Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৪১

কাজলরেখা পর্ব ৪১

কাজলরেখা পর্ব ৪১
তানজিনা ইসলাম

অর্পিতার স্বামী খাবার খেয়ে উঠে যাওয়ার পর, আকিব শিকদার রাফিয়া বেগমের দিকে তাকালেন। শক্ত কন্ঠে বললেন
-“তোমাদের আদরের নাতনি যখন বাড়ির কারো কথা না ভেবে বিয়ের আসর ছেড়ে অজানা অচেনা একটা ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলো, তখন বাড়ির সম্মান যায়নি মা? আমার মেয়ে একটা লেগপিস চাওয়াতেই মান-সম্মান সব ডুবে গেলো? বাহ! কি নৈতিক বিচার তোমার।”

-“সবসময় তোর ওই দস্যি মেয়ের পক্ষ না নিলেই পারোস! আদরে আদরে মাথায় তুলে ফেলছস এজন্যই কাওকে মানে না।”
আকিব শিকদার অস্হির স্বরে বললেন
-“এটা তুমি ঠিক করলে না।তুমি এটা কেন করলে? কেন করলে বলো? ওর সম্মান নেই? ও বাড়ির মেয়ে না? আমার সামনে এভাবে খাবার নিয়ে খোঁটা দিচ্ছো, আমার অগোচরে কী কী করো ওর সাথে?”
জবা বেগম পাশ থেকে বললেন
-“একটা ছোট বিষয় নিয়ে এরকম কেন করছেন আপনি? চাদনী কে কেও খাবার নিয়ে খোঁটা দেয়নি। আম্মা সবার বড়, শাসন করতেই পারে।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“প্লিজ ভাবি,আপনি আমাদের মা-ছেলের মাঝখানে কথা বলবেন না।সবসময় কুট কাঁচালি করা জরুরি? আম্মার কান ভারি করতেই থাকেন সবসময়! এটা ছোট বিষয় মনে হচ্ছে আপনার! অর্পিতার সাথে হলে এমন মনে হতো। ওর জামাইয়ের সামনে আমি কিচ্ছু বলিনি।কিন্তু এখন কিছু না বললে আমি নিজের কাছে ছোট হয়ে যাবো।”
রাফিয়া বেগম বিলাপ করে বললেন
-“তুই বৌমার লগে এরকম করোস কেন? ওই মেয়েটার জন্য। মেয়ে মেয়ে করলেই তো মেয়ে হয়ে যায় না!রক্তের সম্পর্ক থাকতে হয়। অর্পিতা আর ও কী এক?”
-“চুপ করো আম্মা ও শুনতে পাবে।”
-“বাইরের মেয়েটার লাইগা এরোম করতেছস আমার লগে? নিজের মায়ের চেয়ে ওই মেয়েটা বড় হয়ে গেছে।”
-“আম্মা!”

আকিব শিকদার চেচালেন। আরমান শিকদার বাগড়া দিয়ে বললেন
-“চুপ কর না। তুই জানোস তো আম্মা কেমন!চিল্লাপাল্লা করিস না, জামাই শুনবে।”
আকিব শিকদার রাগে কিছু বলতে পারলেন না। রাফিয়া বেগম কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললেন
-“তুই তোর আম্মার লগে এরোম করলি? শুধু ওই মেয়েটার জন্য। ওর সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।”
-“তোমাদের নেই। আমার আছে।ব্যবসা কার অবদানে চলে আম্মা? তুমি জানো ও সবার চেয়ে ছোট। এতো বুঝ হয়নি ওর। তারপরও আমার মা মরা মেয়েটাকে এভাবে বললে তুমি! কেন বললে? আমার মেয়েকে শাসন করার অধিকার আমি কাউকে দিইনি।ওরে খেতে পর্যন্ত দিলে না ভালো করে!”

-“নাটক করে খায়নি আমার দোষ?”
-“দোষী তোমরা নও, আমি। আমি ওরে প্রটেক্ট করতে পারিনি।কিন্তু তুমি শুনে রাখো আম্মা, আমি ওর জন্য সব করতে রাজি। তুমি ওর সাথে আর খারাপ বিহেভ করবে না। সারাজীবন আমি তোমাদের কথা ভেবেছি। নিজের কথা ওর কথা ভাবার সুযোগই হয়নি আমার। কিন্তু এখন আর না। ওর মনটা বিষিয়ে যাচ্ছে।আমি নিজেকে ওর বাবা দাবি করবো কোন মুখে। ব্যবসা আলাদা হলে, তোমার অন্য ছেলেদের কী অবস্থা হবে ওইটা ভেবে তারপর আমার মেয়ের সাথে কথা বলবে।”
আকিব শিকদার দপদপিয়ে চলে গেলেন।

-“চাঁদ!”
-“হু।”
-“মন খারাপ তোর?”
চাদনী উদাস হয়ে জানালার সামনে বসেছিলো। মুখ কালো করে চেয়েছিলো নির্নিমেষ আকাশের দিকে। আঁধারের প্রশ্নে ওর দিকে তাকালো না। শুধু বললো
-“বাবা চেচামেচি কেন করছে? বাবাকে ঝগড়া করতে মানা করো!”
-“এখনো এসব বলবি তুই। বশীকরণের দোয়া তো আমি পড়তেছি, ওঁদের উপর বশ হয়ে আছিস কেন? কোনো কিছু বলায় যায় না তোকে ওঁদের নামে। যা করতেছে ঠিক করতেছে চাচ্চু। আই এপ্রিশিয়েট হিম।”
চাদনী ভ্রু কুঁচকে তাকালো ওর দিকে। বললো

-“বশীকরণের দোয়া পড়তেছো মানে?”
আঁধার উত্তর দিলো না। বোঝানোর ভঙ্গিতে বললো
-“আজকে যা হলো, তারপরও এখানে পরে থাকবি? তুই বুঝতে পারছিস চাঁদ, ওরা তোকে খাবারের খোঁটা দিয়েছে। কতোবড় অপমান!আমি কী এরচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছি?
অথচ এ বাড়িতে অর্পিতা, আমার আর তোর সমান অধিকার আছে। কিন্তু ওরা তোকে আলাদা চোখে দেখে।”
-“অন্তত বাবা আমার জন্য প্রতিবাদ তো করছে। আমার পরিচয় টা সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে। তোমার কাছে তো আমি সামান্য পরিচয়টুকুও পেলাম না।”

-“শুধু পরিচয়! তোর আর কী লাগবে চাদনী,একবার বল।শুধু ঢাকায় চল আমার সাথে। আমি সব শর্ত মানতে রাজি। আই উইল ডু এভরিথিং ফর ইউ।”
-“কোনো শর্ত নেই।”
-“যাবি না?”
-“না।”
-“আর কিচ্ছু বলবো না আমি তোকে। একটা মানুষ আর কতক্ষণ অনুরোধ করতে পারে! ঠিক আছে আমি দোষী তো, আমার ক্যারিয়ার, একাডেমিক লাইফ সব শেষ হয়ে যাক। তুই ভালো থাক এখানে। যেদিন আমি থাকবো না সেদিন বুঝবি। আমার লাশের পাশের আগরবাতির ঘ্রাণ তোকে ঘুমাতে দিবে না।”
চাদনী পাংশুটে মুখে বললো

-“এসব কী বলছো তুমি? লা*শ,আগরবাতি এসব কী?
মাত্রই তো এসেছি। কয়েকদিন থাকি।”
আঁধার চকচকে দৃষ্টিতে তাকালো। দ্রুত এসে ওর পাশে জায়গা করে বসে বললো
-“তারপর,, তারপর যাবি আমার সাথে?”
-“আমার ওখানে অনেক একা একা লাগে।”
-“আমি আছি তো চাঁদ। আমি সবসময় তোর সাথে কথা বলবো। আটমাস টা তো বিষাদ নিয়েই কেটে গেলো। তোর সাথে আমার তেমন কথা পর্যন্ত হলো না। এবার যদি যাস আমি তোকে প্রতিদিন ঘুরতে নিয়ে যাবো।”

-“বেশি কঠোর হবে না আমার সাথে বলো। আমার যা মন চায় আমি করতে পারবো।”
-“করতে পারবি, তবে সীমার মধ্যে।”
-“সীমা কতটুকু? জানাও!”
-“অন্য কোনো ছেলের প্রশংসা করা যাবে না।সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে হবে। বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়ার আগে আমার পারমিশন নিতে হবে। শাড়ি আর কাজল পরে বাইরে যাওয়া যাবে না। ব্যাস এইটুকু!”
-“এইটুকু?এতো রুলস তোমার এইটুকু মনে হয়?”
-“হুম!”
চাদনী ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। জানালা দিয়ে নিভু নিভু সূর্যের আলো প্রবেশ করছে। আজ কুয়াশার ঘনত্ব টা একটু বেশিই। আঁধার মাথা রাখলো চাদনীর কাঁধে। উদাস স্বরে বললো

-“টিকিট কাটবো ট্রেনের? না, বাড়ির গাড়ি করে যাবি?”
-“কষ্ট দেবে না আমাকে, বলো।”
-“একটুও না। তোর সব কষ্টের কারণ মুছে দেবো।”
-“ঠিক আছে।”
আঁধার খুশি হয়ে বললো
-“যাচ্ছিস?”
-“আর কয়েকদিন থাকি। মন ভরে গেলে তোমাকে টিাকেট কাটতে বলবো।”
-“ওঁকে। বাট তোর পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে চাঁদ।ইন্টারেের স্টুডেন্টদের এভাবে গ্যাপ দেওয়া উচিত না।”
-“জাস্ট গ্যাপ যাবে। আর তোমার তো একটা বছরই চলে যাচ্ছে।”
-“তুই আমার সাথে গেলেই হবে চাদনী। একটা বছর কেন আরো অনেকগুলো বছর আমার নষ্ট হয়ে যাক। শুধু তুই বল তুই রাগ করে, জেদ ধরে আমাকে ছেড়ে যাবি না।”
চাদনী মলিন হাসলো। বললো

-“এভাবে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট দিয়ে মায়া লাগায় দাও। তারপর বুকটা খানখান করে দাও। তোমারে আমি আজও বুঝতে পারি নাই। তোমার ভালোবাসাগুলা এমন কেন!”
-“কেমন?”
-“বিষাক্ত। জেনে বুঝে বিষপান করা। জানি মরে যাবো, কিন্তু না খেয়েও থাকতে পারি না। বুকের মধ্যে কেমন কেমন করে! রাখাও যায় না ছেড়ে থাকাও যায় না। হারায় ফেলবো ভাবলেই ভেঙেচুরে কান্না আসে।”

-“রেখে দে।”
-“থেকে যাও। ভালোবাসাটুকু আমার দুর্বলতা না হয়ে যেন শক্তি হয়!”
আঁধার বাহু দিয়ে ধাক্কা দিলো ওঁকে। বিমূঢ় স্বরে বললো
-“ধুর বেডি, নাটকবাজ! এসব কথা আমার সাথে যায়?
তুই দাদিমা কে কিছু বললি না কেন? আমার সাথে খুব তো মুখ বাজাস!”
-“অর্পিতা আপুর হাসবেন্ড ছিলো।”

-“তো? তাই বলে কিছু বলবি না? আমার তো ইচ্ছে করতেছিলো, অর্পিতার মাথায় ওর প্লেটটাই ভাঙতে।কিন্তু বলিনি কিছু, কেন জানিস! এসব শুনলেই তুই আমার সাথে যেতে রাজি হবি।তোরে আসলে ভালো কথায় হবে না।
কিন্তু, এখন তোর সেল্ফরেস্পেক্টে আঘাত আসছে না চাদনী! না, শুধু সেটা আমার ক্ষেত্রে?”
-“এটা আমার বাড়ি। আমি কেন অন্যের কথায় রাগ করে চলে যাবো এখান থেকে! আর যদি প্রতিত্তোর দেওয়ার কথা বলো, তাহলে বলবো আমি লজ্জায় পরে গেছিলাম।সবাই ছিলো, বিশেষ করে বাইরের একটা মানুষ আমাদের সাথে খাচ্ছে। উত্তরটা আসেনি ভেতর থেকে। বাবা তো আমাকে কাওকে অপমান করতে শেখায়নি।”
আঁধার মুখ বাকালো। গুমোট স্বরে বললো

-“নাটকের কথা বলিস না তো!ঘিন লাগে।উত্তর আসবে না কেন? তোর তো উচিত ছিলো অর্পিতার প্লেট থেকে কেঁড়ে নেওয়া। ওর জামাই দুইটা খাচ্ছে। সেক্রিফাইজ তো করবে ও, তুই কেন করবি? তোর জামাই তো দুইটা খাচ্ছে না। ধুর! ভুল হয়ে গেছে। নিজের প্লেট থেকে না নিয়ে ওর প্লেট থেকে কেড়ে নিয়ে তোকে দেওয়া উচিত ছিলো আমার। তারপর বাকি বোঝাপড়া মেঝোমার সাথে আমি করতাম।আমি তো জাস্ট সুযোগ খুঁজছি কীভাবে ঝগড়া লাগানো যায়।এমনি এমনি ছেড়ে দিবো ভেবেছিস। তোর আর আমার প্রতিশোধ একসাথে নেবো ওয়েট কর। সিনক্রিয়েট করা ছাড়া এ বাড়ি থেকে যাচ্ছি না আমি।”

কাজলরেখা পর্ব ৪০ (৩)

চাদনী দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আঁধারের প্রতিশোধপরায়ণতা ছোটবেলা থেকে দেখছে ও। ছেলেটা খুব সুন্দর করে প্রতিশোধ নিতে জানে। ঝড়ের মতো সব তচনচ করে দেয়, তবে আগামবার্তা নিশ্চুপ, শান্ত।

কাজলরেখা পর্ব ৪১ (২)