Home দহনসুধা দহনসুধা পর্ব ১০

দহনসুধা পর্ব ১০

দহনসুধা পর্ব ১০
১৫ জন রাইটার

খুব ভোরের দিকে যান্ত্রিক মুঠো ফোনটি ভোঁ ভোঁ ভাইব্রেশনের তালে তালে কেঁপে কেঁপে উঠল। একবার নয়, দু’বার নয়, বেশ কয়েকবার। তার চান্দি চটে গেল। ফোনের নাম্বারটি চেক না দিয়েই কলটা রিসিভ করে কানে ধরল সে। রাগি গলায় বেশ আচ্ছা করে ধমক ছুড়ল, “এই কে রে তুই? সকাল সকাল ফোন দিয়ে বিরক্ত করছিস কেন?”
ফোনের অপর পাশ থেকে মিষ্টি একটি চিকন গলার মেয়েলি স্বর ভেসে এলো, “আপনার একমাত্র বউ, অশুদ্ধ সাহেব। চিনেছেন আমায়? আপনার তো আবার ভুলে যাওয়ার ব্যামো আছে। তাই ঘণ্টায় ঘণ্টায় আমাকেই মনে করিয়ে দিতে হয় আমি যে আপনার একমাত্র বউ, বুঝলেন অশুদ্ধ সাহেব?”

শুদ্ধ কানের কাছ থেকে ফোনটা নামিয়ে ফোনের নাম্বারটি এক ঝলক দেখল। এটা সেই বিরক্তিকর মেয়েটা। যে তাকে সকাল বিকাল প্রতিনিয়ত ফোন দিয়ে জ্বালিয়ে মা’রছে। আবার কথায় কথায় দাবি করছে, ‘আমি অশুদ্ধ সাহেবের একমাত্র বউ।’ অসহ্যকর একটা! হ্যাঁ অশুদ্ধ নামটা ওরই দেওয়া।
পুনরায় ফোন কানে ধরল শুদ্ধ। শখের ঘুমটা ভাঙার জন্য বেয়াদব মেয়েটার গালটা তার ফাটিয়ে দিতে বড্ড ইচ্ছে করল। সে বেশ কড়া গলায় শুধাল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“চড় খেয়েছিস?”
“ছিহ! অশুদ্ধ সাহেব, বউকে কেউ চড় দেয়?”
“তাহলে বউকে কি দেয়?”
ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা নারীটি এবার সামান্যতম লজ্জা পেল। লাজুকতায় খানিকটা নেতিয়ে গেল। হেসেও দিল সে। বলল, “বউকে তো আদর করতে হয়, অশুদ্ধ সাহেব। তা-ও জানেন না?”
“কিন্তু তুই তো আমার বউ না। তোকে আদর করতে যাব কোন দুঃখে?”
মেয়েটার ফুরফুরে মনটা ক্ষণকালের মধ্যে মলিন হয়ে গেল। সে অভিমানী গলায় ধীরস্থে প্রশ্ন করল,

“আপনি এমন কেন?”
“কেমন?”
“কথায় কথায় চড়ের কথা বলেন। সঙ্গে দুটো রোমান্টিক কথাও শুনান না। শুনতে ভাল লাগবে।”
“আয় আদর করি।”
মেয়েটার মুখটা চমকপ্রদ।
“সত্যি!”
“কানের দুই ইঞ্চি নিচে এমন চড় দিব না, শুধু আব্বা আব্বা করবি।”
“ধুর! আব্বা আব্বা করব কেন? করব তো জামাই জামাই।”
“ওই.., তুই যে পাগল, তোর পরিবারের কেউ জানে?”
“না তো, একমাত্র আপনিই জানেন। কারণ আপনার জন্যই আমি পাগলামি করি। আর কারোর জন্য নয়, অশুদ্ধ সাহেব। বাই দ্য ওয়ে আপনি কিন্তু খুব স্মার্ট। একদম টসটসে রসগোল্লার মতো।”

“ফোন রাখ।”
“প্রশংসা করলে বুঝি মানুষ ফোন রাখতে বলে?”
“আমি বলি। কারণ আমি শুদ্ধ নিজের ইচ্ছে মর্জিতে চলি। কারোর বাপের কথাতে নয়। ফোন রাখ শা*লি। আসছে সকাল সকাল আমার ঘুমটা ভেঙে প্রেমালাপ করতে।”
কথাগুলো শেষ করেই মেয়েটার মুখের ওপর ঠাস করে শুদ্ধ কলটা কেটে দিল।

ফোনের অপর প্রান্তে বসে থাকা সুনেরার মনটা ক্ষণিকের মধ্যে খারাপ হয়ে গেল। মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয়! তবে সকাল সকাল ওয়াজেদ পরিবারের লক্ষ্মী ছেলেটাকে জ্বালাতে পেরে তার বেশ আনন্দ হচ্ছে। সে হল শেহরাজ পাটোয়ারীর ফুফু শাহানাজের একমাত্র মেয়ে সুনেরা। তাকে জন্ম দিতে গিয়েই তার মা মা’রা যায়। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে। তখন ছোট সুনেরা ১ম দু’বছর তার বাবার কাছেই ছিল। পরে সুনেরার বাবা তার ভরষপোষণের দায়িত্ব নিতে পারবে না বলে পাটোয়ারী পরিবারে তাকে দিয়ে যায়। সেই যে তার বাবা তাকে দিয়ে গেল, আর তার খোঁজ খবর নিতে এলো না। তখন থেকেই সুনেরা পাটোয়ারী পরিবারের একজন সদস্য হয়ে ওঠে। সকলে তাকে এত বেশি আদর, স্নেহ, আর ভালোবাসে যে, তাতে তার মনেই হয় না এটা পরের বাড়ি। বরঞ্চ নিজের বাড়ি মনে হয়। এমন কি তার কলেজে নামের সঙ্গে সুনেরা পাটোয়ারী দেওয়া। শেহরাজ তাকে নিজের বোনের চেয়েও বেশি আদর স্নেহ করে। বর্তমানে তার সকল দায়িত্ব শেহরাজ নিয়েছে। কিন্তু শেহরাজ কি জানে? যার কলেজ ফি থেকে শুরু করে বিয়ের যাবতীয় দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে, সেই সুনেরা তার শত্রুপক্ষ শুদ্ধকে ভালোবাসে? উঁহু জানে না। আর শুদ্ধও জানে না সুনেরা পাটোয়ারী পরিবারের একজন। যেদিন সত্যিটা সামনে আসবে, ভয়াবহ রকমের একটা ঝড় হবে। সেই ঝড় হয়ত শীঘ্রই হবে।
আপাতত সুনেরা এসব ভাবে না। তার মতে, বাঁচব আর ক’দিন? এ ক’দিনে এত ঝামেলা পাকানোর দরকার কি? তার তো অশুদ্ধ সাহেবকে রাগাতে বেশ লাগে। সে মনে মনে ভাবে, “আমার সঙ্গে পল্টি নেওয়া এত সহজ নয়, অশুদ্ধ সাহেব। আপনার নামের মতো আপনাকেও আমি একদিন পাল্টে দিব। নতুবা আমার নামও সুনেরা পাটোয়ারী নয়।”

পেশেন্ট দেখার কথা ছিল সকাল আটটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত। সেখানে পেশেন্ট দেখতে দেখতে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত বাজিয়ে ফেলল। আর সবটা হল উমেরার গাফিলতির জন্য। এর কারণ ছিল সে শেহরাজকে কোন প্রকার সাহায্য করেনি। কেনই বা সাহায্য করবে? কথায় কথায় যেই লোকের এত আত্মভিমানী, দম্ভে পা নিচে নামে না। সে কেন অন্যের সাহায্য নিতে যাবে? নিজের কাজ নিজেই করুক না। তার ওতো ঠেকা পড়েনি যে, শত্রু পক্ষকে সাহায্য করে মানবতা দেখাবে। ওসব কাজে নব্য করে সে আর হাতও লাগায়নি। ঠায় মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। শত্রুর বংশের লোকের সঙ্গে এত পিরিত ভাল নয়। তার বাবা একটা কথা বলতো, ‘শত্রু হয় বিষের মতো। সে সামনে থাকলে চোখ জ্বলে, পেটে গেলে গলা জ্বলে।’

তার বাবার কথা অবশ্য সঠিকই। শেহরাজ একটা নীল রঙা বিষাক্ত বিষই; যাকে দেখলে তার সারা অঙ্গ জ্বলে। কেন জ্বলে তা অপ্রকাশিত নয়।
ফ্রীতে চিকিৎসা পেয়ে পেসেন্টদের সংখ্যাও বেড়ে গেল। পাহাড়িদের যে লম্বা লাইন, তা সারারাত বসেও পেশেন্ট দেখলে শেষ হবার নয়। তাই ড. মহিদ জানাল, তারা আরও দু’দিন থাকবে এখানে।
কথাটি শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করা মাত্রই উমেরার রাগ তিরতির করে বেড়ে গেল। সিনিয়র টিচার আর ডক্টর হওয়া সত্ত্বেও সে ড. মহিদকে যথাযথ সম্মানটুকু দেখাতে পারেনি। ওয়াজেদ পরিবার ওমন বুকে ভয় নিয়ে চলে না। তারা রাখে বুকে ভয়ের বদলে সাহসীকতার অস্ত্র । যা শত্রু পক্ষকে ক্ষতবিক্ষত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ছেলেবেলা থেকে ভয়কে পিছু ফেলে রেখে চলতে শিখিয়েছিল তার বাবা উমর ওয়াজেদ। মেয়ে হয়েছে বলে তাকে দুর্বল হওয়া যাবে না। লড়তে হবে। বাঁচতে হবে। শত্রুকে পরাস্ত করতে হবে। সে ড. মহিদকে জানাল, “এটা কেমন কথা স্যার? এখানে আমাদের থাকার কথা ছিল একদিন। এখন বলছেন দু’দিন? সেই অনুযায়ী আমরা পূর্বপ্রস্তুতিও নিয়ে আসিনি। কথা ছিল সারাদিন পেসেন্ট দেখব। রাতের বাসে আবার ফিরে যাব। তাহলে দ্বিমুখীতা কেন দেখাচ্ছেন?”
ড. মহিদ কিঞ্চিৎকর চটল।

“মিস উমেরা ওয়াজেদ, প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। আমরা পরিস্থিতির স্বীকার। এখানে শখ করে কেউ বিয়ে খেতে থেকে যাচ্ছি না। আমাদের সবার মূল উদ্দেশ্য একটাই। সেটা হল ফ্রীতে পেশেন্ট দেখা। তাদের সঠিক চিকিৎসা দেওয়া। সেখানে পেশেন্ট রেখে যদি চলে যাই, কতৃপক্ষের কাছে আমাকে জবাবদিহি দিতে হবে। সেটা কি তুমি করবে?”
উমেরার রাগ এবার চওড়া হল। মাত্রাতিরিক্ত চটলও সে।
“এটা আমাদের এখানে আসার আগে জানানোর প্রয়োজন ছিল।”
ড. মহিদ পাল্টা জবাব দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই শেহরাজ তাবু থেকে বেরিয়ে এলো। সে এতক্ষণ নিজের তাবুতে ছিল। আজ কতজন পেশেন্ট দেখেছে, তাদের কি কি প্রবলেম, সব কাগজে তুলছিল। তখনই উমেরা আর ড. মহিদের কথা-কাটাকাটির শব্দ তার কর্ণধারে গিয়ে পৌঁছাল। তার কলম সেখানেই থেমে পড়ে। কলমের ভার খাতার ওপর ছেড়ে দিয়ে সে লম্বাটে লম্বাটে পা ফেলে দীর্ঘপেশি দেহটা নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হলো। উমেরার রাগান্বিত মুখটা এক ঝলক দেখে ড. মহিদের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকাল সে।

“এনি প্রবলেম, ড. মহিদ?”
ড. মহিদ কিছুটা রাগের সঙ্গে উত্তর দিল,
“আর বলবেন না ড. শেহরাজ, আজকালের স্টুডেন্টরা এত পরিমাণ অভদ্র বেয়াদব হয়েছে, যা টিচারদের হুকুমও অমান্য করে। এরা নিজেকে নিজেরা প্রধানমন্ত্রী ভেবে বসে। গুরুজনের সিদ্ধান্ত তাদের কাছে যেন কিছু না।”
“ব্রেনলেসদের সঙ্গে কথা বলতে যান কেন, ড. মহিদ? আপনিও দেখছি শুধু হাত পায়ে বড়ো হয়েছেন। চান্দিতে সব ফাঁকা। বুদ্ধির ঘাটতি রয়েছে। বাচ্চাদের মতো নির্বোধের সঙ্গে তর্কে না জড়িয়ে নিজের কাজ নিজে করুন। এদের হাজার বোঝালেও বুঝবে না। যেই লাউ, সেই কদুই থাকবে।”
উমেরা কটমট করে শেহরাজের দিকে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। কয়েকটা কঠোর বাক্য শুনিয়ে দিবে ভাবল। তার আগেই শেহরাজ তার ভাবনাতে জল ঢেলে দিল। যেভাবে এসেছিল, সেভাবে চলে গেল। উমেরার রাগ অম্বরচুম্বিত। প্রচন্ড রাগ। রাগে তার মাথার কোষগুলি ছিড়ে যাচ্ছে। কত্ত বড় সাহস! তাকে ব্রেনলেস বলে, আবার নির্বোধও বলছে। আচ্ছা পাটোয়ারীদের পেটে পেটে এত শয়তানি আসে কোথায় থেকে? খায় কি এরা? শয়তানে গোডা?

রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ। পাহাড়ি জায়গা। পাহাড়ের জঙ্গলি পশুদের আক্রমন থেকে রক্ষা পেতে বাহিরে কাঠ দিয়ে আগুন ধরানো হয়েছে। রাত মোটামুটি ভালই বড়ো হয়েছে। পাহাড়ি জঙ্গল থেকে শ্বাপদদের লোমহর্ষক সব অদ্ভুটে ডাকে শরীরের লোম দাঁড়ানোর মতো অবস্থা। এসব জায়গায় একা থাকার অভিজ্ঞতা কখনোই উমেরার ছিল না। তার ভাই শুদ্ধ বেশ কয়েকবার তাকে ফোন করেছিল। সে ইচ্ছে করেই ধরেনি। ধরার মতো মনমানসিকতাও ছিল না। তার ওই পাটোয়ারী বংশের সবচেয়ে অহংকারি লোক মি. শেহরাজ পাটোয়ারীর ওপর অনেক রাগ। ওই লোকটাকে যদি সে ঝুলিয়ে কিছুদিন পিটাতে পারতো। মনে শান্তি মিলতো। জীবনে সে অনেক লোক দেখেছে, কিন্তু এমন বদমেজাজি, অহংকারি জঘন্য লোক সে একটাও দেখেনি। তার পাশে জারা নেই। একাই তাবুতে ঘুমুচ্ছে। জারার তাবু আলাদা। তার তাবুটা একটু জঙ্গলের দিকে। শেয়াল আর শকুনের ডাকে কানটা জ্বালাপোড়ার মতো অবস্থা। এদের এক একটা হাঁক তার রাতের ঘুম কারার মতো। সামান্য একটু আওয়াজ হলে সে ঘুমাতে পারে না। আর এখানে গোটা শেয়াল আর শকুনের পাল যেন ইচ্ছে করে এসে তাকে বিনা পয়সায় ডাক শুনিয়ে যাচ্ছে।

সে উঠে বসল বিছানার ওপর, গালে হাত দিয়ে ভাবতে লাগল আগামীকাল কি কাজ করা যায়? এখান থেকে যাওয়ার আগে ওই পাটোয়ারী বংশের শেহরাজকে যদি একটা শিক্ষা না দিয়ে গেছে, তবে তার নামও উমেরা ওয়াজেদ নয়। তার ভাবনা মাঝে টের পেল জঙ্গল থেকে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ ভেসে আসছে। এই নিস্তব্ধ রজনীতে ওমন মচমচ শুকনো পাতার আওয়াজ কর্ণকুহরে ঠিক লোমহর্ষক ভয়ের ন্যায় ঠেকল। এক একটা শব্দ পৈশাচিকভাবে রাতের অন্ধকারে কর্ণে বাজে। উমেরা ভাল করে কান খাঁড়া করে শুনল, কোনো মানুষের পায়ের আওয়াজ। বেশ সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলছে। কিন্তু কে? সে কি বাহিরে বের হবে? একবার দেখবে? হ্যাঁ অবশ্যই বের হবে। দেখবেও। কারণ সে ভিতু নয়। উমেরার হাতে একটা টর্চ। সে টর্চ হাতে তাবু থেকে বেরিয়ে এলো। গভীর রাত। সবাই যে যার তাবুতে ঘুমুচ্ছে। বাহিরে কারোর শ্বাসের শব্দ পাওয়াও যাচ্ছে না। কোথায় সেই মচমচ পায়ের আওয়াজ? সবটা যেন তার আগমনে মিলিয়ে গেল। তাহলে কী ছিল সেটা? জঙ্গলি কোনো পশু? হবে হয়ত!

সে তাবুতে আবার ফিরে যাচ্ছিল। তাৎক্ষণিক পিছু থেকে কালো লম্বাটে একটি ছায়া ত্বরিত ছুটে এসে তার মুখটা শশব্যস্ত চেপে ধরল। হঠাৎ আক্রমণে উমেরা অপ্রস্তুত হল। সেই সঙ্গে থমকেও গেল সে। বিমূর্ত সে, বক্ষ গহ্বরে বাড়ল দ্রিম দ্রিম করে হৃদপিণ্ডের আওয়াজ। তার হাত থেকে পড়ে গেল টর্চটি। অচেনা লোকটির হাতে ধারাল চকচকে একটি ছুরি। যেটা দিয়ে তাকে আঘাত করতে চাইছে। সে আত্মরক্ষা করতে লোকটাকে বাঁধা দিল। অচেনা লোকটিও সংকল্প করে এসেছে যেন, আজ তাকে আক্রমন করেই যাবে, নতুবা খুন করবেই। তার সঙ্গে অচেনা আগন্তুকের ধস্তাধস্তির লড়াই চলছে। আগন্তুক ব্যক্তি বেশ শক্তিশালি আর চতুর। সে কোনো পুরুষ। বেশ শক্তিশালি পুরুষ। যার সঙ্গে লড়াই করে উমেরা পারবে না এতটুকু অন্তত বুঝল। সে ধস্তাধস্তির মধ্য আগন্তুকের মুখটা একবার দেখতে চেষ্টা করল। মাথায় কালো ক্যাপ, মুখে কালো মাস্ক পরা। মুখ দেখার কোনো উপায় নেই। এমনভাবে নিজেকে ঢেকে এসেছে, চাইলেও সে মুখটা দেখতে পারছে না। কিন্তু এই লোকটা এত মানুষ রেখে তার ওপর আক্রমণ করতে চাইছে কেন? তার কাছে চাইছেটা কি?

নিশ্চিত এটা পাটোয়ারী পরিবারের কাজ। পরিকল্পিত কোন হামলা। পেটে পেটে এদের এতো শয়তানি? আপাতত তার নিজেকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? এক মিনিট, পুরুষের সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্ট কোথায়? কথাটা ভাবতেই সে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। আচমকা লোকটার স্পর্শকাতর স্থানে একটা লাথি বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আগন্তুক ব্যক্তি ওকে ছেড়ে দিল। ছাড়া পেতেই উমেরা দিল দৌড়। বেশ কিছু তাবু ছিল। এরমধ্যে একটা তাবুর দরজা খোলা ছিল। সে সেই তাবুতে ফট করে ঢুকে গেল। ভিতরে ঢুকেই সবার আগে তাবুর দরজার চেইনটি আটকে দিল। এরপরে সামনে ঘুরে ফোঁস করে বেশ কয়েকটি শ্বাস ফেলল। আপাতত সে নিরাপদ কথাটি ভেবেই স্বস্তি পেল। এক পলক সামনে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত পা রীতিমতো ঠান্ডা হয়ে এলো। কার তাবুতে এল সে? তার সামনে বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে ললাট কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং শেহরাজ পাটোয়ারী। এত তাবু থাকতে তাকে কিনা এই অসভ্য লোকটার তাবুতে আসতে হল। এখন বাহিরেও যেতে পারবে না। কারণ বাহিরে বাঘ, ভেতরে সিংহ। মাঝখানে সে হুলো বিড়াল। ভাগ্য আজ তার সঙ্গে নিষ্ঠুর খেলা খেলছে। নতুবা এমন বাজে পরিস্থিতি কেন তার সঙ্গে ঘটবে? যে করেই হোক তাকে কিছু একটা করতে হবে। শেহরাজ বুকের আড়াআড়ি হাত বাঁধা ছেড়ে পকেট হাতিয়ে একটি সিগারেট বের করতে করতে উমেরাকে ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,

“কি ব্যপার, ওয়াজেদ পরিবারের সদস্য হঠাৎ এখানে?”
শেষ করেই সে লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান বসিয়ে দিল। উমেরার মুখের ওপর কতকগুলি ধোঁয়া ছেড়ে দিল। উমেরার কাশতে কাশতে নাজেহাল দশা। চোখে জল আসার উপক্রম। এত জগন্য খারাপ লোক হয়! সে চোখ রাঙাল। তর্জনী আঙুল তুলে শাসাল,

“মি. পাটোয়ারী, ভদ্রতা কী বাজারে বিক্রি করে এসেছেন? প্লিজ ভদ্রতা বজায় রাখুন। নতুবা খুব খারাপ হবে কিন্তু।”
উমেরার কথা শেহরাজের ওপর কোনো রকম প্রভাব ফেলল না। তোয়াক্কাই করল না সেসব। সে ঠোঁট থেকে সিগারেটও নামায়নি। ঠোঁটের ভাঁজেই জ্বলছে জ্বলন্ত সিগারেটটি। সে উমেরার দিকে এক ধাপ এগিয়ে যায়। উমেরার তাক করে রাখা তর্জনী আঙুলটি নৈঃশব্দ্যে নিচে নামিয়ে দিয়ে বলল,
“ওয়াজেদ পরিবার এত নির্লজ্জ হলো কবে থেকে? গভীর রাতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের রুমে ঢুকে বলছে, অসভ্য? তা সভ্যতার প্রতীক, অসভ্যতামি এখনো তো শুরুই করিনি। যখন শুরু করব না, চেয়ে চেয়ে শুধু দেখবেন, আর চোখে মরিচ দিয়ে কাঁদবেন, পাতি ডাক্তার সাহেবা। তার আগেই দূরত্ব বজায় রাখুন।”
“আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন? অসভ্যতামি করবেন, তাই না? একদম নারী নির্যাতনের মামলা দিয়ে দিব।”
শেহরাজ ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে শুধাল, “তাই? তা আপনাকে কোথায় কোথায় নির্যাতন করেছি আমি? দেখান আমায়?”

“আপনাকে আমি কেন দেখাতে যাব? আমি কি আপনার স্ত্রী?”
“আপনার মতো বকবক রানিকে বউ করবে কে? যে করবে, তার ঘর পুড়বে।”
“অন্তত আপনার তো পুড়ছে না। তাহলে এত চিন্তা করছেন কেন?”
“এই যে মিস ঝগড়াটে, মাঝরাতে আমার তাবুতে কি আপনি ঝগড়া করতে এসেছেন? তাহলে এসব ফাও চিন্তা মাথা থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলে দেন। শেহরাজ পাটোয়ারীর এমনও দুর্দিন আসেনি যে, ঘুম বাদ দিয়ে মুখের ভাষা খরচ করে ব্রেনলেস মহিলাদের সঙ্গে মাঝরাতে ঝগড়া করবে। এখন বের হন আমার তাবু থেকে।”
“আপনি কিন্তু রীতিমতো আমাকে অপমান করছেন।”
“না, আপনাকে তো ঝাপটে ধরে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত ছিল। একে তো মাঝরাতে পরপুরুষের তাবুতে অনুমতি ছাড়াই প্রবেশ করেছেন। তার ওপর মুখের কি তেজ? দিব তেজ ভেঙে?”

“কি করবেন আপনি?”
উমেরার গলার আওয়াজ বাড়ল। লোকটার ঠোঁটের কোণে দুর্বোধ্য হাসির ঝলক।
“অনেক কিছুই করতে পারি।”
“যেমন?” প্রশ্ন করেই উমেরা চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে ফেলল।
“এই ধরেন, বাহিরে একটা কালো ছায়া হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যাচ্ছে। মনে হয় সে আপনাকে খুঁজে চলছে। আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। তার হাতে আপনায় তুলে দেই, কি বলেন?”
উমেরার মাথায় হাত। এত সব এই লোকে জানল কী করে? নিশ্চিত এই ব্যাটার নির্ধারিত পরিকল্পিত সব। সে দু’কদম শেহরাজের দিকে এগিয়ে গেল।

“আপনি নিজেকে ভাবেন কি, হ্যাঁ? রাতের আঁধারে মানুষ পাঠিয়ে আমায় খুন করবেন? তাহলে ওসব ভুলে যান। ওতো কাঁচা খেলোয়ার আমি নই।”
শেহরাজের শরীর গরম লাগছিল। এখানে ফ্যান নেই। ভ্যাপসা গরম খারাপ না। সে শরীর থেকে শার্টটি খুলতে খুলতে বলল, “হ্যাঁ আপনার বাবার কাঁড়ি কাঁড়ি সম্পত্তি আছে তো। আপনাকে খুন করে সেসব নিয়ে আমি ভেগে যাব। আর কিছু?”
“আশ্চর্য! আপনি শার্ট খুলছেন কেন?”

শেহরাজের মেজাজটা এবার মাত্রাতিরিক্ত আকাশ ছুঁইল। সে ফল কাটার ছুরিটা ত্বরিত হাতে তুলে নিল। ক্ষুৎপিপাসায় এমনিতে পেট জ্বলছে। তার ভিতরে মেয়েটার চটাৎ চটাৎ কথা তার পরাণে সইল না। সে ছুরি হাতে নিয়ে উমেরার দিকে রাগে ধা ধা করে এগিয়ে গেল। উমেরার গলায় ধারালো ছুরিটা ঠেকিয়ে বলে,
”কিরে ওয়াজেদের বেটি, দিব গলাটা কেটে? আর একটা প্রশ্ন করবি তো, সোজা গলা কেটে খুন করে গুম করে দিব। একটা কাকপক্ষীও টের পাবে না।”
উমেরা শেহরাজের হুমকিতে ভয় পেল না। সে খানিকটা হেসে দিল।

“পাটোয়ারীরা খুনি আজ নতুন নাকি?” উমেরার উপহাসমূলক খোঁচা শেহরাজ গায়ে মাখালো না।
সে ওর গলা থেকে ছুরিটা নামিয়ে নেয়। সিগারেট ঠোঁটের ভাঁজ থেকে সরিয়ে পায়ের নিচে পিষে নিল। তৎপর উমেরার হাত ধরে তাবু থেকে বের করিয়ে দিচ্ছিল। রাগে অপমানে উমেরার ফরসা মুখটা লালবর্ণ হয়ে এলো। এর মধ্যে মি. মহিদ আর তার সহকারি নাহিদকে দেখা গেল শেহরাজের তাবুর দিকে এগিয়ে আসতে। তখন উমেরা আর শেহরাজকে এক তাবু থেকে বের হতে দেখে ড. মহিদ ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“তোমরা এখানে?”
শেহরাজ উমেরার হাতটা সাবধানে তাৎক্ষণিক ছেড়ে দিল। মুখের ভাবভঙ্গি বেশ স্বাভাবিক তার। যেন কিছুই হয়নি। সে বেশ চতুরতার সঙ্গে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলল,
”ডক্টর মহিদ, আপনার স্টুডেন্ট নিয়ে একটু কাজ করছিলাম। কিন্তু আপনার চোখ মুখ এতো শুকনো দেখাচ্ছে কেন? কোন সমস্যা?”

ডক্টর মহিদের আগে তার সহকারি চোখ দুটো ভীত-সন্ত্রস্তে বড়ো বড়ো করে বলল, “জি স্যার, বিরাট বড়ো সমস্যা। আপনার গ্রুপের একটা মেয়ে সুইসাইড করেছে। মাত্র তার ডেড বডি আমি নিজে নামিয়ে এলাম। আপনি একটু আসুন। ডেড বডিটা দেখে যান।”
কথাটি শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করা মাত্রই উমেরার শরীর একটা ঝটকা মেরে ওঠল। সেই সঙ্গে শেহরাজের চোখ মুখে ছাপিয়ে গেল বিমূর্ত ভাব। সে বলল,
“কোথায় ডেড বডি?”
ড. মহিদ বলল,

“ডক্টর শেহরাজ, আস্তে বলুন। ঘটনাটি এখনো সব শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়ানো হয়নি। তার আগে প্লিজ এমন ভয় পাইয়ে দিবেন না। আমার পিছু পিছু আসুন আপনি।”
উমেরা ডক্টর মহিদের কাছে অনুমতি চাইল।
“স্যার, আমিও আসতে চাই।”
ডক্টর মহিদ এক পলক উমেরার অস্থিরচিত্ত প্রাবল্য চিন্তিত মুখটা দেখে নীরবে মাথা ঝাঁকাল।
“আসো।”

শেহরাজ আগেই ডেড বডির দিকে হেটে রওয়ানা হল। তার পিছু পিছু উমেরাও গেল। ঘটনাস্থানে গিয়ে দেখল, একটা ১৯-২১ বছর বয়সি মেয়ের গলায় ওড়না দিয়ে রশ্মির মতো পেঁচানো। যেটা দিয়ে মেয়েটা মূলত আত্মহত্যা করেছে। ওড়নাটি এখনো খোলা হয়নি। সেখানে আরও দু’জন টিচার আর কিছু স্টুডেন্ট উপস্থিত ছিল। সকলের চোখে মুখে ছিল আতঙ্ক আর ভয় ছাপিয়ে। শেহরাজ গিয়েই বলল, “প্লিজ সবাই পিছু হটেন। জায়গা করে দিন।”
শেহরাজের হুকুম পাওয়া মাত্রই সবাই ডেড বডির থেকে দ্রুত দূরত্ব রেখে দাঁড়াল।
শেহরাজ হাতে গ্লাভস পরে ডেড বডিটার পাশে গিয়ে বসল। তার পাশে ডক্টর মহিদ সহ আর একজন ডক্টর ছিল। ডেড বডির গলার ওড়নাটি শেহরাজ নিজে সরিয়ে নিল। ডক্টর মহিদ বেশ হতাশ মুখে বলে, “এখানে এসেই মেয়েটাকে সুইসাইড করতে হলো? এবার এর পরিবারের কাছে আমি কি জবাব দিব? কমিশনারের মেয়ে। বুঝতে পারছেন ব্যাপারটি কতদূর অবধি গড়িয়েছে?”

ডক্টর মহিদের কথার পরিপার্শ্ব ডক্টর সৈয়দ মিনহাজ বলেন, “লাভ কেস মনে হয়, ড. মুহিদ।”
শেহরাজ এদের কথা কানে তুলে ঠিকই। তবে কথার মাঝে কোনো রকম টু শব্দটাও করল না। সে বেশ সুনিপুণমনযোগে ডেড বডিটা দেখতে ব্যস্ত।
“মেয়েটা যদি ফাঁস লাগিয়ে সুইসাইডই করে থাকে, তাহলে মেয়েটার গলায় কোনো দাগ নেই কেন? এমনকি তার জিভটাও গলার ভিতরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষা অনুযায়ী কেউ যদি ফাঁস লাগিয়ে সুইসাইড করে, তাহলে তার গলদেশ থেকে জিভ বেরিয়ে আসবে। চোখ উল্টে যাবে। গলায় রশ্মি পেঁচানোর মোটা দাগ থাকবে। অথচ মেয়েটার শরীরে অথবা গলায় এমন কোনো দাগ নেই কিংবা চিহ্ন নেই। তাহলে ঘটনা এখানে কি দাঁড়ায় ডক্টর মুহিদ? এটা আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত মার্ডার।”

‘মার্ডার..!’ শব্দটি সকলের মধ্যে আরেক ধাপ ভয়ের মাত্রা আর নৃশংস আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল। শিক্ষার্থীর মধ্যে এক প্রকার টান টান উদ্বেগ, উত্তেজনা দেখা গেল। সকলের চোখ মুখ উদ্বিগ্ন। কি দেখছে, কি শুনছে তারা? এমন বিপর্যয়ের কারণ বা কি? শেহরাজ মেয়েটার গলাটা উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে আবার বলতে শুরু করে, “খুবই চতুরতার সঙ্গে খুনি একে মার্ডার করেছে। তাও এমন একজন ব্যক্তি, যে খুন করতে বেশ পারদর্শী। প্রথমে মেয়েটাকে খুন করা হয়েছে। এরপরে তাকে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে ব্যাপারটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু খুনি মনে হয় জানে না, চতুর সে একা নয়। আমরাও কোন অংশে কম কিছু না। কেসটা জটিল বুঝেছেন, ডক্তর মহিদ? কাজটা যে করেছে, খুব নিঁখুতার সঙ্গে করেছে। যাতে ধরা পড়ার কোনো চান্স না থাকে। হতে পারে খুনি আমাদের মধ্যেই কেউ মুখোশ পরে ভালো মানুষি সেজে বসে আছে। আবার এমনও হতে পারে এই মুহূর্তে সে আমাদের মাঝেই উপস্থিত আছে।”

কথাগুলি বলেই শেহরাজ সামান্য থামে। ফোঁস করে বুক চিঁড়ে দুটো সুগভীর নিঃশ্বাস পর পর মুখ গোল করে ছাড়ল। কিন্তু ততক্ষণে উপস্থিত সব স্টুডেন্ট আর শিক্ষকদের মধ্যে এক প্রকার চাপা উত্তেজনা আর ভয়ের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল। একে অপরকে সন্দহের প্রগাঢ় অক্ষিযুগলে দেখতে লাগল। যেন প্রত্যেক প্রত্যেকেই অপরাধী।
“নিশ্চয়ই মেয়েটার সঙ্গে খুনির কোনো বড়ো রকমের ঝামেলা হয়েছিল অথবা খুনির এমন কোনো রহস্য কিংবা গোপন কথা মেয়েটা জেনে গিয়েছিল। যার কারণে খুনি রাগ ক্ষোভ নিয়ে মেয়েটাকে হত্যা করে বডিটা গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা বলে বাঁচতে চেয়েছিল, বুঝলেন ডক্টর শেহরাজ? যার জন্য এই মেয়েটাকে খুনি টার্গেট করেছিল। অবশেষে খুনি সফল হল।”

কথাটি বলল ডক্টর সৈয়দ মিনহাজ। ডক্টর মহিদ ধীর গলায় বলে, “মেয়েটার খুনের রহস্য ফরেনসিক রিপোর্টে না হয় জেনে নিব ঠিকই। কিন্তু খুনি কেন তাকে খুন করল সেই রহস্যটি কীভাবে জানব?”
ডক্টর মহিদ আর ডক্টর সৈয়দ মিনহাজের চলন্ত কথার মধ্যে শেহরাজের চোখ দুটি গিয়ে পড়ল ডেডবডিটার হাতের মধ্যে। মেয়েটার হাতের মধ্যে কিছু একটা আছে। সে হাতের মুঠটা একটু খুলল। সেখানে দেখতে পেল মেয়েদের একটা ব্রেসলেট। ব্রেসলেটটি তার কাছে পূর্ব পরিচিত বলে মনে হল। সে এর আগেও ব্রেসলেটটি দেখেছে। কিন্তু কার হাতে দেখেছে? ঠিক মনে করতে পারছে না। মাথাটা খুব ভাল করে খাটাল একটু। এক মিনিট, এটা তো মিস উমেরা ওয়াজেদের ব্রেসলেট। তার হাতে অসংখ্যবার সে এই ব্রেসলেটটি দেখেছিল। তার মানে উমেরা ওয়াজেদ এই খুনের সঙ্গে জড়িত? সে তড়াক করে উমেরার শান্ত ভীতিকর মুখটার দিকে সন্দিহান দৃষ্টিকোণে চাইল। দেখল, উমেরার খালি হাতটিও। উমেরার হাতে তার ব্রেসলেটটি নেই। একে একে ঘটনা দুই মিলে গেল। সকলের আড়ালে শেহরাজ ব্রেসলেটটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে বলে,

“ডেড বডিটা ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য ল্যাবে পাঠিয়ে দিন। বাকি সব কাজ শহরে গিয়ে এই ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত করব। আপাতত পুলিশ জানাজানির দরকার নেই। তাহলে পাহাড়িদের মধ্যে ভয় ঢুকে যাবে। তারা ভাববে, তাদের সুস্থ চিকিৎসা দেওয়ার বদলে আমরা ভুল চিকিৎসা দিয়ে মানুষ খুন করতে এসেছি। আপাতত এটা না জানানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর আজকের এই ঘটনা যেন বাহিরে লিক না হয় সেদিকে সকলে খেয়াল রাখবেন।”
কথাগুলো শেষ করে সে উমেরাকে আদেশ দিল,
“মিস উমেরা ওয়াজেদ, আপনি আমার সঙ্গে আসুন।”
উমেরা বিড়বিড় করল।
“আমায় ডাকছে কেন?”
খানিকটা লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে শেহরাজ তার হাতে লুকিয়ে রাখা ব্রেসলেটটি দেখিয়ে উমেরার কাছে জানতে চাইল,

“এটা কি আপনার, মিস উমেরা ওয়াজেদ?”
উমেরা ব্রেসলেটটি ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“হ্যাঁ, আমারই তো ওটা। কিন্তু আপনার হাতে গেল কি করে?”
“ডেড বডির হাতের মুঠোয় এটা পেয়েছি। এর মানে কি দাঁড়ায় জানেন? এই খুনের সঙ্গে আপনি খুব ভাল করে জড়িত।”
শেহরাজের কথা কানে প্রবেশ করা মাত্রই উমেরার মাথায় ছোটোখাটো একটা বজ্রপাত হলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে। অতি আশ্চর্যে নির্বিকার। মূর্তও। মস্তিষ্ক মনে হলো নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। সৎবিৎশক্তি ফিরে এলেই খানিকটা চেঁচিয়ে ওঠল সে।
“এসব মিথ্যে কথা? ফাঁসাচ্ছেন আপনি আমায়?”

দহনসুধা পর্ব ৯

শেহরাজ চোখ দুটো তাৎক্ষণিক ছোটো ছোটো করে ফেলল। সূক্ষ্ম দৃষ্টিজোড়া নাচিয়ে ভারিক্কি মুখটাতে স্মিত হাসতে চেষ্টা করল। উমেরার দুঃশ্চিন্তিত উত্তেজিত মুখজটি এক ঝলক দেখে বলল,
“আপনাকে ফাঁসিয়ে আমার লাভ কি, মিস উমেরা ওয়াজেদ? সত্যি তো এটাই, খুনটা আপনি নিজে করেছেন। অ্যাম আই রাইট? আপনার কাছ থেকে তো ব্রেসলেটটা নেইনি, বডির হাতের মুঠোয় ছিল। নিশ্চয়ই আপনি তার হাতের মুঠোয় এটা পুরে দেননি।”

দহনসুধা পর্ব ১১