Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৭

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৭

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৭
নওরিন কবির তিশা

‘জন্মের পর থেকেই ওর নাম আমার নামের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়ে আছে। আর আমি বোধশক্তি হওয়ার পর থেকে না চিনেও ওকে উন্মাদের ন্যায় ভালবেসে আসছি; এতটুকু কারনই কি যথেষ্ট নয় ওকে নিজের করে নেওয়ার জন্য?’——বিধ্বস্ত নীলের গর্জে ওঠা বজ্রকন্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো সমগ্র কক্ষজুড়ে,কম্পিত হলো উপস্থিত প্রতিটি মানব দেহ।
নিহাল হক ক্ষুব্ধ বেগে এগিয়ে এসে বললেন,,—’কে তুই? আমাদের বাড়ির মেয়ে নিয়ে এমন মন্তব্যের অধিকার তোকে কে দিয়েছে?

‘আমি দিয়েছি।’——ভেসে আসা গুরুগম্ভীর কন্ঠে সকলে পিছন ঘুরে তাকালো,ঠিক তখনই রাশভারি পদচারনায় সেখানে উপস্থিত হলেন ওয়ালিদ খান। তাকে দেখে চূড়ান্ত বিস্মিত হলো সকলে, নওশাদ হক বিস্মিত সুরে বললেন,,
—’ওয়ালিদ?তুই?
নওশাদ হক কিছুটা নরম হয়ে পড়লেও নিহাল হক গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন,,—’আরে আরে প্রফেশনাল গাদ্দার যে, কিন্তু আমাদের এ বাড়িতে আপনার কি?
—’মুখ সামলে কথা বল নিহাল। ভুলে যাস না,‌তোর বড় আমি।
ওয়ালিদ খানের এমন কথায় নিহাল হক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,,—’আরে আরে যান,যান। বড় তো আমার আব্বাও ছিল, যে আপনাকে ছেলের মত মানুষ করেছিল। কিন্তু বিনিময়ে আপনি কি করলেন? বিশ্বাসঘাতকতা?
—’যেখানে রৌশান আরা আর ‌নওফেল ভাই দুজন দুজনকে ভালোবাসতো,‌সেখানে বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্ন উঠেছে কোথা থেকে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—’আরে যান আপনার ভালোবাসা। সম্মানের প্রশ্নে ওসব ভালোবাসাকে হক’রা জীবন্ত ক’বর দেয়।
—’এটাই তোদের সাথে আমার পার্থক্য।
তাদের কথার মাঝে নুরুজ্জামান হক কোত্থেকে আসলেন যেন,,—’তুমি এখানে কি করছো ওয়ালিদ?
ওয়ালিদ খান সালাম করতে যেতে;নুরুজ্জামান হক সরে গেলেই তিনি বললেন,,—’আমার ছেলের বউকে স্বসম্মানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি।
—’চলে যাও। চলে যাও আমার হক ম্যানশন পেরিয়ে।
—’চাচা?

নিহাল হক তেড়ে এসে বললেন,,—’কথা কানে যায়নি? বেরিয়ে যান আপনার অসভ্য ছেলেকে নিয়ে।
বাবার প্রতি এমন উগ্র আচরণের নীল এগিয়ে এসে নিহাল হকের হাত ধরে বললেন,,—’আপনাদের সম্মানটা বজায় রেখেছি কারণ আমার বাবা-মা আমাকে এই শিক্ষা দিয়েই বড় করেছেন। কিন্তু আপনারা যদি নিজের সম্মান না রাখতে পারেন সে ক্ষেত্রে আমার আর কিছু করার থাকবে না।
নিহাল হক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে বললেন,,—’বাবা যেমন বিশ্বাসঘাতক ছেলেও তেমন অসভ্য। একজন আমার বাবার সম্মান ডুবিয়েছে আরেকজন এসেছে আমার ভাইজান এর সম্মান ডুবাতে।
তাতে এমন কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝছে না তিহু, বোকা দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে শুধু। এদিকে এতকিছুর মধ্যে আরহাম কাজী সাহেব কে তাড়া দিলেন , বললেন জলদি বিয়ে পড়ানোর কথা। কাজী সাহেব রাজি না হতেই তার ওপর চোটপাট শুরু করল আরহাম।তিহুর হাত ধরতেই এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে আরহামের বাঁ চোয়ালে সপাটে চড় বসালো তিহু।

আরহামের পাগলামো তখনও কমছে না যেন, আরেকবার হাত বাড়াতেই নীল এগিয়ে এসে থাপ্পড় বসালো তার অন্য চোয়ালে‌‌। সঙ্গে সঙ্গে রু’ধিরা’ক্ত হয়ে উঠলো আরহামের চোয়াল। তবুও থামলোনা আরহাম নিজেকে সামলিয়ে নীলের উদ্দেশ্যে হাত বাড়াতে যেতেই,নীল হাত মোচকে দিলো তার।আরহাম উন্মাদের ন্যায় আওড়ালো,,
—’আমি তিহুকে ভালোবাসি। দশ-দশটা বছর যাবৎ উন্মাদের ন্যায় ওকেই চেয়েছি। আর তুই দুদিনের মোহে ওকে নিজের করে পাবি? আমি বেঁচে থাকতে এটা কখনো সম্ভব নয়।
তার এমন কথায় তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো নীল, বেশ শব্দ করেই,বলল,,

—’তুই দশ বছর যাবত ওকে চেয়েছিস আর আমি বোধশক্তি হওয়ার পর থেকে। তুই মন থেকে ওকে চেয়েছিস আর আমি প্রতি মোনাজাতে। তুই ওকে দেখে ভালোবেসেছিস আমি না দেখে। তাহলে বল তুই যদি তথাকথিত ভালবাসার জেরে এতটা উন্মাদ হতে পারিস তাহলে আমি আমার প্রতি মোনাজাতের ফসল কে কিভাবে হাতছাড়া করতে পারি?
এমন কথায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল সকলে, তিহু তো বিষ্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় আরোহন করছে। তারমানে তাদের সম্পর্কটা দুদিনের ছিল না, কিন্তু তিহু তো তাকে সবেমাত্র কিছুদিন হলো চিনেছে। সে বিচলিত কন্ঠে বলল,,
—’নেতা সাহেব?

নীল তার দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বলল,,—’হয়তোবা আমি তোমাকে কোন একদিন বলেছিলাম? হয়তোবা ভুলে গিয়েছি বলতে; তবে এটা সত্যি যে, আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম। যেদিন তুমি আমার ভালোবাসার কথা জানবে না? সেদিন তুমি বড্ড আফসোস করবে, আমাকে এতদিন ভালোবেসেও অপ্রকাশিত রাখার জন্য।
তিহুর হতভম্ব দৃষ্টিকে পেরিয়ে নিহাল হক বললেন,,—’আমাদের মেয়েকে বলির পাঁঠা বানানো থেকে নিজের ছেলেকে রক্ষা করুন ওয়ালিদ খান। নইলে আমরা আপনার ছেলের এমন হাল করব যে…!
ওয়ালিদ খান হেসে বললেন,,—’হিংস্র সিংহের জন্ম দিয়েছি আমি। যে নিজের শিকার ছিনিয়ে আনতে জানে।লোকে কি বলে জানিস সিংহ আমার ওয়াহাজ। ওকে আমি সেই শিক্ষাই দিয়েছি,চলতি পথে এমন দু-একটা কাটা কি উপড়ে ফেলার জন্য ও একাই যথেষ্ট।

নওশাদ হক এতক্ষণ চুপ ছিলেন, নীরবতা পেরিয়ে হঠাৎ তিনি বললেন,,—’চুপচাপ এখান থেকে বেরিয়ে যা ওয়ালিদ। আমি চাচ্ছি না আজকের শুভদিনে কোনো র’ক্তার’ক্তি হোক।
ওয়ালিদ খান কিছুটা অদ্ভুত কণ্ঠে বললেন,,—’এখানে র’ক্তার’ক্তির কি দেখছিস? তোকে দেওয়া কথার মান রক্ষা করলাম মাত্র। ভুলে গেলি কথাটা তুই দিয়েছিলি,যে তোর মেয়ে হলে আমার পুত্রবধূ করে নিয়ে যাব তাকে। সেই কমিটমেন্টই পূরণ করতে এসেছি আজ।
তিহু এবার আর সামলাতে পারল না নিজের কৌতূহল, প্রশ্ন করেই বললো,,—’তোমাদের সমস্যাটা কোথায় বাবা-চাচ্চু?

নিহাল‌ হক নিশাত মজুমদারের উদ্দেশ্যে বললেন,,—’তোমরা ওকে রুমে নিয়ে যাও। আর বাড়ির কাউকে যেন আমি এখানে না দেখি। অন্তত আমি না বলা অব্দি।
আরহাম র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় বলল,,—’বিয়ে না করে তিহু কোথাও যাবে না।
তার কথাটা বলতে দেরি, সঙ্গে সঙ্গে নীলের মুষ্টিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হলো সে। শ্বেত শুভ্র পাঞ্জাবি র’ক্তে র’ঞ্জিত হলো। আঘাত-প্রতিকাঘাতে র’ক্তা’ক্ত হলো দুজনেই। শেষ পর্যন্ত প্রায় চেতানাহীন অবস্থা হলো আরহামের,বহু কষ্টে নীলের থেকে সরানো হলো তাকে।আদ্রিতা নাহার দ্রুত অজ্ঞান প্রায় ছেলেকে বক্ষে আগলে বেরিয়ে গেলেন। তবে যাওয়ার আগে নওশাদ হক আর নিহাল হকের উদ্দেশ্যে সতর্ক কণ্ঠে বললেন,,

—’আপনাদের পারিবারিক সমস্যার জন্য আমার ছেলের যদি কিছু হয়, আমি কিন্তু আপনাদের ছেড়ে কথা বলবো না।
তারা চলে যেতেই নীল তিহুর আঁকড়ে বলল,,—’চলো।
তিহু তার ক্ষতবিক্ষত হাতের দিকে চেয়ে বলল,,-—’আপনার হাত আঘাতপ্রাপ্ত নেতা সাহেব।
নিহাল হক তিহুকে ছাড়াতে যেতেই নীল তাকে ঝটকা মেরে সরিয়ে বলল,,—’আমার হালাল নারীকে, আমার মোনাজাতের ফসল কে আমি নিয়ে যাচ্ছি। আর এপথে কোনো বাধা সৃষ্টি হলে, বাধা দানকারীর লা’শ ডিঙ্গিয়ে আমার অর্ধাঙ্গিনী কে নিয়ে যাব আমি। তাতে যদি সমগ্র হক গোত্রও মৃ’ত্যুপুরীতে পরিণত হয় তাতে আমার কিছু যায় আসবে না।

নিহাল হক ছিটকে পড়েছেন। তিহু একপ্রকার কাউকে না দেখার ভান ধরেই বেরিয়ে গেল নীলের হাতে ধরে। সমস্ত পিছুটান পেরিয়ে সব বাঁধা ডিঙ্গিয়ে সে এগিয়ে চলল নিজের আপন ঠিকানায়। তাদের পিছু পিছু এগিয়ে গেল প্রত্যেকে। বাঁধা দানকারী প্রতিটি শক্তিকে প্রতিহত করল নীলের বাহিনী। নিহাল হককে সামলালেন নওশাদ হক। ইশারায় বোঝালেন,,’দাবার চাল এখনো বহুৎ বাকি। এত সহজে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা নেহাতই বোকামি হবে। ধৈর্য নিয়ে খেলতে হবে এ খেলা।

নীল উঠেছে ইফাজের গাড়িতে, ফেরার পথে আর কোনো বাঁধা চায় না সে। তার গাড়িটাও ভঙ্গুরপ্রায় বলা চলে। তার ওপর সে নিজেও ক্ষতবিক্ষত তাই তিহুকে নিয়ে কোনরকম ঝুঁকি নিতে নারাজ সে। গাড়ি চলছে কাঙ্খিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।ব্যাকসিটে পাশাপাশি বসে আছে নীল-তিহু। ড্রাইভিং সিটে আসিফ।ব্যাস তিনজনই।
গাড়ি মধ্যম গতিতে চলমান। নীলের আঘাতপ্রাপ্ত স্থান থেকে এখনো চুঁইয়ে পড়ছে র*ক্তকণারা।তিহু ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,,—’আপনার র’ক্ত।

তিহুর যে ব্লা’ড ফোবিয়া আছে এটা নীলের ভালো করেই জানা, তবে গম্ভীর মুখে সে হাত ছড়াতে গেলেই তিহু দ্রুত তার হাত আটকে বলল,,—’দেখি কতটা কেটেছে? ইস খুব যন্ত্রণা করছে তাই না? বোধ হয়…!
সে নীলের দিকে তাকাতেই মলিন হাসলো নীল, যেন তাচ্ছিল্যতা ঝরে পড়ছে তাতে,,—’সামান্য কেটেছে বলে এতটা উদ্বিগ্নতা? অথচ তোমার অব্যক্ত অনুরক্তির কারণে যে তিলে তিলে আমার হৃদক্ষরণ হচ্ছে, এর থেকেও শত সহস্র গুণ যন্ত্রণা আমি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি। সেদিকে কোন খেয়াল আছে তোমার?
নীলের কথার মর্ম না বুঝে তার দিকে বোকা দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল তিহু। নীলের তাচ্ছিল্যের হাসি ওষ্টাধরে প্রসারিত হলো। দৃষ্টি সরিয়ে বাহির পানে চাইল সে। তিহু উদাসীন দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার দিকে।

ঘুম ভাঙতেই নিজেকে নরম কোমল কাঙ্খিত বিছানায় আবিষ্কার করল তিহু । চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বুঝল এটা নীলের কক্ষ। আশেপাশে পরিচিত জনের উপস্থিতিতে দ্রুত গতিতে বিছানায় উঠে বসলো সে। মির্জা সূচনা দ্রুত এগিয়ে এসে বললেন,,
—’সামলে সামলে। আস্তে উঠ।ইস একদিনেই কি অবস্থা হয়েছে চেহারার!
মির্জা সায়মা দ্রুত শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে তিহু মুখের সম্মুখে ধরে বললেন,,—’প্রথমে এটা খেয়ে নে, পরে কথা হবে না হয়।

তিহু সেটা গ্রহণ করতে করতেই রুমিন আরা, সঙ্গে একাধিক পরিচারিকা নিয়ে ট্রেতে ফলের পসরা সাজিয়ে বসলেন। গাদাখানিক ফল তার সম্মুখে নীত করে স্নেহময়ী কন্ঠে শাসনের স্বরে বললেন,—’শরবত খেয়েই প্রথমে এগুলো খাবি।
তিহু হাসল খানিক। এতগুলো প্রাণের ভালোবাসা, এমন স্বার্থহীন দরদ পরিবারের লোক গুলোর পরে এদের কাছ থেকেই পেয়েছে তিহু। অবশ্য পরিবারের লোকগুলো তো..! দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এতো তিহুর বক্ষ ভেদিয়ে।
হঠাৎ একজন পরিচারিকা দৌড়ে এসে মির্জা সূচনার উদ্দেশ্যে বললেন,—’বড় আম্মা দ্রুত চলুন, একজন মহিলা এসেছেন আপনার সাথে দেখা করতে;পারিবারিক কি একটা সমস্যা নিয়ে বললেন।

মির্জা সূচনা এখানকার মহিলাদের বিভিন্ন সমস্যার নিষ্পত্তি করে থাকেন, বলতে গেলে প্রতিদিনই জনদশেক মহিলার সাথে বৈঠক হয় তার। কথাটা কর্ণগত হওয়া মাত্র উঠে দাঁড়ালেন তিনি, শাড়ির আঁচল খুব যত্নের সঙ্গে কাঁধের ওপর তুলে নিলেন। অতঃপর মির্জা সায়মা আর রুমিন আরার উদ্দেশ্যে তিহুর খেয়াল রাখার দায়িত্ব অর্পণ করে,রাশভারি প্রচারণায় প্রস্থান করলেন সেখান থেকে।

মির্জা সূচনা যাওয়ার পরপরই, খাবার গরমের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গিয়েছেন মির্জা সায়মাও। কক্ষে এখন শুধুমাত্র তিহু আর রুমিন আরা খান। রুমিন আরা তিহুর কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল,,—’শরীরের তাপমাত্রা তো ঠিকই আছে। তাহলে খাচ্ছিস না কেন মা? খেয়ে নে, না হলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়বি তো।
তিহু তার হাত থেকে ফলটা নিয়ে তাতে কামড় দিতে দিতে বলল,,—’ছোট ফুপ্পি?

—’হুম বল।
—’তোমায় একটা প্রশ্ন করি?
—’কর।
—’সত্যি সত্যি জবাব দিবা কিন্তু।
—’হ্যাঁ রে বাবা কর।
—’প্রমিস?
রুমিন আরা এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,,—’তোর কেন মনে হয় আমি মিথ্যা বলব?
তিহু জলদি কন্ঠে তাকে বোঝানোর স্বরে বলল,,—’ভুল বুঝো না ফুপ্পি, কিন্তু ব্যাপারটা সিরিয়াস।
—’আচ্ছা বল তোর সিরিয়াস টপিক।
—’প্রমিস তো?
—’হু!
—’তোমরা আমার পরিবার সম্পর্কে আগে থেকে জানতে তাই না? আর আমার পরিবারের সঙ্গে তোমাদের আগে কোনো একটা সম্পর্ক ছিল?
আর এমন কথায় তার দিকে চমকে তাকালেন রুমিন আরা,,—’মানে?

—’তুমি কিন্তু আমাকে প্রমিস করেছ ফুপ্পি। সত্যিটা বলো প্লিজ। আমি আর পারছি না এই কৌতূহল নিবারণ করতে। ব্যর্থ আমি, প্লিজ আমাকে সব টা খুলে বলো ফুপ্পি।
রুমিন আরা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন, অতঃপর বলতে শুরু করলেন,,
‘তোর পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভীষণ গাঢ়। বলা চলে বংশপরম্পরায় হক আর খানরা ভীষণ ভালো বন্ধু। আমাদের দাদা নুরুজ্জামান আঙ্কেলের অর্থাৎ তোর দাদার বাবার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। এরপর আমার ভাইজান আর তোর বাবা। ব্যবসায়িক সূত্র, রাজনীতি সবখানেই সক্রিয় বিচরণ ছিল হক আর খানদের। আমাদের গ্রামের বাড়িও খুলনায়। ডুমুরিয়ায় আমাদের আদি নিবাস, তোর বাবাদের বাসাও ডুমুরিয়ায়।
কিন্তু বিশ শতকের শুরুর দিকে, নয়া নয়া রাজনীতৈক অঙ্গনে যখন আমার বাবা আর তোর দাদা প্রবেশ করেছেন, তখন গ্রামীণ শত্রুতা আর ব্যবসার কারণে তারা খুলনায় আসেন। অতঃপর এখানে বড় করে ব্যবসা শুরু করেন। দিন যেতে থাকে ব্যবসার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতেও তারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

তবে ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল না। আমি যখন খুব ছোট ওই ধর ১০ বছরের, তখন আমার বাবা এক রাজনৈতিক সমাবেশে গু’লিতে নি’হত হন। অতঃপর হক ম্যানশন হয় আমাদের আশ্রয়স্থল। যদিও খুলনার বুকে খান মহল নামক বিরাট মহলের উত্তরসূরি আমরা।তবে নুরুজ্জামান আঙ্কেল আমাদের তার কাছে নিয়ে যান।
ধীরে ধীরে ভাইজান রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, নওশাদ ভাই আর তিনি বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলেন। দুজন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্যবসা আর রাজনীতি সামলাতে থাকেন। দুজনের সম্পর্কে এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে তারা একে অন্যকে রীতিমতো কথা দিয়ে রাখেন যে, আগে যার ছেলে হবে তার সঙ্গে অপরজনের মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হবে। দিন গড়াতে থাকে, হঠাৎ ঘটে আরেক বিপর্যয়। তুই হয়তো জানিস না তোরা আরো একটা বড় চাচা আছে,তোর বাবারও বড়।
এ পর্যায়ে থামলেন রুমিন আরা। তিহু বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো,,—’আমার বড় চাচা!

—’হ্যাঁ, নওফেল ভাই।
তিহু চমকিত দৃষ্টিতে তাকালে রুমিন আরা ফের বলতে শুরু করেন,,—’তোদের গোত্রে একটা রেওয়াজ ছিলো; ভালোবাসার বিয়ে নিষিদ্ধ।তবে গোত্রের এরূপ রেওয়াজের গন্ডিসীমানা পেরিয়ে সেই নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন আপা আর নওফেল ভাই। কিছু দিনের মধ্যেই এটা জানাজানি হয় । নুরুজ্জামান আঙ্কেল তো রীতিমতো রেগে-আগুন আমার মা তাঁকে বুঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি নারাজ।তার ভাষ্যমতে এটা পারিবারিক রীতি।এতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া স্বত্বেও এরূপ গোঁড়ামির কারন শুধুই বোকামি ছিলো।

অতঃপর ঘটে অঘটন আপার সঙ্গে নওফেল ভাই বেরিয়ে আসেন বাড়ি থেকে। দুজনে পাড়ি জমান সুদূর কানাডা।আর তাদের এ কাজে সহায়তা করেন আমার ভাইজান।আপা রাওফিনের জন্মের বছর পাঁচেকের মধ্যে ফিরে আসলেও নওফেল ভাই আর ফেরেন নি।তবে সেই দ্বেষ থেকে ছেদ পড়ে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের। ভেঙে যায় হক আর খানদের বংশপরম্পরার সেই বন্ধুত্বের।

আমরা চলে আসি রাজধানী। ভাইজান ফের এককভাবে শুরু করেন ব্যাবসা,যোগ দেন রাজনীতিতে। ধীরে ধীরে আমাদের অবস্থার উন্নতি থেকে বর্তমান এখানে আমরা।তবে এতো কিছুর মাঝেও ভাইজান বন্ধুত্বের ওয়াদা ভঙ্গ করেন নি।ঠিকই তোকে নীলের বউ করে এনেছেন।
পারিবারিক এতো এতো সত্যি জেনে যেন আকাশ থেকে পড়েছে তিহু। বিস্মিত কন্ঠে সে বলল,,—’এতো কিছু অজ্ঞাত ছিলো আমার।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৬

রুমিন আরা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,,—’তবে এতো সত্যর মধ্যে চিরন্তন সত্য হলো‌ নীল তোকে ভালোবাসে। উন্মাদের মত ভালোবাসে।দেখ আমি তোর ফুপ্পি হয়ে বলছি নীল তোকে বড্ড ভালোবাসে। যেখানে ওর বয়সী ছেলেরা মেয়েবাজি করতো সেখানে ও তোর অপেক্ষায় ছিলো। কক্ষনো অন্য কোনো মেয়ের দিকে ফিরেও তাকায় নি।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৮