না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৮ (২)
মাইশা জান্নাত নূরা
ইলমা বললো…..
—”গরীবের বড় স্বপ্ন দেখা পাপ এ’কথা তোমায় কে বলেছে অনু?”
অনু হাসলো। ওর এই হাসির মাঝে লুকিয়ে ছিলো কঠিন বাস্তবতার রূপ নিজ চোখে দেখার অভিজ্ঞতা। অনু বললো….
—”এখন আর কোনো মানুষকে হাতে-কলমে কিছু শিখিয়ে দিতে হয় না আমায়, আপা। বুঝ বয়স থেকেই বাস্তবতা আমায় রং বদলিয়ে বদলিয়ে সবকিছুই শিখিয়ে দিয়েছে। তাই এই অনু ১৬ বছর বয়সে যেই জ্ঞান নিয়ে তোমাদের মাঝে চলাচল করছে হয়তো সেই জ্ঞান নারীরা ২৫ বছর বয়সে গিয়ে অর্জন করে।”
ইলমার বুক চিঁ*ড়ে বেড়িয়ে এলো গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস। হয়তো অনুর কথার পিঠে আর কথা খুঁজে না পাওয়ার জন্যই পড়লো এই শ্বাসটা! কিয়ৎক্ষণ পরিবেশ শান্ত রইলো। ইলমা-অনু দু’জনেই নীরব হয়ে বসে আছে। নীরবতার দেওয়াল ভে*ঙে ইলমা বললো….
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—”সবই বুঝি আমি অনু। কিন্তু একটাবার চিন্তা করে দেখো বেঁচে থাকাকালীন তোমার মা তার জীবনে কি পেয়েছিলেন! কতোটুকু স্বাধীনতা, স্বাচ্ছন্দ্যতা পেয়েছিলেন তিনি! দিন নেই রাত নেই যখন তখন স্বামীর হাতে মা*র খেতেন তবুও তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে অন্যের বাড়িতে-জমিতে ঝিঁ গিরি করে করে তোমার মুখে ভালো খবার তুলে দিতেন, নিজে ছেঁড়া-তালি দেওয়া পোশাক পড়লেও তোমায় ভালো ও নতুন পোশাক পড়তে দিতেন, তোমায় স্কুলে পাঠাতেন, ঘরের কাজ করতে দিতেন না যেনো তুমি ভালোভাবে পড়তে পারো। আর শেষ পর্যন্ত তোমার মা তোমাকে বাঁচাবে জন্য, তোমায় একটা সুন্দর-সুস্থ জীবন দিবেন জন্য নিজের জীবনের পরোয়া করলেন না। সেই মায়ের শেষ ইচ্ছাটুকু পূরণ করা কি তোমার দায়িত্বের মাঝে পরে না?”
অনু প্রতিত্তুরে কিছুই বললো না। ইলমা আবারও বললো…..
—”তোমার মা যেই য*ন্ত্র*ণা ভো*গ করে নিজের জীবন ত্যা*গ করেছিলেন, যেই স্বপ্ন তোমায় নিয়ে দেখেছিলেন তা কি এভাবে গার্মেন্টসে নিম্নপদে চাকরি করে পূরণ করতে পারবে তুমি? বলো!”
অনুর দু’চোখ বেয়ে অশ্রুরা টপটপ করে ঝরে পড়ছে। অনুর বুকের ভিতরটা পুঁ*ড়ছে। অনুর চোখের সামনে পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো জ্বলজ্বল করে ভাসছে।
এইতো সেদিনই অনু চুলে শ্যম্পু করেছে কিন্তু তেল দিবে না জন্য কি জেদ দেখালো কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওর মা ঠিকই ওকে ধরে বেঁধে চুলে তেল দিয়ে দিয়েছিলো। তারপর মাথার দুই পাশে লাল ফিতা দিয়ে কলা বিনুনি করে দিয়েছিলো। অনু সেই বিনুনি দু’টো মাথা এ’পাশ-ওপাশ করে ঝাঁ*কাতো জন্য ওর মা ওর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলতো, ‘ওমন করিস না অনু, মাথা ব্য*থা করবে। তখন আর পড়তে পারবি না। স্কুলে যেতে পারবি না।’
এরপর হুট করেই কি থেকে কি হয়ে গেলো। যেমন কালবৈশাখী ঝড় কোনো জানান না দিয়েই ঘরের দুয়ারে এসে দাঁড়ায় আর সবকিছু ত*ছ-ন*ছ করে দিয়ে যায় মূহূর্তেই তেমনই অনুর জীবনটাও ত*ছ-ন*ছ হয়ে গিয়েছে। কোমর সমান লম্বা-ঘন চুলগুলো ঢাকায় আসার পর কেঁ*টে কাঁধ ছুঁই ছুঁই করে নিয়েছে। চুলগুলো কাটার সময় অনুর কোনো মায়া কাজ করে নি। করবেই বা কেনো? যেই মা নিয়ম করে ওর চুল শ্যম্পু করে দিতো, তেল দিয়ে চিরুনি করে বিনুনি করে দিতো সেই মা’কেই তো ও চিরতরের জন্য হারিয়ে ফেলেছে।
অনুর নীরব কান্না এবার শব্দতে পরিবর্তন হলো। মুখের কাছে ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে অনু যেই না তাতে কাঁ*ম*ড় বসাতে নিবে তখুনি ইলমা অনুর হাত ধরে ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো….
—”এ-কি করতে নিয়েছিলে তুমি অনু! কাঁ*ম*ড়াবে কেনো নিজেই নিজের হাতে!”
অনু কিছু বললো না। ইলমা খেয়াল করলো অনুকে অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে। ঠিক গতকালের মতো যখন অনু ওর অতীত সম্পর্কে ইলমাকে সব বলতে নিয়েছিলো তেমন। ইলমা বুঝলো অনুর যখনই ওর অতীতকে মনে পড়ে তখন আর ও নিজের মাঝে থাকে না। অনুর হাতের কয়েকটা জায়গায় গভীর শুকনো ক্ষ*তগুলো দেখে ইলমা ভেবেছিলো কোনোভাবে হয়তো ও আ*ঘা*ত পেয়েছিলো কিন্তু আজ ইলমা বুঝতে পারলো এই প্রত্যেকটা ক্ষ*তই অনু নিজেই তৈরি করেছে। কখনও দাঁত দিয়ে কাঁ*ম*ড়ে, কখনও হয়তো ধাঁ*রা*লো ছুঁ*রি দিয়ে কেঁ*টে।
ইলমা তৎক্ষনাৎ অনুকে জড়িয়ে ধরলো। অনু ফুঁ*পাচ্ছে। এখন আর ওর চোখ থেকে অশ্রু ঝড়ছে না ঠিকই কিন্তু ওর অস্বাভাবিক ভাবে কম্পিত হওয়া স্বাভাবিক হয় নি এখনও। ইলমা মনে মনে ভাবলো কিছু।
বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার অনু স্বাভাবিক হয়েছে বুঝে ইলমা বললো…
—”তুমি বসো, আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি। আমরা সকালের খাবার একসাথেই খাবো ঠিক আছে!”
অনু মাথা নাড়লো। ইলমা উঠে অনুর রুম থেকে বেড়িয়ে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো। অনু বিছানায় শুয়ে দু’চোখ বুঁজলো। জ্বরটা আবার ফিরে এসেছে এইটুকু সময়ের ভিতরেই। পায়ের কাছে আধোভাঁজ করা কাঁথাটা টেনে অনু নিজের শরীরে জড়িয়ে নিলো। শীত লাগছে ওর ভিষণ।
ইলমা নিজের রুমে এসে তেজের নাম্বারে কল করলো। এক কলেই ওপাশ থেকে তেজ ফোন রিসিভ করলো। ইলমা বললো….
—”আজ আমাদের দেখা করার কথা ছিলো।”
সারফারাজের হাতের মা*র খেয়ে তেজের প*শ্চাৎ*দেশের অবস্থা তো দেখার মতো না। তেজ মনে মনে বললো….
—”না, দেখা করা মিস দেওয়া যাবে না। শরীরের এই কন্ডিশন দেখে তো ইলমা জানতে চাইবেই কি কারণে এমন অবস্থা হয়েছে। তাই একটা কিছু বলে দিবো তখন না হয়।”
এই ভেবে তেজ বললো….
—”হুম, কোথায় দেখা করবেন?”
—”আপনি কই আছেন এখন? নিজ বাসায় নাকি বাংলো বাড়িতে?”
—”বাংলোতেই আছি।”
—”বেশ তো। আমি অনুকে নিয়ে আসছি ওখানেই। একটু সময় অপেক্ষা করুন আমার জন্য।”
তেজ কিছুটা অবাক হলো অনুকে সাথে আনার কথা শুনে। তেজ সে বিষয়ে প্রশ্ন করতে নিতেই ওপাশ থেকে ইলমা খট করে কলটা কেটে দিলো। তেজ বিরবিরিয়ে বললো….
—”হঠাৎ অনুকে সাথে আনার কথা বললেন কেনো ইলমা! কোনো সিরিয়াস কিছু হলো নাকি আবার!”
এদিকে ইলমা প্লেটে খাবার বেড়ে নিলো অনুর আর ওর নিজের জন্য। অনুকে খাইয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সেখান থেকে ও নিজেও খেয়ে নিবে বলে ঠিক করলো। ইলমা খাবারের প্লেটটা নিয়ে আবার অনুর রুমে আসলো। অনু শোয়া থেকে উঠে বসলো। কম্বলটা ভালো ভাবে শরীরে জড়িয়ে নিলো। ইলমা অনুর পাশে বসতে বসতে বললো….
—”শীত করছে তোমার?”
অনু মাথা নেড়ে ‘হ্যা’ সূচক জবাব দিলো। ইলমা তরকারী দিয়ে অল্প ভাত মেখে অনুকে এক লোকমা খাইয়ে দিলো। অনু তা খেয়ে বললো….
—”আপা তরকারী ভাতে মুখে স্বাদ লাগছে না। খেতে কষ্ট হচ্ছে।”
ইলমা বললো….
—”কেনো তরকারী কি স্বাদ খারাপ হয়েছে আজ!”
—”উহুহ, তরকারী মনে হয় ঠিকই আছে। আমার মুখের স্বাদ-ই ন*ষ্ট হয়েছে যা বুঝতেছি। কেমন জিহ্বাটা সিদ্ধ সিদ্ধ ভাব হয়ে আছে।”
—”জ্বরটা আবার ফিরে আসলো নাকি!”
এই বলে ইলমা ওর বাম হাতের উল্টোপিঠ অনুর কপালে, গালে, গলায় ছোঁয়ালো। অতঃপর বললো….
—”হু,জ্বর তো ভালোই এসেছে বুঝছি। একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে তোকে। ব্লাডটা টেস্ট করিয়ে নিয়ে দেখলে মনের খ*চ-খ*চানিটা দূর হবে।”
অনু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো….
—”আগের দিন সত্যিই বা*ঘে খেয়েছে আপা।”
ইলমা ভ্রু কুঁচকে শুধালো….
—”মানে!”
—”ছোটবেলায় আমার সূ*চ ফো*টাতে খুব ভ*য় লাগতো। একবার গ্রামে কলেরা ছড়িয়ে পড়েছিলো।গ্রামে তখন নারীদের চিকিৎসা না করানোর কু*সংস্কার বহাল ছিলো। পরে সরকার ও পুলিশের হস্তক্ষেপে সবাইকে চিকিৎসা নিতে বাধ্য করা হয়, তখন মৃ*ত্যুহারও কমে যায়। এরপর গ্রামে সরকারী হাসপাতাল তৈরি হলে আমার যখনই জ্বর-ঠান্ডা হতো মা আমাকে সেখানে নিয়ে যেতেন। ডাক্তাররা জোর করেই র*ক্ত পরীক্ষা করার জন্য সূ*চ ফোঁ*টাতেন। আর আমি সূ*চ দেখলেই চিৎকার করতাম। ভ*য়টা তখন কিছুতেই কাটতো না। আর এখন!”
এখন শব্দটা উচ্চারণ করতেই অনুর ভিতর থেকে একবার দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসলো। অনু ওর দু’হাত ভাঁজ করছে আবার খুলছে। ওমন করতে করতেই বললো….
—”ঢাকায় প্রথম পা রাখার পর আমি অ*সুস্থ হয়ে স্টেশনেই অ*চেতন হয়ে পড়েছিলাম। পরে জ্ঞান ফিরতেই দেখলাম হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। এক চাচা আমাকে উদ্ধার করে এনেছিলেন সেখান থেকে। স্টেশনের পাশেই একটি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি করতেন তিনি শুনেছিলাম। আমার শরীর যথেষ্ট দুর্বল ছিলো। তাই ডাক্তার আমার হাতের উল্টো পিঠে সূ*চ ফুটিয়েছিলেন। আমি নির্বিকারভাবে তাকিয়ে ছিলাম সেদিন। কোনো ভ*য় বা ব্য*থা কিছুই অনুভব হয় নি আমার। বরং মনে হচ্ছিলো আরও সূ*চ ফু*টানো হোক আমার হাতে, আরও আ*ঘাত করা হোক আমায়, তাতেই মিলবে আমার প্রকৃত শান্তি।”
অনুর শেষ কথাগুলো শুনে ইলমার বুকের ভিতরটা কেমন যেনো করে উঠলো। ইলমার মন ওর মস্তিষ্ককে শুধু একটাই কথা বলছে, ‘অনু স্বাভাবিক নেই।’ অনু ওর হাতের উপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে নিজ থেকে করা প্রতিটা ক্ষ*ত ইলমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে আবারও বললো……
—”তখন জিজ্ঞেস করেছিলে না এই ক্ষ*ত গুলো আমি নিজে নিজেই কেনো করেছি! নিজেকে এভাবে ক*ষ্ট দেওয়ার মানে কি! কিন্তু বিশ্বাস করো আপা, এগুলো করার সময় আমার একটু ক*ষ্ট লাগে নি। বরং মনে হয়েছে এগুলো করার মাঝেই আমার প্রকৃত শান্তি লুকিয়ে আছে। এই যে ডাক্তার দেখাবে বললে! সূঁ*চ ফু*টিয়ে আমার শরীর থেকে র*ক্ত নেওয়া হবে বললে! আমার আর ভ*য় করছে না শুনে। বরং শান্তি শান্তি অনুভূতি কাজ করছে। আমি শান্তি পাবো। শান্তি আমার জন্য বাহিরে অপেক্ষা করছে। কখন নিয়ে যাবে তুমি আমায়?”
ইলমা যেনো পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে অনুর কথাগুলো শুনে। সময় যতো যাচ্ছে অনুকে ততোই অস্বাভাবিক লাগছে ওর। ইলমা মনে মনে ভাবলো….
—”না, আর সময় ন*ষ্ট করলে চলবে না। অনুকে নিয়ে এক্ষুণি বাংলো বাড়িতে যেতে হবে আমায়। তারপর তেজ যেমনটা বলবেন তেমনটাই করবো।”
পরক্ষণেই ইলমা বসা থেকে উঠে ভাত যা ছিলো ওমনই ঢেকে রেখে হাত ধুয়ে নিয়ে বললো…..
—”অনু, উঠো। আমরা বাহিরে যাবো এখন।”
অনু হাসিমুখে বললো….
—”শান্তি দিতে নিয়ে যাবে আমায় আপা! এক্ষুণি?”
অনুর জ্বর যে আরো বেড়েছে তা ইলমা অনুর উলোট-পালোট কথার ধরণ দেখেই বুঝতে পারছে। ইলমা বললো….
—”হুম, নিয়ে যাবো।”
অতঃপর ইলমা কোনোরকমে রেডি হয়ে ইলমাকেও অন্য মেয়েলী পোশাক পড়িয়ে দিলো। তারপর দুইরুমে তালা দিয়ে অনুকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো একটা অটো ধরে তেজদের বাংলো বাড়ির উদ্দেশ্যে।
আতুশি দু’হাতে নিজের মুখে ছিটকে পড়া পানিগুলো নিজের শাড়ির আঁচল টেনে ধীরে ধীরে মুছতে লাগলেন। তাঁর চোখ দু’টো হালকা কুঁচকে রয়েছে। কিন্তু এই কুঁ*চ*কানো ভাবটা বিরক্তির নয় বিস্ময়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। পিহু তখনও কাশতে কাশতে অপ্রস্তুত অবস্থায় উঠে দাঁড়িয়ে বললো…..
—”সরি, সরি ছোট চাচী মা! আমি বুঝতেই পারি নি এমনটা হয়ে যাবে। হুট করে কথাটা শুনে, আসলে….!”
পিহু পুরো কথা শেষ করতে পারলো না। কাশির কারণে গলার স্বর মৃদুভাবে কাঁপছে। পিহুর চোখে-মুখে স্পষ্ট অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠেছে। আতুশি হালকা ভেজা অবস্থাতে থেকেও পিহুর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করলেন। পানি কিংবা কোনো খাবার হঠাৎ তালুতে উঠে কাঁশির সৃষ্টি হলে পিঠের উপর হাত বুলালে অ*সুবিধা অনেকটা কমে আসে। পিহুরও কাঁশি তৎক্ষনাৎ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। আতুশি স্বাভাবিক গলায় বললেন……
—“সমস্যা নেই বউমা। আমি বুঝতে পারছি। তোমার দ্বারা যা হয়েছে তা সম্পূর্ণই অনিচ্ছাকৃত ছিলো। তাই এতে তোমার লজ্জা পাওয়ারও কিছু নেই।”
পিহু হালকা ভাবে নিঃশ্বাস ছাড়লো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ওর অস্ব*স্তি ভাবটা রয়েই গেলো। শিউলি এতোক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে মুখের উপর একহাত হালকা ভাবে চেপে ধরে বসে ছিলেন। পরক্ষণেই শিউলি তার মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে বললেন…..
—“পিহু মা, নীরার বিয়ের কথা শুনে যদি তোমারই এমন অবস্থা হয়, তাহলে নীরার নিজের অবস্থা কী হবে আমি তো সেটাই ভেবে পাচ্ছি না!”
শিউলির এরূপ কথায় ডাইনিং রুমের পরিবেশটা খানিকটা নিস্তব্ধ রূপ ধারণ করলো। পিহু মুখ ফুটে কিছু বললো না। পিহু দৃষ্টি নিচের দিকে স্থির করা। পিহুর ভিতরে ভিতরে চলছে নীরাকে ঘিরে অনেক চিন্তা, অনেক না মেলা হিসাব। যে হিসাবের পাতা সে বাড়ির সিনিয়রদের সামনে খুলতে পারবে না এতো সহজে। পিহুর বুকের ভিতরটা কেমন মো*চড় দিয়ে উঠলো।
কানাডা যাওয়ার আগের নীরার সাথে হওয়া সেই ভয়ংকর সত্য ঘটনার কথা পিহুর স্মৃতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। নীরা নিজেও জানে না কখন, কীভাবে, কার দ্বারা ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষ*তিটা ২ বছর আগে হয়ে গিয়েছিলো। নীরার অচেতনতার সুযোগ নিয়ে ওর সাথে করা সেই জ*ঘন্য অপরাধের দায় কেউ আজও নেয় নি। নীরার সবথেকে দূর্বল পয়েন্ট ওটাই যে, ও অ*পরাধীকে চিনে না।
এরপর হঠাৎ নীরার প্রেগন্যান্ট হয়ে যাওয়া। পিহু ওর দু’চোখের পাতা শক্ত করে চেপে ধরলো। আজ নীরার দেড় বছরের একটা ছেলে আছে। যার নাম সে রেখেছিলো নির্বাণ। অথচ এই বাড়ির কেউ নির্বাণের সম্পর্কে কিচ্ছু জানে না। না আতুশি, না শিউলি, আর না পরিবারের কোনো সিনিয়র সদস্য। তারা শুধু জানে নীরা পড়াশোনার জন্য কানাডা গিয়েছিলো। আর আজ দুই বছর পর সে ফিরে এসেছে নিজ দেশে, নিজ বাড়িতে। তাই এখন নীরার মা, চাচীদের ওর বিয়ের বিষয়ে ভাবাটাও ভুল কিছু না। পিহুর মাথায় একটার পর একটা প্রশ্ন ধা*ক্কা খাচ্ছে।
‘কিভাবে? কিভাবে পারবে ও এই পরিস্থিতিতেকে সামলে নিতে? নীরার যে সন্তান আছে এই সত্যটা প্রকাশ পেলে তখন কী হবে? এই সমাজ, এই পরিবার তখন নীরার প্রতি সহানুভূতি দেখাবে না বরং উঠতে-বসতে ওকে অপমানই করবে। কারণ নীরার জীবনে ঘটে যাওয়া দূ*র্ঘ*টনাকে তখন কেউ কোনো নোং*রা লোকের করা‘জ*ঘ*ন্য অপরাধ’বলে গন্য করবে না। নীরাকেই সকলের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
পিহু ধীরে মাথা তুলে চোখে মেলে তাকালো আতুশি ও শিউলির দিকে। ওর চোখে-মুখে এখন আর সেই অস্বস্তি-অস্থিরতার দেখা মিলছে না। পিহু শান্ত কন্ঠে বললো….
—“ছোট চাচী মা, নীরার বিয়ের বিষয়টা নিয়ে তাড়াহুড়া করা কি ঠিক হবে?”
আতুশি পিহুর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন….
—“তাড়াহুড়া বলছো কেনো তুমি বউমা? বয়স তো কম হলো না নীরার!”
পিহু ধীরে শ্বাস ফেলে বললো….
—“বয়স যে হয়েছে তা আমিও মানছি। কিন্তু নীরা তো দীর্ঘ দুই বছর পর ক’দিন হলোই দেশে ফিরেছে। এতোদিন কানাডায় ও একা ছিলো, পড়াশোনা করেছে, অনেক মানসিক প্রেশারের মধ্য দিয়ে গিয়েছে বলা চলে। তাই এভাবে হঠাৎ করে ওর বিয়ের কথা তুললে ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারবে কিনা সেটাও তো একটাবার ভাবা দরকার বলুন!”
শিউলি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। পিহুও থেমে গেলো এই ভেবে যে, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ও যদি বেশি কারণ তাঁদের সামনে দাঁড় করাতে যায় তাহলে এ নিয়ে তাঁদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে। সবথেকে বড় কথা নীরার সত্যটা সবার সামনে আনার উপযুক্ত সময় এখনও হয় নি। তাই পিহু মনে মনে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো….
যে করেই হোক, নীরার বিয়ের প্রসঙ্গটা কিছু দিনের জন্য ঠেকাতেই হবে। এর মাঝেই পিহুর নীরাকে মানসিকভাবে শক্ত করতে হবে সবার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে হওয়া অ*ন্যায় সম্পর্কে সবাইকে অবগত করার জন্য।
কারণ পিহু চায়, সব সত্য সকলে জানার পর নীরার সম্মান ও নিরাপত্তার উপর কোনো আঁ*চড় না ফেলতে।
অটো তেজদের বাংলো বাড়ির সামনে থামলো। ইলমা অনুকে নিয়ে নেমে দাঁড়ালো। অনুর গায়ে একটা কালো শাল জড়ানো রয়েছে। ঠান্ডা আর বাইরের বাতাস থেকে বাঁচাতেই ইলমা পড়িয়ে দিয়েছিলো অনুকে বাসা থেকে বেড়োনোর আগে। গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে অনু মুগ্ধ চোখে ভিতরটা দেখার চেষ্টা করছে। যেই বাড়ির বাহিরের গেইটের কারুকাজই এতো সুন্দর সেই বাড়ির ভিতরটা না জানি কতোটা দৃষ্টিনন্দন হবে তাই ভাবছিলো অনু। এমন সুন্দর বাড়ি এতো কাছে থেকে দেখার ভাগ্য অনুর আগে কখনও হয় নি। ঢাকায় এসেছে পর কর্মস্থলে যাওয়ার পথে কেবল বাসের জানালার ফাঁক দিয়ে এমন দু-একটা বাড়ির ঝলক পড়েছিলো ওর চোখে।
ইলমা অটোর ভাড়া মিটিয়ে অনুর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো….
—”চলো, ভিতরে যাবো আমরা।”
অনু ইলমার দিকে তাকিয়ে অবাক স্বরে বললো….
—”এই বাড়ি! এতো সুন্দর, এতো বড় বাড়িতে আমাকে ঢুকতে দিবে আপা?”
ইলমা স্মিত হেসে বললো….
—”গতকাল যেই পরিচিত দুইজন পুরুষ এসেছিলেন আমাদের বাসায় এই বাড়িটা তাঁদেরই। তাই এখানে ঢোকার জন্য আমাদের কারোর থেকে অনুমতিপত্র নিতে হবে না। চলো তুমি।”
—”কিন্তু! আমরা এখানে আসলাম কেনো? কালই না ওনাদের সাথে দেখা হলো তোমার! আজ আবার….!”
—”উফহহ, এই মেয়েটা এতো প্রশ্ন করে!”
এই বলে ইলমা অনুর হাত ধরে ওকে নিয়ে মেইন গেইট পেরিয়ে বাংলো বাড়ির ভিতরে যাওয়ার পথ ধরে অগ্রসর হতে শুরু করলো।
পিহু ওর রুমে চিন্তিত মুখে পায়চারি করছে। কোনোভাবেই ভেবে পাচ্ছে না ও ওর করণীয় কি এখন নীরার বিষয়ে! ওদিকে পিহু নীরাকেও এক প্রকার আশাই দিয়ে বসেছিলো যে, একটা এমন পরিকল্পনা পিহু তৈরি করবে যার মাধ্যমে সকল সত্য সবাইকে না জানিয়েও নীরার দেড় বছরের ছেলে নির্বাণকে কানাডা থেকে বাংলাদেশে এনে এই বাড়িতেই রাখা সম্ভব হবে।
সেইসময় পরিচিত কন্ঠস্বরে পিহু শুনতে পেলো…..
—”এতো জোড়ে জোড়ে পায়চারি করলে তো আমার সফট বউয়ের সফট শরীরটা শুকিয়ে বলা চলে হাওয়ায়-ই মিলিয়ে যাবে। এখনই যতোটা শুকনো সে!”
পিহু পায়চারি থামিয়ে তৎক্ষণাৎ সামনের দিকে তাকাকো। রুমের দরজার সাথে হেলান দিয়ে বুকের সাথে দু’হাত করে সারফারাজ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। পিহুর দিকেই সারফারাজের তীক্ষ্ণ গাঢ় নীলাভ মণিবিশিষ্ট দু’চোখজোড়া স্থির হয়ে আছে। পিহুর ঠোঁটেও হাসির রেখা ফুটে উঠলো। সারফারাজের উপস্থিতি যেনো ওর সকল চিন্তার ঔষধী হয়ে উপস্থিত হয়েছে এইমূহূর্তে ওর সামনে। পিহু দ্রুত পায়ে সারফারাজের কাছে এগিয়ে এসে ওর হাত ধরে টেনে ওকে রুমের ভিতরে নিয়ে দরজার ছিটকিনিটা লাগিয়ে দিলো। সারফারাজ ভ্রু নাচিয়ে বললো…..
—”কি ব্যপার, মাত্র একটা রাত বউয়ের সঙ্গে ছিলাম এতেই আমার লজ্জাবতী বউটা হুট করেই লজ্জা টজ্জা ছেড়ে মুডফুল বউয়ে পরিণত হয়েছে দেখছি! বাসররাতের অসমাপ্ত কাজ কি আজই সমাপ্ত করা যাবে তাহলে?”
সারফারাজের এই কথা কানে আসতেই পিহুর হাসি এবার মিলিয়ে গেলো। রূপ নিলো তা ঘন লজ্জায়। নীরার বিষয়ে সারফারাজের সাথে আলোচনা করার চিন্তাতেই পিহু যে এমনটা করে বসেছে তা এখন কিভাবে বলবে সে! পিহু এখনও দরজা মুখো হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। সারফারাজ এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে পিহুর দিকে। পিহুর একেবারে সন্নিকটে এসে পড়েছে সারফারাজ। পিহুর কানের কাছে সারফারাজ ওর মুখটা এগিয়ে এনে ফিসফিসিয়ে বললো…….
—”উত্তর দিলে না যে!”
সঙ্গে সঙ্গে পিহু দু’হাতে নিজের কামিজের নিচের অংশ খাঁ*মচে ধরলো। দু’চোখ বুঁজে নিলো শক্ত করে। সারফারাজ দুষ্টুমি ভরা কন্ঠে বললো…..
—”কোথায় যেনো শুনেছিলাম, নীরাবতাই হয় সম্মতির লক্ষ্মণ। তাহলে তোমার এই নীরাবতাকে কি আমি সম্মতির লক্ষ্মণ হিসেবে ধরে নিবো বউ!”
পিহুর এবার লজ্জায় যেনো মূ*র্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। পিহু সঙ্গে সঙ্গে উল্টোঘুরে থাকা অবস্থাতেই পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে সারফারাজ ওর দু’হাত দরজায় ঠেকিয়ে নিজের বাহুবন্ধনে পিহুকে আবব্ধ করে নিলো। পিহুর কেমন হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হয়েছে। সারফারাজ এবার পিহুকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে করে নিলো। পিহুর পিঠ দরজার সাথে ঠেকলো হালকা শব্দ করে। পিহু ওর ঠোঁটজোড়া চেপে রেখে, চোখ জোড়াও আগের ন্যায় শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে, নিঃশ্বাস ফেলছে ঘন ঘন। সারফারাজ পিহুর মুখের উপর অনেকটা ঝুঁকে এলো। ইন্ঞ্চি খানেক দুরত্ব রেখেছে কেবল। সারফারাজ পিহুর অস্থির অস্থির এই ভাবটা দেখছে মুগ্ধ চোখে। অতঃপর ঘোর লাগা কন্ঠে সারফারাজ বললো……
—”এভাবে আর কিছুসময় ঘন শ্বাস ফেলো যদি তাহলে সত্যি বলছি আমার আমিটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না।”
পিহু সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকালো। ঠোঁটের ভাঁজ ও খুলেছে যেই না ওমনি সারফারাজ পিহুর ঠোঁটজোড়া নিজের ঠোঁটের দখলে নিয়ে নিলো। ভালোবাসার এই পরশ শুরুতে হালকা হলেও তা গাঢ় হতে খুব বেশি সময় নিলো না। পিহুর চোখজোড়ার আকৃতি এতোটাই বড় হয়ে গিয়েছে যেনো তা কোটর থেকেই বেড়িয়ে আসবে এবার। পিহু যেনো নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গিয়েছে মূহূর্তেই।
সারফারাজের একহাত গিয়ে ঠেকলো পিহুর কোমরে। পিহুকে নিজের বুকের সাথে আরো গভীর ভাবে মিশিয়ে নিলো সে। মিনিট খানেক পর সারফারাজ পিহুর ঠোঁট ছেড়ে ওকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো। আকস্মিকতায় পিহু সারফারাজের গলা জড়িয়ে ধরলো দু’হাতে। দু’জনেই শ্বাস ফেলছে জোড়ে জোড়ে। সারফারাজ পিহুকে নিয়ে বিছানার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পিহু শুকনো ঢোক গি*লে বললো…..
—”শু-শুনুন ন…!”
পুরো কথা শেষ করার আগেই সারফারাজ পিহুর ঠোঁটে ছোট্ট করে একবার চুমু খেলো। পিহু আবারও কিছু বলার চেষ্টা করলে সারফারাজ আবারও একই কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটালো। পরপর ৩টে চুমু খাওয়ার পর সারফারাজ পিহু বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর উপর ঝুঁকলো। পিহু চোখ পিটপিট করছে। ওর সর্বাঙ্গে শিরশিরে অনুভূতি কাজ করছে। পিহু বললো…..
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৮
—”শু-শুনবেন ত….!”
সারফারাজ তৎক্ষণাৎ পিহুর শরীরে থাকা ওড়নাটা এক টানে খুলে সাইডে ফেললো। এরপর আর পিহু কিছু বলার সুযোগ পেলো না। সারফারাজ নিজের পরম আদরে, ভালোবাসায় পিহুকে পুরোপুরি ভাবে আজ নিজের করে নিলো।
