Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৮
সাইদা মুন

আবছা আলোয় সামনের বেডে চুল এলোমেলো একজনকে বসে থাকতে দেখে তনিমা জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়। হাত সোজা বাকা করে আড়মোড়া ভাঙছে, হয়তো সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। সে আরও দুকদম এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় বেডের সামনে। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে উঠল,
—হাই, মাই নেইম ইজ তনিমা…
মেহরীন সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। তাহিয়া পাশে এখনো ঘুমিয়ে। আড়মোড়া ভেঙে মুখে হাত দিয়ে হামি দিতেই হঠাৎ কানে মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসে। তা শুনতেই তাড়াতাড়ি সামনে তাকায়। আবছা আলোয় কালো ছায়া চোখে পড়তেই আঁতকে ওঠে। কোনো সারাশব্দ নেই, শুধুই দাঁড়িয়ে। এমন দৃশ্যে যেন তার বুকের রক্ত এক মুহুর্তে হিম হয়ে আসে। এমনিতেই তার ভূতের ভয় প্রচন্ড। তার উপর এই অন্ধকারে এমন অবয়ব। আতঙ্কে কেঁপে ওঠা মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে চিল্লিয়ে উঠল,

—আআআআ ভ…ভূত…
তার হঠাৎ চিৎকারে পাশে শোয়া তাহিয়া যেন তড়াক করে আকাশ থেকে পড়ল। শোয়া থেকে ধরফরিয়ে উঠে। পাগলের মতো এদিক-ওদিক খুঁজতে খুঁজতে লাগল,
—কোথায় কোথায়…
মেহরীন কাঁপা শরীরে আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে গুতা মেরে সামনের দিকে ইশারা করতেই তাহিয়া সামনে তাকায়। মুহুর্তে তারও নিশ্বাস আটকে যায়। সামনে সত্যি সত্যি একটা কালো একটা অবয়ব। দেখামাত্রই যেন মেহরীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সেও আরেকটা চিৎকার মেরে উঠল,
—আআআআ ভূত…

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

এদিকে তাদের এই পরপর চিৎকারে তনিমা হতভম্ব। তাকে দেখে এতো ভয় পাচ্ছে কেন। তাকে কি ভূত ভাবছে। অবশ্য অন্ধকারে হঠাৎ কাউকে দেখলে সে নিজেও ভয় পাবেই। এমনটা সে আগে ভাবেনি। নিজেকে সামলে তাদের ভোঝাতে আরেক কদম এগিয়ে যায় তনিমা। সে বলতে নেয় “আমি মানুষ.. “। তবে কিছু বলার আগেই এবার দুজন একসাথে চিল্লিতে লাগে। তাহিয়া তো ভয়ে মেহরীনকে টেনে ব্ল্যাংকেটের নিচে নিয়ে তাকে পুরো ঢেকে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে পাশের বালিশটা নিয়ে সামনে ছুড়ে মারে। তা গিয়ে সোজা তনিমার গায়ে পড়ে। তাহিয়া চেঁচিয়ে বলতে লাগে,
—যাহ যাহ! সামনে আসলে একদম খবর আছে।
তনিমা একদম তাজ্জব। বালিশটা হাতে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে সে। তৎক্ষনাৎ ফাইজা আর তানিয়া বেগম হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢোকেন। ফাইজা লাইট জ্বালাতেই বিছানার দিকে নজর যায় সবার। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে ব্ল্যাংকেটে ঢাকা মেহরীন ঝাপটে ধরে বসে আছে তাহিয়া। তানিয়া বেগম তড়িঘড়ি করে তাহিয়ার পাশে গিয়ে বসে। তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন,

—কি হয়েছে রে মা? ভয় পেয়েছিস? খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস নাকি?
তাহিয়া চাচীর বুকে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে, কিন্তু তার চোখ শুধু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার ওপরই আটকে। মেয়েটা কেমন যেন কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। না পুরো ভয়ে, না পুরো স্বস্তিতে। অন্যদিকে তাহিয়ার থেকে ছাড়া পেয়ে ব্ল্যাংকেটের ভেতর থেকে মাথা তোলে মেহরীন। টানা কয়েকটা শ্বাস নেয়। তাহিয়া এমনভাবে চেপে ধরেছিল যে শ্বাসই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই সেও থমকে যায়। দুজনের একটাই দৃষ্টি। সন্দিহান দু’জনের চোখ।
দুটো মেয়েকে নিজের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকতে দেখে তনিমার অস্থিরতা বাড়তে লাগল। অস্বস্তি স্পষ্ট তার চোখে। ওড়না ঠিকঠাক করে টেনে বলেই ফেলল,

—এভাবে দেখার কি আছে? আমার যা আছে তোমাদেরও তাই আছে।
কথাটুকু শুনতেই তাহিয়া ও মেহরীন হালকা কেশে উঠে। একে অপরের দিকে আড়চোখে তাকায়। মেয়েটা কি মিন করে বলল কথাটা। ছি, তাদের নজরকে কি ইন্ডিরেক্টলি খারাপ বলল। দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয় তারা।
অপরদিকে মেয়েটির কথায় ফাইজা হাসতে শুরু করেছে। তাকে হাসতে দেখে তো আরও গায়ে লাগল তাদের। তাহিয়া সোজা হয়ে বসে, বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,
—এই মেয়ে কে ফাইজাপু?
তানিয়া বেগমও চিনে উঠেননি। আগে কখনো দেখেনি। অচেনা মুখ দেখে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে আছে। ফাইজা সকলের প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি দেখে বলল,

—ও তনিমা, তাহসান ভাইকে কাল সাহায্য করেছে। সে না থাকলে উনার যে কি হতো কাল রাতে। সারা রাত উনার সাথেই ছিল। তাই বাড়িতে নিয়ে আসলো। তাহিয়া, তোর এক সেট জামা দিছ তো। সারা রাত ধরে এই নোংরা কাপড়েই আছে মেয়েটা।
তার কথা শুনে এবার সকলের সন্দেহ কাটল। তানিয়া বেগম অল্প কথা বলে চলে গেলেন। তার পিছু পিছু ফাইজাও চলে গেছে। তারা যেতেই তাহিয়া উঠে দাঁড়ায়। মেহরীন বসে বসেই ব্ল্যাংকেটগুলো গুছাচ্ছে। মেয়েটাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাইলেও, জড়তার কারণে বলতে পারছে না।
দুজনকে চুপ দেখে তনিমা নিজেই বিছানার এক কোনায় গিয়ে বসে পড়ল। তারপর মেহরীনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তাহিয়ার দিকে ইশারা করে বলল,

—তুমি কি ওর বোন?
মেহরীন চুপচাপ একবার তার দিকে তাকিয়ে ফের তাহিয়ার দিকে তাকায়। দেখল তাহিয়া কটমট চোখে মেয়েটার দিকে চেয়ে আছে। যেন মেহরীনের সাথে মিশতে চাওয়াটা তার সহ্য হচ্ছেনা। মেহরীন তার বেস্ট ফ্রেন্ড, কেন আরেকটা মেয়ে ভাব জমাতে আসবে। ভাবতে ভাবতেই দ্রুত এগিয়ে এসে মেয়েটির সামনে দাঁড়ায় মেহরীনের বদলে সে-ই উত্তর দেয়,

—ও আমার বোন।
তনিমা তা শুনে হালকা হেসে বলল,
—তাই-ই ভাবছিলাম। তখন ভয় পেয়ে নিজের আগে বোনকেই প্রটেক্ট করার ব্যাপারটা অনেক সুন্দর ছিল। তবে জানো, আমার কোনো বোন নেই, তাই আমি এই ব্যাপারগুলো মিস করি।
তার কথায় যেন তাহিয়ার মন গলে গেল। উৎসুক মন নিয়ে তৎক্ষণাৎ তনিমার সামনে বসল। তার পাশে মেহরীনও এগিয়ে এসে বসল। দুজনেই তার ব্যাপারে জানতে আগ্রহী। তাহিয়া আগ্রহ দেখিয়ে আগে থেকেই জিজ্ঞেস করল,
—তোমার নাম কি?
—তনিমা চৌ…,তনিমা আমার নাম। আর তোমাদের?
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
—আমার নাম তাহিয়া।
কথাটুকু বলতেই তনিমা তাহিয়ার হাতে চিমটি মেরে বলল,

—সেইম পিঞ্চ! আমার নামও টি দিয়ে তোমার নামও টি দিয়ে।
তাহিয়া কিছুটা নড়েচড়ে চোখমুখ কুঁচকে হাত ঘষতে লাগল। বেশ জোরেই চিমটি দিয়েছে তনিমা। তা দেখে পাশ থেকে মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে তনিমাকে পাল্টা চিমটি দিয়ে বসে। সাথে সাথে তনিমা “আউচ” শব্দ করে হাত ঘষতে ঘষতে কপাল কুঁচকে তাকায় মেহরীনের দিকে। দেখে মেহরীন রাগী চোখে চেয়ে আছে তার দিকেই।
—এই, তুমি আমাকে চিমটি দিলে কেনো?

মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে ঝাঝালো কন্ঠে উত্তর দিল,
—তুমি আমার বান্ধুবির হাতে চিমটি দিলে কেনো?
তনিমা চোখ পিটপিট করে বলল,
—ওটা তো মজা করে দিয়েছি…
মেহরীনও কড়া চোখে চেয়ে বলল,
—তাহলে আমিও মজা করে দিয়েছি।
তনিমা চুপ হয়ে যায়। বুঝতে পারছে, দুটোর মধ্যে একটাকে কিছু করলে আরেকটা ছাড়বে না। তারা বন্ধু হবার বদলে শত্রু হয়ে যাচ্ছে দেখে তনিমা তড়িঘড়ি বলল,
—আরে, তোমরা কি আমাকে এনিমি ভাবছ? চিল, ব্রো, আমি তোমাদের ফ্রেন্ডেরই মতো। তালহা ভাইয়া বলেছিল, তোমরা আমার বয়সিই, সো উই আর ফ্রেন্ড’স ওকে?
তালহার কথা শুনতেই মেহরীনের ভাবনা বদলে যায় দ্রুত জিজ্ঞেস করল,

—উনি কি এসেছেন?
তনিমার কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে। উনি উক্তি শুনে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না কার কথা বলছে।
—উনি আবার কে?
তাহিয়া পাশ থেকে বলে,
—তালহা ভাইয়ার কথা জিজ্ঞেস করছে।
—ওহ, আচ্ছা। হ্যা, আমি তো তাদের সাথেই এসেছি।
মেহরীন দ্রুত ওড়নাটা গায়ে দিয়ে ছুটে যায় তালহার রুমের দিকে। সেই সকালের পর আর দেখেনি লোকটাকে দুপুরে খেতেও আসেনি। খেয়েছে কিনা কে জানে। ভাবতে ভাবতে তালহার রুমের সামনে চলে আসে। দরজা খোলা দেখে নক না করেই রুমে ঢুকে পরে। ঢুকতেই তালহার মুখোমুখি পরে যায়। মাথা তুলে তালহাকে দেখতেই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

তালহার পরনে সাদা রঙের শার্ট, শার্টের হাতা দুটো গুটিয়ে রাখা। কালো ঘড়িটা কব্জিতে চকচক করছে। মেহরীন একটা জিনিস লক্ষ্য করে সবসময়ই, আর যাই হোক ঘড়ি পড়া মিস হয়না তার। নিচে কালো প্যান্ট, এই সাদা-কালোর কম্বিনেশনে তাকে এমন মানিয়েছে যে চোখ সরানো দোষ হয়ে যাচ্ছে। তা কি তালহা বুঝে? তার এসব লুকে কেউ বেহুশ হওয়ার উপক্রম।
মাথার চুল ভেজা, সম্ভবত মাত্রই গোসল সেরে বেরিয়েছে। ভেজা চুল কপালের দুপাশে নেমে এসেছে, কিছুটা এলোমেলো, আবার সেই এলোমেলোতেই যেন অদ্ভুত পরিপাটি লাগছে তাকে। ওইযে কিছু সুন্দর মানুষ থাকে না, তারা যেভাবেই থাকুক সেভাবেই সুন্দর লাগে। তালহাকেও তার কাছে ঠিক তাই লাগছে। তবে এটা কি আসলেই নাকি শুধু তার চোখেই লাগছে।

তার ভাবনার মাঝেই তালহা মুচকি হেসে মেহরীনের বাম হাত ধরে এক ঘোরান্তিতে সামনের দিকে ফিরিয়ে হাতটা নিজের হাতে মুঠোয় নিয়ে দরজার দিকে হাঁটা দেয়। তার এহেন কান্ডে অবাক হয়ে ঘাড় কাত করে তাকায় মেহরীন। তালহার চোখে এখন মোটা ফ্রেমের চশমাটা লাগানো। আর এই চশমা পড়া তালহাকে যেন একটু অন্যরকম সুন্দর লাগে। সিরিয়াস মানুষ তো লাগেই সঙ্গে মেহরীনের কথা মতো ভয়ানক কিউটও লাগে।
পাশাপাশি হাটায় তার গায়ের সাবানের গন্ধটা এসে মেহরীনের নাকে লাগছে। এটাও যেন অদ্ভুতভাবে তাকে আকর্ষণ করছে । ঘ্রাণটা আরেকটু উপভোগ করতে আরেকটু গা ঘেঁষে আসে। তার উপস্থিতি বুঝে তালহার মুখের হাসি আরও গাঢ় হয়। পায়ের গতি আরও ধীর করে ফেলে। যেন এই মুহুর্তটা আরও দীর্ঘায়িত হয়। তবে মেহরীন তার তো সেদিকে খেয়াল নেই। সে তো নিজের মতো তার তালহাকে দেখতে ব্যস্ত। গলার কাছের দুটো বোতাম খোলা, সেখানে পানির ফোঁটা স্পষ্ট যা এখনো শুকোয়নি। তা দেখতে দেখতেই মেহরীন প্রশ্ন করল,

—মাত্রই গোসল করেছেন?
তালহা নিচু কণ্ঠে উত্তর দিল,
—হুম..
মেহরীন ফের প্রশ্ন করল,
—খেয়েছিলেন দুপুরে?
—নাহ। আপনি খেয়েছেন?
মেহরীন মাথা ঝাঁকিয়ে ‘হ্যা’ বোঝিয়ে প্রশ্ন করল,
—শার্টের উপরের দুটো বোতাম লাগাচ্ছেন না কেনো?
তালহা আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে দোতলার করিডোরের একদম শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়াল। মেহরীনে হাত ছেড়ে দু’হাত পকেটে ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—কেনো? খারাপ লাগছে এভাবে?
তার প্রশ্নে খানিক বিরক্তি চোখে তাকায় মেহরীন। এ আবার কেমন কথা। খারাপ লাগছে মানে, তার তো জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, “আগের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে নাকি?”। তবে এসব অহেতুক ভাবনা সাইডে রেখে মিনমিন গলায় বলল,
—ভালোই লাগছে..
তা শুনে তালহা কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—তাহলে তাকাচ্ছেন না কেনো?

মেহরীন চোরাচোখে তাকায়। মনে মনে বিড়বিড়ায়, আপনার নরমাল লুকেই হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায়, তার উপর এই চশমা! এটা তো বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। আড়চোখে খুঁটিয়ে দেখেই মনের ভেতর উতালপাতাল শুরু হয়ে গেছে। আবার সোজাসুজি তাকালে তো হার্ট অ্যাটাক করব নিশ্চিত। নাহ মেহরীন না তোকে এভাবে গলে গেলে চলবে না। নিজেকে সামলে তালহার চোখে চোখ রাখে। চশমার ভেতর দিয়ে তার চোখের মনিটা যেন আরও কালো, আরও গভীর দেখাচ্ছে। তার উপর সেই গাঢ় দৃষ্টি নিজের দিকে আটকে আছে। টের পেতেই লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলে।

—কি হলো..?
—লজ্জা লাগছে..
তার কথায় তালহা এক চিলতে হেসে কিছুটা ঝুঁকে বলল,
—দেখি, লজ্জা লাগলে আপনাকে কেমন লাগে।
মেহরীন শরমে যেন আরও গুটিয়ে যায়। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তালহাও নীরবে তাকিয়ে আছে, একদম স্থির চোখে, যেন তার অর্ধাঙ্গিনির মুখের প্রতিটা ভাব পড়ছে। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা কাটতেই মেহরীন মাথা তুলে তাকায়। ধীর গলায় প্রশ্ন করে,

—আপনি কি এখন বের হবেন?
তালহা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতেই মেহরীন চোখ বড় বড় করে তড়িঘড়ি বলল,
—এভাবেই বের হবেন?
তালহা তার হাবভাব দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
—হ্যা..
মেহরীন উত্তেজিত হয়ে বলল,
—না না! এভাবে বের হবেন না, শার্টের উপরের বোতামগুলো লাগান।
তালহা যেন পুড়া পুড়া গন্ধ পেল। বউটা তাকে নিয়ে ভয়ঙ্কর জেলাস। তাকে একটু বাজাতে বলল,
—থাকনা এমন, এটা স্টাইল।
মেহরীন মাথা দু’দিকে নাড়িয়ে কাঠ-কাঠ কণ্ঠে বলল,

—দরকার নেই এতো স্টাইলের।
—কেনো? এভাবে গেলে সমস্যা কি?
মেহরীন বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
—মেডিকেলে কত নার্স, সিস্টার আছে। তারা আপনাকে দেখুক, আপনি এটাই চাচ্ছেন? তাহলে যান তবে আমার সাথে কথা বলবেন না।
তাকে এমন রাগতে দেখে তালহা শব্দ করে হেসে উঠল। মাথা নাড়িয়ে না করে। নরম কণ্ঠে বলল,
—তাহলে লাগিয়ে দিন আপনিই।

মেহরীনও কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে তালহার বুকের বোতামগুলো লাগাতে লাগল। তালহা সুযোগ বুঝে ঝুঁকে মাথাটা নিচু করে তার ভেজা চুল ঝারা মারে। সাথে সাথেই পানি ছিটিয়ে পড়ে মেহরীনের চোখেমুখে। মেহরীন মুঁচকি হেসে পিছিয়ে যায়। তবে পরমুহূর্তেই অন্য কান্ড ঘটিয়ে বসে। এগিয়ে এসে তালহার শার্টের কলারে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায়। ঠোঁটে থাকা হালকা গোলাপি লিপবামের দাগ কিছুটা লেগে যায় সাদা শার্টে। তা দেখে নিজেই আবার মুছতে লাগে, তবে উঠছে না। তালহা চুপচাপ তার কান্ড দেখছে। একপর্যায়ে উঠছে না দেখে অপরাধীর চোখে তাকাতেই। তালহা হেসে মেহরীনের হাত আবারও আঁকড়ে ধরে কলারটা উল্টে নিচে নামতে লাগল। কয়েক সিঁড়ি নামতেই নিচে তার মাকে দেখে হাত ছেড়ে দেয়।
টেবিলে বসতেই তিতলি বেগম খাবার এগিয়ে দিলেন। মেহরীনকে দেখে টুকটাক কথা বলতে লাগে। তালহা এক লোকমা ভাত মুখে দিয়ে মায়ের দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে বলল,

—তুমি এখনো ফ্রেশ হতে যাওনি?
তিতলি বেগম একটু চুপসে গিয়ে বললেন,
—এইতো তোকে খাবার দিয়ে এখনই যাবো।
মা’র উত্তর শুনে তালহার চোখ মুহূর্তেই রাগে কড়া হয়ে উঠল। ছেলের রাগী দৃষ্টি দেখে তিতলি বেগম অস্থিরতায় এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন।
—আম্মু তুমি কি একটু বেশি করছো না?
—এইযে… আমি এক্ষুনি যাবো ফ্রেশ হতে।
তালহা বিরক্ত হয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। নরম অথচ কঠোর গলায় বলল,

—তুমি আমার কথার কোনো দামই দাওনা। আমার কি হাত-পা নেই? আমি কি নিজে খাবার নিয়ে খেতে পারব না? তোমাকে আসার পর কতবার বললাম আগে নিজে ফ্রেশ হবে খাবে। এসব কি ফাও বললাম? তাহলে বলো, আর কখনো তোমাকে কিছু বলতে যাবো না। তোমার যা খুশি তুমি তাই করো।
মেহরীন আর তিতলি বেগম চোখাচোখি করছেন। তিতলি বেগমের মুখ অপরাধীর মতো ছোট হয়ে আছে। তা দেখে মেহরীনের মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল। এটা নতুন কিছু নয়। তালহা প্রায়ই তার মাকে ছোট বাচ্চার মতো শাসন করে। কারণও আছে। তিতলি বেগম সবার খোঁজ নিতে নিতে নিজের কথা বেমালুম ভুলেই বসেন।
মেহরীন চোখের ইশারায় তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বলল,
—আন্টি, তুমি যাও ফ্রেশ হতে। উনার কিছু লাগলে আমি আছি।
তিতলি বেগম আর কিছু না বাড়িয়ে ঘরে চলে গেলেন। মেহরীন তালহার পাশের চেয়ারটা টেনে বসে গালে হাত রেখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

—আপনার সবদিকে এতো নজর থাকে কীভাবে?
তালহা একবার মাথা তুলে তাকিয়ে আবার ভাত মাখতে মাখতে বলল,
—দায়িত্ব! দায়িত্ব মানুষকে বদলে দেয়। যখন দায়িত্বের ভার কাঁধে নেমে আসে, তখন ছন্নছাড়া ছেলেটাও বদলে যায়। দায়িত্ববোধ এমন এক অদৃশ্য শক্তি, যা মানুষকে নিজের সীমা ছাড়িয়ে সবাইকে আগলে রাখতে শেখায়।
কথা বলতে বলতেই তালহা হঠাৎ এক লোকমা ভাত মেহরীনের মুখের দিকে এগিয়ে ধরল। মুহূর্তেই মেহরীন স্তব্ধ হয়ে যায়। তার দিকে তাকিয়ে আছে অবাক চাহনিতে। তালহার এমন ব্যবহার সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। সে যেন তার চাওয়া থেকেও একটু বেশি বেশিই পেয়ে যাচ্ছে। মনের ভেতর প্রশ্নের ঝড়। সে কি একটু বেশি ভালোবাসা পেয়ে যাচ্ছে? এই ভালোবাসা কি তার ভাগ্যে সইবে?
মেহরীনকে চুপচাপ দেখে তালহা চোখের ইশারায় বলল,”হা করো”। মেহরীন হালকা করে হা করতেই সযত্নে ভাত তার মুখে তুলে দিল তালহা। সঙ্গে সঙ্গেই মেহরীনের চোখ বেয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। তা দেখে তালহা অস্থির হয়ে উঠল। বাঁ-হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে চোখের পানি মুছে। দ্রুত পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—ঝাল লেগেছে? খারাপ লাগছে?
মেহরীন তার বাম হাতটা আঁকড়ে ধরে আলতো হেসে বলল,
—আমি ঠিক আছি। অস্থির হবেন না।
এরমাঝে তানিয়া বেগমের গলা শুনে মেহরীন উঠে রান্নাঘরে চলে যায়। তালহাও খাওয়ায় মন দেয়। মেহরীন নিজের জন্য চা আর তালহার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে ফিরল। ততক্ষণে তালহা খাওয়া শেষ। সোফায় হেলান দিয়ে সবে মাত্র বসছে। মেহরীন কফির কাপ বাড়িয়ে দিলে সে হেসে তা নিয়ে বলল,

—আমি মাত্রই ভাবছিলাম, কফির কথা। মাথাটা খুব ধরেছে।
মেহরীন সামনের সোফায় বসে বলল,
—চশমা পড়া দেখেই বুঝেছিলাম আপনার মাথা ব্যথা। তাই নিজ থেকেই বানিয়ে আনলাম।
তালহা কফিতে চুমুক দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বলল,
—আমাকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবছো বোধহয়।
মেহরীন টিটকারি মেরে বলে উঠল,
—কেনো? অন্য ছেলে নিয়েও ভাবব নাকি?
কথাটা শুনতেই তালহার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
—অন্য ছেলের চিন্তা মাথায় আসলে একদম জানে মেরে ফেলব।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৭

মুহূর্তেই মেহরীন চুপ করে যায়। বুঝতে পারছে তালহাকে রাগিয়ে দিচ্ছে সে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চা খেতে লাগে। তিতলি বেগম ফ্রেশ হয়ে নামতেই তালহা তাকে বলে বেরিয়ে পড়ল। মেডিকেল যাবে আবার। সিলেট থেকে তারা এসে পড়েছে। রাতে তাদের নিয়েই ফিরবে সে।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২৯