Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৩

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৩

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৩
নওরিন কবির তিশা

‘উইসসস, আস্তে।পাশে আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ঘুমন্ত।’——মাত্রাতিরিক্ত সতর্কতা মিশ্রিত নীলের কন্ঠ।
ইফাজ কিঞ্চিৎ বিস্মিত কণ্ঠে বলল,,——’কিন্তু ভাই?
—’শাট আপ,স্টুপিড।আর কোনো কথা নেই।
সে ফোন কাটতে যেতেই ইফাজ দ্রুত কন্ঠে বলল,,—’ভাই,ভাই,ফোন রাখবেন না প্লিজ। জালাল পার্টির লোকেরা ইদানিং বেশি বাড়াবাড়ি করছে কিছুদিন যাবত আমাদের দলের বহু লোককে নানাভাবে আহত করেছে ওরা। আলতাফ চাচার অবস্থা ভালো না।ওনার ছেলে আনিরকেও আহত করেছে ওরা। যেহেতু আপনি আজ ফিরেছেন তাই আপনাকে জানালাম।

নীল বিস্মিত কন্ঠে বলল,,—’হোয়াটস রাবিশ? এত কিছু হয়ে গিয়েছে তুই আজকে জানাচ্ছিস আমায়?
—’ইয়ে-মানে ভাই আপনাকে চাচা জানাতে বারণ দিয়েছিল।
ইফাজের কথা শোনা মাত্র মাথা দপদপ করে উঠল নীলের। তার মানে এই জন্যই ওয়ালিদ খান কিছুদিন আগে তিহুর সঙ্গে দেখা করেই ঢাকা ব্যাক করেছে। এক হাতে তিহুকে আগলে অপর হাতের কর্নিষ্ঠা আর মধ্যমা দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে কপালে ঘষতে ঘষতে, চিৎকার করতে গিয়েও নিজেকে সংবরণ করে যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে সে বলল,,—‘হোয়াট দ্যা হেল..!শাট আপ স্টুপিড ‌ফোন রাখ আ’ম কামিং!’

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বলেই ফোন কেটে দিল নীল। মাথাটা ছিড়ে যাচ্ছে। এমনিতেই দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি;তার উপর তার দলের লোকের এই শোচনীয় খবর! সবচেয়ে বড় কথা,তার বাবা কেন এসব লুকোলেন?
নীল একবার গভীর দৃষ্টিতে তিহুর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকাল। সন্ধ্যার কিছুটা পরে বাড়ি ফেরার পথে দীর্ঘ যানজটে আটকে পড়েছিল তারা। ক্লান্ততার দরুন তার বুকে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে তিহু। সে অবশ্য সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে ছিল, তবে তার নিদ্রা যখন ভীষণ গভীরে তখন নীল আস্তে আস্তে নিজের বুকের বাঁ পাশে এনে রেখেছে তাকে।

ধীরে ধীরে যানজট কমার সঙ্গে সঙ্গে অতি সন্তর্পণে গাড়িতে স্টার্ট দিল সে;বর্তমানে মন্থর গতিতে চলমান গাড়িটা। শহরের ব্যস্ত রাজপথে ট্র্যাফিকের দীর্ঘ এক সারি অতিক্রম করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেটা। মাথা ভর্তি দুশ্চিন্তার মাঝেও নীলের সম্পূর্ণ মনোযোগ পাশের মানবিটির উপর স্থির।
তার শখের বাগানের এই একমাত্র ফুলে কক্ষনো তার এই নোংরা রাজনীতির আঁচ লাগতে দেবে না সে।কিন্তু যেহেতু নির্বাচন আসন্ন তাই কোথাও নিরাপদ নয় তারা। তার উপর আলতাফ চাচার এই অবস্থা! একজন এমপির ছেলে হিসেবে সে এসব দেখে চুপ করে বসে থাকতে পারে না। তার রাজনীতিতে নামা স্রেফ একটা শখ নয়, তার একটা অঙ্গীকার আছে। তার সমর্থকদের প্রতি তার একটা দায়বদ্ধতা আছে।
ভাবতে ভাবতে গাড়ির গতি বাড়ালো সে। কিঞ্চিত দ্রুত বেগে সেটি এগিয়ে চলল সম্মুখ পানে।

ঘড়ির কাঁটায় রাত আটটা বেজে পঁয়তাল্লিশ নীলের গাড়িটা এসে থামল, ঢাকা সিটি মেডিকেলের সম্মুখে। আজ প্রায় সপ্তাহখানেক এখানে ভর্তি রয়েছেন আফজাল হোসেন। তাদের পার্টির সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর পুরাতন মানব তিনি। তার আন্তরিকতা মুখে বলে বোঝানো যাবে না। নীল দ্রুত গাড়ি থেকে নামলো। তিহুকে বাড়িতে রেখেই এখানে এসেছে সে।
গাড়ি থেকে নামতেই দেখতে পেল ইফাজ আর আদনান বাইরে অপেক্ষা করছে। তারা সালাম দিতেই উত্তর দিয়ে তাদের নিয়ে চটজলদি ভেতরে প্রবেশ করল নীল।

আজ সকালেই জ্ঞান ফিরেছে আফজাল হোসেনের। পাশে বসে আছে বিপর্যস্ত আনির। আফজাল হোসেনের একমাত্র পুত্র সে। তার অবস্থাও ভালো নয়। নীলকে দেখামাত্র আফজাল হোসেন উঠে বসার চেষ্টা করলেন। আধশোয়া হয়ে বসে ছিলেন তিনি। নীল দ্রুত পদক্ষেপে আলতাফ হোসেনের বেডের পাশে এসে দাঁড়ালো, তাঁর কপালে গভীর চিন্তার রেখা। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি এখন পুরোপুরি উপেক্ষিত।পাশে বসা বিধ্বস্ত আনিরের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে সে বুঝলো, পরিস্থিতি যতটা খারাপ ভেবেছিল, তার চেয়েও হয়তো গুরুতর।
‘আলতাফ চাচা, আপনি এভাবে উঠছেন কেন? শুয়ে থাকুন।’——নীলের কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট কর্তৃত্ব, তবে সেই সঙ্গে এক গভীর উদ্বেগ।

আফজাল হোসেন দুর্বল কণ্ঠে হাসার চেষ্টা করলেন,,—বাবা নীল, তুমি এসেছ!আসলে…!——কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি.সামান্য কথাতেই কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো।
নীল শান্ত অথচ চাপা ক্ষোভ নিয়ে বলল,,—’আপনি শান্ত হোন চাচা‌। কিন্তু আপনারা কেন ব্যাপারটা আমাকে জানালেন না, চাচা? এই দলের ভিত্তি আপনারাই। আপনাদের বিপদে আমি বিদেশ বিভুঁইয়ে আরামে থাকব, আর এদিকে আপনারা রক্ত দেবেন, এটা কী ধরনের কথা?
আফজাল হোসেনকে শান্ত করে একে একে আনিরের মুখ থেকে সমস্ত কিছু শুনলো নীল।মূলত তাদের ঢাকায় না থাকার সুযোগে কিছুদিন আগে জালাল পার্টির লোকেরা তাদের পার্টি অফিসে হামলা করে। তারপর ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া থেকে আফজাল হোসেনের এই অবস্থা। আর তাকে বাঁচাতে গিয়ে অনিরও আহত হয়েছে বেশ। সমস্ত কিছু শুনে নীলের চোখ দু’টি ইস্পাতের ন্যায় ধারালো হয়ে উঠল।
আফজাল হোসেনের সঙ্গে কিছু কথা বলেই আদনান আর ইফাজকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো সে।

রাত গভীর হয়েছে ‌কিঞ্চিৎ,তবে সদা ব্যস্ততা বিরাজমান শহরের রাজপথের ব্যস্ততা বহাল তবিয়তে চলমান।রাস্তার বাতিগুলো জ্বলছে ঝলমলিয়ে।এই আলো-আঁধারির মাঝেও আবহাওয়ায় কেমন যেন চাপা উত্তেজনা আর শীতলতা মিশ্রিত।একটা ধূসর রঙের গাড়িটি হাসপাতালের কিছুটা দূরে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে।
নীল, ইফাজ আর আদনান সেই গাড়িরই পেছনের ডিকিতে ‌হেলান দিয়ে ‌দাঁড়ানো স্থির হয়ে। মুখমণ্ডলে কোনো ক্লান্তি নেই কারও,আছে শুধু আসন্ন এক ঝড়ের পূর্বাভাস। হঠাৎ নীল চাপা স্বরে বলল,,—’তাহলে প্ল্যান ফাইনাল। আর কোনো ভুল যেন না হয়।

ইফাজ আর আদনান একসঙ্গে মাথা সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল।ইফাজ হঠাৎ পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে; নীলের সম্মুখে ধরল। তাদের জ্ঞান সীমানা অনুসারে ক্লান্ততার দরুন আজ ধূমপান প্রয়োজন নীলের।
তবে তাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকে মিথ্যা প্রমাণিত করে নীল বলল,,—’আই হেট স্মোকিং..!
আদনান ইফাজ চমকে তাকালো। নীল যে নিয়মিত ধূমপান করত তেমন নয় তবে এমন জটিল জটিল সমস্যায় প্রায়শ হয়ে তাকে টুকটাক এক-দু’টি সিগারেট ধরাতে দেখা যেত। মূলত ধোঁয়াকে সে যেন নিজের ভেতরের অশান্ত ঝঞ্ঝা দমন করার জন্য এক কৃত্রিম নিস্তব্ধতা হিসাবে ব্যবহার করত। কিন্তু আজ এমন উল্টো কথায় বিস্মিত দুজনেই।
ইফাজ দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,,—’ভাই, আপনি তো স্ট্রেস কমাতে… মানে আজ কী হয়েছে, কিছু কি…?’
নীল শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ চোখে ইফাজের দিকে তাকাল।তার মুখমণ্ডলে এক স্থির,নব প্রত্যয়,,

—’এভরিথিং ইজ চেঞ্জ নাউ। নিকোটিন এখন স্রেফ একটা ডিস্ট্র‍্যাকশন। কিন্তু যখন লাইফে এমন একটা ওয়ান অ্যান্ড ওনলি রিজন চলে আসে, যার কাছে তুই বেস্ট ভার্সনে থাকার জন্য কমিটেড তখন এসব সস্তা রিলিফ লাগে না। আর আমি এমন একজনের কাছে কমিটেড যে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশান্তির কারণ।
তার এমন কথায় মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো ইফাজ আদনান। আদনান বলল,,—’আপনি ভাবিকে খুব ভালোবাসেন তাই না ভাই..?

তার এমন কথায়, অদ্ভুত মুগ্ধ হাসলো নীল। গভীর কণ্ঠে বললো,,—’ভালোবাসা না কি আসক্তি জানিনা। শুধু এটুকুই বলতে পারি সে আমার অস্তিত্বের একমাত্র কারণ, আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
কিয়ৎক্ষণ স্থবির হয়ে পড়লো তারা। নীলের মতো গুরুগম্ভীর মানব থেকে এমন উত্তর হয়তো আশা করেনি তারা। হঠাৎ নীল তাদের অবাক করে দিয়ে ফের বললো,,-—’কয়টা বাজে ইফাজ?
ইফাজ বোকা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে হঠাৎ তার এমন কণ্ঠে অপ্রস্তুত হয়ে হাতের দিকে চেয়ে বলল,,—’হু?স-সাড়ে নয়টা ভাই।
নীল হাতে থাকা সফট বলটা দূরে ছুঁড়ে দিয়ে বললো,,—’আমায় ফিরতে হবে।
বলেই সেখান থেকে প্রস্থান করল সে। গাড়িতে উঠে তা স্টার্ট দিতে দিতে ফের তাদের উদ্দেশ্যে সতর্কমূলক কণ্ঠে বললো,,—’যা বললাম তার এক ইঞ্চিও যেন নড়চড় না হয়। মাইন্ড ইট এক ইঞ্চি ও নয়।
ইফাজ-আদনান বাধ্য ছেলের ন্যায় মাথা নাড়তেই, নীল গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে এগিয়ে গেল সম্মুখ পানে।

ঘড়ির কাঁটাটা নয়টা টা পঁয়তাল্লিশ পেরিয়ে ছেচল্লিশের ওপর স্থির হয়েছে সবে। তিহু ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে; নীলের অপেক্ষায়। সেই যে তখন তাকে মহলে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়েছে এখনো ফেরার নামগন্ধ নেই। এতক্ষণ অবশ্য সবাই ছিল, কিছুক্ষণ হয়েছে সকলে প্রস্থান করেছেন নিজ নিজ কক্ষের উদ্দেশ্যে।
দীর্ঘ সফরের দরুন ক্লান্ত সকলে। তবে সন্ধ্যায় কিছুটা ঘুমিয়ে নেওয়ার দরুণ ক্লান্ততার পরিমাণ যৎসামান্য তিহুর। বরঞ্চ তার চঞ্চল আঁখি জোড়া স্থবির হয়ে আছে প্রধান ফটকের পানে। নীলের আগমনের অপেক্ষায় চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে আছে সে।

হঠাৎ ‌একটি গাড়ির আগমনী শ্রবনগোচর হতেই তিহুর চঞ্চল চক্ষু পল্লব ঝাঁপটালো বার কয়েক।ঘন অন্ধকারের মাঝেও তীব্র বেগে ছুটে আসা ধূসর রঙের সেডান গাড়িটিকে চিনতে তার ভুল হলো না। দ্রুত বেগে গাড়িটি বিশাল লোহার ফটক অতিক্রম করে ভেতরের প্রশস্ত আঙিনায় এসে ধীর হলো।
তিহু সরুনেত্রে এক ঝলক চাইল সেদিকে। কিছুক্ষণের মধ্যে কক্ষের দরজায় এসে কড়া নাড়লো নীল।আধ খোলা থাকায় সামান্য স্পর্শেই খুলে গেল তা। ভেতরে ঢুকে তিহুকে না পেয়ে মুচকি হেসে ব্যালকানিতে প্রবেশ করলো সে।এদিকে নীলকে না দেখতে পেয়ে তিহু উঁকি মারলো বেশ কয়েকবার। মাত্র আসা মানবটি, হুট করে কোথায় উধাও হয়ে গেল..? চোখে পলকেই হারিয়ে গেল নাকি? নাকি এটা তার ভ্রম ছিল?
সে যখন নীল কে খুঁজতে ব্যস্ত তখনই নিঃশব্দে-অগোচরে তার পিছনে এসে দাঁড়ালো নীল। প্রশান্তির হাসির রেখা ঠোঁটে বিদ্যমান রেখে, বরাবরের ন্যায় গভীর কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো,,

—’আমাকে খুঁজছেন ম্যাডাম?
তিহু হঠাৎ নীলের এমন কণ্ঠে হচকিত হয়ে উঠল। দ্রুত পিছন ঘুরে নীলকে দেখতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। তবে এতক্ষন অধীর আগ্রহে নীলের অপেক্ষায় থাকলেও, তাকে দেখেই গম্ভীর হলো সে। অভিমানী কন্ঠে বলল,,—’একদম না।
বলেই নীলকে পাশ কাটিয়ে কক্ষের উদ্দেশ্যে যেতে লাগলো সে। তবে পিছন থেকে তার হাতটা খপ করে ধরে বসলো নীল। কাছাকাছি টেনে বলল,,
—’মিথ্যা বলাই যায়, যদি অপর পক্ষ তা ধরতে না পারে। কিন্তু আমি তো ধরে ফেলেছি। তা এতবড় মিথ্যা বলার কারন কি ম্যাডাম?
—’কিসের আবার মিথ্যা?ঘুম আসছিল না তাই দাঁড়িয়ে ছিলাম। নতুবা কারো জন্য সাধ করে অপেক্ষা করার কোনো ইচ্ছা নেই আমার। বিশেষত তার জন্য যে আমাকে কিছু না জানিয়ে এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে।
নীল বুঝলো অভিমানীর অভিমান। ঘড়ির কাঁটায় চেয়ে বললো,,—’সবে তো রাত ৯ টা বেজে ৫০। এত রাত কিভাবে হলো?

—’আমি কি আপনার কাছে কৈফিয়ৎ চেয়েছি? ছাড়ুন আমায়।
তিহু মোচড়া-মোচড়ি করতেই, নীল তাকে আরো কাছে টেনে ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল,,—’আচ্ছা নাও বুঝেছি এটা অনেক রাত। কিন্তু আমার কথাটা তো শোনো।
তিহু স্থির হলো। ভ্রু কুঁচকে বলল,,—’বলুন কি বলবেন?
—’দ্যাটস লাইক মাই লেডি। বাট আপনার জানা উচিত ম্যাডাম, আপনার হাজবেন্ড শুধু আপনার হাজবেন্ডই নয়। একজন ব্যবসায়ী প্লাস আপনার মতে নেতা সাহেব। তার ব্যবসা আছে, আর এতদিন সে বাইরে ছিল। তো সব দিকটা হ্যান্ডেল করতে হবে তো?
বাচ্চাদের ভোলানোর মতো এমন কথা বলায় তিহু ভ্রু কুচঁকে বলল,,—’ছেলে ভোলানোর মতো কথা বলার কোনো দরকার নেই মিস্টার। আমি বাচ্চা নই। ভালো করেই জানি আপনার বিজনেস আছে। কিন্তু সেটা একটা কল করে জানালেই হয়। আর আজকে ফিরে পারেন নি;আজকে থেকে কিসের দায়িত্ব হ্যাঁ?
—’আচ্ছা নাও, দোষটা আমারই। এবার রাগ কমেছে ম্যাডাম? বড্ড ক্লান্ত লাগছে, রুমে যাই?
তিহু লুক্কায়িত হেসে বলল,,—’হুম!

‘আপনি না হয় বিছানাতেই ঘুমান’——তিহুর এমন কথায় সরুনেত্রে তার দিকে তাকালো নীল। ইঞ্চিৎ আশ্চর্য্যনিত কন্ঠে বলল,
—’কি?
তিহু ভ্রু কুঞ্জনপূর্বক বলল,—’বলেছি বিছানায় ঘুমাতে। এমনিতেও জাফলংয়ে তো এটাই হতো। এখন আবার নতুন করে বাংলা সিরিয়ালের নায়কের মতো হওয়ার কিছু নেই।আর তাছাড়াও সকালে রহিমা আন্টিরা ‌যখন রুম গোছাতে আসে তখন ওই সোফাটার দিকে কেমন করে জানি তাকায়।
নীল ঘড়ি খুলতে খুলতে আনমনে বলে উঠল,,—’বউ থাকা সত্ত্বেও বিছানা ঠিকঠাক আর বরের বালিশ সোফায় থাকলে সবাই তো ওভাবে তাকাবেই…!
নীলের কণ্ঠস্বর এতটাই খাদে নামানো ছিল যে তার এক শব্দ ও শুনতে পেল না তিহু। নিশ্চিত হতে ফের শুধালো,,

—’কি বললেন?
নীল গলা খাঁকারি দিয়ে বলল ,,—’নাথিং। আচ্ছা দেখাও কোথায় ঘুমাবো। টায়ার্ড অনেক।
তিহু দ্রুত পাশ বালিশটা মাঝে রেখে, ডানপাশে ইশারা করে বলল,,—’এখানে।
নীল দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকলো ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে দেখল তিহু ইতিমধ্যেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে।নীল ভেজা টাওয়াল দিয়ে জল সিক্ত চুলগুলো শেষবারের মতো মুছে সেটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে আবারও তাকালো ঘুমন্ত তিহুর দিকে। খানিক মুচকি হেসে এগিয়ে আসলো বিছানায়।
নিজের অবস্থানটা প্রেয়সীর ডান পাশে আর প্রেয়সীর অবস্থান নিজের বাঁ পাশে দেখে আনমনে মুচকি হেসে বলল,,
—’পারফেক্ট পজিশন। কিন্তু অবস্থানটা বিছানার বাঁ পাশে না হয়ে আমার বুকের বাঁ পাশে হলেই বেশি ভালো লাগতো।

বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভোরের স্নিগ্ধ আলোর রেশ কেটে তপ্ততায় মুখর হল পরিবেশ। পাখির কিচিরমিচির আর পাশের বাগানের নানাবিধ ফুলের মিষ্টি সুবাসে মনোহর পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে। । প্রায় অর্ধ মাসের ছুটি শেষে আজ কর্মজীবনে প্রবেশ করবে সবাই।
প্রবীণ সদস্যরা অবশ্য নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত।নীলের ব্যস্ততাও কোনো অংশে কম নয়। অফিস থেকে শুরু করে রাজনীতি ময়দান সবখানেই সক্রিয় বিচরণ তার। আর আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে তাই কর্মচাপ দ্বিগুণ হয়েছে।
এদিকে আজ ভার্সিটি যাবে বলে ঠিক করেছে তিহু। যেহেতু মাহা রিশাদ কাল এখানেই থেকেছে তাই একসঙ্গেই ভার্সিটি যাবে তারা। সকালের খাওয়া দাওয়া শেষে, বাড়ির মধ্যে সদস্যের সাথে বিদায় আলাপচারিতা শেষে বেরিয়ে পড়ল তিনজন। ড্রাইভার আসিফই ড্রপ করে দেবে তাদের।
তবে গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে কোত্থেকে জানি হাজির হলো রাওফিন।তিহুকে দেখে বলল,,

—’আরে সিস্টার? কোথাও যাবে নাকি?
তিহু,রিশাদ একে অন্যের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করল। অতঃপর রিশাদ বলল,—’ইয়াহ ব্রো। ভার্সিটি যাব।
—’ও তাই নাকি?তা চলো আমি ড্রপ করে দিই। আমিও ওই দিকেই যাচ্ছি।
‘না!—মাহার এমন কথায় তিহু রিশাদ ভ্রু কুঁচকে ‌তাকালো তার দিকে।তবে রাওফিন তার কথায় পাত্তা না দিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল,,—’তোমরা বসো সিস্টার আমি আবার সবার কথা শুনি না।
তিহু-রিশাদ মুখ চেপে হাসলো। মাহা গম্ভীর দৃষ্টিতে ভ্রু কুঁচকে বলল,,—’তোরা যা আমি ট্যাক্সিতে আসছি।
রিশাদ গাড়ির ভেতর থেকেই বলল,,—’ওরে আয় রে নানী শাশুড়ি। একদিন গেলে মান যাবেনা। আর এমনিতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।

তার এমন সম্বোধনে রাওফিন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো রিশাদের পানে,—’নানী শাশুড়ি মানে?
—’ওফফস,স্যরি ব্রো।তোমাকে তো বলা হয়নি আমি ওর নাত জামাই।ওর নাতনি আমার দশ নম্বর।
রাওফিন অবাক দৃষ্টিতে তাকালো,,—’দশ নম্বর?
—’হ্যাঁ দশ নম্বর।
—’বাব্বা তোমার তো সেই পাওয়ার! একটা সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছি আর তোমার দশ-দশটা!
রিশাদ একটু ভাব নিয়ে বলল,,—’দ্যাট ইজ পাওয়ার।
—’হুম,হুম, বুঝেছি তোমার কলিকাতা হারবালের পাওয়ার একটু বেশিই।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩২

তাদের এমন লাগামহীন কথাবার্তায় হালকা কেশে উঠলো তিহু‌। অর্থাৎ সেও এখানে উপস্থিত। রাওফিন বোকা হেসে বলল,,—’স্যরি।
অতঃপর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা, গম্ভীর মাহার পানে চেয়ে মনে মনে বলল,,—’মেয়ের কান্ড দেখেছো? আমাকে সহ্য করতে পারে না।অথচ আমার মেয়ের মেয়ে পয়দা করে বন্ধুর সাথে বিয়েও দিয়ে ফেলেছে! শালার জিন্দেগি!

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৪