Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২০

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২০

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২০
অনামিকা তাহসিন রোজা

সবকিছু মেনে নেয়া যায়। কিন্তু নিজের মায়ের এমন পল্টিবাজি মেনে নেয়া যায় না। শ্রাবণ শেখের ক্ষেত্রে তো মোটেই না। শেখ বাড়ির একমাত্র ছেলে বেচারা শ্রাবণ এখনো বুঝতে পারছে না যে তার মা হুট করে এভাবে প্লটি খেলো কেনো? তিনি তো কদিন আগেও শ্রাবণ কে বোঝাচ্ছিলেন যে ধারা কে যেন মেনে নেয়, খারাপ ব্যবহার না করে, হেনতেন আরো কত কি! আর আজ যখন শ্রাবণ একই বিষয়ে সাহায্য চাইতে এলো, তখন তার মা সালমা বেগম এভাবে বেইমানি করবে? এটা কি উচিত! এটা তো কস্মিনকালেও ভাবেনি শ্রাবণ।

চরম বিরক্তিতে ছেয়ে গেছে শ্রাবণের চেহারা। সে মুখ কুঁচকে রীতিমতো তব্দা খেয়ে তাকিয়ে রয়েছে সালমা বেগমের দিকে। ভদ্রমহিলা এখন শসা কাটতে ব্যস্ত। মুখে নেই কোনো অভিব্যক্তি। নির্লিপ্ত চেহারা নিয়ে শসা কাটছেন। একবার নিজের ছেলের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বাঁকা হাসলেন তিনি। নাও বাবা! এবার বোঝো দেখি ঠ্যালা কাকে বলে? যখন বলেছিলাম বউকে মেনে নে, তখন তো পাত্তা দিলি না, আর এখন রান্নাঘরে এসে আমার আঁচল ধরে ঝুলে আছিস সাহায্যের জন্য! কিন্তু আমি তো আর সাহায্য করব না। যা করার নিজে করো বাপ! হয়তো একেই বলে ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে!
ছেলের এমন ঝুলন্ত দুর্দশা দেখে ঠোঁট টিপে আড়ালে হাসলেন সালমা বেগম। মুখমণ্ডল স্বাভাবিক করে খানিক ভ্রু কুঁচকে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—” আশ্চর্য! রান্নাঘর থেকে যাচ্ছিস না কেনো তুই? তখন থেকে এসে ঝুলে আছিস এখানে? গরম করছে না? যা ঘরে যা!”
শ্রাবণ বড় করে শ্বাস নিল। বুঝলো না রাগ টা এখন কার উপর হচ্ছে! মাঝেমাঝে আবার মুখে তালা মেরে বোবা হয়ে থাকা ধারা নামক নারী টাকে তুলে এনে আঁছাড় মারতে মন চাইছে। ওই মেয়ের অতিরিক্ত ভালো মানুষির জন্য আজ শ্রাবণকে মুখ খুলতে হচ্ছে। নইলে শ্রাবণ শেখ কে দিয়ে এত সহজে কেও বলাতে পারত না!
—” আমি তন্নির মত ওই ছিঁচকা মেয়েটাকে বিয়ে করতে পারব না! বাবাকে বলে দেবে শ্রাবণ শেখ পাগল হলেও এ কাজ করবে না!”
পুরো কথাটাই অন্যদিকে দৃষ্টি রেখে বলল শ্রাবণ। একটু অসস্তি হচ্ছে তার। শ্রাবণের কথা শুনে অবাক হওয়ার ভান করলেন সালমা। ঠোঁট উল্টো জিজ্ঞেস করলেন,

—” এ বাবা! এ কি কথা! বিয়ে করতে পারবি না কেনো?”
শ্রাবণ এবার আড়চোখে তাকালো সালমা বেগমের দিকে। ঠোঁট ভিজিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে খুব ভাব নিয়ে বলল,
—” কারন ছয়বার কবুল বলতে পারব না আমি। মুখ ব্যাথা করে। মুড নেই!”
হা হয়ে তাকালেন সালমা বেগম। শসা কাটতে থাকা হাতটাও থমকে দাঁড়ালো। চোখ পিটপিট করে নিচ থেকে উপর পর্যন্ত নিজের ছেলেকে পর্যবেক্ষন করলেন ভদ্রমহিলা। ভাবতে থাকলেন, তার ছেলে পাগল হয়েছে কিনা। কিসব বলছে এই ছেলে! শেষে কিনা এমন উদ্ভট একটা অযুহাত দিলো৷ হতভম্ব হয়ে ভুল শুনেছেন কিনা নিশ্চিত হতে তিনি বললেন,

—” মানেহহ?”
বেফাঁস কথা বলে নিজেকে বোকা প্রমাণ করেছে, এটা বুঝলো শ্রাবণ। তাই ফটাফট বলল,
—” মানে, আমি বিবাহিত!”
—” কিন্তু….!”
শ্রাবণ এবার সালমা বেগমের কথা না শুনেই এক হাত উঠিয়ে বলতে থাকলো,
—” কোনো কিন্তু ফিন্তু নেই মা। তুমি ভালো করে কান খুলে শুনে রাখো। আমি ছোট থেকেই তোমার বাধ্য ছেলে। তাই তোমার কথা শুনেই বিয়ে করেছি। আর আমি বর্তমানে বিবাহিত। আমি আর কোনো বিয়েটিয়ে করতে পারব না। তুমি বাবাকে বলবে ধারাও আমার সাথেই থাকতে চায়!”
সালমা বেগম এবার হাতে থাকা ছুরিটা পাশে রেখে ঠোঁট টিপে হাসলেন। সামনের দিকে ঘুরে ছেলের মুখোমুখি হয়ে দুহাত বুকে গুঁজে ভ্রু উঁচিয়ে বললেন,

—” তাহলে তুই ধারাকে বউ হিসেবে মানছিস?”
চমকালো শ্রাবণ। তৎক্ষনাৎ আত্মসম্মান আর লজ্জা নামক দুই বস্তু মাথায় চাড়া দিয়ে উঠতেই ফটাফট কিছু না ভেবেই বলল,
—” আমি কি সেটা বলেছি নাকি?”
ভ্রু কুঁচকে তাকালেন সালমা,
—” তারমানে মানিস নি?”
—” আমি কি সেটাও একবারো বলেছি?”

আর কিছু বলতে পারলেন না সালমা বেগম। তিনি বেশ বুঝলেন, তার ছেলে মোটামুটি পাগলই হয়েছে। দোটানার মধ্যে পড়ে গিয়ে উল্টোবাল্টা বকছে। তবে সালমা বেগম তো একজন মা। তিনি ঠিকই ধরতে পেরেছেন তার ছেলে এখন কী চাইছে। তাই তিনি আর কথা বাড়ালেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো শসা কাটতে ব্যস্ত হলেন, মিনতি করে মুখে অসহায় ভাব নিয়ে বলে উঠলেন,

—’ হয়েছো বাপ। থাক, তোকে আর কিছু বলতে হবেনা। আমি বুঝতে পেরেছি। তোকে জ্বিনে ধরেছে। আর কষ্ট করতে হবেনা, বাপ আমার। যা ঘরে যা। ঘরে গিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা কর। একটু পর ডিনার করতে নিচে আসিস। যা!”
শ্রাবণ মনে মনে খুশিই হলো। তবে মনে এক টুকরো সন্দেহ রয়েই গেলো। নিশ্চিন্ত হলো না পুরোপুরি। তাই ঠোঁট ভিজিয়ে কিছু বলতে চাইলো। কিন্তু তার আগেই সালমা বেগম আবারো হাত উঠিয়ে আস্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন,
—” চিন্তা করার কিছু নেই। তোর বাবার সাথে কথা বলব। তেমন কিছুই হবে না। তোকে বিয়ে করতে হবেনা! ধারাকেও বিয়ে দেবেনা অন্য কোথাও! হয়েছে? খুশি? এবার যা তো বাপ। রান্না শেষ করতে দে। রাতে কি ঘাসপাতা খাবি? তোরা দুই বাপ বেটাই আমার জীবনটা ভাজাভাজা করে দিলি!”

শ্রাবণ মনে মনে নিশ্চিন্ত হলো। তবে প্রকাশ করল না। শার্টের কলার ঝাঁকিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলে উঠলো,
—” ওই মেয়েকে বিয়ে দেবে না রাখবে, সেটা তোমাদের ব্যাপার। আমি শুধু নিজের কথা বলতে এলাম যে, আমি বিয়ে করব না। এখন যদি ওই পিচ্চি মেয়ের হাজারটা বিয়ে করতে ইচ্ছে হয়, তো করুক গিয়ে। আই ডোন্ট কেয়ার!”
সালমা বেগম শসা কাটা শেষ করে টমেটো হাতে নিয়ে মুখ কুঁচকে তাকালেন ছেলের দিকে। ঢঙ দেখো ছেলের! এমন ভাব করছে যেন আসলেই কিছু যায় আসে না। অথচ অসহায় মুখটা দেখে মনেই হচ্ছিল নিজের বউ হারানোর চিন্তাতেই ছিল। কি আর বলবেন তিনি! নাটকবাজ পরিবার! এরা দুই বাপ বেটা একই জাতের! দুটোই নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করবেনা। অবশ্য ঠিকই আছে। রক্তের টান বলেও তো একটা কথা আছে। সালমা বেগম আবারো আবিষ্কার করলেন, তিনি ভালো মানুষ বলে এখনো এই সংসারে আছেন, অন্য কোনো মহিলা হলে কবেই এই সংসারকে ছুঁড়ে ফেলে চলে যেত!

সালমা বেগমের কথাটা শুনেছে শ্রাবণ। আসলেই সে এখন ল্যাপটপ কোলের উপর নিয়ে বিছানায় হাঁটু মুড়ে বসে বসে নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনা করতে থাকলো। ল্যাপটপের বোতাম চাপতে চাপতে ফাইল ওপেন করল। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই থাকতে পারল না সে। মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু একটাই মুখ। সেই কান্নাভেজা চোখ, কাঁপা ঠোঁট, আর ভয়ার্ত অথচ নরম দৃষ্টি। ল্যাপটপ বন্ধ করে একপাশে সরিয়ে রাখল সে। দুহাত মাথার পেছনে গুঁজে শুয়ে পড়ল। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে গেলো। কীভাবে বলা যায় ওকে? কীভাবে বোঝানো যায় যে ও-ই তার আসল পছন্দ, আসল মনের মানুষ? মনের ভেতর হালকা কষ্টও টের পেল শ্রাবণ। এতদিন শুধু গম্ভীর মুখে দূরে দূরে থেকেছে, কখনো নরম কথা বলেনি। বরং একরকম জেদ করেই ধারা কে এড়িয়ে চলেছে। অথচ আজ নিজের ভেতরকার অস্থিরতা চেপে রাখা যাচ্ছে না।

এই যে এখন শুয়ে আছে সে। মন চাইছে ধারাকে এক পলক দেখতে। শাড়ি পড়ানোর সময় মেয়েটা কতই না লজ্জা পেলো! লাল হয়ে যাওয়া গালদুটো স্পষ্ট মনে আছে শ্রাবণের। এলোমেলো চোখদুটো দেখে তো শ্রাবণের হাসি পাচ্ছিল! এত লজ্জা পেলো কেনো পিচ্চিটা?
শ্রাবণ নিজের ভাবনাতে একটু পর হেসে উঠল। পরমুহূর্তেই বুঝতে পারল যে সে আসলেই শেষ! পুরোপুরি সর্বনাশ করেই ছেড়েছে মেয়েটা! আসলেই কি শ্রাবণ শেখ এত দুর্বল হয়ে গেছিে? একটা মেয়ে কি এভাবে মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে? আবারই মনে পড়ল, ধারার চোখে জল, আর নিজের হাতের আঙুল দিয়ে তা মুছে দেয়া। বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগলো। সেই সময় রিনরিন করে কান্নার আওয়াজ শুনেছিল শ্রাবণ। কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়নি আসলেই ধারা কান্না করেছে কিনা।
হঠাৎ মুঠো শক্ত করল শ্রাবণ, মনে মনে বলল,

—” না, আর চুপ করে থাকব না। যাই হোক না কেনো, ওকে বলতেই হবে। নিজের বউকে বউ হিসেবে স্বীকার করা লজ্জার কিছু না। ধারা আমার, শুধু আমার।”
কিন্তু পরক্ষণেই দ্বিধা চেপে ধরল,
—” বলব কীভাবে?”
শ্রাবণ কপালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করল। মাথার ভেতর এলোমেলো চিন্তার ভিড়। ধারা তার কাছে শুধু দায়িত্ব নয়, আবেগও হয়ে গেছে। কিন্তু সেই আবেগ মুখে আনার সাহস এখনো খুঁজে পাচ্ছে না। কীভাবে শুরু করব কথাটা? ধারা, আমি তোমাকে চাই? না, এটা অনেক সোজা হয়ে যাবে।তুমি আমার বউ। না, এটা আবার খুব বেশি শোনাবে। তাহলে? অস্থির হয়ে পাশ ফিরল শ্রাবণ। মনে হলো, রাত যতই বাড়বে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সে কিছুতেই খুঁজে পাবে না।

ঝট করে একটা চিন্তা মাথায় এলো শ্রাবণের। সেই সময় মায়ের মুখে শুনেছিল ধারা নাকি নিজের ঘরের বারান্দা টা অনেক সুন্দর সাজিয়েছে। প্রায় অনেক সময় বারান্দায় গিয়ে বসে থাকে। আপ্লুত হলো শ্রাবণ। দ্রুত শোয়া থেকে উঠে বসে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ নিজের বারান্দার বদ্ধ দরজাটার দিকে ঠোঁট চেপে তাকিয়ে থাকে৷ এরপর এত দিন পর প্রথমবারের মত বারান্দার দরজা খুলে সে। ধীরে ধীরে বারান্দার কাঁচের দরজাটাও ঠেলল। ঠাণ্ডা রাতের বাতাস ভেসে এলো ঘরে। হালকা চাঁদের আলোয় সবকিছু মায়াবী লাগছে।

দরজা খুলতেই চোখ পড়লো পাশের বারান্দায়। তার ধারনাই সঠিক। সিক্স সেন্স মারাত্মক কাজ করল। আসলেই বারান্দায় ধারাকে দেখা গেলো। পরনে এখনো সেই শাড়ি। মেয়েটা রেলিংয়ে কনুই রেখে মাথাটা ঠেকিয়ে বসে আছে। চোখ দূরে কোথাও নিবদ্ধ, মনে হচ্ছে যেন দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে আলাদা হয়ে গেছে। এলোমেলো খোলা চুল হাওয়ায় দুলছে, চাঁদের আলোয় যেন রুপালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। শান্ত, অথচ গভীর ভাবনায় ডুবে থাকা এই মেয়েটাকে দেখে মুহূর্তে মুগ্ধ হয়ে গেলো শ্রাবণ। তার বুকের ভেতর যেন ধুকপুকানির গতি বেড়ে গেলো। হঠাৎ মনে হলো, ধারা কোনো সাধারন নয়, বরং কোনো নিস্তব্ধ রাতের এক টুকরো কবিতা, যার প্রতিটি লাইন চোখের পলক ফেলার ভেতরেই হৃদয়ে গেঁথে যায়।

শ্রাবণের হাত অজান্তেই বারান্দার রেলিং এ চেপে ধরল। চুপচাপ তাকিয়ে রইল সে। মনে হলো হাজার বছর ধরে এই দৃশ্যের অপেক্ষায় ছিলো। মনের ভেতর থেকে এক অদৃশ্য স্বর ভেসে এলো, এমন করে তাকিয়ে থাকলেই যদি বোঝাতে পারতাম, ধারা.. হুট করেই তুমিই আমার আসল শান্তি হয়ে গেলে। কিন্তু ঠোঁট তখনো বন্ধ। শুধু চোখ বলছে সব কথা। শ্রাবণ বুঝলো, ধারা হয়তো এখনো টের পায়নি সে তাকিয়ে আছে। তবুও ইচ্ছে করছিলো একবার ডাকতে, একবার নাম ধরে ডাকতে। কিন্তু সাহস হলো না। বুকের ভেতর আটকে রইল সেই ডাক।

তবে অবাকও হলো শ্রাবণ। মেয়েটা এমন বিষাদ মুখে রয়েছে কেনো? কি এত ভাবছে পিচ্চিটা? হুট করেই শ্রাবণের মনে হলো ধারা এখন পরিপূর্ণ এক যুবতী, যার চোখ বাস্তবতার শিকলে বেঁধে গিয়েছে। তবে এখন তো তেমন কোনো পরিস্থিতি নেই যে ধারাকে এভাবে বিরস মুখে থাকতে হবে। প্রথমে আসলেই সে ভাবল যে ধারা কে ডাকবে না। কিন্তু লোভ টা সামলানো গেলো না। এক হাত মুখের কাছে মুঠো করে খুকখুক করে কেশে উঠলো শ্রাবণ, নিতান্তই ধারার মনোযোগ আকর্ষণের সামান্য চেষ্টা। হলোও তাই! হুট করে এমন গলা খাঁকারির শব্দে চমকে উঠলো ধারা। শব্দের উৎস ধরে সোজা দৃষ্টি দিল শ্রাবণের বারান্দায়। অবাক হওয়ার সাথে সাথে ভয়ও পেলো।
সালমা বেগম তো বলেছিলেন শ্রাবণ বারান্দায় আসে না। তাই হুট করে এভাবে বারান্দার দরজা খোলা আর শ্রাবণকে দেখে অপ্রস্তুত হলো ধারা। তৎক্ষনাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি দিল ওদিকে। শ্রাবণ গম্ভীর স্বরেই বলে উঠলো,

—” কী করছিলে এখানে?”
সহজ সরল এক প্রশ্ন। অথচ অনেক সময় নিয়ে ভাবলো ধারা, এরপর মিনমিন করে জবাব দিল,
—” ফুলের গাছ গুলো দেখতে এসেছিলাম।”
শ্রাবণ ঠোঁট উল্টিয়ে উপর নিচ মাথা নাড়ালো। তাকালো না ধারার দিকে। বারান্দার গ্রিল দিয়ে অদুরে থাকা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চোখ রেখেই ধারা কে আবারঁ জিজ্ঞেস করল,
—” গাছগাছালি পছন্দ? ”
ধারা এবারো মুচকি হেসে জবাবা দিল,

—” জ্বি খুব পছন্দ। ছোটবেলায় এমন করে বাগান করার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু চাচি কখনো করতে দেয়নি!”
শুকনো ঢোক গিলল শ্রাবণ। সে এখন মোটেই ধারার অতীতের কাহিনী শুনতে ইচ্ছুক নয়, কারন সেটা যে মোটেই সুখকর হবেনা, এটা সেও খুব ভালো করে জানে। তাই ছোট করে “ওও” বলল। তবে শ্রাবণের মনের ইচ্ছে বোধহয় পূরণ হলো না।
ধারা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে কাঠগোলাপের গাছটার দিকে তাকিয়ে নিজে থেকেই বলল,
—” এইযে এমন একটা গাছ আমারো ছিল জানেন। অনেক সুন্দর আর বড় একটা কাঠগোলাপ গাছ ছিল আমার। খুব যত্ন করতাম। ভালো লাগতো খুব। কিন্তু, চাচি বটি দিয়ে কে’টে ফেলেছিল। তারপর পুকুরে ফেলেছে!”
এ পর্যায়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো শ্রাবণ। ধারার দৃষ্টি কাঠগোলাপের গাছের দিকে নিবদ্ধ। হয়তো মন খারাপ হয়েছে। ওর দিকে তাকিয়েই শ্রাবণ জিজ্ঞেস করল,

—” গাছটা কে’টে পুকুরে ফেলল? কিন্তু কেনো?”
ধারা তাকালো শ্রাবণের দিকে। মিষ্টি হেসে জ্বলজ্বল করা চোখ নিয়ে বলল,
—” খাওয়ার সময় একবার ভুল করে পাতে বেশি ভাত নিয়ে ফেলেছিলাম। খিদে পেয়েছিল তো। ওই ভুলের কারনেই চাচি রেগে গিয়ে কেটে দিল আমার সাধের গাছটা!”

চোখ খিঁচে বন্ধ করল শ্রাবণ। বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠলো সহসা। সে জানতো এমন কিছুই হবে। শুনতে চায়নি এসব। শ্রাবণ গভীর বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। মিষ্টি হাসিমাখা চোখ, অথচ সেই চোখের আড়ালে লুকানো কতটা যন্ত্রণা! মানুষ কি করে এত অমানবিক হতে পারে? খাওয়ার সময় সামান্য ভাত বেশি নেয়ার অপরাধে একটা মেয়ের প্রিয় গাছ কেটে ফেলা, এ কেমন নিষ্ঠুরতা! এত হালকা গলায়, এত সরলভাবে নিজের হৃদয়বিদারক স্মৃতি বলল ধারা, যেন এটা কোনো বড় ব্যাপারই নয়। অথচ এসব শুনলে শ্রাবণের ইচ্ছে করে মেয়েটাকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে নিতে, ইচ্ছে করে হাজারো আদরে ভরিয়ে দিয়ে বোঝাতে এখন আর এমন কিছু হবেনা তোমার সাথে, তোমায় ভালো রাখব আমি! সত্যি! সাথে সাথে নিজেও অবাক হলো শ্রাবণ। কি আশ্চর্য! সে তো মনে মনেই ধারার সাথে কথা বলছে। মনে হলো এসবই ধারাকে বলা উচিত!
শ্রাবণের হাত গ্রিলের ওপর আরও শক্ত হয়ে চেপে বসল। গলায় শব্দ আটকে গেল। সে কেবল অবাক চোখে দেখল, ধারা যেন নিজের কষ্টকেও মিষ্টি করে সাজিয়ে বলতে পারে। ধারা এবার গাছটার পাতায় হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে বলল,

—” তখন খুব কেঁদেছিলাম। কিন্তু পরে আর গাছের জন্য কাঁদিনি। ভেবেছিলাম, হয়তো আমি গাছ আগলে রাখার যোগ্যই না।”
শ্রাবণের শ্বাসরোধ হয়ে এলো। মনে হলো, মেয়েটা ছোট থেকেই শাস্তি পেতে পেতে নিজের স্বপ্ন, নিজের ইচ্ছেগুলোকে ছোট করে ফেলেছে। অথচ আজও কাঠগোলাপের পাতায় হাত বুলিয়ে সেই হারানো গাছের আদর খুঁজছে। তার ভিতরটা হঠাৎই ঝাঁপসা হয়ে উঠলো। রাগে, কষ্টে আর মমতায়। চোখ সরু করে তাকিয়ে সে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,

—” তোমার আর কী কী ফুলের গাছ পছন্দ?”
ধারা চমকে তাকালো। বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো তার। মনে হলো, অনেকদিন পর কেউ যেন তার পছন্দ সম্পর্কে জানতে চাইছে। এবার একটু মাথা নিচু করল ধারা। ঠোঁট কাঁমড়ে কিছু একটা ভেবে বলে উঠলো,
—” সব ফুলই তো ভীষণ ভালো লাগে। বিশেষ করে কাঠগোলাপ, শিউলি ফুল খুব পছন্দ। আর আপনি যে সেদিন বেলী ফুলের মালা কিনে দিলেন, সেটাও খুব পছন্দ হয়েছে। ঘ্রাণ টা কি সুন্দর! এত স্নিগ্ধ, নরম, মিষ্টি গন্ধ কখনোই পাইনি!”

শ্রাবণের ঠোঁটে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। মেয়েটার চোখমুখে যে নিষ্পাপ উচ্ছ্বাস, সেটা দেখে বুকটা কেমন যেন হালকা লাগতে শুরু করল। সে এবার আর চোখ ফেরাতে পারলো না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ধারার দিকে। মুহূর্তের জন্য ভুলেই গেল, এটা কোনো সাধারণ আলাপ নয়। মনে হচ্ছিল, ধারা শুধু ফুলের কথা বলছে না, নিজের মনের ভেতরকার ছোট ছোট সুখের কথাও বলে দিচ্ছে। সেই সুখগুলো এতদিন কেউ শোনেনি, জানতেও চায়নি। শ্রাবণ গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
—” কালই কাঠগোলাপ, শিউলি, বেলীর চারাসহ আরো কিছু চারা আনবো। তোমাকেই চারা লাগাতে হবে, যত্নও তোমাকেই করতে হবে। বারান্দায় জায়গা না হলে বাড়ির সামনের বাগানেও চারা লাগাতে পারো!”
ধারা চোখ বড় করে তাকালো। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। ফিসফিস করে বলল,

—” সত্যি আনবেন?”
শ্রাবণ এবার মাথা নাড়িয়ে ঠোঁট উল্টাল,
—” আমি মিথ্যে বলি না।”
ধারার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠলো। সে ঠোঁট কামড়ে হালকা হেসে মাথা নিচু করল। চোখের কোনে অচেতনেই জমে উঠলো জলকণা. শ্রাবণ তা দেখেও কিছু বলল না। কি সাংঘাতিক বিষয়! এই দুরত্বে থেকেও শ্রাবণ ধারার গতিবিধি কীভাবে যেন টের পেয়ে যাচ্ছে! এটা কি মনের টান নাকি!
ধারা একটু সামলে নিয়ে, চোখের কোনার জল আঙুলের পেছনে মুছে নিল। বুকের ভেতরটা কেমন টনটন করছে। তবুও নিজেকে শক্ত করে গলাটা পরিষ্কার করে মৃদু স্বরে বলে উঠলো,

—” আমার জন্য এত কিছু করার দরকার নেই…!”
শ্রাবণ হালকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ঠোঁট উল্টে এমন ভঙ্গি করল যেন কথাটা তার কাছে একেবারেই তুচ্ছ,
—” তো কার জন্য করব? পাশের বাসার মোটকু আন্টির জন্য? নাকি নিচ তলার খিটখিটে আঙ্কেলের জন্য?”
ধারা ঠোঁট উল্টিয়ে অসহায় মুখশ্রী বানাতেই শ্রাবণ এবার অদুরে চোখ রেখে বলল,
—” ওগুলো তো আর আকাশ থেকে টেনে আনব না। গাছ কিনে আনতে কি লাখ টাকা লাগে?”
ধারা মাথা নাড়ালো আস্তে। নিচু চোখে ফিসফিস করে বলল,
—” তাও…এতটা ভাবছেন আমার জন্যে..কেউ তো কখনো ভাবেনি…!”
শ্রাবণ ফট করে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
—” তথাকথিত কেও এর সাথে আমার তুলনা করছো?”
ধারা পিটপিট করে তাকালো,
—” না মানে…!”

শ্রাবণ এবার চুপ করে রইল। বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে অদূরে তাকিয়ে থাকল, যেন আমতা আমতা করে বলতে চাওয়া কথাটা তার কানে আসেনি। অথচ বুকের ভেতরটা হঠাৎ উষ্ণ হয়ে উঠল। অচেনা এক টান টের পেল সে। নিজেকে শক্ত করে রাখার জন্য গম্ভীর স্বরে আবার বলে উঠল,
—” আমি নিজের অবস্থান চাই, বুঝেছো? তোমার জীবনে আমার জায়গাটা মোটেই ভুলে যাবে না মেয়ে। আমি মোটেই নিজের জায়গা, নিজের অধিকার ছাড়ার মানুষ না। এসব বিষয়ে পসেসিভ আমি। সত্যি বলতে, অভার-পসেসিভ! এ পৃথিবীতে কেও নেই যার সাথে তুমি নিজের অবস্থানের ভিত্তিতে আমার তুলনা করতে পারবে! বাকিরা তোমার কেও না, কিন্তু আমি তোমার…!”

থামলো শ্রাবণ। শিট! মুখ ফঁসকে কি বলতে চাইছিল আল্লাহ! ঠোঁট কাঁমড়ে শ্রাবণ, চোখ তুলল ধারার মুখশ্রীতে। ধারা অবাক হয়ে তাকালো শ্রাবণের দিকে। চোখেমুখে চমক আর বিস্ময় একসাথে ফুটে উঠল। কিছু বলতে চাইলেও গলাটা আটকে গেল। শ্রাবণ তাকে আর সুযোগ দিল না। তাড়াতাড়ি ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। কিন্তু দরজা বন্ধ করার আগ পর্যন্ত চোখের কোণে লুকিয়ে রাখা মিটিমিটি হাসিটা থামাতে পারল না সে। ভুল করে মুখ ফঁসকে কথাটা বললেও ভালো লাগছে শ্রাবণের। যাক, একটু ইঙ্গিত দিতে পেরেছে!

সামিউল শেখ বাড়িতে ফিরে আসলেই সব কথা জানিয়েছেন সালমা বেগম। নিজের ছেলের পাগলামির কথা শুনে সামিউল শেখের মোটেই হাসি পেলো না। বরং মুখ কুঁচকে ছেলের ঘরের দিকে তাকালেন তিনি। বেটার বুক ফাটবে, মুখ ফুটবে না! হতচ্ছাড়া ছাগল কোথাকার! শেষে পিছলে গেলোই! বংশ পরম্পরা রক্ষা হলো তবে! সুন্দরী বউ কে ছাড়তে মন চাইছে না, মুখে বললেই হয়। অত কাহিনী করার কি আছে.?

রাতের খাওয়ার পর্ব টাও বেশ অদ্ভুত ভাবে শেষ হলো। সালমা বেগম কেনো যেন নিজের প্লেট আর ধারার প্লেট নিয়ে সোজা ধারার রুমে চলে গেলেন। শ্রাবণ কেবলই নীলরঙা টি শার্ট গায়ে জড়িয়ে ডাইনিং টেবিলে বসেছে। আড়চোখে সেও বিষয়টা লক্ষ্য করল। দুটো প্লেট হাতে নিয়ে উপরের ঘরে যেতে দেখা সালমা বেগমকে তীর্যক দৃষ্টিতে দেখলো। আজকাল তার স্বয়ং মা কেনো যেন বেশ নাটক করছে! সবই কপাল! দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলে বসল শ্রাবণ। এবার লক্ষ্য করল সামিউল শেখ তাকিয়ে আছেন চশমার ফাঁক গলে। শ্রাবণ বুঝলো কোনো কিছু একটা কাহিনী আছে। তাই সে নিজে থেকেই মোলায়েম স্বরে জিজ্ঞেস করল,

—” কিছু বলবে বাবা?”
সামিউল শেখ চশমা ঠেলে চাইলেন। মাথা নেড়ে বললেন,
—” অনেক কিছু। তোর ধৈর্য্য থাকবে পাঁচ মিনিট আমার কথা শোনার?”
শ্রাবণ বুঝলো গুরুতর কোনো বিষয়। তাই মাথা নেড়ে সায় দিল। এবার ভদ্রলোক ফোঁস করে শ্বাস ফেললেন। একটু থেমে পানি খেলেন। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে শ্রাবণের দিকে তাকালেন। কণ্ঠটা এবার ভারী, গভীর হয়লো,মাথা নেড়ে বলতে শুরু করলেন,

—” শ্রাবণ, তোর মা হয়তো রাগে ঝাড়ে, না হয় ঠাট্টায় হাসে। কিন্তু আমি জানি, আমার ছেলে আসলে কী চায়। তুই নিজের মনের ভেতরটা মুখে আনতে জানিস না, এটাই তোর সবচেয়ে বড় দোষ। ধারা নামের মেয়েটাকে যেমন অপছন্দ করতিস, আজ এই মুহুর্তে বাবা হিসেবে আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, তার থেকেও বেশি এখন ওকে পছন্দ করিস, এটা আমি আজ চোখে দেখলাম। তোকে চেপে রাখতে হবে না।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে বিষয়টা বুঝে ঠোঁট ভিজিয়ে একটু এদিক-ওদিক তাকাল। গলা শুকিয়ে এলো। তবুও কিছু বলল না। সামিউল শেখ এবার চশমাটা টেবিলে খুলে রাখলেন। একটু ঝুঁকে বসে, নিচু স্বরে বললেন,
—” ধারা কি রকম জীবন কাটিয়েছে, সেটা তুই কল্পনাও করতে পারবি না। ছোট বেলা থেকে কারো আদর, কারো মায়া, কারো স্নেহ কিছুই পায়নি। ভালোবাসা তো বিলাসিতা। খাওয়াদাওয়া, পড়াশোনা, সবকিছুতেই অভাব। তার ওপরে এমন চাচি পেয়েছিল যে ওর হাসিটুকুকেও অপরাধ বানিয়ে ফেলেছে। আমি শুনেছি, একটা ছোট মেয়ে কীভাবে সারাক্ষণ ভয় আর অবহেলায় বড় হয়েছে!”

শ্রাবণের বুকের ভেতরটা হঠাৎ টনটন করে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠল কাঠগোলাপ গাছের সেই গল্পটা। সামিউল শেখ এবার সোজা হয়ে বসলেন, গম্ভীর গলায় বললেন,
—” বউ হিসেবে ধারাকে তুই শুধু দায়িত্ব মনে করিস না। এভাবে চললে মেয়েটা জীবনে কোনোদিনো শান্তি পাবে না। ওকে ভালোবাসিস, সম্মান দিস। ও যেন বুঝতে পারে, সে শুধু তোর ঘরে ঠাঁই পায়নি, তোর হৃদয়েও জায়গা পেয়েছে। এটা তোকে করতেই হবে, শ্রাবণ। এত বছরে যে অভাবের শূন্যতায় মেয়েটা বড় হয়েছে, সেই শূন্যতা যদি তুই ভরতে না পারিস, তবে ওর জীবনে কোনো মানে রইল না। এটা অপ্রিয় হলেও সত্যি, আমি শুধুমাত্র ধারার জীবনে একটু সুখ আনতেই তোর সাথে বিয়ে দিয়েছি ওর। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার ছেলে স্বামী হিসেবে খারাপ হবেনা!”

একটু থামলেন সামিউল শেখ। চোখ কড়া হয়ে উঠল এবার,
—” মনে রাখিস, মানুষ বউকে কেবল সংসারের সঙ্গী করে না, জীবনসঙ্গী করে। তাই ওর পাশে থাক, ওর হাতে হাত রাখ। একসাথে চলতে হবে তো তোদের। তোর মা বা আমি কদিন আর বাঁচব। পৃথিবীতে তোর জন্য থাকবে কে বল তো? সবসময় একটা জিনিস ভাববি যে, তোর স্ত্রী যেন কখনো বলতে না পারে যে আমার স্বামী খারাপ! এর থেকে বেশি লজ্জাজনক একটা পুরুষের কাছে হতে পারেনা! এসব কথা ভবিষ্যতের জন্য বলছি শ্রাবণ। কিন্তু বর্তমান টা কীভাবে ঠিকঠাক করবি সেটা তোর ব্যাপার! এটা তোকেই করতে হবে। আমি মোটেই ধারা কে গিয়ে বলব না যে, যাও, আজ থেকে শ্রাবণের সাথে থাকো। উহু, এটা সম্ভব না। যা করার তুই করবি। কীভাবে, সেটা তুই ভালো জানিস!”

ঘরে নীরবতা নেমে এলো। দূরে কেবল দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দ। শ্রাবণ মাথা নিচু করে বসে আছে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরেছে। কিছু একটা ভাবছে সে! বাস্তবতা আসলেই কঠিন! সেই সাথে স্বামী হওয়াও সহজ না! সবাই আদর্শ স্বামী হতে পারে না।
সামিউল শেখ চশমাটা আবারো চোখে পড়লেন, আস্তে করে বললেন,
—” তুই যদি পুরুষ হয়ে থাকিস, তবে নিজের স্ত্রীর জীবনে আফসোস রাখিস না। সৃষ্টিকর্তা তোকে যতটুকু সামর্থ্য দিয়েছে, সেই সামর্থ্য অনুযায়ী যদি তুই তোর স্ত্রীর হক পূরণ না করিস, তাহলে আমি বাবা হিসেবে তোকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারিনি। তোর মা কে বলিস, সে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট কিনা! তারপর বুঝবি কেনো এই কথা বললাম। পিতা হিসেবে এটুকুই শেখাতে পারব আমি। কথাগুলো মনে রাখবি! ”

ঘড়ির কাটা এগারোটার ছুঁইছুঁই। সামিউল শেখ এবং সালমা বেগম ইতোমধ্যে ঘরে ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমিয়েও গেছে। অথচ বেচারা শ্রাবণের চোখে ঘুম নেই। সে অপলক তাকিয়ে রয়েছে উপরের দিকে। চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে ভাবছে সে। এক হাত মাথার নিচে চাপা। সেই সময় সামিউল শেখের সমস্ত কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে শ্রাবণ। বুঝতে পেরেছে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণ। সকালে যা করার করবে ভেবে চোখ বুঁজে ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু কোনোমতেই ঘুম আসল না। খানিকক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও চোখে ঘুম নামল না। বিরক্ত হলো শ্রাবণ। নাহ! আর নেয়া যাচ্ছে না। ফট করে শোয়া থেকে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো শ্রাবণ, দ্রুত গতিতে এসে দাঁড়ালো পাশের রুমের দরজার সামনে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরগতিতে দরজা খুলল। তৎক্ষনাৎ দেখতে পেলো ঘুমন্ত ধারা কে। শাড়ি পড়েই ঘুমিয়ে গেছে মেয়েটা। ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। স্নিগ্ধ মুখটা দেখে তার হিংসে হলো। এদিকে সে ঘুমোতে পারছে না, আর এই পিচ্চিটা ঘুমিয়ে গেছে? কেনো ঘুমোলো? ঘুমোতে পারলো? শ্রাবণ ধারাকে ডাকতে শুরু করল।

—” ধারা, এই মেয়ে, ওঠো!”
শ্রাবণের ডাকে খানিকটা ঘুম হালকা হলো ধারার। একটু পর চোখ বন্ধ রেখেই অস্ফুটস্বরে বলল,
—” হুমমমম!”
ঘুমন্ত স্বরটা কানে বাজলো শ্রাবণের। ইশ! ঘুমন্ত কন্ঠটাও এত আকর্ষণীয় হয় বুঝি! শুকনো ঢোক গিলে আবারো ডাকলো শ্রাবণ,
—” ওঠো, ওঠো বলছি। চোখ খোলো!”
কিন্তু এতো ডাকাডাকি তেও ঘুম পুরোপুরি ভাঙলো না ধারার। কোনোমতে চোখ অল্প একটু খুলে ভাঙা স্বরে বলল,
—’ কিছু লাগবে আপনার?”
—” হ্যাঁ লাগবে! ওঠো দেখি!”

কিন্তু আবারো চোখ বন্ধ করে ঘুমে তলিয়ে গেলো ধারা। শ্রাবণ বুঝলো গভীর ঘুম। তাই ঠোঁট কাঁমড়ে তাকিয়ে নিজের শার্টের হাতা গোটালো শ্রাবণ। দেরি না করে ফট করে ছোট্ট শরীরটা কোলে তুলে নিল। খানিকটা ভয় পেলো ধারা। ঘুম? কোথায় ঘুম? কীসের ঘুম? কার ঘুম? ধারার সব ঘুম কর্পূরের মত উড়ে গিয়ে কুতুব মিনার চলে গেলো। বড় বড় চোখ করে হা করে তাকালো ধারা। শ্রাবণের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে হতবাক হয়ে বলল,
—’ কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?”
আমতা আমতা করে বলা কথাটুকু শ্রাবণের পছন্দ হলো না বোধহয়। ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
—” শাট আপ ইডিয়ট! আমাকে ঘুমোতে হবে!”
নিষ্পাপ ভঙ্গিতে ধারা বলল,

—” তো ঘুমান!”
তৎক্ষনাৎ শ্রাবণ বলে উঠলো,
—” তোমাকে ছাড়া ঘুম আসছে না!”
চোখ পিটপিট করে তাকালো ধারা, কথাটা ঠিক শুনেছে কিনা নিশ্চিত হতে বলল,
—” কীহ?”
শ্রাবণ বুঝলো মুখ ফঁসকে সত্যি কথাটা বলে গেছে। তাই ফট করে বলল,
—” কিছু না!”

শ্রাবণের বুকটা ধুকপুক করতে লাগল নিজেরই বলা কথায়। ঠোঁট কামড়ে এদিক-ওদিক তাকাল, যেন ভুল করে কোনো গোপন ফাঁস হয়ে গেছে। ধারা তখনো বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। তার চেহারার অভিব্যক্তি এমন, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত কথা সে এখনই শুনল। কোলে থাকা অবস্থায় ধারা ফিসফিস করে বলল,
—” আমাকে ছাড়ুন।”
শ্রাবণ চোখ কুঁচকে গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল,
—” ছাড়ব না। ঘুমালে একসাথে ঘুমাব। না হলে তোমাকেও ঘুমাতে দিব না, আমিও ঘুমোবো না।”
ধারা ভয়ার্ত অথচ কেমন এক অদ্ভুত কাঁপুনিতে মিশ্রিত স্বরে বলল,

—” কিন্তু… কিন্তু এটা ঠিক না।”
শ্রাবণ ঠোঁটে একচিলতে হাসি টেনে নিয়ে মৃদু স্বরে জবাব দিল,
—” ছোট থেকে তোমার জীবনে কোনো কিছুই ঠিক হয়নি। একবার হলেও, কোনো কিছু নিজের মত করে ঠিক হতে দাও। চুপ থাকো!”
ধারা স্তব্ধ হয়ে গেল। কেমন এক ঝড় বয়ে গেল তার বুকের ভেতর। মৃদু নিঃশ্বাস ফেলল সে। শ্রাবণ হাঁটতে হাঁটতে নিজের ঘরে পৌঁছে বিছানার দিকে গেল। আস্তে করে ধারাকে নামিয়ে শুইয়ে দিল। এরপর দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর নিজেও পাশে শুয়ে পড়ল। তবে একটু ফাঁকা জায়গা রেখে। হাতের উপর মাথা রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

—” এখন ঘুমোও। আমি আছি।”
ধারার চোখে জল এসে জমল। কারনটা জানেনা। বুকের ভেতর কেমন করে উঠল তার। সত্যি বলতে তারও একা ঘুমোতে কেনো যেন ভালো লাগছিল না। অনেক কষ্টে ঘুমিয়েছিল সে। চুপচাপ পাশ ফিরল ধারা। চোখ বন্ধ করল। ধীরে ধীরে ঘুম নেমে এলো তার চোখে। শ্রাবণ তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। কি আশ্চর্য! দুজন মানুষ পাশাপাশি শোয়ার পরেও একে অপরকে না দেখে দুজনে দুদিকে মুখ ফিরিয়েই শুয়ে পড়লো।
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলো। কি আজব কারবার! এখনো তো শ্রাবণের ঘুম আসছে না। পাশে ধারা নিশ্চুপ, নিয়মিত নিঃশ্বাস ফেলছে। শ্রাবণ ভেবেছিল গাধাটাকে পাশে নিলে তার ঘুম আসবে।

অথচ এখনো শ্রাবণের চোখ যেন একফোঁটা বন্ধ হচ্ছে না। চোখের পাতায় ভার আসছে, কিন্তু বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো ঠিক যেন হাঁড়ির ভেতর ফুটতে থাকা দমের মতো একটু পরেই উপচে পড়বে। মাথার নিচে হাত গুঁজে রাখা অবস্থায় শ্রাবণ ভেতরে ভেতরে কেমন যেন লড়াই করছে। কেনো পারছি না মুখে আনতে? এতটুকু বলাটাই কি এত কঠিন? শ্রাবণ চোখ বন্ধ করল একবার, কিন্তু পরক্ষণেই আবার খুলে ফেলল। মনের ভেতর জমে থাকা কথা তাকে কুঁড়ে খাচ্ছে। বারবার ধারা নামটা মাথায় প্রতিধ্বনি তুলছে। পাশেই মেয়েটা শুয়ে আছে। অথচ এই শান্তিটা দেখে শ্রাবণের বুকের মধ্যে অস্থিরতা আরও বেড়ে যাচ্ছে। মনে মনে গুমরে উঠল সে, কেনো এত বছর পর এমন এক মেয়ে এসে আমাকে অস্থির করে দিচ্ছে? কেনো মনে হচ্ছে, ওকে না বললে আমার জীবনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে? ধুর! মুখে আনতে না পারলে সব দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

ঠোঁট কামড়ে পাশ ফিরে তাকাল শ্রাবণ। চাঁদের আলোয় ধারা শান্ত মুখে শুয়ে আছে। বুকের ভেতর আবার ঢেউ তুলল মমতা আর অদম্য টান। সে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। কেনো যেন মনে হলো ধারা ঘুমোয়নি। শরীর একদম স্থবির হয়ে আছে। নাহ! আর চেপে রাখা যাচ্ছে না। এমন করে থাকলে সে নিজেই জ্বলে যাবে। তাই মিহি স্বরে ডেকে উঠলো শ্রাবণ,

—” ধারা!”
—” উমম..!”
শ্রাবণ শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল,
—” ঘুমিয়ে গেছো ?”
ধারা ঘুমোয়নি। উৎকন্ঠায় মরিমরি অবস্থা তার। এসব মেনে নিতে জানটাই না চলে যায়! শ্রাবণ শেখ নাকি তাকে কোলে করে এই ঘরে এনেছে? এটাও ভাবা যায়! কোনোমতে ধারা মিনমিন করে বলল,
—” উহু! ”
শ্রাবণ এবার চোখে একরাশ মায়া নিয়ে বলল,
—” তুমি যে বলেছিলে, ভুল করেও নাকি তুমি ভালো কিছু পাবে না। অথচ আমি যে অপ্রত্যাশিত ভাবেই তোমায় ভালোবেসে ফেললাম। এবার কী হবে?”
ধারার বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। নিঃশ্বাস এক লহমায় আটকে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সে অন্ধকারে, যদিও শ্রাবণের মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। এতটা অপ্রত্যাশিত স্বীকারোক্তি, এমন কিছু শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।

মুহূর্তে শরীর গরম হয়ে উঠলো ধারার, আবার হাত-পা যেন শীতল বরফে ডুবে গেল। ভালোবেসে ফেলেছে? শ্রাবণ শেখ? এ যেন কানে বাজতে থাকা এক অচেনা সুর। বিশ্বাস হচ্ছে না, আবার ভীষণভাবে সত্যি মনে হচ্ছে। ঠোঁট কাঁপছিল তার, কিছু বলার চেষ্টা করেও গলায় শব্দ আটকে গেল। ধুকপুকানি এত দ্রুত হচ্ছিল যে মনে হলো, বুক ভেঙে সব বেরিয়ে পড়বে। চোখে অঝোরে জল চলে এলো, অথচ সে জানেই না কেনো।
শ্রাবণ স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে তার প্রতিক্রিয়ার দিকে। মেয়েটার চোখের বিস্ময়, শরীরের কাঁপুনি, সবই বুঝতে পারছে সে। হালকা হাসির এক মায়ামাখা রেখা ফুটলো শ্রাবণের ঠোঁটে। ধারার মনে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো। গলা শুকিয়ে এলো তার। কোনোভাবে অস্পষ্ট, কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলল,

—” হু?”
শ্রাবণ এবার আর চোখ ফেরাল না। মৃদু কণ্ঠে, কিন্তু নিঃসন্দেহে বলল,
—” আমি বললাম, তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি, ধারা।”
এবার ধারার ভেতরকার বিস্ময় আর অবাক ভাব যেন হাজার গুণ বেড়ে গেল। সে সত্যিই হতভম্ব হয়ে গেলো। শুকনো ঢোক গিলে হাত মুঠো করে গুটিয়ে এলো। ওভাবে শুয়েই থাকলো। ঠোঁট কাঁমড়ে এলোমেলো চোখে তাকালো। আমতা আমতা করে বলল,
—” আপনার বোধহয় কোথাও ভুল হচ্ছে! ”
মেজাজ খারাপ হলো শ্রাবণের। সে কতটা কষ্ট করে মনের কথাটা বলল, আর এই মেয়ে বলে কিনা তার ভুল হচ্ছে! শ্রাবণ এবার ধমকের সুরে বলে উঠলো,

—” তুমি আবার উল্টোপাল্টা কথা বলছো? শাট আপ! অত কথা কে বলতে বলেছে। যেটা বলেছি সেটা শুনে রাখো। শ্রাবণ শেখের এ বিষয়ে ভুল হবে না, বুঝেছো?”
ধারার বুক ধকধক করে উঠলো শ্রাবণের ধমকের তীব্রতায়। গলা শুকিয়ে গেল। এত দৃঢ়ভাবে, এত নির্দ্বিধায় কেউ তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছে, এরকম অভিজ্ঞতা তার জীবনে নেই। বরং এতদিন কেবল শাসন, গঞ্জনা আর অবহেলাই শুনে এসেছে। আজ হঠাৎ শ্রাবণের এই অকপট স্বীকারোক্তি তাকে সম্পূর্ণ অচল করে দিল। চোখের কোণে টলমল করা অশ্রু যেন আর আটকে রাখা গেল না। নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। সে মুখ ঘুরিয়ে নিলো, যাতে শ্রাবণ না দেখতে পায়। তবু শ্রাবণ খেয়াল করলো। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো সে। মৃদু স্বরে এবার একটু নরম হয়ে বললো শ্রাবণ,

—” কাঁদছো কেনো? আমি কি তোমায় কষ্ট দিলাম?”
ধারা তাড়াহুড়ো করে চোখ মুছে নিল, ফিসফিস করে বলল
—”উহু, কিছু না।”
কিন্তু কণ্ঠের কাঁপন আর ভেজা চোখ সব বলে দিচ্ছিল, এটা কিছু না নয়।
শ্রাবণ ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে নিল। দ্বিধায় থেমে গেলেও শেষ পর্যন্ত আলতো করে ধারার হাতটা চেপে ধরল। শক্ত নয়, কিন্তু ভরসা জাগানো এক মুঠো।
—” আর কাউকে প্রমাণ করার দরকার নেই। আমি জানি আমি কী চাই। আমি জানি, আমি তোমায় চাই। কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে নাও। নাহলে হাতুড়ি মেরে ঢোকাব!”
ধারা স্তব্ধ। বুক ভরে উঠছে, আবার ভয়েও কাঁপছে। সে মাথা নিচু করে, শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। শ্রাবণ এবার দৃঢ়স্বরে বলল,

—” আজ থেকে এ ঘরে থাকবে তুমি। এই বিছানায় ঘুমোবে!”
—” আর আপনি?”
—” আমিও এ ঘরেই থাকবো।”
—’ আর ঘুমোবেন কোথায়?”
ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। মেয়েটা কি পাগল? নাকি বেশিই পিচ্চি! সবকিছু ধরিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে নাকি? নিজে থেকে একটু বুঝবে না? ধারার নিষ্পাপ চাহনি দেখেও মন গলল না তার। শক্ত কন্ঠে বলল,
—” তুমি কি আমায় বিছানার নিচে ঘুমোতে বলছো?”
তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়লো ধারা,
—” ছি ছি, না! ”

শ্রাবণ বুৃঝলো এই মেয়েকে এভাবে বললে হবে না। ঠিকঠাক বলতে হবে। তাই শ্রাবণ এবার শোয়া থেকে উঠে বসল। ধারাকে উঠতে বলল। কোনোমতে সন্দিহান দৃষ্টি নিয়ে ধারাও ভয়ে ভয়ে উঠে বসে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ এবার এগিয়ে এসে চোখ রাখলো ধারার মুখের দিকে। চোখে চোখ রেখে বলতে শুরু করলো,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৯

—” তিন কবুল বলে বিয়ে করেছি তোমায়। আর আমি লস প্রজেক্ট পছন্দ করি না। তুমি চাও বা না চাও, তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে। কারন তুমি আমার বউ। কথাটা বুঝেছো? আমার স্ত্রী তুমি। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। এর দায়ভারও তোমার। তুমি বাধ্য করেছো। আমি চাইনি তোমায় ভালোবেসতে। অথচ হাঁটুর বয়সী তুমি, কি খেলটাই না খেললে। জাদুটোনা ভালোই জানো তুমি! তাই এখন যদি তোমায় শিকল দিয়ে আমার জীবনে বেঁধে রাখতে হয়, তাহলে তাই করব। কথাটা এই ছোট্ট মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে নাও। এখন ঘুম দরকার আমার। চুপচাপ আমার পাশে ঘুমোও। বাকি কথা কালকে হবে। গুড নাইট!”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২১