চারুবৃত্ত পর্ব ১১ (২)
জুলি জোনাকি
রাত দুটো ছুইছুই, সবে সবে অনুষ্ঠান শেষ করে যে যার ঘরে ঘুমাতে গেল । সবার যাওয়ার পরেও বৃত্ত মা তীক্ষ্ণ নজরে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল । চারু আর তার মা থালা বাসন ধুয়ে বসার ঘর পরিষ্কার করে তারপর ঘরে গেল । মা মেয়ে বিছানাতে গা এলিয়ে দিতে যাবে এমন সময় দরজায় টোকা পড়লো । চারুর মা উঠতে গেলে চারু বাধা দিয়ে বলল,
“তুমি ঘুমিয়ে পড়ো অনেক ধখল গেছে । আমি দেখছি । চারু গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আওয়াজ দিল ,
“কে ?”
বাইরে থেকে উওর এলো না কেবল দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ এলো । খুলে দিল দরজাটা । দরজার ওপাশে হাসতে থাকা মানুষকে দেখে চারু বাইরে গিয়ে বলল,
“এতো রাতে তোমরা এখানে ?”
“রান্না ঘরে চল কাজ আছে ।”
“কি খাবে বলো বানিয়ে দেই ?”
“দে ভারি কিছু, খুব ক্ষুদা পাইছে । তখন খেলেই ভালো হতো , না খেয়ে এখন ঘুমিই আসছে না । খাবারও শেষ ।”
চারু হেসে বলল,
“ঠিক আছে বিন্দু, বিন্তি তুমি কি খাবে ?”
“তোর যেটা ভালো লাগে বানিয়ে দে । ”
তখন দুই বোন না খেয়েই উপরে চলে গিয়েছিল । এখন ক্ষুদাতে ঘুম আসছে না জন্য মাঝরাতে চারুকে চুপিচুপি ডেকে তুলে এনেছে , খাবার বানিয়ে দেওয়ার জন্য । চারু রান্না ঘরে ফ্রাইড রাইচ বানাতে লাগলো আর দুই বোন উঁকি দিয়ে তা দেখছিল । নীরবতা কাটিয়ে বিন্দু বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“আচ্ছা চারু তোর কেমন ছেলে পছন্দ? ”
এমন আহামরি প্রশ্ন শুনে চারু কপালে ভাঁজ ফেললো বলল,
“এমন প্রশ্ন কেন করছো ?”
“বল না ।”
চারু হাসলো । তা দেখে বিন্তি বলল,
“তুই হাসছিস কেন ? তোর মনে আবার কেউ আছে নাকি? ”
চারু হাসি থামিয়ে বলল,
“আমার মনে আবার কে থাকবে ?”
“তাহলে বলল কেমন ছেলে পছন্দ? ”
“তেমন না , আমায় আর আমার মাকে সম্মান করবে এতেই হবে ।”
“হুমম বুঝলাম ।”
বিন্দু পেটে হাত রেখে তারা দিয়ে বলল,
“কিরে আর কতো খন লাগবে ?”
“এইতো হয়ে গেছে , তোমরা টেবিলে বসো আমি নিয়ে আসছি ।”
বিন্দু আর বিন্তির প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে পাশে বসলো চারু , এমন সময় পা টিপে কেউ এসে চারুর পাশে বসে প্লটটা তুলে ফিসফিস করে বলল,
” আমাকে ও একটু দাও , হেব্বি ক্ষুদা পেয়েছে ।”
চারু নড়েচড়ে তাকালো । বৃত্ত প্লট নিয়ে বসে আছে । চারু উঠে দাড়াতে গেলে বৃত্ত হাতটা ধরে তার কাছে বসিয়ে দিল । বলল,
“উঠতে হবে না , বসেই তো দেওয়া যায় । ”
চারু অসস্থি নিয়ে স্থির হয়ে বসলো , বৃত্তের দিক না তাকিয়ে খাবার প্লেটে তুলে দিল । বৃত্ত এক লোকমা মুখে দিয়ে বলল,
“বাহ , দারুন ! তুমি খাও ।”
“আমার ক্ষিদে নেই ।”
বিন্দু বলল,
“তুমি না তখন খেলে ?”
“তো কি এখন খেতে পারি না ?”
“না সেটা বলছি না , তবে এতো তারাতারি ক্ষুদা পেল কি করে ।”
“খাচ্ছিস খা না ।”
“ওকে ।”
বিন্দু বিন্তি মুখ টিপে হাসলো । চারু চুপ করে বসে ছিল । বৃত্ত খাচ্ছিল আর চারুর মুখের দিক লুকিয়ে লুকিয়ে তাকাচ্ছিল ।
আজ বিয়ে ,কতো কাজ । সেই সকাল সকাল সবাই ঘুম থেকে উঠেছে । বৃত্তের বাবা মা বাইরে উঠানে কাজ করছে । এদিকে চারু আর তার মা সকালের খাবার ব্যবস্থা করছে । রুহি এসে বলল,
“চারু কফি বানিয়ে দাও তো আমার বৃত্ত ভাইয়ের জন্য ।”
চারু ফ্লোরে বসে সবজি কাটছিল , রুহি হাক দিতেই বলল,
“একটু অপেক্ষা করো ।”
” পারবো না গো । এখনি দাও ।”
চারু বিরক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালো । কফি বানিয়ে দিলো তা রুহি বৃত্তের রুমে নিয়ে গেল ।
“বৃত্ত ভাই, ঘর খুলো ।”
বৃত্ত খালি গায়ে উপুর হয়ে বেঘরে ঘুমাচ্ছিল । রুহি বেশ কিছু বার ডাকার পর সারা পেলো ,
“কে ?”
ঘুম জড়ানো ভারি কন্ঠে বৃত্ত আওরাল । রুহি বলল,
“আমি রুহি ,কফি এনেছি তোমার জন্য ।”
“লাগবে না তুই খা , আমায় ঘুমাতে দে ।”
“এটাতো তোমার জন্য বানিয়েছি । ”
ভেতর থেকে কোন উওর এলো না । অনেক ডাকলো ,সাড়া না পেয়ে ঠোঁট উল্টে চলে গেল রুহি ।
দুপুরে সবাই সেজেগুজে অপেক্ষা করছে কখন বর আসবে । চারু বিন্দুদের কাছে ছিল । বাড়ি ভর্তি হইচই শুরু হলো ,
‘বর এসেছে বর এসেছে ‘
সবাই সে দিক গেল । বৃত্ত গিয়ে সোনার চেন পড়িয়ে দিয়ে নামাল । বর পক্ষকে বেশ খাতির যত্ন করলো । রুহি বরের হাত ধোয়ালো । তা নিয়ে বেশ কিছুখন মজা হলো । ওদিকে বিন্দু আর বিন্তি মিলে জোর করে চারুকে শাড়ি পড়িয়ে দিয়ে হালকা সাজিয়ে দিয়েছে । একদম বাঙ্গালী বাঙ্গালী লাগছে , চুল ছেড়ে তাতে একটা গাঁদা ফুল গুঁজে দিয়েছে । বৃত্ত ও পিঙ্ক রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে চারু তা জানে না । এটা নিয়ে যে ঝামেলা হতে পারে তাও চারুর ছিল না ।
বিয়ে পড়ানো শুরু হবে বলে বউ নিয়ে যাওয়ার ডাক এলো । বৃত্ত নিজে এলো বোনদের নিতে । ঘরে পা রাখতেই চোখ আটকে গেল দুই বোনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধ, মায়াবি শ্যামবতীর দিক । চারু আচলের এক কোণা ধরে আঙ্গুলে পেচিয়ে খেলছে । বৃত্ত ভেজা ঢোক গিলে ভেতরে ঢুকে বলল,
“চ চল যাবি ।”
কথাটা চারুর দিক তাকিয়ে বলল। বিন্তি হাসলো । বিন্দু বলল,
“কাকে নিতে এসেছ আমাদের নাকি চারু কে?”
বৃত্ত চোখ ঝাকিয়ে উঠলো । চোখ ছোট্ট ছোট্ট করে জবাব দিলো,
“বিয়ে তোদের ওর দিক নজর দিচ্ছিস কেন ?”
“আমরা কখন দিলাম তুমিই তো ওর দিক তাকিয়ে কথাটা বললে ।”
চারু বেশ লজ্জা আর অসস্থি একসাথে নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল । বৃত্ত বলল,
“এই চলতো বিদেই হবি ।”
বৃত্ত তাদের নিয়ে গেল । পেছন পেছন চারু ও গেল । বৃত্তের মায়ের চোখে পড়তেই ফস করে উঠলো । মানুষ দেখে কিছু বললো না ।
বিয়ে টা বেশ সুন্দর ভাবে সম্পূর্ণ হলো । চারু এক কোনে বিদায়ের পর্ব দেখছিল । এই প্রথম বৃত্তকে কান্না করতে দেখলো । দু বোনকে একসাথে বুকে আগলে কান্না করছিল । চারু কেবল তাকিয়ে থাকলো । বিন্দু আর বিন্তি কে গাড়িতে তুলে দিতে গেল বৃত্ত সাথে সাথে সবাই গেল । বৃত্তের মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল তা দেখে চারু এগিয়ে গিয়ে পাশে বসলো । বলল,
“কাকিমা কান্না করো না । ওরা খুব ভালো থাকবে দেখো ।”
বৃত্তের মায়ের তখনকার রাগ টা এসে মাথায় ঝেঁকে বসলো । ফসফস করে ডুকরে উঠে চারুকে নিজের থেকে দূরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
” তুই আগে বাড়ি থেকে বিদেই হয় ছোটোলোকি । তোর চালাক আমি বুঝি না ? এমন সেজেগুজে আমার ছেলের আসে পাশে দাঁড়াতে বারণ করেছি না ? কেন শাড়ি পড়েছিস ?”
চারু বেশ ভয় পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিল । বৃত্তের মায়ের আওয়াজ পেয়ে রুহি আর চারুর মা দৌড়ে ভেতরে এলো । চারুর মা মেয়েকে এমন পরে থাকতে দেখে গিয়ে টেনে তুললো । রুহি ফুপির হাত ধরে বলল,
” কি হয়েছে ফুপি ?”
বৃত্তের মা মারার জন্য হাত তুলে এগিয়ে যেতেই বৃত্ত এসে ধরে ফেললো । আস্তে আস্তে বাড়িতে মানুষ ভরে গেল । বৃত্তের বাবা এসেও জানতে চাইলো ,
” কি হয়েছে বৃত্তের মা এমন করছো কেন ।”
বৃত্তের মা মুখে বাজে ভাষা ব্যবহার করে বলল,
“এই খানকি টারে বাড়ি থেকে বিদেয় করো । আমার ছেলেটারে ফাঁসাচ্ছে ছোটলোকের বাচ্চা । এই জন্য ব……”
বৃত্ত তার মাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
” কি হয়েছে মা এমন বাজে ভাষায় কেন কথা বলছো ? কি করেছে চারু ?”
“কি করেছে হ্যা, আচ্ছা তুই সত্যিই আমার ছেলে তো ? তোর রুচি এতো খারাপ কবে থেকে হলো যে এই ছোটলোকের পাল্লায় পরলি ?”
বৃত্ত এবার রেগে গেল । গলার রগ ফুলে উঠলো । চারুর দিক তাকাতেই দেখলো চারু মুখ চেপে কান্না করছে । এতে যেন বৃত্ত আরো বিগরে গেল । বাড়ি ভরতি লোককে তোয়াক্কা না করে বলল,
” মা তুমি এমন করে ওর সাথে কথা বলতে পারো না , তোমার পছন্দ না ভালো কথা সংসার আমি করবো আমার পছন্দ হলেই যথেষ্ঠ । ”
বৃত্ত মা আরো বাজে ভাষা বলতে লাগলে বৃত্তের বাবা ধমকে বলল ,
” থামো বলছি ? এসব কথা পড়ে হবে বাড়ি ভরতি লোক কি বলবে ?”
“তুমি আমায় চুপ করাচ্ছ ? নিজের ছেলেকে কে তো মানুষ করতে পড়লে না আবার বড় বড় কথা বলছো ?”
পরিবেশটা বেশ বিগরে গেল । এদের মধ্যে রুহি গিয়ে বৃত্তের কাছে ফোরন কেটে বলল,
” ছি বৃত্ত ভাই তোমার রুচি এতো খারাপ যে তু…..”
পুরো কথা শেষ না হতেই রুহির গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় পড়লো । রুহি ফ্লোরে পড়ে গেল ।
“চারুর বিষয়ে একটা বাজে কথা কারো মুখ থেকে শুনতে চাইছি না , নাহলে আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না ।”
শেষের কথাটা বৃত্ত মায়ের দিক তাকিয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে দাতে দাত পিষে বলল ।
চারু চমকে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো । রুহির মা এসে ধরলো ,রুহির বাবা বৃত্তের দিক হাত তুলে রুক্ষে যেতেই চারু এসে ধরলো ।
” আপনারা ঝামেলা করবেন না ,আমি এখুনি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি । ”
বৃত্ত হাত চেপে ধরে বলল,
” কোথাও যাবে না তুমি ।”
বৃত্তের মা এসে বৃত্তকে সবার সামনে গায়ে হাত তুলতে গেলে বৃত্তের বাবা ধরে ধমকে সেখান থেকে নিয়ে ঘরে আটকে রেখে আসলো । পরিবেশ স্বাভাবিক করতে সবাইকে চলে যেতে বলল । বৃত্ত এখনো চারুর হাত ধরে আছে চারু হাত ছাড়ানোর শত চেষ্টা করে যাচ্ছে । রুহির বাবা মা মুখামুখি করে মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন আর বৃত্ত কে আঙ্গুল উচিয়ে শাষিয়ে গেলেন । উপর থেকে বৃত্তের মা গাল মন্দ করতে করতে চারুকে বলতে লাগলো ,
” খানকির মেয়ে তুই আমার বাড়ি থেকে এখনি বেড় হ । ছোটলোকের বাচ্চা বের হ বলছি ।”
চারু আর তার মা কেদেই যাচ্ছে । জোরে ঝেংটা দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে এক কাপড়েই বাড়ি ছেড়ে চলে গেল চারু আর তার মা । বৃত্ত আটকাতে গেলে চারু চেঁচিয়ে উঠল,
চারুবৃত্ত পর্ব ১১
” আপনি দয়া করে আমার পিছে আসবেন না , আপনি আমার জিবনটাকে আজ সবার সামনে জোঁকার বানিয়ে দিলেন । বারং করার শর্তেও পেছনে পড়ে আছেন ।”
“আ আমি সব ঠিক করে দিব আমার কথা শুনো ।”
চারু বৃত্তের কথা না শুনে কাজল লেপটে কান্না করতে করতে বাড়ি ছাড়লো । বৃত্ত ফ্লোরে বসে ক্লান্ত সুরে আওরাল,
” যেওনা চারু , শুনো !”
