The Silent Manor part 51
Dayna Imrose lucky
চাপ-চাপ কুয়াশায় দঙ্গল বাদশাহি মেজাজে গড়িয়ে যাচ্ছিল সবুজ গালচের মতো বিছানো চা-গাছের ওপর দিয়ে সিন্ধুতলি নিকটবর্তী নদীর দিকে।বিচ্ছিরি, মন খারাপ করে দেওয়া সকালগুলো গোটানো মতো টেনে টেনে নিয়ে আসছিল স্যাঁতস্যাঁতে দিনের প্রথম শুরুর আকাশটা।সূর্যের তীব্র ঝিলিক নদীর জলে পড়ে চিকমিক করছে।
মাঝিরা নৌকা বাইছে।গুনগুন করে কেউ গানও গাইছে। অসময়ের গান।সকাল সকাল কেউ গান গায়? উনারা গাইছেন। লোকগুলো আধপাগল নয়তো? সুফিয়ান ভাবছে।গতকাল সারারাত ঘুমায়নি।কখনো ফারদিনার কব’রের কাছে,কখনো বাড়ির ছাদে গিয়ে মাথা নিচু করে ফারদিনার কব’রটির দিকে তাকিয়েছিল।
যারা ঘুমোয় না, তাঁদের সাথে রাত দিনের হিসেব না করলেই চলে।তবু প্রকৃতির নিয়মে যেন করতেই হয়। সুফিয়ান ভোরবেলা ঘরের জানালাটা খুলে দিয়েছিল।চোখ পড়েছিল ক্ষেতের দিকে।সেখানে ফারদিনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল।প্রথমে খুশি হলেও পরক্ষনেই মনে পড়েছিল,মানুষটি আর দুনিয়াতে নেই।
এরপর মুখের অভিব্যক্তি পরিবর্তন করে ধাতব আলমারি থেকে পাঞ্জাবি,পাজামা বের করে নিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করে।গত কদিন ধরে এক পোশাকেই ছিল সে।ময়লা,র’ক্তে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছিল।বেশ কিছুক্ষণ বসে গোসল সেরে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দীর্ঘদিন পর নিজেকে খানিকটা পরিপাটি করে। এরপর ফারদিনার ক’বরের কাছে গিয়েছিল।দূর থেকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল।যতবার ফারদিনার ক’বরের দিকে দেখছিল ততবার নিজেকে অপরাধী মনে হয়েছিল। কান্না করতে চাইছিল না।তবু চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু জল জমেছিল। তাৎক্ষণিক চোখের জল টুকু মুছে ফেলে নদীর তীরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে বসে বসে সিগারেট টানছিল।ফারদিনার বাঁচ্চামি গুলো মনে করে একা একা হেঁসে উঠল।কখনো তাঁর মনে হয় ফারদিনা মরেনি। বেঁচে আছে। এখুনি কোথাও থেকে এসে বলবে ‘বাঁশিওয়ালা’। সুফিয়ান যেন শব্দটি শুনতে পেল। নড়েচড়ে বসল।এদিক-ওদিক তাকাল।কেউ নেই।ভাবনার জগত থেকে শব্দটি ভেসে এসেছিল।
সুফিয়ান কারো পায়ের শব্দ পেল।ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে দেখল। বিন্তি এসেছে।ও এসে সুফিয়ান এর পাশে বসে। সুফিয়ান পুনরায় আশেপাশে দেখে বলল “তুই বাইরে কেন বের হয়েছিস?”
“তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে চলে আসলাম। আজকাল তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না।কখন কি করে বসো কে জানে!”
থেমে বিন্তি সুফিয়ান কে দেখল।সেই পুরনো দিনের মতো আজ সুফিয়ান সাদা রঙের পাঞ্জাবি পাজামা পড়েছে।বড্ড স্বচ্ছ দেখাচ্ছে তাঁকে। এতক্ষণ বিন্তি খেয়াল করেনি।গতকাল অবধি ভাইয়ের চেহারায় নিষ্প্রাণ একটা ভাব ছিল।আজ তাঁর চেহারার উজ্জ্বলতার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বিন্তি খুশি হল মনে মনে।
সুফিয়ান নদীর দিকে একবার, দ্বিতীয়বার ফারদিনার দিকে চেয়ে বলল “কি দেখছিস?আজ একটু পরিবর্তন লাগছে আমাকে!” বলে ফিক করে হাসল।কষ্টের মাঝে লুকানো হাঁসি হঠাৎ ফুটে উঠলেও যেন কষ্টটা কমে না।বরং বাড়ে।
বিন্তি বলল “তোমার হাঁসিতেও আজকাল ভয় হয় ভাই।”
“যেদিন আমি দুনিয়া ছেড়ে চলে যাব,সেদিন ভয়টা চিরদিনের জন্য দূর হয়ে যাবে।”
“ভাই” বিন্তির চোখে আবার জল চলে আসল।
সুফিয়ান মৃদু হাসল। “মসকরাও বুঝিস না! আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাব না।এই কথা দিলাম।” তাঁর দু হাত দিয়ে বিন্তির ডান হাতটা শপথ স্পর্শে শক্ত করে চেপে ধরল।
“তোমার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে আমি কিন্তু সহ্য করতে পারব না ভাই,এইটা শুধু মাথায় রেখো।”
“মাথায় তো কত-কিই রেখেছিলাম, শেষমেষ কিছুই রইল না।”
“ভাগ্যে হয়ত এটাই ছিল।অতিতে পড়ে থাকতে নেই ভাই।ফিরে এসো অতিত থেকে।”
“কিছু অতিত থেকে কখনো ফিরে আসা যায় না বোন,মনে হয় পিছু থেকে টেনে ধরে আছে।”
“তুমি ভাবছো কেউ ধরে রেখেছে পেছন থেকে।ভাবনাটাই ছেড়ে দাও, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সুফিয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা শ্বাস ফেলে বলল “ ভাঙ্গা জিনিস জোড়া লাগে না। আমার হৃদয়টা বহু খণ্ডে খণ্ডিত হয়ে গেছে। আমার ভাঙ্গা হৃদয়ের মেরামত একমাত্র ফারদিনা করতে পারত। কিন্তু আমি তাঁকেই তো য’ন্ত্রণায় শেষ করে দিলাম।”
সুফিয়ান এর চোখ ভেজা জলে নদীর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল। বিন্তি শুধু তাঁর ভাইয়ের পানশে মুখখানি দেখল। কখনো অসহায় দেখায়, কখনো হাঁসিখুশি দেখায়। কষ্ট গুলো তাঁকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।চাইলেও আর ছুটতে পারবে না সে। বিন্তি নিশ্চিত হল।
“ভাই”
“হুঁ।”
“তুমি চাইলে তোমার জীবনটা নতুন করে সাজাতে পারো।দেখো, মানুষের জীবনে খা’রাপ সময় আসে। পরিস্থিতি এক রকম থাকে না, পরিবর্তন হয়। তুমিও পরিবর্তন করো।”
“আমি আমার জীবনের শেষ দিন গুলো পর্যন্ত ফারদিনাকে ভেবেই বেঁচে থাকতে চাই।ওকে ভুলে নয়,বরং ওঁর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। আমার জীবন আর চাইলেও সাজাতে পারব না।সাজরং-টাই যে সমুদ্রের জলে ডুবে গেছে।”
‘ফারদিনার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাই।’ সুফিয়ান বেঁচে থাকার কথা বলেছে।সে বেঁচে থাকতে চায়।হোক সেটা ফারদিনার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে। বিন্তি নিঃশব্দে হাসল। খুশিতে মাথা চুলকালো। ওঁর ভাইয়ের মানসিক চিন্তাধারা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। বিন্তির আনন্দ হচ্ছে।ও খুব করে চাইছে, আল্লাহর নিকট দোয়া করছে – যাতে ওঁর ভাইয়ের ভাবনা থেকে আত্মহ’ত্যা করার চিন্তাভাবনা দূর দেন তিনি।গত রাতেও বিন্তি নামাজে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছে। ভাবছে, নিশ্চয়ই ওঁর দোয়া তাৎক্ষণিক কবুল করেছেন আল্লাহ। ফলাফল এখন প্রকাশ পাচ্ছে।
বিন্তি মলিন হেঁসে বলল “ভাই,গত রাতেও না খেয়ে ছিলে।আজ অন্তত খেয়ে নিও।আমি তোমার জন্য সুটকি, রসের পিঠা,আর হাঁস রান্না করব।খাবে বলো?” বিন্তি সুফিয়ান এর দিকে ঘাড় তাক করে প্রশ্ন করল।
সুফিয়ান ঘাস টেনে টেনে ছিঁড়ে জবাব দিল “আচ্ছা,আজ তোর হাতে খাব।আমি তোকে একসময় খাইয়ে দিতাম।আজ তুই খাইয়ে দিবি।কি দিবি তো?”
বিন্তি অশ্রুসিক্ত নয়নে হেঁসে পরপর দুবার বলল “হুঁ ভাই,দেব-খাইয়ে দেব তোমায়। আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে ভাই।”
সুফিয়ান স্বাভাবিক কন্ঠে বলল “তোর আনন্দে আমি সুখ খুঁজে পাই বোন।তুই সবসময় আনন্দে থাক।”
বিন্তি হাসল। কিছু বলল না। সুফিয়ান বলল “এখন এখান থেকে চলে যা। রান্নাবান্না কর। লোকজন চলে আসবে।”
বিন্তি সুফিয়ান এর কথা মত বসা থেকে উঠে যেতেই ফের স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বলল “ভাই” এবার বিন্তির কন্ঠে অন্যরকম বার্তার লক্ষন প্রকাশ পেল।
সুফিয়ান চোখের দৃষ্টি সচল করে ঢং করে বলল “বলুন ছোট্ট-রানী”
“পহেলা ফাল্গুন আসতে আর মাত্র কিছুদিন বাকি।”
সুফিয়ান ভ্রু কুঞ্ছিত করে ফেলল। “তো?
“সেদিন বিশেষ একটি দিন।ভুলে গেলে?”
সুফিয়ান যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করল মস্তিষ্কে। পহেলা ফাল্গুন ঘিরে বিশেষ দিনটির কথা মনে করার তীব্র চেষ্টা করল। তাঁর চেষ্টা বিফলে গেল।মনে পড়ল না। “হুঁ,ভুলে গেছি।কি সেদিন?”
বিন্তি আশ্চর্য হল। সুফিয়ান কখনো পহেলা ফাল্গুন এর কথা ভুলে না।আজ ভুলে গেছে।তবু বিন্তি নিজেই বলল “পহেলা ফাল্গুন তোমার জন্মদিন।তুমি বত্রিশ বছরে পা ফেলবে।সেদিন ঘিরে কত আনন্দ করতাম আমরা।মনে পড়ে আজও।আমি অনেক কিছু ভেবে রেখেছি সে-ই দিনটি ঘিরে।”
“দেখিস, জন্মদিন আবার যেন মৃ’ত্যুদিন হয় না।” বলে সুফিয়ান শব্দ ব্যতীত হাসল। বিন্তি এবার রেগে গেল। সুফিয়ান বিন্তির কোচকানো চোখ দেখে বলল “মজা করে বলেছি।এতেও রাগ করতে হয়!যা,এখন ঘরে চলে যা। গিয়ে দ্রুত রান্নাবান্না সেরে ফেল।”
বিন্তি চলে যেতেই সুফিয়ান পেছন থেকে বলল “তোর ল্যাংড়া জামাই এর নামটা যেন কি? ওকেও আমার জন্মদিনে একটু মিষ্টির দাওয়াত দিস। বেচারা এমনিতেই ল্যাংড়া”
বিন্তি দু কোমরে হাত দিয়ে পেছন ঘুরে ভাই বলে দাঁড়িয়ে পড়ল। সুফিয়ান হেঁসে উঠল। বিন্তিও সুফিয়ান এর হাঁসি দেখে হাসল। এরপর চলে যায় বাড়ির দিকে।
সুফিয়ান হাঁসি থামিয়ে হাফ ছেড়ে চোখ মুছল। বিন্তিকে খুব কষ্টে এতক্ষণ ভুলভাল বুঝিয়েছে। নিজেকে যথেষ্ট ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মিথ্যা নাটক করেছে।
“বোন কে মিথ্যা আশা দিলেন?” সোলেমান এর কন্ঠ। ওরা এতক্ষণ দূর থেকে দুই ভাই বোনের কথোপকথন শুনছিল।এসে সুফিয়ান এর দুপাশে বসে পা ভাঁজ করে।
সুফিয়ান বলল “কি করার,বোনটা আমার জন্য কষ্ট পাচ্ছে। ওর কষ্ট দেখতে পারছি না। ওকে খুশি করতে আমার এতটুকু অভিনয় করতেই হল।”
“অভিনয়টা বাস্তবে রূপ দেন।” বলল বদরু।
“আপাতত সেটাই চাচ্ছি।” সুফিয়ান এর কন্ঠে জোর পাওয়া গেল।
সোলেমান বলল “আপনার বয়স একত্রিশ। কিন্তু দেখে মনে হয় আরো কম। কিভাবে নিজের সৌন্দর্য বজায় রাখলেন?” বলে সবাই মিলে হেঁসে উঠল।
সুফিয়ান জবাবে বলল “পুরুষদের সৌন্দর্য ধরে রাখতে হয় না।আমিও রাখিনি।বাবা একজন সুদর্শন পুরুষ ছিলেন।তবে উনার গায়ের রং-টা ফর্সা ছিল। আমি তাঁর মতই,তবে শ্যামবর্ণের।”
“আপনি যদি আপনাকে স্বচোক্ষে দেখতেন,তাহলে বুঝতেন আপনি কতটা সুদর্শন!নয়ত ঐ জমিদার এর মেয়ে আপনার প্রেমে পড়ত না।” সোলেমান বলল।
সুফিয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল “হলেও হতে পারে।চল, তোদের আমার সমস্ত ক্ষেত দেখিয়ে দেই।”
বলে ক’জন উঠে হাঁটা শুরু করল ধান ক্ষেতের দিকে। নদীর অন্য পাশেই ধানক্ষেত। বিশাল বড়।নীলাভ আকাশের নিচে সারি সারি জমি, মাঝখানে সরু বাঁশের সাঁকো আর কই মাছের নড়াচড়ায় মাঝে মাঝে পানির উপর ভাঙা রোদ ঝিলিক দিয়ে উঠে। একটি বক পাখি ধীর ভঙ্গিতে পানির ধারে নেমে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো এক পা এগিয়ে আবার থেমে যায়,মনে হয় এই নীরবতার মধ্যেও সে কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে।
ধান-গাছের দোলায় ভাসতে ভাসতে হালকা কাদামাটির গন্ধ এসে নাকে লাগে। কিছু কৃষকরা তাঁর ক্ষেতে কাজ করছে।দূর থেকে কিছু কৃষকের কণ্ঠে ভেসে আসে সুরেলা ডাক “ওই পানি একটু ছাড়ো” কথাগুলো ভাঙা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
পুরো দৃশ্যটি এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছি নরম সকালের মাঝে।মনে হয় ধান-ক্ষেতের প্রতিটি শীষ, প্রতিটি বাতাসের ছোঁয়া, এই গ্রাম্য জীবনকে নিজের মতো করে গল্প বলছে।সোলেমান ওদের কাছে দৃশ্যটি আকর্ষণীয় লাগল।আলিমনগর এর থেকে সিন্ধুতলি গ্রামটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক- বলে ধরে নিল ওরা।
সুফিয়ান তাঁদের পিতৃপুরুষের রেখে যাওয়া ধনসম্পত্তি নিয়ে এটা ওটা ধান ক্ষেতের এক সারির মাঝে বসে পায়চারি করতে করতে বলছে।উনারা চলে যাওয়ার পর,সে কিভাবে সবকিছু অটল রেখে ধরে রেখেছে সে-ই গল্প ওদের শোনাচ্ছে। ওরাও মাটিতে বসে মাথা তুলে সুফিয়ান এর দিকে তাকিয়ে শুনছে।
দূরের কৃষকরা ক্ষেতে সার দিচ্ছে।কখনো ক্ষেতের দিকে কখনো সরু চোখে সুফিয়ান এর দিকে দেখছে। কতদিন পর তাঁদের সরদার কে ক্ষেতে দেখছে।দেখেই যেন তাঁরা শান্তি পাচ্ছে।
সুফিয়ান কথা বলতে বলতে ক্ষেত ছেড়ে দূরে তাকাল। তাঁর বাড়ির দিকে। সেখানে একজন বোরখাওয়ালী দাঁড়িয়ে আছে।সে যেন দূরের দৃষ্টি ঠিক সুফিয়ান এর দিকেই ফেলে রেখেছে। সুফিয়ান চোখ সরিয়ে নিল। তাঁর বক্তব্য অবিরত রাখল। সোলেমান হুট করে মাঝখান থেকে প্রশ্ন করল “আপনাকে আজ কেন যেন সে-ই আলিমনগর এর সুফিয়ান ভাইয়ের মতই লাগছে। আপনার পরিবর্তন টা ভালো লাগছে। কিন্তু, তারপরও..!’” সোলেমান বাকি কথা গিলে ফেলল।
সুফিয়ান ওর রেশ টেনে বলল “তোরা আলিমনগর এর হালচাল জানতিস।এখানের কোন কিছুই জানিস না।বুঝিস না।তাই শিখিয়ে দিচ্ছি।”
“আলাদা করে শিখিয়ে দিতে হবে না। আপনি তো সবসময় আমাদের সাথেই থাকবেন।” বলল লাল মিয়া।
সুফিয়ান মাথা হালকা ঝাঁকিয়ে বলল হুঁ, তারপরও তোদের শেখানো আমার দায়িত্ব।”
সুফিয়ান এর ফের দৃষ্টি গেল সেই বোরখাওয়ালীর দিকে। মেয়েটি ঠিক কোথায় তাকিয়ে আছে, সুফিয়ান বুঝতে পারছে না। সুফিয়ান কৌতুহল-বশত নিজেকে ফেলে পেছন ঘুরে দেখল।ক্ষেত ব্যতীত কিছুই নেই যা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখার মত। সুফিয়ান ওঁদের নিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে থেকে ধীরপায়ে হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে ওদের কাজের বাকি নির্দেশ দিচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে চোখ তুলে বোরখাওয়ালী মেয়েটির দিকেও তাকাচ্ছে। সুফিয়ান -দের অনুসরণ করে মেয়েটিও দূর থেকে একই সাথে সামনে এগোচ্ছে। সুফিয়ান এর রাগ উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে সামনে এগিয়ে গেল।
ধানক্ষেত ছেড়ে তাঁরা রাস্তায় উঠেছে। সুফিয়ান ওদের আজকে কাজে লাগতে বারণ করেছে।বলেছে আগামীকাল সবকিছু ভালোভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে দিবে। এরপর কাজে লাগবে। ওরাও আর তাঁর আদেশের বিরুদ্ধে গেল না। সুফিয়ান পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিল।বোরখাওয়ালী মেয়েটিকে খুঁজল। আশেপাশে আর মেয়েটিকে দেখা গেল না।কে ছিল মেয়েটি? সুফিয়ান কে দেখছিল? না কি অন্য কাউকে? অন্যকিছু? সুফিয়ান এর মনে প্রশ্ন জাগল।জবাব মেলানো দরকার। ভেবে সুফিয়ান বাড়ির পথে হাঁটা শুরু করল।আজ শুক্রবার,পথে ঘাটে লোকজনের খুব একটা আনাগোনা দেখা যাচ্ছে না। চারপাশ কেমন এক নিস্তব্ধতায় ঘেরা।বাড়ির সামনে এসে সুফিয়ান হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়।মনে হল এই বুঝি কেউ তাঁকে আড়ালে দেখছে।সে ঘুরে ঘুরে চারপাশে তাকাল।কাউকে দেখতে পেল না। তাঁর অস্থির চোখ দেখে সোলেমান দ্রুত তাঁর দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল “কাকে খুঁজছেন?
সুফিয়ান মিথ্যা বলল “তোদের!”
তাঁর মিথ্যা বলার অভিনয় হল না। বদরু ধরে ফেলে বলল “অন্য কাউকে বা অন্যকিছু খুঁজছিলেন!বলুন কি খুঁজতে ছিলেন?”
সুফিয়ান প্রসঙ্গ এড়াতে চেষ্টা করল। পরপর কয়েকবার সিগারেটে টান দিল। এরপর সিগারেট এর শেষ খণ্ডটি ফেলে দিল।বলল “আজমাত-মনে হল আজমাত কে দেখেছি।আপছা চোখে।”
“আজমাত,ওই ধলা বিলাই,সে তো বিদেশে চলে গেছে।জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। গতকাল থেকেই।”
“ও” সুফিয়ান ছোট্ট শব্দে জবাব দিয়ে আবার বলল “রশীদ চাঁচা শহর থেকে ফিরেছেন?
সোলেমান ভেবে জবাব দিল “শুনেছি আজ ফিরবে।ফিরেছি কি-না বলতে পারব না।”
“আর জেবুন্নেছা ফুপু?উনি সব জেনে ফেলেছেন নিশ্চয়ই?” সুফিয়ান জিজ্ঞেস করে আবার ধীরে পথে হাঁটতে শুরু করল।
লাল মিয়া হাঁটতে হাঁটতে বলল “হুঁ।উনি সেদিন নাকি কিছু টের-ই পাননি।”
“টের না পেয়েছে ভালো হয়েছে।ওদিন উনি উল্টোপাল্টা কিছু বললে হয়ত উনাকেও উপরে পাঠিয়ে দিতাম।”
সুফিয়ান এর কথা শুনে সোলেমান ওরা হেঁসে উঠল। সুফিয়ান এর তখন আবার মনে হল তাঁকে কেউ অনুসরণ করছে।সে দ্রুত পেছন ঘুরল। অনুসরণকারী যাতে আড়ালে না যেতে পারে। এবার দেখতে পেল। সে-ই বোরখাওয়ালী কে। সুফিয়ান দাঁড়িয়ে যায়।ওরাও দাঁড়িয়ে যায়।সে-ই সাথে বোরখাওয়ালী মেয়েটিও দাঁড়িয়ে পড়েছে থ’হয়ে যেন।
সুফিয়ান ওদের বলল “তোরা এখানেই দাঁড়া।আমি আসছি।” বলে বোরখাওয়ালী মেয়েটির দিকে পা বাড়াতেই মেয়েটি এক পা দু পা করে পেছনে সরে যায়। এরপর সুফিয়ান এর থেকে পিঠ ঘুরে চলে যায় সোজা পথে। সুফিয়ান আশ্চর্য হল।বলল “মেয়েটা কি অদ্ভুত।মনে হচ্ছে আধপাগল।”
সোলেমান ওরা একসাথে বলে উঠল “আধপাগল না,মনে হয় পুরোটাই পাগল।” বলা শেষে হেঁসে উঠল।
মেয়েটি নিজ পথে যেতে যেতে ক’বার পেছন ফিরেও তাকিয়েছিল। সুফিয়ানও একবার পেছন ঘুরে ওর চাহনি দেখেছিল। মেয়েটি কে?সে আন্দাজ করতে পারল না। তাঁদের কোন আত্মীয়-স্বজন নেই।যার ফলে সঠিক উত্তর মিলল না।
বিন্তি রান্নাবান্না শেষ করে। মাংসের গন্ধ আসছে। চারপাশ রন্ধন-গন্ধে ভরে গেছে।যে কারোর রান্নার এমন সুগন্ধে খিদে বেড়ে যাবে।যার খাবারের প্রতি অনিহা সেও খেতে চাইবে। বিন্তি রান্না শিখেছিল তাঁর মায়ের থেকে। মাঝেমধ্যে সুফিয়ান ওঁর হাতে রান্না খেয়ে বলত ‘তোর রান্না খেলে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে’। কারো শূন্যতা বয়ে বেরোনো অনেক যন্ত্র’ণার। সেখানে সুফিয়ান প্রতিনিয়ত আপনজনদের হারানোর ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছে। বিন্তি খাবার প্লেটে তুলতে তুলতে ওঁর ভাইয়ের কথা ভাবছে। সত্যিই মানুষটা পরিবর্তন হল! না,তখন ওকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছে, তাই ভাবছে। বিন্তি আর নতুন করে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ভাবতে চাইল না।
ভাবনা ছেড়ে খাবার টেবিলে পরিবেশন করল। সুফিয়ান, সোলেমান ওরা ঘরের সামনে বসে বসে গল্প করছিল। সোলেমান ওদের কথাবার্তা সুফিয়ান কানে না নিয়ে, না বুঝেও হুঁ হা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। তাঁর মনটা পড়ে আছে ফারদিনার কাছে। মানুষটি দুনিয়াতে নেই। অথচ তাঁর প্রতিনিয়ত মনে হচ্ছে ফারদিনা তাঁর আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়।ফারদিনার গায়ের গন্ধটা অবধি সে পাচ্ছে।শুধু চোখ মেলে তাকালে কাউকে দেখতে পায় না।
বিন্তি সদর দরজার কাছে এসে সুফিয়ান কে খেতে ডাকে।সাথে বাকিদের। সুফিয়ান থম মেরে কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে গেল খাবার ঘরে।খাবার টেবিলে সবাই গোলাকার হয়ে বসে।বদরু ওঁরা কারো দিকে না তাকিয়ে গোগ্রাসে খেতে শুরু করে। সুফিয়ান খাচ্ছে না। খাবার সামনে বসে আছে। বিন্তি সুফিয়ান এর কাঁধে হাত রেখে বলল “আমি খাইয়ে দেই।” সুফিয়ান বারণ করতে চাইল। তাৎক্ষণিক মনে পড়ল সে-ই বলেছে আজ ওর হাতে খাবে।বোনকে খুশি করতে তখন কত কি বলেছে, শেষে এসে আর ওঁর মনটা ভাঙ্গতে চাইল না।
বিন্তি ভাত মাখিয়ে সুফিয়ান এর মুখে তুলে দিল। সুফিয়ান হা করে নিল। বিন্তি সুফিয়ান এর মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বলল “আর নিজেকে শেষ করো না। ভাগ্যকে বিশ্বাস করো। আস্তে আস্তে তুমি অতিতের সে-ই বি’ষাক্ততা থেকে মুক্তি পাবে দেখো।”
সুফিয়ান কিছু বলল না। চুপচাপ খাবার শেষ করল।কতদিন পর অন্ন মুখে তুলল সেই হিসেবটা পর্যন্ত নেই। একজন দাসী এসে এঁটো বাসন গুলো সরাতে সরাতে বিন্তি কে লক্ষ্য করে বলল “সই’ আজকে বিকেলে আমরা একসাথে ঘুরতে বের হব।যাবি তো?”
সুফিয়ান দাসীর দিকে তাকিয়ে রইল। ঝিলমিল এর কথা মনে পড়ে।ঝিলমিলও ঠিক এভাবে ফারদিনার সাথে বন্ধুত্ব করে। ওর প্রয়োজনে পাশে থেকে বিশ্বাস অর্জন করে এরপর ওর সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করে। সুফিয়ান এর মনে ভয় ঢুকল। কাউকে বিশ্বাসও সে করতে পারছে না।চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল।দাসী এঁটো বাসন নিয়ে চলে গেল। বিন্তি সুফিয়ান কে বলল “কি হল, চুপসে গেলে যে!”
সুফিয়ান নরম গলায় বলল “তোর কোন বন্ধুর দরকার নেই।কোন দাসীর সাথে বন্ধুত্ব করবি না। এবং কি অন্য কারো সাথেও না।জানিস তো,আপন মানুষগুলোর থেকেই আমাদের সর্বদা দূরে থাকতে হয়। দিনশেষে ওরাই যে আমাদের পিঠে ছু’রি বসায়।”
“ভাই, তুমি যদি আমাকে দুনিয়া ছাড়তে বলো,আমি তা-ও ছেড়ে দেব। চিন্তা করো, না! কারো সাথে আমি ঘনিষ্ঠপূর্ণ সম্পর্ক গড়ব না।”
লালমিয়া বলল “ঝিলমিল বেইমানি করেছে, তারমানে এই নয় সবাই ওর মত বেইমান।বিশ্বাসঘা’তকতা করবে।”
সুফিয়ান ঠোঁট কুঁচকে হেঁসে বলল “ বিশ্বাস! শব্দটা চার অক্ষরের হলেও এর মূল্য বেশ দামী।যখন দামী বস্তুটি সস্তায় ভেঙ্গে যায়,তখন আর সে-ই দামী বস্তুটির প্রতিও আগ্রহ থাকে না।- আমার বিশ্বাস ভেঙ্গেছে ওরা।ফারদিনার বিশ্বাস ভাঙ্গা মানেই আমার বিশ্বাস ভাঙ্গা ছিল। বন্ধুমুক্ত জীবন হোক,তবু বেইমান বন্ধু কারো না হোক।”
বলে সুফিয়ান খাবার ঘর থেকে নিজের ঘরে চলে যায়।
ড্রয়ার থেকে সিগারেট বের করে ধরাল।বসল বারান্দায়। দোতলার তাঁর ঘর থেকে ফারদিনার কব’রটি দেখা যায়। সেখানে তাকালে তাঁর কষ্টটা দ্বিগুণ বেড়ে যায়।চোখ থেকে আপনাআপনি জল গড়িয়ে পড়ে।পাশে বেতের টেবিলের উপর তাঁর মা বাবার ছবি। সুফিয়ান নিজ হাতে অঙ্কন করেছিল তাঁদের ছবি।ঘন কার্ডবোর্ড ওপর আঠা দিয়ে লাগানো। সুফিয়ান ছবিটি হাতে তুলে নিল। মায়ের দিকে তাকাল। কথা বলতে চাইছে তাঁর সাথে। নিজের কষ্টগুলো মা’কে বলতে পারলে বোধহয় কমে যেত। তাঁর মা মাথায় হাত রেখে দোয়া করত।মুহুর্তে হয়ত তাঁর সমস্ত ব্যথা দূর হয়ে যেত।
সুফিয়ান কেঁদে উঠল। তাঁর মা বাবার ছবিটি বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল।নীরব ঘরে একাকী বলল “ না পাওয়ায় দু্ঃখ ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু পূর্ণতার ছোঁয়া পেতে পেতে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ব্যথা সহ্য করার মত নয়।- কেন আমি সেদিন ফারদিনার সাথে জঘন্যতম কাজটি করতে গেলাম!” সুফিয়ান এর ভেতরে অনুশোচনার ভারটা চেপে বসে আছে।ঘুরেফিরে একটাই প্রশ্ন তাঁর ভেতরে ঘুরছে।
বিন্তি সুফিয়ান এর ঘরের দরজার সামনে এসে উঁকি মেরে ভাইকে দেখছে। তাঁর ভাইটা পাগলপ্রায়ই।কোন উপায় যদি তাঁর ভাইয়ের কষ্ট কমানো যেত! সে-ই উপায়কে বিন্তি সবকিছুর বিনিময় হলেও ক্রয় করতে রাজি ছিল।অথচ সেই উপায়টুকু আর অবশিষ্ট রইল না।সব যেন সমুদ্রের জলে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে।
দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে ধরণীতে।
নিস্তব্ধ একটি সন্ধ্যা যেন ধীরে ধীরে পৃথিবীর উপর নেমে আসে। দিনের শেষ আলোটা আকাশের কোণে ঝুলে থাকে সোনালি,রক্তিম আর হালকা বেগুনি রঙে মেখে আছে।পশ্চিম দিগন্তে অস্তগামী সূর্য যেন তার শেষ উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে বিদায় নিচ্ছে। দূর থেকে ভেসে আসে পাখিদের ঘরে ফেরার ডাক,মনে হয়, তারা দিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে আপন ঠিকানার দিকে ফিরে যাচ্ছে।
সন্ধ্যার বাতাসে থাকে এক ধরনের ঠাণ্ডা মিশে থাকা শান্ত অনুভূতি। চারিদিকে হালকা অন্ধকার নামতে থাকে, কিন্তু পুরোটা ঘিরে ফেলছে না।এখনও বলা যায়, দিন আর রাতের মাঝামাঝি এক অপূর্ণ মুহূর্ত।কোথাও কোথাও শোনা যায় মাগরিবের আজানের সুর, যা বাতাসে মিশে পুরো পরিবেশকে ধর্মীয় অনুভূতিতে রুপান্তরিত করছে।
আকাশে ঠিক এমন মূহুর্তে,প্রথম জ্বলজ্বলে তারা দেখা দেয়। ছোটদের উৎসাহ যেন বেড়ে যায়। ওরা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাটির চুলোর ধোঁয়া ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার গন্ধ তৈরি করে। মাটি, ধোঁয়া আর শীতল হাওয়ার মিশ্র এক অনন্য ঘ্রাণ।
এ সময় সাধারণত মানুষ একটু ঢিলেঢালা হয়ে যায়। কেউ উঠোনে বসে দিনের গল্প বলে, কেউ ঘরের ভিতর আলো জ্বালাতে ব্যস্ত থাকে। পথের ধারে কেরোসিন ল্যাম্প জ্বলে ওঠে, যার হলুদ আলো যেন অন্ধকারকে ঠেলে সামান্য জায়গা দখল করে নেয়। দূরের কুকুর-গুলোর ডাক,গাছের পাতার মৃদু নড়াচড়া মিলিয়ে এক ধরনের গভীর নিস্তব্ধতা তৈরি হয়, যা অদ্ভুতভাবে মনকে শান্ত করে।
সন্ধ্যার দৃশ্য সুন্দর হলেও সুফিয়ান এর কাছে বিরক্তিকর লাগছে।গোটা দুনিয়াটাকেই তাঁর বিরক্ত লাগছে।দু হাত পেছনে বেঁধে বাড়ির সামনে পায়চারি করছে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল ফারদিনার কব’রের কাছে।একা একা ফারদিনার সাথে কথা বলছিল।তাঁর মনে হয় ফারদিনা তাঁর কথাগুলো শুনছিল। কিন্তু জবাব দিল না।ফারদিনা বোধহয় অভিমান করে আছে।ভেবে সুফিয়ান কিছুক্ষণ কাঁদছিল। এরপর কব’রের কাছ থেকে চলে আসে।
সোলেমান ওরা বাজারে গিয়েছে। তাঁকে সঙ্গে নিতে চেয়েছিল। যায়নি। বলেছিল তাঁকে কিছুক্ষণ একা ছেড়ে দিক। ওরা আর কথা না বাড়িয়ে চলে যায়। সুফিয়ান বেশ কিছুক্ষণ হয় পায়চারি করছে।কখনো মনে হচ্ছে তাঁকে কেউ দূর থেকে দেখছে। আশেপাশে তাকালে কাউকেই দেখতে পায় না।মনের ভুল।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সুফিয়ান ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল।বাইরে আজ প্রবল ঠাণ্ডা পড়ছে।ঠিক তখনই মনে হল পেছনে কেউ আছে।সময় না নিয়ে তাৎক্ষণিক পেছনে ঘুরে তাকাল। সে-ই বোরখাওয়ালী মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি আর এবার পালাতে পারবে না। সুফিয়ান তাঁর সন্নিকটে। মেয়েটি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ল।এলোমেলো চোখ করে এদিক ওদিক তাকাল। সুফিয়ান মেয়েটির সামনে এগিয়ে বলল “কে তুমি?”
বোরখাওয়ালী চোখ নামিয়ে বলল “আমি হেলেনা। মৌলভী সাহেব কে চিনেন নিশ্চয়ই! তাঁর মেয়ে আমি।”
সুফিয়ান কিছু বলার আগেই বিন্তি এসে হাজির হয়।হেলেনা বিন্তির দিকে চেয়ে ঘরের দিকে চলে গেল। বিন্তি সুফিয়ান কে লক্ষ্য করে বলল “ভাই ওকে আমি ডেকেছি।”
বলে বিন্তি হেলেনা কে নিয়ে ঘরের ভেতর চলে যায়।বেশ কিছুক্ষণ দু’জন গল্পগুজব করল। এরপর হেলেনা চলে যায়।সুফিয়ান বিন্তি কে ডেকে নিল।হেলেনার যাওয়ার পানে একবার চেয়ে সুফিয়ান বিন্তি কে জিজ্ঞেস করল ও কে?তোর সাথে পরিচয় কিভাবে হল? আগে কখনো আসেনি তো!”
বিন্তি জবাব দিতে সময় নিল। সুফিয়ান বৈঠকখানায় বসে। পুনরায় তাড়া দিল। বিন্তি নতজানু হয়ে সুফিয়ান এর সামনে দাঁড়িয়ে বলল “ভাই, আমি কখনো তোমার সাথে মিথ্যা বলিনি।আজও বলব না। হেলেনা! আমাদের মৌলভী সাহেব এর মেয়ে।ও খুব ছোট্ট থেকেই তোমাকে পছন্দ করত। ভালোওবাসে তোমাকে।তুমি যখন আলিমনগর ছিলে,তখন ওর সাথে আমার দেখা হয়,কথা হয়। সবকিছু আমাকে বলে।” থেমে বিন্তি সুফিয়ান এর সামনে বসে।ফের বলল “ভাই,ফারদিনা তো চলে গেছে, তুমি কি চাইলেই পারবে না নতুন একটি জীবন শুরু করতে। হেলেনা কে বিয়ে করতে!!”
সুফিয়ান ক্রোধের আগুনে জ্বলে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। বিন্তির দিকে তাঁর ডান হাতটা এগিয়ে গিয়েছিল থাপ্পড় দেয়ার জন্য। মুহুর্তে সুফিয়ান নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। চোখের পলক বারবার পড়ছিল। এরপর বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। বিন্তি ঠোঁটে কাঁপুনি নিয়ে বলল “ভাই আমি ওভাবে বলতে চাইনি।আসলে…!
The Silent Manor part 50
বিন্তি বাকি কথা বলার আগে সুফিয়ান ওর দিকে ছুটে গিয়ে বলল “আসলে কি!আমি ফারদিনাকে ভুলে যাব?যাকে ভালোবেসে আমিই ম’রে গেছি তাঁকে ভুলে যাব?যাকে আমি নিজ হাতে মে’রে ফেলেছি তাঁকে ভুলে যাব?তুই জানিস কত বড় পাপ করেছি আমি? আমি আমার অনাগত সন্তানকেও গলা টিপে হ’ত্যা করেছি!কত সুন্দর একটা সংসার হত,ফারদিনা বেঁচে থাকত, আমার বউ হত, আমার সন্তান দুনিয়ার মুখ দেখত! কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে গেল। শুধুমাত্র বংশ বাঁচাতে ওরা আমার হাতে ফারদিনাকে মা’রতে বাধ্য করে,আর আমিও শতশত গ্রাম বাসীদের বাঁচাতে স্বার্থপর এর মত আমার জীবনের বিশেষ মানুষ দুটোকে শেষ করে ফেলি।”
সুফিয়ান এর চোখে জলের স্রোত নেমে এল। সোফায় বসে পড়ে। মুখে হাত চাপা দিয়ে কেঁদে উঠল।_
