Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৩

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৩

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৩
অনামিকা তাহসিন রোজা

অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু জীবনে আসলে, অপ্রত্যাশিত কিছু অনায়াসে পেয়ে গেলে যেকোনো মানুষই মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হয়। ধারার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। ছোট থেকে অনেক ঝড়ঝাপটা গেছে তার উপর দিয়ে। কেও সামান্যটুকু আদরও তাকে করেনি। আর পাঁচটা মেয়ের মত বাবার আদর পায়নি, মায়ের ভালোবাসা পায়নি। তবে সময়ের অদ্ভুত খেলায় আজ শ্রাবণ শেখ তার কাছে এসেছিল। যতটুকুই হোক না কেনো! তবুও কাছে তো এসেছিল। যা একদমই নিতে পারেনি ধারার ছোট্ট কায়াটা। পুরোদমে ছুটে এসে একদম পাশের রুমের বারান্দাতে এসেই থামলো ধারা। রেলিং এ দুহাত রেখে হাঁপাতে থাকলো। জোরে জোরে শ্বাস টানার ভঙ্গিটা দেখে মনে হচ্ছে পেছনে কেও তাড়া করেছিল। অবাধ্য মনটা অবশ্য বলছে আসলেই পেছনে তাড়া করেছিল। অদৃশ্য মনটা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা আর, শ্রাবণ শেখের একটুখানি ছোঁয়াটা তাড়া করেছিল উন্মাদের মত!

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দিনের আলো প্রায় ফুরিয়ে গেছে। সামিউল শেখ প্রতিদিনের মত এক কাপ রঙ চা নিয়ে টিভির সামনে বসেছেন। মনোযোগী দৃষ্টি দিয়ে নিউজ চ্যানেলগুলো একটার পর একটা বদলাচ্ছেন। আজকাল যদসব উদ্ভট ভয়ানক নিউজ গুলো ছড়িয়ে গেছে। পৃথিবী টা কতই না অদ্ভুত! সামান্য সম্পত্তির জন্য এক ভাই আরেক ভাইয়ের প্রাণ পর্যন্ত নিতে দ্বিধাবোধ করছে না। শিশু পর্যন্ত ধ*র্ষনের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এসব ছাড়াও চুরি ডাকাতি তো প্রতিদিনের সাধারন খবর। এদের তো জালেম বললেও কম হয়ে যায়। প্রতিদিনই এসব নিউজ আসে চ্যানেল গুলোতে আর দেখেই সর্বদা মুখ কুঁচকে ফেলেন সামিউল শেখ। ছোট্ট একটা জীবন মানুষের। কি দরকার এসব করার! সম্পত্তি কি কবরে নিয়ে যাবে? দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

একটু পরে দেখা গেলো ধারা কে। খুব মনোযোগ দিয়ে রান্নাঘরে চা বানানো শিখছে সে। যদিও ধারা অনেক ভালো চা বানায়। তবে এটা নাকি কি একটা বিদেশি রকমের চা, যেটা সামিউল শেখ আর শ্রাবণ প্রায়ই খায়। যখনই ধারা শুনলো এই ধরনের চা শ্রাবণের পছন্দ, তখনই মিনমিন করে এসে বিড়ালের মত উঁকিঝুঁকি মেরে সালমা বেগমের চা বানানো টা দেখতে থাকলো। মনে মনে সব শিখে নিতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর চা বানানো শেষ হলে সালমা বেগম ট্রেতে চারটে কাপ সাজিয়ে দিয়ে ধারার হাতে দিলেন।

ট্রে হাতে ধারা ওড়না সামলে নিল। এরপর একপা দুপা করে সোফার দিকে এগোতে থাকলো। কিন্তু সোফায় সামিউল শেখের দিকে আসার আগেই শ্রাবণ কে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে দেখা গেলো। কালো রঙের টি শার্ট টা পড়তে পড়তে নিচে নামলো শ্রাবণ। এক পলক ধারার দিকে তাকালো। এদিকে শ্রাবণ কে দেখে পা’জোড়া স্তব্ধ হলো ধারার। বুকের ভেতর কালবৈশাখীর প্রবল ঝড় উঠলো। হাতে থাকা ট্রে টাও থরথর করে কাঁপতে থাকলো। শুকনো ঠোঁট জ্বিভের অগ্রভাগ দিয়ে ভিজিয়ে ঢোক গিলল মেয়েটা। নিতান্তই অতিরঞ্জিত ব্যাপার-স্যাপার। কিন্তু কিছু করার নেই। বিকালে ওই ঘটনার পর থেকেই ধারা শ্রাবণের সামনে যায়নি। বা যাওয়ার সাহস পায়নি। লজ্জায় মরিমরি অবস্থা মেয়েটার। প্রথমে তন্নির প্রতি রাগে সে হুঁশ হারালেও পরে বুঝতে পেরেছে কতই না লজ্জাজনক কাজ করেছে সে। ঘুমন্ত লোকটার দিকে অভদ্রের মত তাকিয়ে থাকার কি দরকার ছিল? আবার তর্কও করেছে! ইশ! কি লজ্জা, কি লজ্জা!

শ্রাবণ আড়চোখে ভ্রু কুঁচকে সবটা লক্ষ্য করলো। ট্রের কাপে কাপে চায়ের ভেতর থেকে ধোঁয়া উড়ছে, আর তার সাথে সাথে মেয়েটার হাতও কাঁপছে থরথর করে। মনে মনে “ইডিয়ট” বলতেও ভুলল না শ্রাবণ। তাকে দেখে এমন কাঁপা-কাঁপি করার কি আছে? সে কি বাচ্চা মেয়েটা কে খেয়ে ফেলবে নাকি? দুষ্টু মনটা হুট করেই অবাধ্য হলো। মিটিমিটি হেসে শ্রাবণ বিড়বিড় করল,

—” আসলেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলা দরকার!”
বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে ধারার দিকে চেয়ে সোফায় বসতে গিয়েও বসল না শ্রাবণ। মেয়েটা যেভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে, টোকা দিলেই বোধহয় ধপাশ করে পড়ে যাবে। হাতে থাকা ট্রেটার প্রতি মায়া হলো শ্রাবণের। ধারা কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই, শ্রাবণ হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে ধারার হাত থেকে নিয়ে নিল ট্রেটা। বিস্ময়াভিভূত ধারা সন্দিহান দৃষ্টি ফেলে তাকালে শ্রাবণ দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠলো,
—” ড্রিল মেশিনের মত কাঁপছো! এর মধ্যে আবার ট্রে হাতে ঘুরছো? ইউ ক্যারি অন ইওর কাঁপা-কাঁপি। দাও, এটা বরং আমি-ই নিয়ে যাচ্ছি।”

ধারার গাল লাল হয়ে উঠলো লজ্জায়। বুকের ভেতর আরো দ্রুত বাজতে লাগলো ঢাকঢোল। কিছু বলার সাহস পেল না সে। শুধু আড়চোখে তাকিয়ে নিজের আঁচল খুঁটতে লাগল। শ্রাবণ সামিউল শেখের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলে ধারাও শ্রাবণের পেছন পেছন গুটিসুটি মেরে বিড়ালের মত এগোলো, আর শ্রাবণ সোফার কাছে থামলে ধারাও সংকুচিত হয়ে শ্রাবণের পেছনে দাঁড়ালো। উঁকি মেরে একবার কাপের দিকে তাকিয়ে দেখলো সব ঠিক আছে কিনা।
শ্রাবণ একটা কাপ সামিউল শেখের সামনে রাখতেই আগুনে কেরোসিন ঢালার মত চেতে গেলেন ভদ্রলোক। রীতিমতো ধমকে বলে উঠলো,

—” তোমরা কি আমায় চায়ে ডুবিয়ে মা’রতে চাইছো হ্যাঁ?”
অপ্রস্তুত হলো শ্রাবণ। ধারাও পিটপিট করে তাকালো, সে তো একেবারেই দিশেহারা। পরে শ্রাবণ খেয়াল করল সামিউল শেখের হাতে আগে থেকেই এক কাপ রঙ চা। তাই শ্রাবণ বলল,
—” আমি কি জানি বাবা? মা-ই তো দিল। তুমি আবার রঙ চা খেয়েছো কেনো এখন? এই চা খাবে না?”
সামিউল শেখ এবার ফট করে শ্রাবণের হাতে থেকে দ্বিতীয় কাপ টাও নিয়ে নিলেন। আমতা আমতা করে গম্ভীর স্বরে বললেন,

—’ সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো, তোমরা মা ছেলে মিলে চায়ের মধ্যে ডুবিয়ে আমার কবরে যাওয়ার রাস্তা ক্লিয়ার করার কুটিল ষড়যন্ত্র করেছো!”
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের বাবা কে খুব ভালো করেই চেনে সে। তাই নিজের কাপ টা নিয়ে ধপ করে সোফায় বসে পড়লো। ধারা বিরাট অসস্তিতে পড়লো। শ্বশুরের হঠাৎ এমন আচরণ আর শ্রাবণের নির্লিপ্ততার কারন বুঝলো না। সে এবার মিনমিন করে বলল,
—” আপনি খেতে না চাইলে চা টা দিয়ে দিন বাবা। জোর করে খেতে হবে না!”
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বাঁকা হাসলো শ্রাবণ। চা ফিরিয়ে দেবে? তাও আবার তার বাবা? হুহ! অসম্ভব! সামিউল শেখ দুটো কাপই শক্ত করে হাতে চেপে ধরে মিনমিন করে বললেন,
—” না বউমা। তোমার শ্বাশুড়ি যখন কষ্ট করে বানিয়ছে, তখন কি আর করার! খেতেই হবে। এরা মা- ছেলে দুজনেই তো চা লোভী! ”
রান্নাঘর থেকে সালমা বেগমের বিদ্রুপ স্বর ভেসে এলো,

—” হুম। এখানে যে কে চা-লোভী সেটা আমরা বেশ ভালোই জানি। যাক গে, শ্রাবণ রাতে আরো এক কাপ চা বানাবো বুঝলি। তোর বাপকে দেব না!”
প্রথমে বউমার সামনে নিজের চা লোভের বিষয়টা ফাঁস হওয়ায় অপ্রস্তুত হলেও পরের কথাটা শুনে চমকে রান্নাঘরের দিকে তাকালেন সামিউল শেখ। চা তাকে দেবে না মানে? এও কি সম্ভব নাকি? চা ছাড়া তো ভদ্রলোকের জীবন অচল। তার ভেতরে ছোট্ট ভূমিকম্প শুরু হলো। চা ছাড়া তার তো বেঁচে থাকা দায়! শ্রাবণ ফিক করে হেসে উঠতে গিয়েও মুখ চেপে রাখল, হাসলো না। এ বাড়িতে তারা দুজনই চরম লেভেলের চা-খোর! ধারা আর শ্রাবণ তেমন পাগল না হলেও বাকিরা চায়ের জন্য জান দিতে প্রস্তুত!
ধারা এবার বুঝলো বিষয়টা। সেও মুচকি হেসে আবারো রান্নাঘরে চলে গেলে সামিউল শেখ খানিকটা ঝুঁকে আসলো শ্রাবণের দিকে। চোখ কুঁচকে ধমক দিয়ে বলল,

—” এই ছেলে, বউমার সামনে আমায় অপমান করবি না, আর তোর মা কে বলে দিস, আমায় ছাড়া চা খেলে সে মোটেই বেহেশত পাবে না। ফেরেশতারা কিন্তু সব দেখছে! রাতে যেন আরো দু কাপ পাই৷ মাথায় রাখিস!”
বিষম লেগে গেলো চায়ে চুমুক দিতে থাকা শ্রাবণের। কাশতে কাশতে অসহায় চোখে তাকালো বাবার দিকে। তাহলে এই ডায়লগ টাও সে বংশগত পেয়েছে। এই জন্যই ধারা কিছু করলেই তাকে এই হুমকি দেয় শ্রাবণ! কি একটা অবস্থা!

খানিকক্ষণ বাদে সালমা বেগম আর ধারাও সোফায় এসে বসলো। সালমা বেগম কায়দা করে শ্রাবণের পাশে ধারা কে বসাতেই দুটো হার্টবিট মিস করল ধারা। নিজের ওড়না চেপে ধরল সে। মেয়েটাকে পাশে বসতে দেখে শ্রাবণও সবার আড়ালে একটু এগিয়ে এলো। আড়চোখে দেখল পিচ্চিটার লাজুক মুখটা। পাকা টমেটোর মত লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখতে এত ভালো লাগে কেনো কে জানে! সামিউল শেখ কিছু একটা মনে করতেই হুট করেই বলে উঠলেন,
—” ও ভালো কথা, রাতে কি তুই বিজি থাকবি শ্রাবণ? অফিসের কোনো কাজ আছে কি?”
শ্রাবণ একটু সময় নিয়ে ভেবে বলল,
—” নাহ, তেমন কাজ নেই।”
সামিউল শেখ এবার চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
—” তাহলে চল একটু সিটি হসপিটাল থেকে ঘুরে আসি!”
এক মুহূর্তে ঘরের পরিবেশ পাল্টে গেল। সবাই অবাক হয়ে তাকাল ভদ্রলোকের দিকে। সালমা বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,

—”হাসপাতালে? হঠাৎ, কেনো?”
শ্রাবণও অবাক। গুরুতর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
—”কোনো? কিছু হয়েছে নাকি বাবা?”
ধারাও চিন্তিত চোখে একবার শ্বশুরের দিকে, একবার শ্রাবণের দিকে তাকালো। সামিউল শেখ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—” তন্নি সু”ইসাইড করার চেষ্টা করেছিল!”
এক মুহূর্তে পুরো ঘরটা হিম হয়ে গেল। সালমা বেগম দুহাত জোড় করে মাথায় দিলেন,
—”আল্লাহ! এ আবার কি বলছো তুমি?”
শ্রাবণের চোখ বিস্ফারিত। একবার ধারার দিকে তাকালো সে। চিন্তিত হতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, ভেতরে প্রচণ্ড ধাক্কা খেলেও ঠান্ডা গলায় বলল,

—”কি বলছো তুমি বাবা? কখন হলো এসব?”
সামিউল শেখ ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন,
—”বিকেলের দিকে খবর পেয়েছি। ও নাকি ওষুধ খেয়েছিল। ভাগ্যিস সময়মতো টের পেয়েছে ওর বাবা। এখনো সিটি হসপিটালের আইসিইউতে আছে।”

ধারার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। নিজের অজান্তেই ওড়না চেপে ধরল সে। মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো বিকেলের জুয়েলারি শপের সেই দৃশ্যটা, তন্নির চোখের দৃষ্টি, সেই হাহাকার মাখা কামনা। এটা বুঝতে বাকি নেই যে তন্নি কোন কারনে এই কাজটা করেছে। একবার অসহায় চোখে শ্রাবণের দিকে তাকালো ধারা। শ্রাবণ আগে থেকেই তাকিয়ে ছিল। চোখাচোখি হতেই ধারা চোখ নামিয়ে নিল।
সালমা বেগম কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—” তো আপনি কেনো যেতে চাইছেন শ্রাবণের বাবা?”
শ্রাবণের চোখেও একই প্রশ্ন। সামিউল শেখ ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন,
—” তন্নির বাবা কল করেছিল। পুরোপুরি ভাবে জ্ঞান এখনো ফেরে নি। কিন্তু বিড়বিড় করে নাকি শ্রাবণের নাম বলছে বারবার। তাই ভাবছি একবার ফর্মালিটির খাতিরে দেখে আসি। আর ডক্টর নাকি পুরো ঘটনা শুনে বলল শ্রাবণকে একবার নিয়ে গেলে অবস্থার উন্নতি হতে পারে!”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জোরালো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তাকে দেখলেই মেয়েটা সুস্থ হবে নাকি? সিনেমাটিক ব্যপার! সালমা বেগমও খুব বেশি আমলে নিলেন না। কিন্তু ধারা চিন্তিত হলো। হাতের কাপটায় আঙুল ছুঁয়ে ভাবতে থাকলো কিছু একটা। সামিউল শেখ এবার কন্ঠ খাদে নামিয়ে নরম স্বরে বললেন,

—” আমার কি মনে হয় জানিস শ্রাবণ? মেয়েটা বোধহয় সত্যিই তোর প্রতি উইক। সোজা বাংলায় ভালোবাসে তোকে। আসলে আশা, ভরসা আর বিশ্বাস- তিন জিনিসই মারাত্মক ভয়ংকর! তন্নির ক্ষেত্রে আশাটা কাজে লেগেছে। ও আশা করেছিল তোর সাথে সংসার করার। বিশ্বাস, আশা আর ভরসা থেকেই ধীরে ধীরে ভালোবাসা জন্ম নেয়! এগুলো যতদিন থাকে, মানুষ বেঁচে থাকার অজুহাত খুঁজে নেয়। কিন্তু যেদিন এগুলো ভেঙে যায়, সেদিন মানুষ সব শেষ করে ফেলে।”

শ্রাবণ কোনো উত্তর দিল না। শুধু একপলক ধারার দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে গভীর শ্বাস নিল। ধারা নিজেকে তন্নির জায়গায় বসালো। মনে মনে নিজের মত করে ভাবল যে সে যদি তন্নির জায়গায় থাকত৷ আর শ্রাবণ কে অন্য কোনো মেয়ের সাথে দেখতো, তবে কেমন অনুভূতি হতো। পরমুহূর্তেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেঁপে উঠলো ধারার। ভয়ানক যন্ত্রনা! সে এমন দৃশ্য নিতেই পারবে না!
সামিউল শেখ কিছুক্ষণ নীরব থেকে ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে নিলেন। তারপর এক চুমুক চা খেয়ে গলা পরিষ্কার করলেন।

—”মানুষ যখন কাউকে নিজের জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে, তখন সেই মানুষটা যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, তখন সে ভেঙে পড়ে একেবারে। তন্নির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ওর নিজের পরিবার হয়তো যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেনি, কিংবা দিতে চেয়েও পারেনি।”
ভদ্রলোক এবার নিঃশ্বাস ফেললেন। ধারার দিকে অসহায় দৃষ্টি ফেলে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—”ভালোবাসা একটা অদ্ভুত ব্যাপার রে। এটা কাউকে শক্তিশালী করে তোলে, আবার ধ্বংসও করে দেয়। তন্নি হয়তো ভেবেছিল তোকে বিয়ে করলে তার পৃথিবী পূর্ণ হবে। কিন্তু যখন দেখলো তুই অন্য কারও সাথে সংসার শুরু করেছিস, তখন সেই ভরসার জায়গাটা ধসে গেল।”
সালমা বেগম ভ্রু কুঁচকে মাঝখানেই বললেন,
—”তাহলেই কি এমন ভুল কাজ করবে? নিজের জীবনটাই শেষ করতে চাইবে?”
সামিউল শেখ শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,

—”আত্মহত্যার চেষ্টা যে সঠিক কাজ তা বলছি না। তবে মানসিক চাপ, একাকীত্ব, ভরসার জায়গা হারানো, সব মিলে মানুষকে এভাবে ঠেলে দেয় অন্ধকারে। ও হয়তো চেয়েছিল একটা শেষ চেষ্টা করতে, যেটা আমরা এখন ‘ডিস্টার্বড মেন্টাল স্টেট’ বলি।”
শ্রাবণ নিচু স্বরে বলল,
—” কিন্তু বাবা, এসব নিতান্তই ছেলেমানুষী! আমি বিবাহিত। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে তিন জিনিসই উপরওয়ালার হাতে, এটা তোমরাই আমায় বলেছো। জোর করে কোনো কিছুই হয়না! ওই মেয়েটার এমন কুৎসিত ভাবনা থাকাটা কি স্বাভাবিক!”
সামিউল শেখ ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,

—”ভাবাটা স্বাভাবিক, শ্রাবণ। কিন্তু এই ভাবনা যদি সামলে না ওঠে, তাহলে ওর জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে। এজন্য ডাক্তারও বলছে তোকে একবার দেখা দিতে। তোর উপস্থিতি হয়তো ওর মাথায় একটা স্পষ্ট উত্তর তৈরি করবে, যে তুই এখন অন্য কারও, তোর জীবন অন্য দিকে এগিয়ে গেছে। সেটা হয়তো কষ্টের হবে, কিন্তু সময়ের সাথে ওর মেনে নিতে সাহায্য করবে। আমি চাইছিলাম তোকে নিয়ে যেতে। শুধু শেষ বারের মত বুঝিয়ে আসবি ওকে। সরাসরি বলে বোঝাবি যে এসব করেও কোনো লাভ নেই!”
ধারার বুকটা হুহু করে উঠলো। ভেতরে ভেতরে যেন আঘাত লাগল। একদিকে তন্নির কষ্টের প্রতি সহানুভূতি, অন্যদিকে অদ্ভুত ভয়, শ্রাবণ যদি গিয়ে তন্নির অবস্থা দেখে দুর্বল হয়ে পড়ে? ওর মনে হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত শঙ্কা জন্ম নিল। যদিও এটাও একটা ছেলেমানুষী চিন্তাভাবনা।
সালমা বেগম হালকা অসন্তোষে মাথা নাড়লেন।

—” এসবই বাড়াবাড়ি। একটা ছেলের জন্য এভাবে নিজের জীবন শেষ করতে যায় কেউ? এর মানে হলো মনের জোরই নেই মেয়েটার।”
সামিউল শেখ স্ত্রীর দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালেন,
—” তুমি আমি বয়সে অনেকটা বড় হয়েছি বলেই এসব ঠান্ডা মাথায় ভাবতে পারি। কিন্তু ও এখনো তরুণী। ওর কাছে ভালোবাসাটাই সবচেয়ে বড়। তুমি-আমি হয়তো বলব জীবন মানে সংসার, দায়িত্ব, পরিবার। কিন্তু তন্নির কাছে জীবন মানে শুধু আবেগ। আর সেই আবেগকে যখন সে দূরে সরে যেতে দেখলো, তখন ওর চোখে সব অন্ধকার হয়ে গেছে।”

শ্রাবণ এবার মেঝেতে চোখ নামিয়ে ভাবতে থাকলো কিছু একটা। সালমা বেগম আড়চোখে ধারার দিকে তাকালেন। তিনি ভেবেছিলেন আজকেও ধারা বরাবরের মত নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি নিয়ে থাকবে। অথচ অবাক হয়ে তিনি লক্ষ্য করলেন, ধারা একরাশ আশা নিয়ে আতঙ্কিত নয়নে চেয়ে রয়েছে ভাবুক শ্রাবণের দিকে। চোখে এক ফালি আশা, ভরসা আর চরম বিশ্বাস! সালমা বেগম অবাক হয়ে দেখলেন ধারাকে, এরপর নিজের ছেলের দিকে তাকালেন। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল তার। তিনি এবার সামিউল শেখ কে ইশারা করলেন ধারাকে দেখার জন্য। ভদ্রলোক হেসে মাথা নেড়ে বোঝালেন তিনি সবই দেখছেন, খেয়াল করেছেন ধারার অস্থিরতা!
শ্রাবণ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ফট করে জানালো,
—” ঠিক আছে বাবা। আমি তৈরী হয়ে আসছি। শেষবারের মত একবার দেখা করে আসি!”
শ্রাবণের হঠাৎ সিদ্ধান্তে ঘরের সবাই মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। সবার বিস্ময়ের মাঝেই শ্রাবণ কোনো দ্বিধা না রেখেই হঠাৎ পাশে বসা ধারার হাত চেপে ধরলো, মুখে বলল,

—” ঘরে চলো। কথা আছে!”
মেয়েটা যেন আচমকা বিদ্যুতের শক খেলো। ঠাণ্ডা আঙুলগুলো মুহূর্তেই ঘেমে উঠলো। লালচে মুখটা আরও টকটকে লাল হয়ে উঠলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শ্রাবণ উঠে দাঁড়াল। হাতে আঁকড়ে রাখা ধারাটাকেও দাঁড় করালো জোরে টান দিয়ে। বিস্মিত চোখে সালমা বেগম আর সামিউল শেখ একে অপরের দিকে তাকালেন। তারা ভেবেছিলেন শ্রাবণ শুধু কথা বলবে, কিন্তু এভাবে সবার সামনেই ধারা কে হাত ধরে টেনে নেবে, সেটা ভাবেননি।
ধারা অসহায় চাহনি ছুঁড়ে একবার সালমা বেগমের দিকে তাকালো। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস পেল না। শ্রাবণ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

—”আমি তৈরী হয়ে আসছি বাবা। তবে আগে ধারার সাথে কিছু কথা আছে। ঘরে যাচ্ছি আমরা।”
বলে শ্রাবণ একেবারে নির্বিকার ভঙ্গিতে ধারার হাত শক্ত করে ধরে সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলো। সবার সামনে হাত ধরা, এই প্রথম! ধারা যেন মাটির উপরে নেই, ভাসছে। লজ্জা, ভয়, উত্তেজনা, সব মিলে বুকের ভেতর ঢাকঢোল এমন জোরে বাজতে লাগলো যে মনে হলো সবাই শুনতে পাচ্ছে। তবুও সে কিছু বলল না। কেবল বিড়ালের মত শ্রাবণের হাতের মুঠোয় বন্দী হয়ে গুটিসুটি মেরে পেছনে পেছনে হাঁটলো।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সামিউল শেখ আর সালমা বেগম একসাথে এক অদ্ভুত দৃষ্টি বিনিময় করলেন। সামিউল শেখের চোখে তৃপ্তির আভা, আর সালমা বেগমের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি।

ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে টেনে দিলো শ্রাবণ। ধারা তখনো মাটির দিকে চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে প্রচণ্ডভাবে। হাত ছাড়াতে চাইলেও শ্রাবণ শক্ত করে ধরে রাখল। এরপর ঘরের মধ্যিখানে দাঁড় করিয়ে শ্রাবণ গভীর স্বরে বলল,
—” তুমি বলবে, নাকি আমি বলব?”
ধারা ঠোঁট উল্টে এক পলক তাকালো শ্রাবণের দিকে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করল এই প্রথমবার, শ্রাবণের কপাল ঘেমে মুখটাও খানিক লালচে হয়ে আছে। রেগে গেছে নাকি? ধারা ভয় পেলো, মিনমিন করে বলল,

—” আপনিই বলুন!”
শ্রাবণ মাথা নেড়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
—” এইভাবে চুপ করেই থাকবে? আমি কিন্তু সব বুঝতে পারছি! ”
ধারা ভড়কে চোখ তুলে তাকালো। মৃদু কাঁপা গলায় বলল,
—”কি… কি বুঝছেন আপনি?”
শ্রাবণ কাছে এগিয়ে এলো। ধারার চোখে চোখ রেখে রাগ, অভিমান, তীব্র ব্যাথা সব একাকার করে দিয়ে বলল,

—” তুমি ভাবছো আমি কিছুই বুঝি না? তোমার মত গাধা আমি? বাড়িতে আসার পর থেকেই তোমার চেহারায় একটা অন্ধকার দেখছি। তন্নির ওই নজর, ওই কথাগুলো তোমার মনে লেগেছে!”
ধারার চোখ ভিজে উঠলো। ঠোঁট কেঁপে উঠল। নখ খুটতে খুটতে বলল,
—”আমি তো কিছু বলিনি…!”
শ্রাবণ এবার এক ঝটকায় ওর হাত ছেড়ে দিয়ে কাছে এসে দাঁড়াল। দুহাত দিয়ে আলতো করে ওর মুখটা উপরে তুলল। চোখে চোখ মিলিয়ে বলল,

—”চোখটা আমার সাথে মেলাও ধারা। লুক এট মাই আইজ! তুমি ভাবছো তন্নি সুই’সাইড করার চেষ্টা করেছে আমার জন্য? আর তাই তুমি ভয় পাচ্ছো যে আমি যদি ওর জন্য কিছু অনুভব করি? বা এমন কিছুই তো ভাবছো তাই না?”
ধারা শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছিল। অস্ফুট স্বরে বলল,
—”আমি…আমি জানি না। আমি শুধু দেখেছি ওর চোখে…এমন কিছু, যেটা আমার সহ্য হয়নি।”
শ্রাবণ গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল ধারার দিকে। তারপর দৃঢ় স্বরে বলল,
—” তুমি একটা জিনিস ভালো করে কান খুলে শুনে নাও ধারা। তন্নি আমাকে ভালোবাসুক, পাগল হয়ে যাক, তাতে কিছু আসে যায় না। ও আমায় চাইতে চাইতে মরে গেলেও আমি ফিরে তাকাবো না। আমি কার জন্য বাঁচব, কার জন্য মরবো, সেটা আমি নিজে ঠিক করি। আর সেটা আমি অনেক আগেই ঠিক করেছি। আমার জীবনে শুধু একজনই থাকবে।”
ধারা লোভী নয়। মোটেই এ জীবনে কোনো কিছুতে লোভ করেনি। তবে আজ লোভ হলো। ভীষন রকম লোভ হলো একটা কথা আবারো শোনার৷ তাই জানার পরেও অবুঝের ন্যয় শুধালো,

—” কে?”
শ্রাবণ বোঝেনি প্রথমে, সন্দিহান দৃষ্টি ফেলে বলল,
—” কে মানে?’
ধারা মিনমিন করে বলল,
—” বললেন যে একজনই থাকবে আপনার জীবনে। সেটা…কে?”
শ্রাবণ বুঝলো ধারার সরলতা। মেয়েটা মোটেই চালাক নয়। নইলে শ্রাবণের রগে রগে যে বুদ্ধি গিজগিজ করছে সেটা বুঝতো। সরাসরি বললেই হয় নিজের নাম শুনতে মন চাইছে। তবে শ্রাবণও কম যায় না। সে সেদিন রাতে ভালোবাসার কথা সরাসরি বলার পরেও মেয়েটা না বোঝার ভান করছে বা অবিশ্বাস করছে। তাই শ্রাবণও একটু অভিমান করে বলল,

—” আমার জানামতে একটাই বিয়ে করেছি আমি। অবশ্যই আমার বউ থাকবে!”
খানিক থেমে একটু রাগান্বিত স্বরে শ্রাবণ বলল,
—” এখন যদি বলদের মত কে আমার বউ সেটা জিজ্ঞেস করেছো, তাহলে এক আঁছাড়ে তোমার সব হাড়গোড় ভেঙ্গে ফেলব! ”
ধারার চোখ ভিজে উঠলো পুরোপুরি। বুকের ভেতর চাপা স্বস্তি ঢেউ খেলে গেল। ওর গাল লাল হয়ে উঠল লজ্জায়। ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে বলল,
—”কিন্তু… যদি তন্নি আবার কিছু করে বসে?”
শ্রাবণ এবার গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
—”ওর জীবনের দায়িত্ব আমার না, ধারা। আমি শুধু আমার বউয়ের দায়িত্ব নিয়েছি। আমি বউয়ের হাত ধরেছি, মানে সারাজীবন এই হাত ছাড়বো না।”

ধারা অল্প করে মাথা নেড়ে মুখ নামিয়ে ফেলল। শ্রাবণ ধারার গাল চেপে ধরে ছিল দুহাতে। তাই আলগা করল হাতদুটো। কিন্তু ছাড়লো না। আলতো করে ধরেই থাকলো। তবে ধারা মুখ নামাতে বুঝলো মেয়েটা কেঁদে ফেলবে। তাই শ্রাবণ আবারো ধারার মুখটা দুহাতের মধ্যিখানে নিয়ে তুলল। কিছুক্ষণ লালিত চেহারায় চোখ বুলিয়ে সময় নিয়ে ঠোঁটের উষ্ণছোঁয়া এঁকে দিল ধারার কপালে। বেশ সময় নিল সে। প্রথমবার সরাসরি কপালে ঠোঁট ছুঁইয়েছে যে। তারপর ধীরে সুস্থে সরে এসে আবারো তাকালো মেয়েটার দিকে। ধারা চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছিল। অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে গিয়েছিল সর্বাঙ্গ।
শ্রাবণ এবার আঙুল দিয়ে ধারার চোখের পানি মুছে দিয়ে আদেশ ছুঁড়লো,

—” লুক এট মি, মিসেস শেখ!”
আদেশ অমান্য করার সাহস নেই ধারার। সম্বোধন টাও বেশ আকর্ষণীয়। সাথে সাথে চোখ খুলে ওই ঈগল চোখের দৃষ্টিতে চোখ মেলালো ধারা। শ্রাবণ এবার খুব নরম স্বরে বলতে শুরু করল,
—” ধারা, হয়তো আমি অনেক দেরিতে বুঝেছি। তোমাকে জীবনে পাওয়ার পরেও তোমার মর্যাদা দিতে পারিনি, তোমাকে নিজের বলা মানে শুধু কাগজে-কলমের সম্পর্ক ভেবেছিলাম। কিন্তু আজ বুঝেছি, এই মুহুর্তে উপলব্ধি করলাম, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। মানুষ যেটা হাজার সাধনা করেও পায় না, তা আমি পেয়েছি। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আজ থেকে তোমার স্বপ্নগুলোকে আমি নিজের স্বপ্ন মনে করব। তোমার হাসি হবে আমার শান্তি, আর তোমার কান্না হবে আমার অপরাধ। দেখবে, আমি একজন ভালো স্বামী হয়ে দেখাবো। তুমি মোটেই অভাগী নও। আমি তোমায় নিজের সাধ্য অনুযায়ী পৃথিবীর সব সুখ এনে দেব প্রমিজ। দেখো, একদিন তুমি নিজেই বলবে, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী, আর আমার স্বামী আমার কাছে শ্রেষ্ঠ! তোমার কাছে আদর্শ স্বামী হয়েই ছাড়বো ধারা । কথা দিলাম!”

ধারা স্তব্ধ হলো। হৃদপিণ্ডের কার্যক্রম স্বাভাবিক রইলো না মনে হয়। জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করল মেয়েটা। অস্থিরতার মাত্রা বুঝলো শ্রাবণ। সময় নষ্ট না করে টেনে নিল বুকের মাঝে। নরম দুহাত টা নিজের পিঠের কাছে দিয়ে নীরবে আঁকড়ে ধরার আহ্বান করল। ধারার সর্বনাশ অনেক আগেই হয়েছে। নির্ভরতার একটা নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে সেও মুখ লুকিয়ে ফেলল। রীতিমতো শ্রাবণের বুকে মাথা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠোঁট কাঁমড়ে কাঁদতে শুরু করল। বুকের ভেতরকার সব আতঙ্ক, ভয় আর অস্থিরতা যেন গলে গেল মুহূর্তে।

শ্রাবন আরেকটু জোরে জড়িয়ে ধরে ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
—” হুশশ! কাঁদে না সোনা। হয়েছে তো! আমি কি তোমায় কষ্ট দেয়ার মত কোনো কথা বলেছি? বোকা মেয়ে! কেও আনন্দেও এভাবে কাঁদে নাকি?”
অবাধ্য হলো ধারা। তারই বা কী দোষ! চোখের পানি কি আর কারো কথা শোনে নাকি! সে নিজের মত করেই চলতে থাকে। ধারাও থামলো না। কাঁদতে থাকলো। তবে মাত্রা কমিয়ে এনে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল। শ্রাবণ বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিল। হৃদয়ের শূন্য জায়গা টা এখন পূরণ হলো মনে হচ্ছে। সে এবার বলল,
—” জানো, তোমায় এগুলো কেনো বললাম? কারন তুমি আমার! তুমি স্বীকার না করলেও, আমি জানি যে তুমি আমায়….
—” ভালোবাসি! ”

শ্রাবণের কথা শেষ করতে দেয়নি ধারা। তার আগেই অসম্পূর্ণ কথাটা নিজেই নিজের হয়ে সম্পূর্ণ করে দিল। সাথে পূরণ করে দিল আকাঙ্খিত মনের অনাকাঙ্ক্ষিত ইচ্ছে। সিক্ত করে দিল খরা নামা হৃদয়ে। শ্রাবণ জমে গেল মুহূর্তের জন্য। বিশ্বাসই হচ্ছিল না, ধারা নিজেই… হ্যাঁ, ধারা নিজেই সেই অমূল্য শব্দ উচ্চারণ করেছে। বলেছে, নিজে স্বীকার করেছে। শব্দটা কানে বাজলো ঝড়ের মত, আবার ঢেউয়ের মত মিষ্টি সুরে। বুকের ভেতর জমে থাকা সব চাপা কষ্ট, অভিমান, অনিশ্চয়তা এক নিমিষে গলে গেলো।
শ্রাবণের ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে উঠলো হাসি। না, হাসি নয়, সুখে আত্মহারা এক অট্টহাসি। বুক ধকধক করে উঠলো। ভেতরের হৃদপিণ্ডটা নেচে উঠছে উল্লাসে।ধারা কে আরো জোরে আঁকড়ে ধরল শ্রাবণ, এতটাই শক্ত করে, যেন আর কখনো আলগা করতে না পারে। কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
—”তুমি…তুমি কি জানো ধারা, তুমি আমার সাথে কী করেছো এই মুহূর্তে? কী দরকার ছিল এই অসময়ে ষড়যন্ত্র করে খু’ন করার?”

ধারা চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল শ্রাবণের বুকে। শ্রাবণ ভেবেছিল ধারা কোনোদিন এই কথাটা বলবে না। হয়তো কথাটা শোনার জন্য অনেক বেগ পোহাতে হবে। তাই তো সে কেবল ধারার নীরব চোখে, ধারার আচরণে ভালোবাসার আভাস খুঁজে বেড়াত। শ্রাবণ আবিষ্কার করল, এ জীবনে এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি!
ধারা ঠোঁট কাঁপিয়ে চোখ বুজে রইলো। ছোটবেলা থেকে অবহেলা, কটু কথা, শূন্যতায় ভরা জীবনে এই প্রথমবার কেউ তাকে এভাবে আঁকড়ে ধরলো। কেও তাকে আশ্রয় দিল বুকে! জীবনের প্রতিটি অবহেলা, প্রতিটি অশ্রুর ক্ষত যেন এই একটি মুহূর্তে মুছে যাচ্ছে। শ্রাবণের বুকের ভেতরটা যেন তার জন্যই এক নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, পরিপূর্ণ ভালোবাসায় গড়িয়ে তোলা!

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২২ (২)

শ্রাবণ এবার জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই এক হাত দিয়ে ধারার ভিজে গাল মুছে দিলো সযত্নে। দুহাতে আগলে বুকের মাঝে আরেকটু চেপে নিল মেয়েটাকে। চোখে একরাশ আনন্দ নিয়ে উন্মাদ হয়ে খুশিতে বলে উঠলো,
—” একদম নড়াচড়া করবে না। অন্তত দশ মিনিট এভাবেই থাকো। তোমার দুঃখগুলোকে আমায় দাও, আর আমার উষ্ণতাগুলো তুমি নাও! প্রসেসিং টা হতে সময় লাগবে। তাই ডোন্ট মুভ!”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৪