Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৮

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৮

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৮
অনামিকা তাহসিন রোজা

বাসের যাত্রাটা গত দিনের থেকে বেশ আরামদায়ক ছিল। অন্তত শ্রাবণের কাছে মনে হয়েছে এমন কিছুই। কারন ধারা বাসে উঠার কয়েক মুহুর্ত পর আবারো ঘুমিয়ে গেছিল। আর শ্রাবণ এবারো আড়ালে ওর মাথাটা নিজের কাঁধে এনে রেখেছিল। বিষয়টা শ্রাবণের কাছেও বেশ ভালো লাগে। কারন বাসে অসস্তি হলেও কাঁধের ওই কোমল ভারটা অনুভব করতেই ঘুম এসে যায়, অন্যরকম আবেশ কাজ করে। যদিও আজ ঘুমোয়নি শ্রাবণ। ভেবেছে সে! আজকাল সে ভাবছে! খুব ভাবছে!

বিয়ের প্রথম রাতে যখন শ্রাবণ ধারাকে দেখেছিল, তখন রীতিমতো পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে উঠেছিল। তার মেয়েটাকে দেখলেই কোনো কারণ ছাড়া রাগ লাগতো। ইচ্ছে করতো অকারণে বকতে, ধমকাতে চোখের সামনে দেখতেই ইচ্ছে করতো না। কিন্তু সেই কঠিন, নির্দয় অনুভূতি টা আর নেই মনে হয়।
গ্রামে এসে অনেক সান্নিধ্যে ছিল তারা। প্রায় পুরোটা সময়ই মেয়েটাকে পরখ করেছে সে। আর বারবারই অভিভূত হয়েছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে ধারার বয়স কিছুটা কম! কিন্তু তাতে কি? এটুকু বয়সে মেয়েটা যত ঝড় ঝাপটা সহ্য করেছে, যেভাবে চাচা-চাচীর অত্যাচার সহ্য করেছে, পারিবারিক কাজকর্ম শিখেছে, সেভাবে তো কোনো সাধারণ মেয়ে থাকে না!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শ্রাবণের সাথে বিয়ে হয় যে ধারা মোটামুটি একটা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে এসেছে এটা এই মুহুর্তে আবিষ্কার করেছে শ্রাবণ। তখনি শ্রাবণের ভেতরকার বিবেক সত্তা চেঁচিয়ে উঠলো,
—’ মোটেই না! ধারা মোটেই জাহান্নাম থেকে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করেনি। বরং একইভাবে, একই কষ্টে, একই নিয়মে, শুধু ভিন্ন স্থান থেকে, সে অবহেলা পেয়েছে। আগে পেয়েছে চাচা চাচির কাছ থেকে, আর এখন পাচ্ছে স্বয়ং তার স্বামীর কাছ থেকে!”

শ্রাবণের বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠলো। তাহলে ধারা আসলেই কারো কাছেই ভালোবাসা নামে কিছু পায়নি? সবসময় কেবল কষ্ট, সবসময় অপমান…অথচ সে, শ্রাবণ শেখ, স্বামী হয়েও কি দিয়েছে? সে তো চাইলে অন্তত একটা নিরাপদ বুকে আশ্রয় দিতে পারতো। অথচ দেয়নি। বরং প্রথম রাতেই সে নিজেই ধারার চোখে ভয় বসিয়েছে, অপছন্দের দেয়াল তুলে দিয়েছে। শ্রাবণ ঠোঁট কামড়ে নিল। মাথার ভেতর কেবল একটা সত্যি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, ধারা শুধু অবহেলিত হয়েছে, প্রতিবার। আর সেই অবহেলার অংশীদার এখন সেও।
মেয়েটা পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, মাথা তার কাঁধে হেলে আছে। কত সহজে ভরসা করছে, অথচ সে ভরসার যোগ্য তো কখনোই ছিল না! চোখের কোনায় অদ্ভুত একটা ভার অনুভব করলো শ্রাবণ। হঠাৎ যেন নিজের ভেতরে প্রতিজ্ঞার মতো একটা অনুভূতি জেগে উঠলো, এবার থেকে ধারা অবহেলিত হবে না। অন্তত তার জীবনে যতদিন শ্রাবণ আছে, ততদিন না।

শ্রাবণ ঠোঁট চেপে ধরলো, বুকের ভেতর দ্বিধার ঝড়। ভালোবাসা শব্দটা তো তার কাছে কখনোই সহজ ছিল না। জীবনে সবকিছু হিসেব করে চলেছে সে। কোথায় কত সময় দিবে, কার সাথে কেমন ব্যবহার করবে। ভালোবাসা? ওটা তো তার কাছে একপ্রকার বিলাসিতা। কিন্তু এখন, ধারা ঘুমিয়ে আছে মাথা তার কাঁধে, তার ছোট্ট নিঃশ্বাস বুক ছুঁয়ে যাচ্ছে, এই মুহূর্তে শ্রাবণ বুঝলো, ভালোবাসা আসলে কোনো বিলাসিতা না। এটা প্রয়োজন। ধারা যেমন পানির জন্য পিপাসিত, ঠিক তেমনি ভালোবাসার জন্যও পিপাসিত। মনে মনে শ্রাবণের সত্তাটাই বলে উঠলো। তুই পারিস শ্রাবণ! তুই চাইলে ওকে ভালোবাসতে পারিস। ওর পাশে দাঁড়াতে পারিস। প্রশ্নটা যেন বারবার তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো। ভালোবাসা কি কথায় প্রকাশ করতে হয়? নাকি কাজে? সে কি কখনো শিখেছে কাউকে ভালোবাসতে? না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে—শেখার দরকার নেই। ধারার জন্য যা করবে, সেটাই ভালোবাসা। শ্রাবণ আবারও একবার ধারার দিকে তাকালো। ম্লান আলোয় মেয়েটার মুখ কতটা শান্ত, কতটা নিরীহ! একটা নিঃশব্দ অঙ্গীকার যেন বুকের গভীরে গেঁথে গেল। শ্রাবণ মাথা হেলিয়ে নিল সামান্য, যেন নিজের কাঁধের আশ্রয়টা ধারার জন্য আরো নরম হয়ে ওঠে।

সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে শ্রাবণ। সে হয়তো ধারাকে এখনো ভালোবাসতে পারবেনা। তবে অবহেলা করবেনা। মানুষ হিসেবে অন্তত সম্মান, মায়া, স্নেহ সব দেবে। এরপর দেখা যাক কি হয়! কারন নিজের অনুভূতি নিয়ে একদমই নিশ্চিত নয় শ্রাবণ। বাসের যাত্রা শেষ করে ট্যাক্সি করে বাড়ির সামনে আসলো দুজনে। ব্যাগের সংখ্যা আরেকটা বেড়ে গেছে। ললিতা খাতুন অনেক খাঁটি দুধ, মধু, সবজি, ফলমূল পাঠিয়েছে গ্রাম থেকে। সেসবই ব্যাগে আনতে হয়েছে। ধারার কেনো যেন একটু অসস্তি হচ্ছে। তাকে সালমা বেগম বলেছিলেন,
—” এই সাতদিনে আমার ছেলেকে জাদুটোনা করে ফেলবে বুঝলে। আসার পর আমি যেন আমার ছেলেকে তোমার হাত ধরে বাড়িতে ঢুকতে দেখি। ”

মন খারাপ হলো ধারার। এই কথাটা ভেবেই কেমন যেন মনে হলো। শ্রাবণ শেখ তার হাত ধরে বাড়িতে ঢুকবে? এও হয় নাকি? তার ভাবনার মধ্যেই দারোয়ান এসে সব ব্যাগ ভেতরে যেতে শুরু করে। আর শ্রাবণ কোনোকিছু না ভেবেই ফট করে ধারার কব্জি আলতো করে ধরে বলে,— চলো!
হা হয়ে তাকিয়ে থাকে ধারা। একবার নিজের হাতের দিকে, আরেকবার শ্রাবণ শেখের ফর্সা গালের দিকে তাকালো। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা অদ্ভুতভাবে ধপধপ করতে লাগলো। হাতের মুঠোয় শ্রাবণের আঙুলের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে শরীরের ভেতরটায়। বিস্ফারিত চোখে আবারো নিজের হাতের দিকে তাকালো সে। এটা কি সত্যি? এরপর এক পলক চোখ তুলেই শ্রাবণের গম্ভীর অথচ নির্লিপ্ত মুখটা দেখতে লাগলো।
অল্পবয়সী মেয়েটা হতভম্ব হয়ে রইলো, কিন্তু পা নিজে থেকেই নড়তে শুরু করলো। শ্রাবণ কোনো দিকে তাকাল না, সোজা সদর দরজার দিকে এগোতে লাগলো, যেন এটাই স্বাভাবিক। দরজার কাছে পৌঁছাতেই হুট করে দাঁড়ালো শ্রাবণ। ধারার দিকে তাকিয়ে বেশ অসস্তি নিয়ে বলল,

—” আমি যে সকালে না খেয়ে বের হয়েছি, এটা মা কে বলবে না, হুম? বকাবকি করবে!”
ধারা শুনলো কিনা জানা নেই। শুধু যন্ত্রের মত মাথা নাড়ালো। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার হাতটা এখনো ধরা আছে শ্রাবণের মুঠোয়। ছোট্ট একটা বিষয় হয়তো, কিন্তু ধারার কাছে এটা যেন পুরো পৃথিবী বদলে দেওয়ার মত অনুভূতি। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো সদর দরজার দোড়গোড়ায়, ভেতরে ঢোকার আগে একবার গোপনে তাকালো কব্জিতে ধরা হাতটার দিকে। ঠোঁটে অদৃশ্য এক শ্বাস বের হলো। শ্রাবণ শেখ… হাতটা সত্যিই ছাড়ছে না।

সবকিছু ঠিকই ছিল। শ্রাবণ ধারাকে নিয়ে সদর দরজা পার করল। ব্যাগ ভেতরে চলে গেছে, দারোয়ান দরজা ধরে রেখেছে। কিন্তু সদর দরজায় পা রাখতেই কেও ঝড়ের গতিতে এসে জাপটে জড়িয়ে ধরল শ্রাবণকে। হুট করে কেও এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে ভাবেনি শ্রাবণ।বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকালো সে। এক পা পিছিয়ে গেলো, এত জোরে ধাক্কা খেল যে মুঠো থেকে ধারার হাতটা আলগা হয়ে বেরিয়ে গেল। ধারা চমকে একপাশে সরে দাঁড়ালো।
শ্রাবণের বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে একটা মেয়ে। পরণে কালো রঙা কামিজ, কাঁধ পর্যন্ত খোলা চুল, একপাশে ওড়না নেয়া মুখ ভরে উচ্ছ্বাস। ঠোঁটে অকারণ খুশির ছটা।

—”উফফ! শ্রাবণ ভাই! অবশেষে এলেন আপনি! জানেন আমি কতটা ওয়েট করছিলাম? আই রিয়েলি মিসড ইউ! ”
বলে আরেকটু জোরে জড়িয়ে ধরল শ্রাবণকে। ধারা শূন্য চোখে দেখতে থাকলো দৃশ্য টা। একবার চোখ ঘুরিয়ে আনলো শ্রাবণের পেটের কাছে থাকা মেয়েটার হাতের দিক থেকে। তারপর আবারো অসহায় চোখে তাকালো শ্রাবণের দিকে। ঠোঁট কাঁমড়ে বোঝার চেষ্টা করল মেয়েটা কে? শ্রাবণের সাথে তার সম্পর্কটাই বা কী?
এদিকে তন্নির এমন গদগদে কথা শুনে বিরক্ত হলেন সালমা বেগম। তার উপর শ্রাবণকে জড়িয়ে ধরেছে! কত বড় সাহস! আসলে সালমা বেগম এই ভয়টাই পাচ্ছিলেন। না জানি কবে থেকে মেয়েটা এমন গায়ে পড়া স্বভাবের হলো।
শ্রাবণ হতবাক হয়ে গেল। কোনোমতে শক্ত হাতে তন্নির বাহু ধরে তাকে দূরে সরিয়ে চোখ কুঁচকে, গলা ভারী করে বলল,

—” হোয়াট রাবিশ তন্নি? এগুলো কী ধরনের আচরণ?”
তন্নির মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেলো না। ও ভাবল শ্রাবণ নিজের বাবা-মায়ের ভয়ে এমন করছে। তাই একটু সরে এসেই বলল,
—” ইটস ওকে শ্রাবণ ভাই। আমার আর এসব নাটক কিন্তু সহ্য হচ্ছে না। আপনি দ্রুত সমাধান করুন!”
ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। এমনিতেই এভাবে জড়িয়ে ধরাতে বিরক্ত হয়েছে সে, তার উপর এমন উদ্ভট কথা শুনে সালমা বেগমের দিকে তীর্যক দৃষ্টি ফেলে শ্রাবণ তন্নিকে বলল,
—” কীসের সমাধান? কী করব আমি?”
তন্নি এবার হেসে ধারার দিকে ঘৃণার দৃষ্টি দিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
—” কী আর করবেন! এই উড়ে এসে জুড়ে বসা মেয়েটা কে ডিভোর্স দিয়ে আমায় বিয়ে করবেন! আমার সাথে তো আপনার আগে থেকেই বিয়ে ঠিক ছিল শ্রাবণ ভাই। এই গেঁয়ো মেয়েটা চেপকে না বসলে আজ আমরা সংসার করতাম!”

মুহুর্তের মাথা পুরো বিগড়ে গেলো শ্রাবণের। মাথা খারাপ নাকি এই মেয়ের! মুখ কুঁচকে চরম বিরক্তিতে হাতের ব্যাগ টা ছুঁড়ে ফেলে এগিয়ে গিয়ে সামিউল শেখ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
—” বাবা! এগুলো কী? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! এগুলো কী হচ্ছে বাবা? এই মেয়ে কী বলছে এসব?”
সামিউল শেখ কিছু না বলে চোখে চশমা ঠেলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। অসহায়ের ন্যয় দাঁড়িয়ে থাকা ধারাকে দেখে চোখে মায়া আসলো সালমা বেগমের। তিনি এগিয়ে গিয়ে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আসলেন ধারাকে। ধারা মিনমিন করে বলল,

—” কী হয়েছে মা? ওই মেয়ে… কে উনি?”
সালমা বেগম ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বাস দিয়ে বললেন,
—” তুই একটু ধৈর্য্য ধর মা। দেখ না কি হয়!”
সরল মনে আবারো প্রশ্ন করল ধারা,
—” ক..কী হবে?”
ধারার অসহায় মুখে বলা কাঁপা কাঁপা কন্ঠটা শুনে মায়া হলো সালমা বেগমের। গলা ভারি হলো তার, মিষ্টি করে বললেন,

—” কিচ্ছু হবে না। চিন্তা করিস না!”
সামিউল শেখের কোনো জবাব না পেয়ে আরো ফুঁসে উঠলো শ্রাবণ। এগিয়ে গেলো আরো, হুংকার ছুঁড়ে বলল,
—” কথা বলছো না কেনো বাবা? তন্নি কী বলছে এসব? কীসের ডিভোর্স? কীসের বিয়ে?”
সামিউল শেখ একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু তার চোখেমুখে অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। গম্ভীর হয়ে কপাল কুঁচকে চশমার ফাঁক দিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। শ্রাবণ আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে কণ্ঠ কাঁপিয়ে গর্জে উঠল,
—” আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি বাবা! এ মেয়ে কী বলছে এসব? এরকম কথা বলার সাহস ও পেলো কীভাবে? আর ধারাকে গেঁয়ো বলার অধিকার কে দিয়েছে ওকে? এগুলো কিসের নাটক!”
এ পর্যায়ে ভ্রু উঁচিয়ে ঠোঁট উল্টালেন সামিউল শেখ। ধারাকে নিয়ে কথা বলছে শ্রাবণ? বাহ! সালমা বেগমও বাঁকা হাসলেন। জল তাহলে ঠিক জায়গাতেই গড়াচ্ছে! অথচ, তন্নি আবারও হেসে উঠল, যেন এ তো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। হাত কোমরে দিয়ে বলল,

—” আরে শ্রাবণ ভাই! নাটক কিসের? আপনার মা-ই তো বারবার বলছিলেন আমার সাথে আপনার বিয়ে হবে। আমি তো সেই বিশ্বাসেই বসেছিলাম। বাড়ির সবাই জানে। এখন এই গেঁয়ো মেয়েটাকে বিয়ে করে নিয়েছেন ভুল করে, অথচ আমায় অস্বীকার করছেন? এটা ঠিক হচ্ছে?”
ধারা শুনে একেবারে স্তব্ধ। বুকের ভেতর কেমন ভেঙে যাচ্ছে সবকিছু। অথচ তার ঠোঁট শুকনো, কিছুই বলতে পারছে না। প্রতিবারের মত ঠোঁট কাঁমড়ে মাথা নিচু করল। শ্রাবণের রাগ এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সে সরাসরি তন্নির দিকে আঙুল তুলে গর্জে উঠল,

—” ইউ শাট আপ তন্নি! কে তোমাকে এসব বাজে কথা বলার সাহস দিয়েছে? আমি জীবনে একবারও তোমাকে বিয়ে করব বলিনি। তুমি আমার কী হ্যাঁ? লিটরেলি বলতে গেলে, তুমি আমার কাছে একদম অপরিচিত একটা মেয়ে! এইসব নোংরা নাটক করবে না আমার বাড়িতে!”
ঘরের ভেতর সবার নিঃশ্বাস আটকে গেল। সালমা বেগম হাসি ঠোঁটে চেপে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন ধারার কাঁধ। ধারা তবুও তাকিয়ে রইল অবিশ্বাসে ভরা চোখে। সামিউল শেখ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর কণ্ঠে বললেন,
—” শ্রাবণ…শান্ত হ তুই। আমরা বসে কথা বলি। তুই সোফায় এসে বোস। আমি সব বুঝিয়ে বলছি তোকে।”
শ্রাবণ আসলেই একটু শান্ত হলো। হাত গুটিয়ে মাথা নিচু করে রাখা ধারার দিকে এক পলক তাকিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়লো।

—” শোন শ্রাবণ, তুই যখন বিদেশে ছিলি, তখন তোর মা আবেগে আপ্লুত হয়ে তন্নিকে তোর বউ হিসেবে পছন্দ করেছিল। আর সত্যিই, তোর অগোচরে আমরা তন্নির পরিবারের সাথে বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা চালাচ্ছিলাম। তবে সেটা চূড়ান্ত হয়নি। কথা ছিল, তুই বাড়িতে ফিরলে কথা চূড়ান্ত করে ফেলব। কিন্তু তার আগেই তো ধারাকে পেলাম। তাই আমিও তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিয়ে দিলাম! ”
এক মুহূর্তে শ্রাবণের মাথার ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। এসব কি নাটক শুরু করেছে তার বাবা-মা! বিয়ে টা কি নাটক নাকি! গলা ফাটিয়ে বলে উঠল,
—” বাবা! এত বড় কথা আমার কাছে লুকিয়ে রাখলে তোমরা? তোমরা কে কাকে ঠিক করেছিলে সেটা তোমাদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার! সেটা তো আমি জানিনা। আর এখন তন্নিকে আমার ঘরে ঢুকতে দিলে কেন? ওকে সায় দিচ্ছো কেনো? আমার বউয়ের সামনে এই অপমান, এটা তুমি সহ্য করলে? ও কোন সাহসে আমার বউয়ের সামনেই আমায় জড়িয়ে ধরে? কে অধিকার দিয়েছে?”
সামিউল শেখ আবারো হতবাক হওয়ার মত ভান করে ঠোঁট উল্টালেন। মোক্ষম সুযোগ পেয়ে সালমা বেগম বাঁকা হেসে টেনে টেনে বললেন,

—” বউ!! কে তোর বউ?”
নিতান্তই খেপিয়ে খোঁচা দেয়ার মত একটা কথা বললেন সালমা বেগম। অথচ অপ্রস্তুত না হয়ে শ্রাবণ অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল মায়ের দিকে, যাতে স্পষ্ট অসহায়ত্বও টের পাওয়া গেলো। সালমা বেগম এমন ভান করলেন যেন তিনি জানেনই না তার ছেলের বউ কে!
সামিউল শেখ মাথা নিচু করে নীরব রইলেন। দরজার কাছে দাঁড়ানো দারোয়ান মফিজ পারলে পপকর্ন নিয়ে বসে পড়েন। আর সালমা বেগম কাঁপতে থাকা ধারাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ফিসফিস বললেন,

—” ভয় পাস না মা, তুই আমার ঘরের বউ। তোর জায়গা কেউ নিতে পারবে না।”
শ্রাবণ এবার একেবারে তন্নির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে আগুন, কণ্ঠ কঠিন করে বলল,
—” শোনো মেয়ে! আমার বাবা-মা দুজনেই আবেগে আপ্লূত থাকে সবসময়! এটা আমি আজ বুঝতে পারলাম! তুমি আর ঝামেলা কোরো না! আরেকবার এসব বাজে কথা বললে পুলিশের কাছে দৌড়াতে হবে তোমাকে। আমার ঘরে আসবে না আর। ক্লিয়ার?”
তন্নির হাসি মিলিয়ে গেল। কিন্তু ওর চোখে এখনো বিদ্বেষ। ঠোঁট বাঁকিয়ে ধারা’র দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—” এই ছুঁচো মার্কা বাইরের গেঁয়ো মেয়েটার জন্য যতসব ঝামেলা হচ্ছে! ”
শ্রাবণ শুনতে পেলো ফিসফিস করে বলা সম্পূর্ণ কথাটা। মুহূর্তেই যেন বিস্ফোরিত হলো সে। এতক্ষণ যতটা নিজেকে সামলাচ্ছিল, এবার আর পারল না। দাঁত খিঁচিয়ে ফুঁসে উঠে তন্নির দিকে আঙুল তাক করে গর্জে উঠল,
—” ইনাফ ইজ ইনাফ! মুখ সামলে কথা বলবে মেয়ে! জাস্ট শাট ইউর মাউথ! কোন সাহসে ধারাকে এমন কথা বলো তুমি? হু আর ইউ? বাইরের মেয়ে কাকে বলছো তুমি? ট্রুলি, তুমি একটা বাইরের মেয়ে! ”
তন্নি আঁতকে উঠল শ্রাবণের এই গর্জনে। চারপাশে এত মানুষ, সামিউল শেখ, সালমা বেগম, দারোয়ান, এমনকি ধারাও শুনছে তো। অপমানটা গায়ে বিঁধল ওর। শ্রাবণ এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। কণ্ঠটা আরও ভারী, কঠিন করে বলল,

—” কান খুলে শুনো। ধারা এ বাড়ির বউ। তাকে অপমান করা মানে এ বাড়িকে, আমাকে অপমান করা। আর আমি কাউকে সে সুযোগ দেব না! তাই সাবধান করে দিলাম। আমার ঘরের দোরগোড়ায় পা রাখার আগেও যদি আর একবার এরকম বাজে কথা বলো, পুলিশ ডাকব। এবার বিদায় হও!”
তন্নির মুখ রঙ বদলাতে লাগল। একবার লাল, একবার ফ্যাকাশে। ঠোঁট বাঁকিয়ে শেষবারের মতো ধারার দিকে ঘৃণাভরা চোখে তাকাল, তারপর ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল সেখান থেকে।

ঘরে থমথমে নীরবতা। ধারা কাঁপতে কাঁপতে তাকাল শ্রাবণের দিকে। নিজের কানে বিশ্বাস হচ্ছে না, এই মানুষটা, যে তাকে প্রায়শই অবহেলায় রেখেছে, আজ তার জন্য এতটা গর্জে উঠল? নিজের বউ না বলুক, বাড়ির বউ তো বলল! সালমা বেগম নিঃশব্দে ধারার কাঁধে হাত রাখলেন। আর শ্রাবণ এখনও দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে, রাগে বুক ওঠানামা করছে তার।
সামিউল শেখ এবার সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করলেন। সম্মতি পেতেই ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলেন,

—” শ্রাবণ, আমি তোর এত অভার রিয়েক্ট করার মত কারন খুঁজে পাচ্ছিনা। তন্নির তো কোনো দোষ নেই। তোর মা নিজে ওকে কথা দিয়েছিল। তাই ও বিয়ের দাবি করতেই পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তোর তো ওর সাথেই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল!”
শ্রাবণ হতবাক হয়ে গিয়ে বলল,
—” কিন্তু বাবা, আমার তো বিয়ে হয়েছে!”
এ পর্যায়ে ভ্রু কুঁচকে সালমা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
—” কিন্তু, তুই তো বিয়েটা মানিসই না!”
এবারে দমে গেলো শ্রাবণ। অসহায় চোখে তাকালো মাথা নিচু করে থাকা ধারার দিকে। সামিউল শেখ শ্রাবণের নীরবতায় সুযোগ পেলেন,

—” হ্যাঁ সেটাই তো। তুই-ই নাকি তোর মা কে বলিছিলি, তুই ধারাকে কখনোই মেনে নিবি না, ওকে বউ মানবিনা, হেনতেন আরো কত কি! তো, এমনটা হলে তন্নিকে বিয়ে করতে সমস্যা কী? ধারাকে ডিভোর্স দিয়ে তন্নিকে বিয়ে করতেই পারিস! আমরা অনুমতি দিলাম! তোরও শখ পূরণ হলো, আর তন্নির পরিবারের কাছে আমাদের সম্মানটাও থাকবে। ধারাকেও আমি না হয় একটা জায়গা সেট করে দিব!”
শ্রাবণের বুক টা কেঁপে উঠলো হুট করে। ডিভোর্স শব্দটা ঠোক্কর খেলো হৃদয়ে। আগের থেকেও বেশি মায়াভরা চোখে তাকালো ধারার দিকে। কি আশ্চর্য! মেয়েটা কিছু বলছে না কেনো? কেনো এভাবে মাথা নিচু করে রয়েছে? ও কি কিছু বলবে না?
এর মধ্যে সালমা বেগমও আবারো খোচা দিয় বললেন,

—” হ্যাঁ গো! তোমার ছেলে তো আমায় বিয়ের পরের দিনই গর্ব করে বলল যে সে নাকি ধারাকে কখনো বউ হিসেবে মানবেই না।”
চোখ খিঁচে বন্ধ করল শ্রাবণ। হ্যাঁ, সে বলেছিল। আসলেই বলেছিল। কিন্তু তখন তো পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। আর এখন? মাথা নিচু করল শ্রাবণ। ধারার দিকে তাকাতে পারল না। সালমা বেগম আর সামিউল শেখ আবারো ইশারা করে একে অপরকে কিছু একটা বোঝালেন। এবারে শেষ গুটিটা ফেললেন সামিউল শেখ। ধারার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
—” ধারা, আমার কথা শোনো, বউমা! আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। তন্নির বাবার কাছে কথা দিয়েছি যে শ্রাবণ রাজি থাকলে তন্নিকেই বউ বানাব। এখন দেখলে তো কেমন পরিস্থিতি! যদি শ্রাবণের সাথে তোমার ডিভোর্স করিয়ে দিই, তোমার কি কোনো সমস্যা আছে?”
ধারা কিছু বলার আগেই সালমা বেগম বললেন,

—” সমস্যা থাকবে কেনো? ও তো সংসারই করেনি! একটা রাতও তো শ্রাবণের ঘরেও থাকেনি!”
এ পর্যায়ে শ্রাবণের ইচ্ছে করল চেঁচিয়ে বলতে, নাহ, ও ছিল, ও আমার সাথে ঘুমিয়েছে। আমি দেখেছি ওর ঘুমন্ত মুখ! দেখেছি কত নিষ্পাপ ভঙ্গিতে মেয়েটা ঘুমোয়। কিন্তু আত্মসম্মানের কাছে চুপ রইলো শ্রাবণ শেখ। বলল না, ধারা ওর সাথে এক রাত হলেও থেকেছে! শুধু স্বামী স্ত্রীর মত ঘনিষ্ঠ হয়নি।
সামিউল শেখ এবার ধারার মাথায় হাত দিয়ে জানতে চাইলো,
—” ধারা, মা, তোমাকে আমি এ বাড়িতে মেয়ের মতই রাখব। ডিভোর্সের পরেও এ বাড়িতে রাখব তোমায়! পরে ভালো ছেলে পেলে বিয়ে দিয়ে দেব৷ আমার সিদ্ধান্তে তোমার কোনো আপত্তি আছে?”
শ্রাবণ এ পর্যায়ে সরু চোখে চাইলো। বুকের ভেতর যেন কেমন এক অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করল। খুব করে মনে মনে চাইলো যে ধারা আপত্তি করবে। কিছু একটা বলবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ধারা দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,

—” আপনারা যা ভালো মনে করেন!”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৮

ধারা কথাটা বলা মাত্রই শ্রাবণের মনে হলো বুকের ভেতর কেউ ছুরি চালিয়ে দিল। দাঁত চেপে চুপ করে রইল সে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। চোখ মেলে ধারার দিকে তাকাতে চাইলো। কিন্তু তাকাতে পারল না। কারণ ও জানে, ধারা এখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো কান্না নেই, কোনো শব্দ নেই, শুধু নিঃশব্দে সম্মতি দিল মেয়েটা। অথচ এই সম্মতি যেন এক অগ্নিবাণ হয়ে বিঁধল শ্রাবণের বুকে। মাথার ভেতর চেঁচিয়ে উঠল শ্রাবণের বিবেক,
—” কেনো কিছু বলছিস না তুই? কেনো ওকে থামাচ্ছিস না? বল, তুই ডিভোর্স দিবি না! বল, এই মেয়েটা তোর বউ! ওকে ছাড়বি না তুই! বল শ্রাবণ বল!”

কিন্তু ঠোঁট নড়ল না শ্রাবণের। আত্মসম্মান যেন শিকল হয়ে আটকে দিল তার মুখ। বাবা-মায়ের সামনে গলা উঁচু করার সাহস হলো না। কারন সে-ই তো নিজের মা কে বলেছে সে মানবেনা ধারাকে।
ধারার মুখশ্রীতে কোনো অভিব্যক্তি নেই। শুধু শান্ত স্বরে সম্মতি দিলো। কিন্তু ভেতরে? ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর এত বড় আঘাত, অথচ ঠোঁট দিয়ে বের হলো না কোনো কথা। ধারা নিজের মনেই বলল, আমার কি আদৌও কখনো কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার ছিল? চাচা-চাচীর বাড়ি, সেখান থেকে শ্বশুরবাড়ি, সব জায়গায় শুধু অন্যরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজও তাই হলো। তার বুকটা কেঁপে উঠল অজানা কষ্টে। সে ভেবেছিল অন্তত শ্রাবণ কিছু বলবে। একটুখানি থামাবে। চোখ তুলে তাকাবে আর বলবে, না, ধারা আমার বউ। কিন্তু কিছুই হলো না।

ধারার চোখ দুটো অশ্রুতে ভারী হয়ে উঠল, তবে সে কান্না চেপে রাখল। মাথা নিচু রেখেই নিজের কষ্টটা গিলে নিল। অভ্যাস হয়ে গেছে সারাজীবন নিঃশব্দে কষ্ট সহ্য করার। আর শ্রাবণ? সে দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মতো। এ পর্যায়ে রাগও হলো শ্রাবণের। চোখ সরু করে, বুক ধকধক করতে করতে ভেতরে শুধু একটাই কথা প্রতিধ্বনিত হলো,
—” ধারা আমাকে ভরসা করলো না কেনো? কেনো এমন নির্বিকার রইলো? ও সত্যিই কি চায়, আমি ওকে ছেড়ে দিই?”
সালমা বেগম ধীরপায়ে ধারার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

—”চল মা, তুই একটু ভেতরে আয়। মাথাটা গরম হয়ে আছে সবার, তুই কিছু ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ধারা কোনো কথা বলল না। শুধু নিঃশব্দে সালমা বেগমের পিছু নিল। হাঁটতে হাঁটতে বুকের ভেতরটা কেমন হালকা হয়ে আসছিল, যেন কোনো অদৃশ্য ভার নামছে, অথচ তার জায়গায় জমছে এক অজানা শূন্যতা। শ্রাবণ অসহায় চোখে ধারার প্রস্থান দেখলো।

ঘরে ঢুকিয়ে সালমা বেগম দরজা টেনে দিলেন। তারপর নরম কণ্ঠে ধারাকে বললেন,
—” ভয় পাস না মা। আমি তো আছিই। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এই কথাগুলো ধারার কানে ঢুকল ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতর কোনো আশ্বাস গাঁথল না। বরং মাথা এলিয়ে বলল,
—” ঠিক আছে মা!”
মেয়েটার কন্ঠ শুনেই বুকটা ধ্বক করে উঠলো সালমা বেগমের। বুঝতে পারল মেয়েটা কান্না আটকে রেখেছে, গলা ধরে গেছে। তিনি এবার ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে ফট করে জিজ্ঞেস করলেন,

—” তুই কি শ্রাবণকে ভালোবাসিস? ”
ফট করে মাথা তুলে তাকালো ধারা। এ সময়ে এমন ভয়ানক প্রশ্ন আশা করেনি। ঠোঁট ভিজিয়ে হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইলো। তারপর নিঃশব্দে দুদিকে মাথা নাড়ালো, যার অর্থ না। সালমা বেগম মুচকি হাসলেন,
—” তাহলে কাঁদছিস কেনো?”
ধারা ঠোঁট কাঁমড়ে মাথা নিচু করে বলল,
—” জানিনা!”

আর কষ্ট দিতে চাইলেন না সালমা বেগম। মেয়েটা কে একা থাকতে দিয়ে আদরের হাত বুলিয়ে ধারাকে ফ্রেশ হতে বলে চলে গেলেন ঘর থেকে।
এবারে ধপ করে বিছানার নিচে মেঝেতে বসে পড়ল ধারা। এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল তার ভেতরের সেই শক্ত দেয়াল, যেটা সে এতদিন ধরে আঁকড়ে ছিল। চোখ থেকে হঠাৎ গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। একটু একটু করে শুরু করে হুহু করে কেঁদে উঠলো। দুহাত মুখে ঢেকে কেঁদে উঠলো সজোরে।
ধারা অনেকদিন পর কাঁদছে। চাচা-চাচির অকথ্য অত্যাচার সয়ে যাওয়ার পরও সে কান্না আটকে ছিল। গায়ে হাত পড়লেও, না খেয়েও দিন কেটে গেলেও সে চোখের পানি ফেলেনি। নিজের চোখকে শক্ত করেছিল, ভেবেছিল, কান্না করলে দুর্বল হয়ে যাব।

কিন্তু আজ? আজ ডিভোর্সের কথা শুনে, আর নিজের স্বামীকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুকের ভেতর ভেঙে গেল তার সব প্রতিরোধ। কেনো যেন খুব কষ্ট হলো! ধারা মুখ চেপে ধরে বুক ভাসিয়ে কাঁদছে, দেখে মনে হলো, বছরের পর বছর জমে থাকা দুঃখের সবটুকুই আজ বেরিয়ে আসছে।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৭

সালমা বেগম দরজার আড়াল থেকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তিনি প্রথমবার দেখলেন, বাইরে থেকে শক্ত-নিঃশব্দ এই মেয়েটার বুকের ভেতর কতটা যন্ত্রণা জমে আছে। তিনি এবার বুঝলেন ধারা মিথ্যে বলেছে। এই সপ্তাদশী অবশ্যই শ্রাবণ শেখকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু মুখে বলছে না। মনে মনে বিড়বিড় করলেন সালমা বেগম,
—” কান্না কর মা, সব কান্না বের করে দে। শেষবারের মত কান্না কর! তারপর দেখবি, একদিন সব ঠিকই হয়ে যাবে। হয়তো খুব তাড়াতাড়ি! ”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৯