The Silent Manor part 52+53
Dayna Imrose lucky
১৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৭১ – ১ ফাল্গুন ১২৭৭ বঙ্গাব্দ
রশীদ তালুকদার ভোর ঠিক ছ’টায় আলিমনগর ফিরেছেন।গত কয়েকদিন আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা শুনেছেন জেবুন্নেছার কাছ থেকে। তাঁর বংশ নির্বংশ হয়েছে। গ্রাম ব্রিটিশদের হাতে চলে গেছে। জেবুন্নেছা পাশে বসে এখনো অবিরত সব বলে যাচ্ছে।এবার সে শুধু শুনছে।এই শোনাটাই তার ভেতর সবচেয়ে অদ্ভুত ভাঙন তৈরি করেছে।
প্রথম মুহূর্তে তার মন সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেছে। কথাগুলোর অর্থ সে বুঝেছে, কিন্তু গ্রহণ করতে পারছে না। যেন শব্দগুলো কানে ঢুকেছে, মাথায় পৌঁছায়নি।চারপাশের সব শব্দ দূরে সরে গেছে।নিজের নিঃশ্বাসের আওয়াজটুকুও অচেনা লাগছে।
তারপর ধীরে ধীরে বাস্তবটা গায়ে এসে পড়েছে। বুকের ভেতর একটি অদৃশ্য চাপ জমছে। অজানা ভয়, অকারণ আতঙ্ক তাকে জড়িয়ে ধরেছে। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, শরীর আছে কিন্তু মন যেন ঠিক সেখানে নেই।
চিন্তাগুলো ছুটোছুটি করছে “সব কি সত্যি?”, “আমি কি ঠিক শুনেছি?”, “এরপর কী হবে?”
উত্তর খোঁজার শক্তি নেই রশীদ এর। মনে হচ্ছে কেউ যেন তার পায়ের নিচের জমিটুকু হঠাৎ কেড়ে নিয়েছে।
এক ধরনের অসাড়তা তাকে গ্রাস করেছে। কান্না আসার কথা, রাগ হওয়ার কথা,কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছে না। সে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে, অথচ ভেতরের ভাঙচুর থামছে না। স্মৃতি, আশঙ্কা, অনুশোচনা,সব একসাথে মাথার ভেতর গাদাগাদি করছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সবচেয়ে গভীর অনুভূতিটা হলো অপ্রস্তুত শোক। সে জানে, এখনো পুরো কষ্টটা এসে পৌঁছায়নি। iকিন্তু সেটার ছায়া ইতিমধ্যেই তাকে ঢেকে ফেলেছে।সে বসে আছে,শব্দহীন, স্থির,ভেতরে ভেতরে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছেন তিনি।
ছড়ির উপর হাতের ভর।ছড়ি সহ হাতটি তখন কেঁপে উঠেছিল। একজন দাসী ছুটে এসে একগ্লাস জল দিয়েছিল। রশীদ খেতে চেয়েছিলেন জলটুকু।পারেননি।হাতের কাঁপুনির জন্য গ্লাসটা পড়ে গিয়ে মৃদু আওয়াজ তুলেছিল। তাঁর চার সন্তান নি’কৃষ্টতম কাজ করেছে। বিনিময়ে ওদের প্রাণ দিতে হয়েছে।ফারদিনা- যাকে ঘিরে রশীদ বেঁচে ছিলেন, সে-ই একমাত্র মেয়েকে মরতে হয়েছে। অন্যকেউ ওকে মেরে ফেলেছে।কতই না কষ্ট হয়েছে ওর তখন।চার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। রশীদ মানছেন তাঁরা দোষ করেছিল, কিন্তু তারপরও তাঁর হৃদয়টা হঠাৎ ব্যাকুল হয়ে উঠল। সন্তান বলে। ভেতরের ভাঙ্গা শব্দ বাইরে পর্যন্ত বেরিয়ে আসছে।
আলিমনগর,যে গ্রাম ঘিরে কতশত স্মৃতি তাঁর। নিজের হাতে গ্রামকে সাজিয়ে-ছিলেন।কত যুগ ধরে জমিদারি সামলাচ্ছেন তিনি, গ্রামের মানুষগুলো নিশ্চয়ই তার অপেক্ষায় আছে। তিনি নিশ্চয়ই গ্রামকে ব্রিটিশদের হাত থেকে রক্ষা করবেন। রশীদ হঠাৎ করে চিরশূন্য হয়ে গেলেন। সামান্য ছড়ি ধরে রাখার মত শক্তি টুকু পাচ্ছে না। মাথা তুলে তাকাতে অবধি পারছেন না।সব যেন এলোমেলো হয়ে গেছে।রশীদ এর চোখ বেয়ে জল পড়ছে
তাঁর শক্তি ছিল তাঁর পাঁচ সন্তান।চার ছেলে ছিল তাঁর দু হাতের লাঠির মত।ফারদিনা ছিল তার গর্ভধারিনী মায়ের মত।ফারদিনার দিকে তাকালে নিজের প্রান প্রিয় স্ত্রীকে দেখতে পেতেন।ফারদিনা দুনিয়াতে আসার আগে তাঁকে তাঁর স্ত্রী বলেছিলেন “এবার যদি আমার মেয়ে হয়, সে-ই মেয়েকে তোমার মায়ের স্থানটি দিবে। তুমি তো তোমার মাকে ভীষণ ভালোবাসতে।আগলে রাখবে নিজের মেয়েকে।কখনো কাছছাড়া করবে না।” সেদিন তাঁর প্রাণপ্রিয় স্ত্রী যেন আগেভাগেই মৃ’ত্যুর ইঙ্গিত পেয়েছিলেন।
দিনটির কথা মনে পড়ল তাঁর।বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। নিজের স্ত্রীকে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারেনি। নিজের কন্যাকে রক্ষা করতে পারেনি। অন্যদের করা পাপের ফল ওর ভোগ করতে হয়েছে। রশীদ এর চোখের সামনে ফারদিনার ছোট্ট বেলার একটা মুহূর্ত ভেসে উঠল। ঘাগড়া পড়ে উঠোনের মাঝে দৌড়াদৌড়ি করছিল।বয়স তখন আনুমানিক দশ।খেলার মাঝখানে সায়েম এর সাথে ঝগড়া হয়েছিল।সায়েম ধাক্কা মেরে ফারদিনাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল।ফারদিনা তির্যক কন্ঠে কান্না শুরু করেছিল। রশীদ এমন দৃশ্য দেখে ঘর থেকে ছুটে যান।ফারদিনা কান্না করতে করতে সায়েম এর নামে নালিশ করে। পড়ে গিয়ে হাঁটুতে আ’ঘাত পেয়েছে। সামান্য কেটে গিয়েছিল। রশীদ ফাদিনাকে সামলাতে চাইল।ফারদিনার কান্না দেখে সেদিন রশীদ তালুকদারও কেঁদে ফেলেছিলেন।ফারদিনা রশীদ এর চোখের জল মুছে বলেছিল “আব্বা, আপনি কাঁদবেন না। আপনার কান্না দেখলে আমি আরো কাঁদব।যে আমাকে মেরেছে আপনি ওকে মেরে দিন।” রশীদ ফারদিনার জন্য সেদিন সায়েম কে বেশ পিটিয়েছিল। ফারদিনা সায়েম এর কান্না দেখে হেসে উঠেছিল।ওর হাসিতে রশীদও আনন্দ পেয়েছিলেন।
চোখের সামনে থেকে দৃশ্যটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।আজ ফারদিনা আ’ঘাত পায়নি।বরং চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে তাঁর জীবন থেকে। রশীদ এর কষ্ট যেন বাঁধনহারা হয়ে গেল। চিৎকার দিয়ে কান্না করতে ইচ্ছে করছে তাঁর। লোকজন চেয়ে থাকবে,অনুচর,দাসীরা ভাববে সরদার আজ পরিপূর্ণ একা হয়ে গেছে। দুর্বল হয়ে গেছে।উনার আর দুনিয়াতে কেউ নেই।তিনি আর ওঁদের রক্ষা করতে পারবে না।
অনুচর ক’জন বৈঠকখানায় বসে আছে।হাতে কোন অ’স্ত্র নেই।লাঠি নেই।খঞ্জর নেই। ওঁদের মধ্যে আর দাম্ভিকতা নেই।সেই অহংকারটা আর নেই। সব যেন সুফিয়ান সেদিন ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়ে গেছে।অহংকার মাটির সাথে মিশে গেছে।ওরা সেদিন সৌভাগ্যবশত গোপন ঘরে ছিল না।থাকলে হয়ত ওঁরাও আজ বেঁচে থাকত না। নিশ্চিত।
কুদ্দুস বাড়িতে নেই। ওর নিজ বাড়িতে চলে গেছে আজ দু’দিন হয়। বলেছিল রশীদ ফিরলেই ফিরবে। বোধহয় এখনো সংবাদ পায়নি ও। ব্রিটিশ প্রধান একবার তালুকদার বাড়ির সামনে এসে গিয়েছিল। রশীদ তালুকদার এর সাথে দেখা করবে বলে। রশীদ জানিয়েছেন উনি এখন দেখা করবেন না। ব্রিটিশ প্রধান আর জোর করেনি।এখন না হোক,পড়ে ঠিকই দেখা হবে। কারণ গ্রাম যে তাঁদের হাতে।
জেবুন্নেছা রশীদ এর পাশে বসে। তাঁর কাঁধে হাত দেয়। শান্তনা দেয়ার বৃথা চেষ্টা করল। রশীদ কোন প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে বসেই রইল। রশীদ এর নীরবতা দেখে জেবুন্নেছা বললেন
“সব দোষ তো ঐ সুফিয়ান এর।ও কেন ফারদিনার সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছিল!আদিব ওর বোনের সাথে যেটা করেছে সেটা ফারদিনার সাথে করার কি দরকার ছিল!এরপর নিজেই ফারদিনাকে মেরে ফেলল। সাথে আমাদের চার পুত্রকে।” আদিব ওরা সুফিয়ান কে বাধ্য করেছে ফারদিনাকে মে’রে ফেলতে, সে-ই সত্য জেবুন্নেছা চেপে গেলেন।
রশীদ এর শান্ত মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে অশান্ত হয়ে যাচ্ছে যেন। এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। কষ্ট হচ্ছিল ঠিকই। কিন্তু রাগ হচ্ছিল না। হঠাৎ যেন এখন মেজাজ খারা’প হয়ে গেল। সুফিয়ান তাঁর মেয়ের সাথে অন্যায় করেছে,নিজ হাতে মেরে ফেলেছে,বড় অন্যায় করেছে বলে রশীদ বেশ ক্ষিপ্ত হলেন।
রশীদ এরপরও শান্ত ভঙ্গিতে বললেন “বেশ কিছুদিন আগে একটা চিঠি এসেছিল রাতে, সেখানে আমাকে সতর্ক করা হয়েছিল, যাকে আমরা ভরসা করি সে-ই আমাদের শেষ করে ফেলবে।নিশ্চয়ই যিনি চিঠি পাঠিয়েছেন উনি সুফিয়ান এর কথাই বলেছিলেন। সুফিয়ান আমার বংশ নির্বংশ করে ফেলেছে। কতটা সাংঘা’তিক।”
“হুঁ।প্রথম থেকেই আমার সন্দেহ ছিল ওর উপর।ও সাধারণ কেউ ছিল না! আগেই বলেছিলাম।এখন সত্যি হল তো”
রশীদ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে আবার বললেন “সুফিয়ান এর জায়গায় অন্যকেউ থাকলে হয়ত সেও প্রতি’শোধ নিতে চাইত। কিন্তু তাই বলে নিরপরাধ, নিষ্পাপ মেয়েটিকে মে’রে ফেলবে, ওর ইজ্জত..।” রশীদ বলতে পারলেন না সম্পুর্ন কথা। কেঁদে ফেললেন। একজন বাবা হয়ে মেয়ের এত বড় ক্ষতি- সহ্য করার মত নয়।
জেবুন্নেছা বললেন “এখন দুঃখ পেয়ে আর কি হবে! কিছু করার নেই আর।”
“আমি যাব সিন্ধুতলি গ্রামে।” রশীদ বেশ গম্ভীর গলায় বললেন।
জেবুন্নেছা বললেন “কেন?
“সুফিয়ান আমার মেয়েকে কেন মে’রেছে জিজ্ঞেস করব।ও কি ক্ষতি করেছে ওর? জানতে চাইব। আমার প্রশ্নের উত্তর ওর দিতে হবে।”
জেবুন্নেছা এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল “ওর উদ্দেশ্যই ছিল আমাদের বংশ নির্বংশ করার। অবশেষে তা সফল হয়েছে। গিয়ে দেখ,ও এখন বেশ আনন্দে আছে।হয়ত উল্লাসে ব্যস্ত।”
রশীদ পুরোপুরি রেগে গেলেন।বসা থেকে অবশেষে উঠে দাঁড়ালেন। সাথে অনুচরগনও উঠে দাঁড়াল। রশীদ ছড়ি ঠুকে ঠুকে পায়চারি করতে করতে বলল “ও ফারদিনাকে ভালো না বেসে ভালোবাসার অভিনয় করেছে, আমার মেয়েকে ব্যবহার করেছে। এরপর নিজ হাতে মে’রেও ফেলেছে!বড্ড অন্যায় করেছে ও।এর শেষ দেখে ছাড়বো।”
তালুকদার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানের দিকে রশীদ গেলেন।সেদিন সুফিয়ান সবাইকে মে’রে ফেলার পর কুদ্দুস কিছু গ্রামবাসীদের নিয়ে মৃ’ত আদিব-দের শেষ বিদায়ের ব্যবস্থা করেছিল। তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেছিল।
রশীদ গেলেন কব’রের সামনে।সবার কব’র দেখলেন। তাঁর আদরের চার সন্তান শুয়ে আছে মাটির ঘরে। কষ্ট হচ্ছে।নিজের সন্তান যত পাপী হোক দিনশেষে মা বাবার কাছে তাঁরা নিষ্পাপ। রশীদ এর কাছেও তেমনি তাঁর চার সন্তান নিষ্পাপ।ঠোঁটটা কেঁপে উঠল রশীদ এর। তরতর করে কাঁপছে।
জেবুন্নেছা চোখের জল মুছে বললেন “এখান থেকে চল,যত ওদের ক’বর দেখবি তত খারাপ লাগবে। কষ্ট বাড়বে।”
রশীদ বললেন “ওরা পাপ করেছে, আমাকে বললে আমি শা’স্তি দিতাম। চিরকাল না হয় অন্ধকার বন্দিশালায় বন্দি করে রাখতাম।তবু কেন অন্যর হাতে আমার সন্তানেরা প্রাণ হারাল।”
জেবুন্নেছা কব’রস্থান থেকে রশীদ কে ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসেন।উঠোনে চেয়ারে বসালেন।
রশীদ জল চাইলেন।গলাটা তাঁর শুকিয়ে গেছে। জেবুন্নেছা একজন দাসীকে ডেকে জল চাইল।
দাসী জল নিয়ে আসলে রশীদ ঢকঢক করে খেয়ে ফেললেন। এরপর শ্বাস ফেলে বললেন “আমি এখুনি যাব সিন্ধুতলি। সুফিয়ান কে শুধু একটা প্রশ্ন করব।ব্যস। এরপর আমিও ওর কাছে মাফ চেয়ে আসব।আমি..আমি যাব ওর কাছে।” রশীদ হঠাৎ করে নরম হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ আগের ক্রোধের ছোঁয়ার কন্ঠ নিমিষেই মিশিয়ে গেল। কিন্তু তাঁর রাগ নরম হওয়ার বিষয়টি জেবুন্নেছার ভালো লাগল না। আপাতত সে আর কিছু বলল না।
আজ সিন্ধুতলির ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই যেন গ্রামটা জেগে উঠেছে।এমন জাগরণ সাধারণ দিনের নয়। বাতাসে আজ অন্যরকম একটি গন্ধ, কাঁচা রোদ আর রজনীগন্ধার মিশেলে যে গন্ধ জন্মায়, সেটাই ভাসছে চারদিক জুড়ে। মাঠের ঘাসে শিশির জমে ঝরঝর করছে, পুকুরের জলে আলোর চিকচিক।দূরে তালগাছের ফাঁক দিয়ে উঠতে থাকা সূর্যটাও আজ যেন একটু বেশিই উজ্জ্বল।
পুরো গ্রাম জুড়ে আনন্দের ঢেউ। কাঁচা মাটির রাস্তা ধরে হাঁটলে শোনা যায় হাসির শব্দ। হায়দার বাড়ির উঠোনে ব্যস্ততার ছায়া।কেউ ভেজেছে চাল ধুয়ে, কেউ হাঁড়ি চড়িয়েছে চুলায়।আজ কারও মুখেই ক্লান্তি নেই, সবার চোখে একরাশ প্রত্যাশা।যেন এই দিনটা সবার নিজের।
গ্রামের শিশুদের উল্লাস আলাদা। কেউ নতুন জামা পরে দৌড়চ্ছে, কেউ হাতে রঙিন কাগজের পতাকা,কেউ বাঁশের তৈরি খেলনা নিয়ে চিৎকার করছে,
“আজ সরদার-এর জন্মদিন!”
এই বাক্যটাই যেন আজকের দিনের মন্ত্র। বারবার উচ্চারিত হয়েও তাতে বিন্দুমাত্র জীর্ণতা নেই, বরং প্রতিবার নতুন করে উদযাপনের শিহরণ জাগায়।
হায়দার বাড়ি-আজ সে এক আলোকমালায় মোড়া স্বপ্নের ঘর।ইটের মোড়া দেয়ালে রোদ পড়ে সোনালি হয়ে উঠেছে।বাগান বাড়ির ছোট্ট গাছে গাছে ঝুলছে নকশা করা কাপড়, রঙিন কাগজের ফেস্টুন বাতাসে দুলে দুলে আনাগোনা করছে। উঠোনের মাঝখানে বিশাল আমগাছটাকে আজ ফুল আর আলোয় সাজানো হয়েছে,যেন সে নিজেই উৎসবের প্রহরী।
ঘরের ভেতরটা আরও ব্যস্ত।সেখানেও রান্নার আয়োজন করা হয়েছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে মশলার উষ্ণ গন্ধ—এমন গন্ধ, যা ক্ষুধার আগে স্মৃতিকে জাগায়। পুরনো পদপ্রণালির হাঁড়িতে ফুটছে মাংস, আলাদা চুলায় দুধ জ্বাল হচ্ছে মিষ্টির জন্য।পাশে দাঁড়িয়ে দাসী বারবার ঢাকনা তুলে দেখে নিচ্ছে, ঠিকঠাক হচ্ছে তো? এই ব্যস্ততার মাঝেও হাসি থেমে নেই,কথার ফাঁকে ফাঁকে জন্ম নিচ্ছে গল্প। আজকের জন্মদিনে, পুরনো দুঃখ-সুখ, আর সরদার-এর জীবনের নানান অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করছে সকলে। আজকের দিনে সুফিয়ান গ্রামের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে। ভালোমন্দ খাওয়ানোর জন্য।দিনটি বিশেষ দিন হিসেবে স্মৃতি করে তুলে।
হায়দার বাড়ির নারীকণ্ঠে আজ অন্যরকম সুর। গানের মতো কথাবার্তা, খিলখিল হাসি,কখনো-কখনো আবেগে ভিজে যাওয়া চোখ। কারণ সরদার শুধু একজন মানুষ নন,সে এই বাড়ির শিরদাঁড়া, এই গ্রামের নির্ভরতা। যাঁর কাঁধে ভর করে কত মানুষ সাহস পেয়েছে, যাঁর একটুখানি কথা বহু অন্ধকার রাতে আলো জ্বালিয়েছে। ব্রিটিশদের মত বাহিনীর হাত থেকে নিজের গ্রামকে রক্ষা করেছে।
দুপুর গড়ালে অতিথিদের আসা শুরু হয়। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ গরুর গাড়িতে, কেউ বা দূরের গ্রাম থেকে ঘোড়ায় চড়ে। প্রত্যেকের হাতে ছোট-বড় উপহার।কিছুটা আনুষ্ঠানিক, বেশিরভাগ-টাই আন্তরিক। উঠোনে পা পড়তেই সবাই একবার থমকে দাঁড়ায়।যেন, এই আনন্দের পরিসরটাকে সম্মান জানায়। তারপর হাসি, কোলাকুলি, শুভেচ্ছার উষ্ণতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
সুফিয়ান নিজে আজ অদ্ভুতভাবে শান্ত। মুখে অল্প হাসি, চোখে গভীর ক্লান্তি।সে চারপাশটা দেখছে।এই মানুষগুলো, এই গ্রাম, এই বাড়ি সব মিলিয়ে জীবনের এক বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি করছে যেন।জন্মদিনের আনন্দ তাঁর জন্য বাহারি আয়োজনের চেয়ে অনেক বড় এটি সম্পর্কের উৎসব, বিশ্বাসের উৎসব।
বিকেলের দিকে গ্রামের ময়দানে বসে যায় ছোটখাটো বৈঠক। বয়োজ্যেষ্ঠরা এক পাশে, তরুণেরা আরেক পাশে। গল্প চলে-খেতের ফসল, আসন্ন বর্ষা, দূর শহরের খবর। কোথাও তর্ক, কোথাও মতের মিল, কিন্তু সবকিছুর মধ্যেই আছে এক আশ্চর্য সুর।আজ কেউ কারও বিরুদ্ধে নয়। আজ সব পথ এসে মিশেছে সরদার-এর জন্মদিনের আনন্দে।
সূর্য ঢলে পড়লে আলো জ্বলে ওঠে। মশাল, কুপির আলো,ঘরে ঘরে দীপের সারিতে গ্রামটা যেন ছোট্ট নক্ষত্রপুঞ্জ। সে-ই আলোয় মুখগুলো নরম দেখায়, হাসিগুলো আরও উষ্ণ লাগে।হায়দার বাড়ির উঠোনে এখন সন্ধ্যার নাস্তার আয়োজন। কলাপাতায় সাজানো খাবার, ধোঁয়া ওঠা পিঠা, আর চারদিকে প্রশান্তির গুঞ্জন।
নাস্তা শেষ হলে গান শুরু করে। কেউ বাঁশি তোলে, কেউ ঢোলক বাজায়, কেউ গলা খুলে গেয়ে ওঠে পুরনো গান। আকাশটা মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছে, যেন এই আনন্দকে নিজের আলো দিয়ে আশীর্বাদ করতে চায়।
জন্মদিন এর পুরো আয়োজন জাঁকজমকে পূর্ণ। আছে প্রাচুর্য।আছে মহিমা। কারণ আজকের আনন্দ মানুষে মানুষে বাঁধা।মাটির মতো সহজ, নদীর মতো উদার। সুফিয়ান প্রতি জন্মদিনে বেশ সময় নিয়ে বক্তব্য রাখে।আজও রাখবে।এখনো সমস্ত গ্রামবাসীরা এসে পৌঁছায়নি। বিন্তি ওর উপহার এখনো হাজির করেনি। সুফিয়ান এতটুকু পরিপাটি হয়ে নতুন করে সাজেনি।সময় হয়নি। বিন্তি উপহার নিয়ে আসবে।ঠিক সে-ই সময়ের অপেক্ষা করছে সুফিয়ান।
শত আনন্দ আজ।অথচ সুফিয়ান উদ্ভ্রান্ত পথিক এর মত নিজের ঘরের বারান্দা থেকে ফারদিনার কব’রটি দেখছে।আজ ফারদিনা বেঁচে থাকলে বোধহয় সেও কোন না কোন উপহার নিয়ে হাজির হত। নিশ্চয়ই নতুন রুপে প্রেম নিবেদন করত,নয়ত সুফিয়ান এর করতে হত। নতুন কোন বাহানা তৈরি করত।সে-ই বাহানায় মিশে থাকত কত কত ভালোবাসা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। চেয়ারে নীরবে বসে।একটা সিগারেট হাতে তুলে নিয়েছিল।ধরায়নি।এশার আযান পরবে এখুনি। সুফিয়ান মসজিদে নামাজ আদায় করবে ভেবে মনস্থির করল।
তাঁর ঘরে বিন্তি উপস্থিত হল। সুফিয়ান এর আলমারি থেকে কালো রঙের পাঞ্জাবি বের করে। সুফিয়ান বিন্তি কে কাছে ডেকে বলল “এই রঙের পাঞ্জাবি বের করলি!”
“আজকে তুমি এই রঙের পাঞ্জাবিই পড়বে। তোমাকে কালো রঙে সুন্দর দেখায়। পড়বে তো!”
“না।সাদা রঙের পাঞ্জাবি পড়ব।মা সবসময় বলতেন আমাকে সাদা রঙের পাঞ্জাবিতে বেশি সুন্দর দেখায়। তাছাড়া সাদা পাঞ্জাবি পড়া সুন্নত।এখন বের হবে মসজিদ এর উদ্দেশ্যে।”
বিন্তি সুফিয়ান এর পরিবর্তনে খুশি হল। সুফিয়ান এর দিকে আর একটু এগিয়ে গেল।বলল “ভাই, তুমি নামাজ পড়বে!”
“এতে অবাক হওয়ার কি আছে! ধর্ম কর্ম পালন করতে হবে তো নাকি। মা বাবার জন্য দোয়া করতে হবে। মা বাবা দুনিয়া থেকে চলে গেলে তাদের জন্য সন্তানের দোয়া দরকার হয়।আমিও আজ থেকে মা বাবার জন্য দোয়া করব। নিজের পাপের জন্য ক্ষমা চাইব। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন।উনি যে অতি দয়াশীল।”
বিন্তি আনন্দের সাথে হেসে ফেলল। মুখে হাঁসি চোখে ছলছল জল নিয়ে বলল “আজ আমি বিশেষ কিছু উপহার পেলাম। তোমার পরিবর্তন। আনন্দ হচ্ছে। তুমি যেভাবে খুশি দুনিয়ার বুকে বেঁচে থাকো।আমি কখনো বলব না ফারদিনাকে ভুলে অন্য কারো সাথে নতুন জীবন শুরু করো। গতকাল এর জন্য দুঃখিত ভাই।”
সুফিয়ান ঠোঁট কুঁচকে হাসল।চেয়ার থেকে উঠে ঘরের ভেতরে এল।দু হাত পেছনে রেখে ধীর পায়ে পায়চারি করতে করতে বলল “হুঁ।বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছি।যদি আত্মহ’ত্যা করি তাহলে পরপারে ফারদিনাকে পাওয়ার আশা এতটুকু থাকবে না।” থেমে সুফিয়ান গভীর নিঃশ্বাস এর সাথে আবার বলল “ওকে আমি হালাল ভাবে নিজের করে নিতে পারিনি।তবু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে উনি নিশ্চয়ই আমার প্রার্থনা ফেলবেন না।ফারদিনাকে পরপারে পেলেও পেতে পারি। অন্তত এই সুযোগটা হাত ছাড়া করতে চাচ্ছি না।”
“তুমি পাবে ভাই।ফারদিনাকে পরপারে পাবে। দোয়া অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে। তুমি নিরাশ হয়ো না।বাসি পোশাক বদলে নতুন সাদা রঙের পাঞ্জাবি পাজামা পড়ে নাও।এরপর মসজিদে যাও।আযানের সুর ভেসে আসছে।”
বিন্তি হাত থেকে কালো রঙের পাঞ্জাবি রেখে দেয়।পরিবর্তে সাদা রঙের পাঞ্জাবি পাজামা বের করে।সুফিয়ান বলল “তোর বিয়ে হয়েছে, শশুর বাড়ি যেতে হবে।মেয়েদের বিয়ের পর শশুর বাড়ি হয় স্থায়ী ঠিকানা।আমিও তোকে সেখানেই দেখতে চাই। আমার বোন সুখে সংসার করবে।”
বিন্তি হঠাৎ করে স্থির হয়ে গেল।হাত দুটো আলমারি থেকে সরিয়ে নীরবে সুফিয়ান এর দিকে ঘুরে তাকাল।বলল “তুমি কি করে ভাবলে তোমাকে এই অবস্থায় আমি ফেলে রেখে যাব? তোমার খেয়াল কে রাখবে? তোমার যত্ন কে করবে?আমি তোমাকে এখানে ফেলে সুখে সংসার করব!ভাবলে কিভাবে!” থেমে বিন্তি সুফিয়ান এর সামনে এসে সামনে দাঁড়ায়। “যতদিন আমি বেঁচে আছি ততদিন তোমার কাছেই থাকব। বিয়ে তো আমি করতে চাইনি। তুমিই জোর করেছিলে।”
সুফিয়ান বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল “তোর জামাই কে আমাকে খারাপ ভাববে। বলবে, বোনকে বিয়ে দিয়ে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে।”
তাৎক্ষণিক সুফিয়ান এর পেছন থেকে জাভেদ এর কন্ঠ ভেসে আসে। “ছিঃ ভাই, আপনি কিভাবে ভাবলেন আপনাকে নিয়ে কখনো আমি অভিযোগ করব!” জাভেদ চৌধুরী। বিন্তিকে একবার এক মেলায় দেখে পছন্দ করেছিল। হায়দার বংশের মেয়ে বলে সরাসরি প্রেম নিবেদন করতে সাহস করেনি। কিন্তু তাঁর ভালোবাসা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে সুফিয়ান এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। সুফিয়ান তখন জাভেদ কে প্রত্যাখ্যান করে।এর পেছনে একটা কারণ ছিল। জাভেদ কে দেখে সুফিয়ান এর পছন্দ হয়েছিল। তাঁর ভাবসাব ছিল সাহেব এর মত। কখনো দেখাত একজন যোদ্ধার মত। সুফিয়ান খাস লোক লাগিয়ে ছিল জাভেদ এর পেছনে। তাঁর আচার-আচরণ, চরিত্র, এবং বংশের অন্যরা কেমন সবকিছু সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করার জন্য।যখন তাঁর বোনের জন্য উপযুক্ত পাত্র হিসেবে যোগ্য মনে হল তখন সুফিয়ান নিজেই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়।
জাভেদ এসে সুফিয়ান এর সাথে হাতে হাত মিলায়। সুফিয়ান বলল “তুমি কখন এলে?
“মাত্রই এসেছি। তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে উপরে চলে আসলাম।”
“তোমার বউকে আমি আটকে রেখেছি। তুমি চাইলে শিগগিরই নিয়ে যেতে পারো।আমি আমাকে সামলে থাকতে পারব, আমার খেয়াল আমি রাখতে পারব।”
জাভেদ বলল “না ভাই। আপনার এই অবস্থায় আপনাকে একা করে ওকে দূরে নেব না। দরকার হয় আমিও এখানে এসে কিছুদিন পরপর থেকে যাব। বিন্তি আপনাকে অনেক ভালোবাসে।বিয়ের দিন নিয়ে গিয়েছিলাম তো,সেদিন সারারাত আমাকে ঘুমাতে দেয়নি।। শুধু আপনার জন্য কান্নাকাটি করেছে। বাচ্চাদের মতন।” শুনে সুফিয়ান হেসে উঠল। সে-ই সাথে জাভেদ- বিন্তিও হাসল।
সুফিয়ান বলল “তোমরা কথা বলো,আমি আসছি।” বলে সুফিয়ান পাঞ্জাবি পাজামা নিয়ে আলাদা ঘরে চলে গেল। পরনের পোশাক বদলে নতুন পাঞ্জাবি পড়ে মসজিদ এর উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
বিন্তি সুফিয়ান এর ঘর ছেড়ে যেতেই জাভেদ টেনে নিজের দিকে নিল ওকে। বিন্তির শাড়ির আঁচলটা মাথায় তুলে দিয়ে বলল “ভাইয়ের আদরের বোন, ভাইকে ছাড়া থাকতেই পারবে না,তা আমি তোমাকে ছাড়া কিভাবে থাকব শুনি?”
বিন্তি লজ্জায় লাল হয়ে বলল “তুমিও এখানে এসে থাকো। আমি তুমি ভাই, দরকার হয় তোমার আম্মু আব্বুকেও এখানে নিয়ে আসো।আমরা সবাই মিলে একসাথে থাকব।”
“তারপরও তুমি আমার সাথে যাবে না।”
বিন্তি কিছু ভেবে বলল “তাহলে সাথে ভাই কে নিয়ে যাব।”
জাভেদ কপাল ভাঁজ করে বলল “আমিত তোমাকে নিয়ে দেশের বাইরে চলে যেতে চাই,কারণ আমার ব্যবসা সেখানে।”
“তাহলে আমি সেখানেও ভাইকে নিয়ে যাব”
জাভেদ এবার দুই কোমরে হাত দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বলল “তোমার কোথাও যেতে হবে না। শুধু আজকে রাতটা অন্তত আমাকে দিও।”
বিন্তি লম্বা সুরে বলল “আজকের রাত!”
“এমন ভাবে বললে যেন সারাজীবন চেয়েছি।”
“একটা রাত অনেক সময়।আমি এত সময় তোমার সাথে থাকলে ভাইয়ের খোঁজ তো নিতে পারব না।ভাই যদি কিছু করে বসে।”
জাভেদ যেন ক্লান্ত হয়ে গেল ভাইয়ের কথা শুনতে শুনতে। ঢং করে দরজার দিকে দেখিয়ে বলল “ওদিকে দরজা।যান আপনি আপনার কাজ করুন।”
বিন্তি চাপা স্বরে হেসে ধন্যবাদ বলে চলে যায়। জাভেদ উপর দিক চেয়ে একা একা বলল ‘আল্লাহ এই ভাই বোনের চক্কর থেকে আমাকে রক্ষা করিও।” জাভেদ এর কথাগুলো বিন্তি আড়ালে থেকে শুনছিল। এরপর আওয়াজ করে হেসে চলে যায় রান্নাঘরে।
সুফিয়ান ঘরের বাইরে এসে রাঙার সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটাল। চারদিকে অতিথি। তাঁদের নজর এড়িয়ে সে রাঙাকে রেখে মসজিদ এর উদ্দেশ্যে হাঁটে। মাথায় সাদা রঙের রুমাল বাঁধা। তাঁকে দূর থেকে সোলেমান দেখছিল।ও বসে বসে পিঠা খাচ্ছিল।
হায়দার বাড়ির উত্তরে মসজিদ। সুফিয়ান সেদিকে হাঁটে।যেতে যেতে পথে দেখা মেলে হেলেনার। হেলেনা সুফিয়ান কে দাঁড় করিয়ে দেয়। সুফিয়ান প্রথমে দাঁড়াতে চাইল না।হেলেনা জোর করল। সুফিয়ান বাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।বলল “দাঁড় করালে কেন?
“ আমি আপনার সমন্ধে সবকিছু জানি।আপনি আলিমনগর এর একটা মেয়েকে ভালোবাসতেন, তাঁকে নিজ হাতে মেরে ফেলেছেন, সবকিছু জানি। আপনি কি জানেন, আপনার জন্য আমিও আলিমনগর ছিলাম! ছদ্মবেশে দূর থেকে দেখতাম।”
এতটুকু বলে থেমে হেলেনা আবার বলল “ আপনি কি সে-ই একচোখা ব্যক্তিকে চিনেন!যে আদিবদের হয়ে কাজ করত! নিশ্চয়ই চিনেন।উনি কিন্তু আমার খাস লোক ছিলেন।যিনি আমার অনুপস্থিতিতে আপনার উপর নজর রাখতেন।এক কথায় আপনার খেয়াল রাখতেন।কেননা,আদিব ওঁরা আপনাকে অনেকবার কুসংস্কার মেনে বাঘের খাদ্য বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। শুধুমাত্র ঐ একচোখা ব্যক্তির জন্য।উনি আপনার নামে মিথ্যা কথা বলতো ওঁদের কাছে, আপনার সমস্যা আছে, আপনি নিখুঁত নন, আপনি একমাত্র ছেলে নন, ইত্যাদি।”
সুফিয়ান কিছুটা অবাক হল। এরপর বলল “কিন্তু, এসব এখন বলে কি হবে!এখন আর এসব বলতে চাই না।আর তুমিও আমাকে ভুলে যাও।” বলে সুফিয়ান যেতেই ফের দাঁড়িয়ে বলল “তোমার বাবা তাহলে ওদিন মিথ্যা কেন বলেছেন,যে তুমি তোমার ফুফু বাড়ি ছিলে!
“বাবা চাননা আপনি সত্যটা জানুন।যে আমি আপনাকে ভালোবাসি।এখন তো আপনি সত্যটা জেনেই গেলেন। কিন্তু আপনি হয়ত ভাবছেন আমি হয়ত আপনার ভালোবাসা ভিক্ষা চাইতে এসেছি,আসলে তা নয়,আমি জানতে চাই সে-ই একচোখা ব্যক্তি কোথায়? আপনি কি উনাকে মে’রে ফেলেছেন?
সুফিয়ান আশ্চর্য হল। “মানে, আমি কেন উনাকে মারব!আর সে কোথায় আমি জানব কি করে?
“আপনি শেষ উনাকে যেদিন দেখেছেন তারপর থেকে আর উনার খোঁজ পাইনি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আদিব ওরাও সেদিন অপেক্ষায় ছিল উনার। কিন্তু উনি আর তাঁদের কাছে ফিরেননি।”
সুফিয়ান চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল “আমি এসব সম্পর্কে কিছুই জানি না। কিন্তু কোথায় যাবেন উনি! বিষয়টি আশ্চর্যজনক।” বলে থেমে গেল সুফিয়ান। হেলেনা জানে সুফিয়ান কোন বিষয় মিথ্যা বলবে না।সে এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে সুফিয়ান কে জন্মদিন এর শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে যায়। সুফিয়ান আর কিছু বলল না। শুধু ভাবল একচোখা ব্যক্তি কোথায়?
মসজিদের সামনে পুকুর। সুফিয়ান পুকুর থেকে ওযু সেরে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ল।চোখের জল মিশিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে নামাজ শেষ করে। শেষ মোনাজাতে এসে সমস্ত পাপের অনুশোচনায় কেঁদে উঠল।মন ভাসিয়ে আল্লাহর নিকট কাঁদল।মন থেকে ক্ষমা চাইল।ফারদিনার হয়ে ক্ষমা চাইল। নিজের মা বাবার জন্য দোয়া করল।
মৌলভী এসে সুফিয়ান এর পাশে বসলেন।সুফিয়ান মোনাজাত শেষ করল।মৌলভী বললেন “তোমার আজকের পরিবর্তন বেশ ভালো লেগেছে।অতিত ভুলে নতুন একটি জীবন শুধুমাত্র আল্লাহকে ঘিরে শুরু করো।” বলে উনি মসজিদ থেকে বেরিয়ে যান। সুফিয়ানও বেরিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
রাত বাড়ছে। সমস্ত অতিথিবৃন্দ এসে উপস্থিত হয়েছে। সুফিয়ান ফারদিনার কবরের দিকে গেল।একই সঙ্গে সবার কব’র জিয়ারত করল।জিয়ারত শেষে একাকী বলল “আমার না হওয়া প্রেয়সী’ তোমাকে ভালোবেসেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেব। তুমিহীনা বেঁচে থাকতে আমার কষ্ট হবে,সত্যি! ভীষণ যন্ত্রণা সহ্য করতে আমার।তবু থেকে যেতে চাই পরপারে তোমাকে পাওয়ার লোভে।জানো, আজকের দিনটা আমার জন্য বিশেষ একটি দিন, কখনো ভাবিনি তোমাকে পাওয়ার জন্য নতুন একটি রাস্তা পাব। আত্ম’হত্যা করব ভেবে নিশ্চিত ছিলাম। সে-ই ভাবনা থেকে আল্লাহ সুচিন্তা জড়িত করলেন।এখন মনে হচ্ছে আমি হয়ত তোমাকে পাব।একালে আর না, পরকালে।পরকালে কোন এক শিমুল গাছের তলায় বসে মুগ্ধকর বাঁশি বাজাব তোমার উদ্দেশ্যে -আর সে-ই বাঁশির সুরে তুমি ছুটে আসবে। বাঁশিওয়ালা বাঁশিওয়ালা বলে সারাদিন আমাকে বিরক্ত করবে। ভাবতেই কেমন এক আনন্দ অনুভূতি হচ্ছে।আরো ভেবে আনন্দ হচ্ছে -পরকালে আর কেউ আমার থেকে তোমাকে দূরে সরাতে পারবে না। বিচ্ছেদ হবে না আমাদের।জানো,আজ আল্লাহর কাছে প্রার্থনায় কি চেয়েছি? পরপারে যদি আমার জীবন সঙ্গী হিসেবে তোমাকে আমার করে দেন, তবেই যেন সঙ্গী হিসেবে একমাত্র তোমাকেই দেন। তোমার মত অন্য কাউকে যেন আমাকে না দেন। দরকার হয় তখনো একাকী কাটাব।তবু তোমার জায়গায় অন্য কাউকে চাই না।চাইব না।”
সুফিয়ান থেমে চোখের জল মুছল। আবার বলল “পরকালের সে-ই দিনটি না আসা পর্যন্ত তোমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে,যতদিন বেঁচে আছি ততদিন, মৃ’ত্যুর পর যতদিন হাশর না আসে ততদিন পর্যন্ত শুধু অপেক্ষা।”
‘সুফিয়ান ভাই’ বদরুর কন্ঠ।সুফিয়ান ঘুরে তাকাল।
বদরু বলল “চলুন!সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
সুফিয়ান চোখ মুছে ফারদিনার কব’রটির দিকে তাকিয়ে চলে গেল বদরুর সাথে।
উঠোনে সবাই গোলাকার হয়ে বসে আছে। চারদিক মশাল,লণ্ঠন এর আলোয় বেশ আলোকিত। বিন্তি সুফিয়ান এর হাত ধরে সবার মাঝে নিল।জাভেদ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে দুই ভাই বোন এর দিকে তাকিয়ে আছে।সুফিয়ান মৃদু আলোয় চারপাশ দেখে বলল “খুব সুন্দর সাজিয়েছিস।তুই আমাকে বিশেষ কিছু উপহার দিবি বলেছিলিস।কই সে বিশেষ উপহার?”
বিন্তি বলল “আন্দাজ করোতো!”
সুফিয়ান ভেবে বলল “বাঁশি!”
বিন্তি না সূচক মাথা নেড়ে বলল “হয়নি। আজকের সেই বিশেষ উপহারটি তুমি পেলে হয়ত অর্ধেক কষ্টই তোমার দূর হয়ে যাবে।”
“তাহলে অপেক্ষা কিসের? দিয়ে দে!”
‘না। তুমি প্রতি জন্মদিনে কিছু বক্তব্য রাখো।আজ রাখবে না?”
সুফিয়ান লম্বা শ্বাস ফেলে বলল “আজ আর নতুন করে গ্রামের ভালো মন্দ সম্পর্কে বলব না।আজ আমি কিছু সত্য বলব।যে সত্য আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। আজকের দিনে সে-ই সত্য সবাইকে জানাতে চাই।”
বিন্তি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকাল সুফিয়ান এর দিকে।কোন সত্যর কথা বলছে সুফিয়ান? তা-ও আজকের দিনে! বিন্তি সুফিয়ান এর চোখের দিকে হঠাৎ জমা আতঙ্ক নিয়ে বলল “কি সেই সত্য?
সুফিয়ান কাঁশি দিয়ে বলল “বলছি। তাঁর আগে আমাকে একটু জল খাওয়া।খুব জল তেষ্টা পেয়েছে।”
বিন্তি ঘর থেকে জল নিয়ে আসে। সুফিয়ান বিন্তির হাত থেকে জলের গ্লাস টা নিতেই ঢাম করে এক শব্দ এসে গ্লাসে একটা গুলি লাগল। গ্লাসটি ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়। সুফিয়ান গুলি কোথা থেকে আসল দেখতে,ঘুরে তাকাতেই দ্বিতীয় আর একটি গুলি এসে ঠিক তাঁর বুকের বাঁ পাশে বিদ্ধ হয়। সুফিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর একটি গুলি এসে বুকের মাঝ বরাবর বিদ্ধ হল তাঁর।সে তাৎক্ষণিক মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। বিন্তি বুক চিরে চিৎকার দিয়ে উঠে সুফিয়ান কে ধরার চেষ্টা করল। জাভেদ দৌড়ে আসল। সুফিয়ান এর মুখ থেকে রক্ত গড়গড় করে বেড়োতে শুরু করল। বিন্তি ওঁর কোলের উপর সুফিয়ান এর মাথাটা নিল। সুফিয়ান ঘুরে দেখতে চাইল তাঁর দিকে গুলি কে ছুঁড়ল?গ্রাম বাসীদের ছোটাছুটির জন্য পরিষ্কার কাউকে দেখা গেল না। তাঁর চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হতে শুরু করল।তখন তাঁর সামনে উপস্থিত হয় রশীদ তালুকদার হাতে রাই’ফেল নিয়ে।সাথে জেবুন্নেছা। রশীদ রাইফেল মাটিতে ঠুকে বললেন
“আমার বংশ নির্বংশ করে তুই এখানে বসে উল্লাস করছিস! আমার মেয়ের সাথে প্রেমের মিথ্যা নাটক করে তুই আনন্দ করছিস, বাহ্!তোর মতন পাপী এই দুনিয়াতে থাকার যোগ্য না।”
সুফিয়ান ধীর ধীরে নেতিয়ে গেল।তবু অস্পষ্ট কন্ঠে বিড়বিড় করে বলল “আমাকে গুলি বিদ্ধ করে মেরে ফেলার দরকার ছিল না। অনেক আগেই আমি মরে গেছিলাম। আমার ভেতরের কষ্টটা আপনি দেখলে আর মারতেন না আমাকে।”
বদরু ওঁরা ছুটে এসে সুফিয়ান এর চারপাশে বসে।ভাই ভাই বলে চেঁচাতে থাকে।আজ যেন আর তাদের সুফিয়ান ভাই সে-ই পুরানো দিনের মত সাড়া দিচ্ছে না।
বিন্তি সুফিয়ান গাল স্পর্শ করে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাঁপা গলায় বলছে “ভাই,এই ভাই,চোখ মেলে তাকাও,ভাই, কিছু বলো ভাই! জাভেদ আমার ভাইকে বাঁচাও।ভাই”
ওঁর ডাক সুফিয়ান এর কানে গেল। কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না।তবু খুব কষ্টে একটা শব্দ বের করল “জল” জাভেদ দৌড়ে গেল জল আনতে। মৃ’ত্যুর আগে বোধহয় মানুষের জলতেষ্টা পায়।আজ সুফিয়ান এর ভীষণ জলতেষ্টা পেয়েছে। ইচ্ছে করছে সারা দুনিয়ার জলটুকু খেয়ে ফেলতে।
বিন্তির বুকের ভেতরটা মুহূর্তে ফেটে গেল।
সুফিয়ান তার কোলে ঢলে পড়তেই সে যেন বোবা হয়ে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। চোখ দুটি বিস্ফারিত, ঠোঁট কাঁপছে,কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না। সুফিয়ান ঢলে পড়ল ওর বুকে।দেখে বিন্তি হঠাৎ করে এক অসহায় চিৎকারে ভেঙে দিল চারপাশের নিস্তব্ধতা।
“ভাই, ও ভাই,না না, চোখ বন্ধ করো না!”
ওর দুই হাত কাঁপতে কাঁপতে সুফিয়ান এর বুকের উপরটা চেপে ধরেছে,যেন হাতের চাপেই রক্তপাত থেমে যাবে, যেন এই স্পর্শেই মৃত্যু পিছিয়ে যাবে। বুকের উষ্ণতা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছে।আর সেই ঠান্ডা বিন্তির মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যাচ্ছে হিম হয়ে।
সে কাঁদছে না শুধু, আকুতি জানাচ্ছে।
কখনো আল্লাহকে, কখনো নিজের ভাগ্যকে, কখনো সেই নিষ্ঠুর মুহূর্তটাকে। “আমাকে রেখে যেও না ভাই, আমি তোমাকে ছাড়া কাকে নিয়ে বাঁচব? চোখটা মেলে তাকাও”
সুফিয়ান এর নিঃশ্বাস টুকরো টুকরো হয়ে আসছে। প্রতিটা শ্বাস যেন শেষ যুদ্ধ।বিন্তি তাঁর কপাল ধরে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিচ্ছে। গাল বেয়ে নামা অশ্রু ভাইয়ের মুখে পড়ে যাচ্ছে।
বিন্তির কান্নায় গোটা জমজমাট পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেছে।কথা বলার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলছে।মুখ থেকে শব্দ ভেঙে ভেঙে বেরোচ্ছে তার মুখ থেকে।
“ছোট্ট বেলার সেই ওয়াদার কথা মনে আছে? আমাকে না কখনো তুমি ছেড়ে যাবে না, তাহলে আজ কেন সাড়া দিচ্ছ না ভাই।”
জাভেদ জল নিয়ে আসল। সুফিয়ান কে জলটুকু দিতেই সে একটা হেঁচকি তুলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। বিন্তির কোলেই ঢলে পড়ে।বিন্তি ভাই বলে হৃদয় ভেঙ্গে এক ডাক তুলল।
চারপাশের মানুষ,সময় সব যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।এই মুহূর্তে শুধু এই দুটি মানুষ, আর একটি জীবন। ভাইয়ের শেষ নিঃশ্বাস টুকু যেন ধীরে ধীরে ছিটকে যাচ্ছে বোনের আঁচল ফুঁড়ে।
বিন্তি বুঝে গেছে।এই কান্না আর বাঁচানোর নয়।
এই কান্না বিদায়ের।ভাইয়ের মাথা বুকে চেপে ধরে বিন্তি আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠল
“আল্লাহ,ভাইকে নিয়ে নিলে আমাকেও নিয়ে নাও,আমিও আর বাঁচতে চাই না”
কুদ্দুস দৌড়ে দৌড়ে এসে থামে সুফিয়ান এর মৃত দেহের পাশে।ধাপ করে মাটিতে হাঁটু গেঁথে বসে পড়ে। বিন্তি রশীদ এর দিকে তাকিয়ে বলল “আপনি আমার ভাইকে মারলেন কেন? আমার ভাই ফারদিনার সাথে বেইমানি করেনি, আপনার ছেলেরা বাধ্য করেছিল আপনার মেয়েকে নিজ হাতে মে’রে ফেলতে। আমার ভাই তো সেদিনই মরে গিয়েছিল,যেদিন ফারদিনাকে নিজ হাতে মে’রে ফেলেছে।” কথাগুলো বলেছে স্রোতের মত বয়ে যাওয়া চোখের জলের সাথে। কুদ্দুসও কান্না করতে করতে রশীদ এর দিকে চেয়ে বলল “আমি আজ আপনাদের বাড়িতে ফিরেই জানতে পেরেছি আপনি সুফিয়ান ভাইকে হ’ত্যা করার জন্য এসেছেন।আমি তখনি সিন্ধুতলি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হই। কিন্তু কপাল আমার,আমি পারিনি সত্যটা আপনাকে জানাতে।পারিনি সুফিয়ান ভাইকে বাঁচাতে।”
জেবুন্নেছা রশীদ এর পাশ থেকে ধীরে ধীরে সরে যায়। তাঁর উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছে।সে চেয়েছিল সুফিয়ানকে যাতে রশীদ নিজের হাতে মে’রে ফেলে।কারণ সুফিয়ান জানে উনি উনার স্বামীকে নিজ হা’তে মেরে ফেলেছে। কিভাবে সুফিয়ান জেনেছে তা আজও অজানা।
রশীদ ধীরে ধীরে নিজের বলশক্তি ছেড়ে লুটিয়ে বসে পড়ে মাটিতে। নিজের সন্তানের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃ’ত্যুর প্রতিশোধ নিতে নিজের বন্ধুর ছেলেকে নিজ হাতে মেরে ফেলেছে।উনি কাঁদলেন। তবে এ কান্নায় যেন আর সুফিয়ান ফিরে আসবে না।
সোলেমান অশ্রুসিক্ত নয়নে বলছে “সুফিয়ান ভাই,কে আমাদের সঠিক পথ দেখাবে?কে আমাদের দুঃসময়ে পাশে থাকবে?কে আমাদের সাথে ক্ষেতে কাজ করবে?ভাই!”
সুফিয়ান এর শরীর পুরোপুরি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। শরীর এর সমস্ত র’ক্ত মাটিতে পড়ে মাটির রং বদলে গেছে।রাঙা অশ্বশালা বসে পা নাচিয়ে নাচিয়ে হ্রেষাধ্বনি তুলছে। বাঁধা দড়ি থেকে ছুটে আসতে চাইছে।পারছে না।ওর চোখ বেয়েও জল পড়ছে।
সুফিয়ান এর সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা রইল না।লাল হয়ে গেছে। শেষ জলটুকু অবধি খেতে পারেনি। বিন্তির কানের কাছে সুফিয়ান এর বলা শেষে বাক্যটি ভেসে উঠল। “আমাকে একটু জল এনে দে’ খুব জলতেষ্টা পেয়েছে।” শেষ তৃষ্ণা আর মেটাতে পারেনি সুফিয়ান। তাঁর আগেই সামনে মৃ’ত্যুদূত এসে হাজির হয়েছে। তাঁর শেষ ইচ্ছা যেন পূর্ন হয়েছে।খুব করে চেয়েছিল নিজের মৃ’ত্যু। নিজের বোনকে আকুতির সাথে বলেছিল ‘এমন উপায় বের করে দে,যাতে আমি দ্রুত দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারি।’
আজ তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়েছে।চলে গেছে না ফেরার দেশে। দুঃখ কষ্ট দুনিয়ার বুকে ফেলে গেছে।আর কেউ বিন্তি কে বোন বলে ডাকবে না, সোলেমান ওদের ডাকবে না, কাজের নির্দেশ দিবে না, সঠিক পথ দেখাবে না।
গ্রামবাসীরা পুনরায় এসে ভির জমিয়েছে। তাঁদের সরদার দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছে। সুফিয়ান এর নিথর দেহটা দেখে তাঁরাও কাঁদছে। তাঁদের গ্রামের নক্ষত্র হারিয়ে গেছে। ভরসা,সাহস দেয়ার মত আর কেউ বেঁচে রইল না।কেউ না।
_ একটি ভুল,একটি অন্যায়, কেড়ে নিতে পারে একাধিক জীবন। শেষ করে দিতে পারে সুখের সংসার। শেষ করে দেয় মায়ার বাঁধন।মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোন কর্ম আমাদের দিকে ধেয়ে আসলে আমরা রুখে দাঁড়াব।সাহস করে বলব – আমি এই কাজে,এই প্রস্তাবে রাজি নই, আমার জন্য ব্যতিক্রম খুঁজুন।তবু নিজের সামান্যতম জটিলতা দূর করতে কখনো অন্যর আবেগ কাজে লাগিয়ে তাঁকে ব্যবহৃত করে তাঁকে জীবন্ত অবস্থায় শেষ করতে বাধ্য করব না।সেদিন আদিব পিয়াশার সাথে জঘন্যতম কাজটি না করলে আজ সুফিয়ান এর পরিবার শেষ হত না। তাঁর মা বাবাকে হারাত না। ব্রিটিশরা সুযোগ পেয়ে সিন্ধুতলি দখল করত না। সুফিয়ান প্রতি’শোধ এর নেশায় জমিদার কন্যাকে ব্যবহার করত না।
কুসংস্কার -ছয় অক্ষরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট শব্দ। কুসংস্কার- অন্ধবিশ্বাস- করে তালুকদার বংশের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চেয়েছিল আদিব,সায়েম,আরিব, রায়ান। একেরপর পর মানুষ কে বাঘের খাদ্য করেছে।কত নিরীহ জীবন নিয়েছে।ফারদিনার রোগ প্রতিরোধ করতে নবজাতক শিশুদের প্রাণ নিয়েছে।
সুফিয়ান হায়দার ওরফে রাখাল বাঁশিওয়ালার একটি ভুলের জন্য জমিদার কন্যা হয়েছিল অন্তঃসত্ত্বা। অবৈধ সম্পর্কে- পাপের স্পর্শে বোকা ফারদিনার গর্ভে এসেছিল একটি ফুল। সে-ই ফুলটি ঘিরে তৈরি হল ভুল ধারণা তাঁর ভাইদের মধ্যে। পণ্ডিত বলেছে ‘যার সন্তান সে যদি নিজ হাতে ফারদিনাকে মে’রে ফেলে তবে তালুকদার বংশ বিস্তার লাভ করবে। আহ্হা.. অন্ধবিশ্বাস। সেদিনের সে-ই কুসংস্কার বাধ্য করে রাখাল বাঁশিওয়ালাকে !তার হাতে মারতে হয় জমিদার কন্যাকে। শেষ হয়ে যায় একসাথে দুটো জীবন।একটি ভুলে শেষ হয়ে যায় দুটি ফুল। শেষ হয় তালুকদার বংশ।আজ শেষ গেছে সুফিয়ান হায়দার। চিরবিদায় নিয়েছে দুনিয়া থেকে।আর ফিরে আসবে না রাখাল বাঁশিওয়ালা -।কত স্মৃতি ফেলে গেছে দুনিয়ার বুকে।ফেলে গেছে শখের বাঁশি।আর সুর তুলবে না বাঁশিওয়ালা।
১২৭৭ বঙ্গাব্দ পহেলা ফাল্গুন ঠিক রাত আটটা উনিশ মিনিটে সুফিয়ান হায়দার চলে গিয়েছে, তাঁর প্রাণপ্রিয় ফারদিনার কাছে। জীবনটাকে নতুন করে সাজাতে চেয়েছিল সুফিয়ান। সব ভুলে বেঁচে থাকার ক্ষুদ্র আশা করেছিল। কিন্তু ভাগ্য তাকে বেঁচে থাকতে দেয়নি। বোধহয় তাঁর আয়ু শেষ।তবু সৌভাগ্য রাখাল বাঁশিওয়ালার, শেষ মুহূর্তে আল্লাহর কাছে মাথা নত করে ক্ষমা চাইতে পেরেছিল। আল্লাহ মহান।উনি মহা পাপীকেও শেষ সময়ে একটাবার এর জন্য হলেও উনার দরবারে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ দেন।আজ সুফিয়ান কে দিয়েছে।
প্রতি’শোধ কখনো আমাদের জীবনকে সুন্দর করে তোলে না।বরং ধ্বং’স করে দেয়।যেমন ভাবে ধ্বং’স হয়েছে সুফিয়ান হায়দার এর জীবন। মানুষটা জীবনে কিছুই পেল না। না পেল বাবা মায়ের দীর্ঘ আদর স্নেহ। না পেল নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে আপন করে।
The Silent Manor part 51
বিন্তি বুকের মাঝে ভাইকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। সুফিয়ান এর মুখের র’ক্ত শুকাতে অবধি শুরু করেছে। ফিরবে না আর ওর ভাই, ভাবতেই কষ্ট হল ওর। শুধু একবার বলল _ একটি ভুল সিদ্ধান্ত সবকিছু শেষ করে দিয়েছে।_
