Home unpredictable Unpredictable part 3

Unpredictable part 3

Unpredictable part 3
Jannatul firdaus mithila

দূর পশ্চিম আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে। চারপাশে নেমে আসছে সন্ধ্যার নরম আবহ। বোস্টনের ব্রুকলিন শহরের ব্যস্ত রাস্তার পাশের ফুটওভারে গম্ভীর মুখে একা একা হাঁটছে আয়রা। গায়ে জড়ানো লং কুর্তি,সেই সাথে কালো ফর্মাল প্যান্ট। ক্রিম কালারের ওভারকোটটা জুড়ে আছে সর্বাঙ্গে,মাথায় বরাবরের মত বেঁধে রাখা হিজাব খানা! আয়রার আবার খোলা চুল ভালো লাগে না। কেন যেন আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মত চুল খুলে হাঁটাহাটিঁ করতে পারেনা সে! হয়তো এর পেছনেও লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো কারণ। হাতে কালো ফর্মাল ব্যাগ নিয়ে হাঁটছে সে। উদ্দেশ্য, পেশেন্টের বাসায় যাওয়া। একজন সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে বেশ নামডাক আয়রার। অথচ মেয়ে এখনও পড়াশোনাও কমপ্লিট করেনি,তার আগেই সে-কি ব্যস্ততা তার!

ব্রুকলিন শহরের বেডফোর্ড এভিনিউ!সরু রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি কাঠের তৈরি বাড়ি। এদিকটায় এখনো এমন বহু বাড়ির দেখা মিলে, যেগুলো সাধারণত কাঠের তৈরী। আয়রা হাঁটতে হাঁটতে ১১নম্বর বাড়িটির মেইন ডোরের সামনে এসে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে কলিং বেলে দুবার চাপ দিতেই, কেউ একজন এসে আলগোছে খুলে দেয় দরজাটা। আয়রা চোখ তুলে সামনে তাকায়। চোখে এঁটে রাখা নীল রঙা গগলসটা হাত বাড়িয়ে খুলে নেয় পরক্ষণে। দরজার কাছে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়স্ক বিদেশীনী। বেশ নাদুসনুদুস গায়ের গড়ন মানুষটার। তিনি আয়রাকে দেখেই ভাব বিনিময়ে ব্যস্ত হলেন। নিজে থেকে আয়রার হাত টেনে ভেতরে ঢোকালেন। আয়রা চুপচাপ গম্ভীর মুখে গিয়ে বসলো সোফায়। হাতের কালো ব্যাগটা সোফায় উঠিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ পেশেন্ট কোথায়?”
বিদেশীনীর হাসিমুখটা নিমিষেই ভার হয়ে এলো। তার বুক চিঁড়ে তক্ষুনি বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ নিশ্বাস। সে কিয়তক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সময় নিয়ে নিজ ভাষায় বললেন,
“ ওর ঘরে আছে। সকালেও একবার সুইসাইড কমিট করতে চেয়েছে! আমার এখন ওকে নিয়ে ভয় লাগছে আয়রা!”
আয়রা মনোযোগ দিয়ে শুনলো সবটা। পরক্ষণে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে। বলে,
“ দেখছি ব্যাপারটা!”

একটি অন্ধকার রুম।চারিদিকে ভ্যাপসা গন্ধ। মনে হচ্ছে কেউ বুঝি বহুদিন যাবত ঘরের জানালাগুলো খুলেনি। হঠাৎ সে-ই অন্ধকার ঘরে দেখা মিলল এক ছটাক আলোর। ঘরের বন্ধ দরজাটা ধীরে ধীরে খুলছে কেউ। সেখান থেকেই আলো এসে ঢুকছে ঘরে। আয়রা সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে।পরক্ষণে হাত বাড়িয়ে দেয়ালের সুইচবোর্ডে চাপ দিতেই পুরো ঘরটা কেমন আলোকিত হয়ে গেল মুহুর্তেই! সে আলো সইতে পারলোনা ঘরের বন্দীরত মেয়েটি। সে তৎক্ষনাৎ নিজের চোখদুটোর ওপর হাত চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠল ঘর কাপিয়ে। চেঁচিয়ে ল্যাটিন ভাষায় বলতে লাগল,

“ কে জ্বালালো লাইট? কার এতোবড় স্পর্ধা? এক্ষুণি লাইট নেভাও। নেভাও বলছি!”
বন্দীনীর বাক্যগুলো কানে গেলো ঠিকই আয়রার,তবে এতে তার কোনো হেলদোল নেই। সে ব্যস্ত মেয়েটার আচরণ বিধি পরোখ করতে। কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে তা পরোখ করে আয়রা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলো। পেছন পেছন মধ্যবয়স্ক বিদেশিনী ঢুকতে চাইলে আয়রা হাতের ইশারায় না করল তাকে। বিদেশিনী তৎক্ষনাৎ থেমে গেলেন সেথায়। আয়রা এবার এগিয়ে গেল মেয়েটার কাছে। সময় নিয়ে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকলো বন্দীনীকে।
“ সারাহ!”
সারাহ কাঁপছে রীতিমতো! চোখদুটোতে তার এখনো আঙুল বাঁধা। আয়রা ফের ডাকল,
“ মাইকেল পাঠিয়েছে আমায়! কথা বলবেনা আমার সাথে?”
তৎক্ষনাৎ চোখদুটো থেকে আঙুল সরালো সারাহ।ভেজা চোখদুটো দিয়ে ভীষণ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো আয়রার পানে। থেমে থেমে বলল,

“ম-মাইকেল?”
আয়রা মুচকি হাসলো। ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে বসল সারাহ-র ঠিক মুখোমুখি। ওদিকে সারাহ অস্থির! সে তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে খামচে ধরল আয়রার হাতদুটো। আয়রা ব্যথায় কপাল কুঁচকালেও মুখে তেমন পরিবর্তন আসেনি তার! কী আশ্চর্য এক সত্তা নিয়ে চলে মেয়েটা। সারাহ আয়রার হাতদুটোকে খানিক ঝাঁকিয়ে বলতে লাগলো,
“ আমার… মাইকেল কোথায় আছে? ও এখন আসেনা কেনো আমার কাছে? ও কী আমায় ভুলে গেছে? ও কী আর আসবেনা? ও কী সত্যি সত্যিই ঐ ইটালিয়ান মেয়েটাকে বিয়ে করে ফেলেছে?”

আয়রা শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল সারাহ-র দিকে। মনে মনে ভাবছে, যে অনুভুতির সবটা জুড়ে শুধুই ব্যথা, সে অনুভুতিতেই কেনো জড়াতে হবে মানুষের? কেনো ভালোবাসতে হবে কাউকে? কেনো একজনের চলে যাওয়ায় তার জন্য পাগল হয়ে যেতে হবে? কেনো এভাবে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে বাকিটা জীবন কাটাতে হবে? মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া এহেন জটিল প্রশ্নগুলোর,বরাবরের মত আজও কোনো উত্তর মিলেনি। আয়রা এবার ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল। মেয়েটার দিকে কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শুরু করল নিজের কাউন্সিল।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া! শহরের উপকণ্ঠে, একদম নীরব আর অভিজাত এলাকাটার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিলাসবহুল বাড়ি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, এ যেন মেঘের ওপর ভাসমান কোনো আধুনিক প্রাসাদ! বাড়ির প্রধান ফটক থেকে শুরু করে বাড়ি অবধি লম্বা পাথরের ড্রাইভওয়ে, দু’পাশে ছায়ামাখা ওক গাছের সারি। দু’টো কালো মার্সিডিজ বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়াতেই দুজন কালো পোশাকধারী বলিষ্ঠদেহী দারোয়ান এসে ফটক খুলে দিলো আলগোছে।গাড়ি দুটো ধীরে ধীরে প্রবেশ করল ড্রাইভওয়ের দিকে। গেট দিয়ে ঢোকার পর পরই বরাবরের ন্যায় হালকা ল্যাভেন্ডার গন্ধ নাকে ভেসে আসে গাড়িতে বসে থাকা মানুষগুলোর।ড্রাইভওয়ের দু’ধারের প্রান্তজোড়া ফুলের বাগানে সুসজ্জিত।

আধুনিক সুসজ্জিত বাড়িটির গায়ে কাঁচ আর সাদা মার্বেল পাথরের সু-সংমিশ্রণ,চারিদিকে সদ্য সন্ধ্যার আলো পড়ায় পুরো বাড়ির গায়ে জ্বলতে থাকা ঝকমকে আলোয় সে-কি অপরুপ সৌন্দর্য দেখা দিয়েছে! গাড়ির ভেতর থেকেই নতুন দুজন ভিনদেশী পুরুষ চকচকে চোখে তাকিয়ে দেখছে এ সৌন্দর্য! প্রায় মিনিট দশেক পর গাড়ি দুটো থামলো বাড়ির প্রধান দরজার সামনে। কিয়তক্ষন বাদে গাড়ি দুটো থেকে বেরিয়ে আসে ছ’জন সুদর্শন মার্কিন মানব। ঠিক তাদের বেরিয়ে আসার পরপরই প্রথম গাড়ির ফ্রন্ট সিট থেকে নেমে আসেন আরেক সুদর্শন যুবক। গায়ে কালো স্যুট-বুট,কানে গুঁজে রাখা হেডফোন। চোখে আটাঁ কালো রঙের রোদচশমা যদিওবা এখন সন্ধ্যা, তবুও প্রফেশনালিজম বজায় রাখতেই বুঝি তার ওমন উদ্যেগ। যুবক কানে গুঁজে রাখা হেডফোন দিয়ে কথা বলছেন টুকটাক। তখনি ভীনদেশী মার্কিন মানবদের মধ্য থেকে একজন,মধ্যবয়স্ক টমাস মিলান এগিয়ে আসেন খানিকটা। মোটাসোটা গোলগাল ধরনের লোক,মাথাটা সম্পূর্ণ টাক তার।তারওপর মাথায় এঁটেছেন গোল টুপি! চোখে রিমলেস চশমা,ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি। টমাস ক্ষুদ্র পায়ে এগিয়ে এসে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে স্প্যানিশ ভাষায় বললেন,

“ মিস্টার নিহাদ! আমরা কী এবার ভেতরে যাবো?”
নিহাদ মাথা নাড়ায় আলতো করে। সম্মতি জানিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ইয়েস! প্লিজ কাম উইথ মি!”
বলেই নিহাদ আগেভাগে পা বাড়ায় বাড়ির চৌকাঠে। বাড়ির প্রধান দরজার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মরত দারোয়ান দ্বয় আলগোছে মাথা নুইয়ে কুর্নিশ জানায় সকলকে। নিহাদের পিছুপিছু বাকিরাও বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। মুহুর্তেই সকলের চক্ষু চড়কগাছে রুপান্তরীত হলো! ভিতরে ঢোকার পরপরই তাদের চোখ গিয়ে পড়ল বিশাল ডাবল-হাইট লিভিং রুমের দিকে। লিভিং রুমের ফ্লোরটা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ কাচের তৈরী! কাঁচের নিচ দিয়ে বইছে বেশ ছোটখাটো একটা পুল,যেখানে সাতার কাটছে নানান রঙবেরঙের মাছ!একনজর পুরো লিভিং রুমে তাকিয়ে থাকলেই মনে হবে যেন চারদিকে আলো আর স্বচ্ছ কাঁচের সমুদ্র বইছে! ছাদের কাছ পর্যন্ত উঁচু জানালাগুলো দিয়ে দূরের পাহাড় আর সিটির লাইট একসাথে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাঝখানে রাখা নরম ধূসর রঙা সোফা, এক পাশে আধুনিক ফায়ার প্লেস। যেটায় আপাতত নিঃশব্দে আগুন জ্বলছে। মার্কিন মানবগুলো ধীরে ধীরে পা ফেলছে সাদা মার্বেলের মেঝেতে।স্বচ্ছ চকচকে মেঝেতে হাঁটার দরুন সেথায় হালকা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে তাদের। বাঁদিকে লম্বা সিঁড়িটা হেলিকাল ডিজাইনের তৈরি। গ্লাস রেলিং, নিচে লুকানো ওয়ার্ম লাইট। মানুষের কদম পড়তেই লাইটগুলো জ্বানান দেয় তাদের উপস্থিতি! টমাস ঘুরে ঘুরে বাড়িটা এবং তার বিলাসবহুল সাজসজ্জা গুলো দেখছেন। কিয়তক্ষন বাদেই তিনি কেমন গাল বাকিঁয়ে বললেন,

“ আই মাস্ট এডমিট, মিস্টার এডওয়ার্ড জে.ডি’র টেস্ট আছে!”
তার এহেন কথায় বাকিরা একযোগে সম্মতি জানালেও নিহাদ গম্ভীর মুখে পেটের কাছে দু’হাত বেঁধে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। টমাস এবার ঘাড় বাকিয়ে তার দিকে ঘুরে তাকালেন। চোখদুটো খানিক ছোট ছোট করে নিয়ে বললেন,
“ মিস্টার এডওয়ার্ডের সাথে আজকে দেখা হচ্ছে তো? না-কি আজ আবারও ফিরে যেতে হবে দেখা না করেই?”
এপর্যায়ে স্মিত হাসলো নিহাদ।হাত বাড়িয়ে চোখের ওপর থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে রাশভারী কন্ঠে বললো,
“ সেটা ডিপেন্ড করে জে.ডি স্যারের মুডের ওপর।”
মনে মনে মুখ বাঁকালেন টমাস। তবে বাইরে থেকে মুখে মেকি হাসি টেনেছেন তিনি। খানিকক্ষণ জোরপূর্বক হাসি দিয়ে বলে ওঠেন,

“ ওকে! ওকে! আমরা তবে অপেক্ষা করি! কী বলেন?”
নিহাদ বললো না কিছু। উল্টো হাঁক ছেড়ে বাড়ির কর্মরত দুজন মধ্যবয়স্ক লোককে ডেকে ওঠে একযোগে,
“ লুথার, সিলভিয়া!”
তৎক্ষনাৎ লুথার, সিলভিয়া দৌড়ে এলো একপ্রকার। মাথা নুইয়ে বাধ্যদের ন্যায় দাঁড়াতেই নিহাদ আদেশ ছুড়ে বলল,
“ গেস্টদের গ্রিট করুণ। আর হ্যা, এডওয়ার্ড স্যার কোথায়?”
লুথার চোখ তুলে চাইলেন এবার। বললেন,
“ স্যার তার পেইন্টিং রুমে আছেন।”
নিহাদ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। চুপচাপ এগিয়ে গেলো সিড়িঁর দিকে।

দোতলার লম্বা করিডর দিয়ে হাঁটছে নিহাদ। সরু করিডরটিও বেশ সুসজ্জিত! চারদিকে সাজিয়ে রাখা নানান ধরনের নিখুতঁ স্কাল্পচার। কোথাও কোথাও আবার চোখে তাক লাগিয়ে দেওয়া পেইন্টিং! নিহাদ ধীর পায়ে এসে থামলো পেইন্টিং রুমের বন্ধ দরজার সামনে। দরজার গায়ে লাগিয়ে রাখা আধুনিক সিস্টেমের লকটায় পাসওয়ার্ড দিতেই আপনা-আপনি খুলে গেলো তা! নিহাদ গম্ভীর মুখে দরজার নব ঘুরিয়ে মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে দাঁড়ালো। দরজার কাছে পা রেখেই ডেকে উঠল,
“ এডওয়ার্ড স্যার? এডওয়ার্ড স্যার! মে আই কাম ইন?”
ওপাশ থেকে তৎক্ষনাৎ আওয়াজ আসলোনা তেমন। নিহাদ ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতরে ঢুকলো। অতঃপর একহাতে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে ফের হাক ছেড়ে বলল,
“ জেডি! কই বে তুই? এতো করে ডাকছি, কানে যাচ্ছে না তোর?”

বিশাল বড় কক্ষটির চারপাশে শুধু পেইন্টিং আর পেইন্টিং বোর্ড! রুমের এককোনার কাঠের নকশিকরা তাক গুলোয় সাজিয়ে রাখা নানান ধরনের রঙের কৌটা। ঘরটার ঠিক মাঝ বরাবর ঝুলছে সফেদ রঙা পাতলা ফিনফিনে পর্দা।পর্দার ওপারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এক বলিষ্ঠদেহী সুপুরুষের দাঁড়িয়ে থাকা অবয়ব। যিনি কি-না গায়ে এপ্রন জড়িয়ে পেইন্ট বোর্ডে কাউকে আঁকতে ব্যস্ত! যুবকের পেশিবহুল হাতদুটো কেমন হা করে খুলে রাখা! মাসলগুলো ফুলেফেঁপে উঠছে বারবার নড়চড়ে।সুদর্শন যুবকের হাতদুটো ব্যস্ত ব্রাশ নাড়ানোয়। নিহাদ নির্বাক চোখে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। পরক্ষণে এগিয়ে এসে, হাত বাড়িয়ে পর্দা ভেদ করে যুবকের সামনে এসে কটমট করে বলল,

“ জেহরান! হোয়াট দা ফা*ক ম্যান? তোকে ডাকছি তোর কানে যাচ্ছে না?”
জেহরান নিজের কাজ বহাল রেখেই চোখ পাকিয়ে তাকায় নিহাদের পানে। হুটহাট কাজের মধ্যে বেঘাত দেয়াটা খুব একটা পছন্দ নয় তার সেটা তো বেশ ভালো জানে নিহাদ! তারপরও কেনো যে সে এমনটা করে! নিহাদ ভড়কায় জেহরানের চোখ পাকানো দেখে। বেচারা কেমন কথা গুলিয়ে ফেলল মুহুর্তেই! তবুও খানিকটা আমতাআমতা করে বলল কোনরকমে,
“ ইয়ে মানে… সরি বাডি! আসলে নিচে কয়েকজন ডিলার এসেছে এন্ড…. ”
“ আমার মুড নেই কারো সাথে দেখা করার।সো বাজ অফ!”
জেহরানের এহেন সোজাসাপটা প্রতিত্তোরে আহাম্মক বনে গেল নিহাদ। সে তৎক্ষনাৎ কেমন ব্যস্ত কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ বাট জেডি! ওরা আরও ৩মাস আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট কেটে রেখেছিল।এমনকি এর আগে দুবার করে মিট করতেও এসেছিল, সেক্ষেত্রে ওদের আবারও না বলে দিলে…. ”
“ সো হোয়াট?”

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিহাদের মুখপানে তাকিয়ে আছে জেহরান। নিহাদ ফের শব্দ হারালো। জেহরানের বাদমী ঘোলাটে চোখদুটোর দিকে তাকালেই ছেলেটার বরাবর এমন হাল হয়! আজও তাই। নিহাদ এবার মুখভঙ্গিতে পরিবর্তন আনলো। গলায় খানিকটা নম্রতা ঢেলে বলতে লাগলো,
“ ভাই একটু বুঝ! ইট’স এবাউট টেন মিলিয়ন ডলারস! তারা ডিরেক্ট তোর এক্সিবিশন হয়ে তারপর এসেছে। এন্ড ইউ নো হোয়াট? তারা এক্সিবিশনের সবচেয়ে দামি ১০টা পেইন্টিং নেওয়ার জন্য চেকসহ নিয়ে এসেছে। এমুহূর্তে তুই এভাবে না বলে দিলে একটা ব্লান্ডার হয়ে যাবে জেডি!”
জেহরান অদ্ভুতভাবে বাঁকা হাসলো। পেইন্ট বোর্ডে ব্রাশ চালাতে চালাতে শান্ত কন্ঠে বললো,
“ ফা*ক অফ ম্যান! হু দা হেল কেয়ারস এবাউট দেট ফা*কিং বুলশিট? আজ আমি ব্যস্ত!”
নিহাদ পড়লো এবার গেরাকলে। না পারছে এই ঘারত্যাড়া জেডিকে বোঝাতে, আর না পারছে সে-ই ডিলারসদের বোঝাতে। বেচারা কেমন উদাস মুখে কোমরে হাত চেপে দাঁড়ালো। পরক্ষণেই তার চোখ গেলো পেইন্ট বোর্ডের দিকে। সেথায় আবারও সে-ই পরিচিত অচেনা মেয়েটিকে দেখেই চোখদুটো বিরক্তিতে কুঁচকে আসে তার। সে তৎক্ষনাৎ কেমন বিরক্তি নিয়ে বলে ওঠে,

“ এই মেয়ে কী আদৌও আছে এ পৃথিবীতে? আমার তো মনে হয়না! সেই কতগুলো বছর আগে জাস্ট একটা ইমেজিনেশন থেকে ছবি আঁকলি, তারপর থেকে শুধু এই একটা মুখেরই ছবি আঁকছিস! আচ্ছা এই মেয়েটার ছবি তুই বিক্রি করিস না কেনো জেডি? অথচ এই ছবিগুলো একদম জীবন্ত দেখতে। এগুলো এক্সিবিশনে দিলে নিলাম চলবে জাস্ট!”

কথাটা বলতে দেরি বেচারা নিহাদের গাল বরাবর শক্তপোক্ত এক হাতের ঘুষি পড়তে দেরি হলোনা। হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনার আকস্মিকতায় বেচারা তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়লো মাটিতে। ব্যাথায় চোখমুখ কুঁচকে গোঙাতে লাগল গাল চেপে ধরে। ওদিকে জেহরান কেমন রাগে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা সাপের ন্যায় ফুঁসছে রীতিমতো। সে তৎক্ষনাৎ খানিকটা নিচু হয়ে নিহাদের মাথার তালুর চুলগুলো চেপে ধরে হাতের মুঠোয়। নিহাদ এবার শব্দ করে আর্তনাদ করে ওঠে। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা নেই জেহরানের। ছেলেটা কেমন কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পরক্ষণেই সে খানিক সময় নিয়ে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,
“ তোর ভাগ্য ভালো তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, তাই তোকে জানে মারছিনা। তা নাহলে তোর জায়গায় আজ অন্য কেউ থাকলে এতক্ষণে তাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলতাম মাটিতে।”
নিহাদ হকচকিয়ে ওঠে এরূপ কথায়। ছেলেটা কেমন ভয়ার্ত ঢোক গিললো পরপর। গালে একরাশ ব্যথা থাকা স্বত্বেও অপরাধী সুরে থেমে থেমে বলল,

“ ও তো এক্সিস্ট করেনা রাইট? একটা সাধারণ ইমেজিনেশনের জন্য তুই মানুষ মেরে ফেলবি জেডি?”
এপর্যায়ে ক্রুর হাসলো জেহরান। নিহাদের চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে সটান হয়ে দাঁড়ালো তখন। সদ্য আকাঁ বাদামী চুলের রমণীর ছবিটির পানে তাকিয়ে থেকে কেমন অদ্ভুত শান্ত কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ কে বলল ও শুধুই আমার ইমেজিনেশন? আমিতো জানি ও আমার অবসেশন! এন এবস্ট্রাকট এন্ড ডিপেস্ট অবসেশন। যা দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না শুধুই অনুভব করা যায় দৃঢ়ভাবে।”
অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নিহাদ।এ আবার কোন এডওয়ার্ড জেডিকে দেখছে সে? সারাজীবন নারীদের ঘৃণা করা মানুষটা কি-না আজ হঠাৎ কারো প্রতি ডিপেস্ট অবসেশনের কথা বলছে? রিয়েলি? এটা কী আদৌও সত্যি?

রাত আড়াইটা!
গ্র্যান্ড আইল্যান্ড,নেব্রাস্কা! ক্যালিফোর্নিয়া এবং বোস্টনের মিডপয়েন্টের শহর।প্রতি ২মাস অন্তর অন্তর এ শহরে ব্যপকভাবে আয়োজিত হয় — বাইক রেস! আমেরিকার প্রায় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং শহর থেকে বাইকপ্রেমীরা এ সময় ছুটে আসেন এখানে।আজও এসেছে সবাই! এই রেসের একটা ভালো নিয়মই আছে।এখানে যারা যারা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় তারা কেউই নিজেদের আসল পরিচয় ব্যাবহার করেনা,প্রত্যেকেই নিজেদের পছন্দানুযায়ী নিজেদের গায়ে ট্যাগ লাগায় বিভিন্ন নিক-নামের।
চারিদিকে একপ্রকার হৈ-হুল্লোড়! কেউ কেউ বাজি লাগাচ্ছে অমুক-তমুক বাইকারের ওপর, তো আবার কেউ কেউ নিজেদের প্রস্তুত করতে ব্যস্ত! তবে ইভেন্টের ম্যানেজার এস্থার হাইমেন নিজের সকল কাজ-কর্ম একপ্রকার সাইডে চাপিয়ে ব্যাকুল হয়ে নিজের টিম মেম্বারদের কাছে ছুটছেন। তিনি এসেই সবাইকে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“ পয়জন রাইডার আসেনি এখনো?”
দায়িত্বরত কর্মীগণ দু’ধারে মাথা নাড়ালেন। তন্মধ্যে একজন হুট করে বলে ওঠে,
“ স্যার! আই থিংক সে আজ পার্টিসিপ্যাট করবেনা।”
এহেন কথায় চিন্তায় পড়লেন এস্থার। দেখো কান্ড! যে-ই রাইডারের ওপর সে সহ আরও বড় বড় স্পন্সাররা টাকা লাগিয়ে বসে আছে, সে-ই না-কি আজ আসবেনা! এটা হলো? এস্থার এবার একরাশ উদ্বেগ নিয়ে ছুটে গেলেন অন্যদিকে। প্রতিযোগিতা শুরু হতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি।এরমধ্যে পয়জন রাইডার না এলে আজ নিশ্চিত তার ভরাডুবি! যদিও রাইডার নিয়ে বেটিং ইল্লিগ্যাল তবুও তারা চুপিসারে রাইডারদের অজান্তেই করে যায় এসব।

প্রতিটি প্রতিযোগি নিজেদের মার্কিং লাইনে এসে দাঁড়ালেন। মাথায় হ্যালমেট, গায়ে মোটা কোট,হাতে গ্লাভস! প্রত্যেকেই যেন একেকজন প্রফেশনাল রাইডার। আজ কেন যেন মনে মনে সবাই বড্ড খুশি। কেননা এখনও পয়জন রাইডার এসে উপস্থিত হয়নি লাইনে।তারমানে আজ তাদের মধ্য থেকে যেকারোর জেতার সম্ভাবনা আছে।নাহলে তো প্রতিবার সেই রহস্যময় রাইডার এসেই জিতে চলে যায়। তবে আশ্চর্য কথা হচ্ছে অন্য একটা! সবাই যেখানে ফেম,টাকার জন্য জিততে চায় সেখানে সেই রহস্যময় রাইডার করে অন্য কাজ! সে জেতার পরপরই একপ্রকার উধাও হয়ে যায় সবার অলক্ষ্যে। কোথায় যায়,কীভাবে যায় তা কেউই জানেনা তেমন।কারো চোখেই পড়েনি সে।
সবাই যখন নিজেদের চিয়ার করতে ব্যস্ত ঠিক তখনি মার্কিংয়ের শেষ লাইনে এসে দাঁড়ালো একটি কালো এবং লাল রঙ মিশ্রিত বাইক। যেথায় বসে আছে সে-ই রহস্যময় রাইডার যার ডাকনাম — পয়জন।

তাকে দেখেই ম্যানেজারের সে-কি আনন্দ। যাক বেচারার টাকাগুলো আজ বোধহয় আর ডুবলোনা। সময় যখন আর মাত্র মিনিট দুয়েক অবশিষ্ট ঠিক তখনি পয়জন রাইডারের অপজিটে একজন নতুন অজ্ঞাত রাইডার এসে উপস্থিত হলো। কালো কুচকুচে রঙের রেসিং বাইক, বাইকারের গায়ে সেম কালো রঙের হুডি। হুডির পেছনে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা — Shadow Man. এহেন নাম দেখে বাদবাকিরা কপাল কুঁচকালেও পয়জন রাইডার একটিবার ফিরেও তাকালো না সেদিকে। সে-তো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে নিজের মত। সময় শুরু হলো, একজন তৎক্ষনাৎ বন্দুকের ট্রিগার চাপতেই প্রতিটি বাইকার ছুটলো সবেগে। বরাবরের মত এবারেও সকলকে ছাপিয়ে পয়জন রাইডার এগিয়ে যাচ্ছে হাওয়ার গতিতে। তবে এবার দৃশ্যে কিছুটা পরিবর্তন এলো যেন। অজ্ঞাত সে-ই নতুন Shadow Man প্রায় কাছাকাছি অবস্থান করছে পয়জন রাইডারের। দু’জনার বাইক প্রায় সমদূরত্বে এগোচ্ছে।

মাঝে দিয়ে Shadow Man এক-আধবার পাশের পয়জন রাইডারের দিকে তাকালেও পয়জন রাইডার মোটেও তাকায়নি তার দিকে। অতঃপর দু’জন ছুটে গেলো একটি গভীর এবং লম্বা টানেলের দিকে। উল্টো দিক থেকে ব্যস্ত জনমানবের গাড়ি ছুটে আসছে তবুও তাদের পাশ কাটিয়ে ছুটে যাচ্ছে প্রতিযোগিরা। প্রায় আধঘন্টার বিরতিহীন রেসিং এর ঠিক শেষ মুহূর্তে ঘটল আরেক কান্ড। পয়জন রাইডার হাওয়ার বেগে ছুটলেও আজ অভাবনীয় ব্যাপার হিসেবে পাশ থেকে Shadow Man তার বাইকের অসাধারণ স্টান্ট দেখিয়ে জিতে গেলো রেসটা! মুহুর্তেই চারপাশের হৈচৈ এ পড়ে গেলো একপ্রকার নিরব বাজঁ! সকলেই কেমন থমথমে মুখে চেয়ে রইল সেদিকে।

অন্যদিকে, পয়জন রাইডার খানিকটা দূরে গিয়ে মাত্রই বাইক থামালো।হ্যালমেটের আড়ালে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইলো Shadow Man এর দিকে। Shadow Man তখন বাইক ঘুরিয়ে আনলো উল্টো দিকে। পয়জন রাইডারকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতেই একবার থমকে গিয়ে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকায় সে। পরক্ষণে গ্লাভস পরা ডানহাতের দু-আঙুল নিজের চোখের দিকে তাক করে পরমুহূর্তেই পয়জন রাইডারের দিকে তাক করলো সে আঙুল। এদিকে পয়জন বোধহয় হ্যালমেটের আড়ালেই বাঁকা হাসলো। তারপর বাইকে আবারও স্টার্ট দিয়ে সে হারিয়ে গেলো ভীরের মধ্যে। Shadow Man. মোটেও বিচলিত হলোনা তা দেখে। উল্টো সে তাকিয়ে রইলো পয়জনের চলে যাওয়ার পথে।

একটি বড় শপিংমলের সামনে এসে বাইক থামালো পয়জন রাইডার। মাথার হ্যালমেট না খুলেই, বাইকটা সেখানে স্ট্যান্ড করিয়ে গটগট পায়ে চলে গেলো মলের ভেতর।মলের ঠিক ডানদিকের ভেজিটেবল কাউন্টারের দিকে দাঁড়িয়ে আছে একজন মাস্ক পড়া ব্যাক্তি।যার হাতে রয়েছে একটা শপিং ব্যাগ। পয়জন তার দিকে একপলক তাকিয়ে গায়ের হুডির পকেটে দু’হাত গুঁজে খানিকটা সামনে যেতে যেতেই হাঁটার পথে নিজের পকেট থেকে বাইকের চাবিটা গুঁজে দিলো সে-ই দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাক্তির হাতে।আরেক হাতে তৎক্ষনাৎ নিয়ে নিলো ব্যাক্তিটির হাতে থাকা শপিং ব্যাগটা। ব্যাক্তিটি মুচকি হেসে চাবিটা ঢুকিয়ে নিলো নিজ পকেটে।

ওদিকে পয়জন একবারও পেছন ফিরে না তাকিয়ে চলে গেলো ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে একবার আশপাশে সতর্ক নজর বুলিয়ে পরক্ষণেই ঢুকে পড়লো ওমেন্স সেকশনে। চারপাশে ভালোমতো দেখেশুনে পয়জন চলে গেলো একদিকের কর্ণার ওয়াশরুমে।ওয়াশরুমের দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিয়ে সে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে ওয়াশরুমের বেসিনের দিকে।

Unpredictable part 2

সেথায় লাগিয়ে রাখা বড় আয়নাটিতে চোখ রেখেই সে ধীরে ধীরে নিজের মাথা থেকে হ্যালমেটটা খুলে নিলো আলগোছে। মুহুর্তেই তার মাথাভর্তি বাদামী সিল্কি চুলগুলো ঝপঝপিয়ে নেমে গেলো পিঠ বেয়ে কোমর অবধি। আয়নায় প্রতিবিম্বিত হলো আয়রার সুশ্রী মুখখানা। সে কেমন বাঁকা হেসে তাকিয়ে রইলো আয়নার দিকে। পরক্ষণেই কেমন বিরবির করে বলতে লাগলো,
“ অবশেষে আয়রাকে টক্কর দেওয়ার মত কেউ এলো তবে! নট ব্যাড! আ’ম ইম্প্রেসড।”

Unpredictable part 4