Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৫

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৫

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৫
ঐশী আফরিন

আয়াজ আর ইচ্ছের বিয়েটা এতই তাড়াতাড়িই হলো যে বিষয়টা কেউ ভালোভাবে বুঝতেই পরেনি। একদিকে কবুল বলা শেষ হয় আরেক দিকে সবার হুশ আসতে থাকে। এভাবে বিয়েটা দেয়া একদমই ঠিক হয়নি। যতই হোক বাড়ির বড়ো ছেলের বিয়ে। কিন্ত এখন আর তো বলেও লাভ হবে না। তাই কেউ আর কথা বারায় না। ইচ্ছে এখনও জানে না তার বিয়ে আয়াজের সাথে হয়েছে।

বিয়ের শেষে আয়াজের বাবা আনোয়ার ইশান ইচ্ছেকে উদ্দেশ্য করে বলেন “তোমার সম্বন্ধে আমরা ভালোই জানি। তাই কোন কথাবার্তা ছাড়া হুট করে বিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করিনি। কিন্ত তোমার বাবা মায়েরও তো কথা থাকতে পারে। তোমার পরিবারকে খবর দেও”
আরিয়ান বলে “খবর দেয়া হয়ে গেছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই তারা এসে পরবে”
আরশির বাবা ফখরুল ইশান বলে “এসেই যেহেতু পরছে তো ওরা আসলেই বিয়েটা দেয়া যেত। এত তাড়াহুড়া করা কি দরকার ছিলো?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“যা হয়েছে তো হয়েছেই”
আরিয়ানের বাপ চাচা তিন জন। আনোয়ার ইশান সবার বড়,মেঝো ছিলেন নেওয়াজ ইশান,আর ছোট ফখরুল ইশান। আনোয়ার ইশানের স্ত্রী রাশেদা ইশান। বড় ছেলে আয়াজ,ছোট মেয়ে রুহি। নেওয়াজ ইশানের স্ত্রী মাহমুদা ইশান। একমাত্র পুত্র আরিয়ান। আর ফখরুল ইশানের স্ত্রী নমিতা ইশান।একমাত্র মেয়ে আরশি। এই কয়েকজন মিলেই ছোট্ট পরিবার।
কিছুক্ষনের মাঝেই ইচ্ছের পরিবার আসে। তারাও আর দ্বিমত করেনি। কারণ তারাও জানে বিয়েটা আয়াজের সাথে হয়েছে। নিঃশ্বন্দেহে আয়াজ ভালো ছেলে। তবে তারা জানায় বিয়েটা যেভাবেই হোক এখন অনুষ্ঠান করা হবে। তাদের প্রস্তাব শুনে মাহমুদা ইশান বলে

“বিয়ে কিন্ত শুধু দুজনের হয়নি চারজনের হয়েছে। তাই চারজনেরই এক সাথে অনুষ্ঠান করা হোক”
এখনও বাড়ির পুরুষদের জানানো হয়নি মাধবী আর আরিয়ানের বিয়ের কথা। আরিয়ানের বন্ধু বান্ধবরাও জানে না ব্যাপারটা। ইচ্ছের সাথে তখন অভি,অপূর্ব,
অরিন্দ ওরাও এসেছে। ওরা এখন বড়দের সামনে চুপ করে বসে আছে। অপূর্ব একটু পর উঁকি দিয়ে মাধবীকে দেখার চেষ্টা করছে। আর অভির চোখ রুহির দিক থেকে সরছেই না। অরিন্দ চুপচাপ এদের তামাশা দেখছে। আজ বাড়ি থেকে অপূর্ব কে একদম বুঝিয়ে নিয়ে এসেছে যেন আজই আরিয়ান কে তার ভালোবাসার কথা জানায়।
মাহমুদা ইশানের কথায় সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। আনোয়ার ইশান জিজ্ঞেস করে “চারজন কোথায় দেখলেন?”
“আমাদের মাধবী আর আরিয়ানও তো গ্রাম থেকে বিয়ে করে এসেছে”
কথাটা সকালের দিকে সবাই যতটা সহজ ভাবে নিয়েছিলো এখন ঠিক ততটাই কঠিন মনে হলো। এক সেকেন্ডের নিরবতায় ইচ্ছে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠে ”

“আরিয়ানের বিয়ে মাধবীর সাথে হলে তাহলে আমার বিয়ে কার সাথে হয়েছে?”
“যার সাথে হওয়ার কথা ছিলো তার সাথেই হয়েছে”
আরিয়ান নির্বিকার কন্ঠে উত্তর দিয়ে মাধবীর পাশে গিয়ে বসে। ইচ্ছে যেন বাকহাড়া হয়ে যায়। অরিন্দ প্রথমেই অপূর্বকে আগলে ধরে। অপূর্বেরও একই অবস্থা। সে হতবিহম্বিত চোখে তাকায় এক সাথে বসে থাকা মাধবী আর আরিয়ানের দিকে। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
“বলেছিলাম আগে জানিয়ে দেয়ার জন্য”

আরিন্দের কথায় কোন উত্তর দিতে পারে না অপূর্ব। আগে বললেই আর কিই বা হতো!আরিয়ান কখনোই তার মধুমতী ব্যাতিত অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। অপূর্বের কাছে এবার সবটা স্পষ্ট হয়ে যায় আরিয়ানের সেই মধু এই মাধবীই ছিলো। এখানে তার কিছুই করার নেই। সে তার বন্ধুর ভালোবাসাকে ভালোবেসেছে। চাইলেও না কিছু বলতে পারবে আর না কিছু করতে পারবে। অপূর্ব অনুভব করে তার গলায় যেন কাঁটা বিঁধে আছে। আরিয়ান যখন জানতে পারবে সে এতদিন অগ্নিপরি যাকে বলেছে সেই মাধবী। তাহলে কি অন্য সবার মত মাধবীকে ভালোবাসার অপরাধে তাকে শাস্তি দেবে! তাকে কি আর বন্ধু ভাববে! বন্ধুত্বে ঠিক কতটা ফাটল ধরবে ভাবতেই অপূর্বের মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। তার ভালোবাসার বয়স দু বছর তবে বন্ধুত্বের বয়স অনেক। সে কিছুতেই বন্ধুত্ব নষ্ট করতে চায় না। সে সবার অগোচরে শুধু অরিন্দ কে বলে “আল্লাহর ওয়াস্তে তোরা কেউ আরিয়ান কে এসব কিছু বলবি না” বলেই সে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। তার কিছুদিন সময় দরকার সব কিছু মেনে নিতে।
ইচ্ছের রিয়েকশনে রাশেদা ইশান জিজ্ঞেস করে “কেন মেয়ে তুমি জানোনা তোমার বিয়ে আমার ছেলে আয়াজের সাথে হয়েছে”

ইচ্ছে জবাব দিতে পারে না। তার এখন কী করা উচিত সেটাও ভেবে পায় না। সে অসহায় চোখে একবার আরিয়ান আরেকবার তার হাসিখুশি মা বাবা দিকে তাকায়। সবার সামনে কিছু বলতেও পারছে না। হুট করেই তার চোখ যায় মাধবীর দিকে। তারপর রাশেদা ইশান কে বলে “কিছু না আন্টি। এমনি মজা করছিলাম”
“আন্টি না। এখন থেকে আম্মা ডাকবে”

তারপর সবার উদ্দেশ্যে বলে “যেহেতু বিয়ে দুই ছেলেরই হয়েছে তো অনুষ্ঠানো দুজনেরই করা হোক?”
মাধবী বাধা দিয়ে বলে “আমাদের অনুষ্ঠান করতে হবে না। শুধু আয়াজ ভাইয়া আর ইচ্ছে আপুর অনুষ্ঠান করেন”
মাহমুদা ইশান বলেন “কেন মাধবী? সমস্যা কি অনুষ্ঠান করলে? কোন কথা হবে না। অনুষ্ঠান হবে মানে হবেই”
মাধবীকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তারা তারিখ ঠিক করতে থাকে অনুষ্ঠানের। মাধবী আর যাই হোক কাদের সামনে ভদ্র থাকতে হয় কাদের সামনে বারাবারি করতে হয় তা খুব ভালোভাবেই যানে। সে অন্য সবার সাথে ঠ্যেশ মেরে কথা বলতে পারলেও এদের সামনে বলে না। তাই এদের কিছু বলতে না পেরে আরিয়ানের দিকে তাকায়। আরিয়ান যেন দেখেও না দেখার মত বসে আছে। মাধবী চিমটি দিয়ে বলে “কিছু বলছেন না কেন?”

“তুই জানিস?”
মাধবী কপাল কুচকে তাকিয়ে বলে “কি জানবো?”
“তুই জানিস তুই যে মিরমিরা মিচকে শয়তান?”
মাধবীও নির্বিকার জবাব দেয় “আমি জানি। এখন এদের আটকান”
“পারবো না”
“পারবেন না আপনি?”
কথাটা এতটাই জোরে বলেছে যে উপস্থিত সবার কানে পৌছে গেছে। সবাই কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাধবী সোজা হয়ে বসে বলে “কি হয়েছে?”

সবাই একসঙ্গে হেসে দেয়। কেন হাসলো তা মাধবীর দেখার বিষয় না। সে এখন কোনভাবেই অনুষ্ঠান করে সময় নষ্ট করতে চায় না। সে আবারও আরিয়ান কে খোঁচা দেয়। কিন্ত আরিয়ানের কোন পাত্তাই নেই। শেষে মাধবী বিরক্ত হয়ে বসে থাকে। সবাই কথা বলে সামনের শুক্রবার বিয়ে ঠিক করে। মাধবী কিছু একটা ভেবে মাঝ থেকে বলে “বিয়ের বয়সি তো আরো দুজন আছে। আচ্ছা রুহিকে না হয় বাদ দেয়া গেল কিন্ত আরশিকেও একসাথে বিয়ে দিয়ে দিন”
এই মাত্র আরশি নিজের রুম থেকে এসে দরজায় দাঁড়িয়েছিল। তাই মাধবীর কথাটা শোনা মাত্রই উত্তর দেয় “আমি বিয়ে করবো না”

নমিতা ইশান আরশির কথায় নাকচ করে বলে “মাধবী তো ঠিকই বলেছে। বিয়ে যখন হয়েছে একসাথেই হয়ে যাক”
তারপর ফখরুল ইশানের উদ্দেশ্যে বলে “আপনি আরশির জন্য শুক্রবারের আগে একটা ভালো পাত্র দেখেন। এবার সবার বিয়ে হয়ে যাক। পরে রুহির কথা ভেবে দেখবো”
কথাটা শুনেই রুহি তরাক করে অভির দিকে তাকায়। অভি আগে থেকেই তাকিয়ে আছে তার দিকে দেখে আবার সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেলে।
আরশি কাঠ কাঠ কন্ঠে বলে “আমি বিয়ে করবো না”
নমিতা ইশান সবার দিকে একপলক তাকিয়ে মেয়েকে বলে “কেন করবি না? কি সমস্যা?”
“কোন সমস্যা নেই। আমি এখন বিয়ে করবো না”
ফখরুল ইশান বলে “এখন করে ফেললেই তো ভালো। সবার বিয়েটা এক সাথে হয়ে গেলে সবাই এক সাথে নতুন জীবন শুরু করতে পারবি”

আরশির বলতে ইচ্ছা হলো “আমার তো নতুন জীবন শুরু করার আগেই শেষ হয়ে গেছে। আমি এখন কার সাথে শুরু করবো?যাকে ঘিরে সমস্ত স্বপ্ন ছিলো সেই তো স্বপ্ন গুলো ভেঙে দিলো”
তবে মুখে কিছুই বললো না। বাবার মুখে মুখে সে কথা বলতে পারে না। তাই চুপ করে গিয়ে মাধবীর ডান পাশে বসে। আর বা পাশে আরিয়ান বসা। ইচ্ছে থম মেরে বসে আছে আয়াজের পাশে। তার শরীর কেমন করছে। সে এরকম ধোঁকা কল্পনাও করেনি কখনো। মাধবী আর আরিয়ান কে যেনো একসাথে বিষের মতো মনে হচ্ছে।
আরশিকে তার পাশে বসতে দেখে মাধবী বলে “আরশিকে না হয় অরিন্দ ভাইয়ার সাথে…
কথা শেষ করার আগেই অরিন্দ বলে উঠে “এই না। আমি কোন বিয়ে টিয়ে করবো না। অপূর্বরই এখনও বিয়ে হয়নি”
অরিন্দর কথা শুনেই আরিয়ান খেয়াল করে অপূর্ব নেই। তৎখনাত জিজ্ঞেস করে “কিরে তোর বড়োটা কই?”
অরিন্দ ভেবে বলে “ওর শরীর খারাপ লাগছে তাই চলে গেছে”

অপূর্বের কথা উঠতেই অভি,আয়াজ, ইচ্ছের মনে পরে অপূর্বেও তো মাধবীকে ভালোবাসতো। মনে হতেই সবার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
আরিয়ান বলে “ওর শরীর খারাপ লাগছে আর ও আমাকে না বলে চলে গেল? তোরা যেতে কেন দিলি?”
বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায়। সাথে সাথে বাকি তিন বন্ধুও উঠে দাঁড়ায়। তারা জানে অপূর্ব কেন চলে গেছে। অপূর্বর অবস্থান টা সবচেয়ে বেশি অনুভব করতে পারছে ইচ্ছে আর আরশি। আরশিও রুহির কাছ থেকে সেদিন শুনেছে অপূর্ব মাধবীকে ভালোবাসে।
আরিয়ান ইচ্ছের বাড়ির লোকদের বলে “দুঃখিত আপনাদের রেখেই যেতে হবে। আর ইচ্ছেও আমাদের সাথেই যাবে। অপূর্ব ওরোও বন্ধু। আর আয়াজ তো আমাদের সাথেই যাচ্ছে”

সবার সম্মতি নিয়ে ৫ বন্ধু বেরিয়ে যায়। ওরা বেরিয়ে যেতেই ইচ্ছের বাড়ির লোকজনও চলে যায়। বাকিরাও যে যার কাজে চলে যায়। আরশির বিয়ের ব্যাপারে আর কথা বলে না। বসার ঘরে বাকি থাকে শুধু মাধবী,ইচ্ছে আর রুহি। কিছুক্ষন পিনপতং নিরবতার পরে আরশি মাধবীকে বলে “ইচ্ছে আপুকেও শেষ করে দিলে?”
“শেষ কোথায় করলাম! ভালো থাকার ব্যাবস্থা করলাম শুধু”
“তুমি তো সব জানতে মাধবী আপু। তবুও কেন এমনটা করলে?”
মাধবী নরম হয়। আরশির হাতদুটো ধরে চোখে চোখ রেখে বলে “আমি কি করবো বল। তুই তো শুনলি সবটা। বিয়েটা অপ্রত্যাশিত হয়েছে। আমি নিজেও চাইনি এখন বিয়েটা করতে। এখন হয়ে গেছে তো গেছেই। কিচ্ছু করার নেই। আর আরিয়ান ভাই আমাকে ভালোবাসে। তার চেয়েও বড় কথা আমি তাকে ভালোবাসি। ১০ বছর পরে হলেও বিয়েটা আমাদেরই হতো। কারণ উনার বাঁ পাঁজরের হাড় থেকে আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমাদের হাতে কিছুই নেই”

“ঐ বাঁ পাঁজরের হাড়টা দ্বারা কি আমাকে বানানো গেলো না। খুব বেশি কি ক্ষতি হতো যদি তোমার স্থানে আমি থাকতাম?”
পরক্ষণেই আবার বলে “ওহ ভূলেই গিয়েছিলাম। সৌন্দর্য যার মহারাজা তার। তুমি তো অপরূপা। তোমার স্থানে নিজেকে আশা করা নেহাতই বোকামি”
“কথাটা ভুল বলিস নি। তবে মনে রাখিস ‘কাফনের কাপড়টা সাদা হলেও তার অবস্থান ক্ষণস্থায়ি, আর কাবা শরীফের গিলাফ কালো হলেও তার অবস্থান চিরস্থায়ী’। হয়তো এখন অবাক হবি। নিজে সুন্দরী হওয়ার পরেও কেন কথাটা এভাবে বললাম ভেবে। আসলে যেটা সত্যি সেটাই বলেছি”
আরশি এবং রুহি দুজনেই স্তব্ধ হয়ে শোনে মাধবীর কথাটা। কথাটা বলে মাধবী আর বসে না। উঠে নিজের ঘরে চলে যায়।

রাত প্রায় ১১টা বাজতে চললো। আয়াজ ইচ্ছেকে নিয়ে বিকেলের দিকে এসেছে। আরিয়ান এখনও আসেনি। সবাই যে যার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। ইচ্ছে আয়াজের সাথে থাকবে না বলে তাকে আরশি আর রুহির সাথে দেয়া হয়েছে। ইচ্ছে, আরশি কেউই আর কারও সাথে কোন কথা বলেনি এমনকি রাতের খাবারও খায়নি। আর বাকি সবার খাওয়া দাওয়া শেষে শুধু খাবার টেবিলে মাহমুদা ইশান আর মাধবী বসে আছে আরিয়ানের অপেক্ষায়। দুজন খাওয়ার শেষে বসে গল্প করছে। কথায় কথায় মাধবী জিজ্ঞেস করে “আচ্ছা মামার খুনিকে কি কেউ খোঁজার চেষ্টা করেনি?”
মাধবীর প্রশ্নে মহিলা কিছুক্ষন চুপ থেকে উত্তর দেয় “চেষ্টা তো অনেক করেছে। কিন্ত কেউ কোন সন্ধান পায়নি”

“ওহ। আচ্ছা আমি চেষ্টা করি?”
“নিজের পরিবারের খুনিদেরই তো এখনো বের করতে পারলি না”
“জানো মামি, কেন যেন আমার মনে হচ্ছে এই সমস্ত খুনের পেছনে এক জনেরই হাত আছে। তুমি আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দেও তো। তাহলেই সহজ হবে আরো”
“কি উত্তর দেব?”
“কীভাবে লাশটা পেয়েছিলে পুরো ঘটনা টা আমাকে খুলে বলো”

তখন বর্ষাকাল ছিলো। মাঠখাট কাঁদায় মাখামাখি। মাঝ রাতে মাহমুদা উঠেছিলো প্রয়োজনের জন্য। বাহিরে ঝুম বৃষ্টি। তখন তাদের এরকম দালান বাড়ি ছিলো না। বাহিরেই সব ছিলো। বাড়ির বাকিরা যার যার চিলেকোঠায় ঘুমিয়ে ছিলো। আরিয়ান তখন সদ্য কিশোরে পা রেখেছে। রাজবাড়িতে থাকতো তখন। সেদিনই ছিলো সেই কাল রাত্রি। মাহমুদা ওড়না গায়ে পেচিয়ে একটা হাড়িকেন হাতে বের হয় ঘর থেকে। চারদিকে বৃষ্টির জন্য সব অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তিনি মাটির বারান্দা পেরিয়ে নামতেই দুয়ারে পরে থাকা লাশ দেখে ভয় পেয়ে যান। তিনি তখনো চিনতে পারেনি। তাই কাছে না গিয়ে সবাই কে ডেকে না। সবাই দূর থেকে দেখেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। ওদের চিৎকারে গ্রামের লোকজন হাজির হয়ে লাশের কাছে যায়। লাশ চিনতে পেরে মাহমুদাকে বলার পর তিনি এক চিৎকারে জ্ঞান হাড়ায়। পরে ওনার যখন জ্ঞান ফিরে তখন দেখে শুধু নেওয়াজ ইশান একা ছিলো না অপূর্বের বাবা আফজাল হায়দারও ছিলো। নেওয়াজ ইশান ও আফজাল হায়দার ছোট বেলা থেকেই দু বন্ধু ছিলো। সব কাজ একসাথেই করতো। তাদের দুজনেরই আয় রোজগার খারাপ ছিলো বলে শহরে বানিজ্য করতে গিয়েছিল। আর এসেছে লাশ হয়ে। ওনার জ্ঞান ফিরতে ফিরতেই গোসল দেয়াও শেষ। আরিয়ান আর অপূর্ব এসে সব করিয়েছে নাকি। তখন কারো মাথায় এত কিছু আসেনি। দাফন কাফন যখন শেষ তখন সবাই বলাবলি করে যেহেতু খুন হয়েছে তাই পুলিশকে জানানো দরকার। পরে জানিয়েও আর কিছু হয়নি। কারণ না ছিলো কোন প্রমাণ আর না ছিলো তখন তাদের এত টাকা পয়সা।

পুরো ঘটনাটা একদম সংক্ষেপে বলে মাহমুদা ইশান। সব শুনে মাধবী বলে “তাই বলে তোমরা আর খুনিকে খোঁজার চেষ্টা করবে না! দু দুটো মানুষ খুন হয়েছে আর তোমারা হাত গুটিয়ে বসে ছিলে”
মাহমুদা ইশান বলার মত কিছু পেলেন না। মাধবী বলে “দুজনকে কি একই জায়গায় কবর দেয়া হয়েছে?”
“হ্যা”
“তাহলে কাল আমাকে নিয়ে যাবে তাদের কবরে”
“তুই গিয়ে কি করবি?”
বলতে বলতে সদর দরজায় টোকা পরে। মাহমুদা ইশান মাধবীকে খাওয়ানোর কথা বলে চলে যায়। মাধবী গিয়ে দরজা খুলে দেয়। আরিয়ান যেন আকাশের চাঁদ দেখেছে এমন অবাক হয়ে বলে “ম্যাডাম কি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো!”

“নাহ। আপনার জন্য কেন অপেক্ষা করবো! আমি জেগে থাকতে ইচ্ছে হয়েছে। তাই জেগে আছি। এখন আসুন”
আরিয়ান বেল্টের জুতো জোড়া খুলে ঘরে ঢোকে। প্রথমেই কোন কথা না বলে খেতে বসে পরে। মাধবীকে পাশে ডেকে বলে “বড্ড ক্ষিধে পেয়েছে রে। তাড়াতাড়ি আয় খাইয়ে দেই”
“আপনার ক্ষিধে পেয়েছে আপনি খান। আমি খেয়ে ফেলেছি”
“কিহ! তুই জানিস না বিয়ের পর স্বামীর সাথে বসে খেতে হয়”
“যে স্বামী রাত বিরাতে বাড়ি ফেরে সেই স্বামীর সাথে খাওয়ার ইচ্ছে নেই”
“ওলে লে লে লে। আমার সোনা বউটা রে। আগে বলবি তো যে তোর স্বামীকে স্বামীকে ছাড়া ভালো লাগে না। এত নাটকের কই আছে। যাহ কাল থেকে তাড়াতাড়ি আসবো”
মাধবী আর কথা না বারিয়ে খাবার বেরে দেয়। তার মনে মনে এখন অন্য কিছু চলছে। যত তাড়াতাড়ি এখানের কাজ শেষ করতে পারবে ততো ভালো। আরিয়ানও আর কথা না বলে পুরো খাবার শেষ করে। খাওয়া শেষে মাধবী বলে

“চুপচাপ এখন গিয়ে শুয়ে পরুন তো। আর একটা কথাও বলবেন না”
“আদেশ দিচ্ছিস?”
“নাহ শাসন করছি”
“তুই আমাকে তো গ্রাম পাস নি”
“গ্রামে আমার যতটুকু অধিকার শাসন করার তার চেয়েও বেশি শাসন করার অধিকার আপনার উপর। এখন যান শুয়ে পরুন গিয়ে”
আরিয়ান মুচকি হেসে কপাল কুচকে বলে “তুই কোথায় ঘুমাবি?”
“আপনার সাথেই। আপনি যান আমি আসছি”

আরিয়ান গিয়ে শুয়ে পরে। শুতেই ঘুমে তার দুচোখ লেগে আসে। কিছুক্ষন পর মাধবী ঘরে আসে। আরিয়ান কে ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে দেখে বাঁকা হেসে বলে “আপনি যদি গাছের পাতায় পাতায় চলেন তো আমি চলি গাছের শেকড়ে শেকড়ে। আজ আবারও সেই দিনের পুনরাবৃত্তি হবে”

বলে বাহির থেকে ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে যায়। সদর দরজার সামনে রুহি দাঁড়িয়ে আছে হাতে ধারালো কুঠার নিয়ে। মাধবী নিজের প্রিয় ধনুক টা কাধে নিয়ে আসতেই রুহি কুঠারটাও তার হাতে দেয়। মাধবী কুঠারের ধারালো অংশাটাতে একটা চুমু আঁকে। রুহি কিছুটা ইতস্তত করে বলে “যদি আরিয়ান ভাইয়া জেগে যায় পরে কি হবে?”
“আরে জাগবে না। ছয়টা ঘুমের ঔষধ দিয়েছি। আমার কাজ শেষ হতে হতে হুশ আসারা কোন রাস্তাই নেই”
“কিন্ত তুমি একা একা কিভাবে করবে? যদি ধরা পরে যাও তখন তো তোমাকে পুলিশে দিবে”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৪

“আমাকে পুলিশের বাপও খুঁজে পাবে না। তুই শুধু বাড়ির দিকে খেয়াল রাখ। আমি আসছি”
বলে আর মাধবী দাঁড়ায় না। গায়ে সাদা চাঁদরটা জরিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। ধীরে ধীরে কুয়াশার সাথে যখন মাধবীর অবয়ব মিশে যায় তখন রুহি দরজা বন্ধ করে দেয়।

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ২৬