Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫০

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫০

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫০
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

রাতের অন্ধকার কাটিয়ে ধরণীতে দিনের আলো ফুটে উঠেছে। আজ শুক্রবার, ছুটির দিন থাকায় সব কর্তারা বাড়িতেই আছে। ইসলাম বাড়ির কর্তিরা সকালের নাস্তার আয়োজন করছে । বাড়ির চার কর্তারা হল রুমে চা পান করছে আর টুকটাক কথা বলছে বসে বসে।
হামিদ সাহেব চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে দিয়ে আনিসুল সাহেব এর দিকে তাকিয়ে বললো ” বড় ভাই আজ না আমাদের একটু গ্রামে যাবার কথা..! ভুলে গিয়েছেন?”

আনিসুল সাহেব চায়ের কাপ টা হাতে থেকে নামিয়ে সামনের টেবিলের উপর রেখে বললো ” হুমম, মন আছে ভুলি নি আমি। এতোটাও বুড়ো হই নি যে সব কিছু ভুলে যাবো।” একটু থেমে আবার বললো ” বাড়ির বউদের তৈরি থাকতে বলো, আমরা দুপুরে রওনা দিবো।”
হাশিম সাহেব মাথা নাড়িয়ে বললো ” আর বাচ্চারা?”
” রাশেদ , আম্মা আর খালা আছে ওনারা সামলে নিবে ওদের। আর আমরা তো একবারে থাকতে যাচ্ছি না, আজকে রাতের মধ্যেই ফিরে আসবো। ”
বড় ভাইয়ের কথা শুনে তিন ভাই মাথা নাড়ালো ।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

” আবরার আমি এসে গিয়েছি। আর আধঘন্টা লাগবে আমার আসতে।”
” ঠিক আছে তুমি সাবধানে এসো ।” বলেই শুভ্র কল কেটে শার্টের বোতাম গুলো লাগাতে লাগলো। তখনই আবারো ফোন বেজে উঠতেই শুভ্র ফোনে থাকা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শোনা গেলো ” আব্বা কোথায় তুই..? তাড়াতাড়ি আয় খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে তো।”
” মামনি আর পাঁচ মিনিট।”
” আচ্ছা আব্বা আমরা সবাই অপেক্ষা করছি আয় তাড়াতাড়ি।” বলেই ফোন কেটে দিলো।
শুভ্র দ্রুত তৈরি হয়ে রওনা হলো ইসলাম বাড়ির দিকে।

সে এখন নিজের বাড়িতেই থাকে। তবে নিজের বাড়িতে থাকলে কী হবে লতিফা,রাশেদা, মনিরা, তাহমিনা বেগম এর করা আদেশ সে ও বাড়িতে থাকবে ঠিক আছে কিন্তু এই বাড়িতে এসে খাবার খেয়ে যাবে। ইসলাম বাড়ির চার কর্তি শুধু ও বাড়ির সবার খেয়াল রাখে তা কিন্তু নয়, তারা শুভ্রর বাড়ির দিকেও খেয়াল রাখে। এই যে যেমন একদিন পর পর এসে বাড়িতে চক্কর দেওয়া, শুভ্রর কী প্রয়োজন না প্রয়োজন সেগুলো খোঁজ রাখা। নিজের ছেলের মতো করে আগলে রেখেছে তাঁরা শুভ্র কে। শুভ্র কে ছাড়া ইসলাম বাড়ির খাবারের টেবিলে কেউ খেতে বসে না, বিশেষ করে ছুটির দিনে। সবাই শুভ্র কে অনেক জোড়া জোড়ি করেছিলো সে যেনো ইসলাম বাড়িতে থাকে কিন্তু শুভ্রর একটা কথাই, নিজের বউ যেদিন বলবে সেদিন থেকে এই বাড়িতে আবার থাকবে তার আগে নয়। লামিয়া এইসব সব ই জানে তবুও সে চুপচাপ আছে, শুভ্র কে এখনো বলে নি ইসলাম বাড়িতে থাকতে। এখনো মেয়েটা তাঁর উপর রাগ, অভিমান করে আছে। কবে এই অভিমানের পাল্লা শেষ হবে সেটা কেবল লামিয়া জানে। ভেবেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ইসলাম বাড়িতে প্রবেশ করলো।

শুভ্র কে দেখে রাশেদা বেগম বললো ” এতোক্ষণ লাগে তোর আসতে? তাড়াতাড়ি আয় বস ।”
শুভ্র হালকা হেঁসে মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে এসে চেয়ারে বসলো। হামিদ, হাশিম, আজমির, আনিসুল সাহেব হাঁসি মুখে কৌশল বিনিময় করলেন শুভ্রর সাথে। তারপর কাজের বিষয়ে টুকটাক কথা বলতে থাকলেন।
শুভ্র আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো খাবার টেবিলে মাহির, তায়েব, তায়েবা, ছবি, মিলি, তিহা, রাশেদ, আরিফ,আয়না আছে কিন্তু লামিয়া নেই। তা দেখে ভ্রু কুঁচকে এলো তার। হামিদা আর লামহা খান বাড়িতে তাই তারা নেই। কিন্তু এই মেডাম কোথায় আজকে দেখা যাচ্ছে না কেনো। ভাবতে ভাবতে পাশ ফিরে তাকাতেই তায়েব বলে উঠলো ” যাকে খুঁজতেছো সে ঘুমে তলিয়ে আছে।”
শুভ্র তায়েব এর কথা শুনে খাবার খেতে লাগলো। খাবার খেতে খেতে বলে উঠলো ” বড় বাবাই আমি একটা কথা বলতে চাই।”
আনিসুল সাহেব হেঁসে বললো ” অবশ্যই বলো কী বলতে চাও..?”

” আসলে আজকে মণি মা আসছে লন্ডন থেকে।”
” এখানে..?”
” হ্যাঁ..!”
” সে তো বেশ ভালো কথা। আমাদের উচিত তাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর। আমাদের ছেলে মেয়ে দুটোকে বাঁচিয়েছেন তিনি । তার কাছে আমরা ঋণী হয়ে আছি।”
শুভ্র মাথা নিচু করে শুনলো কিছু বললো না। বেশ কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা চললো তাদের মধ্যে। আজ তাঁরা গ্রামে যাবে সেটাও জানালো। শুভ্র জানি একটু খেয়াল রাখে বাড়ির বাচ্চাদের উপর। তাঁরা কাজ শেষ করে দ্রুত এসে পড়বে। শুভ্র তা শুনে মাথা নাড়ালো। টুকটাক কথা বলে খাবার শেষ করে কর্তারা চলে গেলো নিজেদের কক্ষে। তাঁর সাথে যার যার কর্তিরা। শুধু লতিফা বেগম থেকে গেলো শুভ্রর কি লাগবে না লাগবে তা দেখতে।
” আমমমম মাআআআ, এক হাড়ি গরম পানি দেও প্লিজ। আমি গোসল করবো শরীর চুলকাচ্ছে।” বলতে বলতে হামি তুলতে তুলতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে লামিয়া।

হাঁটার তালে তালে পায়ের নূপুর ঝুমঝুম শব্দ তুলছে। শুভ্র খাবার রেখে লামিয়ার দিকে তাকালো। চোখ দুটো ফুলে আছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, ঘুমিয়ে থাকার কারণে গালে তিনটে দাগ হয়ে আছে। কী সুন্দর লাগছে তাঁর ভ্রমর কে। শুভ্র এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো লামিয়ার পাণে।
লামিয়া সিঁড়ি বেয়ে নেমে চোখ কচলাতে কচলাতে শুভ্রর দিকে চোখ পড়তেই দেখলো শুভ্র তার দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে লামিয়া ভেংচি কেটে অন্য দিকে তাকালো। শুভ্র তা দেখে হাসলো।
” ইয়েএএ বিগ বস উঠে গেছে। আজকে আমাকে বলেছিলে সাইকেল চালানো শেখাবে। চলো চলো এখন ই যাই।” বলেই চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলো তোয়া।

লামিয়া বিরক্ত গলায় বললো ” এখন না পরে।” বলেই লতিফা বেগম এর দিকে তাকিয়ে বললো ” মা প্লিজ এক হাঁড়ি গরম পানি। ঠান্ডা পানি দিয়েই করতাম কিন্তু আমার ভীষণ ঠান্ডা লাগছে। ”
লতিফা বেগম আর কিছু না বলে চলে গেলো রান্নাঘরে। এটা নতুন কিছু নয়। শীতের দিন আসলেই এই মেয়ে আগে ভাগেই গোসল করে ফেলে। বেলা করে গোসল করতে গেলে তাঁর নাকি শীত করে, তাঁর উপর লম্বা চুল হওয়ায় বেলা করে গোসল করতে চুল ভেজা থাকে শোকায় না তাই শীতের দিনে দ্রুত গোসল করাটাই তাঁর কাছে উত্তম মনে হয়।
লতিফা বেগম যেতেই লামিয়া নিজের রুমের দিকে এগোতেই আবার কি যেনো ভেবে পিছন ফিরে শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্র কেমন জানি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। লামিয়া তা দেখে ভ্রু নাচালো, শুভ্র তা দেখে কিছু না বলে মাথা নিচু করে খাবার খেতে মন দিলো লামিয়া তা দেখে মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো। শুভ্র আড়চোখে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে খাবার শেষ করে উঠে দাঁড়ালো।
তারপর আশেপাশে চোখ বুলিয়ে গটগট পায়ে হাঁটা ধরলো লামিয়ার রুমের দিকে।

~ বাতাসে গুন গুন,
এসেছে ফাগুন
বুঝিনি তোমার শুধু ছোঁয়ায় এতো যে আগুন।
বাতাসে গুন গুন…..
গানের শব্দ শুনে শুভ্র ভ্রু কুঁচকে দরজার দিকে উঁকি মারতেই দেখলো লামিয়া বিছানায় চার হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে। শুভ্র আস্তে করে রুমে প্রবেশ করে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো। দরজা লাগানোর শব্দ শুনে লামিয়া লাফিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে। লামিয়া দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ভ্রু কুঁচকে বললো ” কী চাই..?”
শুভ্র লামিয়ার প্রশ্নে কোনো উত্তর না দিয়ে ঝট করে এগিয়ে এসে লামিয়া কে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিলো। আচমকা এমন হওয়াতে লামিয়া টাল সামলাতে না পেরে বিছানায় পরে গেলো। লামিয়া বিছানা থেকে দ্রুত উঠতে চাইলো কিন্তু তাঁর আগেই শুভ্র লামিয়া কে বিছানায় চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বললো ” জুনায়েদ কে, তোদের ভার্সিটির..?”

শুভ্রর এমন কথা শুনে লামিয়ার কপালে ভাঁজ পড়লো।
” জুনায়েদ কে মানে..? কে জুনায়েদ..?”
” তুই চিনিস না..?”
” না কে জুনায়েদ..?”
” জুনায়েদ কে তুই চিনিস না তাহলে..?”
” আরে বা*ল কে জুনায়েদ সেটা তো বলবেন..? আর সমস্যা কী আপনার এমন ব্যাবহার করছেন কেনো? ছাড়ুন আমাকে আর আমার রুম থেকে এখন ই বের হন।”
লামিয়ার কথায় শুভ্র লামিয়ার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকালো। লামিয়া তা দেখে বিরক্ত হয়ে বললো ” বা*ল হাতির মতো শরীর নিয়ে একটা পিঁপড়ার মতো মেয়ের উপর পড়তে লজ্জা করে না আপনার..?”

” উহু একদম না।” বলেই লামিয়ার গলায় মুখ গুঁজে দিলো। লামিয়ার শরীর হিম শীতল হয়ে গেলো। বরফের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছে তাঁর শরীর। শুভ্র লামিয়ার গলায় ছোট্ট ছোট্ট চুমু খাচ্ছে। শুভ্রর ঠোঁটের স্পর্শ পেতেই লামিয়া একটু পর পর কেঁপে উঠছে।
শুভ্র চুমু রেখে এবার নাক দিয়ে গলা ঘষতে ঘষতে হাস্কি কন্ঠে বললো ” লজ্জা আমার পাওয়ার কথা নয় ভ্রমর।
লজ্জা তো পাবি তুই। আর সারাজীবন এই হাতির শরীর কেই তোর ভার বহন করতে হবে। তাই এখন অভ্যস্ত করে নে ভ্রমর।”
” ছাড়বেন আপনি..? নাকি অন্য ব্যাবস্থা করবো কোনটা..?”
” কী করবি..?”
” অনেক কিছুই করবো। তাই ভালোয় ভালোয় সরুন। উফফ ভালো লাগছে না। আমি গলে যাবো উঠুন আমার উপর থেকে।”

” উঠবো একটা শর্তে..!”
শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো ” কী শর্ত..?”
” উমমম আমার ঠোঁট গুলো কেমন ফেটে গিয়েছে দেখেছিস..?”
” তো ভ্যাসলিন লাগিয়ে রাখুন তাহলেই তো হয়।”
” উমমমম ভ্যাসলিন লাগালে হবে না।”
” তাহলে লিপস্টিক লাগিয়ে রাখুন।”
” তাও হবে না।”
” না হলে শেষে গু লাগিয়ে রাখুন।” বেশ বিরক্ত হয়ে বললো লামিয়া।
” ছিঃ দিন দিন এমন খচ্চর কথা কোথা থেকে শিখতেছিস??”
” আগের থেকেই এমন আমি।”

শুভ্র নাক মুখ কুঁচকে তাকালো লামিয়ার দিকে। দিন দিন এই মেয়ের মুখের ভাষা বাজে হয়ে যাচ্ছে। শুভ্র ভেবেই বিরক্ত শ্বাস ফেললো। লামিয়া বিরক্ত হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু শুভ্র ছাড়ছে না।
শুভ্র এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। শুভ্রর দৃষ্টি লামিয়ার আরো অস্বস্তি লাগছে। তাই আরো ছটফট করতে লাগলো। শুভ্র তা দেখে লামিয়া কে আরো চেপে ধরে একটু একটু এগিয়ে যেতে লাগলো লামিয়ার দিকে। তখনই নিচে থেকে গাড়ির হর্ন শুনতে শুভ্র লামিয়া কে ছেড়ে দিলো। দরজার দিকে এগোতে এগোতে বললো ” চুমু টা তোলা রইলো পরে নিয়ে নিবো।” বলেই দ্রুত দরজা চলে গেলো। লামিয়া শুভ্রর দিকে তাকিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললো ” ফালতু লোক।”

বলেই বাথরুম থেকে বালতি নিয়ে হাঁটা ধরলো রান্না ঘরের দিকে গরম পানি আনতে।
ইসলাম বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। আর তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে রাবেয়া বেগম। ভদ্রমহিলা টি দেখতে বেশ সুন্দরী। শুভ্র এগিয়ে গিয়ে ভদ্রমহিলা টি কে জড়িয়ে ধরে বললো ” কেমন আছো মণি মা..?”
” আমি ভালো আছি তুই কেমন আছিস.?”
” ভালো মণি মা।”
তাঁদের কথার মাঝেই ছবি মুখ ফুলিয়ে বললো ” হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তো তোমার কেউ না। তাই তো আসার পর থেকে শুভ্র ভাইয়ের খবর নিচ্ছো।”
ছবির কথা শুনে ভদ্রমহিলা হেঁসে শুভ্র কে ছেঁড়ে ছবি কে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে বললো ” মায়ের কাছে সব সন্তানরাই এক। তাই মুখ ফুলোতে হবে না। এখন বল কেমন আছিস..?”

” আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি..?”
” আমিও ভালো।”
বলেই ছবি কে ছেঁড়ে এগিয়ে গিয়ে ইসলাম বাড়ির কর্তা আর কর্তিদের সাথে হাঁসি মুখে কৌশল বিনিময় করলো। ভদ্রমহিলা টির কথা শুনে মনে হচ্ছে সে অনেক আগে থেকেই চেনে তাদের সবাই কে। ইসলাম বাড়ির কর্তা ও কর্তীরা ও হেঁসে হেঁসে কথা বললো ভদ্রমহিলার সাথে।
হাতে গরম পানির বালতি নিয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে এতোক্ষণ লামিয়া ভ্রু কুঁচকে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলো। সবার কথা শুনে এইটুকু বুঝতে পেরেছে যে এই ভদ্রমহিলা ই হলো শুভ্র আর ছবির মণি মা। যার কথা শুনেছে সে ছবির থেকে। ভদ্রমহিলা টি কে দেখে বেশ স্মার্ট মনে হচ্ছে। রাবেয়া বেগম কে পছন্দ হয়েছে লামিয়ার । তাই ঠোঁটের কোণে হাঁসি ফুটলো।

রাবেয়া বেগম সবার সাথে কৌশল বিনিময় করলো। আনিসুল সাহেব হাঁসি মুখে বললো ” ভিতরে আসবেন না, বাহিরে দাঁড়িয়েই সব কথা শেষ করবেন নাকি??”
আনিসুল সাহেব এর কথায় শুভ্র বললো ” হ্যাঁ মণি মা ভিতরে চলো। বসে কথা বলি।”
রাবেয়া বেগম হালকা হেসে বললো ” হ্যাঁ অবশ্যই তবে মিহু টা এখনো আসছে না কেনো..?”
মিরা নামটা শুনে শুভ্র কপাল কুঁচকে বললো ” মিরা এখানে..? ওও কি তোমার সাথে এসেছে নাকি..?”
রাবেয়া বেগম শুভ্রর কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে বললো
” কেনো মিরা তো সেই তিনদিন আগেই এসেছে। তোমাদের সাথে দেখা হয়নি..?”
পাশ থেকে ছবি বললো ” কোথায় না তো…! মিরাপু আসবে আমাদের তো বলে নি। ”
রাবেয়া বেগম দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো ” দেখেছো মেয়ের কান্ড..? সে এখানে এসেছে তিনদিন হয়ে গেলো আর তোদের কিছু জানায় নি। দাঁড়া মিরা কে কল করছি।” বলেই ফোন করতে যাবে তাঁর আগেই একটা বাইক এসে থামলো তাদের সামনে। সবাই চোখ ঘুরিয়ে সামনে তাকালো।

” সারপ্রাইজ শুভ্র,ছবি। ” বলেই বাইক থেকে নেমে এলো একটি মেয়ে। গাঁয়ে তার লেডিস কালো শার্ট আর প্যান্ট। মাথায় হেলমেট পরা।
ছবি মেয়েটির কথা শুনে দৌড়ে গিয়ে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো ” মিরাপু তুমি এসেছো..? কতোদিন পর দেখতে পেলাম তোমাকে।”
মিরা হালকা হেঁসে হেলমেট খুলে বললো ” আমিও তোকে অনেকদিন পর দেখলাম ছোট্টু। কেমন আছিস..?”
” ভালো তুমি..?”
” একদম ফাস্ট ক্লাস।”

” তুমি তিন দিন আগে এসেও ওদের সাথে দেখা করো নি কেনো..?” গম্ভীর কন্ঠে বললো রাবেয়া বেগম।
” ওও হোও মণি ওদের আমি সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। ” বলেই মাথা থেকে হেলমেট খুলতেই পিঠে আঁচড়ে পড়লো কোমড় সমান লম্বা চুল। মিরা চুল গুলো ঝাড়া দিয়ে হাত দিয়ে ব্রাশ করতে করতে চোখ ঘুরিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে কৌশল বিনিময় করলো। লামিয়া পিছন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে তাকিয়ে আছে মিরার দিকে। মেয়েটা দেখতে বেশ সুন্দরী। কিন্তু কে এই মেয়ে আগে তো এর নাম শুনে নি।
আর বিদেশী মেয়েরাও এতো বড় চুল রাখে দেখে অনেকটা আশ্চর্য হলো লামিয়া।
মিরা সবার সাথে কথা বলে চোখ ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখলো শুভ্র নিরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মিরা শুভ্র কে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে হাঁসি মুখে এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো শুভ্র কে। শুভ্র কে জড়িয়ে ধরায় সবাই হা হয়ে তাকালো সেদিকে। মাহির, তায়েব, তায়েবা, আরিফ, রাশেদ,ছবি, আয়না ঢোঁক গিলে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো লামিয়া অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে। এবার যে একটা কাহিনী হবে এটা বুঝতে কারোর বাকি নেই।
মিরা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে শুভ্র কে। শুভ্র নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না।

” কেমন আছো শুভ্র..? এখানে এসে তো আমাকে ভুলেই গিয়েছো।” ঠোঁট উল্টে বললো মিরা।
” দেখো মিরা এখানে বাড়ির বড়রা আছে ছাড়ো আমাকে। নিজের ভালো চাও তো ছাড়ো।”
” নিজের ভালো চাও মানে কী বলতে চাইছো..?”
শুভ্র মিরা কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই টগবগে গরম পানি তার বুকে এসে পড়লো। টগবগে গরম পান চামড়ায় এসে পড়তেই শুভ্র মৃদু শব্দ করে সামনে তাকাতেই দেখলো লামিয়া অসম্ভব রেগে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। রাগে শরীর কাঁপছে তার। শুভ্র ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তাকিয়ে রইলো লামিয়ার দিকে।
এইদিকে বাড়ির সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। তাঁরা ভাবতে পারে নি এমন কিছু হবে।
মাহির, তায়েব, তায়েবা, ছবি,আয়না, আরিফ, রাশেদ নিজেদের কপালে হাত রাখলো। তাঁরা যা সন্দেহ করেছিল তাই হয়েছে।

শুভ্রর গাঁয়ের পানি দেওয়ায় মিরা পাশে থাকায় তার গাঁয়ে ও এক ফোঁটা ছিটে গিয়েছিলো। পানি বেশ গরম ছিলো তা বুঝতে পারলো। সামনে ঘুরে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” হেই তুমি কী পাগল..? এতো গরম পানি ওর গাঁয়ে দিয়েছো কেনো..? মাথা খারাপ নাকি তোমার..? ননন্সেস গার্ল।”
বলেই সামনে ঘুরে শুভ্রর দিকে এগিয়ে অস্থির গলায় বললো ” তোমার কিছু হয় নি তো শুভ্র..? তুমি ঠিক আছো..?”
বলেই শুভ্রর বুকের কাছ টায় হাত দিতেই লামিয়া দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে এসে শুভ্রর বুকে জোরে ধাক্কা মারতেই শুভ্র মিরার থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলো। তা দেখে মিরা এবার অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাপ্পড় তোলার জন্য হাত উঠাতেই লামিয়া মিরার হাত শক্ত করে চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলো ” হাত, মাথা, চোখ অন্য জায়গায় রাখ নয়তো জায়গার জিনিস জায়গায় রাখবো না। ”

বলেই মিরার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে শুভ্রর দিকে দৃষ্টি ফেলে বললো ” এইবার গরম পানি দিয়েছি। পরের বার তোর পুরো শরীর আমি এসিডে ডুবাবো। ” বলেই মিরর হাত ঝাড়া দিয়ে ছেঁড়ে দিলো। মিরা লামিয়ার দিকে চোখ লাল লাল করে তাকালো।
” তুমি জানো না আমি কে..! ভুল মানুষের সঙ্গে পাঙ্গা নিয়েছো। এর শাস্তি তুমি পাবে খুব শীঘ্রই।”
রেগে হিসহিসিয়ে বললো মিরা।
” নাটকির পু তোমার ওই বা*লের শাস্তির কথা শুনে ভয় পামু আমি মনে করছো…? উহু একদম ই নয় তোমার শাস্তি তোমার পিছন দিয়ে গুঁজে দিবো উল্টো। মগজে লিখে রাখ, নয়তো দলিল কর। আমার জিনিস এর উপর নজর দিলে আমি ছাড়বো না কাউকে।”

বলেই শুভ্র কে চোখ দিয়ে শাসিয়ে চলে গেলো বাড়ির দিকে। এই দিকে সবাই হা করে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। শুভ্র লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসলো। রাবেয়া বেগম চোখ ঘুরিয়ে শুভ্রর দিকে কিছু ইশারা করতেই শুভ্র হালকা হেঁসে মাথা নাড়াতেই রাবেয়া বেগমের অধরে হাঁসি ফুটলো।
হামিদ সাহেব মেয়ের এমন কাজে বেশ লজ্জিত হলো। তাই কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই রাবেয়া বেগম হাঁসি মুখে বললো ” আমাদের আজকে এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখবেন নাকি ভিতরে নিয়ে যাবেন কোনটা..?”
আনিসুল সাহেব বললো ” আসলে…।”

তাঁকে থামিয়ে দিয়ে রাবেয়া বেগম বললো ” এসব ভিতরে গিয়ে বলি কেমন..?”
আনিসুল সাহেব আর কথা বাড়ালো না। হাঁসি মুখে তাদের ভিতরে নিয়ে গেলো। বড়রা সবাই ভিতরে চলে গেলো। শুধু দাঁড়িয়ে থাকলো মাহির, তায়েব, তায়েবা, রাশেদ, আরিফ,আয়না,ছবি।
” হ্যান্ডসাম বয় তোমার কোথাও লাগে নি তো..? বিগ বসের মাথা অনেক গরম। তুমি কিছু মনে করো না। বিগ বস অনেক ভালো। বিগ বসের হয়ে আমি সরি বলছি ।”
শুভ্র মাথা নিচু করে তোয়ার দিকে তাকালো। মেয়েটা ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। তা দেখে শুভ্র হেঁসে নিচু হয়ে বললো ” আমি জানি তো তোমার বস ভালো। তবে বিশ্বাস করো আমার একটু ও লাগে নি। তুমি কেঁদো না।”

” কিন্তু তোমার শরীর তো লাল হয়ে গিয়েছে। চলো মলম লাগিয়ে দেই তোমাকে।”
” উহু..! যে আঘাত দিয়েছে সেই ইই আঘাতে মলম লাগাবে। তুমি চিন্তা করো না যাও বাড়িতে যাও। ” বলেই রাশেদ কে ইশারা করতেই রাশেদ তোয়া কে কোলে তুলে নিয়ে সবাই বাড়িতে চলে গেলো।
শুভ্র পিছনে ঘুরে মিরার দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বললো ” দ্বিতীয় বার ওর দিকে তোমার এই হাত বাড়ালে আমি তোমার এই হাত রাখবো না।” বলেই হাঁটা শুরু করলো নিজের বাড়ির দিকে।
শুভ্রর শক্ত কথা শুনে মিরার চোখে পানি জমে গেলো।
হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বাঁকা হেঁসে বললো

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৯

” হুমকি দিয়ে গেলে শুভ্র..? কিন্তু তোমার হুমকি তে আমি ভয় পাই না। আমার আর তোমার মাঝে যে আসবে আমি তাকেই সরিয়ে দিবো।”
বলেই বাইকে উঠে বসে স্টার্ট দিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে বাইক টান দিয়ে চলে গেলো নিজের গন্তব্যে।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫০ (২)