চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২
আরোবা চৌধুরী আরু
ঘড়িতে তখন রাত ১টা ৪৭।
পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ, কেবল দূরের কুকুরের হালকা ডাক আর বাতাসে পাতা সরে যাওয়ার শব্দ।
DSP সায়মান তাহের রাশিদ একবার তাকালো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার দিকে, তারপর ধীরে ধীরে চোখ গেল লাল বেনারসিতে বসে থাকা মেয়েটির দিকে। মেয়েটি যেন ঘোমটার আড়ালে, চুুুুুুুপচাপ, নিস্তব্ধ, অপার।
রাজীব পাশ থেকে ফিসফিস করে বললো,
“স্যার, আমরা চলে যাই? লোকজন জড়ো হওয়ার আগেই…”
কিন্তু ততক্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে আরও কয়েকজন,
বয়সে মাঝারি, কিছু বয়স্ক। তাদের কণ্ঠে স্পষ্ট উত্তেজনা।
“কী হইছে গো তন্দ্রা ভাবি? এই পুলিস ক্যানো?”
তন্দ্রা সবাইকে দেখে মুহূর্তের মাঝে নাটক শুরু করলো,
“ওরা আমাদের মাইয়ার বিয়েটা ভাঙলো! এখন কই যাই! এতদিনের মান-সম্মান সব শেষ!”
এক বৃদ্ধ চাচা গলা উঁচু করে বললেন,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“বিয়ে ঠিক হইছে শুনছিলাম, কিন্তু এইটা তো হঠাৎ! এখন আবার কি হলো হঠাৎ পুলিশ আইলো কোই থিকা। ”
তন্দ্রা আরো সুযোগ পেল কথা বলার, মাইয়ার বিয়া ঠিক করছিলাম এখন দেখি পোলাটা একটা দাগি আসামি পুলিশ আসে ধরে নিয়ে গেল। এখন এই বিয়ে ভেঙে যাওয়া মাইয়ার বিয়া করবো কেডা আল্লাহ গো……..।
মাইয়াটার সাথে কি হইল, অনেক ভালো মাইয়া ছোট থিকা আমাদের সামনে বড় হয়েছে। এখন বিয়া না হলে গ্রামে আর মুখ দেখাতে পারবো না আর কি বিয়া হইবো।
তন্দ্রা এবার ঘোমটার দিকে ইশারা করে নিজে সুর মিলিয়ে বললো,
“তোমরা নিজেই কইছো, মাইয়াডা কেমন চুপচাপ, ভদ্র। সব কিছু হইছে ওই যে দাঁড়াইয়া আছে … এই অফিসার টার জন্য। এখন একটায় উপায়,এই অফিসার দের মধ্যে একজন বিয়া করবে আমার মাইয়াডার। মাইয়াডারে বিয়া না করলে মেয়েটার জীবন শেষ না হলে !”
সায়মান এবার চোখ বন্ধ করলো কিছুক্ষণের জন্য। তার মাথার মধ্যে বাজছে একটা অদৃশ্য সাইরেন।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে আসামি কামরান হোসেনের সেই সিগারেট ধরা হাত, যে হাতে ঘোমটা ঢাকা মেয়েটার আঙুল ছিল আটকে। সে বুঝতে পেরেছে, এই বিয়েটা ছিল জোর করে, মেয়েটির মতামত ছাড়া।
এবং এখন,দায়িত্ববোধ আর এই মহিলার নাটকের মাঝে, তাকে বিবাহের আসনে বসিয়ে দিতে চাইছে!
রাজীব নিচু গলায় বললো,
“স্যার, আমার মনে হয়… এক্ষুনি বেরিয়ে যাওয়া উচিত… গ্রামের লোকজন উত্তেজিত হচ্ছে।”
কিন্তু সায়মান রাজীবকে থামিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে।
সে দাঁড়াল মেয়েটির সামনে। ঘোমটার আড়ালে কি এক অপূর্ব মুখ? না হয়তো, শুধুই ভয় আর নিরবতা? সায়মান নিচু গলায় বললো,
“তুমি কী চাও, বলো। আমি চলে যাবো। কেউ জোর করবে না।”
ঘোমটার নিচ থেকে কোনও উত্তর এল না।
তন্দ্রা এবার রীতিমতো চিৎকার করে উঠলো,
“এই মাইয়া মুখ খুইলা কিছু কয় না মানে সে রাজি!
ঘরের ভিতরের বাতাসটা ভারী। লাল বেনারসি পরা মেয়েটি চুপ করে বসে। মুখ ঘোমটার আড়ালে, কিন্তু তার নিরব উপস্থিতি গোটা ঘরে একটা অপার্থিব টান এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে, গ্রামবাসীরা ঘরের বাইরে জড়ো হতে শুরু করেছে,
চোখেমুখে উত্তেজনা, মুখে মুখে ফিসফাস।
কেউ বলছে, “এই পুলিশ অফিসার মাইয়াডারে বিয়া না করলে আজই পত্র-পত্রিকায় উঠবো!”কেউ আবার বলে,
“ভাল কইরা বিয়া করায়ে তারপর এখান থেকে যাইতে দিতে হবে!”
আর তন্দ্রা তার নাটকীয় গলায় আবার বলে উঠল,
“আমরা তো জানতাম না কামরান সন্ত্রাসী! এখন যদি বিয়া না হয়, মাইয়াডার ভবিষ্যৎ ধ্বংস!”
সায়মানের মাথা গরম হয়ে গেল। সে চিৎকার না করেও এমন গলায় বললো, যাতে চারপাশ থমকে যায়,
“আপনারা সবাই তো সমাজ ঠিক করার দায়িত্ব নিয়েছেন দেখি! কোথায় ছিলেন তখন, যখন এই মেয়েকে একটা সন্ত্রাসীর হাতে তুলে দিচ্ছিল?”
তন্দ্রা মুখে হাত দিয়ে ছলছল চোখে বললো,
“ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু মাইয়ার বিয়েটা তো ভেঙেগেল । আর আপনি… আপনি বাঁচাইছেন ঠিক আছে, কিন্তু এখন যদি আপনি বিয়া না করেন, তাহলে মাইয়াডারে কে বিয়ে করবে?”
সায়মান দাঁতের ফাঁকে চাপা স্বরে বললো,
“আপনারা চাচ্ছেন, আমি আসামি ধরতে এসে বর হয়ে ফিরি? পাগল নাকি আপনারা!”
পাশে দাঁড়িয়ে রাজীব কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো,
“স্যার, এক্সকিউজ মি… কিন্তু আপনার চারপাশে ৪০ জন গ্রামের লোক দাঁড়িয়ে আছে। আপনার রিভলবারের থেকেও এদের জ্ঞানবোধ বিপজ্জনক।”
সায়মান দাঁড়িয়ে থেকে কয়েক সেকেন্ড চুপ।তারপর চোখ তুলে ঠাণ্ডা গলায় বললো,
“রাজীব, তুমি বিয়ে করো। মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে, তাই না? করো।”
রাজীব এমনভাবে লাফ দিয়ে সরে গেল, মনে হলো কেউ বন্দুক ঠেকিয়ে দিয়েছে।
“না না না না, স্যার, আমি… আমি পারব না!”
সায়মান চোখ সরু করে তাকালো, “পারবে না মানে?”
রাজীব গলার স্বর একদম নিচু করে বললো,
“আসলে স্যার… আমার… আমার একটা গার্লফ্রেন্ড আছে… ও মেরে ফেলবে আমাকে। আমারে বিয়ের সাজে দেখলে ও আমার জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলবে!” স্যার অনেক কষ্টে একটা গার্লফ্রেন্ড পাইছি অনেক প্যারা দেয় কিন্তু ওকে অনেক ভালোবাসি অন্য কোথাও বিয়ে করতে পারব না প্লিজ । বলে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো ।
সায়মান মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়ালো।
এইখানে সে এসেছে এক সন্ত্রাসী ধরতে। এখন সে একটা অজানা মেয়ের বর হবে । এবং যে মেয়ের বয়স, নাম, কিছুই সে জানে না। এই পরিস্থিতি থেকে পালানোর আর কোনও রাস্তা খুঁজে পেল না সে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“ঠিক আছে। কাবিন করেন।”
সবাই “ওইইইইই!” করে উঠলো।
তন্দ্রা মহিলার মুখে শয়তানি হাসি চোখে আনন্দের অশ্রু!
কাজী হুজুর খুশিতে কলম চালাতে শুরু করলেন।
কিন্তু তখনও সায়মানের দৃষ্টি ছিল ঠান্ডা, স্থির, গম্ভীর।
সে ঘোমটার আড়ালের মেয়েটিকে একবারও ভালো করে দেখেনি। আর মেয়েটি? নিঃশব্দে বসে আছে। যেন নিজেরও কিছু বলার নেই।
কাবিন হয়ে গেল।
বিয়ের পরপরই সায়মান উঠে দাঁড়ালো। তাঁর কণ্ঠে কোনও সৌজন্যবোধ নেই, প্রেম তো দূরের কথা।
সে বললো,
“আপনারা তো চাচ্ছিলেন, বিয়ে হোক। হয়ে গেছে। এখন আমরা চলে যাচ্ছি।”
তন্দ্রা অবাক হয়ে বললো,
“এই রাতে মাইয়াডারে নিয়া যান? বউরে নিয়ে যাইতেছেন না কেন ?
সায়মানের বিরক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে। সে রাজীবকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“রাজীব, ওনাকে বাইকের কাছে নিয়ে আসো। আমি সামনে যাচ্ছি।”
রাজীব ঢোক গিলে বললো,
“স্যার, বাইকে তো তিনজন ওঠা যাবে না। আপনি ভাবিকে নিয়ে যান, আমি পেছনে… না মানে আমি… আমি পরে লোকাল গাড়িতে আসবো।”
এই কথার পর সায়মান তাকালো রাজীবের দিকে। সে তাকায়নি,
সে তাকালো। সেই ভয়ংকর, ঠাণ্ডা, গভীর, ‘যা বলছি কর, নইলে পাতালেও লুকাতে পারবি না’ চাহনি।
রাজীব আর কিছু বললো না। বিয়ের পর গ্রামের মানুষ যেন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললো। তারা পেছনে দাঁড়িয়ে দেখছে, তাদের ‘অভিযান’ সফল হয়েছে।
সায়মান বাইকের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, নিজের সাদা হেলমেটটা মাথায় চাপিয়ে নিল। পেছন থেকে রাজীব মেয়েটিকে নিয়ে আসছে। মেয়েটির মুখ ঢেকে আছে ঘোমটায়। মাথা নিচু, পায়ের হাঁটায় অনিচ্ছা। যেন প্রতিটি ধাপ ওর জীবনের হাজারটা প্রশ্ন।
রাজীব খুব আস্তে করে বলে,
“ভাইয়া… মানে স্যার, আপনি কি ঠিক করছেন?”
সায়মান কোনো উত্তর দেয় না। শুধু বলে
“পেছনে বসতে বলো।”
রাজীব মেয়েটাকে বাইকের পেছনে বসিয়ে দেয়।কিন্তু মেয়েটি একটু দূরে বসে। স্পষ্টভাবে বোঝা যায়,
সে ছুঁতে চায় না। যেন এতক্ষণে সে নিজেই অনুধাবন করছে, এই লোকটা তার স্বামী! একটু দূরে বসে সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
সায়মান খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
“ভালো করে বসো। এভাবে বসলে পড়ে যাবে।”
কোনো উত্তর নেই।সে একচুল নড়ল না।
তখন সায়মান কড়া গলায় বলে,
“ঠিক করে বসো বললাম! যদি পড়ে যাও, আমি থামবো না।”
মেয়েটা ভয়ে কেঁপে ওঠে। তার দুটো হাত থরথর করে কাঁপে। আস্তে করে, খুব ধীরে… মেয়েটির ডান হাতটা বাড়াই । সায়মানের কাঁধে এসে পড়ে সেই হাত।নিশ্বাস আটকে রেখে, সে নিজেকে সামলে বসে।
সায়মান বাইক স্টার্ট দেয়। ক্লাচ ছাড়ে। বালির ধুলো উড়িয়ে বাইকটা বেরিয়ে পড়ে অন্ধকার রাতের পথ ধরে। গ্রামটা পেছনে পড়ে যায়।আর মেয়েটির চোখে জমে ওঠে জল।সেই জল নিঃশব্দ। একফোঁটা একফোঁটা করে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে।
সায়মান জানে, মেয়েটা কাঁদছে।সে শুনতে পাচ্ছে নিঃশ্বাসের কম্পন। পিছন থেকে যে কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস আসছে, তা কারো চোখের কান্না না দেখেও চিনে ফেলা যায়। তবুও… সে কিছু বলল না।একটা শব্দও না।এই মুহূর্তে সে জানে, কিছু বলা মানে আরও কিছু জটিলতা টেনে আনা। সে বাইক চালায়। শহরের আলো ধীরে ধীরে তাদের গিলে নেয়।
২ ঘণ্টা পর ঢাকা পুলিশ কমিশনার অফিস রাত প্রায় ২,৩ টা। অফিস ফাঁকা। কমিশনার স্যার তখন কফি খাচ্ছিলেন নিজের কেবিনে।
হঠাৎ দরজায় টোকা।
“May I come in, sir?”
স্যার চোখ তুলে দেখলেন, সায়মান একদম শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে।
Come in my boy , তুমি আজকে চমৎকার কাজ করেছো, আমি জানতাম তুমি পারবে । but , এত লেট হল কেন তোমার আসতে আর রাজিব কোথায় । আর তুমি এরকম গম্ভীর মুখে আছো কেন? এমনিতে তো তুমি হাসো না এত বড় একটা কেস সল্ভ করলে এবার তো একটু হাসো , বলে ওর কাঁধে হাত দিলেন।
স্যার আপনার সাথে কিছু কথা ছিল । অনেক ইম্পোর্টেন্ট ।
ইয়েস মাই বয় বল , একটা কেন অনেকগুলো কথা বল আজকে তুমি আমার মন ভালো করে দিয়েছো।
সায়মান সব খুলে বলল। প্রথমে সন্ত্রাসী ধরার মিশন, তারপর মেয়েটিকে উদ্ধার, এরপর গ্রামবাসীদের চাপ, এবং… বিয়ে।
কমিশনার তাহমিদ ইকবাল একটু চুপ থেকে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল
“তুমি বলছো, তুমি একটা আসামি ধরতে গিয়ে বউ নিয়ে ফিরে এসেছো?”
সায়মানের চোখ কুঁচকে গেল। “স্যার, এটা হাসির কিছু না।”
“আরে আমি হাসছি এই ভেবে, তোমার মতো গম্ভীর লোকটাও বিয়ে করতে পারে? তাও অভিযানে গিয়ে!”
ঠাণ্ডা গলায় বললো,
“স্যার, দয়া করে হাসা বন্ধ করুন। এটা আমার জন্য অপমানজনক পরিস্থিতি।”
কমিশনার তাহমিদ ইকবাল মুখ চেপে হাসি থামালেন।
তারপর বললেন,
“আচ্ছা, ভালো। ওকে নিয়ে এসো দেখি। একবার দেখি কে এমন ভাগ্যবতী যে তোমার মতো বর পেয়েছে।”
সায়মান ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে স্যালুট করে বাইরে বেরিয়ে গেল।
দু মিনিট পরে সে ঘরে ঢুকলো মেয়েটিকে নিয়ে।
মেয়েটি এখনো সেই লাল বেনারসি পরে আছে। মাথায় ঘোমটা যা, ঠোঁট পর্যন্ত নামানো। মুখ দেখা যায় না, কেবল এক জোড়া কাঁপতে থাকা হাত বুকের কাছে ধরা।
কমিশনার তাহমিদ ইকবাল ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“ মামনি তোমার যদি কোন সমস্যা না থাকে, ঘোমটা সরাও। কথা বলার সময় মুখ দেখা দরকার।”
সায়মান মেয়েটির দিকে একবার তাকালো।
মেয়েটির হাত কাঁপে। সে ধীরে ধীরে ঘোমটা সরায়।
আর সেই মুহূর্তেই সায়মান যেন চেয়ারে গেঁথে যায়। ঘরের বাতাস থেমে যায়।
ঘোমটা সরে যেতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি অপূর্ব পুতুলের মতো মুখ
একটু গোলগাল গাল, টকটকে হলুদ ফর্সা গায়ের রঙ কান্না ফলে নাকের ডগা লাল টুকটুকে হয়ে গেছে, মনে আছে গ্লাস দেওয়া তাছাড়া কোন সেরকম মেকআপ করা নেই । গাল বেয়ে পড়েছে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার রেখা। চোখের নিচে হালকা ফোলাভাব, পরিষ্কার বোঝা যায়, অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে। চোখজোড়া বড়, ডাগর। হাইট দেখে মনে হচ্ছে পাঁচ ফিট ১-২ হবে খুব জোর ছোট এক বাচ্চার মত এটা দেখে আরো অবাক হবে দুইজনই কিন্তু সেই চোখে আজ শুধু একটাই অভিব্যক্তি ভয়।
কমিশনার তাহমিদ ইকবালচোখ কুঁচকে তাকান। একবার মেয়েটির দিকে, একবার সায়মানের দিকে।
“তুমি বলছো, এ মেয়েটাকে তুমি বিয়ে করেছো? এই পুতুলের মতো দেখতে… এইটা একটা মেয়ে না, একটা শিশু!”
সায়মান গলার খাঁকারি দিয়ে মুখে হাত রাখে। কিছু বলার মতো অবস্থা নেই।
কমিশনার তাহমিদ ইকবাল কপাল চুলকে বললেন,
“তোমার নাম কী?”
মেয়েটি নিচু গলায়, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো,
“নাফিসা…”
“ঠিকানা?”
“সিরাজগঞ্জ… কাজিপুর… বড় হাট…”
“বয়স?”
মেয়েটি এবার একটু মুখ তোলে।
তার চোখে অসীম ক্লান্তি, কান্নার দাগে ভিজে থাকা চোখদুটো কেমন যেন ফাঁকা।
“চৌদ্দ…”
ঘরের মধ্যে মুহূর্তেই নিঃশব্দ বিস্ফোরণ ঘটে গেল।
কমিশনার হঠাৎ চমকে এক ঝাটকায় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
“চৌদ্দ?!”
সায়মান এক পা পিছিয়ে গিয়ে চমকে তাকায় মেয়েটার দিকে। এই প্রথম যেন উপলব্ধি করলো, সে কী করে ফেলেছে! মেয়েটির মুখ দেখে এক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছে, যেন তার মনের মধ্যে একটি বাচ্চা দাঁড়িয়ে কাঁদছে… “তুমি আমার সাথে এটা করলে কেন?”
“স্যার, আমি জানতাম না… ওর বয়স… আমি ওর মুখটাও ভালো করে দেখিনি।”
কমিশনার রাগে গর্জে উঠলেন,
“এইটা কি একটা সাধারণ কেস ?! ১৪ বছরের কিশোরীকে বিয়ে করেছো! আমাদের দুজনের চাকরি যাবে, প্রেসে উঠলে তো আরও বড় বিপদ!” তোমার জন্য তো আরো বিপদ তোমার ফ্যামিলিতে তো আবার রাজনীতি করে । এটা যদি ছাড়াছাড়ি হয় আমাদের ডিপার্টমেন্টসহ তোমার বাবার রাজনীতি ক্যারিয়ার নিয়ে টানাটানি করে যাবে ।
সায়মান এবার ঠাণ্ডা গলায় বললো,
“স্যার, আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম… ও কিছু বলেনি। আর তন্দ্রা নামের মহিলা এত নাটক করছিল… আমি পরিস্থিতির চাপে পড়ে গিয়েছিলাম।”
কমিশনার এবার নাফিসার দিকে তাকালেন।
“তুমি কেন কিছু বলোনি? তোমার মুখ নেই?”
নাফিসা চুপ করে থাকে।
তার চোখের পাতা কাঁপছে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর এক নিঃশ্বাসে সে বললো,
“আমার বাবা-মা অনেক বছর আগে মারা গেছে। মামা-মামির কাছে বড় হয়েছি। মামা খুব ভালো, কিন্তু মামি…”
গলার স্বরটা কেঁপে উঠলো।
“মামি আমারে অনেক অত্যাচার করতো। আমাকে কোনো কথা বলতে নিষেধ করেছিল । বিয়ের আগের রাতে খুব মেরেছে। বলেছে আমি যদি কিছু বলি, তাহলে আমায় ঘর থেকে বের করে দেবে… কেউ আমাকে নেবে না…”
তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল।
“আমি বিয়ে করতে চাইনি। আমি বলেছিলাম… কিন্তু কেউ শোনেনি। আমি অনেকবার বলেছি। কিন্তু…”
শব্দ আটকে গেল।
কমিশনার মুখ কঠিন করে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?”
নাফিসা মাথা নিচু করে কাঁপা কণ্ঠে বললো,
“ অষ্টম শ্রেণি…”
এইবার সায়মান পিছনে গিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। নিচের দুই হাত শক্ত করে মুঠো করে ফেলে ওর হাত কাঁপছে রাগে ।
কমিশনার তাহমিদ ইকবাল স্বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। একটা ছোট্ট মেয়ে, স্কুল পড়ুয়া, এত কম বয়সেই এইভাবে ঠেলে দেওয়া হলো সংসারে?
নাফিসার গলার স্বর ভাঙা ভাঙা।
“মামা বাসায় ছিল না। মামি এই সুযোগে আমাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমি কিছু বলতে পারিনি। অনেক কেঁদেছিলাম … কেউ শুনেনি। আমাকে মেরেছে, জোর করে সাজিয়েছে। বিয়ের মঞ্চে বসিয়েছে। তখন কেউ একটা বাঁচানোর জন্য আসবে জানতাম না…”
শেষের দিকে গলা ফেটে গেল তার। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো।
“আমি তো শুধু পড়তে চাই… আমি তো কারো স্ত্রীর পরিচয়ে বাঁধা পড়তে চাইনি…”
মেয়েটার কথা শুনে অফিসঘরটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
কমিশনার নিজের মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
অন্যদিকে, সায়মান ঠিক পাথরের মতো দাঁড়িয়ে, একদম নিঃশব্দ। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখের গভীরে যেন ঝড় বইছে।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১
শুধু তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। তার ভিতরে কী চলছে কেউ জানে না।
তবে বোঝা যাচ্ছে, এই বিয়েটা ছিল কেবল কাগজের ছাপ নয়, এক বিপদ আর অন্যায়ের দলিল। যার সাক্ষী সে নিজেই হয়ে গেছে, অজান্তে।
এখন প্রশ্ন একটাই,
এরপর কী?
