Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩০

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩০

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩০
মৃধা মৌনি

এক কনকনে শীতের ভোর। সূর্য তখনও পূর্ব আকাশে চোখ খোলেনি, চারদিক হিম শীতল কুয়াশার পুরু চাদরে মোড়া। তাপমাত্রা এতটাই কম যে নিঃশ্বাস ফেললে তা সাদা ধোঁয়ার মতো উবে যায়। এই নিথর ঠান্ডার মাঝেও তৃণা তার ছোট্ট, স্যাঁতসেঁতে ঘরে কম্বল মুড়ি দিয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। তার ক্লান্ত শরীর হয়তো এক মুহূর্তের শান্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু সেই শান্তি স্থায়ী হলো না।
হঠাৎ করেই পিঠের ওপর এক ঝলক বরফ-ঠান্ডা জলের স্পর্শ পেয়ে তৃণার শরীরটা ধনুকের মতো কেঁপে উঠল। সে গোঙানির শব্দ করে ধড়মড় করে উঠে বসল। শীতের তীব্রতা যেন এক মুহূর্তে তার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরাকে জমাট বাঁধিয়ে দিল।
তৃণা চোখ কচলে সামনে তাকিয়ে দেখল, রাসেলের মা একটি খালি ঘটি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখ দুটো আ গু নে র মতো জ্বলছে, মুখে একরাশ বিরক্তি আর ঘৃণা।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

মহিলা দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, ‘কোন ভদ্র বাড়ির বউ সাত সকাল বেলায় ভোঁসভোঁস করে ঘুমায় শুনি? লজ্জা করে না? সাতটা বেজে গেল, আর মহারানীর এখনও ঘুম ভাঙছে না! আমার বাপের বাড়িতে এমন অলস মেয়ে দেখিনি বাপু! উঠ, উঠে হাত লাগা কাজে। তোকে পুষতে এখানে আনা হয়নি!’
তৃণার সারা শরীর কাঁপছে, মনটা দুঃসহ বেদনায় গুমরে উঠল। সে ধীরে ধীরে কম্বল সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে তখনও ঘুমের রেশ, কিন্তু কণ্ঠস্বরে একটা চাপা অভিমান।
সে মাথা নিচু করে, ফিসফিস করে জবাব দিলো, ‘আপনি তো আমাকে বউ বলেই মানেননি…। তাহলে এত সকাল করে উঠে কাকে খুশি করব?’

এই সামান্য প্রত্যুত্তরে মিনারা যেন বারুদে আ গু ন দিলেন। তার চোখ আরও বড় হলো। হাতের ঘটিটা সশব্দে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে তিনি এগিয়ে এলেন।
‘অ্যাঁ! কী বললি? তোর এত বড় আস্পর্ধা! আমার মুখের ওপর কথা বলা হচ্ছে? কার জোরে এত তেজ দেখাস শুনি?’
মহিলা তৃণার হাত টেনে ধরলেন। তার হাতের মুঠো শক্ত, নির্মম।
‘শোন মেয়ে, তুই এই ঘরে পা দিয়েছিস আমার ছেলেটার জন্যই। তুই এখন আমার ছেলের ঘাড়ের বোঝা! এখানে থাকতে হলে কাজের লোক হয়ে থাকতে হবে। চল, এই সাত সকালে আমার হেঁশেলে আ গু ন দিতে হবে। হাঁড়ি-পাতিল, এঁটো থালাবাসন জমে আছে পাহাড়ের মতো। চল, হাত চালা!’

তৃণা আর কোনো কথা বলল না। কথা বলার ইচ্ছেটুকু তার নেই। গত তিনদিন ধরে সে এই বাড়িতে এসেছে, আর প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে মনে হয়েছে এক নির্মম পরীক্ষা। চৌধুরী বাড়ির বিলাসবহুল সোফা বা দীক্ষার রাজকীয় বিছানার পাশে এই ছোট, অন্ধকার ঘরে তার দিন কাটছে এক চরম দুঃস্বপ্নের মধ্যে।
তারপর তার কাজ শুরু হলো, যেসব কাজ সে তার জীবনে কোনোদিন শেখেনি, কোনোদিন করতে হয়নি, সেসবই আজ তাকে করতে হচ্ছে।
প্রথমেই ছিল রান্নাঘরের কাজ। কনকনে শীতে কল থেকে বের হওয়া ঠান্ডা জলে হাঁড়ি-পাতিল ধোয়া। চর্বি, তেল আর বাসি খাবারের গন্ধ- তৃণার বমি আসছিল বারবার। তার আঙুলগুলো ঠান্ডায় জমে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, ব্যথা করছে তীব্রভাবে।

তরকারি কা টা নিয়ে আরেক দফা যুদ্ধ গেল তার উপর দিয়ে। সাইজ হচ্ছে না, এত মোটা কেন, এত পাতলা কেন- নানান টালবাহানা মিনারার। তৃণা ক্লান্ত হলো। শেষে ওসব ফেলে তাকে দেওয়া হলো রুটি বেলতে। সেই রুটি কিছুতেই গোল হয় না। তৃণার ভয় করে। মিনারা তাকে অগ্নি দৃষ্টিতে বিষ গিলে খাচ্ছেন যেন। কটমট করে বললেন, ‘কাজ পারিস না একটাও, ছেলে ভুলিয়ে পেট বাজাতে পারিস, নষ্ট মা*গী।’
রান্নাঘর থেকে বের করে ওকে তাই কাপড় ধুঁতে দেওয়া হলো। তৃণা নিঃশব্দে ধুঁতে লাগল। কি ভীষণ ঠান্ডা পানি! গায়ের ভিতর ছিঁড়ে পড়লে কলিজা সহ টান খায়। অথচ মিনারার হচ্ছেই না। যতই ধোঁয়, আরও এনে দেয়, আবার ধোঁয়া গুলিই হয়নি বলে আবার ধোঁয়ায়।
সকাল দশটা বাজতে না বাজতেই তৃণা ক্লান্তিতে হাঁপিয়ে উঠল। সে এক কোণে বসে সামান্য দম নিতেই রাসেলের মা সামনে এসে দাঁড়ালেন।

‘কী হলো? বসলি কেন? অলসতা ঝেড়ে ফেলে দুপুরের রান্না চড়া। রাঁধতে পারিস নাকি তাও শিখিসনি? শিখিয়েছি কি তোর মা? খালি ছলাকলা করে ছেলে পটানো? এরকম মেয়ে আমি আমার বাপের জন্মে দেখেনি। আর এই অযোগ্যতার কুমড়াই কিনা আমার ঘরে এসে জুটলো… উফফফ!’
তৃণা অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল। তার চোখ দুটি জলে ভেজা। তার মনে পড়ল, সে তো কুরুচিপূর্ণ জীবনে অভ্যস্ত ছিল না। তার জীবনে আরাম ছিল, দীক্ষার স্নেহ ছিল। মায়ের নরম মমতা ছিল। বাবার গভীর ভালোবাসা ছিল। অথচ আজ, এক অজানা জীবনের দাসত্বে সে চূর্ণবিচূর্ণ!
রান্না চড়াতে গিয়ে দেখল ছয় পদের আয়োজন।

তৃণার বিস্ময়ের সীমা রইল না। মাছ ভাজতে গিয়ে ভেঙে গেল, মুরগী কষানো হয়নি, শাক ভাজিতে লবণ কটা, ফুলকপির তরকারিতে এত হলুদ দেয় কেউ? অভিযোগে অভিযোগে রান্নাঘর ভারী…তৃণার চোখের জল মোছার ও সময় পায় না ফাঁকে…
এমন জীবন, এমন সময় চেয়েছিল সে?
সময় গড়াচ্ছে, দিন ফুরোচ্ছে- অথচ কাজের শেষ নেই। একটি কাজ শেষ হতে না হতেই রাসেলের মা আরও দশটা কাজের নির্দেশ দিচ্ছেন।

তৃণা ভাবল, সে তো দীক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করেছিল, শিশিরের সঙ্গে মিলে পাপ করেছিল। কিন্তু তার সেই পাপের শাস্তি কি এই শারীরিক নির্যাতন? যেখানে সে একটু সম্মান বা একফোঁটা স্বস্তিও পাচ্ছে না!
এই চরম হতাশার মুহূর্তে, তৃণা হয়তো মনে মনে ভাবল, অরুণিমাভ চৌধুরীর বাড়ির ‘কাজের মেয়ে’র জীবনও হয়তো এর চেয়ে ভালো ছিল! সেখানে অন্তত দু’জন শিশুর ঔদ্ধত্য সইতে হতো, কিন্তু এই বয়স্ক মহিলার নির্মমতা আর শারীরিক শ্রমের যন্ত্রণা সইতে হতো না।

এই জীবন আর কতদিন চলবে? এই প্রশ্নটা তার মনে কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
বেলা প্রায় এগারোটা। রান্নাঘরের এক কোণে হাঁপিয়ে বসে আছে তৃণা। তার হাত-পায়ে অসহ্য ব্যথা, চামড়া ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। তবুও রাসেলের মা তাকে এটা-সেটা ধরিয়ে দিচ্ছেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর থেকে একটা গম্ভীর, চড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
‘মা! এই খাবারগুলো কী বানিয়েছ! এ কী!’
রাসেল নবাবজাদার মতো ঘুম থেকে উঠে এসেছে। গায়ে এখনও তার বিলাসবহুল শাল জড়িয়ে, চুলগুলো এলোমেলো। শীতকালে এই বাড়ির একমাত্র আরামদায়ক প্রাণী সে-ই। সে ড্রয়িং রুমের লাগোয়া ডাইনিং টেবিলে বসল। টেবিলের ওপর রাখা শক্ত হয়ে যাওয়া পরোটা আর ঠান্ডা জমা সবজি।
রাসেলের মা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ছেলের চেঁচামেচি শুনেও এগিয়ে গেলেন না বরং উঁচু গলায় উত্তর দিলেন,

‘কেমন হইছে? যা হইছে তাই গেল। আনছিস তো একটা ঢেরসের বাচ্চা, মায়ের কথা শুনলে আজ এই দিন দেখতে হতো না।’
রাসেল রেগে গিয়ে টেবিল থেকে কাঁটা চামচটা ছুঁড়ে ফেলল।
‘যা আছে তাই খাব মানে কী! আমি কি রাস্তার লোক? তুমি জানো না আমি কি খাই না খাই, না পারলে শিখিয়ে পড়ে নাও মা। আর নাইলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দাও। আমায় কথা শোনাচ্ছ কেন?’
তৃণা রান্নাঘরের ভেতর থেকেই বুঝতে পারল, রাসেল তাকেই উদ্দেশ্য করে বলছে। সে ধীর পায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো।
‘কিছু লাগলে বল, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।’

তৃণাকে সামনে দেখেই রাসেলের রাগ আরও তিনগুণ বেড়ে গেল। তার জিদ যেন আকাশ ছুঁল। সে টেবিলে সশব্দে একটা চাপড় মেরে চিৎকার করে উঠল,
‘তুই কেন এসেছিস এখানে? কে তোকে ডাকল? তুই এখানে কী করছিস?’
তৃণা শান্ত থাকার চেষ্টা করল, উত্তরে বলল, ‘তুই ডাকলি যে…’
‘তোকে ডাকিনি! তোর মতো জঘন্য চেহারার কাউকে আমি কোনোদিন ডাকিনি! যা, দূর হ! আমার সামনে থেকে যা!’ রাসেল দাঁত কিড়মিড় করে।

তবুও তৃণা এক পাও নড়ল না। সে শক্ত হতে চাইছে।
‘যা লাগলে বল, আমি… আমি বানিয়ে দিচ্ছি। সকালে তোকে শক্ত পরোটা খেতে হবে না।’
রাসেল রাগে কাঁপছে। সে উঠে এসে তৃণার মুখের সামনে দাঁড়াল। তার চোখে তীব্র ঘৃণা।
‘খবরদার! আমার বউ হওয়ার চেষ্টা করবি না, একদম খবরদার! তুই কে? তোকে দেখে আমার ঘৃণা হয়! আমার সামনে থেকে এক্ষুনি যা!’
ঠিক সেই সময় এঘরে প্রবেশ করে তিয়াশা। চিল্লাচিল্লির শব্দ সে ভেতর থেকেই পাচ্ছিল। প্রতিদিন রাসেলের খাবার টাইমে সেও একসঙ্গে খায়। তবে এই কয়দিন ধরে সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটছে। রাসেল এখন বিবাহিত, এটা সত্যি- মানুক বা নাই মানুক। আর জেনে-বুঝে সে কোন বিবাহিত ছেলের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক রাখতে চায় না, এইটুকু মনের জোর তিয়াশার আছে।

সে বের হতেই রাসেল, তৃণা দু’জনেই তার দিকে তাকাল। তিয়াশা কটাক্ষের সুরে বলল, ‘ও তো তোমার বউ-ই, রাসেল! এভাবে চেঁচামেচি করছো কেন?’
তিয়াশার এই খোঁচা যেন রাসেলের ধৈর্যের শেষ বাঁধ ভেঙে দিলো। সে সঙ্গে সঙ্গে তিয়াশার কাছে গিয়ে আকুতি-মিনতি শুরু করল। তার চোখে জল প্রায় চলে এসেছে।
‘তিয়াশা! তুমিও ওকে বউ বলছো? আমার কপালটাই খারাপ! বিশ্বাস করো তিয়াশা, আমি ওকে এক মুহূর্তের জন্যও বউ হিসেবে মানি না! তুমি ছাড়া আর কাউকে আমি আমার বউ হিসেবে মানবো না, কোনোদিন না! তুমি ভুলে যেও না, ভার্সিটি উঠলেই আমাদের বিয়ে দেওয়ার কথা পাকা করা ছিল!’
রাসেল তিয়াশার হাত ধরে কেঁদে ফেলার ভঙ্গিতে বলল,

‘আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, আমি খুব শীঘ্রই ওকে ডিভোর্স দেবো, দেখো তুমি! ওকে আমি এই বাড়ি থেকে তাড়াবোই! তুমি রাগ করো না প্লিজ!’
এই কথাগুলো রাসেল বলছে, একদম তৃণার সামনে দাঁড়িয়ে, তৃণার চোখের দিকে তাকিয়ে।
এইসব শুনে তৃণার মাথাটা যেন ভনভন করে ঘুরতে শুরু করল। তার কানে যেন রাসেলের কথাগুলো আর পৌঁছাচ্ছে না, পৌঁছাচ্ছে কয়েক মাস আগের পুরোনো স্মৃতি।
সে অস্ফুটে বিড়বিড় করল, ‘..ডিভোর্স… মানি না… তাড়াবো…’
হঠাৎ করেই চোখের সামনে সবটা স্পষ্ট হয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল, একদিন তো তার জন্যই শিশিরও তার আপন বোন দীক্ষাকে একইরকম কথা বলেছিল!

‘দীক্ষা আমার কাছে কেউ নয়! আমি তৃণাকে ভালোবাসি! ওকে আমি ডিভোর্স দেবো!’
সময়ের চক্র, নিয়তির নির্মম খেলা- তৃণা আজ দীক্ষার অবস্থানে! একদিন দীক্ষা ছিল, আজ তৃণা আছে। একই জায়গায়… একই স্থানে!
তৃণার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। তার মনে হলো, প্রকৃতি তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছে- একইভাবে, একই যন্ত্রণা দিয়ে। তার মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বের হলো না, শুধু মনের ভেতরে তীব্র হাহাকার আর সেই পুরোনো স্মৃতিটা কাঁটার মতো বিঁধে রইল।

অরুণিমাভ চৌধুরীর বিশাল ডাইনিং টেবিলে সকালের নাস্তার আয়োজন চলছে। কাঁচের টেবিলটা চকচক করছে, চারদিকে সুন্দর অর্কিডের সৌরভ। অরুণিমাভ, দীক্ষা, বকুল, খালেদা, আরহাম এবং আয়ান- সবাই একসঙ্গে বসেছে।
সকালের নাশতা চলছে রিল্যাক্সড মেজাজে। অরুণিমাভ আজ আর কাজে যাওয়ার তাড়া দেখাচ্ছেন না। তিনি আরহাম ও আয়ানকে তাদের স্কুলের প্রজেক্ট নিয়ে কিছু মজার কথা বলছেন আর দীক্ষা মুগ্ধ হয়ে সেই আলোচনা শুনছে।
অরুণিমাভ বলছেন, ‘আচ্ছা আরহাম, তুমি বললে তুমি নাকি ‘স্পেস শাটল’ বানাবে? কিন্তু শাটল তো এখন আর ব্যবহার হয় না! তুমি বরং একটা ‘স্পেস-এক্স রকেট’ বানাও। তাতে তোমার বিজ্ঞান জ্ঞান আরও বাড়বে।’
আয়ান চিমটি কাটার ভঙ্গিতে বলল, ‘পাপা, ব্রো রকেট বানাতে পারবে না। ও শুধু ছবি আঁকতে পারে। রকেট তো আমিই বানাব, যেটা আন্টির বাবুকে নিয়ে চাঁদে চলে যাবে!’
দীক্ষা হেসে উঠল তাই শুনে, ‘বাহ! আমার বাবু তো তবে চাঁদে যাবে! তোমার রকেট নিশ্চয়ই খুব মজবুত হবে, আয়ান?’

‘অবশ্যই! আমি আলতু ফালতু জিনিস বানাই না আন্টি..’
এই মিষ্টি আর মজার আলোচনার মাঝেও বকুলের মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ। সে চুপচাপ প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে, মুখে কোনো হাসি নেই। তার চোখেমুখে একটা গভীর অস্থিরতা।
আসলে, ভোর রাতে সে স্বপ্নে শান্তকে দেখেছিল। দেখল মানুষটা এসে তাকে নিয়ে গেছে সোনাডিঙি দীঘির পাড়ে, কি বাতাস সেখানে। শীতে জড়োসড়ো হতেই মানুষটা নিজের জ্যাকেট খুলে বকুলকে এগিয়ে দিলো। ব্যস এইটুকুই… ঘুম ভাঙতেও তার রেশ রইল অনেকক্ষণ। এখনো মনে হচ্ছে একটা শান্ত শান্ত ঘ্রাণ তার চারপাশে… মানুষটার প্রতি তার রাগ থাকা সত্ত্বেও, তাকে এক নজর দেখার জন্য বকুলের মনটা আকুলিবিকুলি করছে খুব। সে বুঝতে পারছে না, তার রাগটা আসলে শান্তর ওপর, নাকি শান্তকে পছন্দ করে ফেলার জন্য নিজের ওপর!
বকুলের এই নীরব বিষাদ অরুণিমাভ চৌধুরীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং দীক্ষার স্নেহভরা চোখ- কারও নজরই এড়াল না।
অরুণিমাভ প্রথমে বকুলের দিকে মনোযোগ দিলেন। তিনি নরম গলায় জানতে চাইলেন,

‘কী হলো, বকুল? তুমি দেখছি একেবারেই চুপচাপ। তোমার নাশতাও তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কোনো সমস্যা কি? এখানে তোমার কোনো কিছু অপছন্দ হচ্ছে?’
বকুল দ্রুত মাথা নাড়ল। সে চট করে একটা কৃত্রিম হাসি মুখে আনল।
‘না ভাইয়া। সব ঠিক আছে। আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি… আমি একটু ক্লান্ত বোধ করছি, এই আর কি।’
অরুণিমাভ আর জোর করলেন না। তিনি বুঝলেন, এটা ব্যক্তিগত কোনো বিষয়।
কিন্তু দীক্ষা, সে তো বকুলকে চেনে। সে বুঝতে পারল, এটা কোনো ক্লান্তি নয়, বরং মনের ভেতরে জমাট বাঁধা অভিমান আর আকাঙ্ক্ষা। শান্তর কথাই যে বকুল ভাবছে, তা দীক্ষার কাছে সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট।
দীক্ষা মুচকি হাসল। তার সেই হাসিটা রহস্যময়, যেন সে সব জানে। সে শান্তভাবে বকুলের দিকে তাকাল, যেন চোখ দিয়ে বলছে, ‘ধৈর্য ধর! তোর বিষাদ এখন উড়তে চলেছে।’

দীক্ষা ভালো করেই জানে, এখন বকুলের মন খারাপের কারণ শান্ত হলেও, একটু পরেই এই বিষণ্ণতা হারিয়ে শত গুণ খুশি ভর করবে বকুলের চোখমুখ জুড়ে। কারণ, দীক্ষা কাল রাতে শান্তর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। শান্ত আজ আসছে, তবে এবার বকুলকে একটা বিশেষ উপহার দেওয়ার জন্যই তার এই ছুটে আসা…
দীক্ষার সেই রহস্যময় হাসি বকুলের নজর এড়াল না। বকুল ভ্রু কুঁচকে ফিসফিস করে দীক্ষাকে শুধালো, ‘হাসছো কেন আপা? কী হয়েছে তোমার?’
দীক্ষা চোখ সরিয়ে নিলো, ‘কিছু না।’
তারপর খাওয়ায় মন দিলো চুপটি করে।

বকুলও শুধালো না আর। তবে এই খোশমেজাজি গাল গল্পের মাঝেও খালেদা বেগম গম্ভীর হয়ে আছেন। এতক্ষণ তিনি আনন্দের মাঝে তৃণার প্রসঙ্গ আনেননি, কিন্তু এবার তার মাতৃত্বের টান তাকে স্থির থাকতে দিলো না।
খালেদা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মেয়েটা কেমন আছে কে জানে! শত রাগ থাকুক, তবু সে তো আমার পেটের সন্তান… আমারই র ক্ত। এমন অবস্থায় গেছে দেখে আমার মনটা শান্তি পাচ্ছে না, বাবা। কেমন চিন্তা হচ্ছে।’
দীক্ষা মাথা নিচু করে রইল। তার মনেও এক ধরনের দ্বিধা কাজ করছে। তৃণার ওপর রাগ থাকলেও ওখানে কেমন আছে সে ব্যাপারে সেও যথেষ্ট সন্দিহান তবে প্রকাশ করতে চাইছে না দেখেই চুপচাপ।

অরুণিমাভ চৌধুরীর শান্ত মুখ এবার একটু সহানুভূতিতে ভরে উঠল। তিনি আশ্বস্ত সুরে বললেন, ‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমি খোঁজ রেখেছি। আমি জানি, আপনি এখন ওর শ্বশুরবাড়ির পরিবেশের কথা শুনে আরও কষ্ট পাবেন। তাই আমি আপনাকে কিছুই বলিনি। তবে ওর ওপর নজর আমার আছে। তাই চিন্তা করবেন না।’
তিনি এক মুহূর্ত থেমে বললেন, ‘এবং আজকে আমি একবার যাবোও ও বাড়িতে ইনশা আল্লাহ। ওকে একবার দেখে আসব।’

খালেদা বেগম কৃতজ্ঞতার চোখে তাকালেন।
‘ধন্যবাদ বাবা।’
‘আপনি হয়তো রাগ হতে পারেন, এভাবে ওর বিয়েটা দিয়ে দেওয়ার জন্য… কিন্তু ওর গর্ভের সন্তানটিকে পিতৃ পরিচয় দিতে এটাই আমার মাথায় এসেছিল সে সময়, এছাড়া আর উপায় ছিল না। আমি তো ওর অতীত জানি। রাসেলের পরিবার যতই খারাপ হোক, অন্তত সন্তানটি বৈধতা পেল। আর আমি সবসময় চাইব, সে যেন ভালো থাকে।’

‘কিন্তু রাসেল আর তৃণার সম্পর্ক কি সহজ হবে? রাসেল তো ওকে এক মুহূর্তের জন্যও বউ হিসেবে মানবে বলে মনে হয় না।’ বকুলের কণ্ঠে সন্দেহ।
অরুণিমাভ এবার এক ধরনের দার্শনিকের হাসি হাসলেন। তিনি নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
‘একটা কথা মনে রাখবে, এক ছাদের তলায় থাকতে থাকতে কুকুরের প্রতিও মানুষের মায়া জন্মায়, সেখানে তৃণা তো মানুষ, আর ওর মাথায় তো কুবুদ্ধির অভাব নেই!’
অরুণিমাভ গলা নামিয়ে হাসলেন, ‘ও খুব ভালো করেই জানে কীভাবে ছিনিয়ে নিতে হয়। সেখানে রাসেল ওর বিয়ে করা স্বামী… তার ভালোবাসা ও কীভাবে ছিনিয়ে নিতে হবে, আশা করি তৃণা জানবে।’
এই কথাটা শুনে বকুল আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে হা হা করে হাসতে লাগল।
দীক্ষা শুধু মৃদু হাসল। অরুণিমাভর কথাগুলো হয়তো কঠিন কিন্তু মিথ্যা নয়।
তাদের এই হাসি আড্ডার মাঝখানে হঠাৎ করেই বাইরে থেকে একটা তীব্র শোরগোলের আওয়াজ ভেসে এলো। ডাইনিং টেবিলের হাসিখুশি আমেজ হঠাৎ করেই চূর্ন হলো।

শোনা গেল দারোয়ানের চেঁচানো গলা, ‘আরে না না ভাইজান! আপনি ভেতরে যাইতে পারবেন না। অনুমতি নাই। আপনাকে ওয়েটিং রুমে বসতে বলছি, আগে বসেন, আর এই সব জিনিসপত্র ভেতরে ঢোকানো যাইব না!’
কিন্তু দারোয়ানের বাঁধা কেউ মানল না। গ্রাম্য টানে কথা বলতে বলতে এক লহমায় শান্ত ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার সঙ্গে দারোয়ানের একরকম ধস্তাধস্তি চলছে।
শান্তকে সেই রূপে দেখে ডাইনিং টেবিলে থাকা সবাই- একেবারে আহাম্মক, হতবাক।
শান্তকে দেখাচ্ছে সে যেন কোনো যাত্রাপালায় ভাঁড়ের চরিত্রে অভিনয় করতে এসেছে। হাটুর কাছে ছেঁড়া জিন্সের প্যান্ট, তার ওপর কটকটে লাল রঙের শার্টের ওপরে আবার কালো লেদারের জ্যাকেট! মাথায় আবার উলের টুপি, যেন সে সাইবেরিয়া জয় করে এসেছে।

কিন্তু আসল দৃশ্য ছিল তার হাতে। শান্ত তার বিশাল কাঁধে দুইটা তাগড়া, জ্যান্ত মুরগী আর দুইটা রাজহাঁস ঝুলিয়ে এনেছে! হাঁস আর মুরগীগুলো তাদের শেষ রক্ষা করার জন্য প্রাণপণে তারস্বরে ডাকছে। একটা কচি লাউ সে বগলে চেপে ধরে রেখেছে, আর এক ছড়া ডাব বেচারা দারোয়ানের হাতে জোর করে ধরিয়ে দিয়েছে।
এই সব প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে একসাথে ঢুকল শান্ত।
শান্ত সবাইকে দেখে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে।

‘আরে দীক্ষা আপা দেখেন তো এই ব্যাডা আমারে ঢুকতে দিতেছে না.. মেজাজ খারাপ লাগে না বলেন?’ সে দারোয়ানের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে সেই মুরগী, হাঁস, লাউ সব একসাথে সশব্দে মাটিতে নামিয়ে রাখল। হাঁস-মুরগীগুলো দামী মেঝের ওপর তাদের বাদাভিসার চিহ্ণ এঁকে দিলো!
শান্ত সেই দৃশ্যের দিকে নজর না দিয়ে, লাফিয়ে লাফিয়ে অরুণিমাভ চৌধুরীর কাছে এগিয়ে এলো। সে সালাম করার জন্য নিচু হতেই ঘটল এক চরম হাস্যকর কাণ্ড। তার ঢোলা শার্টের পকেট থেকে গড়িয়ে পড়ল কয়েকটা খুচরো পয়সা, একটা ভাঙা ছোট চিরুনি আর এক পাতা ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ক্রিমের পাতা!
শান্ত অপ্রস্তুত হয়ে সেগুলো কুড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আর দীক্ষা সেই দৃশ্য দেখে সশব্দে হেসে উঠল। কিছুতেই হাসি চাপতে পারল না।

বকুল তখন লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। তার ইচ্ছে করছে, মাটির অতলে সেঁধিয়ে যেতে।
দীক্ষার পেছনে পারছে না লুকিয়ে ফেলছে নিজেকে।
শালার গরু একটা!! রাগে গজগজ করে ওঠে সে,
এমন রামবলদকে কীভাবে ভালোবাসলাম আমি! একে ভালোবাসার আগে আমার চোখ দু’খানা কোথায় হারিয়ে গেছিল? ইশ.. লজ্জাবোধ বলতে কিচ্ছু নেই… আবার কেমন দাঁত ক্যালাচ্ছে! পাঠার বাচ্চা!
একা একাই মনে মনে আওড়ে চলে বকুল।

তৃণা রান্নাঘরে। চুলোয় চড়েছে নুডুলস, যার সুগন্ধ হালকাভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তার মন নেই সেদিকে। রান্নাঘরের খোলা জানালা দিয়ে ঢলে পড়া ধূসর সন্ধ্যা আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে সে। অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের চাপা কষ্ট, আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা – সব মিলেমিশে একাকার হয়ে তার মনে এক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। মাঝে মাঝে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসছে।
ঠিক তখনই নিঃশব্দতা ভঙ্গ করে রাসেল এ ঘরে প্রবেশ করল। কোনো কিছু খুঁজতে খুঁজতে তার চোখ গেল শেলফের দিকে। সেই শব্দে তৃণার ধ্যান ভাঙল। সে ঘুরে তাকিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করল, ‘কী লাগবে?’
রাসেল চট করে পিছন ফিরে তাকাল। তার চোখে স্পষ্ট বিরক্তি।
‘তোকে বলেছি না আমার সঙ্গে কথা বলবি না,’ রুক্ষ স্বরে বলল সে, ‘তারপরও নির্লজ্জের মতো বারবার সেঁধে কথা বলিস কেন?’

তৃণার মুখ কঠিন হয়ে উঠল। চাপা কষ্ট এবার কণ্ঠে বিদ্রোহের সুর আনল।
‘আমি নির্লজ্জ নাকি তুই রাসেল? আমাকে সেই তখন থেকে দোষারোপ করে যাচ্ছিস…অথচ নিজের কাজের জন্য একটু লজ্জাবোধও হচ্ছে না?’
রাসেল যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার চোখ কপালে, গলার স্বর চড়তে শুরু করল।
‘তুই আমার সঙ্গে গলা চড়িয়ে কথা বলছিস! এত সাহস তোর!’
‘হ্যাঁ, বলছি!’ তৃণার গলায় এবার স্পষ্ট জেদ, ‘পিঠে দেয়াল ঠেকে গেছে। আর কত মুখ বুঁজে সইব? দোষ আমার হলে দোষ তো তোরও! অথচ আমি একাই দোষী… তুই কি?’

‘তৃণা…’
রাসেলের গলায় এবার ভয়ানক গর্জন। তার হুংকারের তীব্রতা রান্নাঘরের চার দেয়াল ছাড়িয়ে গেল। সেই শব্দে দ্রুত পায়ে ছুটে এলেন মিনারা বেগম,
‘কী হইছে বাবু, কী হইছে?’ ছেলেকে আগলে ধরার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, এরপর চোখ গেল তৃণার দিকে, ‘এই মা*গী আবার তোরে কী করল?’
তৃণার কান লাল হয়ে উঠল। শাশুড়ির এমন গালাগাল আর সহ্য হলো না তার। সেও চিৎকার করে উঠল, ‘আমি এ বাড়ির বউ, আমাকে বারবার গালাগাল করতে আপনার গায়ে বাঁধে না, হ্যাঁ? আমাকে আর একবার খারাপ ভাষায় ডাকলে…’

‘কী করবি তুই?’ চমকে গেছেন মিনারাও। কিন্তু পরক্ষণেই ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটল, ‘চড়ুই পাখির মুখে বুলি ফুটছে দেখি… বাপরে বাপ…’ তিনি এগিয়ে এসে তৃণার সামনে দাঁড়ালেন, ‘বল কী করবি তুই..’ এরপর রাসেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘জিগা তোর বউরে, কী করবে সে আমারে?’
রাসেল যেন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। সে গর্জে উঠে বলল, ‘ও আমার বউ না! এই শা*উ*য়া আর একবার আমার সামনে বললে আমি এই বাড়ি ছেড়ে যেদিক মন চায় সেদিক চলে যাবো বলে দিলাম।’
তর্কাতর্কি যখন চরম পর্যায়ে, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় যখন সর্বোচ্চ সীমায়, ঠিক তখনই খোলা সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন অরুণিমাভ চৌধুরী। তিনি রাজ্যের সব বাজার নিয়ে এসেছেন। বাজারগুলোর ভারে চারজন লোকও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। তিনি গটগট পায়ে হেঁটে এগিয়ে এসে রান্নাঘরের দরজা ধরে দাঁড়ালেন।
অরুণিমাভ চৌধুরীর অপ্রত্যাশিত আবির্ভাবে উত্তপ্ত রান্নাঘরের পরিবেশ মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাসেল, মিনারা বেগম এবং তৃণা- সকলেই স্তব্ধ। প্রথম নীরবতা ভাঙল রাসেল।

এক রাশ বিরক্তি নিয়ে সে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, ‘আপনি এখানে?’
অরুণিমাভ মৃদু হাসলেন। আলতো হাতে নিজের সানগ্লাসটি খুলে পাশে দাঁড়ানো একজন গার্ডের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। তাঁর চোখে ঠাণ্ডা অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
‘আমার বোন এখানে আছে, তাকে দেখতে আসব না, এটা কেমন কথা?’ শান্ত স্বরে বললেন তিনি।
মিনারা বেগম তখনো রাগের মাথায় আছেন। তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে তিক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আসছেন, দেখছেন, এবার বিদায় হন। আপনাকে আপ্যায়ন করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ যে আমাদের নেই, আশা করি বুঝতেই পারছেন।’
অরুণিমাভের হাসি আরো বিস্তৃত হলো, যেন মিনারা বেগমের কথা তাঁকে স্পর্শও করেনি।
‘যার তার ঘরে আমি আপ্যায়ন গ্রহণও করি না, এটাও আপনি বুঝতে পারছেন আই থিংক!’ অরুণিমাভ সরাসরি মিনারা বেগমের চোখে তাকালেন। এরপর তাঁর কণ্ঠস্বর আচমকা পাল্টে গেল, তাতে যুক্ত হলো উদ্দেশ্যমূলক গাম্ভীর্য।

‘যাইহোক, আমি শুধু ওকে দেখতে আসিনি, ওদের বিয়ের কাবিননামা নিয়ে এসেছি। বস্তুত সেটা তৃণার কাছে থাকা উচিত বলেই… তৃণাকে দেখাতে এনেছি। তৃণা, এদিকে আসো।’
তৃণা যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে, কাঁপা পায়ে এগিয়ে গেল। অরুণিমাভ তাকে ভাঁজ করা কাগজটি ধরিয়ে দিলেন।
‘পড়ে দেখো সব ঠিকঠাক আছে কিনা। নাম, বাবার নাম, ঠিকানা… সব দেখো।’ অরুণিমাভ তাকে খুঁটিয়ে দেখতে বললেন, ‘আর, দেনমোহর ঠিক আছে কিনা দেখো তো।’
তৃণা কাগজটির ভাঁজ খুলল। তার চোখ নাম, ঠিকানা পেরিয়ে দেনমোহর লেখার স্থানে স্থির হলো। সংখ্যাটি দেখেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে যেন মুহূর্তে বোবা হয়ে গেছে, হাতে ধরা কাবিননামাটি কাঁপছে।
অরুণিমাভ পরিস্থিতি লক্ষ্য করলেন। তিনি বললেন, ‘সংখ্যাটা উল্লেখ করো, তৃণা।’
তৃণা কোনো কথা বলতে পারল না। তার বিস্ময় কাটছে না দেখে অরুণিমাভ নিজেই কাগজটি তার হাত থেকে আলতো করে তুলে নিলেন। এরপর রাসেল ও মিনারা বেগমের দিকে সরাসরি তাকালেন।
তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘দেনমোহর পঞ্চাশ লক্ষ টাকা।’

কথাটি যেন বজ্রপাতের মতো শোনাল।
ফিফটি ল্যাক! পঞ্চাশের পর চারটা শূন্য!
এই সংখ্যাটি শুনে রাসেল এবং মিনারা বেগম- দু’জনের মাথাতেই যেন আকাশ, পাতাল, পৃথিবী, সব একসঙ্গে ভেঙে পড়ল। তাদের মুখের রঙ পাল্টে গেল, চোখ ছানাবড়া। রাসেলকে দেখে মনে হলো আর সামান্য বাকি, সে বুঝি স্ট্রোক করবে।
মিনারা বেগম কোনোমতে তোতলাতে তোতলাতে প্রশ্ন করলেন, ‘কত… কত?’
অরুণিমাভ হাসি চেপে রেখে, অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিলেন, ‘পঞ্চাশ লাখ।’
রান্নাঘরের আবহাওয়া যেন জমাট বেঁধে গেছে। অরুণিমাভ চৌধুরীর বলা ‘পঞ্চাশ লক্ষ টাকা’ শব্দ ক’টি মিনারা বেগম ও রাসেলের মাথায় ক্রমাগত হাতুড়ির ঘা দিচ্ছে। মিনারা বেগমের মুখ দেখে মনে হলো, তিনি যেন এক্ষুনি জ্ঞান হারাবেন।
তোতলামি কাটিয়ে তাঁর গলায় এবার তীব্র ক্রোধ আর আতঙ্ক মিশে গেল।

‘পঞ্চাশ লাখ? আপনি কার সঙ্গে কথা বলে এত টাকা দেনমোহর ধার্য করেছেন, হ্যাঁ? কে আপনারে এত ক্ষমতা দিল? আমাদের অবস্থা না জেনে…এই গাঁজাখুরি দেনমোহর আমরা মানব না!’
মিনারা বেগম দ্রুত অরুণিমাভের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাঁর চোখ কপালে।
‘আমি মামলা করব আপনার নামে! এই কাগজ ভুয়া! আপনি জোর করে আমার ছেলের ওপর এই শর্ত চাপিয়েছেন! আমরা আপনাকে দেখে নেব!’
অরুণিমাভ চৌধুরীর মুখে তখনো সেই শান্ত হাসি। তিনি মিনারা বেগমের অস্থিরতাকে উপেক্ষা করে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে জবাব দিলেন।

‘আচ্ছা, করেন। আপনার যা যা করার আছে, আপনি করুন,’ তিনি পকেট থেকে তাঁর রুমাল বের করে সানগ্লাসটি মুছতে মুছতে বললেন, ‘তবে আমার বোনকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার আগে অথবা তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে এই ‘পঞ্চাশ লক্ষ’ টাকার দেনমোহরের অঙ্কটা একটু ভালো করে মাথায় রাখবেন।’
‘আর হ্যাঁ…’ আবার মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে বললেন, ‘ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার আগে একটু ভেবেচিন্তে করবেন… মামলা শুধু আপনি না, আমিও করতে পারি, এটা মাথায় রাখবেন। মামলা চালানোর মতো অর্থকরী আপনার না থাকলেও আমার যে যথেষ্ট আছে, আশা করি আপনি এতটুকু বুঝেছেন…’
অরুণিমাভ এবার দৃষ্টি ফেরালেন তৃণার দিকে। সে তখনও হাতে কাবিননামাটি ধরে স্তম্ভিত। অরুণিমাভ এগিয়ে এলেন, আলতো করে তার কাঁপা মাথায় হাত রাখলেন।

‘সাবধানে থেকো,’ শুধুমাত্র এইটুকুই বললেন তিনি। এরপর তিনি তাঁর লোকজনকে ইঙ্গিতে বাইরে অপেক্ষার নির্দেশ দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
অরুণিমাভ চলে যেতেই মিনারা বেগমের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি মাটিতে বসে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন।

‘তুই এ কী অভিশাপ আনলি আমার ঘরে কু*ত্তার বাচ্চারে! মরছিলি মরছিলি, অন্য জায়গায় গিয়া মরতি, এইখানে মরলি কেন… হায় আল্লাহ, আমাদের এখন কী হবে! পঞ্চাশ লাখ!’
তাঁর আহাজারি আর বিলাপ রান্নাঘরের কোনায় কোনায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তিনি ভাগ্যকে দোষ দিতে লাগলেন, তৃণার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে থাকলেন।
কিন্তু তৃণা সেদিকে বিন্দুমাত্র কান দিল না। তার চোখে এখন আর জল নেই, আছে কেবল কঠিন এক দৃঢ়তা। সে যেন এক নতুন তৃণা। সে চুপচাপ অরুণিমাভের রেখে যাওয়া বাজারভর্তি ব্যাগ গুলোর কাছে গেল। সবজি, ফল আর অন্যান্য সদাই গোছানো শুরু করল।
বাহিরের সন্ধ্যা এখন ঘরের ভেতরেও গাঢ় অন্ধকার নিয়ে এসেছে। কিন্তু তৃণার মুখে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

সবেমাত্র এশার নামাজ শেষ করেছেন খালেদা বেগম। শরীরটা ক্লান্ত লাগছিল, তাই এক কাপ গরম চায়ের খোঁজে তিনি রান্নাঘরের দিকে এগোচ্ছিলেন। বাড়ির ভেতরে তখন গভীর নিস্তব্ধতা। অরুণিমাভ নেই, বকুল ঘুমিয়ে আছে, আর শান্তও বাইরে গিয়ে এখনো ফেরেনি। এই নিঃসঙ্গ পরিবেশে কেমন যেন একা একা লাগছে তাঁর।
ঠিক এই সময়ই শব্দটি শুনলেন তিনি। ধপ করে কিছু একটা ভারী জিনিস মেঝেতে পড়ার মতো আওয়াজ, তারপরই সব চুপচাপ। আকস্মিক এই শব্দে খালেদা বেগমের বুকটা কেঁপে উঠল। কোনো অশুভ ইঙ্গিত যেন তাঁকে আচ্ছন্ন করল।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৯

তাঁর পায়ে দ্রুততা এলো। চায়ের কথা ভুলে দ্রুত পায়ে তিনি দীক্ষার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
দ্বিধা না করে দরজাটা খুলে যেই তিনি সামান্য মাথা ঢুকিয়ে ভেতরে দৃষ্টি দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কলিজা ছিঁড়ে এক তীব্র আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো।
তাঁর সোনামানিক, তাঁর বুকের মধ্যমণি দীক্ষা…মেঝেতে ঢলে পড়ে আছে, নিথর, নিস্তব্ধ!

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩১