স্রোতে। অশান্তি কিছুটা কমে আসছে। ঠোঁট কাঁপছে, চোখ বন্ধ করে ফিসফিসিয়ে বলে,
—তবে মনে রাখবেন তো আমায়? এক মুহূর্তের জন্য হলেও আমি আপনার বউ, রাখবেন মনে আমায়?
সময় কেটে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর ভেজা শরীরে বাথরুম থেকে বের হয় সে। কাপড় আনেইনি সাথে, তাহিয়া যদি নিচে থাকে, তাহলে এখন ডেকে আনাও সম্ভব নয়। ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। ঘর ভিজে যাবে ভেবে এক ছুটে ওয়ারড্রবের দিকে পা বাড়ায়। ঠিক সেই সময় দরজা ঠেলে কেউ বড় বড় পা ফেলে ঢোকে পড়ে,
—মেহরীন, নিচে….
বাকিটা মুখে আনার আগেই থেমে যায় তালহা। সামনের দৃশ্যটা দেখে যেন শ্বাস আটকে যায় তার। এক মুহূর্ত নীরবতা, তারপর আচমকা দরজা বন্ধ করে ছিটকানি লাগিয়ে দেয়। মেহরীন সেই শব্দে কেঁপে ওঠে। গায়ের ভেজা ওড়নাটা টেনে ঠিক করে নেয় দ্রুত। তারই মধ্যে বাইরে থেকে দরজায় টপাটপ বারির আওয়াজ,
—এই ভাইয়া, তুমি আবার এখানে ঢুকে দরজা লাগালে কেনো? সবাই ডাকছে, নিচে আসো!
মেহেদির গলায় তালহা ভারী স্বরে বলল,
—তুই যা ভাইয়া আসছি।
বলতেই সে চলে যায়, তালহা পেছন ঘুরে হাত বুকে গুজে দাঁড়ায়। চোখের দৃষ্টিটা তীক্ষ্ণ, কণ্ঠে রুক্ষতা,
—জর বাঁধানোর ইচ্ছে?
মেহরীন মাথা নিচু করে, কাঁপা গলায় বলে,
—না…
তালহার কণ্ঠ আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে,
—এই অসময়ে ভিজলে কেনো? আর পানিতে এতক্ষণ ছিলে কেনো?
মেহরীন অবাক চোখে তাকায়,
—আপনি বুঝলেন কি করে আমি অনেকক্ষণ ছিলাম?
তালহা ঠোঁট চেপে শান্ত স্বরে বলে,
—তোমার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
মেহরীন আরও অবাক হয়। চোখ দেখেও এতোকিছু বুঝা যায়, তালহা কতো ট্যালেন্টেড। ভাবতেই একটুখানি হেসে ওঠে,
—ওয়াও! আপনি তো অনেক জ্ঞানি। মানুষের চোখ দেখেই সব বলে দিতে পারেন সব।
তালহা হালকা ধমক দিয়ে উত্তর দেয়,
—হ্যাঁ, আর এখন এইটাও বলতে পারি তুমি একটা গাধা।
মেহরীন চোখ পিটপিট করে বলে,
—এহহ?
তালহা এবার জুড়েই ঝারি দিয়ে ওঠে,
—এহ নয়, হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি কাপড় বদলাও ইডিয়েট। সাধে কি গাধা বলি? নিজের চিন্তা নিজের নেই।
তালহার কড়া ধমকে চমকে ওঠে মেহরীন। দ্রুত পা বাড়ায় ওয়ারড্রবের দিকে। আড়চোখে একবার তাকাতেই দেখে, তালহা মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। মুখটা কেমন যেন চুপচাপ, গম্ভীর।
ওয়ারড্রব খুলে তাড়াহুড়ো করে কাপড়টা নিয়ে ফিরে আসে। পা টিপে টিপে হাটছে পড়ে না যায় সেই ভয়ে। তবে তালহার সামনে দিয়ে যেতে নার্ভাস লাগছে। দ্রুত তাকে পেরিয়ে যেতে গিয়েই গিয়েই অঘটন টা ঘটে। তখনি পা পিছলে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। ভয়ে হালকা শব্দ করে ওঠে,
—আআয়া
সঙ্গে সঙ্গে চোখ খিচে বন্ধ করে নেয়। এদিকে মেহরীনের হঠাৎ চেচিয়ে উঠায়, পাশ ফিরতেই তালহা সেকেন্ডে দু’কদক এগিয়ে আসে। দু’হাতে তাকে আঁকড়ে ধরে কোনোরকমে। কিন্তু ভেজা মেঝেতে তারও পা পিছলে যায়। ব্যস দুজনেই ধপাস করে মেঝেতে পড়ে যায় একসাথে। ব্যথার ধাক্কায় সাথে সাথেই দুজনের মুখ থেকে একসাথে বেরিয়ে আসে,
—আহহহ…
মেহরীন নিচে, তার ওপরে তালহা পড়েছে। তালহার বাম হাত মেহরীনের মাথার নিচে, ডান হাত মেঝেতে ঠেকানো। তার পুরো শরীরের ভার এসে পড়েছে মেহরীনের উপর। চোখমুখ খিচে সামনে তাকাতেই, এক মুহূর্তের জন্য যেন তালহার পৃথিবী থেমে যায়। এমন এক পরিস্থিতি দুজন এতো কাছাকাছি। অজানা ঘোর বস করে তাকে, একধ্যানে তাকিয়ে আছে ভীত মেহেরীনের মুখের পানে। অন্যদিকে মেহরীন ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। ভেবেছিল মাথা বুঝি ফেটে গেল, কিন্তু আশ্চর্য! মাথায় একটুও ব্যথা লাগেনি। চটজলদি চোখ খুলতেই চোখে পড়ে তালহার মুখ, তার একদম সামনে। এক নিঃশ্বাস দূরত্বও নেই তাদের মাঝে।
চোখাচোখি হতেই দুজনের দৃষ্টি থেমে যায় সেখানেই। সময় যেন হিম হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। দুজন ডুবে গেছে অনুভূতির গভীর তলায়। যেখানে ঢোকার রাস্তা জানা থাকলেও বের হওয়ার রাস্তা গোলকধাঁধার চেয়ে কম নয়। তালহার মুখে ব্যথার ছাপ স্পষ্ট, তার চোয়াল শক্ত হয়তো দাতঁ চেপে রেখেছে ব্যথায়। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে পড়ে আছে, গরম নিঃশ্বাস এসে মেহরীনের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার। তা সে বেশ উপভোগও করছে। দুজনেরই হৃদস্পন্দন বেড়ে চলেছে, অনুভব করছে একে অপরের দ্রুতগতির হৃদস্পন্দন। বুকের ভেতর কেমন যেন অজানা এক স্রোত বয়ে যাচ্ছে।
মেহরীন হালকা কাঁপছে, এক হাতে তালহার পাঞ্জাবির কলার শক্ত করে ধরে রেখেছে, অন্য হাতটা তার কাঁধে। আনমনেই সেই হাতটা আরেকটু নামিয়ে তালহার হৃদপিন্ড বরাবর রাখে, তার হার্টবিট যেন সুপার ফাস্ট স্পিডে চলছে। এই বুঝি বুক চিরে বেরিয়ে এলো বলে। দ্রুত হাতটা সরিয়ে ফেলে মেহরীন।
মেহরীনের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে একটা চুল, তা নইজে নিজেই সরতে দেখে তালহা এক পলক চেয়ে থাকে। চুলগুলো মেহরীনের মুখ স্পর্শ করছে দেখে রাগে চোখের নজর কড়া হয়ে উঠে। পরমুহূর্তে ডান হাত বাড়িয়ে মেহরীনের মুখের উপরের সমস্ত চুল আঙুলের আলতো স্পর্শে সরিয়ে দিতে লাগে। সে এমনটা কেন করছে তা সে জানেনা, তবে তার চোখে অদ্ভুত এক ঝড়, রাগ, আর তার মাঝখানে লুকিয়ে থাকা এক আকুলতা। মেহরীন অবাক হয়ে দেখছে, এই মুহূর্তটা যেন অন্য জগৎ থেকে ধার করা কোনো কল্পনা। যেখানে আছে শুধু সুন্দর মুহুর্ত, নীরবতা, শ্বাসের শব্দ, আর কেবল চোখের ভাষা।
হঠাৎই তালহার মুখের ভাব বদলে যায়। মাথার নিচের হাতটা চুলের ভেতর আস্তে আস্তে আরও ঢুকে যায়। তা কি হলো মেহরীন তা ভাবতে সময় পায়নি। তার আগেই চোখের পলকে চুল শক্ত করে মুঠোয় করে ধরে মেহরীনের মুখের দিকে ঝুঁকে আসে,
মেহরীন বুঝে ওঠার আগেই, তালহার ঠোঁট এসে ছুঁয়ে যায় তার ঠোঁটে, যেন হঠাৎ বজ্রপাতের মতো কঠিন ছোয়াঁ তেড়ে এসেছে, যা অবাধ্য, অথচ গভীর। হালকা চুম্বন দিতেই তৎক্ষনাৎ নিচের ঠোঁটে কামড়ে ধরে হিংস্র পশুর ন্যায়। সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন চোখ বড়বড় করে তাকায়, ব্যথায় হাত দিয়ে ঠেলতে লাগে। তবে কাজ হয়না তালহার এ কাজ কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকে, এমনকি তাকে নড়াতেও অক্ষম মেহরীন। তালহার চোখে মুখে একটা অজানা আবেগ, রাগ, ক্ষোভ, যেন অপ্রকাশিত যন্ত্রণার বিস্ফোরণ।
মেহরীনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, শরীর শিউরে ওঠছে বারবার। চোখে বিস্ময়, আর এক চিলতে অজানা কাঁপন। মনে প্রশ্ন জাগে তালহা কি তাকে আদর করছে নাকি রাগ ঝারছে? তবে ব্যথায় ছটফট ও করছে, মাংসটাই কি ছিড়ে ফেলবে নাকি। পরক্ষণেই তালহা তাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। দরজাটা শব্দ করে খুলে, একটিও কথা না বলে সেকেন্ডে নিজের রুমে ঢুকে আবারও শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দেয়।
মাত্র কী হলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না মেহরীন। মাথাটা যেন কাজই করছে না। হতবাক চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওটা কি সত্যিই তালহা ছিল, নাকি অন্য কেউ? মনে হাজারটা প্রশ্নের ভিড়। ভাবতে ভাবতেই একটু নড়েচড়ে উঠতে গিয়েই ‘আহহহ!’ করে চিৎকার করে ওঠে। যেন শরীরের সব হাড়মোড় ভেঙে গেছে। ব্যথায় কুঁকড়ে যায় বেচারি। অনেক কষ্টে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, পা টেনে টেনে কোনো রকমে বাথরুমে ঢোকে।
কাপড় বদলে বের হওয়ার আগে ঠোঁটের জ্বালায় আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেই থমকে যায়। নিচের ঠোঁট হালকা ফুলে কেটে গেছে, আর তাতে চিকচিক করছে ছোপ ছোপ রক্ত। চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়,
—লোকটা কি রাক্ষস নাকি, মাংস দেখলেই এমন ঝাঁপিয়ে পড়ে? আর একটু হলেই…
বাকিটা আর মুখে আনতে পারে না। গাল দুটো লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়। দ্রুত ঠোঁট ধুয়ে নেয়, যেন কেউ দেখলে কিছু না বোঝে। মাথায় কেবল একটাই প্রশ্ন, তালহা কি আসলেই এমনটা করেছে? এখনও যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না, সবটুকু কেমন দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।
পরপরই হঠাৎ আবারও মনে পড়ে যায় সেই মুহূর্ত, তালহার স্পর্শ, তার ভারী শ্বাস, ভাবতেই শরীরের ভেতর কোথাও গরম আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে অচেনা এক অনুভূতি। মনে হয় কান দিয়ে সেই আগুনের গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। চোখ খিচে বন্ধ করে নেয়, মাথা নাড়ায় লজ্জায়। তবে পরমুহূর্তে মুখে নেমে আসে আধার, সে তার নয়, চিন্তা আসতেই সব চিন্তা ঝেরে ফেলে।
কাপড় পরে বের হতেই তাহিয়ার সামনে পরে। মেহরীনের হাঁটার ভঙ্গি দেখে তাহিয়া চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—কিরে, কি হয়েছে?
মেহরীন বিছানায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে, মুখ ভার করে বলে,
—উফ, আর বলিস না, পিছলে পড়েছিলাম। হাতির মতো লোকটা আমার উপ…
বাকি কথাটা মুখে রেখেই থেমে যায়। সাথে সাথেই ভেতরটা আঁতকে ওঠে, এইরে! যদি সব বলে ফেলতাম। এদিকে তাহিয়া কৌতূহলভরে চোখ বড় করে তাকায়,
—থামলি কেন? বল না, হাতির মতো লোক তোর উপর পড়েছে? আর কে সেই হাতি?
মেহরীন দ্রুত কথার মোড় ঘুরিয়ে বলল,
—না না, আমি বলছিলাম আমি-ই হাতির মতো মেয়েটা পিছলে ধপাস করে পড়েছি।
তার কথা শুনতেই তাহিয়া হেসে উঠে, হাসতে হাসিতে যেন গড়াগড়ি খাচ্ছে। মেহরীন মুখ গোমড়া করে বসে আছে। তার তো এখনো শরীরটা ব্যথায় নীল হিয়ে যাচ্ছে, আর এই মেয়ে কিনা তাকে নিয়ে হাসছে। এবার হাসি থামিয়ে তাহিয়া একটু কাছে এসে বসল। মেহরীনের মুখের ভাব দেখে বোঝে, ও সত্যিই অনেক ব্যথা পেয়েছে। তারমধ্যে মেহরীন জিজ্ঞেস করল,
—ওরা কি চলে গেছে?
তাহিয়া উত্তর দিল,
—হু, তোকে আর ভাইয়াকে যাওয়ার আগে খুঁজছিলো, কিন্তু তোরা দুজনেই উধাও।
তাহিয়া এবার একটু চিন্তিত হয়ে মেহরীনকে পরখ করতে করতে জিজ্ঞেস করল,
—ঠোঁটে কি হয়েছে রে..?
এই প্রশ্নে মেহরীন কিছুটা কেঁপে উঠে। তাহিয়া কি বুঝে গেল নাকি ভেবে দ্রুত বলল,
—ও ওই উল্টে পড়েই তো ঠোঁটেও লাগল।
শুনতেই তাহিয়ার হাবভাব বদলে যায় মমতা মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করে,,
—তুই কি খুব ব্যথা পেয়েছিস?
মেহরীন মাথা নিচু করে, ঠোঁট কামড়ে শুধু “হ্যা” বলে। তআ দেখে তাহিয়া নিচে গিয়ে মায়ের কাছ থেকে বলে ব্যথার ওষুধ এনে দেয়। ওষুধ খেয়েই মেহরীন বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। বিরবির করে উঠে,
—ভাই ব্যথা দেয় আর বোন মলম লাগিয়ে দেয়। কি কাজকাম এদের…..
চোখ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে। শরীরটা ক্লান্ত, মনটা অস্থির, মাথার ভেতর এখনো সেই মুহূর্তটা ঘুরছে, তালহার ছোঁয়া, তার চোখের তীব্রতা, আর নিজের ভেতরের অচেনা কাঁপুনি। সবমিলিয়ে যেন আবারও তার সেই অবাধ্য মন তালহাতে মেতে উঠেছে। নিজেকে তালহার থেকে গুটিয়ে নেওয়ার চিন্তা যেন একটু আগের সেই ঝড়ের সাথেই চলে গেছে। সবশেষে, ব্যথা আর বিভ্রান্তির মাঝেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুম, যেখানে হয়তো এখন আবার স্বপ্ন হয়ে সেই মুখটা ফিরে আসবে।
ঘুম ভাঙতেই মেহরীন দেখে রাত নয়টা বাজে। কপালে হাত দিয়ে চোখ বুজে ফেলে, মনে মনে বলে ওঠে,” এতোক্ষণ ঘুমাচ্ছি আর কেউ ডাকলই না!” তালহাও কি আজ পড়াতে আসেনি? দ্রুত উঠতে গিয়ে কোমড়ে হালকা ব্যথা অনুভব করে, শরীরের ব্যথা কম, তবে কোমরে একটু তুলনামূলক বেশি ব্যথা। ফ্রেশ হয়ে আস্তে-ধীরে নিচে নামতেই দেখল, তাহিয়া খালা আর দাদি টিভি দেখছে। এগিয়ে গিয়ে তাহিয়ার পাশে বসে জিজ্ঞেস করল,
—আমাকে ডাকিসনি কেনো?
—আম্মু বললো ঘুমাচ্ছিস, যেহেতু ঘুমাক।
—তো সন্ধ্যায় ডাকলি না, উনি পড়ায় নি?
—পড়িয়েছে, তবে আজ অল্পই।
—তো আমাকে ডাকলি না।
—ভাইয়া বললো ঘুমাচ্ছিস, যেহেতু থাক।
মেহরীন অবাক, তালহার আচরণ দিন দিন কেমন বদলে যাচ্ছে। মিথ্যা বলছে, আবার আজকে পড়াতেও ডাক দেয়নি। চিন্তা ভাবনা মাথায় ঘুরতে থাকে, শেষমেষ সে টিভিতেই মন দেয়।
দশটা বাজে,
সবাই টেবিলে বসেছে, শুধুমাত্র একজন বাদে, তালহা। তাহিয়া আবারও গেছে তাকে ডাকতে। এবার সে নিয়েই নেমে এলো। মেহরীন আড়চোখে তাকাতেই দেখে, ঘুম-ঘুম চোখে তালহা এগিয়ে আসছে। এতোক্ষণ ঘুমিয়েছিল হয়তো, ভাবতে ভাবতেই চোখ পড়ে কপালের সাদা বেন্ডেজের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠে “কপালটা কি হলো?”
সাথে সাথেই মনে পড়ে, যখন পরেছিল তার পাশের মেঝেতে মাথায় বাড়ি খাওয়ার আওয়াজ হয়েছিল। তবে ভেবেছিল, নিজেরই মাথা ফেটেছে পরে দেখল না। তাহলে কি তখন তারই কপালে লেগেছিল। সঙ্গে সঙ্গে অপরাধবোধ নেমে আসে তার চোখমুখে, নিজেকে ভীষণ অসহ্য লাগছে। তালহা এসে বসতেই বিল্লাল সাহেব জিজ্ঞেস করেন,
—এখন কেমন লাগছে?
তালহা আস্তে করে উত্তর দেয়,
—বেটার।
তানিয়া বেগম তালহার পাশে দাঁড়িয়ে খাবার পরিবেশন করতে করতে বললেন,
—বুঝলাম না, আজকে তুইও পড়েছিস, মেহরীনও পড়েছে। সব বিপদ একদিনেই, আল্লাহ সবাইকে রক্ষা করুন।
মেহরীন চোরাচোখে তাকায় তালহার দিকে। তালহা একপলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। ইশ্, তার জন্য কতটা ব্যথা পেয়েছে, ভাবতে ভাবতে মেহরীন নিজেকে অপরাধীর তাকমা লাগাচ্ছে বারবার। পাশ থেকে দাদি বললেন,
—বিপদ আসলে তো আর বলে আসেনা, সবাই সাবধানে চলো।
পরের দিন সকাল নয়টা,
মেহরীনরা বসে আছে গাড়িতে। সামনে ড্রাইভার, পাশের সিটে তালহা, পেছনে তারা। তালহার হাতে চুট লেগেছে, তাই আজ গাড়ি চালাতে পারছে না। মেহরীন মিয়িয়ে যায়, তার মাথা বাঁচাতে গিয়েই যে ব্যথা পেল। ভেবেছে একবার সরি বলে দিবে। আবার লজ্জাও লাগছে, তালহার সঙ্গে কথা বলার জন্য। কালকের কান্ডের পর থেকে এখন তাকাতেও লজ্জা পায়।
গাড়ি কলেজের সামনে থামতেই দুজনে নেমে পড়ে। বিদায় নিয়ে গেট পেড়িয়ে ঢুকতেই দুইপাশ থেকে “ভাউ” শব্দে লাফিয়ে ওঠে। দুজনেই ভয় পেয়ে দু’কদম পেছনে হটে। ফারিন-রাফি তো তাদের ভয় পেতে দেখে হেসে হাই-ফাইভ করে চেচিঁয়ে বলে উঠে,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২১
—এক বড় না দুই বড়?
তাহিয়া ও মেহরীনও হেসে ওঠে, সঙ্গে সঙ্গে চিল্লিয়ে বলল,
—বাংলা স্যারের পেট বড়…
বলেই দুজন হাসিতে লাগলেও এবার ফারিন-রাফি চুপ, চোখে ভীতির ছাপ স্পাই। তাদের পেছনের কাউকে দেখে ভয় পাচ্ছে। কৌতুহল নিয়ে দুজন পেছন ফিরে তাকাতেই আতঁকে উঠে…
