তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১৩
ঐশী আফরিন
মেয়েটা কথা শেষ করে হাঁপরের মত কয়েকবার দম নিল।আদিত্য এতক্ষন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল।এবার চোখ সরিয়ে নেয়।পুরো ঘটনাটা তার মাথার উপর দিয়ে গেল।জটিলতা কেবল বাড়ছে বইকি কমছে না।এত বছর আগে তার পুরো পরিবার মারা গেলে তাহলে বর্তমানে মেয়েটা জেলে কিভাবে থাকে?কাহিনীটা পুরোনো হলে বর্তমানটা এরকম কিভাবে?বিষয়টা এখনও এক বিন্দিও খালাস হয়নি।
কৌতুহল দেখতে না পেরে আদিত্য বলে “কিন্ত আপনার অতীতের সাথে বর্তমানের মিল পাচ্ছি না তো ”
” আমিও পাই নি ”
” এখন পেয়েছেন?”
” পরিস্থিতি দিয়েছে ”
” আপনার বলা ঘটনা থেকে সব উত্তর পাই নি ”
” দিতেও চচ্ছি না ”
” আপনি যথেষ্ট বুঝদার ও বুদ্ধিমান মিসেস মাধবীলতা হায়দার।আশা করি আপনাকে আর বুঝাতে হবে না ”
মাধবী তাকে হায়দার সম্বোধন করায় চোখ তুলে চায়।এই প্রথম তাকে কেউ হায়দার সম্বোধন করলো।এই সম্বোধনে তার ভেতর তেঁতেঁ উঠল।তবে সে নিরব রইলো।
আদিত্য আবার বললো ” কী হলো?”
মাধবী কিছু বললো না। আদিত্য কিছু একটা ভেবে বললো ” আচ্ছা?তাহলে এই ইশানরা কারা?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
” বিধ্বংসী ”
আদিত্য ভ্রু কুচকে বললো “মানে?”
” মানে বলতে কিছু হয় না ”
” ইশানদের সাথে আপনাদের কীসের সম্পর্ক?”
” কোন সম্পর্ক নেই ”
মাধবীর গা ছারা ভাবে আদিত্য বিরক্ত। এদিকে এমপি আরিয়ান বারবার উপরমহল কে চাপ দিচ্ছে মাধবীকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্ত সমাজ তো ছেরে দেবে না।দেখে শুনে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে মেয়েটা অন্যায়ের প্রতিবাদী।তাহলে অন্যায়ের প্রতিবাদী হয়েও নিজেই কীভাবে অন্যায় করতে পারে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না আদিত্য। কোন না কোন কারন তো নিশ্চয়ই আছে। এখন কারনটা বললে তো দেশবাসীকে সত্যটা জানিয়ে মেয়েটাকে মুক্তি দেওয়া যেত।কিন্ত মেয়েটা বড্ড ছন্যছাড়া বেপরোয়া স্বভাবের।
তবে এবার আদিত্য আসল কথায় আসে ” আপনি কি মুক্তি পেতে চান?”
” মুক্তি আবার কে না চায়?”
রমনীর জবাবে সে অবাক হলেও বললো ” যদি মুক্তি পেতেই চান তাহলে সত্যিটা আমাদের জানাতে হবে।আপনার স্বামী রীতিমত জেরা করছে ছাড়াতে তাই সত্যিটা বলে উনার কাছে চলে যান ”
” উনি আমাকে সুযোগ দেবে?”
” মনে হচ্ছে।উনি আপনাকে অনেক ভালোবাসে মিসেস মাধবী।আপনি এমনটা না করলেও পারতেন ”
মাধবী কিছুই বললো না। ইশশশ মেয়েটার কি কোন আবেগ অনুভূতি নেই?আদিত্য বুঝে পায় না।না এই মেয়েকে কাঁদতে দেখেছে না হাসতে।তবে এতটুকু তো বলতেই হবে রমনীর রুপ,গুন,প্রতিভা,প্রতিপত্তি,
অর্থ-সম্পদ,সাহস,তীক্ষ্ণতা,ক্ষমতা,কৌশল,ভালোবাসা সবই ভয়ংকর।
আদিত্য বললো ” বলবেন?”
” ক্লান্ত লাগছে ”
এরমধ্যেই একজন এসে খবর দিয়ে যায় এমপি আরিয়ান তার স্ত্রীর সাথে দেখা করতে এসেছে।মাধবীর শিরায় শিরায় অস্থিরতা ছড়িয়ে পরে।আদিত্য উঠে চলে যেতে নিলে মাধবী পেছন থেকে ডাকে ” এই নিন।এখানে শুরু থেকে শেষ সবটা লেখা আছে ”
আদিত্য ভ্রু কুচকে মাধবীর বারিয়ে দেওয়া লোহার বক্সের মত জিনিসটা হাতে নেয়।একটা খাতার মত মনে হলো যার উপরের মোলাট টা লোহার।কালো রঙের উপরে নীল হীরা গুলো চকচক করছে।বেশ মোটা খাতাটা।
” এই নিন চাবি।খুলে পড়া শুরু করুন ”
আদিত্য চাবি নিয়ে বেরিয়ে নিজ কক্ষে চলে যায় যাওয়ার আগে আরিয়ান কে ঢুকতে দেওয়ার কথা বলে যায়।আদিত্য চেয়ার টেনে বসে খাতাটা খুলে এর পরের ঘটনা থেকে পড়া শুরু করে________।
মাধবীকে আষ্টেপিষ্টে জরিয়ে ঘুমিয়ে আছে আরিয়ান। সে কখন থেকে উঠার জন্য মোচঁরা মুচঁরি করছে উঠার জন্য কিন্ত লাভ হচ্ছে না বিশেষ।টুপ করে মাধবী কে একটা চুমু খেয়ে আবারও জরিয়ে ধরে সে।ব্যক্তিগত শ্রেয়সীকে বুকে নিয়ে ঘুমানোর মত শান্তির অনুভূতির চেয়ে আর কোন সুন্দর অনুভূতি আছে বলে আরিয়ানের মনে হয় না।তবে এই সুন্দর অনুভূতির বেঘাত ঘটিয়ে হঠাৎই তার গায়ে পানি এসে পরে।ধরফরিয়ে উঠে বসে সে।গা সহ বিছানা সব ভিজে জুবুথুবু।সামনে তাকিয়ে দেখে মাধবী এক হাতে বালতি আরেক হাত কোমরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।বুঝলো এই ফাজিলের কাজ এটা।
রেগে সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মাধবী বলে ” কতদিন ধরে এসব চলছে ?”
আরিয়ান ভ্রু কুচকে বলে ” কোনসব?”
” কোলবালিসের সাথে ফষ্টিনষ্টি?”
আরিয়ান এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে সে এতক্ষন স্বপ্নের মাঝে কোলবালিস কে মাধবী ভেবে জরিয়ে ঘুমিয়ে ছিল।আরিয়ান কপাল চাপরায় দিন দিন অবনতি ছাড়া উন্নতি হচ্ছে না তার।তাই চুপ থাকে।
আরিয়ান কে চুপ থাকতে দেখে মাধবী হাতের বালতি বিছানায় রেখে বলে ” আমি মামিকে বলছি।তোমার ছেলে কি আর সাধে বিয়ে করে না।ঘরে কোলবালিসের সাথে…”
” তুই চাইছিস এবার এই ভেজা কাপড় গুলো তোকে দিয়ে ধোঁয়াই?”
” এহ! আসছে! নিজেরটা নিজে ধুবেন ”
বলতে বলতে মাধবী দরজা ছেরে বেরিয়ে যায়।বলাতো যায় না সত্যি সত্যিই যদি তাকে দিয়ে ধোঁয়ায় !আরিয়ান বিছানা থেকে নামতে নামতে নিলে আবারও দরজা দিয়ে ছোট্ট মাথাটা উঁকি দেয়।
” আপনাকে মামি খেতে ডেকেছে।এক মিনিটের মধ্যে না আসলে খুন্তি নিয়ে আসতে পারে।আবার আমাকেও পাঠাতে পারে ”
” তা তুই খুন্তি দিয়ে আমাকে কী করবি শুনি?”
বলতে বলতে আরিয়ান এগিয়ে যেতে নিলেই মাধবী দৌড়ে পালায়।আরিয়ান ঠোঁট বাকিয়ে মুচকি হাসে।
রাজবাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর মাঝে কেটে গেছে দু বছর।দু বছরে পাল্টেছে অনেক কিছু।সেদিন মাধবী অজ্ঞান হওয়ার পর আরিয়ান তাকে নিজেদের বাড়ি ‘ইশানস প্যালেস’ এ নিয়ে এসে পরে।এখন মাধবী এখানেই থাকে।এখন আর সে আগের মত অন্দরেই কাটায় না সারাদিন।আগের মত আর নিজেকে অত আড়াল করার চেষ্টা রাখে না।এই দু বছরে মাধবী নিজেকে সামলে নিলেও মনে মনে আজও অনুসন্ধান এক মুহূর্তের জন্যও থামায়নি।গোপনে সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে খুনিদের খুঁজে বের করার।চঞ্চল মেয়েটা হয়ে উঠেছে আরও চঞ্চল।আমাদের জীবনে এমন অনেক ধাক্কা আসে যা কাউকে বানায় নিস্তব্ধ,কাউকে বানায় চঞ্চল আবার কাউকে বানায় কাঠখোট্টা স্বভাবের।নিয়মটা থেকে মাধবীর জীবনে স্থান পেয়েছে চঞ্চলতাটা। তবে তার চঞ্চলতাটা বাড়িতেই সীমাবদ্ধ।
রাজ্য শাসনে সে বেজায় কঠোর।যদিও সে ময়মনসিংহ থাকে না তবে বাবার অনুপস্থিতিতে রাজ্য শাসনের ভার তাকেই নিতে হয়েছে।আর তার সাথে সঙ্গ দিচ্ছে আরিয়ান। প্রতি সপ্তাহে দুজন গিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আসে।আপাতত রাজবাড়ি ফাঁকা পরে আছে।কেউ ভুলেও সেদিকে পা বারায় না।যেখানে মানুষ খুন হয় সেখানে নাকি তাদের প্রেত আত্নারা ঘোরা ফেরা করে।আর এই বাড়িতে তো এক দুজোন নয় পুরো পরিবার খুন হয়েছে।এমনিতেই রাজবাড়ির পেছনের বট গাছটা নিয়ে নানান কথা রচিত আছে।তাই এখন আর কেউ দিনের বেলাতেও ভুল করে রাজবাড়িতো দূর রাজবাড়ির এরিয়ার আশপাশও মারায় না।
তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল রাজবাড়ি নাকি দিন দিন বিশাল আকার ধারন করছে।কথাটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। মাধবী নিজেও দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছে বিশাল রাজবাড়ি আরও বিশাল হচ্ছে।কিন্ত কিভাবে হচ্ছে কেউ জানে না।বদ্ধ বাড়ি থেকে ভেসে আসে বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ। ভেসে আসে ঘুঙুর পরিহিত নাচের আওয়াজ। আবার কখনও শোনা যায় খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ। বাতাসে ভেসে বেরায় পোরা মাংসের গন্ধ।
এক সময়ের জাকজামক রাজবাড়ি ছেয়ে আছে মাকরশার জালে।সেই বড় বট গাছটার শেখর দেয়াল বেয়ে উঠে রাজকীয় দেয়ালগুলোতে ফাটল তুলছে।বাড়ির আসেপাশের সমস্ত গাছগুলোকে অযত্নে বেরে উঠা আগাছারা গিলে খাচ্ছে।বাগান জুড়ে লাগানো মাধবীলতার গাছগুলো শুকিয়ে মিশে যাচ্ছে মাটির সাথে।বিশাল পদ্ম পুকুর আজ কেবল নোংরা ডোবায় পরিনত হয়ে আছে।রাজ্যের মুরুব্বিদের মতে বাড়িতে অনেক দিন কেউ না থাকায় তা জিনদের দখলে চলে গেছে।তা ফিরিয়ে আনার সাহস দেখালে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।তাই আজও অভিশপ্ত বাড়িটি এভাবেই পরে আছে।
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১২
আরিয়ান সংসদে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ তৈরী হয়ে নিচে আসে গায়ে শুভ্র পাঞ্জাবির হাতা কঁনুই পর্যন্ত গোটানো।বুক পকেটে রাখা ছোট্ট একটা রুমাল।ঘার ছুইছুই বাবরি চুলগুলো সুন্দর করে সেট করা।বা হাতে কালো ঘড়ি।কালো চশমাটা গলায় ঝুলানো।মোটকথা একজন সুনামধন্য এমপি হিসেবে তার যেভাবে থাকা দরকার সেভাবেই সে তৈরী।কয়েকদিন আগে হওয়া ইলেকশনের জেতা সদ্য এমপি সে।দলীয় তহবিলের একজন যোগ্য যুবনেতা হওয়ায় সে প্রথম বারেই এমপি পদপ্রাপ্ত হতে পেরেছে।রাজনীতির দিক দিয়ে বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরাও তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার কারনে তাকে যথেষ্ট সম্মান করে।একই সাথে সে সেনাপতি এবং এমপি দুটো দিকই সামলাচ্ছে।
