চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৬
আরোবা চৌধুরী আরু
সায়ফান দরজার পাশে এসে ঠেস দিল। তার ভুরু কুচকে উঠল, চোখে এক ধরনের বিস্ময়।
——— “তোমরা দুইজন এখানে কি করছ?
ও এসেছিল সায়মানকে খুঁজতে মাহবুব রাশিদ ওকে পাঠিয়েছে। স্টাফ জানালো , সায়মানকে উপরে যেতে দেখেছে, তাই সাইফানও উপরের দিকে ওঠে খুঁজতে। হালকা আওয়াজ শুনে ও ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে আসে। দরজার সামান্য ফাঁকা করে রাখা দেখেও দরজার ঠেলে ভিতরে ঢুকে।
সায়মান, তার স্বাভাবিক গম্ভীরতা বজায় রেখে, চোখে একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
——— “তুই এখানে কি করছিস?”
সাইফান একটু হোঁচট খেল, আমার প্রশ্ন আমাকেই করছে ভাবলো, তারপর বলল,
——— “আব্বু তোমাকে খুঁজছে, এখনই নিচে যেতে হবে।”তারপর নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল, এই ছটু তুই এখানে কি করিস, সবাই নিচে আছে নিচে যা।
নাফিসা শ্বাস চেপে ধরে শান্ত হতে চেষ্টা করল।এখনো ওর শরীর কাঁপছে,নিজেকে ঠিক করে — সায়ফানকে কিছু বলতে যাবে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সায়মান তাকে থামাল,
——— “ও কোথাও যাবেনা। তুই নিচে যা, আমি আসছি।”
নাফিসা অদ্ভুত দৃষ্টিতে সায়মানের দিকে তাকালো, হঠাৎ রাগ লাগলো ওর খুব, জেদ ধরে ঠোঁট একটু চেপে, সে বলল,
——— “ভাইয়া, আমি নিচে যাচ্ছি, তোমরা আসো। বলার সাথে সাথে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে জোর কদমে হেঁটে চলে গেল। ”
সায়মান ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁতের দাঁত চেপে বলল,
——— “ইডিয়েট।”
সাইফান হোঁচট খেল, এদের দুইজনের কাণ্ড দেখে। মনে হচ্ছে এদের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। বিষয়টা অত পাত্তা দিল না কেন জানি? তারপর দৃষ্টি সায়মানের দিকে ঝুলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
——— “ভাইয়া, চলো, তাড়াতাড়ি। অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি।”
সায়মান গভীর স্বরে শুধু মাথা নাড়য়ে হাঁটা শুরু করলো।
সাইফান ও ধীরে ধীরে তার পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে এগোতে লাগল।
সাইফান একটা ঢোক গিলে হালকা হেসে বলল,
——— “ভাই, একটা কথা বলি।”
সায়মান শুধু ছোট করে উত্তর দিল,
——— “হুম।”
——— “ভাই, তুমি তো ৩৪-এ পৌঁছেছ, বুড়ো হয়ে যাচ্ছো।বিয়ে করার কোন নাম গন্ধ নিচ্ছো না তোমার জন্য, আমাকে কেউ বিয়ে দিচ্ছে না, সব পাপীর দল।”
সায়মান কোনো উত্তর দিল না।
——— “ভাইয়া, কোনো সমস্যা আছে?
সায়মান হাঁটার গতি বন্ধ করে দিয়ে দাঁড়িয়ে পরল। ভুরু কুচকে সাইফনের দিকে তাকিয়ে বলল,
———— হোয়াট …….?
সাইফান দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল, ——— তোমার মেশিনে কি কোনো সমস্যা আছে ? আমাকে বলো, আমি কলকাতা থেকে হারবাল নিয়ে আসব। ছোট ভাই বলে আমার সামনে লজ্জা পেতে হবে না। নির্দ্বিধায় সব কিছু বলতে পারো আমি তোমাকে হেল্প করব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল শেষের কথাগুলো। ”
সায়মানের দিকে তাকিয়ে দেখল, ও চোখ ছোট ছোট করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে কিছু বলছে না, সাইফান আবার বলা শুরু করল,
——— “নাকি তোমার মেয়েদের পছন্দ না, তুমি যে হারে মেয়েদের কাছে ঘেষো না ? ভাই, তুমি কি ছেলেদের পছন্দ করো? আমি তো কোনো হাফ লেডিসকে ভাবি বানাতে পারবো না।”
সায়মান শুধু দাঁতের দাঁত চেপে, মাথা নিচু করে নিজের জুতো দ্রুত খোলার জন্য প্রস্তুত হলো।
সাইফান সায়মানের জুতো খুলতে দেখে দৌড় দিল তারপর আবার একটু এগিয়ে এসে বলল,
——— “আর একটা কোশ্চেন… ছেলে-ছেলে পছন্দ করলে কেমন হয়? মানে ওরা ওই আর কি ইটিশ পিটিস কেমনে করে? অনেক কনফিউশনে আছি।” ——— বলেই আবার দৌড় দিল।
সায়মান জুতো তুলে হালকা করে ওরদিকে টান মারলো ।
জুতো গিয়ে লাগলো একদম সাইফানের পশ্চাৎদেশে।
সাইফান আহ করে উঠল,দৌড়ানো থামিয়ে দিয়ে, নিজের হাত দিয়ে আঘাতের জায়গা ডলতে শুরু করলো।
——— “ভাই! আমার হট পশ্চাৎদেশে মারলে কেন! শুধু আমাকে মারলে না, আমার বউয়ের সম্পদ নষ্ট করলে। আমার শরীরের প্রত্যেক ইঞ্চি ইঞ্চিতে আমার বউয়ের হক আর সেই জায়গায় তুমি আমাকে মারলে ?”
সায়মান ওর ঢং দেখে ওর দিকে ধীরে ধীরে এগোতে থাকতেই, সাইফান পশ্চাৎ দেশে মাসাজ বন্ধ করে দিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে পালালো।
সায়মান, হালকা রাগে বলল,
——— “এক নম্বরের বাঁদর লেজকাটা।”
নাফিসা নিচে নেমে আফিয়া বেগমের পাশে দাঁড়ালো।
——— “এই মেয়ে কোথায় কোথায় চড়ে বেড়াচ্ছিস, তোকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না! আগে শান্ত সৃষ্ট ছিলি, আর এখন দিন দিন বাঁদর হচ্ছিস,” আফিয়া বেগম একটু হেসে বললেন।
নাফিসা হালকা করে হাসলো, আফিয়া বেগমের হাতটা ধরে কাঁধে মাথা রাখলো।
——— “হ্যাঁ, তোমার ভালোবাসা পেয়ে পেয়ে আমি সত্যিই বাঁদর হচ্ছি।”
সায়মান নিচে এসে, নাফিসা ও আফিয়া বেগমকে এমন দৃশ্যে দেখল। কেন জানি, হঠাৎ ওর ভালো লাগা হৃদয় ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল।
মাহবুব রাশিদ সায়মানকে দেখে এগিয়ে এসে হাত ধরলেন,
——— “আমার সাথে এসো।”
সায়মান চুপচাপ, কোনো উত্তর দিলো না, মাহবুব রাশিদ ওর হাত ধরে স্টেজের দিকে উঠল। বাবার কাণ্ড চোখে দেখে শুধু শান্তভাবে থাকল।
মাহবুব রাশিদ এবার রাইমার দিকে তাকিয়ে হেসে ইশারা করলেন, স্টেজে আসার জন্য।
রাইমা অদ্ভুতভাবে চারপাশে তাকালো—— সব চোখ ওর দিকে। এবার মাহবুব রাশিদের দিকে তাকিয়ে হেসে স্টেজের ওপর উঠে দাঁড়ালো, সায়মানের পাশে।
সাবিহা খালেদ, স্টেজের দিকে তাকিয়ে, দুই হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে চমৎকার হাসি দিলেন। চারপাশে সবাই আগ্রহভরে তাকিয়ে আছে, মুহূর্তটি কি হতে যাচ্ছে, সেটা দেখার জন্য।
মাহবুব রাশিদ মাইকের হাতে নিয়ে, গলা খানিকটা খাইরি দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
———— “আসসালামু আলাইকুম এভরিওয়ান। এই খুশির দিনে আপনাদের জন্য আর একটা সারপ্রাইজ আছে। সবাই আমার বড় ছেলে, সায়মান তাহের রাশিদকে চেনেন। আজকের এই অনুষ্ঠানে আমি ঘোষণা করতে চাই যে, সায়মানের সঙ্গে রাইমার বিয়ের প্রক্রিয়া কিছুদিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে, আর আজ আমরা এ এনগেজমেন্টের আনন্দ ভাগাভাগি করছি।”
চারপাশে করতালিতে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। রাইমা খুশিতে লাজুকভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে সাবিহা খালেদের দিকে তাকালো, এই সারপ্রাইজের কথা বলছিল তা হলে আম্মু।
সাবিহা খালেদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে, আনন্দে নিজ হাত দিয়ে ফ্লাইং কিস দিল।
অন্যান্য অতিথিরা খুশিতে উচ্ছ্বসিত হলেও পরিবারের সকলেই বিস্ময়ে মুখে তাকিয়ে আছে—— কারণ কেউই এই ঘোষণা সম্পর্কে আগে কিছু জানে না। আফিয়া বেগম অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
।নাফিসার চোখে যেন হঠাৎ করে পুরো পৃথিবী ঝাপসা হয়ে গেল। মাহবুব রাশিদের বলা প্রতিটি শব্দ তার ভেতরের দেয়াল ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিল। চারপাশে শত মানুষের উপস্থিতি, আলো, সঙ্গীত——— সব কিছু যেন মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। মনে হচ্ছে, তার বুকের ভেতর কেউ ভারি পাথর চেপে বসেছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গলা শুকিয়ে গেছে, কিন্তু চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরছে। প্রতিটি অশ্রু যেন তার ভেতরের দুঃখ, অপমান আর অসহায়তার সাক্ষী হয়ে মাটিতে পড়ছে।
সে বুঝতে পারছে না———নিজেকে দোষ দেবে, নাকি পরিস্থিতিকে। অজানা ভয় তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
সায়মান নাফিসার দিকে তাকালো, নাফিসা তাকিয়ে ছিল বিধায় দুজনের চোখে চোখ পড়ে গেল। সায়মান নাফিসের চোখের পানি দেখে, ওর বুকে যন্ত্রণা শুরু হলো। নাফিসা এক মুহূর্তও কাঁদতে কাঁদতে থেমে থাকল না। নিজের চোখের পানি এক হাত দিয়ে মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে গেল।
সায়মান নাফিসার সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে অদ্ভুত এক উষ্ণতা আর ক্ষোভের মিশ্রণ। হঠাৎই মাথায় এলো, নাফিসার কান্নার কারণটা ঠিক কি। দাঁতের দাঁত চেপে, রাগ আর হতাশার মিশ্রণে মাহবুব রাশিদের দিকে তাকাল।
————“আমার অনুমতি না নিয়ে, আপনাকে আমার লাইফের এত বড় ডিসিশন কে নিতে বলছে ?”——— সায়মান কণ্ঠে কঠোরতা আর ব্যথার স্বর মিশিয়ে বলল।
মাহবুব রাশিদ স্থির চোখে ছেলে’র দিকে তাকিয়ে বললেন,
————“ভুলে যেও না, আমি তোমার বাবা। তোমার লাইফের ডিসিশন নেওয়ার অধিকার সবসময় আমার আছে। সবসময় তোমার মতো চলবে না।”
সায়মানের চোখে রাগের ঝলক আরো বৃদ্ধি পেল। দাঁতের দাঁত চেপে, ঘাড়ে রক্ত সঞ্চালনের মত উত্তেজনা ধরে ধরে বলল,
———— “আপনি যেগুলো বললেন, সেগুলোর কিছুই হবে না। সবাইকে এখনই জানিয়ে দাও———— কোনো বিয়ে হবে না।”
কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা যে চারপাশে থাকা সবাই কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল।
——— “আমি যখন ডিসিশন নিয়েছি, এই বিয়ে হবে । তোমার সব কথা শুনতে আমি বাধ্য নই।”———— মাহাবুব রাশিদ জেদ ধরে বললো নিজের সিদ্ধান্তে অটুট।
———— সায়মানের রাগের ঢেউয়ে আরও দৃঢ় হল ।
স্টেজের পাশে থাকা ফুলের টপটি হাতে তুলে এক আছাড়ে ভেঙে চিল দিয়ে ফেলে দিল। সাদা-লাল ফুলের পাপড়িগুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। চারপাশে থাকা অতিথিরা করে তাকিয়ে রইল।
বাড়ির সবাই ভয়ে ভয়ে সায়মানের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ সাহস করতে পারছে না। কারণ সবাই জানে, কোনোদিন কেউ সায়মানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু চাপানোর চেষ্টা করে, সায়মান সেটা কখনো মানবে না।
———— “কাজ সারছে রে।”——— হঠাৎ সাইফান মুখ খুলল, স্বরটা হালকা হলেও কণ্ঠে বিস্ময় আর উত্তেজনার মিশ্রণ।
জারিন আর রিশা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। রিশা সাইফানের কাঁধে হালকা হাত রাখে, কণ্ঠে কৌতূহল ও উত্তেজনার স্বর———
———— “ভাইয়া, এবার কি হবে?”
———— “কি আর হবে, যা হওয়ার তাই হবে। শুধু দেখতে থাক। আব্বু খেয়েদেয়ে কাজ পাইলো না, ভাইয়াকে না বলে এত বড় ডিসিশন নিয়েছে, তা আবার সবার সামনে এনাউন্স করে দিল। এর সাইড ইফেক্ট তো পেতেই হবে।”———— সাইফানের চোখে নরম হাসি, কণ্ঠে হালকা উত্তেজনা।
——— “ঠিক বলেছ, তাও আবার রাইমা আপুর সাথে ‘আই ডোন্ট লাইক হার’।”———— রিশা মুখ ঘুরিয়ে বলল।
——— “ঠিক কথা বলেছিস। এতদিন পর একটা। আব্বু খেয়ে দেইও কাজ পাইনি, রাম ছাগলের সাথে ভাইয়ার বিয়ে ঠিক করল।”———— সাইফান নাক ছিটকিয়ে বলল।
আফিয়া বেগম আর মঈন রাশিদ একসাথে এগিয়ে গেল সায়মানের দিকে। দু’জন মিলে চেষ্টা করছে সায়মানক থামাতে ।
——— “সায়মান, প্লিজ, এখানে অনেক মানুষ আছে। শান্ত হও,”———— মঈন রাশিদ কণ্ঠে কোমলতা মিশিয়ে বলল।
——— “ধীরে ধীরে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা হবে। এখন শুধু শান্ত হও।”
সায়মান দাঁতের দাঁত চেপে, উত্তেজনায় কণ্ঠের স্বর কমিয়ে বাবার দিকে তাকাল।
———— “তোমার ভাইয়ের ভাবা উচিত ছিল সেটা, আমাকে না বলে সবার সামনে এভাবে অ্যানাউন্স করার আগে।”
আফিয়া বেগম সায়মানের কাঁধে হাত রাখে, হালকা করে মাসাজ করতে থাকলো, ওর নিঃশ্বাসের উত্তেজনা কমাতে পারে।
———— “প্লিজ, তেহু শান্ত হও, আব্বু। শান্ত হও। যাও উপরে যাও, আমি সব দেখছি।”
সায়মান মাহবুব রাশিদের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে, নিজের ক্ষোভ বোঝাচ্ছে——— মাহবুব রাশিদ ওর দিকে তাকিয়ে ভুরু
কুঁচকালো।
সায়মান রেগে উপরের দিকে চলে গেল।
আফিয়া বেগম , দাঁতের দাঁত চেপে মাহবুর রাশিদ দিকে তাকিয়ে রইল। তার নিঃশ্বাস ঢোকায় ঢোকায় প্রবাহিত হচ্ছে, হালকা ঘাম চুলের সিংহলায় ভিজে গেছে।
মাহবুব রাশিদ চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
রাইমা সায়মানের এমন রিঅ্যাকশন দেখে ভয় পেয়ে তখন ও সাবিহা খালেদের কাছে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে, কান্না করেই যাচ্ছে এখনো পর্যন্ত। সাবিহা খালেদ ওকপ শান্ত করার চেষ্টা করল, হালকা হাত দিয়ে মাথায় বুলিয়ে বলল,
——— “শান্ত হও, সব ঠিক আছে।”
চারপাশে পরিবেশ থমথমে হয়ে গেছে। যারা অতিথি হিসেবে এসেছিল, তারা কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত হাসিখুশি, কথা বলছিল———কিন্তু এখন শোক এবং বিস্ময়ের মিশ্রণে নিস্তব্ধ। অল্পসংখ্যক অতিথিরা এসেছিল যদিও বা, এখন সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে, ক্ষুদ্রভাবে আলোচনা শুরু করেছে।
তাহমিদ ইকবাল ও রাজিব একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাড়িয়ে প্রশ্ন করল———
————“এক্স্যাক্টলি কি হলো?”
তাহমিদ ইকবাল হালকা হাসি দিয়ে বলল,
———— “বুঝেছ, মাঝে মাঝে এমন সিচুয়েশন আসা দরকার আমাদের ভিতরের মনোভাব বোঝার জন্য।”
রাজিব মাথা চুলকালো, অল্প হতাশায় বলল,
————“ঠিক বুঝলাম না স্যার, কি বললেন?”
ইকবাল হাসল না, ভ্রু কুঁচকে বলল————
————“সায়মান তোমার ওপর এমনি রাগ করে না, বুঝেছ? রাজিব, তুমি সত্যিই এক্কেরে একটা আস্ত বলদ।”
রাজিব অসহায় দৃষ্টিতে তাহামিদ ইকবালের দিকে তাকাল। ———গার্লফ্রেন্ড, মা, আর এবার তাহামিদ ইকবালও——— সবই এক কথায় বলে কেন । আর সায়মানও তো ঠিক একই কথা বলে সবসময়।
নাফিসা নিজের ঘরে এসে উপর হয়ে বিছানার উপর শুয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে । হঠাৎ দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ভাবলো সায়মান এসেছে। ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠেলো । কিন্তু পিছনে ঘুরে দেখল রিয়াদ—মুখটা মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল। চোখে আতঙ্ক জমে উঠল।
——— “আপনি… আপনি এখানে কেন? দরজা বন্ধ করলেন কেন?”
রিয়াদ ঠোঁট বাঁকিয়ে শয়তানি হাসি দিল।
——— “আরে বেয়ান, এত স্যাড স্যাড মুখ কেন? দরজা বন্ধ করেছি কারণ , তোমার সাথে এখনো অনেক হিসাব বাকি আছে।”
নাফিসা দাঁড়িয়ে উঠে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
——— “আপনি… এই রুম থেকে বেরিয়ে যান, এখনই। না হলে আমি…”
——— “কি করবে? চিৎকার?”
রিয়াদ অট্টহাসি দিয়ে কাছে এগিয়ে এলো।
——— “করো যত খুশি। সবাই নিচে ব্যস্ত, তোমার চিৎকার কেউ শুনবে না।”
নাফিসা ভয়ে ভেতরে ভেতরে জমে যাচ্ছে । ও পিছু হটতে লাগল। রিয়াদের প্রতিটি পা ফেলার সাথে সাথে ও আরও এক ধাপ পিছিয়ে যায়।
——— “এগোচ্ছেন কেন? থামুন!”
নাফিসার স্বর কেঁপে উঠল।
পিছিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ বিছানার সঙ্গে ধাক্কা খেল। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল নরম বেডের ওপর। চোখ ভিজে উঠল কান্নায়।
রিয়াদ ধীর পায়ে কাছে আসছে। তার দৃষ্টি নাফিসার অসহায় চেহারায় গেঁথে আছে।
নাফিসা দু’হাত সামনে তুলে মিনতি করল,
——— “প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দিন… আমি আপনার পায়ে পড়ি।”
চোখ দিয়ে টলটল করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত শ্বাসে।
রিয়াদ আরেকটু ঝুঁকে এলো, তার ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি।
——— “আজ কেউ তোমাকে বাঁচাতে আসবে না, বুঝলে?”
নাফিসা গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিতে চাইল, কিন্তু আতঙ্কে স্বর আটকে গেল। শুধু কান্নার শব্দ বেরিয়ে আসছে। ও বিছানার এক কোণে গুটিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু চারপাশে যেন দেওয়াল—কোথাও পালানোর রাস্তা নেই।
রিয়াদ, এক টান দিয়ে নাফিসার শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিল। নাফিসা ছাড়া পাওয়ার জন্য ক্রমাগত, নিজের হাত পা নাড়াচ্ছে। রিয়াদ এবার ওর হাত দুটো চেপে ধরে কসরত করে বাকি শাড়িটা খুলে একটা দেন নিচে ফেলে দিল।
নাফিসা চোখ লাল, ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠছে, হাত সামনের দিকে জড়িয়ে নিজেকে ঢাকছে। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন কম্পনের সঙ্গে মিলছে, বুক উঠে পড়ছে, পায়ের তলায় জমে থাকা শক্তি ভয় ও আতঙ্কের মাঝেই মিলিয়ে যাচ্ছে। ওর শাড়ির আঁচল সামান্য গলায় জড়ানো, কিছু অংশ বিছানার পাশে পড়ে আছে—ভগ্নাংশিক অযত্নে।
দরজার বাইরে সায়মান দাঁড়িয়ে আছে। ও নাফিসার কাছে আসছিল দরজার কাছে আসতেই নাফিসার চিৎকার শুনে
———নিস্তব্ধ মনেও হৃদয় দ্রুত ধড়ফড় করছে। ভিতরের কণ্ঠস্বর তাকে জানাচ্ছে———কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না।তাড়াতাড়ি করে নিজের ঘরের দিকে ছুটলো, ঘরে গিয়েই হাত দ্রুত চলে যায় ড্রয়ারের দিকে, যেখানে সে নাফিসার এক্সট্রা চাবি রেখেছিল। ঝটপট চাবি তুলে নিয়ে দ্রুত নাফিসার রুমের ছুটল আবার। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে লক খুলে ভিতরে ঢুকল।
ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল নাফিসার বিধ্বস্ত শরীর। তার চোখ লাল, কান্না থেমে নেই। শাড়ি একপাশে ঝুলছে, হাতে আতঙ্কে দুই হাত সামনে তুলে রাখছে।
রিয়াদ ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। নাফিসার শরীর ক্রমশ কাঁপছে। সে পিছু হটছে, হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে নিজেকে ঢাকতে চেষ্টা করছে।
সায়মান চোখ লাল টকটকি হয়ে উঠলো।মনে হচ্ছে চোখের ভিতর থেকে আগুন ঝরে পড়বে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলো না । এগিয়ে গিয়ে দুই হাতে রিয়াদের কাধের ওপর থাবা বসিয়ে এক আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল।
——— রিয়াদ চমকে উঠলো, ওর গায়ে কেউ হাত দেওয়াই কিন্তু প্রতিক্রিয়া করার সুযোগ পেল না, তার আগে নিজেকে মেঝেতে আবিষ্কার করল। চেষ্টা করল, উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু সায়মান এগিয়ে এসে ওর পেটের ওপর বসে ক্রমাগত মুখে ঘুসি দিতে থাকলো। ওর হাতটা ধরে ডুমরিয়ে দিল। মঠ করে শব্দ হলো সাথে সাথে, রিয়া জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো। সায়মানের ভিতর মনে হচ্ছে কোন হিংস্র জানোয়ার এর আত্মা ঢুকে গেছে। ক্রমাগত রিয়াদকে মেরেই যাচ্ছে । প্রতি আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর বেহাল হয়ে পড়ল।
নাফিসা তাড়াহুড়া করে উঠে নিজের শাড়ি ঠিক করল, গায়ের ওপর জড়িয়ে ধরল। চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে, বুক দ্রুত উঠানামা করছে।
সায়মান ক্রমশ রিয়াদকে আঘাত করছে। প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে তার গলা থেকে বের হচ্ছে:
——— “You bastard! How dare you touch her!”
——— “Don’t you ever come near her again, you bloody fool!”
সায়মান হঠাৎ মারা থামিয়ে দিয়ে, ঘরের চারপাশ তাকায়, চোখে আগুন। ড্রেসিং টেবিলের ওপর থাকা ফুলদানি তার নজর কেড়লো । উঠে গিয়ে ফুলদানিটা হাতে তুলে নিয়ে রিয়াদের মাথার ওপর একটা বাড়ি দিল। রিয়াদ চিৎকার করে উঠলো মাথায় হাত দিয়ে। রক্ত ভিজে উঠেছে ওর সমস্ত মাথা।
নাফিসা এটা দেখে নিজের মুখ চেপে ধরল, চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা আটকে গেছে, শুধু কান্নার শব্দ বের হচ্ছে।
সায়মানের এতেও মনে হয় নিজেকে শান্ত করতে পারল না। আবার এদিক ওদিক তাকিয়ে নজর পড়লো কাচের ফুলদানির ভাঙ্গা অংশের দিকে, ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। হাত বাড়িয়ে সেটা নিজের হাতে তুলে নিল। তারপর রিয়াদের বুকের ওপর আঘাত করতে নিলে,……….
পিছন থেকে নাফিসা সায়মানকে জড়িয়ে ধরল—ভয় ও ত্রাণের মিশ্রণ অনুভব হচ্ছে। ধীরে ধীরে আরো নিজের সাথে জড়িয়ে নিল , কাঁপছে, চোখে পানি ঝরছে পুরো শরীর ক্রমাগত কাঁপছে । ওর নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে, কিন্তু বুকের ভেতর এক অদ্ভুত নিরাপত্তা অনুভব করছে।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৫ (২)
সায়মান থেমে গেল, নিজের হাতে থাকা কাঁচের ফুলদানির ভাঙ্গা অংশ দূরে টান মেরে ফেলে দিল। ধীরে ধীরে নাফিসার হাত নিজের পেটের উপর থেকে সরিয়ে , সামনের দিকে ঘুরে নাফিসাকে নিজের বুকের ভেতরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নাফিসার চোখে পানি এখনও ঝরছে, ঠোঁট লাল। নিজের বুকের থেকে নাফিসাকে তুলে দুহাতের তালু সাহায্যে ওর গাল দুটো আগলে নিল। পুরো মুখ জুড়ে চুমু দিতে লাগলো কপালে গালে পুরো মুখ, নাফিসার পুরো মুখ ভিজে উঠেছে সায়মানের দেওয়া চুম্বনে। সায়মান কিছুক্ষণ থেমে, নাফিসার চোখে চোখ রেখে ধীরে ধীরে ঠোঁটে একটা শুকনো চুমু দিল——— তারপর গতিতে আবার আঁকড়ে ধরল অধর জোড়া একটি দীর্ঘ, আবেগপূর্ণ চুমু। ভয়, রাগ, নিরাপত্তা, ভালোবাসা—সব মিশ্রিত।
