Unpredictable part 2
Jannatul firdaus mithila
❝ আজ আবারও একটি নারী মৃ ত দেহ উধাও হয়েছে Brigham and Women’s Hospital, Boston থেকে।ম্যাসাচুসেটস রাজ্য থেকে এ নিয়ে পরপর ২১টি মৃ ত দেহ উধাও হয়েছে। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, সবগুলোই ছিল নারী মৃ ত দেহ!উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তা এ নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছেন।আশা করি খুব শীঘ্রই আমরা এ নিয়ে সুষ্ঠু একটা তদন্ত পাবো!❞
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই পাদু’টো থমকালো আয়রার।ড্রয়িং রুমের সামনের দেয়াল জুড়ে সগৌরবে ঝুলে থাকা স্মার্ট টিভিতে উচ্চস্বরে খবর চলছে।খবরটি পড়ছেন একজন মার্কিন জার্নালিস্ট। হুটহাট এমন লাশ নিখোঁজের সংবাদে ভ্রু কুঁচকে আসে তার। ইদানিং ম্যাসাচুসেটস এ এমন লাশ নিখোঁজ হবার সংবাদটা একটু বেশিই শোনা যাচ্ছে না? পরনের লং কোটটার হাতা গোটাতে গোটাতে ড্রয়িং পা রাখলো মেয়েটা।ডান কাঁধে তার এখনো ঝুলছে ভার্সিটির ব্যাগ। বোধহয় ভার্সিটি যাওয়ার জন্যই রেডি হয়ে নেমেছে একেবারে! আয়রা গম্ভীর মুখে টিভির স্ক্রিনে চোখ রাখে।অন স্ক্রিনে দেখাচ্ছে হসপিটালের সেই কেবিনটা,যেখানে থেকে মেয়েটির মরদেহ নিখোঁজ হয়েছে। নিখোঁজের নাম এলিয়ানা,গত পরশুই সুইসাইড কমিট করেছিল। হসপিটালে আনা হয়েছিল পোস্টমর্টেম করার জন্য! তবে ভাগ্য! তার আগেই মেয়েটার নিথর দেহ উধাও! আয়রা কেন যেন খবরটা দেখেই তাচ্ছিল্যের হাসি টানলো ঠোঁটের কোণে। বিরবির করে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ এই পৃথিবীতে একটা মেয়ের মরদেহও সেফ না! অথচ আমরা না-কি গ্রেট ক্রিয়েচারস।”
আয়রার বিড়বিড় করার মাঝেই সেথায় এসে নিঃশব্দে দাঁড়ালো স্নেহা এবং আরোহী। একদম পরিপাটি, ফিটফাট হয়ে নেমেছে দুজন। স্নেহা আলগোছে হাত রাখলো আয়রার কাঁধে। হঠাৎ কাধেঁ কেমন শীতল স্পর্শ বোধ হতেই ঘাড় বাকিয়ে তাকায় আয়রা। স্নেহাকে দেখেও মুখভঙ্গি আগের ন্যায় গম্ভীর রেখে বলল,
“ রেডি?”
স্নেহা মুচকি হেসে মাথা নাড়ায় ওপর নিচ। ওদিকে আরোহী ফোন ঘাটছে ব্যস্ত হাতে।কাকে যেন হন্যে হয়ে কল দিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা! তবে ওপাশের ব্যাক্তিটি ফোন তুলছেই না! আরোহী এবার একরাশ বিরক্তি নিয়ে দাঁত কিড়মিড় করল। বিরবির করে বলল,
“ মোবাইল তুলে না কেনো ও? কী সমস্যা ওর?”
বিরবির করে বলা কথাটাও বেশ শুনলো স্নেহা। সে তৎক্ষনাৎ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ আয়ানকে কল দিচ্ছিস না-কি?”
আরোহী ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল এবার।মাথাটা কোনোরকম ওপর নিচ নাড়িয়ে পা বাড়ায় মেইন ডোরের দিকে। হাঁটতে হাঁটতেই বলে,
“ আমি শিওর ওরা দু’টো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আরু,স্নেহু! কাম বেইবস!”
আয়রা বুকের কাছে দু-হাত বেঁধে হাঁটছে। তার অবচেতন মনটা কেমন অজানা চিন্তায় মগ্ন! গতকাল আবারও সেই আগন্তুক এসেছিল,তারমানে আজও নিশ্চয়ই কিছু না কিছু হবে। আয়রা মনে মনে নিজেকে কোনোমতে সামলে, স্বান্তনার বাণী আওড়ে বলল,
“ বি স্ট্রং আরু। বি স্ট্রং!”
HER — ওমেন্স হোস্টলের গেট থেকে পাঁচ হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন সুদর্শন যুবক। একজন পড়ে রেখেছে ব্লু রঙা হুডি, সেই সাথে মাথার চুলগুলো ঢেকে রেখেছে লম্বা হেয়ার ক্যাপে। জনাব দু- কানে গুঁজে রেখেছেন ওয়্যারলেস হেডফোন, বোধহয় গান শুনছেন তিনি।অন্যদিকে অপরজন রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কুকুরকে বিস্কিট খাওয়াচ্ছেন।ছেলেটা আবার বড্ড পশু প্রেমি কি-না! রাস্তা-ঘাটে যেখানেই বোবা প্রানী দেখুক, ওমনি তার মায়া কেমন উপচে পড়ে যেন! আজও হলো তাই। শ্যামবরণ গায়ের গড়নের, ভীষন ভালো উচ্চতার ছেলেটা! নাম তার আয়ান। সে মুচকি হেসে বিস্কিট খাওয়াচ্ছে কুকুরটাকে। হাতের সকল বিস্কিট যখন একেবারেই শেষ, তখনি সে হাঁক ছেড়ে ডেকে ওঠে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে গুনগুন করতে থাকা রিয়াদকে!
“ রিয়াদ! শোন,তোর পকেটে মেবি আরেকটা বিস্কিটের প্যাকেট,আমায় একটু পাস কর তো!”
কানে হেডফোন গুঁজে রাখা রিয়াদ থোড়াই শুনলো ওসব! সে-তো এখনও গা দুলিয়ে হাঁটছে, আর গুনগুন করছে।তা দেখে আয়ান কেমন ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল। সে বুঝে গেলো এ ছেলেকে বলে আর লাভ নেই! একবার গানের তালে পড়লে তাকে আর খুঁজে পাওয়া দায়! আয়ান কাঁধের ব্যাগটা খানিক ঠিকঠাক করে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। একহাতে কপালে এসে লেপ্টে থাকা মাথার লম্বা চুলগুলো, আঙুলের সাহায্যে ঠেলে দেয় পেছনের দিকে। রাস্তার দু’ধারে সর্তক দৃষ্টি ফেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসে রিয়াদের কাছে। অতঃপর কোনোরূপ বলাকওয়া ছাড়াই,পেছন থেকে খপ করে চেপে ধরে রিয়াদের ঘাড়ের কাছের হুডির অংশ। চলন্ত পা জোড়া থমকালো মুহুর্তেই। মাথা থেকে হুট করেই সরে গেলো লম্বা হেয়ার ক্যাপটা।পরমুহূর্তেই উম্মুক্ত হলো ছেলেটার মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুলগুলো। চুল তো নয়,এ যেন সাক্ষাৎ পাখির বাসা! দুয়েকটা পাখি ছেড়ে দিলে তারা যেন ভালোই আনন্দ নিয়ে বসবাস করবে এখানে। ওদিকে আয়ান নিজের এহেন কান্ডে তৎক্ষনাৎ জিভে দাঁত কাটলো। অপরাধীর সুরে বলল,
“ সরি! সরি দোস্ত। আমি আসলে…!”
রিয়াদ কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভাব এমন, এক্ষুণি বুঝি তেড়ে এসে গিলে ফেলবে আয়ানকে। বেচারা আয়ান এহেন দৃষ্টি দেখে ঢোক গিললো সামান্য। ভ্যাবলার মত খানিক জোরপূর্বক হাসি টেনে বলল,
“ দোস্ত সরি…”
রিয়াদ কটমট করতে করতে দু’হাত দিয়ে নিজের ঝাঁকড়া চুলগুলোকে দু’হাতে বাঁধতে লাগল কোনোরকম।কাজ বহাল রেখে আয়ানের উদ্দেশ্যে দাঁত খিঁচে বলল,
“ কতবার বলেছি, ডোন্ট টাচ মাই হেয়ার!”
কথাটা বলতে দেরি, ওমনি পেছন থেকে কেউ একজন হুট করে এসে একহাতে রিয়াদের চুলগুলোকে টেনে ধরতে দেরি করলোনা! আয়ান হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো শুধু। ওদিকে রিয়াদ তো রেগেমেগে আগুন। ছেলেটা কেমন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলল,
“ হোয়াট দা ফা*ক!কে রে!”
পেছন থেকে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে স্নেহা। হাসতে হাসতেই এগিয়ে আসে রিয়াদের সামনে। দুহাত দূরে দাঁড়িয়ে একহাতে কান চেপে ধরে আলতো স্বরে বলে,
“ সরি বাডি!”
অগত্যা রিয়াদ আর কিছু বললোনা। দাঁতে দাঁত চেপে চুলগুলোকে গুছিয়ে নিলো ক্যাপের ভেতরে। হাতের কাজ শেষ হতেই রিয়াদ সটান হয়ে দাঁড়ায়। আশেপাশে একনজর বুলিয়ে ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ আরু কই?”
আরোহী এবং স্নেহা একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল এবার। তা অবশ্য চোখ এড়ায়নি রিয়াদের। ছেলেটা তৎক্ষনাৎ কেমন বিচক্ষণতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কী রে? কাহিনি কী? কিছু কি হয়েছে?”
আরোহী কালবিলম্ব না করে তৎক্ষনাৎ চিন্তিত মুখে বলে ওঠে,
“ এগেইন সে এসেছিল। এ নিয়েই খানিকটা টেন্সড আরু!”
কথাটা শেষ হবার আগেই সেখানে উপস্থিত হলো আয়রা, চিরায়ত গম্ভীর মুখে! মেয়েটা এসেই কেমন তাড়া দেখিয়ে বলে,
“ দাঁড়িয়ে আছিস কেনো তোরা? প্রজেক্ট শোডাউন আছে, ভুলে গিয়েছিস?”
বাকিরা ডানে-বামে মাথা নাড়ায়। এই আরুটা আবার তার সকল কাজকর্মে বড্ড একনিষ্ঠ! সময়ের কাজ সময়ে করার এক ভিন্ন প্রতিযোগিতা তার মধ্যে। আর পাঁচটা মেয়ের মতো কেমন হাসেও না মেয়েটা,সবসময় গম্ভীর মুখে থাকবে।কেউ কিছু বললে বা জিজ্ঞেস করলেও হু,হা তেই তার সকল জবাবের সীমাবদ্ধতা! তবে ফ্রেন্ডসদের প্রতি তার আবার বড্ড দূর্বলতা আছে।এদিকে, আয়রাদের গ্রুপটার যে বেশ ডাকনাম আছে পুরো কলেজ জুড়ে! তাদের গ্রুপের নাম পাঁচফোড়ন গ্রুপ! এহেন ভিন্ন ধরনের নামকরণের পেছনেও রয়েছে বেশ বড়সড় কারণ। তন্মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে — প্রত্যেকের গুণাবলি। পাঁচফোড়ন গ্রুপের একেক সদস্য, একেক ধরনের ব্যাক্তিত্বের অধিকারী! যেখানে রিয়াদ একজন প্রফেশনাল হ্যাট হ্যাকার,সেখানে আয়ান হচ্ছে ভবঘুরে পথিক! নিজের মতো যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানোটাই তার মূখ্য কাজ। ছেলেটা আবার বড্ড ভ্রমনপিপাসু! অন্যদিকে, স্নেহা আবার প্রফেশনাল ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার।মেয়েটার তোলা বেশকিছু ছবি ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন নামি-দামি ম্যাগাজিনে। আরেকদিকে আরোহী হচ্ছে আলালের ঘরের দুলারি! বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে বলে কথা,তার আবার ওতো কাজ করে কী লাভ শুনি? তার বাবার কী আর টাকাপয়সার কমতি আছে?
সবশেষে থাকছে আয়রা,শান্তশিষ্ট গম্ভীর ভাবসাব নিয়ে চলাফেরা করা মেয়ে। একাধারে একজন কাউন্সিলর এবং উদ্যোক্তা। ম্যাসাচুসেটস এর কেপ কোড শহরে, সে দিয়েছে একটা ছোটোখাটো বাঙালি রেস্তোরাঁ। নামও দিয়েছে মানানসই — স্বাদে আহ্লাদী। অল্পসময়ে বাঙালি প্রবাসীদের কাছে এ রেস্তোরাঁ হয়ে ওঠেছে ভীষণ জনপ্রিয়!
আয়রাসহ বাকিরা কলেজের রাস্তা ধরে হাঁটছে। মেইন রোডের ওপারেই বোস্টন ইউনিভার্সিটির CAS বিল্ডিং। আয়রাসহ বাকিরা এখানেই পড়ছে।যদিওবা আয়রা, আয়ান এবং স্নেহা ফুল স্কলারশিপ পেয়ে বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে তবে রিয়াদ এবং আরোহী এসেছে নিজেদের অর্থায়নে। আয়রা আর আয়ান পড়ছে সাইকোলজি নিয়ে,রিয়াদ পড়ছে পলিটিকাল সায়েন্স। আর বাকি দুজন পড়ছে ইংলিশ লিটারেচার সাবজেক্টে।
কলেজ গেট দিয়ে ঢুকছে একে একে প্রতিটি স্টুডেন্ট। ওয়াচম্যান তাদের আইডেন্টিটি কার্ড পরোক্ষ করছেন ডিজিটাল মেশিনে,পরক্ষণে মেশিনে এন্ট্রি করিয়ে ঢুকতে দিচ্ছেন সবাইকে।আয়রার পালা আসতেই, কেউ একজন হুট করে পেছন থেকে একহাতের কব্জি চেপে ধরে আয়রার! আয়রা তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। দেখে একটা ছোট ছেলে আয়রার হাত ধরে টানছে! ছেলেটার বয়স বড়জোর ৮ কি ১০ হবে। আয়রা গম্ভীর মুখে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
বাচ্চাটা বললো না কিছু। শুধু আবারও হাত ধরে টানলো আয়রার।আয়রা ভ্রু কুঁচকে লাইন ছেড়ে বেরিয়ে আসে। খানিকটা দূরে এসে দাঁড়াতেই তার বাকি বন্ধুরাও চলে আসে তার সাথে। আয়রা তাদের দিকে না তাকিয়ে ছেলেটার পানে তাকায়। খানিকটা নিচু হয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই ছেলেটা ছুটলো রাস্তার ধারের কুরিয়ার সেন্টারে।পেছন থেকে আয়রা তাকিয়ে রইলো ভড়কে যাওয়া চোখে। হয়তো ভাবছে,ছেলেটার এরূপ কান্ডের কারণ। মিনিট পাঁচেক পর, ছেলেটা তার গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে আয়রার কাছে। তবে তার হাতে থাকা জিনিসপত্র দেখে আয়রা সহ বাকিরা কেমন স্তম্ভিত নয়নে তাকিয়ে রইলো। ছেলেটার হাতে একগুচ্ছ কালো গোলাপের বেশ বড়সড় একটা বুকে! ছেলেটা কী সুন্দর হেসে হেসে এগিয়ে আসছে আয়রার দিকে। অথচ আয়রার চোখে একরাশ রাগ ছাড়া আর কিছুই নেই। বাচ্চা ছেলেটা আয়রার কাছে এসে বুকে টা আলগোছে এগিয়ে দেয়।নরম কন্ঠে বলে,
“ কেউ একজন আজ সকালে আপনার নামে এসে দিয়ে গিয়েছে এটা! নিয়ে নিন প্লিজ।”
আয়রার মুখভঙ্গি শক্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। শুভ্র নির্মল মুখটা কেমন লাল হয়ে গেলো মুহুর্তেই। বাদামী রঙা চোখদুটো মুহূর্তেই অগ্নিমূর্তি ভাব ধারণ করল যেন। আয়রা শক্ত মুখে তাকিয়ে আছে ফুলগুলোর দিকে। একগুচ্ছ ফুটন্ত কালো গোলাপের ঠিক মাঝ বরাবর একটিমাত্র লাল গোলাপ! কী সুন্দর করে ফুটে আছে গোলাপটা! আয়রার জায়গায় অন্য কেউ হলে নিশ্চয়ই এহেন গিফটে আপ্লূত হলেও হতো বোধহয় তবে আয়রার ব্যাপারটা ভিন্ন! সে তৎক্ষনাৎ একহাতে ফুলগুলো তুলে নেয়। ফুলগুলোকে খানিক নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে গম্ভীর অথচ শান্ত কন্ঠে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কে দিয়েছে সেটা জানো কী?”
বাচ্চা ছেলেটা অবুঝের মতো মাথা নাড়ায় দুপাশে। আয়রা মোটেও অবাক হলোনা এরূপ উত্তরে।যেন সে আগে থেকেই জানতো এমন উত্তর! আয়রা কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইল ফুলগুলোর দিকে, পরক্ষণে ফুলগুলোকে একঝটকায় ফেলে দেয় কলেজ গেটের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা ডাস্টবিনে। কটমট করতে করতে বলে,
“ ব্লাডি মোরন!”
বলেই সে গটগট পায়ে চলে গেলো কলেজের ভেতর। অথচ পেছনে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইলো স্নেহা এবং আরোহী। কেন যেন তাদের খুব ভয় লাগছে এবার! প্রতিবার সেই আগন্তুকের দেওয়া ফুল এবং চিঠিটা তারাই রিসিভ করত।আয়রা তো মোটেও দেখতো না সেসব। তবে এবার যে আয়রা সেসব ফেলে দিলো,সেই আগুন্তুক কী টের পেয়ে যাবে ব্যাপারটা? টের পেলে আবার কোনো ব্লান্ডার করে বসবে না তো?
টানা দু’ঘন্টার ক্লাস শেষে ক্লান্ত সকলে। ক্যান্টিনের সেই পরিচিত চেরি ডালের কাছের টেবিলটায় বসে আছে পাঁচফোড়ন গ্রুপ। আয়রার হাতে সাইকোলজির মোটা একখানা বই, রিয়াদ আবারও কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনছে।আর একটু পরপর প্লাস্টিকের টেবিলটার গায়ে আঙুল দিয়ে বাদ্য বাজাচ্ছে। ওদিকে আয়ান বসে বসে ফোন স্ক্রল করছে। স্নেহা টুকটাক দুয়েকটা চুমুক বসাচ্ছে নিজের সদ্য কিনে আনা হট কফির কাপে।ওদিকে আরোহী খাচ্ছে হটডগ! সকলে যখন নিজেদের কাজে নিমগ্ন তখনি একপ্রকার শোরগোল পড়ে গেলো কলেজ ক্যান্টিনের বাইরে। সকল শিক্ষার্থী বিল্ডিংয়ের বাইরে ছুটছে একনাগাড়ে। আয়রাসহ বাকিরাও কেমন চিন্তিত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে এসে একজন দৌড়াতে থাকা শিক্ষার্থীকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করে ওঠে স্নেহা,
“ হেই! কী হয়েছে? এভাবে ছুটছো কেনো তোমরা?”
মেক্সিকোর ছেলেটা থামলো একমুহূর্তের জন্য। ভয়ার্ত কন্ঠে সামান্য ঢোক গিলে কোনোরকমে বলল,
“ বাইরে আগুন লেগেছে। কলেজ ক্যাম্পাসের ফায়ার ব্রিগেডও ছুটেছে সেদিকে।”
এহেন কথায় মুহুর্তেই হোঁচট খেলো সবাই। অথচ আয়রার বিচক্ষণ মস্তিষ্কে নাড়া দিয়ে উঠলো অন্যকিছু।সে তৎক্ষনাৎ হাতের বইটা রিয়াদের হাতে একপ্রকার ছুড়ে দিয়ে ছুট লাগালো ক্যাম্পাসের দিকে। অন্যদিকে তাকে এভাবে ছুটতে দেখে বাকিরা আহাম্মক বনে গেলো যেন! তারাও কালবিলম্ব ছাড়া ছুটলো আয়রার পিছুপিছু। আয়রা আগে আগে দৌড়ে চলে যায় লিফটের ভেতরে। ব্যস্ত হাতে টপ ফ্লোরের অপশনে ক্লিক করে দাঁড়িয়ে রইল চিন্তিত ভঙ্গিতে।ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই লিফটের দরজা বন্ধ হলো।বাকিরা একটুর জন্য উঠতে পারলোনা আয়রার সাথে! তবে তারা সময় নষ্ট না করে উঠে গেলো পাশের লিফটে।
প্রায় মিনিট দুয়েক পর আয়রা এসে নামলো টপ ফ্লোরে। অতঃপর দ্রুত কদমে দৌড়ে চলে গেলো ছাঁদের দিকে। ছাঁদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়াতেই সর্বাঙ্গ জুড়ে তার বয়ে গেলো এক ঠান্ডা শীতল স্রোত! হাত-পায়ে ধরলো মৃদুমন্দ কম্পন। অদূরের পিচঢালা রাস্তাটায় দাউদাউ করে জ্বলছে একটা ট্রাক! যার সম্পূর্ণটা জুড়ে শুধু কালো রঙের গোলাপ। আয়রার আর বুঝতে বাকি নেই এসব কার কর্মকাণ্ড। সে কাঁপা কাঁপা বদনে খানিক টলতে নিলেই পেছন থেকে স্নেহা এসে খপ করে চেপে ধরে মেয়েটাকে। আয়রা নিজেকে ধরে রাখতে পারলোনা আর! মেয়েটা স্তম্ভিত হয়ে বসে পড়লো ছাঁদের স্বচ্ছ ফ্লোরে। স্নেহাও বসলো তার সাথে। মেয়েটা স্বান্তনার বাণী আওড়ে কিছু বলবে তার আগেই তার চোখ পড়লো আয়রার চোখ থেকে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর দিকে। স্নেহা কেমন বোবা বনে গেলো একমুহূর্তের জন্য! অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো আয়রার দিকে। আজ চারটা বছর একসাথে পড়ছে তারা,কোনোদিন তারা আয়রাকে একবারের জন্যও দেখেনি কাঁদতে তবে আজ? আজ কী এমন হলো যার জন্য এভাবে কাঁদছে মেয়েটা! স্নেহা খানিক সময় নিয়ে আয়রার কাঁধে হাত রাখলো।নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ আরু! আর ইউ ওকে? কাঁদছিস কেনো তুই?”
আয়রার দৃষ্টি এলোমেলো। ঠোঁট দুটো কাপছে তিরতির করে। সে বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কেমন শান্ত কন্ঠে বললো,
“ প্রকাশ্য শত্রুর চেয়ে অপ্রকাশ্য দোসর বেশি ভয়ংকর! আমার গাট ফিলিংস বলছে স্নেহা,সামথিং বেড ইজ গোয়িং টু হেপেন!”
এপর্যায়ে অস্থির হলো স্নেহা। মুখ ফুটে আরও কিছু বলবে তার আগেই ঘটলো আরেক কান্ড! কোত্থেকে যেন হুট করেই বড় বড় ডানা ঝাপটে এক ঈগল এসে দাঁড়ালো ঠিক তাদের মাথা বরাবর। স্নেহা তো ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে পিছিয়ে গেলো খানিকটা। ওদিকে বাকিরাও কেমন হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে! রিয়াদ তৎক্ষনাৎ চেচিয়ে উঠলো আয়রার উদ্দেশ্যে,
“ আরু! স্টে ব্যাক!”
শুনলোনা আয়রা।ঠায় বসে রইলো নিজ জায়গায়। মাথাটা সামান্য উঁচু করে তাকালো মাথার ওপর ডানা ঝাপটাতে থাকা ঈগলটার পানে। তারপর কে জানে কী হলো! ঈগলটা ধীরে ধীরে নেমে এলো ছাঁদের স্বচ্ছ ফ্লোরে। আয়রার দিকে একটু-আধটু এগিয়ে এসে মাথাটা কেমন আলতো করে নিচু করে নিলো।দেখলে মনে হবে,এতোবড় পাখিটা বুঝি কুর্নিশ জানাচ্ছে আয়রাকে।আয়রা মোটেও চমকায়নি এরূপ কান্ডে। উল্টো তার স্থির দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে ঈগলের গলার কাছে।যেখানে মোটা রেমন্ড সুতোয় বেঁধে রাখা কিছু একটা। আয়রা খানিক দোনোমোনো করে নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা এগোয়।মুহুর্তেই পাখিটা আরেক কদম এগিয়ে আসে সামনে।ওদিকে আরোহীর এবার ভয়ে জান যায় যায় অবস্থা! পাখিটা না আবার আরুর কোনো ক্ষতি করে বসে এই চিন্তাই খেয়ে যাচ্ছে তাকে। আয়রা ধীরে ধীরে পাখিটার গলার কাছ থেকে সুতোটা খুলে নেয়।পরক্ষণেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসে একটা কালো রঙা মোটা কাগজের চিরকুট! চিরকুটটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলো আয়রা।হয়তো ভাবছে,চিরকুটটা খোলা ঠিক হবে কি-না! প্রায় অনেকক্ষণ নিজের মনের মাঝে একপ্রকার দ্বিধাদ্বন্দ চালিয়ে অবশেষে চিরকুটটা খুললো আরু।দেখলো পুরো চিরকুটটা কেমন ল্যাটিন শব্দে লেখা। আয়রা আবার ব্যাপক পারদর্শী ল্যাটিন ভাষায়।তাই চিরকুটটা পড়তে মোটেও বেগ পোহাতে হয়নি তার! আয়রা ক্ষুদ্র চোখে পড়া শুরু করল,
❝ আদুরে টুইঙ্কেল!
আমার ব্যাক্তিগত মন বাগানের অজস্র কালো গোলাপের মাঝে তুমি আমার একমাত্র ফুটন্ত লাল গোলাপ! যার সুবাস নিতে আমি মরিয়া হয়ে উঠেছি বারংবার! চিন্তা করোনা,খুব তারাতাড়ি এসে নিয়ে যাবো তোমায়। তুমি আমার, আমার এবং শুধুই আমার।আমার দেওয়া সামান্য কিছু প্রত্যাখান করার সাহস রাখলে, বিনিময়ে তারচেয়ে ১০গুন সহ্য করার ক্ষমতা রেখো কিন্তু! হোক সেটা সামান্য গোলাপ কিংবা ভালোবাসা!
ইতি…..
তোমার অনাকাঙ্ক্ষিত আগন্তুক!❞
পুরোটা পড়ে থামলো আয়রা।নিশ্বাস তার ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে যেন। সে মুখ হা করে বড় বড় নিশ্বাস ফেলতে লাগল।ওদিকে পাখিটাও তার বিশাল ডানা ঝাপটে আবারও পাড়ি দিলো দূর আকাশে।
একটি পুরনো দিনের রয়্যাল ক্যাসেলের হাট খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। যুবকের ফর্সা পেটানো দেহখানা এতো ঠান্ডার মধ্যেও উম্মুক্ত!পরনে শুধুমাত্র একখানা কালো ট্রাউজার। তাও আবার ভি লাইন ছেড়ে বেশ নিচে। তার পেশিবহুল বাহুদ্বয় কেমন ফুলেফেঁপে উঠছে খানিক নড়চড় করতেই! যুবকের ঘাড় থেকে পিঠ অবধি একে রাখা একটা ঈগলের ট্যাটু। যুবকের ঘাড় সমান বাদামী রঙা উলফ কাট চুলগুলো টেনে পেছনের দিকে ঝুঁটি বেঁধে রাখা। যুবকের ঠোঁটের ফাঁকে এখনো বিদ্যমান বিদেশি মোটা সিগারেট। বেশ আয়েশ করে সিগারেটে এক-দুটো টান বসাচ্ছে যুবক। ঠিক তখনি সেই ঈগলটা এসে ডানা ঝাপটাতে লাগল যুবকের মাথার ওপর। যুবক ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট নিয়েই হাসলো খানিকটা। ঈগলটা ধীরেসুস্থে এসে নামলো যুবকের কাঁধে। যুবক পাখিটার গায়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
Unpredictable part 1
“ হাউ ওয়াজ শি?”
পাখিটা গর্জে উঠল মুহুর্তেই। যুবক বাঁকা হেসে তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে,
“ হোপ! শি ইজ মাইন।”
