সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২১
মৃধা মৌনি
হাইওয়ের ধারে সন্ধ্যা নামছে। চারপাশের গাড়ির হেডলাইটগুলো তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে, আর শিশির একটা ভাঙা সাইনবোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কাজ একটাই, কিন্তু কেন যেন আজ তার বুকটা একটু বেশিই কাঁপছে । শরীর চলছে যান্ত্রিকভাবে, কিন্তু মনটা যেন এক পচা পুকুরে ডুবে আছে। বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত শূন্যতায় ছেয়ে আছে। সে এখন দ্রুত টাকা চায়, যেন টাকা দিয়ে সে তার সব অনুভূতি ঢেকে দিতে পারে।
আজকের কাজে মাল দিতে হবে না বরং নিতে হবে।
শিশির সিগারেট ধরাল। ধোঁয়ার কুন্ডলী বাতাসে মিশে গেল। ঠিক তখনই একটা পুরোনো জিপ এসে তার পাশে ব্রেক কষল। কাঁচ নামল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক লোক। লোকটির বর্ণনা করতে গেলে বলতে হয়, সে যেন অন্ধকার জগতের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। বেঁটেখাটো, কিন্তু দেহের প্রতিটি অংশে রুক্ষ পেশির ছাপ। পরনে ময়লা, তেলচিটে শার্ট, তাতে ভাঁজ নেই, শুধু অগোছালো ভাব। ঠোঁটের কোণে সবসময় লেগেই আছে একটা পৈশাচিক হাসি। তার চোখ দুটো রক্তাভ, ঘুম আর নেশার মিশ্রণে ঘোলাটে। দেখলেই মনে হয়, লোকটা যেন গঞ্জিকা আর মাস্তানির মিশ্রণে তৈরি। গলায় একটা মোটা রুপোর চেন, যা তার ফালতু ব্যক্তিত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
লোকটা নেমে শিশিরকে আপাদমস্তক দেখে নিল। তার চোখের দৃষ্টিতে সম্মানের ছিটেফোঁটা নেই।
‘মাল তো তুমিই রিসিভ করবা?’ লোকটা খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করল।
শিশির সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ফেলে দিল, ‘হ্যাঁ।’
লোকটা একটা ভারি ব্যাগ ছুঁড়ে দিল শিশিরের দিকে। ‘নাও। এইটা তোর পাওনা। আর বাকি টাকা যখন ডেলিভারি দিবি তখন পাবি।’
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তুমি থেকে তুইতে- শিশিরের অভ্যেস হয়ে গেছে এ কয়দিনে। এই জগতে কেউ কাউকে নিজের চেয়ে উঁচু কিছু ভাবে না বরং সবাই চেষ্টা করে নিজেকে বড় করিয়ে দেখানোর জন্য!
শিশির ব্যাগটা তুলে নিল। ওজনটা বেশ ভারি। সে টাকাগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে দেখে, আজকের অর্ডারের জন্য যে টাকা দেওয়া হয়েছে, তা তার কল্পনার চেয়েও বেশি।
‘নাম কী তোর?’ লোকটা এবার আলস্যভরে সিগারেট ধরাল।
শিশির একটু ইতস্তত করে বলল, ‘শিশির।’
‘হুম। কসমেটিক নাম। কই থাকিস? মানে, এই লাইনে নতুন?’
‘না মানে… আমি এই শহরেই থাকি।’
শিশির তার আসল পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করল।
লোকটা হেসে উঠল, সে হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই, ‘ভালো। তোরা কম কথা বলা পাবলিক ভালো। কত পাইলি এই অর্ডারটায়?’
শিশির টাকার অঙ্কটা বলল।
লোকটা ঠোঁট উল্টাল, ‘হালা। এইটুকো কামের লাইগা এত খুশি হইছস? তোরা যে এই মাল ডেলিভারি করস, কোনোদিন ধরা খাইলে জেল খাটবি। জানের মায়া নাই?’
শিশির কাঁধ ঝাঁকাল।
‘কী করব ভাই। পেটে তো খিদা আছে।’
‘কথাবার্তায় তো শিক্ষিতো লাগে৷ চাকরি বাকরি কর ব্যাটা।’
‘চাকরি তো সোনার ডিম পাড়া হাঁস, সবার ভাগ্যে জোটে না। আর জুটলেও যে স্যালারি.. তাতে অর্ধেক মাস না খেয়েই থাকতে হবে।’
‘হুম।’
লোকটা একটু কাছে ঘেঁষল। তার মুখ থেকে সিগারেটের ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে। সে এবার কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল, ‘শোন। তোরে দেইখা মনে হইতাছে তুই মালটা ভালো। একটা ভালো অফার দেই। আমরা হচ্ছি রেন্ট-এ-কিলার। বুঝলি?’
শিশিরের হৃৎপিণ্ড যেন এক লাফে গলায় উঠে এল।
লোকটা হেসে উঠল, ‘আরে এত ভয় পাস ক্যান? কাম তো সামান্য। ভাড়ায় খাটবি। তোরে যার যেই কাজ দরকার, সে ভাড়া করবে। কাউকে শায়েস্তা করা লাগলে, হাত-পা ভাঙা লাগলে… তোর মতো চিমসে পাবলিক কামের না। কিন্তু বড় কাজগুলা… ধর, কাউকে একদম শেষ কইরা দিতে চাইলে… সেইগুলাতে অনেক টাকা। বুঝলি? একটা কাম করবি… দুই মাস বইসা খাইতে পারবি।’
শিশিরের চোখে মুহূর্তের জন্য টাকার ঝলকানি খেলে গেল। দুই মাস বসে থাকা! সবার সব অভিযোগ, নিজের যত চাহিদা… সব মিটে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল মায়ের দেওয়া কঠিন শিক্ষা, খানিকটা বেঁচে যাওয়া মানবতাবোধ, ছিটেফোঁটা বিবেকের আর্তচিৎকার!
‘না ভাই…’ শিশিরের গলা শুকিয়ে গেছে, ‘এই কাজ… আমার কলিজায় এতও কারেন্ট নাই।’
লোকটা আবারও সেই নিষ্ঠুর হাসি হাসল, ‘কলিজার কারেন্ট লাগে না রে, পেটের খিদা লাগে। যা এখন। ভাবিস। পরেরবার দেখা হইলে বলিস।’
লোকটা জিপের কাঁচ তুলে দিল। জিপটা ধুলো উড়িয়ে দ্রুত হাইওয়েতে মিশে গেল।
শিশির তখনও দাঁড়িয়ে। হাতে ব্যাগের ভার, কানে লোকটার প্রস্তাব। সে বুঝতে পারল, সে এখন যে লাইনে পা দিয়েছে, সেখান থেকে পিছলে পড়লে কোথায় গিয়ে থামতে হবে। একটা বড় শ্বাস নিয়ে সে সিদ্ধান্ত নিল। এই মুহূর্তে তার শুধু একটাই ঠিকানা… যেখানে কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো নৈতিকতার হিসেব নেই, শুধু আছে অন্ধকার আরাম।
শিশির সোজা হোটেলের দিকে পা বাড়াল। রূপালী হোটেল!
রূপালী হোটেলে ফিরতে শিশিরের পা যেন আর চলতে চাইছে না। না, ক্লান্তি নয়; বরং এক ধরনের অপরাধবোধ আর নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা তাকে গ্রাস করেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার মস্তিষ্ক যুক্তি মানতে নারাজ, সে শুধু সেই অন্ধকারের আরামটুকু চাইছে, যেখানে প্রশ্ন নেই, যেখানে কোনো অতীত নেই।
হোটেলের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এক ঝলক পুরোনো, বাসি পারফিউমের গন্ধ নাকে এলো। লবিটা সবসময়ই ঘোলাটে আলোয় মোড়া থাকে, যেন দিনের আলো এখানকার কোনো পাপ দেখতে না পায়। কৃত্রিম চামড়ার সোফাগুলো কেমন যেন তেলচিটে, আর বাতাসে সবসময় একটা অস্থিরতা মিশে থাকে।
ম্যানেজার সবুজ কাউন্টারে হেলান দিয়ে বসে ছিল। শিশিরকে দেখেই তার বিরক্তির রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
‘আবার আপনি?’ সবুজের কণ্ঠে কোনো উষ্ণতা নেই। আছে একরাশ চাপা বিরক্তি।
‘আজ দু’দিন ধরে একটানা এখানেই পড়ে আছেন ভাই ভালো লাগে না, জানেন? এই জায়গা তো আর কারো আস্তানা না। এখানেই যে সংসার গোছাবেন..’
শিশির তার কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে কাউন্টারের ওপর রাখল, ‘টাকা দিই তো, সবুজ ভাই। আপনার অসুবিধা কীসের?’
‘টাকা দিচ্ছেন ঠিক আছে। কিন্তু নিয়ম বলে তো একটা কথা আছে, তাই না? এই লাইনে যারা আসে, তারা কাজ সারে আর চলে যায়। এসবের ওপর কেউ এভাবে মন দিয়ে বসে নাকি? এরা তো… এদের জীবন অন্যরকম।’ সবুজ ইশারায় কাঙ্ক্ষিত মেয়েদের দিকে বোঝাল। তার কণ্ঠে এক ধরনের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য।
‘কার ওপর মন দিলাম, কার ওপর দিলাম না—সেটা তো আমার ব্যাপার, সবুজ ভাই। আপনার ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে?’ শিশির শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় জবাব দিলো। সে জানে, এই লোকগুলোর সঙ্গে শুধু টাকার সম্পর্ক রাখাটাই নিরাপদ।
সবুজ এবার একটু নরম হলো, তবে চোখ তার তখনো সন্দিহান। সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা ভাই, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আপনার ঘরবাড়ি নাই? বউ-টউ… মানে কেউ নাই যে আপনাকে খুঁজবে না? এই যে রোজ এসে রাত কাটাচ্ছেন…’
শিশিরের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। তার এই পালিয়ে আসার কারণই তো এই সব প্রশ্ন!
সে টাকার ব্যাগটা সবুজের দিকে এগিয়ে দিল। ‘দেখুন, আপনার এসব ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার কোনো দরকার নেই। আমি টাকা দিয়েই আসি। যতদিন খুশি, যতক্ষণ খুশি থাকব। অসুবিধা হলে বলবেন, লাগলে আরও টাকা দেব। বুঝেছেন?’
কথার ঝাঁজে সবুজ সামান্য দমে গেল। টাকাটা হাতে নিয়ে সে গুনে দেখল।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। রেগে যাচ্ছেন কেন? যান। আপনার রুমে যান। নয়নতারা বসে আছে। সেও আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।’
সবুজ আবার হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল, তবে সে হাসিটা এবার আরও বেশি কৃত্রিম।
শিশির আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। সে যেন মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। সবুজকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গেল। তার গন্তব্য স্পষ্ট। সেই কাঙ্ক্ষিত ঘর, যেখানে সব হিসাবনিকাশ, সব অভিযোগের ঊর্ধ্বে এক ধরনের ‘শান্তি’ তাকে অপেক্ষায় রেখেছে। যেখানে এই মুহূর্তে তার জীবন, তার প্রতারণা কিংবা তৃণার কষ্টের কোনো মূল্য নেই। সেখানে শুধু আছে নয়নতারা।
শিশির দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল। ঘরের মৃদু ডিম আলোয় সে দেখল, বিছানার এক কোণে গুটিয়ে বসে আছে নয়নতারা। শিশিরের আগমন টের পেতেই মেয়েটা একটু কেঁপে উঠল, যেন সে এতক্ষণ অন্য কোনো চিন্তায় বিভোর ছিল। এই কাঁপনটা শিশিরের খুব চেনা। সে জানে, এটা ভয়ের কাঁপন নয়, এটা এই পেশার নারীদের এক ধরনের অভ্যস্ত আড়ষ্টতা।
‘নয়নতারা!’ শিশির দরজা ভিড়িয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।
নয়নতারা চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে সেই চেনা কোমলতা।
‘আসুন, শিশির সাহেব। এত সময় লাগল যে?’
‘কাজ ছিল।’
শিশির তার সামনে এসে বসল। নয়নতারা তার হাত ধরতেই শিশির সেই উষ্ণতায় শান্ত হলো। কোলে মাথা রেখে বলল, ‘আর কতদিন এভাবে? আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, নয়নতারা।’
নয়নতারা মৃদু হাসল এ কথা শুনে, ‘বারবার একই কথা বলেন কেন? আমি তো বলি, আরও ভাবুন। আমার মতো মেয়েকে কেন আপনি বিয়ে করতে চান? আপনার মতো ভদ্র সমাজের লোক… কেন এই পাঁকে নামবেন?’
শিশিরের চোখে খেলে পুরোনো রাগ আর নতুন হতাশার মিশ্রণের ঢেউ, ‘ভদ্র সমাজ! সে কোথায়? আমি আর ভদ্র সমাজের লোক নই, নয়নতারা! কী বলছো তুমি? জানো আমি কী করি? ড্রাগস ডিলিং করি! মালামাল পাচার করি এদিক-ওদিক। আর এই যে এই বেশ্যাপাড়ায় আমি দিনের পর দিন পড়ে আছি, সব ভুলে… এরপরও কি আমি ভালো মানুষ রইলাম?’
নয়নতারা হাসল, এবার তার হাসিটা আরও খানিকটা তীক্ষ্ণ। সেই হাসি শিশিরের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিল।
‘কম পুরুষের সাথে উঠাবসা নেই তো, শিশির সাহেব। এটুকু জানতে আর বাকি নেই যে, এই অন্ধকার জগতে তারাই সবচেয়ে বেশি রাজত্ব করে, যাদের বাইরের পৃথিবীটা আলো ঝলমলে। যাদের সমাজ সাধু পুরুষ, ভালো লোক কিংবা পারফেক্ট ম্যান হিসেবে চেনে। জানেন, রাতের আঁধারে তাদের হাতেই ছোবল খেয়ে নাম হয় পতিতা একেকটি মেয়ের? বাইরের ‘ভদ্র’ লোকগুলোই তো এই জগৎটা তৈরি করেছে। আপনি এসেছেন—এতে নতুন কিছু নেই। আপনার মতো লোকেরাই তো আমাদের সবচেয়ে বড় খদ্দের। কিন্তু কেউ কোনোদিন এভাবে বলেনি, এতোটা পাগলামিও করেনি। আপনিই প্রথম পুরুষ আমার জীবনে যে আদাজল খেয়ে হাত ধুয়ে পড়েছেন.. এই ব্যাপারটাই আমি ঠিক করে হজম করতে পারছি না।’
শিশির তার মাথাটা নয়নতারার কোলের ভেতর আরও ঢুকিয়ে দিলো। চোখজোড়া বন্ধ করে নয়নতারার অঙ্গের উত্তাপে নিজেকে উষ্ণ করতে করতে জবাব দিলো, ‘মানুষ যেখানে সুখ পায়, শান্তি পায়, সেটাকেই তো আঁকড়ে ধরতে চায়, তাই না নয়ন? এতে এত হজম না হওয়ার কি আছে?’
‘আমার মতো একজনের কাছে আপনি কি সুখ শান্তি পেলেন, এটাই হজম হচ্ছে না তো।’
‘না হলে হওয়ানোর দরকার কি? থাক না কিছু ব্যাপার আড়ালেই… তুমি শুধু আমার হও!’
‘উঁহু, জীবনের কিছু সিদ্ধান্ত আড়ালে সরিয়ে নিতে হয় না। বরং সকালের আলোয় ভালো করে এ পিঠ ও পিঠ দেখে তবেই নিতে হয়।’
‘তাই? বেশ, তবে প্রশ্ন করো।’
একদন্ড ভাবে নয়নতারা। একটি ছোট শ্বাস ফেলে প্রশ্ন করে ফের, ‘আপনার জীবনে আর কেউ আছে?’
এই প্রশ্নে শিশিরের সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে উঠল। রাগ হলো, তীব্র রাগ। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘এই সব কথা কেন? আমার অতীতে কে ছিল, না ছিল তাতে তোমার কী?’
নয়নতারা শান্তভাবে জবাব দিল, ‘সত্য লুকালে আমি এগোব না, শিশির সাহেব। যে সম্পর্কের শুরু মিথ্যা দিয়ে, সেই সম্পর্কে আমার আগ্রহ নেই। আমি তো মানুষ, তাই না? বেশ্যাপাড়ার মেয়ে হলেও আমার তো একটা মন আছে। আমি ভাঙা সম্পর্ক চাই না।’
সে চোখ তুলে শিশিরের দিকে তাকাল।
‘আর, আমায় মিথ্যে বলবেন না, আমি এত পুরুষের চোখ দেখেছি যে মানুষ চিনতে জানি। আপনার চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি, সে সত্য বলছে না মিথ্যা।’
নয়নতারার সেই শীতল, স্থির চাহনি শিশিরের ভেতরের সব প্রতিরোধ ভেঙে দিল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটিকে সহজে মিথ্যে দিয়ে কেনা যাবে না। টাকা দিয়ে হয়তো তার শরীর কেনা যায়, কিন্তু এই সত্যবাদী চোখ দুটোকে নয়।
শিশির বাধ্য হলো। সে বিছানার ধারে বসে পড়ল। তার মাথা নত হয়ে গেল আপনাতেই। জ্বাললো সিগারেট। তার ধোঁয়ায় নিজেকে আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করে বলতে শুরু করল,
‘আমার… আমার বিয়ে হয়েছিল। ওর নাম ছিল দীক্ষা। আমরা একে অপরের খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। ব্যাচ মেট ছিলাম তো। সেখান থেকেই প্রণয়, এরপর পরিণতি। কিন্তু বিয়ের পর আমি বুঝতে পারি, স্ত্রীকে বন্ধু বানানো যায় কিন্তু বন্ধুকে স্ত্রী বানানো যায় না। স্বামীর প্রতি একটা আলাদা সম্মান, শ্রদ্ধা, ভক্তি থাকতে হয়- যেটা ওর ভেতর ছিল না। আমি চেয়েছিলাম ও ক্যারিয়ার ফোকাস হোক, বাট সে তো সংসার ছাড়া আর কিচ্ছু বোঝেইনি। সবসময় আমার উপর ছড়ি ঘোরানো- এটা করবে না, এটা খাবে না, এখানে যাবে না.. এমনকি বেবি নিলো, সেটাতেও আমার মত আছে কি নেই, একবার জিজ্ঞেস অবধি করেনি। হুট করে জানিয়ে দিলো, আমি বাবা হতে চলেছি। আরে আমার ইচ্ছে কি নেই, সেটা তো একবার জিজ্ঞেস করবি তাই না? বাবা হওয়া কি এতই সহজ নাকি। এত সোজা একটা বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়া? তুমি বলো! মেন্টাল প্রিপারেশন নেই, ফিনানশিয়ালি স্টেবিলিটি নেই। এসব ওকে কে বোঝাবে? আর কিছু বলতে গেলেই ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কান্নাকাটি, না খেয়ে থাকা, অসুস্থ বানানো শরীরটাকে… অসহ্য!! তাই আমিও কখনো ওকে কিছুতে বাঁধা দেইনি। আবার মন থেকে এক্সেপ্ট ও করতে পারিনি। নিজের ভেতর নিজেই গুমরে গুমরে মরেছি।’
শিশির থামল, একটা দম টেনে নিলো। সিগারেটের আগুন নিভে গেছে। সে সেটাকেই আবার ধরানোর চেষ্টা করল। হাত কাঁপছে মৃদু ভাবে। কেন, কে জানে!
নয়নতারা একটি শব্দও না করে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল শিশিরের বলা কথাগুলি। সে থামতেই বলে বসল, ‘তারপর?’
শিশির তার দিকে চেয়ে হাসলো সামান্য, ‘মজার কোনো গল্প শুনছ? এত আগ্রহ!’
‘আপনি বলুন না, গল্পের চেয়ে কম কি…’
তার আগ্রহের জোর দেখে শিশির আবারও বলতে শুরু করল, ‘ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্কের শেকল ঢিল হতে শুরু করল। ওর প্রতি ভালোবাসা,টান,মায়া যেটাই বলো, কমে শূন্যের কোঠায় নামতে লাগল ধীরে ধীরে। আর ওর প্রেগন্যান্সির পর তো, আমার সহ্যই হতো না ওকে। আমি দূরে দূরে সরে থাকতাম, আমাদের মাঝখানে একটা ফাঁকাস্থান তৈরি হলো। এই ফাঁকাস্থানে ঢুকে গেল তৃণা… ওর বোন।’
নয়নতারার মাথায় যেন বাঁজ পড়ল, ‘আপনি তার বোনের সঙ্গে…?’
শিশির আলগোছে মাথা ঝাঁকাল, ‘হুঁ। আসলে তৃণা মেয়েটাই তখন এমন ছিল। আমাকে বুঝতে পারত। আমার মন ভালো না খারাপ, আমি কি ক্লান্ত নাকি, আমার কি চাই, কীভাবে চাই- সবকিছুর দেখভাল করতে লাগল। গল্প করত। আমাকে সাহস দিতো। আমাকে বুঝতো। কীভাবে আস্তে আস্তে তার প্রতি আমিও এগিয়ে গেলাম, নিজেও জানি না। কিন্তু হয়ে গেল একটা কিছু। এতই প্রবল ভাবে.. আমি দীক্ষার সঙ্গে সব সম্পর্ক মুছে দিয়ে ওর সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়তে চাইলাম।’
‘আপনি তার সাথে… তার বোনের জন্য…’ নয়নতারা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। তার বিশ্বাস হচ্ছে না, তার সামনের আলাভোলা দেখতে মানুষটার ভেতরের রূপ এত বিচ্ছিরি। একজন নারী হিসেবে সে আরেক নারীর দরদ বুঝতে পারে। আর তৃণাই বা কেমন মেয়ে…
নিজের ভাবনা গুলো দমিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে নয়নতারা মেঘস্বর শুধালো, ‘তারপর?’
‘আমরা আলাদা বাসায় উঠলাম।’ পরিবার থেকে বের করে দেওয়ার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেল শিশির, ‘ওকে নিয়ে আলাদা বাসায় উঠার পর ও পুরাই পল্টি। মানে কেমন যেন হয়ে গেল। বিয়ের কথা বললাম, সে পাঁচ লাখ টাকা কাবিনের নিচে করবেই না। কাছে আসতে দেয় না। সারাক্ষণ খিটমিট করে। জেদ দেখায়। প্রথম কিছুদিন ভাবলাম, হঠাৎ এই পরিবর্তন নিতে পারছে না বুঝি, কিন্তু দিন দিন এসব বেড়েই চলল। শেষমেশ তার প্রতিও আমার মোহ কাটলো। বুঝলাম, নারী নেশা ধরাতে জানে ঠিক, সেই নেশায় আটকে রাখতে পারে না। জীবনে আর বিয়েশাদি, নারীর দিকে আগাবো না এই সিদ্ধান্ত নিলাম যখন, তখনই আমার পরিচয় হলো তোমার সাথে। তুমি যেভাবে আমাকে গ্রিট করেছিলে, ট্রিট করেছিলে, বিশ্বাস করো, এরকম একজনকেই চেয়েছিলাম জীবনে, যার কাছে আমার সম্মান থাকবে, আমার মান থাকবে, গলার আওয়াজ থাকবে নিচুস্বরে।’
‘এক কথায় আপনার পায়ের তলায় থাকবে তাই তো?’
নয়নতারার হঠাৎ প্রশ্নে ভ্রু কুঁচকে গেল শিশিরের, নয়নতারা হেসে উঠল।
‘মজা করলাম। বলুন আপনি।’
শিশির স্বাভাবিক হলো, ‘তোমায় আমার প্রথমদিনেই ভালো লেগেছে। ভাবলাম আমি নিজেও খারাপ পথের পথিক, আর তুমিও। দু’জনেই অতীত ভুলে ভালো থাকতে পারি, বর্তমান, ভবিষ্যৎ ভালো করতে পারি। তাই তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি। আমি হারামে বিশ্বাসী না, হালালে বিশ্বাসী। যা করতে চাই, হালাল ভাবে করতে চাই তোমার সাথে। তুমি কি আমার… আমার হালাল হবে? আমার বউ হবে?’
নয়নতারার পেট ফাটানো হাসি পাচ্ছে।
কি অদ্ভুত একটা মানুষ! কত অবলীলায় নিজের করা কর্মের কথা বলছে তাও বিন্দুমাত্র অনুশোচনার ছায়াও তার চোখের দৃষ্টিতে নেই। মানুষ এমন হয় কি করে? নয়নতারা নিজের দেহ দিয়ে ব্যবসা করে খায়। আর এ তো আরও জঘন্য কাজ করে। মানুষের হৃদয় ভাঙে। হৃদয় ভাঙার যন্ত্রণা এ কি জানে? যদি জানত এমনটা করতে পারত? এতই সস্তা সব কিছু?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নয়নতারা।
শিশির বলল, ‘কি হলো? সব তো সত্যি বললাম, চোখে তাকিয়ে দেখো, মিথ্যা নেই।’
‘অনুতাপও তো নেই।’
শিশির শক্ত হয়ে উঠল, ‘কিসের অনুতাপ থাকবে? আমি কি ভুল করেছি?’
নয়নতারা শান্ত স্বরে জবাব দিলো, ‘না, অপরাধ করেছেন।’
‘কিসের অপরাধ? কিসব বলছ নয়ন!’
নয়নতারা হাসল, সে হাসিটা এবার বিষাক্ত, ‘আরে মজা করছিলাম বাবা। আপনি যা করেছেন একদম ভালো করেছেন। মন চেয়েছে বিয়ে করেছেন, মন চাইলো না ছুঁড়ে ফেলছেন—এটাই তো উচিত। মেয়ে মানুষ শুধুই দেহের পোশাক। এই যেমন আমাদের কথাই ধরেন না। টাকার কেনা গোলাম হয়ে গেছি। যেভাবে চায় সেভাবেই দিতে হবে। নয়তো কি শারিরীক অত্যাচার! আমরা ব্যথা পাই কি না পাই, কেউ জিজ্ঞেস করে? করে না… আমরা নারীরা মানুষ নাকি? মানুষ তো পুরুষ লোকেরা। মানুষ তো এই সমাজে কেবল আপনারাই…’
নয়নতারার চোখ দুটো জ্বলছে। এতক্ষণের চাপা ক্ষোভ এবার কথা হয়ে বেরিয়ে আসছে।
‘আমরা তো যন্ত্র, শিশির সাহেব। যে যন্ত্রকে যখন ইচ্ছে ব্যবহার করবেন, আর যখন ইচ্ছে আবর্জনার মতো ফেলে দেবেন। আপনি না কী যেন বললেন? আপনার স্ত্রী আপনাকে জিজ্ঞেস করেনি যে আপনি বাবা হতে চান কিনা? আহা রে! আপনার কত কষ্ট! একবারও কি ভেবে দেখেছেন, আপনার মতো কত পুরুষ আমাদের এইখানে এসে গর্ভপাত ঘটাতে বাধ্য করে? আমাদের শরীর আর জীবন নিয়ে যখন খেলা চলে, তখন আমাদের মতামত লাগে? লাগে না! আপনার মতো ভদ্রলোকদের কাছে আমরা তো কেবল মাংসের টুকরো। আপনি অনুতাপ করবেন কেন? আপনি তো পুরুষ! আপনি তো সব করতে পারেন!’
নয়নতারা হাসল। এই হাসিটা সবচেয়ে ভয়ংকর, যেন সে তার সমস্ত রাগ আর তিক্ততা সেই হাসিতে ঢেলে দিচ্ছে।
‘আপনার মতো পুরুষদের হাতেই আমরা পতিতার খাতায় নাম লেখাই। অথচ দোষ কেবল আমাদের, ভার কেবল আমাদেরই….আপনাদের কি? কিচ্ছু না!’
শিশির হতভম্ব হয়ে গেল। নয়নতারা এমন ব্যবহার করছে কেন? আর এসব কিইবা বলছে একা একা পাগলের মতো?
নয়নতারার চোখে আগুনের লেলিহান শিখা। শিশিরের কথাগুলো তার মাথায় প্রতিধ্বনির মতো বাজছে। এত নির্লিপ্ত, এত ঠাণ্ডা… যেন কোনো অপরাধই করেনি! সেই মুহূর্তেই নয়নতারার বুকের ভেতর থেকে উঠে এলো বহুদিনের চাপা দুঃখ, তীব্র অপমান আর বঞ্চনার কাহিনি- যার শুরুটা ঠিক এ রকমই একজন পুরুষের হাত ধরে।
নয়নতারার তো ইচ্ছে ছিল না এই জগতে আসার। সে দায়ে পড়েছিল। জীবন তাকে কোণঠাসা করে দিয়েছিল।
সেই সুযোগেই ঘুর্ণিঝড়ের মতো ঢুকে পড়েছিল আরেকজন পুরুষ- শিশিরের মতোই মায়াবী মুখোশ পরা, কথায়-কথায় ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দেয়া, ‘তুই ছাড়া কেউ নেই আমার..’ – এমন সব মিষ্টি বিষে ভরা কথা। নয়নতারা সরল, ভরসার খোঁজে থাকা এক মেয়ে, বিশ্বাস করেছিল। ভেবেছিল, তার জন্য কেউ আছে। তাকে বাঁচাবে, ঘর দেবে।
কিন্তু একদিন হঠাৎই সেই মানুষ তাকে ‘ভালোবাসার ভবিষ্যৎ দেখাবে’ বলে নিয়ে এসেছিল শহরের এই অভিশপ্ত অন্ধকার কোণে। তারপর? দরজা বন্ধ হলো।
হাসি বদলে গেল চাহনিতে। আর নয়নতারা বুঝে উঠতেই পারল না, কবে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হলো। তারপর শুরু হলো আসল নরকজীবন।
প্রতি রাতে মানুষ আসতো, ভালো জায়গা থেকে, ভালো চেহারা নিয়ে, পরিচ্ছন্ন পোশাক, দামি ফোন, ভদ্রলোক সেজে। নয়নতারাকে ব্যবহারের সময় তারা নিজেদের স্ত্রীর ফোনও ধরত। মিষ্টি ভাষায় বলত,
‘হ্যাঁ সোনা, টেনশন নিও না।’
‘তুমি খেয়ে নাও জান, আমার বাসায় ফিরতে একটু দেড়ি হবে। জরুরি মিটিংয়ে আছি।’
কথাগুলো বলার সময় নয়নতারা তাদেরই দেহের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে.. কি নোংরা,কি বিচ্ছিরি সেই ভালোবাসা প্রতারণা…নয়নতারার বমি পেতো। সেই সঙ্গে চোখে ভরে উঠত জল- নারীরা এত বোকা হয় কেন? কেন একজনকে ভালোবেসে নিজের পৃথিবী বানিয়ে নেয়? সেই পৃথিবী যখন আ গু ন ছড়িয়ে খান খান হয়ে পড়ে, তখন তো যাওয়ার কোনো জায়গাটাও থাকে না। তবু নারীরা তার পুরুষকে ভালোবাসে, ভালোবেসেই পথ চলে… এগিয়ে যেতে থাকে জীবনে… আর কিছু পুরুষেরা?
নয়নতারার বুকের ভিতর একটা চাপ সৃষ্টি হতো। এই বিরোধ, এই দ্বিচারিতাই দিন দিন তার ভেতরের র ক্ত আরও ফুটিয়ে তুলেছিল। নয়নতারার মন জ্বলে যেত…
কেন নারী এত সহজে প্রতারিত হয়? কেন নারীকে এত সস্তা মনে করা হয়? কেন নারী শুধু ভোগের বস্তু হয়ে থাকে?
তার চারপাশের অন্ধকার তাকে ধীরে ধীরে অন্য মানুষে রূপ দিচ্ছিল।
আজ শিশিরের মুখের কথা থেকে যখন সে বুঝল,
নারীর কোনো দাম নেই, তারা শুধুই ব্যবহারযোগ্য,
তখন তার মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল। কোথাও না কোথাও এই মানুষটিকেও সে বিশ্বাস করেছিল হয়তো! তার অতীতের সব পুরুষ, সব প্রতারণা, সব রাত, সব লজ্জা, সব যন্ত্রণার স্মৃতি একসাথে আছড়ে পড়ল।
নারীজাত এতই সস্তা? এতই অবহেলার?
এতই ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার জিনিস?
নয়নতারার পুরো অস্তিত্ব যেন বিদ্রোহ হয়ে ফেটে পড়ছে কিন্তু তবু সে শান্ত, থরথর করে জ্বলতে থাকা আ গু ন পর্যবসিত করছে শব্দে, কারণ তার ক্ষোভের ভাষা আছে, তীব্রতা আছে, এবং তীরের মতো ধার আছে। খুব দ্রুতই নয়নতারা একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
শিশির হতচকিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হয়েছে তোমার? এমন আচরণ করছ কেন?’
নয়নতারার চোখ দুটো তখন পুরো শান্ত, অস্বাভাবিক শান্ত। যেন কোনো আগুনকে বরফের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সে ঠাণ্ডা স্বরে বলল, ‘কিছু হয়নি। আপনি বলুন, খাবার কখন খাবেন?’
শিশির একটু থমকালো।
তার ক্ষুধা আছে, তাও সে স্বীকার করল।
কিন্তু তার চেয়েও জরুরি তার নিজের প্রশ্নের উত্তর জানা!
তাই বলল, ‘তার আগে উত্তর দাও নয়ন… তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে না?’
নয়নতারা মাথা তুলল, চোখে সেই পরিচিত রহস্যমাখা অন্ধকার।
‘কাল সকালেই জেনে যাবেন।’ মুহূর্তটা থেমে গেল যেন। শিশির আর কিছু বলল না।
নয়নতারাই উঠে গেল। খাবার অর্ডার করে এনে তার সামনে সাজিয়ে দিলো। দু’জন একসঙ্গে খেতে বসল নিঃশব্দে। চামচের শব্দ, থালার চাপ, দু’জনের দম শ্বাস সবই যেন ভাসমান, ভারী।
খাওয়া শেষে নয়নতারা নিজেই বাতিটা নিভিয়ে দিল।
অন্ধকার ঘর তাদের শরীর ছুঁয়ে নিল।
এবং সেই অন্ধকারেই আজ নয়নতারা নিজেই হাত বাড়াল।
শিশির অনুভব করল, নয়নতারার টানটা আজ অন্যরকম। প্রবল, বেপরোয়া, মরিয়া।
সে তাকে কাছে টেনে নিল, প্রায় ছুঁড়ে ফেলে দিল নিজের শরীরে।
নয়নতারা তার কাঁধে দাঁত বসাল, বুকের কাছে তীব্র আঁচড়, পিঠে নখের গভীর দাগ- ব্যথায় শিশির কুঁকড়ে উঠলেও বুঝতে দিলো না কিছুই।
শিশির ভাবছে নারীর আনন্দের উন্মাদনা। কিন্তু নয়নতারা জানে— এ যে আনন্দ নয়, এ প্রতিশোধের অগ্নিপরীক্ষা। তার গ্লানি, তার ক্ষোভ, তার নির্যাতিত রাতগুলো- আজ যেন তার নখের ডগায় উঠে এসেছে।
শিশির কিছুই বোঝেনি। একদমই না।
মিলনের শেষে শিশির হাপাতে হাপাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুম তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিল। গভীর, নিশ্চিন্ত, নির্বিকার এক ঘুম।
আর নয়নতারা? তার ঘুম এলো না। চোখের কোলে এক অদ্ভুত জ্বালা নিয়ে সে ধীরে ধীরে বিছানা ছাড়ল।
খালি পায়ে দরজা খুলে উপরে ছাদে উঠে গেল।
রাত তখন ভারী। চাঁদ নেই। হাওয়ার মধ্যে কাঁপুনি আছে।
মৃদু মন্দ বাতাস তার চুল উড়িয়ে দিলো। এক মুহূর্তে পুরো শরীর শিউরে উঠল। তার হৃদয়টা যেন হঠাৎই ভেঙে গেল ভেতরে ভেতরে। নয়নতারা ফেটে পড়ল বুন ভাঙা কান্নায়। বহুদিনের জমা ব্যথা, অপমান, গ্লানি
আজ আর তাকে ধরে রাখতে পারল না।
ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে নয়নতারা। চোখ দুটো ভিজে যাচ্ছে বারবার। মুখটা উপরের দিকে তুলে সে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিল, মনে হলো বুকের সব ভার যেন এক মুহূর্তে বেরিয়ে আসবে।
তারপর নিজের মনকেই জিজ্ঞেস করল,
‘আচ্ছা, কেন এমন করি আমি?
কেন এই মন একটা মাত্র পুরুষকে দেখলেই পাগলের মতো ছুটে যায়? কেন এত উতলা হই? এত বোকা হই?
আমি কেন এমন?’
তার গলা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
দুটি হাত নিজের কপালে রেখে চোখ বন্ধ করে বলতেই লাগল,
‘ভালোবাসা তো সুন্দর হওয়ার কথা…
তাহলে আমাদের জন্যই কেন তা শাস্তি হয়ে যায়?
আমাদেরকেই কেন নির্বাসন পেতে হয়?
একটা পুরুষকে ভালোবেসে কেন নারীর পুরো জীবনটাই শেষ হয়ে যায়?’
হাওয়া একটু জোরে বয়ে গেল। ওড়নার আঁচল উড়ে গেল চোখের কাছাকাছি। হয়তো প্রকৃতি তার চোখের জল শুষে নিতে চাইছে, কিন্তু তার কষ্টটা যে গভীর সমুদ্রের সমান- যত নামবে ততই গভীরতা! নেই কোনো পাড়, নেই কিনারা!
‘সব দোষ কেন শুধু আমাদের?
সব ভার আমাদের কাঁধেই কেন?
ওদের কেন কিছু হয় না কখনো?
কেন পুরুষেরা এত শক্তিশালী?
কিসের শক্তি? কিসের দম্ভ?’
তার গলা ধরে এল।
স্পষ্ট কথা উচ্চারণও কঠিন হয়ে পড়ল।
‘আমরা এত ভঙ্গুর কেন?
ভালোবাসার ব্যথা আমাদেরই ভেতর থেকে ছিঁড়ে নেয়,
ওদের কেন ছোঁয় না সে ব্যথা?
ওদের চোখ কেন শুকনো থাকে সবসময়?
কেন… কেন… কেন!’
শেষ শব্দটা বলেই সে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল ছাদের মেঝেতে। মুখ দু’হাতে ঢেকে কেঁদে উঠল শিশুর মতো।
কান্নার সেই শব্দ রাতের নীরবতায় ভেসে বেড়াতে লাগল। দুর্বল নয়নতারা আজ নিজের জন্য কাঁদছে না, বরং শত নারীর দুঃখ, ব্যথা, হাজার বছরের গ্লানি নিয়ে কাঁদছে আজ।
রাত তাকে জড়িয়ে ধরল নিঃশব্দে। কিন্তু নয়নতারাকে মুক্তি দিল না, তার নিজের প্রশ্নগুলোই তাকে তাড়া করে ফিরল বারবার।
সকাল হয়ে গেছে। রূপালী হোটেলের জানালার কাঁচ চিরে প্রথম আলো এসে পড়েছে ঘোলাটে করিডোরে। বাইরের জগতে গাড়ির শব্দ, ফেরিওয়ালার হাঁকডাক, সব স্বাভাবিক। কিন্তু দোতলার তিন নম্বর ঘরটা তখনও গভীর নীরবতায় মোড়া।
ম্যানেজার সবুজ কাউন্টারে বসে ছিল বটে, কিন্তু তার চোখ বারবার তিন নম্বর ঘরের দিকে যাচ্ছিল। কাল রাত থেকেই লোকটা আর বের হয়নি। প্রথমে একবার এসে ডেকেছিল, নাশতা লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করতে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। ভাবল, হয়তো গভীর ঘুমে আছে। কিন্তু সকাল গড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ শিশির সাহেব বা নয়নতারা- কেউই ঘরের বাইরে এলো না।
সবুজের বিরক্ত লাগছে। দু’দিন ধরে একটানা একই ঘরে আস্তানা গেড়েছে লোকটা, আবার সকালে এতো বেলা অবধি ঘুম!
বিরক্তিতে ফুঁসতে ফুঁসতে সে আরেকবার সিঁড়ি ভেঙে উপরে এলো। দরজায় এবার একটু জোরেই ধাক্কা দিল।
‘নয়নতারা! শিশির সাহেব! বেলা হয়ে গেল তো, ঘর ছাড়বেন না? আরে বাবা, কী হচ্ছে ভেতরে? ডেকেও সাড়া দিচ্ছেন না কেন?’
ডাকাডাকি বৃথা। ভেতরে কোনো সাড়াশব্দ নেই। যেন ঘরের ভেতরের বাতাসও জমাট বেঁধে গেছে। সবুজের মনে এবার একটা অস্বাভাবিক আশঙ্কা উঁকি দিল। এতো নীরবতা তো এই হোটেলের জন্য স্বাভাবিক নয়।
টাকা দিলেও, দু’দিন ধরে একটানা একই গেস্টের থাকা নিয়ে ইতিমধ্যেই তার মেজাজ খারাপ। এখন এই নীরবতা তাকে আরও অস্থির করে তুলল। সবুজ দেরি করল না। দ্রুত নিচে নেমে এক্সট্রা চাবিটা তুলে নিল।
হাত কাঁপতে কাঁপতে চাবি ঢুকিয়ে তালা খুলতেই একটা ঠান্ডা, গাঢ় গন্ধ সবুজের নাকে এলো। সেই গন্ধটা পারফিউমের নয়, অন্য কোনো কিছুর!
সবুজ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। হাত হাতড়ে বাতির সুইচ চেপে জ্বালাতেই থরথর করে কেঁপে উঠল গোটা শরীর। তার চোখ দুটো যেন কপালে উঠে গেল, একেবারেই চড়াকগাছ!
বিছানাটা এলোমেলো, ওলটানো চাদরটার বেশিরভাগ অংশ গাঢ় লাল রঙে রঞ্জিত! র ক্তে র সেই গাঢ়, ধাতব গন্ধটা এখন স্পষ্ট।
বিছানার ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছে শিশির। তার শরীরটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে বেঁকে আছে। চোখ দুটো বোঁজা আর নয়নতারা নেই! ঘরটা শূন্য!
সবুজ ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল, কিন্তু কোনোমতে সাহস জুগিয়ে সে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল আবারও।
কাঁপা কাঁপা হাতে শিশিরের কাছে এগিয়ে গেল সে। শিশিরের শরীরে তখনো প্রাণের কোনো চিহ্ন বোঝা যাচ্ছে না- মরে গেছে নাকি শুধু অজ্ঞান, তা বলা কঠিন। কিন্তু এরপরের দৃশ্যটা আরও ভয়াবহ!
শিশিরের প্যান্ট খোলা। তার শরীরের সেই গোপন অংশটা উন্মুক্ত। শিশিরের অণ্ডকোষ কেউ কেটে নিয়েছে! সেই জায়গা থেকেই টাটকা রক্ত ভেসে বিছানার সাদা চাদরকে বিভীষিকাময় লাল করে তুলেছে। শিশিরের যৌবনের অহংকার, তার নারীজাতির ওপর ছড়ি ঘোরানোর প্রতীক- সব যেন নির্মমভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
সবুজ আর সেখানে দাঁড়াল না। বমি আসতে লাগল তার। দরজার চৌকাঠ ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে সে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করল। তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা, নয়নতারা গেল কোথায়?
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২০
অন্ধকার জগতের এই খেলায় এমন ভয়াবহ পরিণতি সে এর আগে দেখেনি। কাঁপতে কাঁপতে কাউন্টারে ফিরেই সে দেরি না করে ফোন তুলে নিল।
‘পুলিশ! পুলিশ কল করেন! জলদি… আমার হোটেলে, তিন নম্বর রুমে…’ আর্তনাদের স্বরে আওড়ালো সবুজ।
