Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৪

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৪

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৪
অনামিকা তাহসিন রোজা

বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ ললিতা খাতুন মুচকি মুচকি হাসছেন আর ধারার দিকে দুষ্টুমি মাখা চোখে বারবার তাকাচ্ছেন। ব্যপারটা লক্ষ্য করেছে ধারা। কিন্তু অনেকক্ষণ পাত্তা না দিলেও এবার একটু নড়েচড়ে বসলো। আসলে শ্রাবণ যে ধারাকে কোলে করে বাগান থেকে নিয়ে এসেছে, পুরো দৃশ্য টাই বাড়ির দরজা থেকে হা করে তাকিয়ে দেখেছেন ললিতা খাতুন, এবং দেখে বেশ অবাকও হয়েছেন বটে। সেই সময় শ্রাবণের সামনে কিছু বলেন নি তিনি। যতই হোক, সম্পর্কে জামাই হয়! শুধু শুধু বেচারা ছেলেটা কে লজ্জা দেয়ার কোনো দরকার আছে? তাই তখন চুপচাপ কেটে পড়েছেন তিনি, আড়াল হয়েছেন। কিন্তু এখন শ্রাবণ পুকুরপাড়ে গোসল করতে গিয়েছে। এই সুযোগেই বারান্দায় ধারাকে বসিয়ে দুষ্টুমিভরা চোখে তাকে দেখছেন ললিতা।
আর এসব নিতে না পেরে ধারা বলেই বসলো,

—” এভাবে কী দেখছো ফুফু?”
ললিতা হাসিমুখেই বললেন,
—” উহু, কিছু না তো। কিচ্ছু না। আমি কিছুই চোখে দেখিনাই!”
বলেই ফিক করে আবারো হাসলেন তিনি। এ পর্যায়ে অপ্রস্তুত হয়ে গুটিয়ে এলো ধারা। খানিক ভ্রু কুঁচকে সংকুচিত গলায় বলে উঠলো,
—” হুহ! আমি তো জানি তুমি আমাকে দেখেই হাসছো! আশ্চর্য! আমাকে দেখে কি রহিমা খালা মনে হচ্ছে যে তুমি হাসছো আমায় দেখে।”
ধারা কথা শুনে এবার হো হো করে হেসে দিলেন মহিলা। আবারো খেপে উঠলো ধারা,
—” এই যে দেখো, আবার হাসছো! কি মুশকিল! হাসছো কেনো?”
ললিতা খাতুন এবার একটু গা ঘেঁষে বসলেন। ধারার দিকে চকচক করা দৃষ্টি ফেলে বললেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—”তোর জামাই মানে আমার জামাই-বাবাজান যে তোরে বাচ্চার মতো কোলে করে বাগান থেকে নিয়ে আইলো, সেইটা দেখে আমার মন ভইরা গেছে রে! ভাবতেও পারিনাই বাজান এত খেয়াল রাখতে পারে! খুব ভালোবাসে তোরে, দেখে যা বুঝলাম!”
ধারা যেন মুহূর্তেই পলক ফেলতে ভুলে গেল। গাল গরম হয়ে উঠছে, হাতের আঙুলের ডগা দিয়ে শাড়ির আঁচল মুচড়ে ধরল। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে জ্বিভ কাটলো সে। ইশ রে! ফুফু দেখে ফেলেছে। কিন্তু ভালোবাসার কথাটা ঠিক হজম করতে পারল না ধারা। ভালোবাসা একদম দুরের কথা, লোকটা তো তাকে পছন্দই করেনা! নিতান্তই মায়া দয়া করে এনেছে!
বিষয়টা হুট করে মাথায় আসতেই চিন্তিত হলো ধারা। মিইয়ে গেলো কিয়ৎপরিমাণ। ঠোঁট কাঁমড়ে ভাবতে থাকলো একদম বিয়ের রাত থেকে আজ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সব ঘটনা। ধারাকে ওমন করে চিন্তা করতে দেখে ললিতা বাহু ঝাঁকালেন,

—” এই ছেড়ি, কি ভাবোস রে? পিরিতের কথা কইতেই চিন্তাভাবনা শুরু হ্যাঁ? ”
বলে আবারো হো হো করে হাসলেন ললিতা, যেন বিষয়টা নিয়ে খুব মজায় আছেন।
আসলে, গ্রামের মানুষরাই এমন। সরল মনে সবকিছু চিন্তা করে। তবে মাঝে মাঝেই এই অতিরঞ্জিত চিন্তাভাবনা, নাক গলানো বিপদও ডেকে আনে। যেমন ধারাকে বারবার এই কথা বলে ললিতা খাতুন অজান্তেই কষ্ট দিচ্ছে মেয়েটাকে। কারন শ্রাবণ তো বারবার বলেছে, বারবার বুঝিয়েছে,— তোমায় আমি পছন্দ করিনা, তুমি আমার স্ত্রী নও। দীর্ঘশ্বাস ফেলল ধারা, বিবর্ণ মুখে বলল,

—” ফুফু, যেমন ভাবছো, তেমন কিছুই না। দয়া করে, তুমি এমন কথা বলো না!”
ললিতা খাতুন উল্টো বুৃঝলেন। ভাবলেন লজ্জা পাচ্ছে ধারা, তিনি হেসে মাথা নেড়ে বললেন,
—” আরে বোকা মাইয়া, লজ্জা পাস ক্যান রে? এমন জামাই পেলে মেয়ে ভাগ্যবতী হয়। আয়হায়! কিছুই তো কইলাম না, শুধু এই কথা শুনেই লাল হইয়া গেলি!”
ধারা বিরক্তির ভান করে চোখ ঘুরিয়ে নিল, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন এক নরম বিষাদ ভাবটা থামিয়ে রাখতে পারল না। ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

—” আমি ভাগ্যবতী না, ফুফু… উনি শুধু.. সাহায্য করেছেন। পায়ে কাঁটা বিঁধেছিল তো!”
—”সাহায্য করেছে, হুঁ…বেশ। আমি তো অনেক সাহায্যের দৃশ্য দেখছি জীবনে, কিন্তু কোলেপিঠে করে আনার মতো সাহায্য জীবনেও দেখিনাই!”
বলে আবারো হো হো করে হেসে উঠলেন ললিতা খাতুন। ধারা এবার ঠোঁট ভিজিয়ে মাথা নিচু করল। মনে মনে ভাবল, শ্রাবণকে গোসল সেরে ফেরার আগেই যদি চুপ করানো না যায়, তাহলে ফুফু পুরো গ্রামটাই জানিয়ে দেবে!
একটু পর শ্রাবণ মাথা থেকে পানি ঝরতে ঝরতে, ভেজা চুল দু’হাতে পেছনে চেপে ধরে বারান্দায় উঠল। ধারা তখনও ফুফুর পাশে আধা-বিব্রত, আধা-চুপচাপ বসে আছে। দু’জনের কথোপকথনের রেশ গরম বাতাসের মতো এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে। শ্রাবণ দাঁড়িয়ে চোখে একবার ধারার দিকে তাকাল, তারপর সংক্ষেপে বলল,

—” ঘরে চলো, তোমার সাথে একটু কথা আছে।”
ধারা কেমন যেন আঁতকে উঠল। ফুফুর সামনে এই হঠাৎ ডাক, বুকের ভেতর কেমন লজ্জা-ভয় মিশে ধপধপ শুরু করল।
—”কী কথা?”
গলায় অজান্তেই নরম সুর এসে গেল।
—”চলো, ভেতরে গিয়ে বলি।”
বলে হাতের ইশারায় ঘরের ভেতর দিকে দেখাল শ্রাবণ।
এই দৃশ্য দেখে ললিতা খাতুনের চোখ মুহূর্তে গোল হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে এক রহস্যমাখা হাসি ছড়িয়ে পড়ল। দু’হাত জোড়া করে কপালে ঠেকিয়ে নকল বিস্ময়ের ভঙ্গিতে ধারার কানে কানে বলে উঠলেন,
—”আহারে! এত সকালে আবার ঘরের ভেতরে গোপন কথা! বিয়ের পর পরই কি এ রকম চলে নাকি?”
ধারা গরম মুখে শাড়ির আঁচল দিয়ে কপাল মুছে ফেলল,

—”ফুফু, প্লিজ…!”
শ্রাবণ একবার ভ্রু কুঁচকে ফুফুর দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। কারন সে তো বুঝতেই পারেনি,এতক্ষণ ধরে তার ইজ্জতের হালুয়া হয়ে গেছে। আর সে এই সময় ধারাকে ডেকে সেই হালুয়াতে মিষ্টি মিশিয়েছে। ওগুলো না বুঝে ও বোঝার চেষ্টা না করে বরং ধীরস্বরে বলল,
—”চলো ধারা।”
ধারা অনিচ্ছায় উঠে দাঁড়াল, কিন্তু ফুফুর হাসি ততক্ষণে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তিনি নিচু গলায় নিজের সাথে সাথে এমনভাবে বললেন যাতে ধারা শুনে ফেলতে পারে,
—”বাহ! জামাই-বউর মিষ্টি সম্পর্ক দিনকে দিন বাড়তাছে দেখতেছি।”
ধারা এবার একদম থামল না। মাথা নিচু করেই শ্রাবণের পেছনে ঘরে ঢুকে গেল, কিন্তু ললিতা খাতুনের সেই দুষ্টুমি-ভরা চোখের ঝিলিক যেন ঘরের ভেতর পর্যন্ত পিছু নিল।

ঘরে ঢুকতেই দরজা এলিয়ে দিল শ্রাবণ। হাতে থাকা গামছাটা চেয়ারের উপর মেলে দিয়ে বিষাদ মুখে চেয়ে থাকা ধারার দিকে তাকালো। ধারা শ্রাবণকেই দেখছিল। শ্রাবণের ওমন তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি দেখে সহসা মাথা নিচু করল। শ্রাবণ এবার ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” ল্যাম্পপোস্টের মত দাঁড়িয়ে আছো কেনো? পায়ে ব্যাথা নেই? যাও, বিছানায় বোসো!”
প্রতিবারের মত এবারেও এক কথায় বুঝলো না ধারা, নিশ্চিত হতে মিহি কন্ঠে শুধালো,
—” হুম?”
শ্রাবণ নিজের ব্যাগে কিছু একটা খুঁজতে ব্যস্ত ছিল। ধারা কে মিনমিন করতে দেখে বিরক্ত হলো। খানিক জোরেই বলে উঠলো,

—” বিছানায় চুপচাপ বসতে বলেছি। এক কথা একবারে শোনো না কেনো?”
ধারা ঠোঁট উল্টালো। লোকটা কি তাকে ধমক দিল? এভাবে ধমক দিতে পারল? কি জানে হঠাৎ কি হলো ধারার! মন টা খারাপ করে মুখে আঁধার নামিয়ে টিপটিপ করে পা ফেলে বিছানার উপরে পা ঝুলিয়ে বসে পড়লো। আর কপাল খানিক কুঁচকে দেখতে থাকলো ব্যাগ হাতিয়ে কিছু একটা খুঁজতে থাকা মানুষটাকে! ইশ! গোসল করে এসে লোকটা কে কত সুন্দর লাগছে? চুল থেকে টপটপ করে পড়া পানির ফোঁটা গুলোও কি চমৎকার দেখাচ্ছে! ভিজে থাকা শক্ত চোয়াল টাও বেশ আকর্ষণীয় তো! আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করল ধারা। শ্রাবণের পিঠটা মারাত্মক ফর্সা! পুরুষ মানুষ এত ফর্সা হতে হবে কেনো? চোখ পিটপিট করেই বিষয়টা ভাবল ধারা। তারপর নিজের হাতের উপরের অংশ উঠিয়ে দেখলো। দুর থেকেই তুলনা করে আবিষ্কার করল তার হাতের থেকে শ্রাবণ শেখের পিঠ বেশি ফর্সা! বিষয়টা দেখে আবারো ঠোঁট উল্টালো ধারা। কিন্তু পরক্ষনেই নিজের ভাবনা চিন্তার এমন লাগামহীন গতি দেখে চমকে চোখ বড় করে তাকালো! ছি ছি! সে এতক্ষণ মানুষটাকে এভাবে দেখছিল! কি সর্বনাশ! কেও যদি দেখে ফেলত! ইশ! কি লজ্জা!

এর মধ্যেই কাঙ্খিত জিনিসটা ব্যাগে খুঁজে পেলো শ্রাবণ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা নীলরঙা টি শার্ট পড়ে নিল দ্রুত। হাতে খুঁজে পাওয়া জিনিসটা নিয়ে বিছানার কাছে এসে বসে পড়ল। ধারা দেখলো শ্রাবণের হাতে একটা মলম! মলমের ঢাকনা খুলতে খুলতেই শ্রাবণ আদেশ ছুঁড়ে দিল,
—” বিছানায় পা ওঠাও! ”
ধারা এবার বুঝলো, পায়ে কাঁটা বিঁধেছিল বলে শ্রাবণ মলম এনেছে। কিন্তু উনি কি নিজ হাতে মলম লাগিয়ে দেবেন? ছি ছি! এটা কীভাবে হয়? তাই আগ বাড়িয়ে বলল,
—” আমায় দিন। আমি লাগিয়ে নিতে পারব তো!”
মলমটা হাতে নিয়ে মেয়েটার দিকে শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করল শ্রাবণ। মুখে কিছুই বলল না। শুধু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েই রইলো। ধারা ওমন আগুনঝরা দৃষ্টি দেখে চোখ পিটপিট করে তাকালো। মনে মনে ভাবলো, আমি কি কোনো ভুল করলাম? প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে ধারার তাকিয়ে থাকা দেখে শ্রাবণ আগের থেকেও গম্ভীর স্বরে বলল,

—” বিছানায় পা ওঠাতে বলেছি আমি! কথা শোনো নি?”
শুকনো ঢোক গিলল ধারা। মিনমিন করে মাথা নেড়ে বলল,
—” জ্বি শুনেছি!”
আরেকটু গম্ভীর হলো শ্রাবণ,
—” তাহলে ওঠাচ্ছো না কেনো?”
—” না মানে, আমি তো….”
ধারার কথা শেষ হওয়ার আগেই ফট করে ধারার পা টেনে নিল শ্রাবণ। হুট করে পা টান দেয়াতে বেসামাল হয়ে পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেল ধারা। দুহাত পিছনে দিয়ে বিছানায় ভর দিল। শ্রাবণ এবার মলম টা আঙুলে নিয়ে ধারা পায়ের তালুর ঠিক মাঝখানে খানিকটা লাগিয়ে দিল, সহসাই ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠলো ধারা। চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। চোখ তুলল শ্রাবণ, কন্ঠে একরাশ মায়া নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—” খুব বেশি জ্বলছে?”
খিঁচে রাখা চোখজোড়া খুলল ধারা। মুগ্ধ দৃষ্টিতে শ্রাবণের দিকে তাকালো। শ্রাবণের দৃষ্টিতে স্পষ্ট মায়া দেখতে পাচ্ছে সে। জগতের সবকিছু ভুলে গিয়ে যন্ত্রের মত মাথা নেড়ে ধারা বলল,
—” উহু, জ্বলছে না!”
বিশ্বাস করল না শ্রাবণ। আগের থেকেও অনেক বেশি সাবধানে, আর খুব কোমল স্পর্শে মলমটা ঠিকঠাক লাগিয়ে দিল সে। এরপর বলল,
—” এখন হাঁটার দরকার নেই। চুপচাপ বসে থাকো!”
বরাবরের মত বাধ্য মেয়ে ধারা। পরকালে জান্নাত পাওয়ার জন্য সর্বদাই ভালো কাজ করেছে। তাই স্বামীর কথার অবাধ্য হয়ে জাহান্নামে যাওয়ার একচুলও ইচ্ছে নেই তার!

কলেজ থেকেই একে অপরের জিগড়ি দোস্ত জিহান আর শ্রাবণ। তাদের বন্ধত্ব এতটাই গভীর যে কলেজের গন্ডি পেরিয়ে শ্রাবণ যখন বিদেশে চলে যায় তখন জিহান খাওয়া-দাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিল। সেই সময়ে প্রকৃতি হয়তো তার জন্যই পাঠিয়েছিল মুনিরা কে। বাস স্ট্যান্ডে দেখা হয়েছিল দুজনের। প্রথম দেখাতেই সাংঘাতিক প্রেমে পড়ে যায় বেচারা জিহান। পরবর্তীতে জানতে পারে মেয়েটার মা নেই, বাবাই একমাত্র সব। তবে তার বাবা গত বছরে এক্সিডেন্ট করে শয্যাশায়ী হয়েছেন। যদিও ভদ্রলোকের ব্যাক্তিত্বের দাপট কমেনি। আর এখন মুনিরা একটা ভালো চাকরি খুঁজছে। বিষয়টা জানার পর জিহান কল করে নিজের বন্ধু শ্রাবণকে বিষয়টা জানায়। শ্রাবণ ঘটনাটা শুনে একটু চিন্তিত হয়। পরবর্তীতে তার মনে পড়ে, তার ছোট চাচ্চুর কথা এবং দ্রুত সুপারিশ করিয়ে সেই অফিসেই জয়েন হতে বলে মুনিরাকে। এদিকে শ্রাবণের নাম করে জিহান সাহায্য করে মুনিরাকে, আর এভাবেই মন জয় করে নেয়। ইন্টারভিউ তে বেশ ভালো পারফরম্যান্স করে মুনিরা। তাই ফলস্বরূপ সে শ্রাবণের চাচার অফিসেই চাকরি পেয়ে যায়।

কয়দিন আগে শ্রাবণ যখন বিদেশ থেকে এসে অফিসে জয়েন করলো, তখন শ্রাবণেরই অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে কাজ করতে শুরু করলো মুনিরা। এদিকে জিহানও একটা এনজিও তে চাকরি করে আর খুব তাড়াতাড়ি সে মুনিরাকে বিয়ে করার জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তবে যতই যা হোক না কেনো, এই পর্যায়ে এসে মুনিরা উপলব্ধি করতে পারছে যে সে কত বড় ভুল করেছে জিহানের মত একটা গাধার প্রেমে পড়ে। ছেলেটার না আছে বুদ্ধি, না আছে অন্য কিছু। শুধু খোদার দান করা সুন্দর চেহারাটাই রয়েছে। এই চেহারা ধুয়ে কি এখন পানি খাবে মুনিরা। প্রায় এক ঘন্টা যাবৎ সে অপেক্ষা করছে জিহানের আসার। সকালবেলা ওভাবে কথা বলার পর জিহান আরও বেশি ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে, মুনিরাকে রাজি করিয়েছে কফিশপে দেখা করার জন্য। বলেছে, মুনিরা না আসলে সে নাকি কমোডে মুখ ডুবিয়ে অক্কা পাবে! বিষয়টা শুনে মুখ কুঁচকেছে মুনিরা। মরার জায়গা বেছে নেয়ার জঘন্য রুচি দেখে আফসোস করেছে।

কিন্তু কিছু করার নেই। ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। এই কারনে অফিসে ছুটি নিয়ে মুনিরা কফিশপে ছুটে এসেছে। কিন্তু এসে এখন দেখে মহান ব্যাক্তি নিজেই এখনো আসেনি! অলসতার গোডাউন একটা! মুনিরার ইচ্ছে করছে জিহানের চুল একটা একটা করে ছিঁড়ে তাকে রাস্তায় ফেলে পে’টাতে! মুনিরার ভাবনা চিন্তার মাঝেই কোথা থেকে যেন ঝড়ের গতিতে দৌঁড়ে এসে টেবিলের উপর এসে পড়ল জিহান। মুনিরা কে দেখে মেকি হেসে কোনোমতে বুকপকেটে থাকা সানগ্লাস টা খুলে ফু দিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। মুনিরা খুঁজে খুঁজে কফিশপের এই টেবিলটাই বুক করেছে। কারন এই টেবিল বাকিদের বেশ আড়ালে।
মুনিরার অগ্নিঝরা দৃষ্টি দেখে চোখে মাত্রই পড়া সানগ্লাস টা খুলে নামিয়ে রাখলো জিহান। মুখ অন্ধকার করে গুটিয়ে বসলো, বাচ্চাদের মত মুখ করে মিনমিন করে বলল,

—” রাগ করেছো ছন্টুমন্টু?”
আরো বেশি ফুঁসতে লাগলো মুনিরা। চোখ দিয়ে যেন লাভা বেরোচ্ছে। দুহাত টেবিলের উপর রেখে শক্ত করে মুঠো করল সে। বাঘিনীর এমন রূপ দেখে জিহান এবার ঠোঁট ভিজিয়ে বলতে থাকলো,
—” ঢাকার জ্যাম আমার চেহারার থেকেও বেশি বাজে বিশ্বাস করো জান। আমি তো সেই কখন বেরিয়েছি। ধানমন্ডির জ্যাম সম্পর্কে তো জানোই! ”
—” আমরা মিরপুরে আছি।”
ফট করে বলা কথাটা শুনে আবারো মেকি হাসলো জিহান। ভুল করে ভুল জায়গার নাম বলে ফেলেছে সে। এখন কোনো না কোনো ভাবে বাঁচতেই হবে। তাই ও এবার আরো অযুহাত খুঁজতে শুরু করল।
অনেকক্ষন ভেবে জিহান মেকি হাসিটা আরও চওড়া করল, যেন কফিশপের আলোটা শুধু ওর দাঁতের জন্যেই জ্বলে উঠেছে। চোখ টিপে বলল,

—”আসলে ব্যাপারটা হলো, রওনা দিয়েছিলাম তো.. কিন্তু রিকশাওয়ালার সাথে একটু তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলাম। সে বলল, ভাই, আমার রিকশা ল্যাম্বরগিনি স্পিডে যাবে। আমি তো এসব ঢপের কথা মানব না, তাই বললাম, তাহলে ব্রেকও ল্যাম্বরগিনির মতো ধরো! ব্যস, নেমে গেলাম রাস্তায়!”
মুনিরা চোয়াল শক্ত করল, প্লেটের কাঁটা চামচ টা জোরেসোরে ধরল,
—”তাহলে হাঁটতে হাঁটতে এসেছো?”
জিহান ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

—”না প্রিয়তমা, কি যে বলো! তারপর এক ভদ্রলোক বললেন তিনি আমাকে শর্টকাট দেখাবেন। শর্টকাট বলতে উনি আমাকে নিয়ে গেলেন এমন এক গলিতে যেখানে শুধু সবজি আর শুকনো মাছের দোকান। অর্ধেক পথে মনে হলো আমি নেপালে যাচ্ছি!”
মুনিরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। যেকোনো সময় হাতের কাটা চামচটা সে জিহানের গলায়ও চেপে ধরতে পারে। জিহান এবার নাটকীয়ভাবে হাত নেড়ে বলল,
—”তাও তো সময় মতো পৌঁছে যেতাম, কিন্তু তখনই আমার সামনে এক বাচ্চা কবুতর রাস্তা পার হচ্ছিল। আমি তো মানুষ নাকি? আমি থেমে গেলাম। তার মা-বাবা যদি না পেতো তাহলে? তাই আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত করলাম, সে সেফলি অন্যপাশে চলে গেল কিনা!”
মুনিরা ঠান্ডা গলায় বলল,

—”আচ্ছা, তারপর?”
জিহান গম্ভীর মুখে বলল,
—”তারপর আমার জুতোর ফিতা খুলে গেল। জান, ট্রাস্ট মি মোনা, আমি ফিতা বাঁধতে বাঁধতে এমনভাবে নিচু হয়েছিলাম, এক লোক ভেবে ফেলল আমি নাকি প্রপোজ করছি। সে হ্যাঁ বলার আগেই আমি দৌড় দিয়ে পালালাম! জোর বাঁচান বেঁচে গেছি। উফ! আজকালকার ছেলেরাও না! কি যে দুষ্টু হয়েছে!”
মুনিরার গায়ের রক্ত যেন ফুটে উঠল। জিহান এবার বুক চাপড়ে বলল,
—”শপথ করে বলছি জান, আমি যদি তোমার জন্যে আসতে গিয়ে এইসব অ্যাডভেঞ্চার না করতাম, তাহলে এখনই আমি তোমার সামনে বসে চায়ের বদলে এম্বুলেন্স ডাকতাম!”
মুনিরা হাত দুটো টেবিলে ঠুকে বলল,

—”তুমি যদি নাটক শেষ করে সোজা মূল কথায় না আসো, আমি এখানেই তোমার সেই কমোডে ডুব দেওয়ার ইচ্ছেটা পূরণ করে দেব জিহানের বাচ্চা! ”
জিহান মনে মনে ভয় পেল, তবুও মৃদু হাসল, মনে মনে ভেবে নিল তার প্রেমের আসল স্পাইসি ফ্লেভার তার গার্লফ্রেন্ড নিজেই। মেকি হেসে এবার জিহান বলল,
—’ ঠিক আছে, মূল কথায় আসি। তোমার হিটলার বাপ, থুক্কু, শ্রদ্ধেয় মাননীয় শ্বশুর মশাই কি আমায় মেনে নেবে জান? আমার তো ভয়ে কিডনি কাঁপছে! প্রস্তাব নিয়ে যেতেই ভয় করছে!”
জিহান কথাটা বলেই শুকনো ঢোক গিলল, যেন মুনিরার বাবার নাম শুনলেই তার হার্টবিট মেট্রো রেলের চেয়েও দ্রুত ছুটে চলে। কফির কাপে হাত রাখল, কিন্তু হাত এতটাই কাঁপছে যে কাপের ভেতরের কফি ঢেউ তুলে ওঠানামা করছে। জিহান আবারো বলল,

—” জান, তোমার বাপ মানে.. উনি মানুষ না, উনি এক চলন্ত কোর্ট ম্যাটেরিয়াল! আমি যদি প্রস্তাব দিতে যাই, মনে রেখো, ওটাই হবে আমার প্রেমের ফাইনাল এপিসোড। খবরের শিরোনাম হবে— বিয়ের প্রস্তাব দিতে গিয়ে তরুণ নিহত!”
মুনিরা চোখ ছোট করে তাকাল। তর্জনী তুলে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
—” একদম বাজে কথা বলবে না জিহান! অযুহাত দিতে আসল একদম বাটনা বেটে দেব তোমার, জিন্দেগীতে আর লুতুপুতু করতে পারবেনা!”
ভয় পেলো জিহান। কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে চোখ পিটপিট করল। মুনিরা আবারো বলল,

—” অনেক হয়েছে, আর না! তুমি না গেলে এবার আমি যাব, আর বাবাকে বলব, তোমার সাহস নেই। তখন কি করবে?”
জিহান চোখ গোল করে বলল,
—”না না না! তুমি গেলেই উনি বলবেন, এই ছ্যাবলা কোথা থেকে এলো, কীভাবে আমার মেয়েকে ফাঁদে ফেলল? না জান, আমি ওই সিংহের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর আগে নিজের উইল লিখে রাখব!”
মুনিরা এবার হাত গুটিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
—”জিহান, তুমি যদি এখনই সাহস না দেখাও, তাহলে আমি ধরে নেব তুমি আমাকে ভালোবাসো না। এতদিন নাটক করেছো!”
এই কথা শুনেই জিহানের মাথা যেন ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। এবার কিছুটা তড়িঘড়ি করে জিহান বলল

—”ভালোবাসি না? আমি? এমন পচা কথা বলে না জান! আমি তো তোমায় খুব ভালোবাসি! এমন ভালোবাসি যে তোমার জন্য কাবাবও ভাগ করে খেতে রাজি! কিন্তু তোমার বাপের মুখোমুখি হওয়া মানে তো… জান, আমার শরীরের ২০৬ টা হাড়ও তার সামনে গিয়ে ২০৬ টুকরো হয়ে যাবে!”
মুনিরা ঠোঁট কামড়ে চেপে রাখল হাসি, কিন্তু মুখে কড়া গলাতেই বলল,
—”কালকেই যাবে তুমি। না গেলে সম্পর্ক শেষ।”
জিহান চেয়ারে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল, দুহাত তুলে দোয়া চেয়ে বলল
—”হে খোদা, যদি কাল আমি বেঁচে ফিরি, তাহলে আমায় নোবেল পুরস্কার দিও। কারণ আমি মানুষের ইতিহাসে প্রথম মৃত্যুভয় কাটিয়ে প্রেমিকের বাপের সাথে দেখা করা মানুষ হব!”

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ঘুমিয়েছিল শ্রাবণ। গ্রামে আর যাই হোক, পরিবেশ টা এতটাই মনোরম যে, সবারই অন্তত দুপুরে ঝিঁঝি পোকার ডাকে নীরব থমথমে পরিবেশে ঘুমটা একদম পরিপূর্ণ হয়। শহরে হাজারো কোলাহলের ভিড়ে তো তা সম্ভব না। বিকালের দিকে ঘুম ভাঙলো শ্রাবণের। পুকুর থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে চোখেই খুঁজলো ধারা কে। অথচ কোথাও দেখা গেলো না মেয়েটাকে। একটু চিন্তিত হলো শ্রাবণ। পুকুরপাড় থেকে শুরু করে ঘর পর্যন্ত সব জায়গাতেই চোখ বুলিয়েছে সে। আশ্চর্য! গেলো কোথায় মেয়েটা। যদিও ধারা কোথায় গেল, এ নিয়ে মাথা ব্যাথা থাকার কথা না শ্রাবণের। কিন্তু কেনো যেন চোখের আড়াল হলেই অবচেতন মনটা না চাইতেও ধারাকে খুঁজছে, গ্রামে আসার পর থেকেই এমনটা হচ্ছে। কিন্তু কোনো কারন খুঁজে পেলো না শ্রাবণ। নিজের উপরেই বিরক্ত হলো।
এর মধ্যে ললিতা খাতুন কিছু পিঁয়াজু ভেজে উঠোনে শ্রাবণকে খেতে দিলের। শ্রাবণ লক্ষ্য করেছে যেদিন থেকে সে এসেছে, সেদিন থেকেই বিকেলে তাকে বিভিন্ন ভাজাপোড়া খাওয়ানো হচ্ছে। বিষয়টা অনেক কিউট হলেও শ্রাবণের অস্বস্তি হয়। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে সে মেকি হাসলো। কিন্তু অনেকক্ষণ পর লাজ লজ্জার বিসর্জন দিয়ে বলেই উঠলো,

—” ধারা কোথায় ফুফু?”
ললিতা খাতুন পান খাওয়া দাঁত গুলো বের করে হাসলেন, তারপর বললেন,
—” ওইযে পুকুরের পাশে যে একখান বাঁশঝাড় দেখছো না?”
শ্রাবণ মাথা নেড়ে বলল,
—” জ্বি দেখেছি!”
ললিতা খাতুন শাড়ির আঁচল ঠিক করে বললেন,
—” ছেড়ি রে ওই বাঁশঝাড়ের দিকে পাঠাইছি! তুমি নাকি লাউয়ের তরকারি পছন্দ করো বাজান। আমাদের কয়েকটা লাউয়ের গাছ আছে ওই জায়গাতে। এত বড় বড় কয়েকটা লাউ হইছে। সকালে দেইখা আইছি। ওরে ওইজন্য পাঠাইলাম দুইডা লাউ আনতে! রাতে রান্না করুম!”

শ্রাবণ মিষ্টি হেসে বুঝদার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো। তবে সে যে লাউয়ের তরকারি পছন্দ করে এটা ধারা কিভাবে জানতে পারলো এ নিয়ে একটু চিন্তিত হলো শ্রাবণ। মেয়েটা দেখছি তার সব পছন্দ অপছন্দ সম্পর্কে ধারণা রেখেছে। এবার তার মন চাইছে সেখানে যেতে। ললিতা খাতুন মনে হয় বুঝে ফেললেন শ্রাবণের মনোভাব, তাই তিনি বললেন,
—” ও বাজান, তুমিও যাও তাইলে। দেইখা আসো। ওই জায়গাখান মেলা সুন্দর বুঝলা? উঁচু একখান জায়গা, আর নিচের দিকে বড় বড় জমি। মেলা বাতাস হয় ওইখানে। গেলে আর ফিরতে মন চাইবো না। একবার দেইখা আসতে পারো।”
ললিতা খাতুন মনে করেছিলেন শ্রাবণ যাবেনা। অথচ শ্রাবণ দুটো পিঁয়াজু খেয়ে সত্যি সত্যি বেরিয়ে পড়ল ওই বাঁশঝাড়ের দিকে।

বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে রোদের আলো চিকচিক করে পড়ছে। দুপুরের পরের সেই নরম, সোনালি আলোতে পুরো জায়গাটা যেন অন্য জগৎ। হালকা বাতাসে বাঁশের পাতাগুলো সুর করে দুলছে, আর তার সাথে কচি পাতার ঘষাঘষির মৃদু শব্দ, যেন কোনো গোপন ফিসফিসানি চলছে। লাউগাছগুলো মাচার ওপর ঘন হয়ে ছড়িয়ে আছে। গাঢ় সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলে আছে মোটা, গোলগাল লাউ, যেন কচি শিশুর মতো মায়া ছড়াচ্ছে।
ধারা ওগুলো দেখেই হাসলো। খুশি হয়ে খালি পায়েই নরম ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে, হাতের আঙুলে আঁচল গুটিয়ে কোমরে গুঁজে রাখলো, যাতে কাজে সুবিধা হয়। তার মুখে একাগ্র মনোযোগ, পাতার ভেতর থেকে বেছে নিচ্ছে একেবারে সেরা দুটো লাউ। সে একবার মাথা উঁচু করে মাচার নিচ দিয়ে তাকায়, কোনটার রঙ ঠিকঠাক, কোনটা বেশি দিন রাখা যাবে, কোনটার গায়ে দাগ নেই, এসব খুঁটিনাটি যাচাই করছে। গাছের ডগা থেকে একপাশে ঝুলে থাকা একটা লাউ হাত দিয়ে নেড়ে দেখে, তারপর হালকা মাথা নেড়ে অন্যটার দিকে যায়।

হঠাৎ বাতাসে ধারার চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়ে। ধারা দাঁতে ঠোঁট চেপে ওগুলো কানের পেছনে সরায়, তারপর হাত বাড়িয়ে একটা লাউয়ের ডাঁটা ধরে ফচ করে কেটে ফেলে। সেই কাটা লাউ আঁচলের ভাঁজে রাখতেই অন্য হাতে আরেকটা লাউয়ের ডাঁটায় হাত দেয়। তার নড়াচড়া একেবারে অভ্যস্ত গৃহস্থ মেয়ে-সুলভ, তাড়াহুড়ো নেই, আবার ঢিলেমিও নেই। কিন্তু লাউটা বেশ ভারি হওয়ায় আঁচলে নিতে পারল না ধারা। তাই ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে এসে ঘাসের উপর লাউ টা রেখে উঠে দাঁড়াতেই বুক কেঁপে উঠে তার।
সামনে একটা বড় গর্ত রয়েছে, যেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়। সেই দিকটাতে তাকিয়ে চমকে ভয় পেলো ধারা, চোখ বড় করে তাকালো। কারণ সেখানে পাঁচ-ছয়টা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডাকছে। গ্রামে খুব একটা কুকুর দেখা যায় না। কিন্তু বিশেষ বিশেষ সময় গুলোতে কুকুরের উৎপাত বেড়ে যায়। যেমন গতকালকে দু একটা বাড়ির পাশে কোনো এক বাড়িতে বিয়ের আয়োজন হয়েছিল, সেখানে খাওয়া-দাওয়ার উৎকৃষ্ট অংশ এই ভাগাড়ে ফেলা হয়েছে, যে কারণে কুকুর এসে ভিড় জমিয়েছে।

এদিকে ধারার মতো মেয়ে জীবনে কোনো কিছুকেই তেমন ভয় পায় নি, কারণ অনেক নির্মম পরিস্থিতি পেরিয়ে এসেছে সে। কিন্তু এত কিছুর পরেও ধারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় একটা জিনিস কেই। সেটা হলো —কুকুর। ছোট থেকেই কুকুরকে চরমভাবে ভয় পায় ধারা। তাই এই মুহূর্তে নির্জন জায়গাটাতে একা একা দাঁড়িয়ে এতগুলো কুকুর দেখে তার পা কেঁপে উঠলো। শুকনো ঢোক গিলে দ্রুত এখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ধারা। কিন্তু কুকুরগুলো এবার আরো বেশি ঘেউ ঘেউ করা শুরু করলে ধারা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। আর কান্নার শব্দে দুটো কুকুর এবার ধারার দিকেই এগোতে থাকে।

ধারা ভয়ে হঠাৎ মাটির উঁচু ঢিবি টা থেকে লাউটা গড়িয়ে ফেলল, কিন্তু সেটা তুলবার সাহসও হলো না। তার চোখ কেবল কুকুরগুলোর দিকে, দাঁত বের করে, লেজ উঁচু করে এগিয়ে আসছে দুটো, বাকিগুলো পেছনে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করছে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ধারা আঁচলটা চেপে ধরে দৌঁড় দিল বাঁশঝাড়ের ফাঁক গলে। খালি পায়ের ধুপধাপ শব্দ মিশে গেল শুকনো বাঁশপাতার মর্মরের সাথে।
কিন্তু তাড়াহুড়োয় সামনের ছোট্ট এক গর্তে পা আটকে গেল। ধারা ভারসাম্য হারিয়ে হোঁচট খেল, আর ঠিক তখনই বাঁশঝাড়ের ছায়া ভেদ করে এদিকে পা রাখা শ্রাবণের সঙ্গে ধাক্কা খেল সজোরে। প্রথমে ধারা বুঝতেই পারল না কীসের সাথে ধাক্কা খেল। শুধু বুকের সামনে শক্ত, উষ্ণ কিছু একটা টের পেল। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরই বুঝে গেল, এটা শ্রাবণ। ভয়ে কোনো কিছু ভাবল না ধারা। ফট করে আর এক মুহূর্ত না ভেবে, পেছনে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে আতঙ্কে সে দুহাত দিয়ে শ্রাবণের গলা জড়িয়ে ধরল, ঠিক যেন পানিতে ডুবন্ত কেউ ভরসার কাঠি পেয়েছে। শক্ত করে শ্রাবণকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকলো,

—” আমাকে বাঁচান, বাঁচান আমাকে। ওখানে কুকুর! অনেকগুলো কুকুর!”
শ্রাবণ প্রথমে অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ভাবতেই পারেনি এখানে পা রাখার সাথে সাথে একটা ঝড় এসে তার বুকে পড়বে। মেয়েটার শ্বাস ছোট ছোট, কাঁধ কাঁপছে, আর আঙুলের চাপে বোঝা যাচ্ছে কতটা ভয় পেয়েছে সে। পেছনে তাকিয়ে শ্রাবণই এবার কুকুরগুলোর দিকে তাকিয়ে চোখ কুঁচকালো। আর হাত দিয়ে তাড়িয়ে দিল সব কুকুরকে।
ধারা এখনো কাঁপছে। চোখ খিঁচে বন্ধ করে শক্ত করে শ্রাবণের পিঠের কাছের টি শার্ট ধরে আছে। ওর কাঁপুনি টের পেল শ্রাবণ। শুকনো ঢোক গিলে এক হাত ধারার মাথায় রাখলো, একবার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
—” শান্ত হও। কুকুর নেই এখন, সব চলে গেছে!”

শ্রাবণের শান্ত, গভীর কণ্ঠস্বর কানে যেতেই ধারার বুকের ভিতরের ঢেউটা ধীরে ধীরে থেমে আসল। কিন্তু হঠাৎ বুঝে গেল, সে এতক্ষণ কী অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তার আঙুলগুলো এখনো শ্রাবণের টি-শার্টে গেঁথে আছে, গলার চারপাশে তার হাতের চাপ স্পষ্ট। ঠিক তখনই নিজের অবচেতন কাজটা ধারা টের পেল। মুহূর্তের মধ্যে গাল বেয়ে গরম লালচে রঙ ছড়িয়ে পড়ল, যেন লজ্জার আগুনে মুখটা পুড়ে যাচ্ছে। ফট করে সে হাত সরিয়ে নিল, দুই কদম পেছিয়ে দাঁড়াল, আর আঁচলের কোণা মুঠো করে চেপে ধরল। চোখ তুলতে পারল না ধারা, পায়ের আঙুল দিয়ে মাটির ঘাস খুঁটতে লাগল, যেন হঠাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি কাজ সেটাই। আর ঠোঁট সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু কোনো কথা বেরোল না।

শ্রাবণ কেবল তাকিয়ে রইল, চোখে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি, বিস্ময়, মায়া, আর এক চিলতে চাপা হাসি প্রকাশ পেলো।
ধারা এবার খুব বেশি লজ্জা পেয়ে কানের পেছনে চুল গুঁজে একটু একটু করে কদম ফেলে পেছাতে থাকলো। কিন্তু দু কদম পেছাতেই এবার হুট করেই কোনো এক কারণে শ্রাবণ নিজেই ধারার কনুই চেপে ধরে এক টানে নিজের কাছে নিয়ে আসল।
অপ্রস্তুত হলো ধারা, নিজেকে সামলাতে পারল না। হঠাৎ এমন করে হাত ধরে টান দেয়াতে ঝড়ের গতিতে এসে আবারো শ্রাবণের বুকের উপর পড়ল। তবে এবার হাত দুটো মুঠো করে পড়ে রইলো শ্রাবণের বুকের কাছটায়৷ বড় বড় চোখ করে ধারা পিটপিট করে তাকালো শ্রাবণের দিকে। ইশারাতেই যেন চোখ দুটো জিজ্ঞেস করলো কেন এভাবে তাকে টেনে আনলো শ্রাবণ।
শ্রাবণ হয়তো হুঁশে নেই। সে এক পলকেই স্নিগ্ধ মুখশ্রী টা দেখ নিল। চোখে মুগ্ধতা নিয়ে ধারার চোখের দিকে তাকিয়ে অন্যরকম গলায় বলে উঠলো,

—” পেছনে গর্ত ছিল। আবারো হোঁচট খেতে! ”
ধারা এবার কোনোমতে আতঙ্কিত চোখ দিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখলো আসলেই একটা ছোট গর্ত দেখা যাচ্ছে। আরেকটু পেছালেই উল্টে পড়তো ধারা। তা দেখেই আবারো চোখ ফিরিয়ে শ্রাবণের দিকে তাকালো ধারা। শ্রাবণ আরেকবার ধারার চোখে চোখ রেখে কনুই টা ছেড়ে দিল। ধারাও শ্রাবণের বুকের কাছ থেকে হাত দুটো সরিয়ে আনলো।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণ। আশেপাশে তাকিয়ে জায়গাটা দেখতে গিয়ে হুট করেই চোখ আটকালো ধারার শাড়ির দিকে।
আঁচল পেঁচিয়ে কোঁমড়ের কাছে গুঁজে রেখেছে মেয়েটা, ফলস্বরূপ পেটের খানিক ফর্সা অংশ টুকু স্পষ্ট দেখতে পেলো শ্রাবণ। পুরুষের চোখ মারাত্মক! একদম ঠিক জায়গাতেই পড়ে। তাই না চাইতেও পেটের দিকে চোখ গেলো শ্রাবণের। শুকনো ঢোক গিলল সে। আজব তো! পিচ্চি মেয়েটা এভাবে আঁচল কোঁমড়ে গুঁজে রেখেছে কেনো? মনে মনে এসব ভাবলেও চোখ সরেনি শ্রাবণের।

ধারা এবার হুট করে শ্রাবণের দৃষ্টি লক্ষ্য করে আবারো লজ্জা পেলো। তৎক্ষনাৎ আঁচল কোঁমড় থেকে বের করে নামিয়ে ঠিকঠাক করে নিল। অপ্রস্তুত হয়ে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
শ্রাবণের ভ্রু কুঁচকে ওঠায় ধারা আরও বেশি গুটিয়ে গেল। তার মনে হলো, যেন শ্রাবণের সেই দৃষ্টি ভেদ করে ভেতরের সব লজ্জা, সব অস্থিরতা পড়ে ফেলছে। শ্রাবণ এবার ধীরে, খানিক কর্কশ অথচ নিচু স্বরে বলল,

—” গ্রামে জায়গা-জমি ফাঁকা, বাতাসও বেশি..কিন্তু এখানে এমনভাবে হাঁটতে নেই, বুঝলে? সাবধান না হলে বিপদ হবেই।”
গলায় উপদেশের সুর থাকলেও চোখে এখনো সেই অদ্ভুত স্থিরতা, যা ধারা আর সহ্য করতে পারল না। সে গলা খাঁকারি দিয়ে নিচু স্বরে বলল,
—” আমি তো… আমি কেবল লাউ তুলছিলাম..!”
—” জানি,” শ্রাবণ উত্তর দিল সংক্ষিপ্তভাব। কিন্তু সুরে এমন কিছু ছিল যা ধারা ঠিক বুঝতে পারল না, বিরক্তি, না কি চিন্তা।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৩

বাতাসে বাঁশপাতার খসখস শব্দ ভেসে এলো। ধারা চোখ নামিয়ে পায়ের কাছে থাকা পাতাগুলোর তাকাল, যেন ওটাই এখন তার একমাত্র ভরসা। শ্রাবণ তখনো তাকিয়ে আছে, ঠোঁটের কোণে এক মিলিমিটারও নড়াচড়া নেই। মনে মনে আবিষ্কার করল পিচ্চিটাকে যতটা পিচ্চি ভেবেছে ততটা পিচ্চিও নয়, নইলে এভাবে শ্রাবণের দৃষ্টি স্থির করতে সক্ষম হলো কীভাবে!

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৫