Home The Silent Manor The Silent Manor part 63

The Silent Manor part 63

The Silent Manor part 63
Dayna Imrose lucky

মীর দ্রুত পায়ে দোতলা পেরিয়ে নিচ তলায় নামার জন্য সিঁড়িতে পা ফেলতেই রাফিদ তাঁর সম্মুখে হাজির হল।মীর হোঁচট খেয়ে দাঁড়াল। রাফিদ বলল
“এত ব্যস্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?’
মীর রাফিদ কে ঠিক করে দেখল।যেন বহুবছর পর তাঁদের দেখা। রাফিদ কে ঠিকঠাক দেখেও মীর বলল “তুই ঠিক আছিস!’

“আমি ঠিকঠাক তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছি।আর তুই জিজ্ঞেস করছিস,ঠিক আছি কি না! আশ্চর্য,কি হয়েছে তোর”
মীর গোপনে হাঁফ ছাড়ল।ঘাড় ঘুরিয়ে বুলবুল কে দেখে, বুলবুল গাল ফুলিয়ে বলল “আমি সত্যি বলেছি, রাফিদ দাদা কোথাও বের হয়েছিল।”
মীর আবার ঘুরল রাফিদ এর দিকে। রাফিদ কপাল ভাঁজ করল। তাঁর এই কপাল ভাঁজ করার অভ্যাসটা এসেছে আমজাদ এর থেকে। তিনি কপাল ভাঁজ করলে অতি সহজে তা মলিন হয় না। “আমি মাস্টার বাড়ি গিয়েছিলাম।বাবা পাঠিয়েছে। উনাদের মায়ার বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে গিয়েছিলাম। কিছু হয়েছে?’
“তেমন কিছু না। তোকে নিয়ে বের হতে চেয়েছিলাম।বাড়ি ভর্তি অতিথি, ভেবেছি নিরিবিলি কোথাও গিয়ে বসি।” মীর মিথ্যে অনূভুতিটাকেও সত্যর মত উপস্থাপন করল।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“চল’ রাফিদ পথ ছেড়ে বলল।
“না। এখন আর ইচ্ছে করছে না।’ বলে একবার তাকাল বৈঠকখানার দিকে।বেশ সুন্দর করে সাজানো সবকিছু। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের ছোটাছুটি। দলবেঁধে বসা মহিলাদের আড্ডা,তার মাঝে পান।পিকদানিতে পিক ফেলছে, আবার পান মুখে ভরছে।কেউ হাতে মিষ্টি নিয়ে একে ওকে খাওয়াচ্ছে।সোফার অন্যপাশে গোলাকার পালঙ্ক। রাজকীয় ভাবে সাজানো।পাঙ্ককের মাঝে মেহেন্দী সাজানো। কিছু মেয়েরা একে অপরের হাতে মেহেদি লাগাচ্ছে।কারো কণ্ঠ থেকে ভেসে এল ‘যার বিয়ে তাঁর খবর নেই,আর আমরা আগেভাগেই মেহেদী লাগাচ্ছি।’
শব্দটি ভেসে এল মীর এর কানে। রাফিদ ও শুনল।সে বুলবুল কে সে উদ্দেশ্য করে বলল “মায়া এখনো নিচে আসেনি!”

“না দাদা। মালকিন ডাকতে গেছিল,বলছে পড়ে আসবে।”
বলতে না বলতেই মায়াকে তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে নিচে আসতে দেখা গেল। পরনে লাল রঙের শাড়ি।গলায় গহনা।হাতে চুড়ি। চিকমিক করা দেহের সাথে খোলা চুলে যেন তাঁর সৌন্দর্য গলে গলে উপচে পড়ছে।সাথে তৃষ্ণা। অন্যান্য বান্ধবীরা।গোরী তাঁর ডান দিকে।অবশ্য সে মেহেন্দী অনুষ্ঠানে থাকতে চায়নি,মায়া জোর করে রেখেছে। তাঁর মায়ের শরীরটা আজকাল ভীষণ খারা’প।তবু মায়া অনুরোধ করাতে তাঁর মায়ের থেকে অনুমতি নিয়েই এসেছে। কিছু সময়ের জন্য।
মীর দেখল মায়াকে। নিস্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।কোন অঙ্গভঙ্গির সাথেও আজ মায়াকে রাগানোর চেষ্টা করল না। রাফিদ ও সে পথ ছেড়ে দেয়।মায়া তাঁদের সামনে থেকে যেতে একবার আড়চোখে মীর কে দেখল।মীরও তাকিয়ে ছিল। দু’জনের চোখ একই সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল।

আমজাদ চৌধুরী গ্রামের কিছু ব্যক্তিবর্গের সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন হাঁসি মুখে। হঠাৎ চোখ পড়ে মায়ার দিকে। তাঁর কথা থেমে গেল। আটকে যায় শব্দ। দু’চোখ ভরে শুধু মায়ার মলিন মুখখানি দেখল। গুটিগুটি পায়ে এইতো উঠোনে দৌড়াচ্ছিল সেদিন।আদো আদো কথা বলে সারাদিন মাথা খেয়ে নিত। কোথাও আমজাদ রওনা হলে মায়া আগেভাগে তৈরি হয়ে সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত।আর শর্ত দিত ‘আজ আমাকে না নিয়ে গেলে,তোমাকেও যেতে দেব না।’ তাঁর সে-ই ছোট্ট রাজকন্যা আজ অনেক বড় হয়ে গেছে।পড়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। আলাদা একটা পরিচয় তৈরির যেন আয়োজন চলছে। আমজাদ এর দু’চোখ বেয়ে অঝড় বৃষ্টির মত জল গড়িয়ে পড়ল। তাঁর চোখের জল দেখলেন থমাস শন। তিনি আমজাদ এর কাঁধে শান্তনা স্বরুপ হাত রেখে বললেন “তোমাকে আজকে শান্তনা দেয়ার মত কোন শব্দ নেই। কিছু বলার নেই। প্রতিটি মা বাবার জন্য এই দিনগুলো খুব কষ্টের হয়। বিশেষ করে বাবাদের কাছে।শুনেছি বাবারা মেয়েদের একটু বেশিই ভালোবাসে। আমার মেয়ে সন্তান নেই,তবু আমি উপলব্ধি করতে পারছি।” থমাস শন মৃদু হেঁসে থামেন।ফের বললেন “যদিও আমি আমার মীর কে অনেক ভালোবাসি।ওই যেন আমার মেয়ে এবং ছেলে।” বলে একবার ঘুরে তাকাল মীর এর দিকে।

শালুক অতিথিদের আপ্যায়ন এর কাজে ব্যস্ত ছিলেন।চোখ পড়ে মায়ার দিকে। আজ মায়া প্রথমবার লাল শাড়ি পড়েছে।বউবউ লাগছে। শুধু যেন ঘোমটার খামতি।হয়ত আগামী পরশু সে-ই বউ সাজে দেখার দিনটিও চলে আসবে।শালুক ফিরে তাকাল আমজাদ এর দিকে। তাঁর অভিব্যক্তি দেখছেন।মনে হচ্ছে যেন তিনি ভেঙ্গে পড়ছেন।একই সাথে জয়ন্তন দেখছেন মায়াকে। রাফিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল মায়ার দিকে চেয়ে। তাঁর হাঁসি যেন বলতে চাইছে সে-ই ছোট্ট বোনটি আজ পড়ের ঘরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। ভালো থাকুক ও। রাফিদ আড়ালে চোখ মুছে।

দোতলার রেলিঙ পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কাবির।তিনি চৌধুরী বাড়ির সকলকে পরপর তাকিয়ে দেখছেন।
আহির ফিরে এসেছিল সন্ধ্যার দিকে।আজ বাড়ি ফিরে সে কারো সাথে কথা অবধি বলেনি। খাওয়া দাওয়া করেনি।অরুণ খেয়েছিল।আহির কে বারবার ডেকেছিল খেতে। যায়নি।মীর ও রাফিদ এর সাথে কথা বলেনি। রাফিদ তখন তাঁর পিছু পিছু ঘর অবধি এসেছিল। আহির কে চুপচাপ দেখে জিজ্ঞেস করেছিল “কি হয়েছে? কেস কতদূর?’
‘সমাধান এর খুব কাছের।’ বলে চেয়ারে ধব করে বসে পড়ে একগ্লাস জল খেয়েছিল। পুনরায় বলেছিল ‘আমাকে একা কিছুক্ষণ ছেড়ে দে।’ রাফিদ তখন আহির এর ব্যবহারে বিষ্ময়ে তাকিয়ে ছিল শুধু। দ্বিতীয়বার কোন প্রশ্ন না করে চলে যায়।

সে-ই সময়ের পর আহির সবেই ঘর থেকে বের হয়েছে। পরনের শার্ট প্যান্ট পাল্টে পাঞ্জাবি পায়জামা পড়েছে।শীত ঠেকাতে একটা মোটা শাল জড়িয়েছে।সেও এসে রেলিঙ এর কাছে দাঁড়ায়।দু হাত আলতো ছোঁয়াতে রেলিঙ এ রাখে।পাশে এসে দাঁড়াল অরুণ।আহির এর দৃষ্টি অনুসরণ করে ও তাকাল নিচে মেহেন্দী পালঙ্কে। সেখানে কিছু মেয়েরা।আহির ঠিক কাকে দেখছে অরুণ তাঁকে খুঁজছে।আহির দেখছে গৌরী কে।

গৌরী মায়ার সাথে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে দু’জনে উপরের দিকে তাকায়। গৌরী দেখল আহির কে।মায়া তাকায় মীর এর দিকে। পরক্ষনেই চোখ সরিয়ে ফেলল গৌরী।মায়ার বা হাতটি তখন একজন ধরল মেহেদী লাগানোর জন্য।হাতের তালু থেকে নকশা শুরু করল।কাঠির সাথে মেহেদী লাগিয়ে থেমে যায় মেয়েটি। মায়াকে জিজ্ঞেস করল ‘আপনার হবু স্বামীর নাম কি? তাঁর প্রথম অক্ষর থেকে একটা নকশা তৈরি করি।’
মায়া মীর এর দিকে চেয়ে থাকায় বেখেয়ালি ভাবে বলল ‘মীর।’ মেয়েটি মীর এর প্রথম অক্ষর থেকে নকশা শুরু করে।

পাশ থেকে মেয়েরা বলাবলি করছে ‘মেহেদীর রং যত গাঢ় হবে স্বামী কিন্তু ততই ভালোবাসবে।’ বলে বলে ওঁরা হাসিতে মেতে উঠছে। ওঁদের হাসির কারণ মায়া ব্যখ্যা করতে পারছে না।ভাবে- কিভাবে এত আনন্দ ওঁদের মনে, যদি আজকের দিনে আমিও এভাবে হাসতে পারতাম!’ মনে মনে বলল আক্ষেপের সুরে। তাঁর মুখে এতটুকু হাঁসি নেই। ইচ্ছে করেও ফোটাতে পারছে না।
মীর সিঁড়ির সাথে গা হেলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মায়া গৌরীর সাথে কথার ফাঁকে ফের তাকাল মীর এর দিকে।মীর হাতের ইশারায় মায়াকে বোঝাল ‘হাসো।হাসলে তোমাকে সুন্দর দেখায়!’

মীর এর ইশারায় মায়া হেঁসে ফেলল।ভাবতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে, দু’দিন পর থেকে আর সে মীর কে দেখবে না।কথা হবে না।সেও হয়ত মোহিনী কে বিয়ে করে বিদেশে চলে যাবে।
কষ্ট হচ্ছে।এরুপ ভাবনা মনে জাগ্রত হলেই যেন মায়া ভেঙ্গে পড়ে।টইটুম্বর করে জল পড়ল মায়ার চোখ থেকে।
অরুণ কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলো আহির কাকে দেখছে। মিষ্টি রঙের থ্রিপিস এর উপর কালো শাল পরনের মেয়েটির দিকে। গৌরী আজ মিষ্টি রঙের থ্রিপিস পড়েছে।অরুণ আহির এর দিকে তাকিয়ে বলল ‘ স্যার, আপনি ওই মিষ্টি মেয়েটাকে দেখছেন কেন?’
“দেখছি না, ভাবছিলাম।”
“কি ভাবছিলেন? আমার সাথে বলুন! আমিও ভাবি”
“সব ভাবনা সবার কাছে বলা যায় না।এক কাজ করো, মিষ্টি রঙের থ্রিপিস পড়া মেয়েটিকে চুপিসারে বলবে আমি ছাদে ডাকছি।বলতে পারবে?”

“এটা কোন কাজ হল,আমি এই যাব,এই আসব!”
আহির ছাদে চলে গেল। বুলবুল মেয়েদের কাছে গেল। গোলাকার হয়ে ওঁরা মেহেদী লাগাচ্ছে। গৌরী সাজানো পালঙ্কের একটু মাঝেই বসা।জোর গলায় ডাকলে সবাই শুনবে। কিন্তু চুপিসারে বলারও কোন পথ পাচ্ছে না অরুণ। অপেক্ষা করছে কখন গৌরী পাশে আসবে! শুধু ঘুরছে পালঙ্কের পাশে।
এক পর্যায়ে গৌরী পাশে এল। অরুণ তখন সবার নজর এড়িয়ে বলল “আপনাকে আমার স্যার ছাদে ডাকছেন। তাড়াতাড়ি আসুন।” বলে অরুণ সরে গেল। গৌরী একবার অরুণ এর দিকে দ্বিতীয়বার মায়ার দিকে চেয়ে বলল “আমি আসছি।’ বলে গৌরী শালটা ভালো করে পেঁচিয়ে চলে গেল ছাদে।

আজ রুপোলি চাঁদ উঠেছে।তারারা ঘর বেঁধেছে দলে দলে।ছাদে মৃদু বাতাস বইছে। আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায় চাঁদ এর গা ঘেঁষে মেঘ উড়ে যাচ্ছে।ছাদে মশাল জ্বলছে। বাল্ব এর আলো কোন কারণে নেভানো। সে-ই ক্ষুদ্রময় সোনালী আলোতে আহির কে দেখা গেল। ছাদের পুব পাশে দাঁড়িয়ে আছে হাত দুটো পেছনে রেখে।আজ তাঁকে সাদা পাঞ্জাবিতে সুন্দর দেখাচ্ছে বলে গৌরী নিশ্চিত করল। সুঠামদেহী সুশ্রী চেহারার আহির মির্জা,গত ক’দিন গ্রামে থেকে যেন তাঁর গায়ের রংটা একটু কালচে হয়েছে। তাঁতে যেন তাঁর সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেল। চঞ্চলতা যেন আজ আর তাঁকে ছোয়নি। গুরুগম্ভীর মুখ নিয়ে কি যেন কি আকর্ষণ নিয়ে দেখছে।
গৌরী গিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াল।আহির তাঁর উপস্থিতি টের পেয়ে বলল “চাঁদ টা সুন্দর না?

“হুঁ।’ একটা প্রশ্ন – একটা উত্তর শেষে দুজনেই চুপচাপ। গৌরীর বাড়ি ফেরার তাড়া।তাই উসখুস করছে।আহির তাঁর অস্থিরতা দেখে বলল “ছুটে পালাতে চাইছো যেন?
“মা বাড়িতে একা আছেন। আমাকে জলদি ফিরতে হবে।”
“যদি এত তাড়াই ছিল, তবে আসলে কেন?’ আহির এর কণ্ঠ কিছুটা কঠিন কিছুটা নরম।দুইদিক মেলানো। গৌরী বিব্রতকর অবস্থায় পড়ল।মনে হচ্ছে যেন তাঁকে অপমান করা হচ্ছে।
“মায়া খুব করে বলেছিল,তাই এসেছি।”
“জীবনে অন্যর নয়, নিজের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিতে হয়।”
“আমি সর্বদা আমার সিদ্ধান্তকেই মূল্য দেই।”
আহির তাঁর পায়ের স্থিরতা কাটাল। পায়চারি শুরু করল গৌরীর চারপাশে। গৌরী চুপসে গেল অকারণে।সে গলা নত করে বলল “এভাবে আমার চারপাশে ঘুরছেন কেন!কেউ চলে আসবে,যা বলার জন্য ডেকেছেন তা দ্রুত বলুন।”
আহির থেমে গেল। গৌরীর সামনে ঝুঁকে বলল “শোনো মিস সারওয়ারি, তোমার চোঁখে ভয় মানায় না। মানায় তেজ, রাগ।’

‘মিস সারওয়ারি’ শব্দটি গৌরীর চারপাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বারবার।মাথা তুলে ডাগর ডাগর চোখ দুটো ছুঁড়ে দেয় আহির এর দিকে। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠতে চেয়েছিল বটে, গৌরী থামিয়ে নিজেকে দমিয়ে নিল।
আহির সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঠোঁট কুঁচকে হেঁসে বলল “অবাক হচ্ছ নিশ্চয়ই! তোমাদের পদবী কিভাবে জানতে পারলাম!” আহির দীর্ঘ দম ছেড়ে আবার ছাদের পাশে গেল। “তুমি আমার সাথে মিথ্যে কেন বলেছো? তুমি গৌরী নও, তুমি জেসিয়া সারওয়ারি’। তাহলে কেন মিথ্যা পরিচয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ?”
গৌরী থমথমে পরিস্থিতিতে পড়ল যেন। চারপাশে কাঁটা ছড়িয়ে পড়েছে। যেদিকে দৌড়ে দিবে সে-ই বিষা’ক্ত কাঁটা যেন তাঁর পায়ে বিঁধবে। তাঁর শ্বাস প্রশ্বাস ওঠানামা করছে।

আহির গৌরীর সামনে গেল। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল “শান্ত হও, তুমি আমার কাছে মিথ্যে বলেছো, আমি রাগ করিনি,আমি আহির কে তোমার সাথে রাগ করার? অভিমান করার?
গৌরী কোন কথাই বলতে পারছে না। রেলিঙ ঘেঁষে বসে পড়ল মেঝেতে।হাত পা এক করে নিজেকে যেন গুটিয়ে নিল।চোখ থেকে জল পড়তে শুরু করল।আহির তাঁর কান্নার পুরোপুরি কারণ, ব্যথা এখন পর্যন্ত ধরতে পারল না।সেও বসে হাঁটু গেড়ে গৌরীর সামনে।
“চুপ করে কেন আছো?কিছুতো বলো! কাঁদছো কেন? তুমি তোমার আসল নাম কেন লুকিয়ে রেখেছো?
গৌরী অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল “আমার বাবার জন্য।”

“কি করেছিলেন উনি?
“বিশ্বাস’ঘাতকতা”
“কেন? বাবা হয়ে মেয়ের সাথে বিশ্বাস’ঘাতকতা করে করেছিল?
গৌরী আহির এর আদুরে কণ্ঠ শুনে বাঁধভাঙা নদীর মত কেঁদে উঠল।আজ যেন তাঁর সমস্ত জমা কষ্ট গুলো ভেসে উঠছে।
আহিরও গৌরীর সাথে তালে তাল মিলিয়ে মেঝেতে বসল। দ্বিধা নিয়ে গৌরীর হাত দুটো ধরল। এরপর বলল “নির্দ্বিধায় আমায় সবটা বলতে পারো।আমি তোমার বিশ্বাস ভাঙ্গব না।”
“যে বিশ্বাস ভাঙ্গার সে-ই তো ভেঙ্গে দিয়েছিল।”

“কে সে?
“আমার বাবা।”
“খুলে বলো সবকিছু?আর তোমার বাবা মা’রা গিয়েছিলেন কিভাবে? আত্ম’হত্যা নাকি খু’ন!”
“খু’ন হয়েছিল‌!”
“কে তোমার বাবাকে মে’রেছে!
“আমি সে-ই পুরানো দিনের কথা মনে করতে চাই না। কষ্ট হয়।”
“কখনো কখনো ফেলে আসা স্মৃতিতে নাড়া দিতে হয় জেসিয়া।”
আহির এর মুখে জেসিয়া’ নামটা শুনে গৌরী মাথা তুলে তাকাল তাঁর দিকে।আহির শান্ত গলায় বলল “এভাবে দেখছো কেন? নিজের আসল নামটা এত বছর পর শুনে নিশ্চয়ই অবাক লাগছে!এবার বলো,কি করেছিলেন তোমার বাবা!আর কেনই বা তাঁকে অন্যর হাতে প্রাণ দিতে হল?

“আমার মা’কে ঠকিয়েছিল। আমার মা বরাবরই নরম মনের মানুষ ছিলেন।আজও তাই। কিন্তু তখন যেন উনি একটু বেশিই নরম ছিলেন।কেউ অতি সহজে ভুলিয়েভালিয়ে নিতে পারতো।ঠিক সেভাবেই আমার মায়ের সরলতার সুযোগ নিয়েছিলেন তিনি।মা একসময় ছিলেন সুদর্শনা নারী।যে কেউ অতি সহজে প্রেমে পড়ে যেতেন।সেদিন আমার বাবাও আমার মায়ের প্রেমে পড়েন। আমার মা মধুবনপুর গ্রামে থাকতেন। শহরের নিকটবর্তী গ্রামে। পহেলা বৈশাখে গ্রামে মেলা বসে। সেখানে মা যান গ্রামের মেয়েদের সাথে ঘুরতে।আর ঠিক সেদিন আমার বাবাও শহর থেকে মায়ের গ্রামে যান ঘুরতে। মাহতাব সারওয়ারি।পেশায় একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। উচ্চ বংশের ছেলে। আমার মা’কে দেখে সেদিন প্রেমে পড়েন উনি।মা গ্রামের মেয়ে ছিলেন বলে শহুরে কারো সাথে মিশতে অভ্যস্ত ছিলেন না।এরপরও বাবা সেদিন মায়ের সাথে কথা বলেন।” গৌরী থামে সেকেন্ড কয়েক এর জন্য। এরপর আবার বলল “বাবা মায়ের জন্য মধুবনপুর গ্রামে কিছুদিন থেকে যান।এক পর্যায়ে নানার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন উনি। শহুরে ছেলে, তাঁর উপর টাকাওয়ালা।নানা রাজি হয়ে যান।বিয়ে হয় তাঁদের। বিয়ের প্রায়ই একবছর পর মা বুঝতে পারেন বাবা আর আগের মতন নেই। পরিবর্তন হয়ে গেছেন মানুষটা অনেক। এভাবে কিছুদিন চলতে থাকার পর মা বাবার বন্ধুর থেকে জানতে পারে উনার প্রথম স্ত্রী সন্তান আছে।আর সে তাঁদের কাছেই ফিরে গেছেন।”

“মানে,প্রথম স্ত্রী সন্তান থাকার পড়েও আবার কেন বিয়ে করলেন!”
“প্রথম স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্য হয়েছিল। তাঁর উপর জিদ করে আরেক জনকে বিয়ে করে প্রতি’শোধ নিলেন।আর সেই অন্যজন আমার মা। এরপর ঘুরেফিরে আমার বাবা চলে গেলেন আমার মা’কে ফেলে।আর ঠিক সেই সময়ে আমি মায়ের গর্ভে ছিলাম।বাবার দেয়া কিছু গহনা ছিল। সেইগুলো বিক্রি করে মা চলতে ছিলেন। যতদিন না আমি পৃথিবীতে এসেছি ততদিন অবধি মা খুব কষ্ট করে ছিলেন। এরপর আমি দুনিয়াতে আসার পর অন্যর বাসায় কাজ করা শুরু করে। ধীরে ধীরে আমিও বড় হতে লাগলাম।মা আমাকে শহরের একটা ছোটখাটো স্কুলে ভর্তি করেন। কিন্তু, এরপর আর শহরে থাকা সম্ভব হয়নি।চলে আসি আলিমনগর।নানার বাড়ি ফিরে গেলে হয়ত নানান কথা শুনতে হত।মা আর কলঙ্কের বোঝা সইতে রাজি ছিলেন না।”

“তোমার এত সুন্দর নামটা কে রাখে?
“বাবা। বিয়ের পর মাকে বলেছিলেন তোমার মেয়ে হলে এই নাম রাখব। আমি উনাকে ঘৃণা করি।তাই উনার নাম পদবী ব্যবহার করি না।”
“লোভ,কোন নারীকে টাকার কাছে নয়,বরং একজন সৎ পুরুষের হাতে তুলে দিতে হয়।যে তাঁকে ভাত কাপড়ে কষ্ট দিলেও, বেঈমানি করে অন্তরে দাগ লাগাবে না।” বলল আহির।গৌরীর হাত দুটো ছেড়ে দিল। “আচ্ছা, তোমার বাবাকে খু’ন কে করেছে?আর তুমি তোমার আসল নাম, পরিচয় লুকিয়ে রাখতে কেন?
“লোকের প্রশ্নের ভয়।”
“দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর কিন্তু মিলেনি!”

“আমার বাবার জন্য মা রোগে ভুগছেন,হয়ত তাঁর জীবনের শেষ ঘণ্টা বাজছে। আজকের এই করুণ দশার জন্য বাবা দাই।” থেমে আবার বলল “ কথায় আছে না – অসৎ কর্মের ফল এবং কাউকে ঠকানোর ফল একদিন পেতে হয়, তেমনি আমার বাবাও পেয়েছিলেন।উনার প্রথম স্ত্রীও উনাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর তাঁর সন্তানেরা জোর করে সমস্ত সম্পত্তি উনার থেকে লিখিয়ে রাস্তার ফকির বানিয়ে দিয়েছিল।টাকার বেশ অহংকার ছিল,সময়ে সেটাও শেষ হয়ে যায়। সবকিছু হারিয়ে উনি ফিরে এসেছিলেন আমাদের কাছে। মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু মায়ের তীব্র ঘৃণা পারেনি তাকে ক্ষমা করতে।বাড়ির সামনে পড়ে থাকতেন।মা কথা বলতেন না।আমিও না। এভাবে একদিন ম’দ খেয়ে বাড়ি ফিরে। মায়ের সাথে যা’তা ব্যবহার করে,সেদিন আর আমি সহ্য করতে পারিনি। উনার মাথায় ইট দিয়ে আ’ঘাত করেছিলাম।উনি তখনই মা’রা যান।আমিও বুঝে উঠতে পারিনি সে মা’রা যাবেন।পাড়ার লোকদের কাছে মিথ্যে বলেছিলাম,বাবা কাজ থেকে ফিরেছেন, এরপর কিছু লোক এসে এক রাতে বাবা’কে নিয়ে গিয়ে মে’রে ফেলেন।”

আহির কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকল। দমকা হাওয়াতে তাঁর স্তব্ধতা ভেঙ্গে যায়। ক্লান্ত কণ্ঠে বলল “ দুনিয়াতে সবথেকে অসহায় ব্যক্তি কে জানো,যে অন্যর মনে আ’ঘাত দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়,আর শেষ বিদায় নেয়ার আগে সে-ই মানুষটির কাছে ক্ষমা চাইতে না পারা।”
আহির বিরতি নিয়ে আবার বলল “আমি ভাবি সে-ই নারীর কথা,যে নারীর কোমল মনে সে এতটাই তীব্র আ’ঘাত করেছিল, এরপর সে-ই নারীর কাছে ক্ষমা চেয়েও আর ক্ষমা পেল না। নিজের স্ত্রীর মনে কষ্ট দিয়ে কেউ ভালো থাকে না। দুনিয়ার বুকে প্রতিটি নারীর স্বামী হোক, তবে বেইমান,প্রতারক স্বামী কারো না হোক।একটি ফুলের মত মেয়ের জীবন নষ্ট না হোক।”

The Silent Manor part 62

গৌরী চুপচাপ।সময় গড়াচ্ছে।আহির বলল “একজনের উপর জিদ করে,অন্যর জীবন নষ্ট করা মানুষগুলো কখনো ভালো থাকে না। কিছু সুখ ক্ষণিকের হলেও চিরস্থায়ী হয় না। যদি সে-ই সুখটা অন্যায়ের হয়।”

The Silent Manor part 64