The Silent Manor part 49
Dayna Imrose lucky
সকাল এগারোটা বাজলেও আজ রোদ নেই। সূর্যের দেখা মিলেনি।সকালের নিস্তব্ধতা যেন এখনো ভাঙেনি।পুরো হায়দার বাড়ির আঙিনা জুড়ে এক ধরনের স্তব্ধ আলো পড়ে আছে।রোদ নেই, কিন্তু ধূসর আকাশের ফাঁক দিয়ে হালকা শীতের নরম কামড় টের পাওয়া যাচ্ছে। বাতাস খুবই শান্ত, এতটাই শান্ত যে দু’একটা শুকনো পাতা মাটিতে পড়ার শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়।
দূরের কোন গ্রাম্য পথ দিয়ে মাঝে মাঝে কারো পায়ের চাপা শব্দ ভেসে আসছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।পুকুরের জলও আজ অদ্ভুতভাবে যেন, স্থিরতার কুয়াশার পাতলা পর্দা দিয়ে রেখেছে।ঘরের ছাদে থাকা শিশিরের ফোঁটা-গুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে।যেন সময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে গতি কমিয়ে দিয়েছে।
হায়দার বাড়ির বেশ কাছেই একটা ছোট্ট চায়ের দোকান।চা-দোকানের চুলা এখনো নিভু নিভু। ধোঁয়া উঠে আকাশের নিস্তরঙ্গ সাদায় মিলিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মুখ নেই, কোলাহল নেই।শুধু অজানা নিঃশব্দতার গভীর টান।পুরো পৃথিবী আজ যেন একটু থেমে শ্বাস নিচ্ছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এমন বেলা এগারোটার সকাল-নিস্তব্ধ, নির্লিপ্ত, অথচ অদ্ভুতভাবে বিষাদময়। এখানে যে কেউ দাঁড়ালে মনে হবে, তার ভেতরের কোলাহলও যেন আস্তে আস্তে থেমে যাচ্ছে।
ব্রিটিশ দল ঠিক কিছুক্ষণ আগে সিন্ধুতলি গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছে।তাঁদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছে। রশীদ তালুকদার এর চার ছেলে শেষ হয়েছে। চিরতরে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে।উনি এখন দুর্বল।ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কখনোই একা উনি লড়তে পারবেন না বলে আজই ব্রিটিশ প্রধান তাঁর বাহিনী নিয়ে আলিমনগর চলে যান।
অন্যদিকে শূন্য হয়েছে সুফিয়ান।ভোর বেলার দিকে ফারদিনার লা’শ সে-ই গোপন ঘর থেকে বাড়ির সামনে পর্যন্ত এনেছিল। সেখানে অপেক্ষায় ছিল গ্রামের মহিলারা।উনারা সুফিয়ান এর থেকে ফারদিনার লা’শ নিয়ে নেন। তাঁরা বলেছিলেন “ফারদিনাকে ধরা-ছোয়া এখন তোমার মোটেই উচিত নয়। তুমি বলো ওঁর লা’শ কোথায় নিয়ে যাবে? সেখানে আমরা দিয়ে আসছি।!”
সুফিয়ান নীরব থেকে বলেছিল তাঁর গ্রামের কথা। এরপর সকলে চলে আসেন সিন্ধুতলি।বন্দি থাকা গ্রামবাসীরাও চলে আসেন এখানে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর, গ্রামের মহিলারা মিলে ফারদিনার শেষ বিদায়ের আয়োজন করেন।বড়ই পাতা গরম জলে গোসল করান। একজন মৌলবি কে ডেকে জানাযার ব্যবস্থা করেন।সুফিয়ান একবার দেখতে চেয়েছিল ফারদিনাকে।মৌলভি বারণ করেন।বলেন “তুমি ওঁর জন্য বৈধ না। ওকে আর দেখতে পারবে না।” সুফিয়ান তখন ভেঙ্গে পড়েছিল। আকাশটা যেন তাঁর মাথার উপর আছড়ে পড়েছিল।সে আর কোনদিন ফারদিনাকে দেখবে না, তাঁকে শুনবে না।তাঁর প্রিয় মানুষটির সাথে আর কোনদিন চাইলেও দেখা হবে না। অসহায় লাগছিল নিজেকে।
‘তুমি কে?এত রাতে বাঁশি বাজাচ্ছ, আগে কখনো শুনিনি তো। ‘তোমাকে স্বর্ণের বাঁশি উপহার দিয়েছি,যেই বাঁশির সুর একান্তই আমি শুনব।’ ‘আমি আজমাত এর সাথে আলাদা সময় কাটাব। তাঁর ঘরে থাকব।’
সুফিয়ান এর কানের কাছে ফারদিনার বলা শব্দগুলো বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।যেদিকে তাকায় সেদিকেই ফারদিনাকে দেখছে।সাদা রঙের শাড়ি পরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। মুখে হাঁসি নেই তাঁর। অভিমানী দেখাচ্ছে তাঁকে। সুফিয়ান চোখ বুজে ফেলল। হ্যালুসিনেশন দূর করতে। মুক্ত হতে।কিন্তু সে বৃথা চেষ্টা করল।চোখের মণির মাঝেও ফারদিনার স্মৃতি গুলো তাঁকে ধাওয়া করে উঠল। সুফিয়ান চোখ মেলে তাকাল।
ঘরের সামনে বসে আছে সুফিয়ান।গ্রাম বাসীরা দলবেঁধে এসে সুফিয়ান কে বাহবা দিচ্ছে।কেউ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।তাঁদের গ্রামকে ব্রিটিশদের হাত থেকে রক্ষা করেছে। সুফিয়ান দাঁড়িয়ে যায়। একজন বৃদ্ধা লাঠিতে ভর দিয়ে এসে সুফিয়ান এর সম্মুখে দাঁড়ালেন। সুফিয়ান এর হাতটি মুখের কাছে নিয়ে উনি চুমু খেলেন। বললেন “তোমার বাবা সিলমন হায়দার, একজন উদার মনের মানুষ ছিলেন। গ্রাম বাসীদের ভালোর জন্য উনি অনেক কিছু করে গেছেন। কিন্তু হঠাৎ উনি চলে যাওয়াতে ভেবেছিলাম সবকিছু বোধহয় এই শেষ। কিন্তু না। তাঁর ছেলে সুফিয়ান হায়দার আমাদের সে-ই পূর্ণ গ্রামকে ধরে রেখেছে। আমাদের ব্রিটিশদের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তোমার ভালো হোক।” সুফিয়ান জানে এই জয় একজন মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এসেছে।সে বুকে পাহাড় সমান ব্যথা নিয়ে মিথ্যা হাঁসি আনল ঠোঁটের ফাঁকে।বোঝাল,সেও সন্তুষ্ট। বৃদ্ধা সরে গেলেন। এরপর এল প্রতিবন্ধী এক বাচ্চা।এক পা নেই।খোরাতে খোরাতে এসে সুফিয়ান এর সামনে দাঁড়াল।বয়স আনুমানিক চৌদ্দ। সুফিয়ান ওঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে।বলল “তুই কি বলতে এসেছিস?
বাচ্চাটি কিছুক্ষণ সুফিয়ান এর দিকে তাকিয়ে থাকল। সুফিয়ান এর বা চোখের পাশে জল জমে গালে গড়িয়ে পড়ছিল। বাচ্চা ছেলেটি সুফিয়ান এর চোখের জল পড়তে দিল না।ও নরম হাতে স্পর্শ করে মুছে দিল।বলল “ভাইয়া, তুমি কান্না ক্যান করতেছো?”
বাচ্চাটির প্রশ্ন সুফিয়ান কে পুনরায় দমন করে দিল।সে দ্রুত চোখ মুছে প্রশ্ন এড়িয়ে বলল “তোর কি অবস্থা বল,এখন সুস্থ আছিস?আর তোদের ভয় নেই, আমি চলে এসেছি,আজ থেকে সিন্ধুতলি স্বাধীন। যেভাবে খুশি আনন্দ করবি,যা ইচ্ছে করবি।কেউ আর বাঁধা দিবে না।”
বাচ্চা ছেলেটি হাত বাড়িয়ে বলল “কথা দাও ভাইয়া, তুমি আর আমাদের ছাইড়া যাইবা না, কথা দাও, সারাজীবন আমাদের পাশে থাকবা, শ’ত্রুদের হাত থেইকা রক্ষা করবা?” থেমে বাচ্চাটি আবার বলল “ জানো ভাইয়া, এতদিন আমরা শান্তিতে ঘুমাইতে পারি নাই। তুমি ফিরা আইছো,অহন আর চিন্তা নাই, কিন্তু তুমি যদি আবার চইলা যাও,আমরা তাইলে মইরাই যামু,আর কেউ শ’ত্রুদের থেইকা বাচাইতে পারব না।”
সুফিয়ান দাঁড়িয়ে পড়ল।গ্রাম বাসীরা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই অপেক্ষা করছে,কখন সুফিয়ান কথা দিবে?ওয়াদা করবে। সুফিয়ান চাইছে না কথা দিতে। বাচ্চাটি সুফিয়ান এর কনিষ্ঠা আঙুল ধরে হাতটি নাড়াচ্ছে আর বলছে,ও ভাইয়া,চুপ কইরা আছো ক্যান,কথা দাও,চুপ কইরা থাইকো না।”
একি সাথে গ্রামবাসীরা আওয়াজ তুলল। সুফিয়ান বাচ্চাটির দিকে একবার, আরেকবার গ্রাম বাসীদের দিকে তাকাল। মাঝপথে ভেসে উঠল ফারদিনার স্মৃতি। বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই তাঁর।অন্যদের পাশে ভরসাস্থল হয়ে, তাঁদের নির্ভয়ে বাঁচার আসা দিতে সুফিয়ান কেন যেন পারছে না। কিভাবে সে ফারদিনাকে ছাড়া বেঁচে থাকবে?এই প্রশ্নের উত্তর সে তৈরি করতে পারছে না।
বাচ্চাটা এবার অধৈর্য হয়ে বলল “ভাইয়া, তারমানে তুমি আমাদের কথা দিবা না, তুমি আবার চইলা যাইবা?”
“আমাদের ছেড়ে আর যেও না ভাই।” বিন্তির কন্ঠ। সুফিয়ান কাঁধের উপর থেকে ওঁর দিকে ঘুরে তাকাল। বিন্তি পাতলা সুতি কাপড়ের শাড়ি পরে আছে।হাতে স্বর্ণের বালা। জমিদার কন্যা হলেও যেন আজ ওর ভেতর সে-ই জমিদারি ভাবটা আর নেই।সরু থুতনির উপরে কালো তিলটা যেন ফুটে উঠেছে চোখের জলের স্পর্শে।
বিন্তি সুফিয়ান এর পেছনে এসে দাঁড়ায়। ভেজা কন্ঠে বলল “ভাই, কথা দাও,আর আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবে না। সারাজীবন আমাদের ঢাল হয়ে থাকবে।”
সুফিয়ান দ্বিধায় পড়ল।এখন তাঁর কি বলা উচিত ভেবে পাচ্ছে না।ইট পাথরের তৈরি মুর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে।ওয়াদার পরিবর্তে একরাশ দীর্ঘশ্বাস চলে আসল।ঠিক সে-ই মুহূর্তে গ্রাম বাসীদের মধ্য থেকে ফারদিনার কন্ঠ ভেসে আসল।সে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। মৃদু হেসে বলল “কি ভাবছো এত,কথা দাও, তুমি সবার পাশে থাকবে। বোনের, গ্রামবাসীদের ঢাল হয়ে থাকবে।চুপ করে থেকো না,কথা দাও।”
সুফিয়ান বাচ্চাটির হাতে হাত রেখে বলল “কথা দিচ্ছি,আমি আর কোথাও যাব না, যতদিন বেঁচে আছি, তোদের পাশে থাকব।” বাচ্চাটি সহ সবাই বেশ আনন্দিত হল। সুফিয়ান চোখ তুলে তাকাল ফারদিনার দিকে।ফারদিনা নেই। সেখানে সাদা শাড়িতে অন্য একজন দাঁড়িয়ে আছে। সুফিয়ান উদ্ভ্রান্তের মত চারদিকে ফারদিনার খোঁজ শুরু করল।দূর দূরে চোখ মেলাল। কিন্তু সে আর ফারদিনাকে দেখতে পেল না। সুফিয়ান এর ছোটাছুটি দেখে বিন্তি তাকে থামিয়ে দিল। সুফিয়ান এর হাত ধরে ফিসফিসিয়ে বলল “ভাই, তুমি পা’গলের মতন আচরণ করছো কেন,সবাই দেখছে তোমাকে। শান্ত হও।” সুফিয়ান এর যেন হঠাৎ করে হুঁশ ফিরল। স্থির হয়ে দাঁড়াল।
বিন্তি গ্রাম বাসীদের যেতে বললে তাঁরা চলে যায়।তখন উপস্থিত হন মৌলভী সাহেব।উনি সুফিয়ান এর সামনে এসে বলেন “জানাযা সম্পন্ন হয়েছে।যেহেতু ওনার র’ক্তের কেউ বেঁচে নেই, তাই বাধ্য হয়ে আমরাই দাফন করেছি।”
বিন্তি সুফিয়ান কে লক্ষ্য করে বলল “ভাই, তুমি জানাযায় শরীক হলে না?”
সুফিয়ান বলল “আমি অপবিত্র। একজন খু’নি। আমার মতন পাপী ওঁর জানাযা দিলে পাপ হবে। আমি যা পাপ করেছি এর বোধহয় ক্ষমা নেই। শুধু শুধু আমার পাপের বোঝা ও কেন ভোগ করবে।”
মৌলভী সাহেব চলে যান। সুফিয়ান ও বিন্তি হেঁটে হেঁটে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানের দিকে গেল। সুফিয়ান হাঁটছে ঠিকই, তবে তাঁর পায়ের আওয়াজ যেন মাটিও টের পাচ্ছে না। বিন্তি সুফিয়ান কে দেখছে।তরতাজা সে-ই সুফিয়ান আজ যেন তুলোর মত নরম হয়ে গেছে। সুফিয়ান এর এমন রুপ যেন বিন্তি আগে কখনো দেখেনি।ও আড়ালে কাঁদছে। শব্দহীন কান্না।
সুফিয়ান ফারদিনার ক’বরটি কয়েকহাত দূর থেকে দেখছে।কবরের কাছে যেতেও ভয় হচ্ছে।সে যে নিজেকে অপবিত্রই ধরে নিয়েছে।কব’রের ভেতরে অপবিত্র কেউ ঢুকতে পারে না।আজ সেও পারছে না।সে দুনিয়ার বুকে হেঁটে বেড়াচ্ছে।আর তাঁর প্রেয়সী মাটির ঘরে শায়িত হয়ে আছে।চির নিদ্রায় মগ্ন সে।যে নিদ্রা থেকে হাজার ডাকলেও আর জেগে উঠবে না।
সুফিয়ান আবার কেঁদে উঠল।বুক ভাসিয়ে কাঁদল। দাঁড়ানো থেকে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মাটিতে।এরপর লুটিয়ে বসল। বিন্তি সুফিয়ান এর কান্নায় কেঁদে উঠল।শাড়ির আঁচলটা মুখে চেপে ধরল। ওঁর ভাই তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে যেন।সহ্য হচ্ছে না ওঁর।ও ছুটে গেল সুফিয়ান এর কাছে। সুফিয়ান এর পাশে বসে।শাড়ির আঁচল দিয়ে ভাইয়ের চোখের জল মুছে দিল।বলল “ভাই, তুমি এভাবে ভেঙ্গে পড়লে আমার কি হবে? গ্রামবাসীদের কি হবে? নিজেকে সামলাও। সবকিছু একটা দুঃস্বপ্নের মত ভেবে নিজের মনকে শান্তনা দাও।”
সুফিয়ান নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বসে আছে।চোখ থেকে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। বিন্তি কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল “প্রিয় মানুষ হারানোর ব্যথা কখনো যাবে না ভাই।এই ব্যথা চিরস্থায়ী। তোমাকে একটু একটু করে শেষ করে দিবে। আমি যতই শান্তনা দেই, কাজ হবে না জানি।তবু এই য’ন্ত্রণা থেকে ফিরে আসার একটু চেষ্টা করো ভাই। তোমার অবস্থা দেখেছো, চোখের নিচটা কালো হয়ে গেছে।”
সুফিয়ান কান্না থামিয়ে বলল “চোখের নিচের কালো দাগ টা তোর নজরে এসেছে। ঠিকমতো ঘুমালে, যত্ন নিলে চোখের নিচের কালো দাগ দূর হয়ে যাবে।কিন্তু আমার হৃদয়টা পুড়ে যে কালো হয়ে গেছে, সে-ই দাগ কিভাবে দূর হবে?” সুফিয়ান এর কন্ঠে প্রকাশ পেল নীরবতার মাঝে এক ভয়ং’কর চাপা কষ্ট ।
বিন্তির কাছে এরুপ প্রশ্নের কোন জবাব নেই।সে দৃষ্টি নত করে ফেলল। সুফিয়ান ফিক করে হেসে উঠল।বলল “ফারদিনা যদি ফিরে আসে না,তবেই আমার কষ্ট দূর হয়ে যাবে।”
“ম’রা মানুষ ফিরে আসে না ভাই।”
“সৃষ্টিকর্তা চাইলে তো সব পারে,আমার ফারদিনাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না?”
“সৃষ্টিকর্তা চাইলে সব পারেন।তাই বলে মৃত ব্যক্তিদের ফিরে চাইলে উনি আরো নারাজ হবেন।”
সুফিয়ান ভারাক্রান্ত গলায় বলল “কত মানুষ জীবন্ত লা’শ হয়ে ঘুরে বেড়ায়,জীবন্ত লা’শ গুলোর ব্যথা কেউ দেখে না।আমিও আজ জীবন্ত লা’শ হয়ে গেছি।”
“তুমি এরকম বললে আমার কষ্ট হয় ভাই। আমার জন্য অন্তত নিজেকে সামাল দাও। ধৈর্য ধরো। সময়ের অপেক্ষা করো,সময় এবং অপেক্ষা সবকিছু ঠিক করে দিবে।” থেমে বিন্তি আবার বলল “যা হওয়ার হয়ে গেছে। আল্লাহ ক্ষমাশীল। তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। দোয়া কর। দেখবে তুমি শান্তি পাবে।”
সুফিয়ান ফারিনা বেগমের কব’রের দিকে তাকাল। তাঁর পরের কব’রটি সিলমন হায়দার এর। তারপর, তাঁর দাদা,দাদি,পিয়াশার কব’র। শেষের কব’রটি ফারদিনার।সবক’টি কব’রের দিকে চোখ মেলাল। এরপর বলল “যদি দোয়া করে কাউকে ফিরে পাওয়া যেত, তবে আমি আমার মায়ের জন্য দোয়া করতাম। যদি অপেক্ষা করে কাউকে ফিরে পাওয়া যেত, তবে আমি আমার না হওয়া মানুষটির জন্য অপেক্ষা করতাম।”
সময় গড়াচ্ছে।দুজনেই চুপচাপ বসে রইল। সুফিয়ান অপলকে দূর থেকে ফারদিনার ক’বরটির দিকেই দেখছে। বিন্তি পাশেই বসে আছে। ভাইয়ের থেকে দূরে যাচ্ছে না।কখন কি করে বসে বলে অজানা ভয় ওকে গ্রাস করে রেখেছে। উঁকি দিয়ে একবার ঘরের দিকে দেখছে। ঘরের বাইরে তাঁদের ক’জন অনুচর পায়চারি করছে।
সুফিয়ান হঠাৎ করে বিন্তি কে ডাকল। “বিন্তি”
বিন্তি ছোট্ট করে উত্তর দিল। “হুঁ।”
“আত্ম’হত্যা করা পাপ তাই না।”
“হুঁ। আত্ম’হত্যা করলে একালে-পরকালেও শান্তি পাওয়া যায় না।”
“তাহলে তুই একটা সহজ উপায় বের করে দে, যাতে আমি যত দ্রুত সম্ভব দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারি।”
বিন্তি চোখে জল নিয়ে সুফিয়ান এর দিকে তাকাল। মুখটি এলোমেলো হয়ে গেল।ভাই তার বোনের কাছে মৃ’ত্যুর উপায় চাইছে। দুনিয়ার সবচেয়ে করুণ,আর নি’কৃষ্ট আবদার বোধহয় এটাই। বিন্তির নিস্তব্ধতা দেখে সুফিয়ান বলল “ভাবছিস,কি আবোলতাবোল বলছি আমি! তোকে রেখে চলে যেতে চাচ্ছি, তবে কি তোকে ভালবাসি না! আমি তোকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু তোকে রেখে যেতে আর আমার ভয় নেই,তোকে একজন সুপাত্রের হাতে তুলে দিতে পেরেছি।ও তোকে সারাজীবন আগলে রাখবে।”
বিন্তি নিরুত্তর। শুধু অঝোরে চোখের জল ফেলছে। সুফিয়ান সেকেন্ড কয়েক চুপ থেকে আবার বলল “না থাক! আমার মত নিকৃ’ষ্ট মানুষকে মৃ’ত্যুর উপায় বলে দিতে হবে না। আমার পাপের ভার অনেক বেশি।পড়ে এইভার হয়ত তোকে সইতে হবে।ভাই হয়ে বোনের ক্ষতি করতে পারব না।”
“তুমি কোন পাপ করোনি ভাই,যা কিছু করেছো বাধ্য হয়ে। তোমাকে দিয়ে পাপ করানো হয়েছে।”
সুফিয়ান এর চোঁখের ভাঁজে অতিতের সে-ই কাল্পনিক চিত্র গুলো ভেসে উঠল। একদিন রাতে সে কিছুটা ইচ্ছায়, খানিকটা অনিচ্ছায় ফারদিনাকে ব্যবহার করেছে। শুধুমাত্র ওঁর পরিবার কলঙ্কিত করতে। প্রতি’শোধ নিতে। আজকে সে-ই দিনটার কথা মনে পড়তেই সুফিয়ান এর ভেতরের সত্তাটা ছিঃ ছিঃ করে উঠছে। নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে জঘন্য মানুষ মনে হচ্ছে।ফারদিনার সাথে সেদিন অমনটা না করলে বোধহয় আজকের এই দিন দেখতে হত না।
আক্ষেপের সুরে সুফিয়ান বলল “আমি পাপ করেছি বোন।যেই পাপের বোঝা আমাকে আজিবন বয়ে বেড়াতে হবে।বড্ড ভারী জানিস এই পাপের বোঝা।সইতে পারছি না।আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে,আমি কি পাপ করেছি?যেই পাপের জন্য আমার জীবনটা নরকে পরিণত হল!”
বিন্তি নিজের চোখের জল মুছে বলল “যা হয় ভালোর জন্য।” বিন্তির মিথ্যে শান্তনায় কাজ হল না। সুফিয়ান তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।বলল “সব ভালোতে ভালো হয় না,বরং ধ্বং’সও নিয়ে আসে। আমার জীবনে ভালোটা আর কোথায় হল! মা বাবাকে হারালাম, বোনকে হারালাম, যাকে আমার অন্ধকার জীবনের প্রদীপ ভাবতাম, শেষমেষ সে-ই প্রদীপটাও নিভে গেল। আমি আমার ধ্বং’সের শেষ প্রান্তে এসেও ধ্বং’স হলাম।কি ভাগ্য আমার!”
বিন্তি কিছু বলল না। ওঁর বলার মত আর কোন শব্দ অবশিষ্ট রইল না যেন।বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তখন চোখে পড়ল চারজন অচেনা ব্যক্তিদের। চারজনই সাদা রঙের ফতুয়া পরে আছে।বয়স, চেহারা ঠিক একই রকম। বিন্তি জিজ্ঞেস করল “আপনারা কারা?”
সুফিয়ান ঘুরে তাকাল।বদরু, হাবলু, লাল মিয়া, সোলেমান ওঁরা এসেছে। সুফিয়ান দাঁড়াল। ওঁরা নিস্তব্ধ চাহনিতে সুফিয়ান কে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল। এরপর সোলেমান এগিয়ে এসে বলল “সবকিছু কুদ্দুস এর থেকে শুনেছি। তালুকদার এর চার ছেলে শেষ হয়েছে।শুনে খুশি হয়েছি। কিন্তু যখন শুনলাম আপনি ফারদিনাকে নিজ হাতে মে’রে ফেলেছেন,আমি থমকে গেছি।ওই শয়’তান গুলো আপনাকে বাধ্য করেছে তাঁকে মা’রতে।ভেবে খুব কষ্ট হচ্ছে জানেন তো, আপনার আর জমিদার কন্যার প্রেমের পূর্ণতা মিলল না।”
সুফিয়ান নীরবে শ্বাস ফেলল। কিছু বলল না।বদরু এগিয়ে এল। “আপনি আমাদের গ্রামকে মানবশূন্য করছেন।জানেন,যখন শুনেছি তখন একটিবার এর জন্যও আপনাকে খারাপ ভাবিনি। জানতাম, আমাদের সুফিয়ান ভাই একজন সৎ পুরুষ।সে যা করেছে হয়ত তাঁর পেছনে কোন উদ্দেশ্য ছিল। এরপর আমরা সব জানতে পারি।গর্ব হচ্ছে আপনাকে নিয়ে।”
লাল মিয়া পেছন থেকে সামনে এসে বলল “আমরা ওই গ্রাম থেকে চলে এসেছি। চিরদিনের জন্য। ওই গ্রামে থাকলে ব্রিটিশদের কথামতো চলতে হবে। ওঁদের ফ্যাক্টরি তৈরিতে সাহায্য করতে হবে।হয়ত মোটা অংকের টাকা পাব। কিন্তু সে-ই টাকা চাই না।আমরা আপনার গ্রামে কৃষিকাজ করব। যতটুকু প্রাপ্য ততটুকু আয় করব।ব্যস।এর বেশি কিছু চাই না।”
ওঁরা আজ পরিবর্তন হয়েছে। চারজন চোর আজ টাকার পেছনে ছুটছে না।কতকত টাকা কামানোর সুযোগ ওঁদের। কিন্তু ওঁরা সে-ই সুযোগ হাতছাড়া করেছে।আফসোস হচ্ছে সুফিয়ান এর।ফারদিনা ওঁদের পরিবর্তন দেখতে পারল না।আজ ফারদিনা বেঁচে থাকলে সুফিয়ান বড় গলায় বলত “দেখো মেয়ে, আমার চার চোর আজ সত্যিই পরিবর্তন হয়েছে।ভালো মানুষ হয়েছে। ওঁরা আর টাকার পেছনে ছুটছে না।”
ব্যর্থ সুফিয়ান।সে আর বলতে পারেনি ফারদিনাকে। হারিয়ে গেছে যে মানুষটি।
বেলা গড়িয়ে গেল। সুফিয়ান সে-ই সকাল এগারোটার পর থেকে এখনো তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানের পাশেই বসে আছে। বিন্তি চলে গেছে ঘরেতে।একটু পরপর এসে সুফিয়ান কে দেখে যাচ্ছে। বদরু ওঁরা তাঁর পাশেই আছে। সুফিয়ান নির্বাক দৃষ্টিতে বলল “আলিমনগর কে খুব মনে পড়ছে। কতশত স্মৃতি সেখানে ফেলে এসেছি।ফারদিনার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো,রশীদ চাঁচার সাথে কাজ নিয়ে আলাপ, ফারদিনার ফুপুর সাথে মাঝেমধ্যে ঝগড়া করা।খুব মনে পড়ছে।”
থেমে সুফিয়ান আবার বলল “আমার সে-ই ছোট্ট মাটির ঘরে কিছু বই ফেলে রেখে এসেছি। আমার জীবন নিয়ে লেখা গল্পটি ফেলে রেখে এসেছি। বাঁশি।ফারদিনার দেয়া বাঁশিটাও ফেলে রেখে এসেছি।”
সোলেমান তখন একটা পোঁটলা এগিয়ে দিল।বলল “আমরা সব নিয়ে এসেছি।” সুফিয়ান পোঁটলাটা পেয়ে খুশি হল।সেটি দ্রুত খুলল।ফারদিনার দেয়া বাঁশিটা হাতে তুলে নিল।তখন চোখের সামনে ভেসে উঠল অতিতের সে-ই বাঁশি উপহার দেয়ার দিনটি। সেদিন সুফিয়ান ভুল করে বিন্তির নামটা বলে ফেলেছিল। নামটা বলার একটা কারণ ছিল। সুফিয়ান এর প্রতি জন্মদিনে বিন্তি একটা করে বাঁশি উপহার দিত।কিন্তু সুফিয়ান কখনো সে-ই বাঁশি বাজায়নি।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তাঁর সে-ই বাঁশির সুরই যেন অভিশপ্ত হয়ে উঠেছিল। বাঁশিটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল।আর কোনদিন বাঁশির সুর তুলবে না সে।শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে ফারদিনার দেয়া বাঁশিটি।
একটি ক্ষুদ্র জীবন।অথচ কত স্মৃতি। কিছু স্মৃতি জীবন্ত, কিছু স্মৃতি মৃ’ত। দুনিয়ার সবচেয়ে কষ্টকর ব্যাপার হচ্ছে স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা। স্মৃতির পাতায় ভেসে থাকা। সুফিয়ান এখন ভাসছে সে-ই স্মৃতির পাতায়।যে পাতা যেন তাঁর ভার সহ্য করতে পারছে না।
The Silent Manor part 48
সোলেমান সুফিয়ান এর স্থির ভাবনা ভাঙ্গাতে বলল “আপনার গোলাপ বাগানে সত্যিই লা’শ আছে?”
সুফিয়ান ধীরস্থির কন্ঠে বলল “হুঁ। গ্রাম মানবশূন্য করতে যেয়ে আমি তাঁদেরই খু’ন করেছি,যারা পাপী।কেউ ছিল ধ’র্ষণকারী,কেউ ছিল অত্যা’চারিত,কেউ তাঁর মা বাবাকে বৃদ্ধ বয়সে ফেলে দিয়েছিল জঙ্গলে,কেউ গর্ভধারিনী মাকে মে’রেছিল।আর আমি ঠিক সে-ই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওঁদেরই শুধু মে’রেছি।”
থেমে সুফিয়ান ফের বলল “কিন্তু, নিরপরাধ একজনকে মেরে আমিই ম’রে গিয়েছি। হয়ত তাঁর জন্য আমার চলে যাওয়াটা এখন উত্তম।সে যে একা একা আছে।_
