Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৩

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৩

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৩
মৃধা মৌনি

রুদ্রাণীতে যুক্ত হওয়া সবাইকে দীক্ষা মজুমদার তার আন্তরিক ভালোবাসা জানাল।
শুভ সকাল।
মোবাইলের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আজকের পোস্টটা লেখার সময় তার চোখেমুখে ছিল নরম অথচ দৃঢ় এক আলো। জীবনের এই মুহূর্ত, মাতৃত্বের প্রথম স্পর্শ আর একদম নতুন করে শুরু করা ব্যবসার চ্যালেঞ্জ- দুটোই যেন তাকে একই সাথে ভয়ও দেখাচ্ছে, আবার শক্তিও দিচ্ছে।
‘আমি ভালো আছি আপনাদের দোয়ায়। আমার গর্ভের সন্তানটাও ভালো আছে। আমরা অনলাইনে যাত্রা এখনো শুরু না করলেও অফলাইনে কাজ চলছে। খুব শীঘ্রই আপনাদের সামনে কিছু নিয়ে আসবো। তবে তার আগে জানতে চাই, আপনারা কোন জিনিসটার অপেক্ষায় আছেন? কোনটা আগে আনলে ভালো হবে বলে মনে করেন?’

একটু থেমে দীক্ষা স্ক্রিনে নিজের ডিজাইনগুলো দেখে নিলো।
ওয়ান পিস… টু পিস… ফতুয়া…
ওর শেখা আঁকাআঁকির খুঁটিনাটি থেকে তৈরি করা নরম লাইন, ফুলেল নকশা আর রঙের নীরব খেলা, সবকিছুই যেন নতুন স্বপ্নের প্রথম বীজ।
‘শাড়ি আর থ্রিপিসের কাজ সময়সাপেক্ষ। তাই ভাবছি একটু ছোট থেকেই শুরু করি। আপনাদের পরামর্শ চাই।’
শেষে নিজের নাম লিখে পোস্টটা আপলোড করে দিল।
মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশো লাইক জমে গেল।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কমেন্টগুলো দেখে দেখে তার বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠল সবাই উৎসাহ দিচ্ছে, শুভকামনা জানাচ্ছে।প্রথমবারের মতো সে অনুভব করল, সে একা নয়। তার পাশে আছে লক্ষ নারীর ছায়া।
দীক্ষা ফোন লক করে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। তার এখনো বহু পথ বাকি। স্বপ্নের নৌকা এখনও জলে নামেনি। কিন্তু হাতের মুঠোয় থাকা এই সমর্থন তাকে পথ দেখাচ্ছে, সাহস দিচ্ছে।
তারপর সে নিজের ছোট্ট ওয়ার্কটেবিলে বসে গেল।
সাদা কাগজ, টুকটুকে রঙপেন্সিল আর একগুচ্ছ অনামা স্বপ্ন, দীক্ষা আবার আঁকতে শুরু করল…
যা একদিন তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।

এদিকে,
তৃণার নতুন জীবনের সূর্য উঠেছে ঠিকই, কিন্তু তার আলো তৃণার কাছে তেমন উজ্জ্বল নয়।
অরুণিমাভ চৌধুরী সকাল সকাল কাজের জন্য বেরিয়ে গেছে। বিশাল অট্টালিকার দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ যেন তৃণার বুকের ভেতর আরেকটা শূন্যতা তৈরি করল।
আজ তার প্রথম অফিসিয়াল দিন। দুই ছেলেকে সামলানো- আরহাম আর আয়ান।
ডাইনিং রুমটা নিঃশব্দে থরথর করছে। বিলাসিতায় তৈরি জায়গাটা যেন এক সোনালী খাঁচা। দৃশ্যত মুক্ত মনে হলেও বাস্তবে বন্দী।

বড় ডাইনিং টেবিলে দুই ভাই রাজা-মহারাজার ভঙ্গিতে বসে আছে। বিশাল ঘরে তাদের গলার আওয়াজ সামান্যই, কিন্তু হাবভঙ্গির ঔদ্ধত্য যেন দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসছে।
তৃণা ধীরে এগিয়ে গেল। হৃদপিণ্ড ধুকপুক করছে তার, তবু মুখে টেনেটুনে হাসি ধরে রাখল।
‘তোমাদের নাম কী বাবুরা?’
আরহাম, প্রায় দশ-এগারো বছরের মতো বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটা, তৃণার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সে কোনো অদ্ভুত প্রাণী দেখছে। কোনো উত্তর দিল না।
বরং আয়ানকে ইংরেজিতে বলল,
‘Look at her accent, Ayaan. So rustic!’
আয়ান খিলখিল করে হাসল।
হাত তুলে তৃণার ওড়নার দিকে ইশারা করে বলল,
‘She looks like a maid, Brother! Is she new?’
তৃণার কান লাল হয়ে উঠল। শব্দগুলোর মানে তার কাছে অপরিচিত নয়। অবজ্ঞা, বিদ্রূপ, ছোট করে দেখা- সবই সে বুঝল।

কিন্তু প্রতিউত্তর দেওয়ার মতো সম্পর্ক এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই সে শান্ত স্বরেই বলল,
‘আমি তোমাদের দেখাশোনা করার জন্য এসেছি। এখন পড়াশোনার সময়। তোমরা কি এখানেই পড়বে না ঘরের টেবিলে বসবে?’
আরহাম চোখ ঘুরিয়ে ঠান্ডাভাবে বলল, ‘Really? Who gave you the authority? আমাদের রুটিন আমরা জানি। You are just the caretaker.’
‘কেয়ারটেকার’ শব্দটা তৃণার বুকে বিঁধে গেল।
জীবনের কত অপমানই সে সহ্য করেছে, কিন্তু এভাবে একজন শিশুর কাছেও তাকে অপমানিত হতে হবে! কোনোদিন কি কল্পনাতেও ভেবেছিল তা? তৃণার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।

সে আয়ানের দিকে তাকালো।
ছেলেটা তার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে ভেংচি কাটছে।
‘আয়ান, বড়দের সঙ্গে এমন আচরণ করে না। এটাকে ম্যানার্স বলে না।’
তৃণা এবার একটু কঠোরই হলো।
আয়ান আরও বেয়াড়া হয়ে উঠল তাতে।
সে টেবিল থেকে উঠে একদম তৃণার সামনে এসে দাঁড়াল।
‘I will do what I want! You are not my mom!’
তৃণা গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে বলল,

‘মা না হলেও… তোমাদের দেখাশোনার দায়িত্ব যখন আমাকে দেওয়া হয়েছে তখন তোমাদের আদব-কায়দা, আচার-ব্যবহার শেখানোটাও আমার দায়িত্বের ভেতরে পড়ে।’
গম্ভীর হয়ে উঠল তৃণা, চোখেমুখে কঠোরতা ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘তুমি এখনই টেবিলে বসো।’
কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই ছটফটে আয়ান ঠোঁট উল্টে সরাসরি থুতু ছুঁড়ে মারল তৃণার মুখে।
ঘরের বাতাস স্থির হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। এক সেকেন্ড তৃণা কিছুই বুঝতে পারল না। তারপরই দপ করে জ্বলে উঠল মগজের ভেতরটা।

এত বয়সে প্রথম এমন অপমান। তাও কিনা হাঁটুর বয়সী একটা ছেলের কাছে.. কি বেয়াদব, কি অসভ্য! রাগে গা জ্বলে গেল তৃণার। মেজাজ হারিয়ে চড় দিয়ে বসল হঠাৎ করেই…
একটা থাপ্পড় পড়ে গেল আয়ানের গালে।
‘অসভ্য ছেলে!’ দাঁত কিড়মিড় করে তৃণা বলল, ‘মা টা তো এই জন্যে মরে গেছে। বেঁচে থেকে এসব বেয়াড়াপনা দেখত নাকি!’

শব্দগুলো বেরিয়ে আসার সাথে সাথেই তৃণার বুক ধক করে উঠল। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
আয়ানের ভাসা ভাসা চোখজোড়ায় চিকচিক করে ওঠে নোনাজল। এই ছেলেটাও কম জেদি না। একটা কাজের মেয়ে তার গালে চড় মেরেছে! আয়ান চৌধুরীর গালে… আয়ান এক মুহূর্ত দেড়ি করল না। কামড় বসিয়ে দিলো তৃণার হাতে। ওর পাতলা,তীক্ষ্ণ দাঁত ভেদ করে ঢুকে পড়ল চামড়ার ভেতরে।
তৃণার চামড়ায় ব্যথার বিদ্যুৎ ছুটে গেল।
‘আহ্!’ চিৎকার বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে।
রক্তের ধাতব গন্ধ ভেসে উঠল।
হাতের ওপর আঁচড়ের মতো দাঁতের দাগ ফুটে উঠছে।
এতক্ষণ মজা দেখছিল আরহাম। এবার সে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
‘You bitch! সাহস কত বড় তোমার!’

সে চিৎকার করে উঠল, ‘আমার ভাইকে মারো? আজ পাপা আসুক… দেখি তোমাকে!’
তৃণা তার হাত চেপে ধরে মুখ নামিয়ে দ্রুত রুম ছাড়লো। তার মুখে এখনো থুতুর দাগ। হাতে কামড়ের দগদগে যন্ত্রণা। মনে এক অপমানের ধাক্কা।
গতকাল পর্যন্ত সে ভাবত, পালিয়ে এসে বাঁচলো।
শিশিরের মারধর, অপমান, অনিশ্চিত জীবন- সব থেকে মুক্তি পেল।
কিন্তু আজ? আজ আবার একটি শিশুর হাতে অপমানিত হলো সে। একটি শিশুর কামড়ে র ক্ত ঝরছে… আরেকটি শিশুর গালমন্দে তার হৃদয় র ক্তা ক্ত।
নতুন জীবন, নতুন আশ্রয়, সবটাই হঠাৎ করে ধাঁধায় পরিণত হলো।
তৃণা বুঝে গেল, এই বাড়িটাও তাকে সহজে গ্রহণ করবে না। এখানে তার প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত হবে একেকটা পরীক্ষা।

সন্ধ্যা নেমেছে। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকাদের সম্মিলিত ডাক। বকুল সেই তখন থেকে অস্থির অস্থির করছে, বারবার ঘরের ভেতরে আসে-যায়। আজ শান্তর আসার কথা। সেই আশাতেই সে নিজেকে যত্ন করে গুছিয়েছে। যা কোনোদিন করেনি, তাই করেছে। নতুন ভাঁজভাঙা হালকা গোলাপী রংয়ের থ্রিপিস বের করে পড়েছে। চুলগুলো বেনী গেঁথে মাথায় ওড়না টেনেছে। চোখের নিচে একটু কাজল লাগিয়েছিল, তারপর মনে হলো ভালো লাগছে না, তাই কাপড় দিয়ে ঘষে তুলতে গিয়ে লেপ্টে গেল চোখের নিচে। পানি দিয়েও উঠল না। বকুলের মনটাই খারাপ হলো তাই দেখে।
কোনো লুকোচুরি নয় আর। আজ শান্তকে তার মনের সব কথা সে খুলে বলবে। ভালোবাসার প্রথম স্বীকারোক্তি, যা এতদিন কেবল তার বুকের গভীরে জমা ছিল বছর বছর ধরে। তার অস্থিরতা টের পেল বাড়ির সকলেই। রান্নাঘরের থালাবাসন হাত থেকে একটু পর পর ছুটে পড়ছে। তাই দেখে খালেদা বেগম অবাক গলায় বললেন, ‘এই মেয়ে, কি হইছে তোর? শরীর খারাপ?’

‘না ফুপু।’ লজ্জায় প্রায় দৌড়ে পালিয়েছিল বকুল। এই
মন উচাটনের খবর সে কাউকে জানাবে কেমন করে?
ঠিক সাতটা বাজতেই গেটে কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
বকুল বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছুটে গেল। তার হৃৎপিণ্ড ততক্ষণে গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে। গেট খুলে সামনে শান্তকে দেখেই বকুলের সমস্ত শরীর হিম হয়ে গেল। লোকটা একদম সময়মতো এসেছে!
শান্ত গেট পেরিয়ে ভেতরে এলো। পরনে পরিষ্কার শার্ট, হাতা কনুই অবধি গোটানো, এই শীতেও মানুষটার গায়ে আলগা কোনো সোয়েটার নেই। চোখে একটা নতুন ধরনের উজ্জ্বলতা। সে বকুলের দিকে তাকাল, কিন্তু তার দৃষ্টিতে সেই অভিমান বা হাসি কোনোটাই নেই। বরং একটা গম্ভীর, গুরুত্বপূর্ণ কথার আভাস।

‘শান্ত ভাই! আসুন, আসুন।’ বকুলের কণ্ঠস্বর কাঁপছে, তবে সে চেষ্টা করল স্বাভাবিক থাকার।
শান্ত ভেতরে ঢুকল, কিন্তু বকুলের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিলো না। তার চোখ শুধু ভেতরের ঘরের দিকে।
‘দীক্ষা আপা ভেতরে আছে?’ শান্তর প্রশ্নটা সরল, কিন্তু বকুলের কানে সেটা যেন বারুদের মতো ফাটল।
বকুল অবাক হলো, ‘হ্যাঁ… আছে। কেন?’
‘তাকে আমার দরকার। বিশেষ দরকার।’
‘বিশেষ দরকার মানে?’
‘আহ! বিরক্ত করিস না। জরুরি দরকার এই যা। একটা কথা আছে…’
বকুলের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল ঘাম ফোঁটা ছুটে গেল, ‘ক…কি কথা?’
কণ্ঠস্বর এবার অস্বাভাবিক হারে কাঁপছে। চেয়েও গোপন করতে পারছে না হৃদয়ের দুর্বলতা।
শান্ত অবাক হলো। একই সঙ্গে ভ্রু কুঁচকালো, ‘তা তোকে জানাতে হবে?’

বকুল চোখ সরালো, তার চোখ ভার ভার লাগছে। নিশ্চয়ই অবাধ্য পানিরা এসে জড়ো হয়েছে। সেই পানি আর কেউ দেখুক না দেখুক, এই মানুষটা না দেখুক। এই মানুষটার সেই অধিকারই নেই। ইনি তো বকুলের কেউ নন…
‘কিছু কথা অনেকদিন ধরে গোছাচ্ছি বুঝছিস? আজকে উনাকে বলতে চাই। আল্লাহই জানে, শোনার পর কি রিয়েকশন দেয়, তবে আশা করি ভালোই দেবে। এই, আমাকে ফিটফাট লাগছে তো? না মানে উনার সামনে দাঁড়াতেও একটা যোগ্যতা লাগে। সেটুকু তো আছে নাকি? কিরে ওদিক চেয়ে আছিস কেন? এদিক তাকা… এই বকুল।’
বকুল নিচু হলো। বাহানা করল কিছু একটা পড়ে গেছে গা থেকে, চট করে মুছে নিলো চোখজোড়া। মুখ তুলে সামান্য হাসল। মলিন হাসি- ধরা গলায় আওড়াল, ‘দারুণ লাগছে। একদম যোগ্য!’

‘সত্যি বলছিস?’ ঝলমলে শোনালো শান্তর কণ্ঠস্বর।
‘একদম… তিন সত্যি!’
‘যা দোয়া করে দেই, তোরে আল্লাহ ভালো কিছু দেক। এই শোন, কি চাস আমার কাছে? যা চাইবি দিবো। সত্যি বলতেছি।’
‘চাইবো? কি চাইবো আপনার কাছে?’ বকুল শুধালো।
‘যা খুশি।’ শান্তর জবাব।
‘যা চাইবো তা কি আপনি আদৌও দিতে পারবেন শান্ত ভাই?’
শান্ত থতমত খেয়ে গেল, ‘ক্যান, অনেক দামী নাকি?’
‘অনেক দামী… অন্নেএএএএক দামী… আপনার সাধ্য কই?’
বকুল আবারও মুখ ফিরিয়ে নিলো। বারবার চোখ ভরে উঠছে তার। সেই সঙ্গে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে বুকের ঠিক মধ্যিখানটায়।
কোনোমতে বলল, ‘যান,ভেতরে যান,আপা আছে।’

‘তুই কোথায় যাস?’
‘জাহান্নামে… আপনার ব্যাপার না।’
বকুল দ্রুত গতিতে পা চালিয়ে প্রায় দৌড়ে পালালো। আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালে বুঝি চোখ উপচে টপটপ করতে পড়ত নোনাবৃষ্টির ধারা। এই দুঃখ, এই কষ্ট, কেবল তার একার… এখানে শান্তর কোনো ঠাঁই নেই। এক চুল পরিমাণ ও নয়।
ওর যাওয়ার দিকে অবাক দৃষ্টি জোড়া মেলে তাকিয়ে রইল শান্ত, ভ্যাবদার মতো। ঠোঁট ভেঙে অজান্তেই আওড়ালো, ‘আজব তো…’
তারপর নিজেও রওনা হলো কাঙ্ক্ষিত ঘরটির দিকে। বুকের ভেতর যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে কেউ। আচ্ছা সে কি বলবে নাকি সব শুনে দীক্ষার কাছে একটা হাসির পাত্র হয়ে উঠবে? মেয়ে মানুষের মন তো, বোঝা যায় না! তারা ভাবে সব আবেগ শুধু মেয়েদেরই দখলে, ছেলেদের ভেতর কিছু নেই।

শীতের বাতাস জানালার শার্সিতে ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছে অবিরাম। ঘড়িতে সময় প্রায় সাতটা ত্রিশ। দীক্ষা তার ঘরের আরামদায়ক খাটে হেলান দিয়ে বসে, হাতে ফোন। যদিও তার চোখে ফোনের স্ক্রিন, কিন্তু মনটা তখনো দূর আকাশের তারাদের হিসেব কষছে। এই মুহূর্তে সে কেবল তার অনাগত সন্তানের জন্যই একটা স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ কামনা করে।
দরজায় সামান্য টোকার শব্দ হতেই দীক্ষা চোখ তুলে তাকাল। দাঁড়িয়ে আছে শান্ত।
‘ভেতরে আসি?’
‘অনুমতি নিতে হয় নাকি!’
শান্ত সামান্য জড়তাভাবে ভেতরে ঢুকল। তার চোখ-মুখে একধরনের দ্বিধা, যেন সে এক বিশাল সত্য বলার ভার নিয়ে দাঁড়িয়েছে কোনো রানীর দরবারে…
দীক্ষা ফোন নামিয়ে রেখে হাসল।

‘তারপর, কি ব্যাপার, আপনি এলেন শেষমেশ! মান অভিমান ভাঙলো?’
লজ্জায় লাল হলো শান্তর নাকের পাটা, ‘এমন কিছু না।’
‘আমি কিন্তু সব বুঝি…’ দীক্ষা মিটমিট করে হাসছে। শান্তর ভীষণ ভালো লাগছে দেখতে। সে এগিয়ে এসে বসল দূরত্ব বজায় রেখে।
‘না, মানে… এমনিই এলাম। শরীর কেমন আছে আপনার? বেশি দুর্বল লাগছে না তো?’
‘দুর্বলতা তো একটু আছেই, তবে আমি সামলে নিচ্ছি। চিন্তা করবেন না।’
এরপর দু’জনের মধ্যে শুরু হলো কাজের কথা। শান্ত নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে এই ফাঁকে।
‘আমি ভাবছিলাম.. আমাদের কাজটা এবার শুরু করে দেওয়া দরকার। বেশি দেরি করা ঠিক হবে না। কী বলেন? প্রথমে আমরা থ্রিপিস দিয়ে শুরু করি? ওতেই ডিজাইনগুলো বেশি ফুটে উঠবে।’
দীক্ষা মাথা নাড়ল, ‘কাজ তো শুরু হয়ে গেছে অলরেডি তবে থ্রিপিস নয়, ওয়ান পিস, টু-পিস। এগুলো আগে ধরব।’

‘এগুলো আবার কি?’
‘শুধু জামাকে বলে ওয়ান পিস, পায়জামা সহ টু-পিস।’
‘ওহ।’
‘এগুলোতে খাটনি কম, থ্রিপিস বা শাড়ি তো বিশাল ব্যাপার। শুরুতেই এতবড় কিছু তৈরি করা, আমার ভয় করে। তাছাড়া পুঁজির ও একটা ব্যাপার আছে।’
‘হুম। তা ঠিক আছে।’
‘চিন্তা করবেন না। আমি আপনাদের উপর চাপ ফেলবো না।’
‘আরে না, না। এসব কি কথা! আমি সব সামলে নেব। আপনি শুধু ডিজাইনগুলো ধরিয়ে দিন। আমিই ওস্তাদকে বুঝিয়ে দেব।’

শান্ত কথা বলে যাচ্ছে অথচ তার হাত দুটো মুঠোর ভেতরে। সে নিজের অজান্তেই বারবার হাত মুঠো করছে, খুলছে যেন কোনো একটা কথা তার গলায় দলা পাকিয়ে আছে, যা কিছুতেই বাইরে আসছে না।
দীক্ষা শান্তকে দেখল নীরবে। এই ছেলেটা সবসময় একটা অস্থিরতার ভেতর দিয়েই থাকে। তবে আজকের এই তোলপাড় অন্যরকম, অন্যকিছুর ইংগিত। কিছু কি হয়েছে? দীক্ষার চোখ এড়ায় না।
দীক্ষা প্রসঙ্গ পালটে হঠাৎ বলে উঠল, ‘কিছু হয়েছে? আপনাকে এরকম দেখাচ্ছে কেন? কিছু বলতে চাচ্ছেন আমাকে? বলুন না…’

‘আসলে… আপনি কি ভাববেন, সেই ভয়েই…’ শান্ত মাথা নিচু করল। তারপর হঠাৎই দীক্ষার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো কটুক্তি নেই।
‘আমি কিছু মনে করব না। আপনি যা বলতে চান, বলুন, প্লিজ।’
তবু দোনোমোনো করল শান্ত। সত্যি বলবে নাকি বলবে না- এখনো ভেবে চলেছে সে।
‘কি হলো? এখনো দ্বিধায় ভুগছেন? বললাম তো নিশ্চিন্তে বলে ফেলুন, আমার অত মাইন্ড টাইন্ড নেই। বলুন..’
একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলে উঠল ছেলেটা,
‘আমি না… আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। কোনো কারণ ছাড়াই আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। আপনি যখন হাসেন, আমার হৃদয় জুড়িয়ে যায়। আপনার ভালো হোক, আপনি শান্তিতে থাকেন, আমি মন থেকে শুধু এটাই চাই।’
শান্ত এক মুহূর্ত থামল। তার চোখে আর্দ্রতা ফুটে উঠেছে।

‘আমি জানি, আপনার জীবনে এখন অনেক কষ্ট। আপনার… আপনার এখন একজন সঙ্গীর দরকার। আমি… আমি আপনার সঙ্গ দিতে চাই। আপনার পাশে থাকতে চাই। আপনি দয়া করে আপনার যত চিন্তা আছে, সব আপাতত ঝেড়ে ফেলুন। অনাগত অতিথির কথা ভাবুন। তার জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী তৈরি করার কথা ভাবুন।’
দীক্ষা চোখ বড় করে শান্তর কথাগুলো গিলছে। অবাক হয়েছে সে। বুকটা ধুকধুক করছে তার। তবে কি শান্ত তাকে…
না না, এ হতে পারে না, হওয়া উচিত না, দীক্ষার এই জীবনে আর কাউকে সে জীবনসঙ্গী হিসেবে চায় না। অন্তত শান্তকে নয়। শান্ত তারচেয়েও বয়সে ছোট এবং তাদের মধ্যকার সেই সামঞ্জস্যতা নেই যা একজন জীবনসঙ্গীর কাছে খুঁজবে দীক্ষা…

ইয়া রব, বাঁচান আমাকে, এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচান- মন যেন প্রার্থনা করে চলে।
কিন্তু শান্তর পরের কথাগুলো সেই সব আশঙ্কাকে এক লহমায় মুছে দিলো।
‘আমার না কোনো বড় বোন নাই, আপা। ছোট ভাইবোন থাকলেও বড় বোন থাকলে কেমন নির্ভরতা পাওয়া যায়… আমি সেটা কোনোদিন পাইনি। যখন প্রথম আপনার কষ্টগুলো দেখলাম, তখন কেন জানি মনে হইলো… আপনি যদি আমার বড় বোন হইতেন!”

শান্ত দৃঢ় গলায় শেষ করল পরের কথাগুলি, ‘আমি আপনাকে বড় বোনের জায়গাটায় আসন দিছি, দীক্ষা আপা। আমি আপনাকে কোনোদিন ছোট চোখে দেখি নাই। এই কথাগুলো আমি অনেকদিন ধরেই আপনাকে বলতে চাইছিলাম, কিন্তু সাহসে কুলায় নাই। আজ বলে ফেললাম। যাতে আপনিও… আমাকে আপনার ছোট ভাই হিসেবে গ্রহণ করেন।’
দীক্ষার চোখে এবার সত্যি সত্যি জল এলো। সেই জল আর কষ্টের নয়, নির্ভরতা আর ভালোবাসার। শিশিরের বিশ্বাসঘাতকতা, তৃণার তীব্র ঈর্ষার পরে এরকম মানুষের থেকে এমন নির্মল ভালোবাসা পাওয়াটা যেন স্বর্গের আশীর্বাদ। সে উঠে বসল। তার শরীর জুড়ে তখন এক অদ্ভুত আবেগ।

‘শান্ত ভাই…’
‘আপনি আমাকে আপনার ছোট ভাই হিসেবে মেনে নেন না প্লিজ। আমি কথা দিতেছি, আপনার কোনো অযত্ন আর অসম্মান এই শান্ত বেঁচে থাকতে হবে না। যে বা যারাই আপনাকে কষ্ট দিতে আসবে, সবটিরে একদম… আলুপেদানি দিয়া বাপের নাম ভুলাইয়া ছাড়বো। আর আপনি ওরে নিয়াও কোনো চিন্তা করবেন না বুঝছেন? আমি ওর আপন মামা আছি… ভাইবা রাখছি, ওরে মাদ্রাসায় দিবো। ছোট থেকে আল্লাহর কালামে বড় হবে। ভদ্র হবে। হাফেজ হতে পারলে তো আলহামদুলিল্লাহ। নাইলে মাদ্রাসায় কলেজ পাশ দিয়া ডাক্তারিতে দিয়া দিবো। বংশে একটা ডাক্তার থাকা ভালো তাই না আপা? বুড়া হইলে অল্প টাকায় চিকিৎসা পাওয়া যাবে। ডাক্তারি কইরা ও অনেক বড় হবে, তারপর খালি টাকাই টাকা.. আপনার আর কোনো দুঃখ থাকবে না… কষ্ট থাকবে না। মামা হিসেবে আমিও একটু আরাম করতে পারব বুঝেন নাই…’

দীক্ষা হাসছে। শব্দ করে হাসছে। ওর সেই হাসি যেন ঘরভর্তি উষ্ণ আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে টলমল চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু আজ সে সেগুলো মুছতে চাইল না। শান্ত এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখল, হাসির সঙ্গে চোখের পানির মিলনে মেয়েদের মুখে যে অদ্ভুত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, তা ভাষায় বোঝানো যায় না। তার মুখ থেকে অনায়াসেই বেরিয়ে এল, ‘মাশা আল্লাহ… আল্লাহ, আমার এই বোনটাকে সবসময় এমনই হাসিখুশি রেখো।’

দীক্ষার জীবনের সব শূন্যতা যেন ধীরে ধীরে পূর্ণ হতে শুরু করেছে। রাব্বুল আলামীন একে একে তার দুঃখগুলো সরিয়ে দিয়ে সুখের আলো ঢেলে দিচ্ছেন। সেই আলোতেই দীক্ষার মন নতুন করে বাঁচার শক্তি পাচ্ছে।
কিন্তু পৃথিবীটা সবসময় এমন সমান হয় না। দীক্ষা যেখানে ধীরে ধীরে জীবনের সুরভি পাচ্ছে, ঠিক তার উল্টো প্রান্তে শিশিরের নাভিশ্বাস উঠছে। তার শরীরের ওপর একটার পর একটা লাঠির আঘাত পড়ছে। প্রতিটা বারিতেই চোখের সামনে লাল, নীল, সবুজ, হলুদ- একেকটা রঙ আতশবাজির মতো ফেটে উঠছে। তবুও ওসি সাহেব একটু মানবিক। তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ‘উপরের দিকেই যত লাগে লাগুক, নিচের দিকে যেন আমগাছের পাতাও না পড়ে।’
অর্থাৎ মারধর হবে, তবে নিয়মমাফিক!

আহারে বেচারা! ডাক্তার সেলাই দিয়ে দিয়েছে, ব্যথায় মুখ বেঁকে আছে। দাঁড়াতে হয় দু’পা তিন হাত ফাঁক করে, যেন পদ্মাসনের এক বিপরীত সংস্করণ। একটু নড়াচড়া করলেই এমন চিৎকার দেয় যে থানার পাশে থাকা কাকেরাও থমকে তাকিয়ে থাকে।
পরবর্তী বারিটা আরও জোরে পড়ল। শিশির আর সইতে পারল না, ওর ইয়ে হয়ে গেল।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২২

গরম পানি পড়ল এক কনস্টেবলের পায়ের উপর, তিনি লাফ দিয়ে ছিটকে সরে দাঁড়াল। নাকমুখ কুঁচকে বলে উঠল, ‘শালার ওই দুইটা না কাইটা এইটা কাইটা নিয়া গেলে একদম ভালো হতো। শালারপুত, মুতার জায়গা পাস না।’
শিশির চোখ বন্ধ করে নিলো।
জীবনটা তার এমন নরকে পরিণত হলো কেন?

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৪