সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৬
jannatul firdaus mithila
বেলা ৯টা!
রোজ রোজ কায়দা করে সকালের দিকে ঘুম ছেড়ে উঠলেও আজ মাহি বেশ বেলা করে ঘুমুচ্ছে। মাইমুনা বেগম বারকয়েক মেয়েকে এসে টুকটাক ডেকে গিয়েছেন ঘুম থেকে উঠতে তবে মেয়েটার আজ কী হলো কে জানে! সে আজ বিছানা ছাড়ছেই না! এদিকে আহিরা ঘুম থেকে উঠেছে সে-ই কখন। ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে, মেয়েটা এখন রেডি হচ্ছে কলেজ যেতে। অথচ মাহির উঠবার তেমন নামগন্ধও নেই। আহি ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে। আড়চোখে বারকয়েক চোখ রেখেছে আয়নায় প্রতিবিম্বিত হওয়া মাহির দিকে। প্রায় কিয়তক্ষন বাদে মাহির নড়চড় দেখা গেলো।হাত বাড়িয়ে মুখের ওপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা সরিয়ে দিয়ে, মেয়েটা কেমন পিটপিট করে চোখ মেলার চেষ্টা চালাচ্ছে। আহি খেয়াল করল সেদিকে। নিজের হাতের কাজ বহাল রেখে সে বলে ওঠে,
“ কিরে? আজ ঘুম থেকে উঠবি না?”
মাহি ঘুম জড়ানো কন্ঠেই “ হু” বলল একটু-আধটু। পরক্ষণেই মুখের সামনে হাত এনে লম্বা একটা হামি টেনে ধীরেসুস্থে উঠে বসলো শোয়া ছেড়ে।মাথাভর্তি এলোমেলো চুল,অধিক ঘুমানোর ফলে ফোলা ফোলা চোখ সব মিলিয়েই মেয়েটাকে কেমন অগোছালো পুতুলের মত লাগছে। আহি একপলক আয়নায় তাকিয়ে দেখলো মাহিকে। পরক্ষণেই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে এনে, নিজের চিরায়ত খেঁকিয়ে ওঠা কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ মহারানী কী আজ আর কলেজে যাবেন? না-কি পড়ে পড়ে গাধার মতো নাক টেনে ঘুমাবেন? ওহ! আপনার অবগতির জন্য জানিয়ে দিচ্ছি যে, আজকে আমাদের সেকশনের ক্লাস টেস্ট আছে।আশা করি আপনি ভুলে খাননি কথাটা!”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
অগত্যা এমন কথায় তৎক্ষনাৎ সকল তন্দ্রা কেটেঁ গিয়ে হুঁশে ফিরল মাহি।চোখদুটো তার এমুহূর্তে বেরিয়ে আসার উপক্রম। যাহ! সে-তো ভুলেই বসেছিল টেস্টের কথাটা! ইশশ্ আজকে ক্লাস টেস্ট অথচ সে না-কি এভাবে পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে! মাহি তৎক্ষনাৎ জিভে দাঁত বসিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে নামলো। অতঃপর একদৌড়ে কাবার্ডের কাছে গিয়ে, সেখান থেকে কলেজ ড্রেসটা হাতে নিয়েই ছুটলো ওয়াশরুমের দিকে। যেতে যেতেই আহির উদ্দেশ্যে বলল,
“ তুই রেডি হয়ে নিচে নাম,আমি আসছি!”
আহি ভ্রু গোটায় এহেন বাক্যে।সন্দিহান কন্ঠে পরপরই জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ তুই ব্রেকফাস্ট করবিনা?”
মাহি ওয়াশরুমের দরজা লাগাতে গিয়েও থামলো এক সেকেন্ডের জন্য। ব্যস্ত কন্ঠে জবাব দিলো,
“ না সময় নেই! ক্যান্টিন থেকে কিছু খেয়ে নিবো।তুই যা রেডি হ!”
বলেই মাহি দোর আটঁকায়। এদিকে আহিও আর তেমন কিছু না ভেবে নিজের কাজে মগ্ন হলো ফের।মাথায় লম্বা একটা পোনিটেল বেঁধে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিজেকে দেখে নেয় একপলক। পরক্ষণে টেবিলের ওপর গুছিয়ে রাখা নিজের ব্যগটা কাঁধের একপাশে ঝুলিয়ে নিয়ে চুপচাপ পা বাড়ালো ঘরের বাইরে।
প্রায় মিনিট দশেক পর, হন্তদন্ত পায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে মাহি।হাত বাড়িয়ে খাটের পাশে ঝুলিয়ে রাখা স্ট্যান্ডের ওপর থেকে তোয়ালেটা নিয়ে, ভেজা মুখটা কোনমতে মুছতে মুছতে গিয়ে দাঁড়ালো ড্রেসিং টেবিলের সামনে। অতঃপর ব্যস্ত হাতে নিজের এলোমেলো চুলগুলোকে খানিক গুছিয়ে নিয়ে ছুটলো পড়ার টেবিলের কাছে। সেখান থেকে নিজের ব্যাগ এবং চশমাটা তুলে নিয়ে হাঁটা ধরতেই কী মনে করে যেন পাদু’টো থেমে গেলো তার। মাহি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। তৎক্ষনাৎ বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে, বালিশের দু’ধারে হাতড়ে খুঁজতে লাগলো নিজের ফোনটা। কিয়তক্ষন বাদে পেয়েও গেলো তা। মাহি ফোঁস করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো তখন। ফোনটা হাতে নিয়ে আবারও পা বাড়ালো দরজার দিকে। তবে এরইমধ্যে তার চোখ গেলো ফোনের স্ক্রিনে। মুহুর্তেই থমকে গেলো মাহি।তার ফোনের স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কে যেন কলে আছে। তাও আবার টানা ৮ঘন্টা! মাহি ভড়কে গিয়ে তৎক্ষনাৎ ফোনটা কানে ঠেকায়। ভ্রু কুঁচকে বলে,
“ হেলো!”
কথাটা শুনতেই ওপাশের ব্যাক্তিটির কী হলো কে জানে! সে কেমন আলতো হেসে গম্ভীর কন্ঠে প্রতিত্তোরে বললো,
“ গুড মর্নিং!”
মাহি এবার হোচট খেলো যেন। এ আবার কার কন্ঠ? নাম্বারটাও কেমন অচেনা! মাহি চিনতে না পেরে তক্ষুনি জিজ্ঞেস করল,
“ কে আপনি?”
ওপাশের গম্ভীর পুরুষ ঠোঁট কামড়ে হাসছে।সারারাত জেগে থাকার দরুন চোখদুটো কেমন লাল হয়ে আছে তার। তবুও গম্ভীর পুরুষের মুখের অভিব্যাক্তিতে নেই বিন্দুমাত্র বিরক্তির ছাপ। সে সময় নিয়ে ফোনটা খট করে কেটে দিলো। ওপাশে লাইনে থাকা মাহি হতবুদ্ধির ন্যায় ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো শুধু। কার সাথে রাতে কথা বলেছে সে? তাও আবার ৮ ঘন্টা? কেমনে সম্ভব! তার জানামতে সে-তো কাল দেদারসে ঘুমিয়েছে।তাহলে ফোনে কথাটাই বা বললো কে! মাহি কিছুক্ষণ নিজ চিন্তায় মগ্ন থেকে যেইনা নম্বরটায় আবারও ডায়েল করবে ওমনি ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে আসে আহির চেচিয়ে উঠা কন্ঠ!
“ মাহি! তুই নামবি? না-কি আমি একাই চলে যাবো?”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ব্যস্ত পায়ে বাইরে চলে গেলো মাহি।মনে মনে ভেবেই নিলো, আগে কলেজে যাওয়া যাক,তারপর নাহয় কলেজ থেকে ফিরে এসে দেখা যাবে বাকিটা!
ঝা তকতকে সফেদ রঙা এপ্রনটা বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখা। তার ডান পাশেই পড়ে আছে স্ট্যাথোস্কোপ।বা-দিকে পড়ে আছে গোটাকতক হলুদ আবরণের ফাইল। অন্যদিকে, মেঝেতে বিছিয়ে রাখা এক্সারসাইজ ম্যাট,সেখানে আপাতত শারীরিক কসরত করতে ব্যস্ত অরিন! ইদানীং মেয়েটার আবার রোজ কায়দা করে এক্সারসাইজ করতে হয়। সেটা অবশ্য রৌদ্রের জন্যই। ছেলেটার একবাক্য, — এ সাউন্ড মাইন্ড লিভস ইন আ সাউন্ড বডি! সে-ই বাক্যের ওপর নির্ভর করেই আজ ক’দিন ধরে রোজ নিয়ম করে এক্সারসাইজ করতে হচ্ছে অরিনের।
এক্সারসাইজ গাল ফুলিয়ে বসে আছে অরিন।চোখদুটো তার ঘুমের তোড়ে খুলে রাখা দায় আপাতত।মেয়েটা কেমন বসে বসে ঝিমাচ্ছে এখন। তার পাশেই পুশআপস দিতে ব্যস্ত রৌদ্র। সুদর্শন যুবকের শ্যামবরণ গা থেকে টপটপ করে ঝড়ে পড়ছে ঘাম। মাথার বড় বড় চুলগুলো ঘামে লেপ্টে আছে কপাল বরাবর। অরিন তার পিটপিট করে খুলে রাখা চোখ দিয়েই দেখছে তার ব্যক্তিগত পুরুষকে। রৌদ্র পুশআপস দেওয়ার একফাঁকে অরিনের দিকে ঘাড় বাকিয়ে চাইলো। মুচকি হেসে ভ্রু নাচিয়ে দুষ্ট কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ সারারাত আমায় এতো কাছ থেকে দেখেও বুঝি তোমার মন ভরেনি সানশাইন!সেক্ষেত্রে তুমি বললে আমি আরেকটু দেখাতে পারি!”
অরিন মুচকি হাসলো। তৎক্ষনাৎ সময় ব্যায় না করে উঠে বসলো রৌদ্রের চওড়া পিঠের ওপর। সেথায় উবু হয়ে শুয়ে মাথা রাখলো রৌদ্রের পিঠের ওপর। রৌদ্র স্মিত হাসলো মেয়েটার এহেন কান্ডে। পুনরায় নিজের পুশআপ দিতে লাগলো কোনোরূপ অসুবিধে ছাড়া। খানিকক্ষণ বাদেই শোনা গেলো অরিনের ফোঁসফাসঁ করে ফেলতে থাকা নিশ্বাসের শব্দ। রৌদ্র থামলো এপর্যায়ে। ঘাড় বাকিয়ে মেয়েটাকে ডাক দিয়ে বলল,
“ সানশাইন! তুই আবারও ঘুমাচ্ছিস না-কি?”
অরিন ঘুম! ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না মেয়েটার কাছ থেকে। রৌদ্র চট করে একহাতে টেনে ধরল মেয়েটাকে।পরক্ষণেই বেশ কায়দা করে অরিনকে ধীরে ধীরে নামিয়ে আনলো নিজের পিঠ হতে। মেয়েটাকে আলতো করে ম্যাটের ওপর শুইয়ে দিয়ে, রৌদ্র কিয়তক্ষন তাকিয়ে রইলো তার দিকে। আর ঘন্টা খানেক পরেই মেয়েটার ক্লাস। এমুহূর্তে ঘুমিয়ে থাকলে কীভাবে হবে শুনি? রৌদ্র এক-দুবার চাইলো মেয়েটাকে জাগাতে, তবে প্রতিবারই তার ওমন চেষ্টা কেমন বৃথা বনে গেলো! মেয়েটা কী সুন্দর করে ঘুমাচ্ছে, আর সে-কি না জাগিয়ে দেবে তাকে? ঘুম ভেঙে গেলে অরিনটা নিশ্চয়ই কষ্ট পাবে! আবার ভার্সিটিতে যাওয়াটাও তো জরুরী। রৌদ্র এবার পড়লো মহা দ্বন্দে। কোনটা ছেড়ে কোনটা করবে তাই যেন ভাবছে বেচারা। কিছুক্ষণ ভাবাভাবির পর্যায় শেষ করে রৌদ্র অবশেষে মেয়েটার ক্ষুদ্র দেহটা আলতো করে টেনে নেয় নিজ বাহুডোরের মাঝে। অতঃপর মেয়েটার ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখশ্রীর পানে চেয়ে থেকে আলতো হাসলো ছেলেটা।পরক্ষণে নিজের মুখটা খানিক এগিয়ে এনে অরিনের গাল বরাবর আলতো করে নাক ঘষলো। তবুও অরিনের কোনো হেলদোল নেই! রৌদ্র মেয়েটার গালে নাক ঘষতে ঘষতেই বিরবির করে বলল,
“ উফফ!! তোর গালটা কী সফট হানি!”
আপনমনে বিড়বিড় করে থামলো রৌদ্র। স্থির দৃষ্টি ফেলল মেয়েটার গোলাপি নরম অধরযুগলের ওপর। অতঃপর মুহুর্ত ব্যায়েই মুচকি হেসে আলতো করে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো মেয়েটার। ঘুমন্ত অরিনের ওষ্ঠপুট নরমভাবে টানতে কেমন বেশ লাগছে নির্লজ্জ ছেলেটার! সে একবার ওষ্ঠপুট দ্বয় ছাড়ছে তো আবার টেনে নিচ্ছে! এহেন স্পর্শে ঘুম হাওয়া অরিনের। সে চোখ মেলে তাকায় রৌদ্রের চোখ বরাবর। বেড়াল চোখদুটো আপাতত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অরিন কিছুক্ষণ সময় নিলো নিজেকে সামলাতে। পরক্ষণেই নিজের হুঁশ ফিরতেই সে দু’হাত দিয়ে ঠেলতে লাগলো রৌদ্রের বুক বরাবর। রৌদ্র থামলো।মেয়েটার ওষ্ঠপুট ছেড়ে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,
“ কী সমস্যা? থামালি কেনো?”
অরিন বা- হাতের উল্টো পিঠে নিজের ঠোঁটদুটো ক্রমাগত ডলছে।কিয়তক্ষন বাদেই কেমন আর্তনাদ করে বলে ওঠে,
“ ইয়াক!! আপনি মুখ না ধুয়েই আমাকে চুমু খেয়েছেন? ছিহঃ ছিহঃ!”
এহেন কথায় কুঁচকে রাখা ভ্রু-দ্বয় আরও খানিকটা কুঁচকে আসে রৌদ্রের। সে চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে রইল অরিনের দিকে। পরক্ষণেই কি মনে করে হালকা বাঁকা হেসে বললো,
“ সামান্য এটুকু চুমুতেই ছিহঃ তাই-না?”
অরিন চোখমুখ কুঁচকে রেখেছে। রৌদ্র তখন নিজেদের মধ্যকার সকল দুরত্ব এক ঝটকায় শেষ করে দিয়ে, অরিনের কন্ঠদেশে আলতো করে হাত রাখলো।সেখানে আলতো করে চাপ দিয়ে নিজের বেশ খানিকটা কাছে টেনে আনলো অরিনের ক্ষুদ্র মুখখানা। অতঃপর কোনরূপ বলাকওয়া নেই মশাইয়ের,সে তক্ষুনি ঝাপিয়ে পড়লো মেয়েটার নরম ওষ্ঠপুটের ওপর। এবার আর নরম-সরম স্পর্শ নেই, সে স্পর্শে যুক্ত হয়েছে বেশ গভীর আশ্লেষ। অরিন হাত-পা ছুঁড়ে ছাড়াতে চাইছে নিজেকে তবে রৌদ্র তা হতে দিলে তো! রৌদ্র নিজের ওষ্ঠপুটের কাজ বহাল রেখেই তৎক্ষনাৎ একটানে অরিনকে বসিয়ে দিলো নিজের কোল বরাবর। অরিন উঠতে নিলেই মেয়েটার কোমর আঁকড়ে ধরলো রৌদ্র। নিজের বেহায়া হাতের স্পর্শ চালালো মেয়েটার সর্বাঙ্গে। ধীরে ধীরে অরিন স্বাভাবিক হচ্ছে! হয়তো সে বুঝে গিয়েছে — এ পাগলের সাথে তার আর পেরে ওঠবার জো নেই। এদিকে অরিনকে শান্ত হতে দেখে ভ্রু গোটায় রৌদ্র। একমুহূর্তের জন্য অরিনের ওষ্ঠপুট ছেড়ে দিয়ে সে কেমন গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,
“ কী হলো হানি? নড়চড় বন্ধ করে দিলি যে?”
হতভম্ব চোখে তাকায় অরিন। চোখদুটো কেমন ছোট ছোট করে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ তা নাহলে কী করবো?”
রৌদ্র এবার ঠোঁট কামড়ে হাসলো।অরিনের চোখে চোখ রেখে, ধীরে ধীরে হাত নিয়ে গেলো মেয়েটার জামার ফাঁক গলিয়ে মসৃণ উদরে। সেথায় অবাধ্য বিচরণ চালিয়ে মেয়েটার কান বরাবর মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“ তুমি ছটফট না করলে ফিল পাই না হানি! তুমি বারবার নিজেকে আমার কাছ থেকে ছাড়াতে চাইবে,আর আমি জোর করে তোমায় আঁটকে ফেলবো।আমার বেপরোয়া কর্মকান্ড সইতে না পেরে তুমি আমায় থামতে বলবে আর আমি…. আমি তা শুনে আরও বেপরোয়া হবো!আহহ! দেট ফিলিং জাস্ট কিলস মি হানি!”
এহেন বাক্য কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই কানদুটো কেমন ঝা ঝা করে উঠলো মেয়েটার। লোকটা কী ভয়ংকর কথাবার্তা শুরু করলো সকাল সকাল! ছিহঃ ছিহঃ সে-তো ভালো মেয়ে। তার সাথে এসব বলা কী আর সাজে? অরিন তৎক্ষনাৎ নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে।তা দেখে রৌদ্র কেমন মোহগ্রস্তের ন্যায় বলে ওঠে,
“ কাম ক্লোজার হানি! আই নিড আ লিটল “ আস টাইম”
বাক্য শেষ হবার আগেই রৌদ্রের হাতদুটো ব্যস্ত হলো মেয়েটার পরনের জামাটার বাটন খুলতে। অরিন হকচকিয়ে সরতে নিলেই তার দিকে কেমন নেশালো চোখে তাকায় রৌদ্র। ঠোঁট কামড়ে আলতো হেসে বলে ওঠে,
“ নেশা ধরিয়ে কই যাও বউজান? আগে এই নেশা কাটাও ,তারপর যেথায় ইচ্ছে সেথায় যাও! আই ওন্ট স্টপ ইউ দেন হানি!”
ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল অরিন। চুপচাপ নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রের দিকে। লোকটা ইদানিং এতো বেপরোয়া হয়েছে না… মেয়েটার প্রায়শই বেগ পোহাতে হয় তাকে সামলাতে।
ধূসর রঙা বিএমডব্লিউ ব্র্যান্ডের গাড়িটি মাত্রই এসে দাঁড়ালো আইডিয়াল কলেজের দোরগোড়ায়। কিয়তক্ষন বাদে গাড়ি থেকে নেমে আসেন মুগ্ধ নামের সে-ই সুদর্শন বিদেশি যুবক। বলিষ্ঠ দেহে তার এঁটে রাখা কালো রঙা শার্ট, যা কেমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে ছেলেটার গায়ে। জিম করা বলিষ্ঠ দেহটা একপ্রকার স্পষ্ট চক্ষুগোচর হচ্ছে বাইরে থেকেও। যুবকের মাথাভর্তি কালার করা সিল্কি চুলগুলো কেমন হাওয়ায় দুলছে ক্রমাগত। আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রমনীগণ একপ্রকার চোখে গিলে খাচ্ছেন উক্ত নজরকাড়া যুবককে তবে যুবক আবার এদিকটায় বড্ড নাক উঁচু! তিনি আশেপাশে তেমন নজর না দিয়েই গটগট পায়ে এগিয়ে গেলেন কলেজ গেটের সামনে। দারোয়ান তাকে দেখেই আলতো হেসে সালাম দিয়ে জানতে চাইলেন,
“ জ্বি! কিছু বলবেন?”
মুগ্ধ হাত বাড়িয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিলো।পরক্ষণেই গম্ভীর মুখে জবাব দিলো,
“ একটু ভেতরে যাবো। দরকার আছে!”
দারোয়ান তৎক্ষনাৎ দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে না বলতে নিলেই মুগ্ধ পকেট থেকে দুটো চকচকে ১ হাজার টাকার নোট বের করে এগিয়ে ধরলো দারোয়ানের দিকে। গম্ভীর মুখে কুটিল হেসে বলল,
“ এগুলোর দিকে তাকিয়ে কথা বলুন!”
টাকার লোভ, বড় লোভ! দারোয়ান সাহেব আশেপাশে একদফা সর্তক দৃষ্টি বুলিয়ে, দাঁতকপাটি বের করে এমন একটা হাসি দিলেন না…এ যেন চাঁদ হাতে পেয়ে যাবার মত হাসি। তিনি তক্ষুনি ছোঁ মেরে টাকা গুলো নিয়ে নিলেন মুগ্ধের হাত থেকে। বা-হাতে টাকাগুলো বুক পকেটে ঠেলে দিয়ে আলগোছে সরে দাঁড়ালেন গেটের সামনে থেকে। মুগ্ধ বাঁকা হাসলো। দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে নিয়ে, ভীষণ ভাবের সাথে ভেতরে ঢুকলো কলেজের।
সেই আধঘন্টা আগেই কলেজে এসেছে মাহি এবং আহি। তবে ক্লাসে ঢুকতেই তারা খবর পেলো আজ আর পরিক্ষা হচ্ছে না। স্যারের না-কি কী একটা কাজ পরে যাওয়ায় আজ আর কলেজ আসেননি তিনি। তো আর কী করার।প্রথম ঘন্টার পুরো অলস সময়টা আহি হৈচৈ, হৈ-হুল্লোড় করে কাটাতে লাগলেও মাহি চুপচাপ থম মেরে বসে আছে ক্লাসের একদম কর্নারের বেঞ্চটায়।ক্ষুধায় পেটটা কেমন চো চো করছে তার। যদিওবা ক্যান্টিন খুব একটা কাছেই, তবুও কেন যেন তার ইচ্ছেই করছে না উঠে গিয়ে খাবার খেয়ে আসতে।এমুহূর্তে মারাত্মক আলসেমি ভর করেছে মেয়েটার গায়ে।মাহি গালে ডান হাত রেখে,কনুই ঠেকিয়ে বসলো হাই বেঞ্চে।উদাস মুখে ক্লাসের বাইরে চোখ রেখে ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলতে লাগলো ক্রমাগত। ঠিক এমন সময় বাইরে থেকে কেমন হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলো মাহির ক্লাসমেট হৃদয়। ছেলেটা মাহির সামনে এসেই দু’হাটুতে ভর দিয়ে হাঁপাচ্ছে। মাহি আড়চোখে চেয়ে রইলো শুধু। এমনিতেই কারো সাথে যেচে পড়ে কথাবলার অভ্যেস নেই তার।সেক্ষেত্রে এখন থোড়াই বলবে সে! হৃদয় সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিলো।পরক্ষণে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে মাহিকে বলল,
“ মাহি! তোকে ইমার্জেন্সি কমন রুমে ডাকছে তোর গার্জিয়ান! তারাতাড়ি যা!”
ভ্রু গোটায় মাহি। গার্জিয়ান মানে? এখন আবার কে আসলো কলেজে? নিজের মনের মাঝে উত্থাপিত হওয়া এহেন প্রশ্নটা ঠোঁটের গোড়ায় নিয়ে এলো মাহি।সে তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কোন গার্জিয়ান? কে এসেছে?”
হৃদয় মাথা চুলকায় একটুখানি। ঠোঁট উল্টে বলে,
“ জানিনা তো! জাস্ট বললো, তোর গার্জিয়ান।ওয়েট করছে কমন রুমে, তুই তারাতাড়ি যা!”
অগত্যা এমন তাড়া পেয়ে না চাইতেও কমন রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় মাহি।তবে কপালে তার স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়েছে গোটাকতক সন্দেহের ভাজঁ। এই অসময়ে আবার বাড়ি থেকে কে এলো কে জানে!
“ এক্সকিউজ মি!”
পেছন থেকে ভেসে আসা মনোমুগ্ধকর নারী কন্ঠ কানে যেতেই গম্ভীর মুখে স্মিত হাসলো মুগ্ধ। দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে, সে কান খাঁড়া করে দাঁড়ালো মেয়েটার কথাগুলো শুনতে। এদিকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা যুবককে এখনো নিজের দিকে ঘুরে দাঁড়াতে না দেখে মাহি হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে ফের বললো,
“ শুনছেন স্যার? আপনি কী আমায় খুঁজছিলেন?”
এবার রয়েসয়ে পেছনে ফিরে মুগ্ধ। তাকে দেখেই মাহির হাসিটা কেমন ধপ করে নিভে গেলো! বুকের ভেতরে শুরু হলো এক অজানা ভয়ের তান্ডব! মাহি গোটাকতক শুকনো ঢোক গিললো পরপর। মুগ্ধের সেই বাদামী চোখদুটোর তীর্যক দৃষ্টি দেখে মেয়েটার ভয় যেন বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। মাহি দুরুদুরু বুকে কয়েক কদম পেছাতেই মুগ্ধ কাঠ হাসলো। বুকের কাছে বেঁধে রাখা হাতদুটো ছেড়ে দিয়ে পকেটে গুঁজে দাঁড়ালো আয়েশ করে। তারপর কেমন রাশভারী কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ আমি কী তোমায় যেতে বলেছি?”
মাহির কপাল বরাবর ইতোমধ্যেই জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা। ক্ষুদ্রকায় দেহটা কেন যে এতো কাঁপছে কে জানে! মুগ্ধকে তার আগে থেকেই ভয় লাগতো, তবে গতকালকের ওমন শক্তপোক্ত হাতের থাপ্পড় খেয়ে ভয়টা যেন আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে মেয়েটার। মুগ্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরোখ করলো সবটা।কিয়তক্ষন বাদেই সে কেমন মুচকি হেসে দুপা এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মাহির সামনে। মাহি পেছাতে নিলেই মুগ্ধ এবার বিরক্ত হলো। সে কেমন ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,
“ এই চাশমিস তোমার সমস্যা কী? আমি কী বাঘ না-কি ভাল্লুক যে এতো ভয় পাচ্ছো?”
কী বলবে মাহি? গলার কাছটা কেমন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে তার।সে কোনমতে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
“ আপনি আমায় ডেকেছেন কেনো?”
“ প্রেম করতে! করবা?”
মুগ্ধের এহেন সোজাসাপটা উত্তরে এই বুঝি আকাশ ভেঙে মাথায় পড়লো মেয়েটার। সে কেমন ভড়কে গিয়ে চক্ষু ছানাবড়া করে তাকিয়ে রইলো। নিশ্বাস কিন্তু সেকেন্ড খানেক ধরে বন্ধই আছে তার। মুগ্ধ তা বেশ খেয়াল করলো।সে তৎক্ষনাৎ বিরক্তি নিয়ে মেয়েটাকে মৃদু ধমক দিয়ে বলল,
“ এই মেয়ে! নিশ্বাস ফেলো! কথায় কথায় এমন কাঁপা কাঁপি, নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলা,এসব কী? এতো এক্সট্রা নাটক কেনো? স্বাভাবিক থাকতে পারোনা?”
এপর্যায়ে মাহি হতবিহ্বল! সে নাটক করছে মানে? কখন নাটক করলো ও? সে কি আর ইচ্ছে করে হুটহাট কাঁপা-কাঁপি করে? সে-তো মুগ্ধ সামনে এলেই আপনাআপনি কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে যায় তার। মাহি মনে মনে নিজেকে স্বাভাবিক করার বহু চেষ্টা চালাচ্ছে। তক্ষুনি সামনে থেকে মুগ্ধ কেমন আদেশের সুরে বলে ওঠে,
“ চলো!”
বুঝলোনা মাহি।অবুঝের মতো তাকিয়ে থেকে বললো,
“ হু?”
মুগ্ধ কোনো রুপ ভনিতা ছাড়া ফের বলল,
“ হু কী? চলতে বলেছি চলো।”
“ কিন্তু কোথায়?”
“ যেদিকে দুচোখ যায়! কেনো যাবা না?”
“ না যাবো না!”
“ কেনো যাবে না? আমি সাথে আছি বলে?”
“ হ্যা…”
ফটাফট উত্তর গুলো দিয়েই চুপ করে গেলো মাহি। মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মুগ্ধের সম্মুখে। ওদিকে মুগ্ধ অলক্ষ্যে মিটমিটিয়ে হাসছে। আশ্চর্য! মেয়েটার সাথে কথা বলতে এতো ভালো লাগছে কেনো তার? এটাও কী বাদবাকি সাধারণ অনুভুতিগুলোর মতোই? না-কি আলাদা কিছু! মনের কোণে ওঠা এহেন জটিল প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর পাচ্ছেনা মুগ্ধ। ছেলেটা কেমন চোখ সরিয়ে নিলো মাহির ওপর থেকে। অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থেকে বললো,
“ লেট হয়ে যাচ্ছে চাশমিস! তারাতাড়ি চলো।”
মাহি হাত বাড়িয়ে নিজের চোখে এঁটে রাখা চশমাটা খানিক ঠেলে দিয়ে মিনমিন করে বললো,
“ দুঃখীত! আমি অপরিচিত কারো সাথে কোথাও যেতে চাচ্ছিনা!”
এহেন বাক্যে যারপরনাই অবাক হলো মুগ্ধ। অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো মেয়েটার দিকে। অবাক কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো,
“ অপরিচিত? হু ইজ দা ফা*কিং অপরিচিত? আমাকে চেনো না তুমি?”
মাহি মনে মনে বেশ সাহস সঞ্চার করে লম্বা একটা নিশ্বাস টানলো। পরক্ষণেই নির্ভয়ে মাথা নুইয়ে রেখে বললো,
“ না! এতোটাও চিনি না, যতোটা চিনলে কলেজ টাইমে আপনার সাথে এদিক সেদিক যেতে পারবো! তাই সরি!”
ব্যস! এটুকু শুনতেই পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেলো মুগ্ধের। যদিওবা মাহির কথা খুব একটা ভুল নয় তবুও এই কথাটা কেন যেন হজম হলোনা মুগ্ধের।এটলিস্ট মাহির মুখ থেকে অপরিচিত শব্দটা শুনতে সে মোটেও ইচ্ছুক নয়। মাহি মুগ্ধকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই বাঁধ সাধলো মুগ্ধ। মাহির পা জোড়া থামলেও সে চোখ তুলে তাকায়নি। মুগ্ধ তখন ভীষণ শান্ত কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ লিসেন চশমিস! আমি মুগ্ধ, মির্জা সায়ান মুগ্ধ। সন অফ তৌকির মির্জা এন্ড শারমিন মির্জা। উই লিভ ইন সাউথ কোরিয়া। আমি একজন সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ার,সেই সাথে দক্ষ এথলেটও। রিসেন্টলি বাংলাদেশ এসেছি কাজিনের বিয়ের উদ্দেশ্যে। তাছাড়া আমি একটা দিক থেকে তোমার… ইয়ে মানে কী যেন একটা বলেনা, ওহ হ্যা বেয়াই আরকি!”
এটুকু বলে থামলো মুগ্ধ। কিছু একটা ভেবে পরক্ষণে ফের বললো,
“ ইন্ট্রো পেয়ে গেছো? এবার তবে চলো!”
বলেই মুগ্ধ এগিয়ে এসে খপ করে চেপে ধরলো মেয়েটার হাতের কব্জি। মাহি তৎক্ষনাৎ ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নেয় সে হাত। মুগ্ধ এবার চটলো ভীষণ! কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে খেঁকিয়ে বলল,
“ এই কী সমস্যা তোর? তুলতুলু করছি বলে গায়ে লাগেনা তাই না?”
মাহি ভয় পেলেও দমলোনা মোটেই।সে কেমন রাগ নিয়ে বলে ওঠে,
“ না লাগে না! আপনি হুটহাট আমায় এভাবে জোর করতে পারেন না। আর আপনি মোটেও ভুলেও যাবেন না এটা আমার কলেজ! তাই বলছি,প্লিজ এখানে কোনো সিন ক্রিয়েট করবেন না।”
কে শোনে কার কথা!ঘাড়ত্যাড়া মুগ্ধ কখনো শুনেছে কারো শাসন-বারণ? যে আজ এই পুঁচকে মেয়ের শাসন শুনতে যাবে! মুগ্ধ দাঁত খিঁচে দেয়ালের ওপর একহাত চেপে দাঁড়ালো। উদ্দেশ্য, মেয়েটার পথ আটকানো! তবে ঘটনা ঘটে উল্টো দিকে। মাহি কী সুন্দর ফাঁক গলিয়ে মুগ্ধের হাতের নিচ দিয়ে মাথা বের করে চলে গেলো! মেয়েটা আবার মুগ্ধের তুলনায় বেশ ছোটখাটো কি-না। এহেন কান্ডে হতবাক চোখে চেয়ে রইল মুগ্ধ। এত্তো শর্ট মেয়েটা? শেষে কি-না তার হাতের নিচ দিয়েই চলে গেলো অনায়াসে? এ-ও দেখার বাকি ছিলো তবে।
মাহি গটগট পায়ে হেঁটে যাচ্ছে করিডর দিয়ে। পেছন থেকে মুগ্ধ ডাকলেও সে শুনছেনা সে ডাক! উল্টো পায়ের গতি বাড়িয়ে হাঁটছে নিজের মত।তার এহেন অবাধ্যতায় মেজাজ বিগড়ে গেলো মুগ্ধের।ছেলেটা তৎক্ষনাৎ পায়ের গতি বাড়িয়ে এগিয়ে আসে মেয়েটার নিকট। খপ করে চেপে ধরে মাহির বা-হাতের কব্জি। মাহি থমকায়। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে ফিরে দাঁত খিঁচে বলে,
“ হাত ছাড়ুন!”
“ ছাড়বো না, কী করবে?”
মুগ্ধের এহেন কাঠখোট্টা জবাবে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকায় মাহিরা।এমুহূর্তে তার মন চাইছে লোকটাকে ধরে আচ্ছামত কিছুক্ষণ গালমন্দ করতে,তবে ইন্ট্রোভার্ট মেয়ে হওয়ায় গলার কাছ অবধি কথাগুলো এসেই থেমে গিয়েছে সব। মাহি বিরক্তি নিয়েই আশেপাশে সর্তক দৃষ্টি ফেললো।তাকিয়ে দেখল, ক্যাম্পাসের করিডর দিয়ে হাঁটতে থাকা মানুষজনদের উৎসুক দৃষ্টি আপাতত তাদের দিকেই নিবদ্ধ। কেউ কেউ তো এতক্ষণে কানাঘুঁষাও চালিয়ে দিয়েছে নিজেদের মত! তা দেখে মাথাটা আচমকাই ভনভন করে ঘুরতে লাগলো মাহি’র। সে কেমন অসহায় সুরে মিনমিনিয়ে বলল,
“ প্লিজ ছেড়ে দিন হাতটা।মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।”
মুগ্ধের মেজাজ এখন সপ্তম আসমানে। ছেলেটা কেমন দাঁত খিঁচে তক্ষুনি কর্কশ গলায় জবাব দিলো,
“ ফা*ক দেট মানুষজন!জাস্ট কিপ ইউর আইস অন মি!আমাকে ইগনোর করার মত সাহস হয় কোত্থেকে তোমার?”
নাকমুখ কোঁচকায় মাহি। লোকটার এহেন উল্টো পাল্টা কথাতে বরাবরই বিরক্তি আসে তার।আজও তাই তাই হচ্ছে! লোকটা এতো বেপরোয়া হবেই বা কেন? বেপরোয়া হতে হলে অন্য কারো সাথে হোক না,তার সাথেই বা কেনো হতে হবে? মাহি এবার ভীষণ রাগ নিয়ে হাতখানা মোচড়াতে মোচড়াতে বলে ওঠে,
“ এই আপনি আমার হাত ছাড়বেন? না-কি আমি চিৎকার করব? কোনটা?”
এহেন কথায় মুগ্ধ কেমন বাঁকা হাসলো। তৎক্ষনাৎ এককদম এগিয়ে এসে মেয়েটাকে এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নিলো! ঘটনার আকস্মিকতায় আশেপাশের সকলে কেমন হা করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে! ওদিকে মাহিও কেমন বেকুব বনে গেলো মুগ্ধের এহেন উদ্ভট কান্ডে। মেয়েটা এতোটাই হতভম্ব হলো না…যার দরুন মুগ্ধ যে তাকে কাধেঁ তুলে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকে তার কোনো খবরই নেই। অথচ তার উচিত ছিল নিজেকে ছাড়ানোর একটু-আধটু প্রয়াস চালানো যদিওবা সে-ই প্রয়াস বরাবরের ন্যায় বৃথাই হতো!
প্রায় মিনিট খানেকের মধ্যেই মাহির সম্বিৎ ফিরলো যেন। সে তক্ষুনি নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে হাত-পা ছুড়ে, গলা ফাটিয়ে মুগ্ধকে বলতে লাগলো,
“ এই নিচে নামান আমায়!কিসব অসভ্যতামি শুরু করলেন আপনি? নিচে নামান বলছি বেয়াদব লোক! নামাচ্ছেন না কেনো?”
মেয়েটার ওমন ঝাঁঝালো কথা মোটেও গায়ে ভিড়েনি মুগ্ধলর।উল্টো মাহির ওমন হাত-পা ছোঁড়া দেখে তৎক্ষনাৎ মেয়েটার পাদু’টো একহাতে আঁকড়ে ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে ধমক দিয়ে বলল,
“ আরেকটাবার শুধু হাত-পা ছুঁড়ে দেখো মেয়ে, পাদু’টো ভেঙে যদি নদীতে না ফেলছি তাহলে আমার নামও মির্জা সায়ান মুগ্ধ না!”
থেমে গেলো মাহি! কী এমন ছিলো ধমকটায়? যা শুনতেই একদম শান্ত বনে গেলো মেয়েটা! কে জানে কী ছিল!এদিকে মেয়েটাকে শান্ত হতে দেখে ফের হাঁটা ধরলো মুগ্ধ। কিছুটা পথ যেতেই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক,জনাব মঞ্জুর সাহেব পড়লেন সামনে। সম্মানীয় ব্যাক্তি নিজের কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীর ওমন বেহাল অবস্থা দেখে কেমন আঁতকে ওঠলেন যেন! তিনি তৎক্ষনাৎ গুরুগম্ভীর কন্ঠে খানিক জোর গলায় মুগ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ এই কী করছেন আপনি এসব? ওকে এভাবে কোলে তুললেন কেনো? নামান বলছি!”
একে-তো মেজাজ চটে আছে। তারওপর অপরিচিত এই লোকের এহেন কথায় চটে যাওয়া মেজাজটায় কেমন আরেকদফা ঘি পড়লো মুগ্ধের।সে কেমন মেজাজ দেখিয়ে মঞ্জুর সাহেবকে বলে ওঠে,
“ আমার ওয়াইফি কে আমি কোলে তুলে নেই,বা টেনেহিঁচড়ে নেই তাতে আপনার কী?সরুন আমার সামনে থেকে। ”
হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলেন মঞ্জুর সাহেব। এদিকে নিজের কথাটুকু শেষ করে, মঞ্জুর সাহেবকে পাশ কাটিয়ে আবারও গটগট পায়ে হাঁটা ধরলো মুগ্ধ। পেছন থেকে হতবিহ্বলের মত তার দিকেই তাকিয়ে রইলেন অর্থনীতির স্যার।তবে এরইমধ্যে তার চোখ গিয়ে আটকালো মুগ্ধের কাঁধে উবু হয়ে পড়ে থাকা মাহির দিকে। তক্ষুনি চোখদুটো কেমন বেরিয়ে আসার উপক্রম তার। মেয়েটাকে চিনতে খুব একটা সময় লাগেনি মঞ্জুর সাহেবের।তিনি মনে মনে নিশ্চিত, এ-তো তায়েফ এহসানের মেয়ে!তবে নামটা মনে করতে খানিক বেগ পোহাতে হচ্ছে তার। কী যেন নামটা….ভাবতে গিয়েই মস্তিষ্ক কেমন ফাঁকা হয়ে এলো মধ্যবয়স্ক মানুষটার। তিনি ভাবতে ভাবতেই হাত বাড়িয়ে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে আনেন।তারপর নম্বর ডায়াল করে কল লাগালেন পরিচিত একজনের কাছে। ওপাশের নম্বরে রিং হলো গোটা দুয়েক, ওমনি ফোনটা রিসিভ করে একজন গুরুগম্ভীর পুরুষ গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠেন,
— “ আসসালামু আলাইকুম! কে বলছেন?”
মঞ্জুর সাহেব গালভর্তি হাসি টেনে পরক্ষণেই জবাব দিলেন,
— “ ওয়ালাইকুমুসসালাম তায়েফ সাহেব! আমি মঞ্জুরুল হাবিব বলছিলাম। চিনতে পেরেছেন?”
নিজের ডেস্কে বসে কর্মরত ব্যস্ত তায়েফ সাহেব ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতেই ফোন রিসিভ করেছেন।নাম্বারটা একবার যেচে পড়ে চেক অবধি করার সময় মিলেনি বেচারার। তবে ওপাশের ব্যাক্তির নাম শুনে কী মনে করে ফোনটা একবার চেক করে পরক্ষণেই চিনতে পারলেন মানুষটাকে। তক্ষুনি স্মিত হেসে শান্ত গলায় জবাব দিলেন,
“ জ্বি স্যার! চিনতে পেরেছি। তা কেমন আছেন আপনি?”
মঞ্জুর সাহেব আলতো হাসলেন।বাহুর ভাঁজ থেকে গোটানো ফাইলটা হাতে নিয়ে, ক্যাম্পাসের করিডরে হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
“ তা আছি ভালোই।আরও ভালো থাকতাম যদি আপনি আপনার মেয়ের বিয়েতে ইনভাইট করতেন। মেয়েকে এতো সুন্দর জামাই দেখে বিয়ে দিলেন, অথচ আমাদের একটাবার জানালেনও না!এটা কী হলো!”
হতভম্ব বনে গেলেন তায়েফ সাহেব। বেকুবের মত একবার ফোনটা কান থেকে সরিয়ে এনে চেক করলেন নাম্বারটা ঠিকঠাক আছে কি-না। যে-ই পরোখ করা শেষ হলো ওমনি তিনি গম্ভীর কন্ঠে বলতে লাগলেন,
“ কী যা-তা বলছেন? মেয়ের বিয়ে মানে? আমার মেয়েদের এখনো বয়স হয়েছে বিয়ে দেওয়ার? এখনো নাকে টিপলে দুধ বেরোবে,সেই মেয়েদের আবার কিসের বিয়ে? আপনি কি আজকাল দিনে-দুপুরে স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন না-কি?”
এবার সত্যি সত্যি মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে এলো মঞ্জুর সাহেবের। লোকটা নিজের অর্ধ টাক পড়ে যাওয়া মাথাটায় খানিক হাত বুলিয়ে চিন্তিত মুখে বললেন,
“ তবে যে মাত্র একটা ছেলে এসে আপনার মেয়েকে কাঁধে তুলে নিয়ে গেলো,আর বলল আপনার মেয়ে না-কি তার… ঐযে কী যেন একটা জেন জি’রা বলেনা বউকে,ওহ হ্যা ওয়াইফি!”
“ হোয়াট!!!”
তৎক্ষনাৎ বসা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন তায়েফ সাহেব। তাকে দাড়াঁতে দেখে সামনে বসে থাকা জুনিয়ররাও দাঁড়িয়ে পড়লেন সম্মান দেখিয়ে। তায়েফ সাহেবের কপাল কুঁচকে গেছে চিন্তায়।মুখে লেপ্টে আছে অবিশ্বাস্যের ছাপ।তিনি ফের জোরালো কন্ঠে বললেন,
“ আর ইউ শিওর? আপনি ঠিকমতো দেখেছেন সেটা আমার মেয়ে?”
“ হ্যা! তাইতো দেখলাম!”
কথাটুকু শেষ হতে না হতেই তায়েফ সাহেব চেচিয়ে উঠেন। নিজের ডেস্কের ড্রয়ার থেকে লোড করা বন্দুকটা হাতে তুলে নিয়ে, কেবিন থেকে বেরিয়েই বলতে লাগলেন,
“ হামিদ! এক্ষুণি জিপ বের কর।”
পরক্ষণে ঘাড় বাকিয়ে কনস্টেবল পদে কর্মরত শফিককে বললেন,
“ এই শফিক!”
তক্ষুনি ঝিমানো ছেড়ে ছেড়ে দিয়ে সজাগ হলেন শফিক। আঁতকে ওঠে বললেন,
“ জ্বি স্যার!”
“ রেডি হ!কোনো এক অবাধ্য বাপের ব্যাটার কপালে শনি লাগবে আজকে! ওরে আজ বুঝিয়ে ছাড়বো তায়েফ এহসানের মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর পরিণাম কী!”
কলেজ গেট থেকে বেরিয়ে খানিকটা দূরে এসে দাঁড়ালো মুগ্ধ। ধীরেসুস্থে কাঁধ থেকে মাহিকে নামিয়ে দিলো আলগোছে। ছাড়া পেয়েই চোখেমুখে কেমন আধার দেখতে লাগলো মেয়েটা! সে খানিক দুলতে লাগলেই তক্ষুনি মেয়েটাকে আগলে নিলো মুগ্ধ। কিয়তক্ষন বাদেই নিজেকে সামলে নিয়ে মাহি তৎক্ষনাৎ সরে দাঁড়ালো মুগ্ধের কাছ থেকে। গলায় একরাশ ঝাঁঝ ঢেলে বললো,
“ আপনি আস্ত একটা অসভ্য লোক! সবসময় নিজের মনমতো কাজকর্ম করেন!”
মুগ্ধ দুষ্ট হাসলো কেন যেন। কিছুটা এগিয়ে এসে খানিক নিচু হয়ে দুষ্ট কন্ঠে বললো,
“ কোনোরকম অসভ্যতামি না করেই অসভ্য হয়ে গেলাম? এটলিস্ট আমায় কিছুটা করার সুযোগ তো দেওয়া উচিত ছিলো!”
অগত্যা এমন কথায় তৎক্ষনাৎ মাহির শীরদাড়া বেয়ে এক অদ্ভুত শীতল স্রোত নেমে গেলো! সে কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের জামার একাংশ চেপে ধরতেই বাঁকা হাসলো মুগ্ধ। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলতে লাগলো,
“ এতো ভয় পেতে হবে না চশমিস! আমার আবার হাঁটুর বয়সী মেয়েদের প্রতি তেমন কোনো ইন্টারেস্ট নেই! আর তোমার ওপর তো আরও আগে নেই! কথায় কথায় কাঁপা-কাঁপি করা, ছিচঁকাদুনে মেয়েমানুষ আবার দু-চোখে সহ্য হয়না আমার।সেক্ষেত্রে ইউ আর সেফ! ”
মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো মাহি। তবে বাইরে থেকে খানিক ভয়ভীতি ধরে রেখে মিনমিন করে বললো,
“ তাহলে এখানে এনেছেন কেনো?”
“ টাইমপাস করতে!”
“ আমি ইন্টারেস্টেড নই!”
“ ইভেন আমিও নই!”
সোজাসাপটা উত্তরে থামলো মুগ্ধ। প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে রেখে, কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তার গাড়িটার কাছে পা বাড়ালো নিঃশব্দে। এদিকে মাহি পেলো সুযোগ! সে চলে যাবার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই পেছন থেকে ভেসে আসে মুগ্ধের গমগমে গলা!
“এই চশমিস! দাঁড়া… ”
মুহুর্তেই থমকায় মাহি।পাদু’টো তার জমে গেল মাঝ রাস্তাতেই। সে ভয়ে দুরুদুরু বুকে তৎক্ষনাৎ চেপে ধরে পরনের জামাটার একাংশ। ওদিকে মুগ্ধ কেমন আগুন চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পিঠের দিকে। এইটুকু একটা হাটুঁর বয়সী মেয়ের কি-না এতো তেজ যে তাকে উপেক্ষা করে চলে যায়! কত্ত বড় দুঃসাহস হলে মেয়ে মানুষ এমনটা করে কে জানে! মুগ্ধের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো,দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সে পা বাড়িয়ে এগিয়ে আসে মাহির দিকে। পরক্ষণেই কোনোরূপ বলাকওয়া ছাড়া মেয়েটার ডান হাতের কনুই শক্ত করে চেপে ধরে, তাকে একটানে ঘুরিয়ে নেয় নিজের দিকে। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে ওঠে বেচারি! সে কেমন ভড়কে তাকায় মুগ্ধের পানে। ওদিকে মুগ্ধের চোখদুটো দিয়ে এবার যেন আগুন বেরুচ্ছে! সে তক্ষুনি অন্যহাতে মাহির চোয়াল চেপে ধরে খেঁকিয়ে বলে ওঠে,
সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৫
“ তোকে আমি যেতে বলেছি?”
মাহি নিশ্চুপ! ভয়ার্ত ঢোক গিললো পরপর। মুগ্ধ ফের গরম কন্ঠে বললো,
“ আজকে প্রথম এবং আজকেই শেষবারের মতো বলছি চশমিস, আমাকে ইগনোর করার মত দুঃসাহস কোনোদিনও দেখাতে যেও না কিন্তু! কেননা আ’ম নট আ গুড পার্সন। মেজাজ একবার বিগড়ে গেলে, সামনের মানুষটাকে চড়িয়ে কীভাবে গাল ফাটিয়ে দিতে হয় তা আমি বেশ ভালো জানি! এন্ড আই থিংক, ইতোমধ্যেই তুমি সেটা টের পেয়েছো! বাই দা ওয়ে, ভুলে গিয়ে থাকলে আরেকবার মনে করিয়ে দিতে পারি।সেক্ষেত্রে গালটা একটু এগিয়ে আনো তো!”
