Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৮

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৮

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৮
ঐশী আফরিন

আরিয়ানের উপস্থিতি টের পেয়ে মাধবী সালাম দেয়।
” ওয়া আলাইকুম সালাম ”
” ভালো আছেন ?”
” তোর জন্য থাকতে পারছি ?”
মাধবী ভ্রু কুচকায়। এই লোকের সাথে ভালো ভাবে কথা বলা তার উচিত হয়নি। মাধবীর নিজের উপরই আফসোস হচ্ছে।

” কেন ? আমি কী আপনার ভালো থাকা আটকে রেখেছি নাকি ?”
” বেধে রেখেছিস ”
ঐ অপূর্বটার সাথে থেকেই নিশ্চয়ই এমন হয়েছে আরিয়ান। নয়তো এই লোকতো এমন নয়। এক বন্ধু যেমন আরেক বন্ধুতো এরকমই হবে। দরজার ওপাশে মাধবীর আওয়াজ না পেয়ে আরিয়ান বলে, ” তা ম্যাডামের হঠাৎ কী মনে করে আমাকে তলব করা?”
আরিয়ানের মুখে ম্যাডাম ডাকটা শুনে মাধবী কিছুক্ষন থম মেরে বসে রইল। তারপর নিজেকে ধাতস্ত করে রাজ্যের রাণী হিসেবে পেশাদারি কন্ঠে বললো,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

” আপনাকে একটা দায়িত্ব দেওয়ার জন্য ডাক হয়েছে। পূর্ববর্তী সেনাপতি আসাদ খুন হয়েছে এটা নিশ্চয়ই জানেন। বর্তমানে এখনও কাউকে সেনাপতি পদ দেওয়া হয়নি। আর এ পদের জন্য আপনাকে যথেষ্ট উপযুক্ত মনে করা হয়েছে। এবার আপনার মতামত কী?’
আরিয়ানও এবার সেভাবেই বললো, “প্রস্তাব গ্রহণে আমার কোন আপত্তি নেই। তবে আমার একটা শর্ত আছে ”
” পেশ করতে পারেন ”

” ঢাকায় আমি এমপি ইলেকশনে দাড়াবো। বাবার অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক বিষয়গুলো আমাকেই দেখতে হয়। কিছুদিনের মধ্যেই আমি ঢাকা ফিরে যাব। তাই এখানে সকল কাজে আমি উপস্থিত হতে পারবো না। তবে আমার পি.এ. অজয় শিকদার সম্পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে এ দায়িত্ব পালন করবে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলেও পরোক্ষভাবে আমার কথাতেই সব হবে। শুধু স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে পারবো না ”
মাধবী কিছুক্ষন ভাবলো তারপর বললো, ” শর্ত মেনে নেওয়া হচ্ছে। কাল রাজ্যে ঘোষনা করে দিন আপনি রাজ্যের সেনাপতি হচ্ছেন। কাল থেকে আপনি এই রাজ্যের সেনাপতি ”

” কেন কাল থেকে কেন আজ থেকে সমস্যা কোথায়?”
মাধবী আর ভালোভাবে কথা বলতে পারলো না। এতক্ষন যে বলেছে এটাই ঢের।
” আজ আপনি ভদ্র হওয়ার ক্লাস করে ভদ্র হয়ে যান। তারপর কাল থেকে সেনাপতিগিরি করিয়েন ”
” তা কে করাবে আমাকে ভদ্রতার ক্লাস ?”
” আহান ভাইয়া যথেষ্ট ভদ্র তার কাছ থেকে শিখুন”
আরিয়ানের এতক্ষণের হাসি মুখটা উধাও হয়ে যায়। চোয়াল শক্ত হয়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে ” তুই জানলি কি করে আহান ভদ্র?”

” মানুষের কথা বার্তাতেই বোঝা যায় কে ভদ্র ”
” তুই আহানের সাথে কথা বলেছিস?”
” আমি কিভাবে কথা বলবো? তার সাথে তো আমার কথা বলা নিষেধ ”
আরিয়ান এতক্ষন আটকে রাখা শ্বাসটা ছাড়ে ” আজীবনই তোর জন্য নিষিদ্ধ থাকবে কোন পুরুষের সাথে কথা বলা ”
বলেই আরিয়ান গটগট পায়ে চলে যায়। আরিয়ান চলে যেতেই মাধবী দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। কালো কাবলি পান্জাবি পরা আরিয়ানের পেছনটা শুধু দেখতে পায়।

মধ্যরাত। মাধবী সামনের রুমের সোফায় বসে পড়ছে। হঠাৎই দরজায় কেউ কড়া নারায় মাধবীর মনোযোগ নষ্ট হয়। এই সময় কে আসতে পারে মাধবী ভেবে পায় না। কারণ পুরো বাড়ি নিদ্রামগ্ন। মাধবী টেবিল থেকে উঠে দরজার সামনে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে “কে?”
” আমি। একটু ভেতরের রুমে যা মধু”
” কেন?”
” তোকে প্রশ্ন করতে বলিনি ভেতরে যেতে বলেছি ”

মাধবী দরজায় তাকায়। দরজা খোলাই। আরিয়ান চাইলেই ঢুকতে পারতো যেহেতু ঢোকেনি তাই মাধবী কিছুটা আশ্বস্ত হয়। হয়তো কোন কাজে এসেছে ভেবে সে ভেতরে চলে যায়। আরিয়ান ঢুকে একটা বড় ব্যাগ সোফার উপর রেখে আবার বেরিয়ে যায়। তারপর মাধবীকে ডাকে ” মধু! এবার আসতে পারিস”
মাধবী তার রুমের দরজা খুলে আগে উঁকি দিয়ে দেখে নেয়। কাউকে না দেখে বেরিয়ে আসে। সোফার উপর ইয়া বড় ব্যাগ দেখে অবাক হয়।

” এটাতে কী আরিয়ান ভাই?”
” খুলে দেখতে পারিস না? থাক এখন দেখা লাগবে না। এদিকে আয়”
মাধবী দরজার কাছে যায়।
” তোকে কিছু প্রশ্ন করবো। উত্তর দিবি ঠিক আছে?”
মাধবীর কপালে ভাঁজ পরে এত রাতে তাকে ডেকেছে প্রশ্ন করতে। বিরক্ত হয় মাধবী। তবুও বলে ” কেন আপনি কী পড়াশোনা করেন নি? নাকি সব খাবারের সাথে গুলে খেয়ে ফেলেছেন ?”

” আপাতত গুলে খেয়ে ফেলেছি। এখন আমার প্রশ্নের উত্তর দে ”
” বলুন ”
” বিয়ে করার সময় লোকে কী বলে ?”
” কী বলবে আবার আপনি জানেন না ?”
” প্রশ্নের পিঠে তোকে প্রশ্ন করতে বলেছি? জানিনা দেখেইতো তোকে জিজ্ঞেস করছি”
” এ বাবা তাহলে তো দেখি আপনি শুধু শুধু পৃথিবীর অক্সিজেন নষ্ট করছেন। আপনার তো বেঁচে থাকাই উচিত না ”
” কোনটা উচিত কোনটা অনুচিত আমি তোকে তা জিজ্ঞেস করিনি। আগে বল বিয়েতে কী বলতে হয়?”

” কবুল বলতে হয় ”
” কয়বার?”
” তিন বার বলতে হয় ”
” তিন বার কিভাবে বলতে হয়? শিখিয়ে দে তো ”
” কেন আপনি কি বিয়ে করবেন?”
” হ্যা। এখন কাজই কবুল বলতে বললে কীভাবে বলবো। বলে দে ”
মাধবীর পেট ফেটে হাসি পায়। কোন মতে হাসি থামিয়ে সে বললো ” দেখুন আমি এখন যেভাবে বলবো আপনিও সেভাবে বলবেন। ঠিক আছে?”
তারপর থেমে বলে ” যখন আপনাকে কাজী বলবে ‘বল বাবা কবুল’ তখন আপনি বলবেন, কবুল কবুল কবুল ”

” কবুল কবুল কবুল । হয়েছে ?”
” হ্যা হ্যা। হয়েছে।”
বলেই মাধবী খিলখিলিয়ে হেসে দেয়। ওপাশ থেকে মাধবীর হাসির শব্দ শুনে আরিয়ানের হৃদপিন্ড কাজ করা বন্ধ করে দেয়। যেন হৃদপিন্ড বলতে চাইছে ‘তাড়াতাড়ি নিজের শ্রেয়সীকে নিজের করে আন নয়তো একেবারের জন্য শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে দেব’ ।
আরিয়ান ছোট করে ‘আসছি’ বলে সাথে আনা লোকগুলোকে নিয়ে জায়গা ত্যাগ করে। মাধবীর মনে হলো এই লোকের মত বোকা দুনিয়াতে আর একটাও আছে কীনা সন্দেহ ।

মাধবী অপুকে বলে রেখেছিল রাত আরাইটায় তারা ঘুরতে যাবে। তাই আর দেড়ি না করে আরিয়ান চলে যেতেই মাধবী বেরিয়ে পরে। সে রুমাকে তার দুজোরা জামা দিয়ে রুমার জামাগুলো রেখে দিয়েছিল। সেগুলো পরেই বের হয়। মাধবীদের বাড়ির পরেই অপুদের বাসা তাই বেশি দেড়ি লাগে না। যা সময় লাগে রাজবাড়ির এরিয়া পেরোতেই। মাধবী হাটতে হাটতে সোজা অপুদের বাড়ির পেছনে চলে যায়। পদ্ম বিলের পারে অপু বসে আছে হাতে বৈঠা নিয়ে। মাধবী পেছন থেকে অপুর চোখজোরা ধরে ঢেকে ফেলে।

” এত দেড়ি করলি কেন ”
মাধবী চোখ ছেরে অপুর গা ঘেঁষে বসে। ” কিভাবে চিনলি?”
” তুই সাতপাল্লা কাপড় দিয়ে নিজেকে ঢেকে যদি হাজার মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাস আর আমাকে চোখ বেধে তোকে খুঁজতে বলা হয় তবুও আমি তোকে খুঁজে বের করতে পারবো ”
” চাঁপা ! কিভাবে পারবি?”
” ছোট বেলা থেকে তোর সাথে চলছি। ১২বছর ধরে তোর সাথে আমার বন্ধুত্ব। তোকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে আমি চিনি”
” তুই সেই হিসেবও রেখেছিস?”
অপু মাধবীর কথার উত্তর না দিয়ে বলে “এই তুই আমার দিকে তাকাবি না ”
” কেন কেন ? অপূর্ব ভাইয়ের হক আমি নিয়ে নিচ্ছি নাকি। একশো বার আমি তাকাবো। অপূর্ব ভাইয়াকে বলে দিস তার আগে আমি তোকে পেয়েছি সো তার থেকে আমার অধিকার বেশি ”

” উনাকে আবার টানছিস কেন ”
” ওও রাতের মধ্যেই একদম উনি হয়ে গেছে। সমস্যা নেই পাশে আছি চালিয়ে যা ”
” এখন কী নৌকায় উঠবি ?”
” উঠছি তো বাবা ”
দুজনে নৌকায় উঠে বসে।
মাধবী বলে ” বৈঠা আমাকে দে ”
” পারবি তুই?”
” তোকে দিতে বলেছি ”
অপু বৈঠা মাধবীর কাছে দিয়ে দেয়। পরে হাত বারিয়ে পদ্ম ফুল তোলে।
” এই আমার জন্যও তোল ”
” পারবো না। নিজেরটা নিজে তুলে নে ”
” তাহলে আমিও নৌকা চালাবো না। এই যে রেখে দিলাম বৈঠা ”
বলে মাধবী সত্যি সত্যিই বৈঠা রেখে দেয়। কিন্ত তাতেও অপুর কোন হোলদোল নেই। সে একমনে গুনগুন করছে আর ফুল তুলছে। অপু ফুলগুলো তুলে পাশে রাখে। মাধবীকে তার দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে,

” এই মেয়ে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন। তোকে না নিষেধ করেছি আমার দিকে তাকাতে। আর এত সুন্দর হয়েছিল কেন দেখছিস না চাঁদটাও তোকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে। কে বলেছে এত সুন্দর হতে তোকে। এখন তোর দিকে তাকিয়ে কথাও বলতে পারি না। বোবা রোগে ধরে যায়। এরকম ভয়ংকর রুপসী চোখ নিয়ে কোন মানুষের দিকে তাকালে জানিস সেই মানুষটার কি অবস্থা হয়। একদম তাকাবি না আমার দিকে। আমি অকালে পুরে মরতে চাই না। আমার এখনও সংসার করা বাকি। পরে আমার কিছু হয়ে গেলে আমার জামাই আরেকটা বিয়ে করে নেবে ”
মাধবী আহাম্মকের মত তাকিয়ে আছে। মানে সে এখন সুন্দরও হতে পারবে না এদের জন্য?
” আবারও তাকিয়ে আছিস। চোখ সরা ”
মাধবী ভেংচি কাটে ” বয়েই আমার তোর দিকে তাকিয়ে থাকতে। অভিশাপ দিলাম অপূর্ব ভাইয়া সারাদিন তোর দিকে তাকিয়ে থাকবে। বাহিরে গেলেও চোখগুলো খুলে তোর মুখের সামনে দিয়ে যাবে ”
অপু ভাবে আসলেই লোকটা যে মারাত্মক সুন্দর। তার দিকে তাকিয়ে থাকলে তো সে টিকতেই পারবে না। কিছুক্ষন নিরবতার পর অপু হঠাৎই বলে উঠে,

” আমি সত্যিই উনাকে ভালোবেসে ফেলেছি রে ”
” সত্যিই অপু তোর অপূর্ব ভাইয়াকে ভালো লাগে?”
” শুধু ভালো লাগে না ভালো বেসে ফেলেছি। কিন্ত…”
” কোন কিন্ত নয়। আমি আরিয়ান ভাই কে বলছি অপূর্ব ভাইয়াকে জানাতে ”
” উনি যদি আমাকে পছন্দ না করে ”
” উফফ!তুই সবসময় নিজেকে অসুন্দর ভাবিস কেন বলতো? আল্লাহর সৃষ্টি কখনো অসুন্দর হয় না। এবার আমি আসছি বেশি দেড়ি করা যাবে না ”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৭

দুজনে ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। মাধবী অপুকে বিদায় জানিয়ে কয়েকটা পদ্ম ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তবে বাড়িতে ঢুকতেই তার পা থমকে যায়। সে আস্তে আস্তে অন্দরমহলে ঢোকে। মুহুর্তেই তার শরীর সিরসিরিয়ে উঠে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়। মাধবীর মনে সন্দেহরা দানা বাঁধে। বৈঠক খানায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাধবীর স্নায়ু শক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও প্রখর। অন্দরে তার চেনা লোক ছাড়া অন্য কারো উপস্থিতি ঘটলেই সে বুঝতে পারে। এই মুহুর্তে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে অপরিচিত কারো আগমন। মাধবী সিরির কাছে পৌছাতেই তার সন্দেহ সত্য প্রমাণিত হয় অন্ধকারে কালো অবয়বটা ধীরে ধীরে পুষ্পালয়ের দিকে পা বারাচ্ছে।

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৯