Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৫

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৫

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৫
নওরিন মুনতাহা হিয়া

‎আকাশে রক্তিম রঙের সূর্যর আলোয় আলোকিত হয়েছে ভুবন যার এক টুকরো কিরণ জানালা ভেদ করে রুমে এসে পৌঁছায়। সারা রুম আলোকিত হয়ে যায়। খাটে হেলান দিয়ে বসে থাকা এক রমণির চোখে সূর্যর মিষ্টি কিরণ এসে লাগে সঙ্গে সঙ্গে সে তার চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে। তবে সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে যখন সূর্যের আলোর তীব্র বাড়তে থাকে তখন আর চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। পিটপিট করে চোখ খুলে‚হাত দিয়ে চোখ পরিস্কার করে হাই তুলে তাকায়।

রুমের আসবাপত্র আর কাঠামো দেখে অবাক হয় মেঘ এই রুম তার না। মেঘ যখন ঘরের আশেপাশে চোখ বুলাতে ব্যস্ত তখন হঠাৎ তার কোলের মধ্যে কোন বস্তু নাড়াচাড়া করে উঠে। মেঘ তার চোখ নিয়ে রাখে কোলের উপর সে অবাক হয়ে যায় ‚তার কোল জুড়ে মাথা রেখে শুয়ে আছে আদ্রিয়ান। ঘুমন্ত আদ্রিয়ানকে দেখে মেঘের কাল রাতের ঘটনার কথা মনে পড়ে। রাতে আদ্রিয়ান জ্বর উঠেছিল মেঘ তার সেবা করেছিল এরপর রাতে আদ্রিয়ান তার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিল। মেঘ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল তা হয়ত বুঝতে পারেনি।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ঘুমন্ত আদ্রিয়ানের মুখের দিকে মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেঘ‚হাত দিয়ে তার গাল ছুঁয়ে দেয়। আদ্রিয়ানের অসুস্থতায় সেবা করা তার খেয়াল রাখা ‚যত্ন করার দায়িত্ব মেঘের নয় বরং জিয়ার। কারণ জিয়াকে আদ্রিয়ান ভালোবাসে তার সাথে সংসার করতে চাই স্ত্রী হিসাবে জিয়াকে স্বীকার করে। তবে কেনো মেঘকে তার জীবনের সাথে জড়িয়ে রাখতে চাই? বারবার অসুস্থতা বা যন্ত্রণায় কেনো মেঘের কাছে ছুটে আসে? মেঘ কে হয় তার? কাগজে লেখা বউ যাকে সে একমাস পর ডিভোর্স দিয়ে দিবে!

মেঘ আদ্রিয়ানের ডান পাশের গালে হাত বুলিয়ে আপন মনে কথাগুলো বলে যাচ্ছে যা আদ্রিয়ান শুনে না। যদিও এখন সে ঘুমন্ত তাই শুনছে না কিন্তু জেগে থাকলে ও কি মেঘের মনে থাকা প্রশ্ন বা অস্থিরতার দায় তার থাকত। অবশ্য থাকত না সবার কাছে দায় বা দায়িত্বর আশা করা যায় না ‚কিছু মানুষকে তুমি যতই ভালোবাসা আর যত্ন দেও না কেনো তার তোমার থেকে দূর থেকে দুরত্ব চাইবে। অপেক্ষার বদলে শুধু অবহেলা দিবে। তবুও সেই মানুষকে সারাজীবন ভালোবেসে যাওয়া হয়ত বোকামি কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকা হয়ত তুমি। কারণ তুমি তোমার প্রিয়জনকে প্রয়োজনের জন্য ব্যবহার করেন নি তাকে ভালোবাসে প্রিয় – আপনজন করে রাখে চেয়ে ছিলেন।

মেঘ দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে এরপর ঘুমন্ত আদ্রিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে ছোট একটা প্রশ্ন করে ‎
”কেনো আমাকে ভালোবাসলেন না আদ্রিয়ান স্যার?কবুল বলার পর ও কেনো আমার সাথে সংসার করলেন না আপনি? কেনো বউ বলে মেনে নিলেন না আমায়? কেনো আমার অপেক্ষার মূল্য দিলেন না আপনি? কি এমন হতো আমায় একটু ভালোবাসলে? খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেতো কি? ‎”
মেঘ কিছুক্ষণ আদ্রিয়ানের মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এরপর চোখ সরিয়ে নেয়। মেঘের নজর যায় টেবিলের কাছে থাকা ঘড়ির দিকে তখন সময় প্রায় নয়টা বেজে তিরিশ মিনিট। অথচ মেঘের ক্লাস শুরু হবে সকাল দশটায় এখন সে কখন রেডি হবে? কখন খাবে? আর কখন কলেজে গিয়ে পৌঁছাবে? মেঘ দ্রুত ঘুমন্ত আদ্রিয়ানকে আলতো হাতে তার কোল থেকে সরিয়ে নেয় ‚ এরপর তার মাথার নিচে বালিশ দিয়ে দেয় যাতে করে আদ্রিয়ান শান্তিতে ঘুমাতে পারে। জানালা ভেদ করে আসা সূর্যর আলো আদ্রিয়ানের চোখে এসে পড়ায় তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছিল। মেঘ পর্দা দিয়ে জানালা ঢেকে দেয় এরপর একবার আদ্রিয়ানের ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে তাকায়। এরপর মেঘ তার রুমের চলে যায়।

___ মেঘ তার রুমে প্রবেশ করে এরপর আলমারি থেকে জামাকাপড় বের করে ওয়াশরুমে চলে যায় গোসল করতে। গোসল শেষ করে মেঘ বের হয়ে আসে আয়নার সামনে পরিপাটি করে সাজিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। আদ্রকে আজ কলেজে যাওয়ার জন্য ডাকবে না এই অসুস্থ শরীর নিয়ে কলেজে যাওয়া উচিত হবে না। যদি কলেজে গেলে বা বেশি শরীর নাড়াচাড়া করলে জ্বর চলে আসে তখন কি হবে? আজ বরং বাসায় বিশ্রামে থাকুক।

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যায় মেঘ কাজের মহিলা সকালের খাবার রেডি করে টেবিলে সাজিয়ে রেখে দিয়েছে। মেঘ চেয়ার টান দিয়ে টেবিলে বসে যায় এরপর খাওয়া শুরু করে। রান্না ঘর থেকে ফলমূল সহ অন্য খাবারের পদ নিয়ে আসে কাজের মহিলা‚ ওনি মেঘকে বলেন

”মেঘ ম্যাম আদ্রিয়ান স্যার কি সুস্থ হয়েছেন এখন?”
মেঘ খাবার খেতে খেতে উত্তর দেয়
”সুস্থ হয়নি তবে জ্বর কমেছে। আদ্রিয়ার স্যার এখন ঘুমিয়ে আছেন ‚ঘুম থেকে উঠলে ওনার রুমে খাবার দিয়ে এসো। আর ওনার টেবিলে ঔষধ রাখা আছে খেয়ে নিতে বলবে। ”
মেঘের কথায় কাজের মহিলা সম্মতি দিয়ে বলে
”ওকে ম্যাডাম”।
মেঘ খাবার খাওয়া শেষ করে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। বাড়ির বাহিরে আদ্রিয়ানের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল মেঘ সেখানে উঠে বসে।
‎ কলেজ গেইটে গাড়ি এসে থামে মেঘ এতোখন মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছিল যার কারণে সে গাড়ি থেমে যাওয়ার বিষয়টা খেয়াল করেনি। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা ড্রাইভার পিছনে ঘুরে মেঘের দিকে তাকিয়ে বলে

“ ম্যাম আমরা কলেজ গেইটে এসে পড়েছি। আপনি গাড়ি থেকে নামুন “।
ড্রাইভারের কথা শুনে মেঘ দ্রুত বই খাতা ব্যাগে ভরে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। এরপর বড় বড় পা ফেলে কলেজ গেইটের দিকে হাঁটা দেয়। কিছুক্ষণ পর মেঘ এসে পৌঁছায় ক্লাস রুমের বাহিরে যখন সে ভিতরে ঢুকতে যাবে তখন হঠাৎ করে পিছন থেকে একজন তাকে ডাক দেয়।
“ মেঘ “।
মেঘ ডাক শুনে ফিরে তাকায়, পিছনে নূহা দাঁড়িয়ে আছে মেঘ নূহাকে দেখে মিষ্টি হাসি উপহার দেয়। নূহা মেঘের কাছে এগিয়ে আসে এরপর বলে
“ মেঘ তুমি কখন এসেছ? তোমার জন্য ক্লাস রুমের বাহিরে অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করছিলাম আমি। এতো দেরি কেনো হলো আসতে তোমার? “।
নূহার কথা শুনে মেঘের কাল রাতের ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। কাল সারারাত জেগে আদ্রিয়ানের সেবা করতে হয়েছে যার কারণে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। মেঘ মিথ্যা বাহানা দিয়ে বলে

“ সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছিল যার জন্য আসতে লেইট হয়ে গেছে “।
“ ওহ্ আচ্ছা “।
নূহার সাথে দেখা হওয়ার পর মেঘের মনে পড়ে কাল বিকালে কলেজ ছুটির পর নূহা আর মেঘ যখন একসাথে ক্লাস রুম থেকে বের হয়। তখন নূহা ওয়াশরুমে যায় আর মেঘকে বলে তার জন্য অপেক্ষা করতে। কিন্তু মেঘের ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে অনেকক্ষণ যাবৎত অপেক্ষা করছিল বিধায় মেঘ চলে যেতে বাধ্য হয়। নূহা ক্লাস রুমের দিকে পা বাড়ায় মেঘ তাকে থামিয়ে বলে

“নূহা কাল বিকালে তুমি ওয়াশরুমে যাওয়ার আগে আমাকে অপেক্ষা করতে বলেছিলে‚ কিন্তু তখন আমার ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে কলেজ গেইটে ওয়েট করছিল। যার জন্য তোমাকে রেখে চলে গেতে বাধ্য হয় ‚তুমি কি আমার উপর রাগ করেছ নূহা? আমি সত্যি দুঃখিত।“

মেঘের কথা শুনে নূহা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে
”ইটর্স অল রাইট মেঘ এখানে রাগ করার কি আছে? ”
আর তুমি আমার বন্ধু, বন্ধুর উপর কি কেউ রাগ করে?”
নূহার কথা শুনে মেঘ খুশি হয় যাক নূহা তার উপর রাগ করেনি। মেঘ বলে
”নূহা কাল বৃষ্টির মধ্যে কি বাসায় যেতে তোমার কোন সমস্যা হয়েছে? তুমি একা ছিলে তাই জিজ্ঞেস করলাম ”?
মেঘের মুখে কাল বৃষ্টির কথা শুনে নূহার তিহানের কথা মনে পড়ে। নূহার মেজাজ বিগড়ে যায় কিন্তু মেঘের উপর সে কোন রাগ দেখায় না। নূহা শান্ত হয়ে বলে
”না কোন সমস্যা হয়নি। আমি সুস্থ ভাবে বাসায় ফিরে গিয়েছিলাম।”

নূহা আর মেঘে এতোখন ক্লাস রুমের বাহিরে কথা বলছিল সেখানে আরো অনেক ছাএ ছাএী ছিল। ঘড়িতে যখন সাড়ে দশটা তখন ক্লাস রুমের ঘণ্টা বারি দেয় নূহা বলে
”মেঘ চলো ক্লাস রুমে যায় এখুনি স্যার চলে আসবে।”
”হুম চলো নূহা।”

‎___ ক্লাস রুমের প্রথম সারির সিটে বেশ অনেকটুকু জায়গা জুড়ে বসে আছে তিহান। আজ সে সকল ছাএ ছাএীর মধ্যে সর্বপ্রথম ক্লাসে এসেছে ‚ সাধারণ তিহান খুব ঘুম কাতারে মানুষ। সকাল দশটা তার কাছে মাএ ভোর পাঁচটা এই ঘুমের বদ অভ্যাসের কারণে তার মেডিক্যালের প্রথম ক্লাস সবসময় মিস যায়। তবে আজ সে সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে কলেজে এসেছে। অবশ্য এর একটা যুক্তিযুক্ত কারণ আছে তিহানের কাছে তার ওই কারণ হলো তার প্রথম প্রেম মানে মেঘ।

কাল বৃষ্টি ভেজা বিকালে যে রমণী তার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়ে ছিল এখন অবধি তাকে ভুলতে পারেনি সে। কাল সারারাত মেঘের কথা চিন্তা করে তার ঘুম আসেনি‚ বাস্তবে ‚ কল্পনাতে, শুরু মেঘের আবির্ভাব ছিল। তাই তিহান ঠিক করেছে আজ সে মেঘের সাথে বসবে যার জন্য সকাল তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে কলেজে চলে এসেছে। মেঘের জন্য প্রথম সারিতে তার পাশের জায়গা বরাদ্দ করে রেখেছে। কিন্তু মেঘ এখন আসছে না কেনো? ঘড়িতে দশটা বাজে আর ক্লাসের ঘণ্টা ও বারি দিয়ে ফেলেছে তবু ও কেনো আসছে না?

তিহান যখন দরজার দিকে তাকিয়ে আনমনে কথাগুলো চিন্তা করছিল। হঠাৎ তার চোখ যায় দরজার দিকে ক্লাস রুমের কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করছে মেঘ তিহান মেঘকে দেখে আজ ও তার প্রেমে পড়ে যায়। তিহান দ্রুত তার শার্ট আর চুল পরিপাটি করে নেয়। মেঘ আর নূহা যখন ক্লাস রুমের ভিতরে প্রবেশ করে নিজেদের সিট খুঁজতে ব্যস্তা ‚ তখন মেঘের চোখ যায় তিহানের দিকে। কাল বৃষ্টির মধ্যে এই ছেলে তাকে ছাতা দিয়েছিল ‚ মেঘ তিহানের দিকে এগিয়ে যায় আর বলে
”আপনার নাম তিহান, রাইট? কাল বৃষ্টির মধ্যে আমাকে ছাতা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন তাই না ”?

মেঘের কাল তিহানের কথা মনে আছে? তার মানে কি মেঘ ও প্রথম দেখায় তার প্রেমে পড়ে গিয়েছে? তিহানের মন আনন্দে আর খুশিতে উচ্ছাসিত হয়ে উঠে‚ তিহান বলে
”জি আমি তিহান কাল বৃষ্টির মধ্যে আমার আপনার দেখা হয়েছিল। ‎”
মেঘ তার কাঁধে থাকা ব্যাগের চেইন খুলে সেখান থেকে একটা ছাতা বের করে যা কাল তিহান বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ছিল। মেঘ ছাতা হাতলে ধরে তিহানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে
”তিহান এই নেন আপনার ছাতা। আর কালকে বৃষ্টির মধ্যে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে। ‎”

তিহান মেঘের হাত থেকে ছাতা নেয় এরপর বলে
‎”ছাতার জন্য আপনাকে ও ধন্যবাদ। মেঘ আপনি কি বসার জন্য সিট খুঁজছেন? এই প্রথম সারিতে জায়গা আছে। আপনি চাইলে এখানে আমার পাশে বসতে পারেন। ‎”
____ মেঘ তিহানের পাশে বসার জায়গা দেখল কিন্তু প্রথম সারিতে বসার অভ্যাস মেঘের নাই। মেঘ সবসময় সবার শেষে বসতে পছন্দ করে আর এই প্রথম সারিতে বসে থাকা মেয়েরা খুব অহংকারী আর বাঁচাল। মেঘ পড়াশোনা বা ক্লাসের মধ্যে ডিসটার্ব পছন্দ করে না। মেঘ বলে
‎” সরি তিহান‚ সত্যি বলতে আমি প্রথম সারিতে বসতে খুব একটা পছন্দ করি না। শেষের সারিতে জায়গায় আছে আমি বরং সেখানে গিয়ে বসে যায়। ‎”

মেঘের কথা শুনে তিহানের মন খারাপ হয়ে যায় সে এতো কষ্ট করে সকালে ঘুম থেকে উঠে। সবার প্রথম কলেজে এসে মেঘের জন্য জায়গা রেখেছে ‚ আর এখন মেঘ বলতে তার সাথে বসবে না। তিহান একটু মন খারাপ করে বলে
”‎ তবে কি আমার পাশের সিটটা খালি থাকবে? ‎
তিহানের সিট খালি থাকার কথা শুনে মেঘের মনে পড়ে নূহার কথা। নূহা কাল বলছিল সে শেষের সারিতে বসে বোর্ডের পড়া ঠিক করে দেখতে পায় না। তাছাড়া নূহার চোখের সমস্যা দূরের জিনিস সে স্পষ্ট দেখতে পায় না। নূহা সিট খুঁজছিল মেঘ নুহাকে ডাক দেয় আর বলে
‎”‎নূহা তোমাকে আর সিট খুঁজতে হবে না। এখানে প্রথম সারিতে সিট ফাঁকা আছে। ‎”

‎মেঘের কথা শুনে নূহা এগিয়ে আসে কিন্তু যখন নূহা তিহানকে দেখে তখন তার কাল বৃষ্টির ঘটনার কথা মনে পড়ে। তিহান ও নূহার দিকে তাকায় এরপর অবাক হয়ে জোরে বলে উঠে
”‎মিস ঝগড়ুটে আপনি? ‎”
”‎মিস্টার সয়তান আপনি? ‎”
নূহা আর তিহানের কথা মেঘ বুঝতে পারে না তারা একে অপরকে এমন অদ্ভুত নামে কেনো ডাকছে! মেঘ বলে
”‎নূহা, তিহান তোমারা কি একে অপরের পরিচিত? আর নূহা তুই এখানে বসে পড় তিহানের পাশে। ‎”

নূহা তিহানের দিকে তাকিয়ে রাগী কণ্ঠে বলে
”‎অসম্ভব মেঘ এই সয়তান লোকের পাশে আমি কখন বসব না। ‎”
নূহার কথা শুনে তিহান বলে
”‎মেঘ আমি ও এই ঝগড়াটে মহিলার সাথে বসব না অসম্ভব। ‎”
মেঘ নূহা আর তিহানের এমন কথার কারণ বুঝল না। মেঘ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ক্লাসে স্যার প্রবেশ করে। সকল ছাএ ছাএী দ্রুত তাদের সিটে বসে পড়ে, মেঘ বলে
”নূহা তুমি তিহানের সাথে বসো। আমি শেষের সারিতে গেলাম। ‎”

___ মেঘ কথাটা বলে চলে যায়। ক্লাসে স্যার চলে এসেছে নূহা বাধ্য হয়ে তিহানের পাশের সিটে বসে পড়ে। তিহান নূহার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচি দিয়ে বলে
‎”বিরিয়ানির এক ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম, আর শেষে কপালে জুটল ডাল – ভাত। কোথায় আমার প্রথম প্রেম মেঘ , আর কোথায় এই ঝগড়ুটে নূহা। শালার কপাল মন্দ তোর তিহান। ‎”

তিহানের বিরবির করা কথা নূহা শুনল না কিন্তু তিহান যে তাকে গাল মন্দ করছে তা সে বুঝতে পারল। নূহা বলে
”এই আপনি বিরবির করে কি বলছেন? ‎”
তিহান নূহার দিকে তাকিয়ে বলে
”যা আপনি কানে শুনেনি তাই বলেছি ‎”
”সয়তান ‚খাটাশ ‚ বজ্জাত লোক হলেন আপনি। ‎”
‎”ঝগড়াটে ‚কটকটি আর দজ্জাল মহিলা হলেন আপনি। ‎”

তিহান আর নূহা একে অপরের এই কথাগুলো বলে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ক্লাসে উপস্থিত স্যার ক্লাস করানো শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর ক্লাস শেষ হয়। ক্লাস শেষ হওয়ার পর মেঘ বই নিয়ে বসেছিল তখন বাহিরে থাকা ছাএ ছাএী দ্রুত ক্লাস রুমে ঢুকে বলে উঠে
‎”আদ্রিয়ান স্যার আসছে। সবাই ক্লাস রুমে চলে আসো। আদ্রিয়ান স্যার ক্লাস করাবে এখন। ‎”

ক্লাসের ছাএ ছাএী যখন আদ্রিয়ানের নাম নেয় তখন মেঘের হুঁশ ফিরে। আদ্রিয়ান স্যার ক্লাস করাবে মানে? আদ্রিয়ান কি কলেজে এসেছে? কিন্তু ওনি তো অসুস্থ সারাজীবন ধুম জ্বর ছিল শরীরে। এই অসুস্থ শরীর নিয়ে কলেজে কেনো এসেছেন ওনি? মেঘের ভাবনার মাঝে আদ্রিয়ান ক্লাস রুমে প্রবেশ করে। সকল ছাএ ছাএী উঠে দাঁড়ায়, হাতের ইশারা দিয়ে তাদের বসতে বলে আদ্রিয়ান।
সকল ছাএ ছাএী মধ্যে আদ্রিয়ানের চোখ যায় মেঘের দিকে। মেঘ তার দিকে রাগী আর কিছুটা অবাক হয়ে যাওয়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হয়ত সে অসুস্থ শরীর নিয়ে কলেজে এসেছে বলে রাগ করছে। সকালে আদ্রিয়ানের ঘুম ভাঙ্গে দশটায় কাল জ্বরের ঔষধের সাথে কড়া ঘুমের ঔষধ খেয়েছিল। যার জন্য ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়, আর সকালে জ্বর কমে গিয়েছিল আর শরীর সুস্থ লাগছিল তাই কলেজে চলে এসেছে সে। ক্লাস মিস দেওয়া উচিত হবে না। কাল রাতে মেঘ যে তার সেবা করছিল তা আদ্রিয়ান ভুলে যায়নি। সকালে উঠে মেঘ কলেজে চলে এসেছে যার জন্য তাকে ধন্যবাদ অবধি দেওয়ার সুযোগ হয়নি তার।
আদ্রিয়ান ক্লাস শুরু করে দেয় মেঘ আদ্রিয়ানের দিকে দাঁত কটমট করে তাকিয়ে মনে মনে বলে

‎”অসুস্থ শরীর নিয়ে ক্লাস করার খুব শখ না আপনার, ঠিক আছে করুন ক্লাস। রাতে যদি আবার জ্বর আসে তখন মেঘ কিন্তু সেবা যত্ন করবেন না, তখন আপনার ভালোবাসার জিয়াকে বলে দিয়েন সারারাত জেগে তার প্রিয় আদ্রিয়ানকে সুস্থ করতে। মেঘের ঠেকা পড়ছে এমন ঘাড়ত্যাড়া লোকের জন্য চিন্তা করতে। ‎”
ক্লাস চলাকালীন মেঘ একবার ও আদ্রিয়ানের দিকে তাকায় না যা আদ্রিয়ানের নজর এড়ায় না। ক্লাস শেষ করে যখন ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে যাবে আদ্রিয়ান তখন শেষের সারিতে বসে থাকা মেঘকে বলে

”মেঘ তোমাকে আমার কিছু নোটশ দেওয়ার আছে। একবার আমার কেবিনে আসো ”।
আদ্রিয়ানের বলা কথাটা মেঘ শুনে ক্লাসের সকল শিক্ষার্থী মেঘের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। মেঘ তা খেয়াল করল তবে কিছু বলল না কলেজে আদ্রিয়ান তার টির্চার তার আদেশ মেঘকে পালন করতে হবে। মেঘ বড় বড় পা ফেলে ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে যায়।

আদ্রিয়ান ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে কেবিনে যায়। কেবিনের দরজা খুলে ভিতর প্রবেশ করে দেখে সেখানে জিয়া বসে আছে। জিয়াকে দেখে আদ্রিয়ান খুব বেশি অবাক হয়না কিন্তু বিরক্ত হয়। আদ্রিয়ান মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে
”জিয়া তুমি এখানে কি করছ? ”…
”জিয়া এইটা কলেজ এখানে অন্তত অসভ্যতামি করো না? বেহায়ার মতো সব জায়গায় চলে আসো কেনো? ”
আদ্রিয়ানের কথা শুনে জিয়া বলে
”আদ্রিয়ান তুমি রাগ করছ কেনো? আমি তোমাকে একটা গুড নিউজ দেওয়ার জন্য এখানে এসেছি! ”..

”কি গুড নিউজ? তোমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে? ”
”হুম খুব শীঘ্রই আমার আর তোমার বিয়ে হবে? ”
জিয়ার কথা শুনে আদ্রিয়ান অবাক হয়ে বলে
” আমার আর তোমার মানে? মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে জিয়া কি বলছ তুমি? ”
জিয়া আদ্রিয়ানের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে
” হুম আমার আর তোমার বিয়ে হবে খুব শীঘ্রই। আব্বুকে বলেছি যে তুমি আর আমি একে অপরকে ভালোবাসি। তাই বিয়ে করতে চাই। ”…
জিয়ার কথা শুনে আদ্রিয়ান হয়ত অবাক হতে ও ভুলে গেছে। জিয়া আদ্রিয়ানের কাছে গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে তার থাকে থাকা আংটি আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে
”আদ্রিয়ান তুমি কি আমায় বিয়ে করতে রাজি আছো? ”
আদ্রিয়ানের রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে। ও জিয়ার হাত থেকে আংটি নিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে মারে আর চিৎকার করে বলে উঠে

”তুমি কি পা’গ’ল হয়ে গেছো জিয়া কি বলছ এইসব?তুমি ইরফান স্যারকে কি বলেছ? আমি তোমাকে ভালোবাসি না জিয়া। আমার দ্বারা কখন তোমায় বিয়ে করা সম্ভব নয়। ”
আদ্রিয়ানের এমন আচরণে জিয়ার ও রাগ হয় প্রচুর জিয়া বলে
”কেনো তুমি আমাকে বিয়ে করতে পারবে না আদ্রিয়ান? কেনো? উত্তর দাও? ”
জিয়ার কথা শুনে আদ্রিয়ান থমকে যায় কিন্তু এরপর আবার চিৎকার করে বলে
”তোমায় আমি কখনো বিয়ে করতে পারব না জিয়া। তার কারণ আমি বিবাহিত। বাংলাদেশে আমার স্ত্রী রয়েছে। ”
আদ্রিয়ানের কথা শুনে জিয়া নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। জিয়া বলে
” আদ্রিয়ান তুমি মিথ্যা কথা কেনো বলছ? তুমি বিবাহিত কি করে হতে পারো? তোমার স্ত্রী পরিচয় কি? কে তোমার স্ত্রী?”
আদ্রিয়ান শান্ত স্বরে বলে

”আমি তোমায় মিথ্যা কথা বলছি না জিয়া। আমি সত্যি বিবাহিত আমার স্ত্রী নাম মালিহা। একজনকে বিয়ে করে তাকে ডিভোর্স না দিয়ে অন্য কারো সাথে সংসার করা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। পরকীয়া করার মতো এমন জঘন্য কাজ আমি করতে পারব না জিয়া ”।

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৪

আদ্রিয়ান আর জিয়ার কথা দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ শুনছিল যার নাম মেঘ৷ মেঘ ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার কানে শুধু একটা কথা ভেসে উঠে। ” আমার স্ত্রীর নাম মালিহা ”। মেঘের মনে পড়ে তার আইডি কার্ডের নাম মালিহা। তবে কি আদ্রিয়ান মেঘকে স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিল? তাও আবার জিয়ার সামনে!

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৬