The Silent Manor part 69
Dayna Imrose lucky
গৌরী ছাদের এক কোণে বিষন্ন মনে দাঁড়িয়ে আছে।আহির পৌঁছাল তাঁর কাছে। গৌরীর পেছনে দাঁড়াল। পূর্বের মত আজও গলা পরিষ্কার করে নিজের উপস্থিতি জানান দিল। গৌরী পেছন ঘুরল আজ। পরক্ষনেই চোখ সরাল।
আহির বলল “নিচে সবাই আনন্দ করছে। তুমি এখানে!সবার সাথে থাকলে তোমার ভালো লাগত।”
“সব মন খারাপ – আনন্দে মেতে উঠলেই সেরে যায় না। আমার মনের ব্যথাও আর কোনদিন ভালো হবে না।চাইও না।”
“না চাওয়াটা বোকামি। ফিরে এসো অন্ধকার জগত থেকে। হাতটি ধরো আমার। তোমার দুঃখ কষ্ট গুলোকে ধুয়েমুছে সাফ করতে চাই।”
“পারবেন না।”
“একটিবার সুযোগ দিয়েই দেখো।”
গৌরী উত্তর দিল না। হেঁটে ছাদের অপরপ্রান্তে গেল।আহির ও পিছু পিছু গেল।আহির কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল “বলেছিলাম তুমি আমার প্রস্তাবে রাজি হলে, তুমি জানাবে। কিন্তু দেখো, ঘুরেফিরে সে-ই আমিই এসেছি তোমার প্রেমদুয়ারে।আর ফিরিয়ে দিও না। কষ্ট হয়।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
গৌরী গভীর নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।কিচ্ছুটি বলছে না।আহির বলল “আচ্ছা!ধরে নিলাম, তুমি আমাকে পছন্দ করো না। ভালোবাসা দূরের কথা। তাহলে আর এ গ্রামে থেকে লাভ কি!চলে যাব আগামীকাল।মীর চলে যাবে বিদেশে।আর হয়ত কোনদিন কারো সাথে দেখা হবে না। তোমার সাথেও না।অন্য কাউকে ভালোওবাসব না।বাকি জীবনটা এভাবেই একাকী কাটিয়ে দেব।তবু চাইবো তুমি ভালো থাকো।” থামে আহির।গৌরীর দিকে সেকেন্ড কয়েক তাকিয়ে থাকল।তাঁর প্রতিক্রিয়ার কোন উন্নতি নেই।আহির ধরে নিয়েছে তাঁকে গৌরী ভালোবাসে না।সে ব্যথিত কণ্ঠে শেষ শব্দ উচ্চারণ করল “আসি।” বলে সে যেতেই গৌরী বলে উঠল “আপনার মা বাবা কে নিয়ে আসবেন। আমি অপেক্ষায় থাকব।”
অন্যদিকে সম্রাট নিষাদ- এর বংশধর – ওরফে ছদ্মবেশী কাবির হোসেন।যার আসল নাম এহসান সম্রাট।তিনি এতদিন বসে এক জঘ’ন্যতম পরিকল্পনা সাজিয়েছেন চৌধুরী বংশের একমাত্র সন্তান কে খু’’ন করার জন্য। এতদিন বসে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন।কবে তিনি তাঁর, পরিকল্পনা সম্পন্ন করবেন!আজি যেন সে-ই দিনটি এসে হাজির হয়েছে। বিয়ে বাড়ি। সবাই ব্যস্ত।এই ফাঁকে তাঁর কাজ হাসিল করতে হবে।
আজ থেকে ঠিক কিছুদিন আগে পরিকল্পনা মোতাবেক তিনি দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি আহির কে পড়তে দেন। এরপর কৌশলে তাঁদের মন জয় করে, নিজেকে দুঃখি প্রমাণ করে চৌধুরী বাড়িতে আশ্রয় নিলেন এক ক্ষণিক অতিথি হিসেবে। চৌধুরী সাহেবও মন গলালেন, একজন পথহারা পথিক কে কিছুদিন অতিথি হিসেবে রাখতে পারলে তাঁরও ভালো লাগবে বলে।আজ যেন সে-ই মধুর অন্তর টুকুর খেসারত দিতে হবে।
সন্ধ্যায় চৌধুরী বাড়ির অন্যতম কাজের মেয়ে শেফালীর সাথে করুণ পরামর্শ করেছেন। স্বর্ণমুদ্রা, টাকা,জমি,এসব এর লোভ দেখিয়েছেন ওকে। শেফালী প্রথমে আমতা আমতা করছিল।বেশ আপত্তি দেখিয়েছে।কেন ওকে এত লোভ দেখাচ্ছে,তা ও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। শুধু বলেছে,একটা মহৎ কাজ করে দিতে হবে। প্রশ্ন করল শেফালী ‘কি কাজ?”
ছদ্মবেশী কাবির বললেন “একজনকে মে’রে ফেলতে হবে।”
চমকে উঠেছিল শেফালী।সে এমন কাজ করবে না পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল। কাবির আবার লোভ দেখাতে শুরু করে। অতঃপর, শেফালী রাজি হয়। এবং বলে,রাত দশটার পর এসে আপনার সাথে দেখা করব।
রাত দশটা বেজেছে মিনিট পাঁচেক হয়। কাবির অপেক্ষা করছেন বাড়ির পেছনের দিকে অন্ধকার আচ্ছন্ন নিবিড় স্থানটিতে। অশ্বে বসা সে।আজ সকালে একদম তৈরি হয়ে বের হয়েছে সে আর ফিরবে না বলে এই বাড়ি। ক্ষুধার্ত হিং’স্র পশুর মত চোখ দুটো ফুটিয়ে তুলছেন। চারদিকে বারবার দেখছে। শেফালীর অপেক্ষায় পথ চেয়ে সে। যদি শেফালী আজ না আসে তবে তাঁকেই পদক্ষেপ নিতে হবে,চৌধুরীর সন্তান কে খু’ন করার জন্য।কিন্তু তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস শেফালী আসবে। শেফালীর অভিব্যক্তি তখন পরিস্কার করে বুঝিয়েছে,সে লোভে পড়েছে।সে আসবে। কাবির পর এর ধারণা কখনো ভুল হয় না ,আজও হবে না।উনি নিশ্চিন্তে অপেক্ষা করছেন।
অপেক্ষার ফলাফল পূর্ণ। অবশেষে শেফালী আসছে।লাল রঙের চাদরটা দিয়ে একচোখ, নাকমুখ সব ঢেকে রেখেছে।হাতের বালা দুটো দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎগতিতে ও ছুটে আসছে। অপ’রাধী অপ’রাধের পথে পা বাড়ালে তাঁর শিহরণ কাটে ভয়ে।আ’তঙ্কে।
কাবির ওকে দেখে হাসেন। শেফালী বলল “যা কইবেন তাড়াতাড়ি।”
“তোমাকে একজনকে মে’রে ফেলতে হবে।সহজ পদ্ধতিতে। বিনিময়ে তুমি যা পাবে,তা নিয়ে এসেছি।” বলে ছদ্মবেশী কাবির একটা ভারী পোঁটলা শেফালীর দিকে এগিয়ে দেয়। শেফালী সেটি হাতে নিল। চাঁদনীর আলোয় স্বর্ণের মুদ্রা গুলো চিকচিক করছে বেশ। শেফালীর চোখ জোড়া খুশিতে মার্বেল এর মত বড় হয়ে গেল। পোঁটলার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল।স্বর্ণ ব্যতীত টাকাও আছে।যা দিয়ে ওর বাকি জীবনটা পাড় হয়ে যাবে।
“তুমি খুশি হয়েছ নিশ্চয়ই।এই কাবির কখনো মানুষ কে মিথ্যা আসা দেয় না।”
“আপনি ক্যান একজনরে মে’রে ফেলতে চাইতেছেন!আর আপনি কেডা?সত্য পরিচয়?”
“সম্রাট নিষাদ এর নাম শুনেছো নিশ্চয়ই!আমি তাঁর বংশধর।”
“আপনার উদ্দেশ্যডা কি?”
“মীর কে মে’রে ফেলতে হবে।”
শুনে শেফালী হঠাৎ থ’ হয়ে গেল।হাতের পোটলার স্থানটি বুকের কাছ থেকে নিচে নেমে এল। স্বভাবতই ভ্রু কুঁচকে ফেলল ও।বলল “কিন্তু,উনারে মাই’রা কি হইবো?”
“যা হবার তাই হবে। তোমাকে যা বলছি তাই করো।এই কাজ সম্পন্ন হলে তুমি আমার থেকে আরো কয়েকগুণ পুরষ্কার লাভ করবে।”
“আজকের দিনেই ক্যান তারে মা’রতে হইবো!”
“আজ সবাই ব্যস্ত।তোমার সুবিধা হবে আজ ওকে মা’রতে।”
“কিন্তু কেমনে!”
“বি-ষ।বি-ষ খাইয়ে মা’রবি।আমি প্রাকৃতিক তৈরি বি-ষ নিয়ে এসেছি।এক ফোঁটা ওঁর পেটে গেলে আর বাঁচার উপায় থাকবে না।আর এই কাজ তুমি না করলে, তোমার জীবন দিতে হবে। আমার হাত থেকে বাঁচার উপায় থাকবে না।”
শেফালী ভাবছে। বিশাল গভীরতর সমুদ্র যেন ওর সামনে।এক দিকে মীর এর প্রাণ, অন্যদিকে রাজকীয় জীবন।সে একবার মীরকে মে’রে ফেললে সারাজীবন রানী হয়ে থাকবে।তবে শর্ত প্রযোজ্য যেন এই কাজ। তাঁকে তাৎক্ষণিক বাড়ি ছাড়তে হবে।নয়ত চৌধুরী বাড়ির সকলকের হাতে মা’র খেয়েই ম’রতে হবে।
“কি ভাবছো?
শেফালী থমথমে মুখে জবাব দিল “আমি রাজি।”
কাবির বি-ষ এর ছোট্ট বোতলটা এগিয়ে দিল শেফালীর দিকে। শেফালী নিল।চাদরের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল।বাড়ি ফিরতে হবে। সতর্কতার সাথে চারদিকে চোখ বুলায়।কেউ নেই। দ্রুত পায়ে চলে গেল শেফালী।
কাবির খুশি হলেন বেশ। তাঁর অশ্ব একবার হ্রেষাধ্বনি তুলল। শেষবারের মত একবার চৌধুরী বাড়ির দিকে তাকায়। এরপর চলে যান তাঁর গন্তব্যে।
বিয়ে বাড়ি থেকে গ্রামের অতিথিবৃন্দ ধীরে ধীরে নিজ চলে যাচ্ছেন ভোজন শেষে। চৌধুরী বাড়ির অতিথিরা বৈঠকখানায় বসে আড্ডা দিচ্ছে। মায়াকে বাসর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।মীর এখনো যায়নি। শেরওয়ানি পড়েই উঠোনে আহির, রাফিদ তাঁদের সাথে কথা বলছে।নীরব বিয়ে বাড়ি জুড়ে হঠাৎ এক অজানা অস্থিরতা শুরু হল।যা টের পাচ্ছে পশুপাখি। অশ্বশালা থেকে অশ্বের হ্রেষাধ্বনি ভেসে আসছে।ওরা তির্যক কণ্ঠে চেঁচাচ্ছে।মীর অগ্নীল এর চিৎকার পেয়ে ওর দিকে গেল।অগ্নীল এর গায়ে ছুঁয়ে দেখল।অগ্নীল শান্ত হয়ে গেল।ওর চোখে জল যা স্পষ্ট দেখা গেল।মীর বলল “কাঁদছিস কেন? বিয়ে করেছি বলে! বিয়ে করেছি মানে তোকে ভুলে যায়নি, তোকে ছেড়ে যাব না, চিন্তা করিস না। আজকের রাতটা শুধু আমার। আগামীকাল তোকে নিয়ে সময় কাটাব।”
অগ্নীল ব্যাকুল কণ্ঠে এবার যেন হ্রেষাধ্বনি তুলল।
রাত বাড়ছে। শালুক অতিথিদের মাঝে আসছেন না।দূর থেকে দেখছেন। দোতলার রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন। রাফিদ এর উপর নজর রাখছেন। রাফিদ এখন পর্যন্ত বৈঠকখানায় বসে আছে।সবার সাথে আড্ডা দিচ্ছে।আহির ও আজ বেশ খুশি। তাঁর ভালোবাসাও পূর্ন হতে চলল।তখন ছাদ থেকে ঘরে এসেই তাঁর মায়ের কাছে কল করেছে ল্যান্ডলাইনে। তাঁর মা জানিয়েছে আগামীকাল তাঁরা আসবেন আলিমনগর।
শালুক কে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জয়ন্তন এগিয়ে আসেন তাঁর নিকট। একগাল পান ভর্তি মুখে।সাথে একজন দাসী।তিনি যখনি পান মুখে ভরেন তখনই একজন দাসী তাঁর সাথে পিকদানী হাতে ঘুরেন। জয়ন্তন পিকদানীতে পিক ফেলে বললেন “আবার এইহানটায় দাঁড়িয়ে আছো!”
শালুক এক ধ্যানে রাফিদ,মীর তাঁদের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিলেন। জয়ন্তন এর কণ্ঠে শরীর হালকা ঝাঁকি দিয়ে উঠল।পেছন ঘুরে তাঁকে দেখে বললেন “আম্মা! ওঁদের বাসরঘর সাজিয়ে দিয়েছি।নিচেই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মাথায় চক্কর দিল।তাই এখানে দাড়িয়েছি।” শালুক দিব্যি মিথ্যা বলার অভিনয় করে যাচ্ছেন। তাঁর অভিনয় পরিপূর্ণ পরিপক্ক নয়। জয়ন্তন ধরতে পারলেন। “তোমারে আইজ অন্য রহম লাগতেছে। যদি শরীর খা’রাপ লাগে তাইলে বিশ্রাম নাও। তাঁর আগে যতটুকু নিয়ম-কানুন আছে তার কাম শেষ করো।” শালুক জয়ন্তন এর কথায় মাথা নেড়ে বললেন “আর কাজ নেই। শেফালী কে বলেছি দুধ জ্বাল দিতে।হয়ে গেলে বাসর ঘরে দিয়ে আসবে।”
শেফালী দুধ জ্বাল দিচ্ছে। কিন্তু মন ওর অন্যদিকে। কিভাবে বি-ষ মেশাবে ভাবছে। কোনমতে কেউ দেখে ফেললে ওর মৃ’ত্যু নির্ঘাত নিশ্চিত।ভয়ে বুক ধুকপুক করছে।হাতে চামচ দিয়ে দুধ নাড়ছে। আশ্চর্য!ওর হাতটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।বা হাত দিয়ে ও ওঁর ডান হাতটি চেপে ধরল। ঢোঁক গিলে একবার।মীর কে ম’রে ফেলতে তাঁর মনটা সায় দিচ্ছে না।মা নেই। ছোট্ট বেলা থেকেই এতিম।আজ তাঁর শূন্য জীবনে একমুঠো আনন্দ এসেছে। নতুন জীবনে পা দিয়েছে।আর তাঁর জীবনটা শুরুর আগেই কি-না শেষ করে দিবে।! শেফালী থমকে যায় বারবার। ইতিমধ্যে সে কাবির হোসেন এর থেকে স্বর্ণমুদ্রা যেন কুড়িয়ে নিয়েছে।সে বলেছে এ কাজ সম্পন্ন না করতে পারলে, কৌশলে ওঁর জীবন শেষ করে দিবে।
না!করতেই হবে।সহজ কাজ। একজনকে বি-ষ প্রয়োগে ম’রে ফেলবে। ব্যস। বিনিময়ে ওঁর বিলাস-জীবন।
‘শেফালী’ শালুক ডাকলেন শেফালী কে।শেফালী হঠাৎ শালুক এর কন্ঠে লাফিয়ে উঠল। ঘুরে দেখল তাকে।শালুক বললেন “একি!তুই এমন ভাবে ভয় পেলি যেন আমি তোকে ধমক দিয়েছি।তোর মন কোথায়?দুধ উতলে পড়ছে যে” বলে শালুক নিজেই দুধ জ্বাল দিলেন।নাড়া শুরু করলেন।
“মালকিন!মায়ের কথা ভাবতে আছিলাম।আপনে যান, আমি দুধ জ্বাল দিয়া মীর দাদার ঘরে দিয়াইতেছি।”
“মায়াকে কি বলবি জানিস!”
“জ্বে,বলেন!
“মীর যখন ঘরে যাবে, ওঁর পায়ে সালাম করে যেন। এরপর দুধটা ওকে দিবে।বুঝেছিস!”
“বুঝছি।” শালুক শেফালী কে বুঝিয়ে শুনিয়ে ফিরে আসেন রান্নাঘর থেকে। বৈঠকখানায় সবার সাথে আড্ডায় মেতে উঠার নাটক করছেন।নজর তাঁর রাফিদের দিকে।কখন রাফিদ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়!বলা যাচ্ছে না! তিনি নজর রাখছেন।
জয়ন্তন বললেন “রাইত এগারোটা ছুঁই ছুঁই। অহন মীর-রে ঘরে পাঠানো উচিত।”
আহির বলল “আমরা ওকে দিয়ে আসছি।”মীর বলল “আমি একাই যেতে পারব। তোদের কাউকে যেতে হবে না।”
আহির ফিসফিসিয়ে বলল “আমরা কি তোর সাথে ঘরের ভেতরে যাব!” বলে হেসে উঠল সে।মীর ও হাসল।
বৈঠকখানার ব্যস্ততার মাঝে নিখুঁত সুযোগ সৃষ্টি হল শেফালীর জন্য।ও একবার উঁকি দিল বৈঠকখানায়।সবাই আড্ডায় মশগুল।ও দুধটা গ্লাসে ঢেলে কিছুটা ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।মিনিট কয়েক অপেক্ষার পর দেখল দুধটা কুসুম গরম অবস্থানে এসে হাজির হয়েছে।
কাবির এর দেয়া বি-ষটা ও দুধে মিশিয়ে দিল। কাবির বলেছে একফোঁটা দিলেই যথেষ্ট। সেখানে ও সবটুকু দিয়ে দিয়েছে। ভালো করে মিশিয়ে নিল।
মায়া অপেক্ষা করছে মীর এর। ফুলের বিছানায় দু হাঁটু পরস্পর লাগিয়ে হাতের সাহায্যে বেঁধে বসে আছে।মীর কে নিয়ে ঘেরা স্বপ্নগুলো একাকী কল্পনা করছে। তাৎক্ষণিক দরজা খোলার আওয়াজ আসল।সে ভাবছে মীর।ঘরে প্রবেশ করল শেফালী।ও দুধটা নিয়ে খাটের পাশে টেবিলে রাখল। দ্রুত। এরপর কাঁপা গলায় বলল “আপা! আপনাকে মালকিন কইছেন,মীর দাদা যখনি ঘরে আইবো,তখন উনার পায়ে সালাম করে দুধ দিতে।আর আইজকা আপনি ভুলেও আবার দুধ খাইয়েন না যেন।তাইলে অমঙ্গল হইবো। মালকিন কইছেন।” বলে শেফালী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যেতেই মীর সামনে পড়ল। শেফালী চমকে দাঁড়াল।
“তুই এমন ভাবে হাঁটছিস যেন পালিয়ে যাচ্ছিস।” বলল মীর। শেফালী কোন জবাব না দিয়ে চলে গেল।ও পালাবে এখন।দুধ ও জ্বাল দিয়েছে।মীর এর ঘর পর্যন্ত ও পৌঁছে দিয়েছে।মীর এর কিছু হলে ও ধরা পড়ে যাবে।ঘরে পৌঁছে শেফালী ব্যাগপত্র ছাড়াই শুধু কাবির এর দেয়া স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে কৌশলে পালিয়ে যায়।
মীর দরজা লাগিয়ে বাসরঘরে পদার্পণ করল।মায়ার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়।সে নিজেই সেই ধুকপুক শব্দ পাচ্ছে।হাত পায়ের স্থিরতা ছেড়ে দিচ্ছে যেন।মীর গিয়ে মায়ার সামনে শুয়ে পড়ল হাতের উপর ভর দিয়ে কাত হয়ে। শুয়ে শুয়েই মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে।পরীর মত অপরূপা সুন্দরী নারী মায়া।মীর বলিষ্ঠ বা হাতটি দিয়ে মায়ার ঘোমটাটা সরিয়ে দিল।বলল “সুবহানাল্লাহ। আসমানের একখানা চাঁদ আমার ঘরে এসেছে।আলো নিভিয়ে দিলেও বোধহয় ঘরটি আলোকিত হয়ে যাবে।” মায়া চোখ নত করেই মসৃণ হাসল।
মীর বলল “তোমার সৌন্দর্য এর কাছে যেন আমাকে মানাচ্ছে না। তবু আমাকে বিয়ে করলে কেন?”
“ভালোবাসি বলে।”
“কতটা ভালোবাসো”
“যতটা ভালোবাসলে পা’গল হতে হয়।”
“কই তুমি তো পা’গল হওনি। দিব্যি আমার বউ সেজে বসে আছো”
“আপনাকে হারিয়ে ফেললে ঠিকই পা’গল হয়ে যেতাম।”
“আমাকে হারিয়ে ফেলা এত সহজ নয়।”
“আর একটু হলেই বিয়ের সময় আমার প্রাণ বেরিয়ে যেত। যদি আপনার জায়গায় অন্য কোন আদ্রিয়ান থাকত।”
“একটাবার মুখ ফুটে বললে না তবুও।যে আমাকে ভালোবাসো।”
“আপনি সারাদিন মোহিনী মোহিনী করতেন। আমার বিশ্বাস উঠে গেছিল। ভেবেছি আপনি সত্যিই ওকে ভালোবাসেন।”
“তুমি ব্যতীত অন্য নারীর দিকে সেভাবে কখনো চাইনি। যেভাবে চাইলে একটা মানুষ প্রেমে পড়ে।”
“মানুষ চাইলেই বুঝি প্রেমে পড়ে!”.
“অবশ্যই পড়ে। গভীর চোখে একটা নারীকে যখন একজন পুরুষ পর্যবেক্ষণ করে তখন অনেক জল্পনা কল্পনা জাগ্রত হয় ওই পুরুষের মনে। আলাদা অনূভুতি সৃষ্টি হয়।আমি পুরুষ মানুষ।আমি জানি,আমরা কিভাবে একজন নারীকে দেখি।”
“আপনি না তাকিয়ে কিভাবে বুঝলেন, অনুভূতি সৃষ্টি হয়?
“এই যে, তোমার দিকে যেভাবে তাকাতাম। আমার চোখে তুমিই একমাত্র শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী। মিসেস মীর জাফান শন।”
মায়া মীর এর মুখে তাঁর নামের আগে মিসেস এরপর মীর! শব্দটি যেন চির অপরিচিত থেকে আজ খুব আপন হল। শুনে চোখ তুলে তাকায় মীর এর দিকে।মীর শোয়া থেকে উঠে বসে মায়ার সম্মুখে।মায়া একটু নড়েচড়ে পেছনে সরল।মীর মায়ার দু হাত ধরে বলল “আরে মেয়ে, তুমি আমার বউ।এখনো ভয় পাচ্ছ!”
মায়া এবার পরিতৃপ্তির হাসি মাখা মুখে তাকাল মীর এর দিকে। প্রথমবার তাঁর কণ্ঠে বউ ডাকটি শুনল।
“এমন ভাবে কি দেখছো?
“বউ ডাকলেন।”
“সারাজীবন ডাকতে চাই।দেবে-কি সেই সুযোগ।!
“সুযোগ তো করেই নিলেন। হাতটি আস্তে ধরুন। ব্যথা পাচ্ছি।বউকে আদর করে ধরতে হয়। এমন ভাবে ধরেছেন যেন ছেড়ে দিলেই পালিয়ে যাব!”
“তোমাকে কাগজে কলমে আমার জন্য বরাদ্দ করেছি। সারাজীবন এর জন্য।এই যে হাত ধরেছি, মৃ’ত্যু ব্যতীত ছাড়ছি না।”
“আমার জন্য কি উপহার রেখেছেন!”
“আন্দাজ করো।”
“মাথায় আসছে না।”
“তুমি চোখ বুঝে ফেলো। আমি নিয়ে আসছি।” মায়া মীর এর কথামতো চোখ বুঝে ফেলল।মীর বিছানা ছেড়ে আলমারির কাছে গেল। আবার চলে আসল।মায়ার সামনে বসে বলল “এবার চোখ খুলে ফেলো।”
মায়া অধির আগ্রহে তাকাল। তাঁর সামনে একটি বাঁশি। বাঁশিটা দেখে সে কিঞ্চিত বিষ্ময়কর হল।বলল “এই বাঁশি কোথায় পেলেন?
“ছোট মা আমাকে দিয়েছিল।যখন আমার বয়স ছিল মাত্র পনেরো। কিন্তু আমি কখনো বাজাইনি বাঁশি। সে-ই সময়টাতে নয়। কিন্তু তুমি যেদিন জঙ্গলে বাঁশির সুর শুনে ছুটে গিয়েছিলে,সেটা আমারই তোলা সুর ছিল। তোমাকে দূর থেকে দেখে বাঁশিটি এক জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিলাম।”
“তবে আমার সাথে মিথ্যা কেন বললেন?’
“হঠাৎ তোমাকে অবাক করার জন্য।”
“কিছুদিন আগে যে সুর শুনে আমি আর তৃষ্ণা বের হয়েছিলাম সে কি আপনি ছিলেন?”
“না।আমি শুধু একদিনই বাঁশি বাজিয়ে ছিলাম। সেদিন কে ছিল জানি না।”
“সুফিয়ান হায়দার, তাঁর বাঁশি চু’রি হয়ে গেছে।আমি জানতে পেরেছিলাম আহির ভাইয়ের থেকে। উনার বাঁশি কে চু’রি করেছে!”
“জানি না। তবে আমরা তাঁকে খুঁজে বের করব। তবে বাঁশির সুর এক এক জনের এক এক রকম হয়। সুফিয়ান এর সুর যে শুনতে সে-ই উন্মাদ হয়ে যেত।”
“জানেন, সেদিন রাতে আমি যে সুর শুনেছি,এতটাই স্নিগ্ধ ছিল,যা ধারণার বাইরে!”
পরিবেশ খানিকটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।মায়া এক পোশাকে বসে আছে। অসহ্য লাগছে।মীর দেনমোহর এর কুড়িলাখ টাকা মায়াকে দিল। দিতে দিতে বলল “ভাঙ্গা জীবনের জোড়া হিসেবে সেদিন এক টুকরো পূর্ণতা নিয়ে আমার আগমন করার জন্য শুকরিয়া বউ। চিরকাল এভাবেই থেকো আমার হয়ে।”
মায়া হাসল ঠোঁট বাঁকিয়ে। দুনিয়ার সবটুকু সুখ যেন আজ সৃষ্টিকর্তা ঢেলে দিচ্ছেন তাঁদের উপর। এই মুহূর্তেই যেন ধরা দিল দাম্পত্য জীবনের চিরন্তন আশ্রয়।যেখানে ক্লান্তি আছে, তবু ভরসা আরও বেশি, যেখানে পথ কঠিন, তবু সঙ্গ অটুট। এখান থেকেই শুরু হয় জীবনের শেষ ধাপ নয়, বরং এক নতুন যাত্রা,ভালোবাসা, দায়িত্ব আর একসাথে বেড়ে ওঠার নীরব অঙ্গীকারে মোড়ানো একটি জীবন।
মায়া মীর কে বলল “আপনি খাট থেকে নেমে দাঁড়ান।”
“কেন?
“আগে নামুন। তারপর বলছি”
“নামছি।কি আর করার, বউয়ের হুকুম মানতেই হবে যে”
মীর নেমে দাঁড়াল।মায়া ভারী শাড়িখানা নিয়ে নামল।মীর বলল “তোমাকে লাল শাড়িতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। আমার পছন্দ করে ক্রয় করা শাড়ি।”
“সৌন্দর্যের প্রশংসা করেই যাচ্ছেন।এবার থামুন।” বলে মীর কে সালাম করতে চাইল।মীর ধরে ফেলল মায়াকে।বলল “তোমার স্থান পায়ে নয়, বুকে।”
বলে মায়াকে বুকের মধ্যখানে জড়িয়ে ধরল।মায়ার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা তাঁর বুকে ঠেকলো।মায়া যেন বহু অপেক্ষার পর এই স্থানটি দখল করতে পেরেছে।
মীর এর চোখ গিয়ে পড়ল খাটের পাশের টেবিলে।দুধ এর গ্লাস।বলল “আচ্ছা, আজকের দিনে দুধ কেন খেতে হয়!”
মায়া বুক থেকে সরে বলল “উফ্!দুধ এর কথা ভুলেই গেছি।এটা বড়দের নিয়ম।আমিও জানি না। ছোট শাশুড়ি পাঠিয়েছেন।”
“ছোট শাশুড়ি?” মীর জিজ্ঞেস করল।
“আপনার খালা হন আমার মা। মানে আমার শাশুড়ি। দুঃসম্পর্কের।” বলে দু’জনেই হেসে উঠল।
হাঁসি থামিয়ে মায়া দুধটা এনে মীরকে দিল।বি-ষমাখা দুধটা মায়া নিজের হাতে তাঁর স্বামীকে দিচ্ছে।মীর হাত থেকে দুধটা নিয়ে মায়ার দিকে সেকেন্ড দুয়েক চেয়ে থাকে।মায়া বলল “কি দেখছেন?দুধে বি-ষ মিশিয়ে দিয়েছি কিনা!” রসিকতা করে বলল।
মীর ঢকঢক করে পুরো দুধটা খেয়ে বলল “তোমার হাতে বি-ষ খেতেও রাজি বউ। তোমার হাতে ম’রতে পারলে আর কি চাই।”
মায়া দুধের গ্লাস টা মীর এর হাত থেকে নিয়ে বলল “অমন কথা বলবেন না। আপনার জন্য অনেক পু’ড়েছি।আর পু’ড়তে চাই না। আপনার কিছু হলে হয়ত আমি ম’রেই যাব।” পিঠ ঘুরে গ্লাসটা রাখল টেবিলে।পেছন থেকে মীর এর কোন সাড়াশব্দ পেল না সে। ঘুরে তাকাল।মীর খাটের এক কোণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হতে লাগল। বুকের ভেতর মনে হচ্ছে কেউ আগু’ন ধরিয়ে দিয়েছে।শরীরের ভেতরটা হঠাৎ যেন অচেনা হয়ে উঠল। বুকের ভেতর একরকম অস্বস্তি, মাথার ভেতর ভারী কুয়াশা নেমে এলো। চারপাশের শব্দ দূরে সরে যাচ্ছে যেন। আলো-ছায়া মিলেমিশে ঝাপসা লাগছে হঠাৎ তাঁর। শিরায় শিরায় দুর্বলতা ছড়িয়ে পড়ল,নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।বুক ধুকপুক করে উঠছিল অনিয়মিতভাবে। মনে হচ্ছিল শরীর আর মন দুটোই ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে কিছু একটার বিরুদ্ধে লড়ছে, কিন্তু শক্তি ফুরিয়ে আসছে।মীর কিছু বুঝতে পারছে না।
মায়া তাঁর দিকে এগিয়ে গেল। “আপনার শরীর খা’রাপ লাগছে?”
মীর মর্মাহত কণ্ঠে বলল “কি খাওয়ালে বউ! বুকের ভেতরটা কেমন জ্বলে’পুড়ে যাচ্ছে।” বলা শেষে চোখ পড়ে দুধের গ্লাসটার দিকে।একটা বেড়াল চেটেপুটে গ্লাসের সাথে লেগে দুধটা খাচ্ছিল। অমনি ও গলে পড়ল মেঝেতে।মায়া দেখল।মীর ও সে-ই দৃশ্য দেখে ভার কণ্ঠে খুব কষ্টে বলল “তোমার হাতে বি-ষ খেতে রাজি ছিলাম বলে, সত্যি সত্যি বি-ষ খাইয়ে দিলে বউ।” বলেই মেঝেতে ঢলে পড়ে।মায়া মীর এর কাছে ধাপ করে বসে পড়ে। তাঁর শাড়ির আঁচলে বেঁধে ফুলদানিটা পড়ে তির্যক আওয়াজ সৃষ্টি হয়। সে-ই শব্দ তাঁর ঘরের বাইরে গিয়ে জয়ন্তন এর কানে গেল। তিনি ঘরে যাচ্ছিলেন তাঁর।মায়ার ঘরের পাশেই তাঁর ঘর। শব্দ পেয়ে কিছুটা বিভ্রান্ত নিয়ে বলল “মায়া!সব ঠিক আছে তো।” বলে নিজেই বেকুব সাজলেন। আজকের দিনে মীর ও মায়াকে বিরক্ত না করাই ভালো।নিজের কপাল চাপড়ে ঘরে ঢুকতেই মায়া তাঁর ঘরের দরজা খুলে দিল।মা বলে চিৎকার করে শালুক কে লক্ষ্য করে। ছুটে আবার গেল মীর এর কাছে।মীর এর মাথাটা কোলবদ্ধ করল।মীর এখনো তাকিয়ে আছে। গলাটা তীব্র ভাবে শুকিয়ে গেছে তাঁর। ইচ্ছে করছে ঠাণ্ডা জল খেতে।খুব করে ইচ্ছে করছে।অথচ মুখে শব্দটি উচ্চারিত করতে পারছে না।দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। জয়ন্তন এসে দেখলেন মীর মেঝেতে পড়ে আছে। মুখটি নীল হয়ে গেছে।মুখ থেকে সাদা কিছু বের হচ্ছিল।
সাথে র’ক্তের মত কিছু দেখা গেল।উনি নিশ্চিত হলেন এটা বি’ষক্রিয়া।যেটা কোন সাধারণ বি-ষ নয়।তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে বৈঠকখানায় বসা শালুক, উনাদের ডাকলেন।একে একে সবাই ছুটে আসছে মীর ও মায়ার ঘরে।
মায়া করুণ কন্ঠে ডাকছে মীর কে।মীর নেতিয়ে গেল পুরোপুরি। শালুক আসলেন মীর এর কাছে।দিনদুনিয়া ভুলে চিৎকার দিয়ে উঠলেন।মীর কে বুকে টেনে নিলেন।বাপ বাপ বলে চেঁচাতে থাকলেন।লাভ হচ্ছে না কোন।মীর কোন সাড়া দিচ্ছে না।কি থেকে কি হয়ে গেল কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না কেউ। শালুক বললেন “এই মীর,কি হয়েছে বাপ তোর! মায়া তুই করেছিস ওর সাথে।ওর শরীর নীল কেন,মুখ থেকে এগুলো কি বের হচ্ছে!”
মীর কে সবাই ডাকাডাকি শুরু করে। তাকদির!কারো শব্দ পৌঁছাচ্ছে না তাঁর কানে। তাঁর প্রাণটা এখনো বেরিয়ে যায়নি।চোখ আধখোলা। ঘোলাটে ভাবে দেখছে সবাইকে।সবাই ছোটাছুটি করছে।জলের তেষ্টা পেয়েছে।এই জলতেষ্টা মৃ’ত্যুর শেষ তেষ্টা।মনে হচ্ছে কোনদিন সে একফোঁটা জল খায়নি।আজ খুব খেতে ইচ্ছে করছে।শালুক অশ্রুসিক্ত নয়নে বুকফাটা আ’র্তনাদ করে বললেন “বাবা চোখ খোল।কি হল হঠাৎ তোর!’
মীর একবার হেঁচকি তুলল। ফিসফিসিয়ে বলল জল-জল। প্রথমবার জল বলায় শালুক স্পষ্ট শুনতে পেলেন না। দ্বিতীয়বার কান পাতলে শুনতে পায় জল শব্দটি।আহির ছুটে গেল জল আনতে। রাফিদ একজন হাকিম এর খোঁজে গেল। মাঝপথে গিয়ে আবার ফিরে আসছে বাড়ির পথে।কি ভেবে সে বাড়ির পথে ফিরে যাচ্ছে,নিজেও আন্দাজ করতে পারছে না।
আহির জল নিয়ে আসতে আসতে মীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মাথাটা ঢলে পড়ে পাশেই।মায়া ধরল তাঁকে। শালুক পা’গলের মতন আচরণ করছে। সবকিছু এলোমেলো লাগছে।কি থেকে কি হয়ে গেল তিনি ভাবছেন। তাঁর পাপের শা’স্তি পাচ্ছেন।ঠিক কিছুক্ষণ আগে এক নিরীহ মেয়েকে খু’ন করার আদেশ দিয়েছেন। বোধহয় এতক্ষণে মোহিনী কে শেষ করে দেয়া হয়েছে। বিদায় নিয়েছে দুনিয়া থেকে।ওর মা বাবা যখন জানবে, মোহিনী আর দুনিয়ার বুকে নেই, তখন বোধহয় তাঁরাও তাঁর মতই ছটফট করবেন।
তৃষ্ণা, গৌরী এসে মায়াকে ধরল। তাঁর জবান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রায়ই। শুধু দু হাত দেখাচ্ছে।বলতে চাইছে ‘আমি নিজের হাতে আমার স্বামীকে বি-ষ দিয়েছি।’ তাঁর বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। হৃদযন্ত্রটা ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়ছে।
রাফিদ এসে হাজির হল।সংবাদ পেল মীর আর দুনিয়াতে নেই।সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।মীর – আহির- রাফিদ – তিনটি মানুষ হলেও তাঁরা প্রতিশ্রুতি নেয় সারাজীবন একে অপরের পাশে থাকবে। তিনজন আলাদা আলাদা মানুষ হলেও তাঁদের সত্তা,আত্মা যেন একটাই ছিল।যেদিন রাফিদ কাঠের সেতু থেকে পড়ে যাচ্ছিল, তাঁকে বাঁচিয়েছিল মীর। নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে।আজ সে-ই প্রাণপ্রিয় বন্ধু চোঁখের সামনে ছটফট করতে করতে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করল। অথচ তাকে বাঁচাতে পারেনি। নিজেকে ব্যর্থ মনে হচ্ছে।
মায়া কথা বলার চেষ্টা করছে।কণ্ঠ থেকে শব্দ বের হচ্ছে না।বুকের ভেতরের কষ্টটা যেভাবে ছিটকে বেরিয়ে আসছে,ঠিক সেভাবে মায়া হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠতে সক্ষম হল। কিন্তু সেই চিৎকারে শব্দের চেয়ে ভাঙনটাই বেশি ছিল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট যেন এক মুহূর্তে ফেটে বেরিয়ে এলো।সে মীর এর বুকে দু’হাত চেপে ধরে, যেন সেখানেই কোথাও মীর এর প্রাণটা লুকিয়ে আছে।যেন, ধরে রাখলে আর হারাতে হবে না। তার চোখ থেকে অঝোরে জল ঝরছিল, কিন্তু চোখের জলও তার শূন্যতা ভরাতে পারছিল না।
“মীর” নামটা উচ্চারণ করতেই গলা কেঁপে উঠল।কণ্ঠটা ফ্যাশ ফ্যাশ করছিল।এটিই ছিল তাঁর উচ্চারিত শেষ শব্দ।যে মানুষটা একটু আগেও তার পাশে ছিল, যার উপস্থিতিতে জীবনটা নিরাপদ মনে হয়েছিল,সে মানুষটা এখন নীরব, চিরনীরব। চারপাশে আপন মানুষ আছে, কথা আছে, কিন্তু মায়ার কাছে সবকিছু অসহ্য রকমের দূরের- অপরিচিত মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা হঠাৎ থেমে গেছে, অথচ তার বুকের ভেতর ঝড় থামছে না।
সে মীর এর দিকে তাকাল, প্রশ্নভরা চোখে,কেন? কেন এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে গেল? তার আর্ত’নাদে ছিল না শুধু কান্না, ছিল ভেঙে পড়া স্বপ্ন, অসম্পূর্ণ কথা, আর সেইসব ভবিষ্যৎ, যা আর কোনোদিন বাস্তব হবে না। মায়া বুঝতে পারছে, এই শোক কোনোদিন পুরোপুরি পার হবে না।শুধু বয়ে নিয়ে যাবে, নিঃশব্দে, সারাজীবন।
মীরের কত স্বপ্ন ছিল। মায়াকে ঘিরে।তাদের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে এক জীবনের মতো সাজানোর। সে ভাবত, একসাথে হাঁটবে, হাসবে, একে অপরকে সমর্থন করবে, ভবিষ্যত গড়বে। কিন্তু আজ সেই সব স্বপ্ন, সেই সব পরিকল্পনা, এক মুহূর্তে মৃ’ত্যুর নীরব হাতে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মায়ার চারপাশ এখন শুন্য, প্রতিটি কোণ যেন মীর এর উপস্থিতির অভাবকে চিৎকার করছে। মায়া জানে, সেই স্বপ্নগুলো আর ফিরে আসবে না। পূর্ণ হবে না।শুধু স্মৃতি বয়ে যাবে, হৃদয়ে ভাঙন রেখে, এবং প্রতিটি নিঃশ্বাসে মীরের অভাব স্মরণ করিয়ে দিবে হয়ত। কিন্তু সে আর বেঁচে থাকতে চাইছে না। একফোঁটা বি-ষ খুঁজছে।মীর যতটুকু যন্ত্রনা পেয়েছে সেও পাক। কাতরাতে কাতরাতে মরু’ক।
The Silent Manor part 68
আমজাদ দাঁড়িয়ে শুধু দেখছেন,এক মুহূর্তে কিভাবে রঙিন দৃশ্য বদলে কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেল। তাঁর দুঃস্বপ্ন অবশেষে পূর্ণ হল। কলিজার টুকরা মেয়ে বিয়ের রাতেই বিধবা হয়ে গেছে।মায়ার সুখের সংসার আর হল না।সে কিভাবে তাঁর সামনে কাঁদছে। পা’গলপ্রায়।থমাস শন কাঁদতে পারছেন না। উনাকে ধরে রেখেছেন আহির।জল চাইছে একটু। তার বুকে ব্যথা করছে।আহির জলটা এগিয়ে দিল তাঁর দিকে।হাতে নিয়েও থমাস জলটা খেলেন না। তাঁর ছেলে শেষ জলটুকু পর্যন্ত খেতে পারেনি। আক্ষেপের সুরে একবার বললেন “কেন আমি তোকে গ্রামে নিয়ে আসলাম!
