Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪২

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪২

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪২
সাইদা মুন

সামনে এগোতেই হঠাৎ চোখে পড়ে অদ্ভুত এক দৃশ্য। কমবয়সী দু’টি ছেলে-মেয়ে। মেয়েটা ছেলেটার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, আর ছেলেটা বিরক্ত মুখে বারবার পা ঝাড়া দিয়ে তাকে সরাতে চাইছে।
—প্লিজ, এমন কইরো না। তুমি না বলছিলা আমাকে ভালোবাসো, তাহলে এখন এমন করতেছো কেন?
মেয়েটার গলাটা ভাঙা, কান্নার চাপে কথাগুলো ঠিকমতো বেরোচ্ছে না। ছেলেটা বিরক্তিতে দাঁত চেপে হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে থাকে,

—সর! নষ্ট মেয়ে। তোকে আমি ভালোবাসতাম, এমন কথা কখন বলছি? ভালো লাগত, এখন আর লাগে না। তাই তোর সঙ্গে থাকব না।
—এত দিনের সম্পর্ক, এত কিছু হওয়ার পর তুমি আমাকে ছেড়ে দিবা?
মেয়েটার প্রশ্নে কোনো অভিমান নেই, শুধু অসহায়ত্ব। ছেলেটা হেসে ওঠে, সে হাসিতে কোনো লজ্জা নেই আছে শুধু কটুক্তি।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—তোর মতো মেয়েদের মানুষ ব্যবহারই করে, বিয়ে করে না।
কথাগুলো শুনে মেহরীনদের পা যেন মাটিতে গেঁথে যায়। বয়স দেখে চমকে উঠতে বাধ্য হয়, ছেলেটা হয়তো ক্লাস নাইন বা টেনের, আর মেয়েটা বড়জোর সিক্স বা সেভেন। এত ছোট বয়সে এমন সম্পর্ক, এমন ভাষা, এমনসব কথাবার্তা! একে অপরের দিকে তাকায় সবাই, চোখে বিস্ময় আর অস্বস্তি স্পষ্ট।
ঠিক তখনই ছেলেটা মেয়েটাকে লাথি মেরে সরাতে চাইলে মেয়েটা ব্যথায় কুকরে ওঠে। রাফি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সে দৌড়ে গিয়ে এক ঝটকায় ছেলেটার কলার ধরে ফেলে। ৫’৯ লম্বা রাফির সামনে তার চেয়ে খাটো ছেলেটা মুহূর্তেই অসহায় হয়ে পড়ে। দুই হাতে টেনে ধরতেই ছেলেটা মাটি থেকে কিছুটা উপরে উঠে যায়। রাফির চোখ লাল হয়ে উঠেছে, চোয়াল শক্ত। ফর্সা কপালে রগটা স্পষ্ট ভেসে উঠেছে,

—কুত্তার বাচ্চা। তোর সাহস কী করে হয় মেয়ে মানুষের গায়ে হাত দেওয়ার?
ছেলেটার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, কাশতে শুরু করেছে। এদিকে মেহরীন, তাহিয়া, ফারিনরা দৌড়ে গিয়ে নিচে পড়ে থাকা মেয়েটাকে তুলে ধরে। মেয়েটা তখনো কাঁদছে। এদিকে রাফি ছেলেটিকে ছাড়ছেই না। শেষমেশ না পেরে মেয়েটাই কাঁদতে কাঁদতে রাফির পায়ে পড়ে যায়।
—ভাই, দয়া করে ছেড়ে দিন। ওরে মারবেন না, প্লিজ।
এই দেখে রাফি বাধ্য হয় ছেলেটাকে ছেড়ে দিতে। ছেলেটা পাশের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে হাঁপাতে থাকে।রাফি লাল চোখে মেয়েটার দিকে তাকায়।

—এই জানোয়ারটার জন্য তুমি এমন করছো?
মেয়েটা চোখ মুছতে মুছতে বলে,
—কি করবো ভাই, ভালোবেসে ফেলেছি। এখন আর কিছু করার নাই। খারাপ হলেও আমার, ভালো হলেও আমারই।
কথাগুলো শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এইটুকুন মেয়ের মুখে এমন কথা। তাসের হাসিও আসছে আবার মায়াও লাগছে। মেয়েটার চোখে স্পষ্ট ভালোবাসা, অসহায়ত্ব।
হঠাৎ ছেলেটা উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
—এই! তুই কে রে আমাকে ধরার? জানিস আমি কে? এক কল দিলে পুরো দলবল চলে আসবে।
এই হুমকিতে রাফির রাগ যেন সপ্তম আকাশে উঠে যায়। এক সেকেন্ডও দেরি না করে সে আবার ছেলেটার শার্টের বুকের দিকটা এক হাতে চেপে ধরে।

—মা***দ! তোর কোন বাপ আনবি আন। আমি একাই তোর সব আব্বারে আব্বা ডাকামু। ফাপড় মারস কার সামনে।
ছেলেটা নিজেকে বাঁচাতে একটা ঘুষি মারতে গেলে তনিমা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাতটা ধরে মুচড়ে দেয়।
—এই জানোয়ারের বাচ্চা, সাবধান! আমার ভাইয়ের গায়ে হাত তুলবি তো, তোর হাত তোর গলায় ঝুলবে।
পেছন থেকে ফারিনও ছেলেটার চুল টেনে ধরে সর্বশক্তি দিয়ে।
—জানোয়ার! তুই কার ওপর হাত তুলতে গেছিস? নাকে টিপ দিলে দুধ বের হবে। চিনিস আমরা কে?
চারদিক থেকে চাপে পড়ে ছেলেটা হকচকিয়ে যায়। ভয় তার চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠে। মেয়েটা আরও জোরে কাঁদতে থাকে, মেহরীন আর তাহিয়াকে বারবার ছাড়াতে অনুরোধ করে।
মেহরীন বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে,

—তোমার জায়গায় আমি থাকলে এই সুযোগে মাঝ বরাবর লাথি মারতাম। বংশের বাতিই নিভিয়ে দিতাম শা*লার।
শেষমেশ ছেলেটা ভয় পেয়ে গলা নামিয়ে আনে,
—ভাই, ভাই ছাড়েন। আর এমন হবে না। আপনাদের সঙ্গে তো আমার কোনো ঝামেলা নেই। হুদাই নিজেরা শত্রুতা করে কী লাভ?
তার এই তেলমাখা কথায় সবাই বিরক্ত হয়ে সরে দাঁড়ায়। মেহরীন এগিয়ে এসে ঠান্ডা গলায় বলে,
—ঘটনাটা পরিষ্কার করে বলো।
ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে রেগে ওঠে,

—আপনাকে বলব কেন? আমাদের ব্যাপারে আপনাকে ঢুকতে কে বলেছে?
রাফি এক পা এগিয়ে আসে,
—আবার তুই ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলছিস?
ছেলেটা এবার সত্যিই ভয় পেয়ে যায়।
—মা… মানে উনি কি আপনার পরিচিত?
রাফি শক্ত গলায় বলে,
—ওরা আমার বোন।
এই কথায় মুহূর্তের জন্য সবার চোখ রাফির দিকে যায়। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা মুচকি হাসি ফুটে ওঠে সবার। ছেলে-মেয়েটা মাথা নিচু করে বেঞ্চে বসে আছে। তাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে মেহরীন, তাহিয়া, রাফি, তনিমা আর ফারিন। মেহরীন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে প্রশ্ন করে,

—কি হয়েছিল? তুমি এভাবে কাঁদছিলে কেন?
মেয়েটি হঠাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে। ছেলেটার চোখ-মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে। সে বারবার মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে, চোখের ইশারায় ধমক দেওয়ার চেষ্টা করছে, কথা বলতে নিষেধ করছে। তা চোখ এড়ায় না তাহিয়ার। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
—এই ছেলে, তুমি যে ওকে ধমকাচ্ছো, আমরা কিন্তু সব দেখছি। সত্যি কথা না বললে নারী নির্যাতন মামলায় হাজতে ঢুকিয়ে দেব। ভিডিও আমাদের কাছে আছে।
ছেলেটা ভয়ে শক্ত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে নেয়। আর সেই সুযোগে মেয়েটা ভাঙা গলায় কথা বলতে শুরু করে,

—আমি আর ও একই স্কুলে পড়ি। ও পড়ে ক্লাস নাইনে, আমি ক্লাস সিক্সে। অনেক দিন ধরে আমাকে পটানোর চেষ্টা করত। আমি রাজি হইনি। বারবার না বলেছি।
সে একটু থামে, গলা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে,
—তারপর বলল, আমার বান্ধুবিদের ট্রিট দেবে। তাদের নানান লোভ দেখায়। তাতে বান্ধুবিরাও চাপ দিতে লাগল আনাকে। বলল, রিলেশন এখন নরমাল, সবাই করে। তুইও কর, কিছু হবে না। নানান কথা বলে আমার পুরো ব্রেইনওয়াশ করে ফেলেছিল।
চোখের পানি মুছতে মুছতে মেয়েটা বলে,

—ওটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। ওদের জন্যই আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে। অথচ এখন ওরাই বলে, ওরা নাকি আমাকে জোর করেনি।
কথার মাঝেই মেয়েটা হেসে ওঠে। কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ নেই, সেটা ক্লান্ত, ভাঙা, একরাশ পরাজয়ের হাসি। মেহরীনরা অসহায় চোখে একবার একে অন্যের দিকে তাকায়।
সবার জীবনে ভালো বন্ধু জোটে না। কারও কারও জীবনে এমন কিছু মানুষ ঢুকে পড়ে, যারা পরিচয়ে বন্ধু হলেও বাস্তবে তারাই সবচেয়ে গভীর ক্ষতটার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা সব সময় ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ চায়, এমনও না। অনেক সময় নিজেরাও বোঝে না, তাদের কথাগুলো, চাপগুলো, “সবাই করছে, তুইও কর” এই সাধারণ বাক্যগুলো ধীরে ধীরে কাউকে এমন এক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, যেটা সে নিজেও নিতে চায়নি।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর সময়টা আসে পরে। যখন সেই মানুষটার জীবন ভাঙতে শুরু করে, যখন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়, ঠিক তখনই যারা তাকে ওই পথে ঠেলে দিয়েছিল, তারাই একে একে সরে যায়। কেউ দায় এড়াতে বলে, “আমি তো জোর করিনি”, কেউ আবার চুপচাপ দূরে সরে পড়ে। কিন্তু ক্ষতটা থেকে যায় সেই একজনের বুকেই, একাই বহন করার মতো ভারী হয়ে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেয়েটা আবার বলতে শুরু করে,

—ততদিনে আমি তাকে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। খুব বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম। আমি তাকে এমন বিশ্বাস করতাম যে সে যদি আমার চোখের সামনে খুন করেও এসে বলত, আমি করিনি। আমি সেটাই বিশ্বাস করে নিতাম।
তার গলা আরও ভারী হয়ে আসে,
—প্রথম প্রথম খুব ভালোবাসা দেখাত। আমার সঙ্গে কথা বলতে পাগল, এমন ভাব করত। কিন্তু যখন আমি পাগল হয়ে গেলাম, তখন থেকেই অবহেলা শুরু। আমার সঙ্গে কথা বলত না, আমাকে পাত্তা দিত না।
একটু দম নিয়ে সে বলে,

—স্কুলে ওর ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ও বন্ধুদের নিয়ে হাসাহাসি করত, আমাকে ইগনোর করত। অন্য বান্ধুবিদের সঙ্গে গল্প করত, আর আমি শুধু দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতাম।
তাহিয়া আর সহ্য করতে না পেরে মাঝখান থেকে প্রশ্ন করে ওঠে,
—কেন? পটিয়ে আবার ইগনোর কেন করত?
বলেই সে ছেলেটার দিকে রাগী চোখে তাকায়। ছেলেটা আরও চুপসে যায়, চোখ নামিয়ে রাখে। কোনো উত্তর নেই।
মেয়েটি জোর করে একটা হাসি টেনে এনে কপালে চাপড়ায়। সেই হাসিতে আত্মদয়া আর পরাজয়ের ছাপ স্পষ্ট,
—আমারই কপালের দোষ সব। ওর নাকি আমার উপর থেকে মন উঠে গিয়েছিল। আমি কত চেষ্টা করলাম ওকে ঠিক করতে, কিন্তু ও মানতেই চাইত না।
একটু থেমে সে বলে,

—প্রায় দুই মাস আমি ওর পেছনে ছুটেছি। শেষে বুঝলাম কিছুই হবে না, তখন পিছু হটতে শুরু করি। ঠিক তখনই একদিন ও আমাকে একা ডাকে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো আমি ইগনোর করছি বলে ও বুঝতে পারছে, আমাকে আবার চায়।
মেয়েটার গলা কেঁপে ওঠে।
—আমি খুশি মনেই একা দেখা করতে যাই। সেদিন একটা নির্জন পার্কে যাওয়ার পরপরই…. ও আমাকে একটা খুব বাজে প্রস্তাব দেয়।
এই কথাটুকু বলেই মেয়েটা ফোঁপাতে শুরু করে। মেহরীন তার কাঁধে হাত রেখে নীরবে সান্ত্বনা দেয়। এত ছোট বয়সের এসব কথা শুনে একদিকে অবাক লাগছে হাসি আসছে , অন্যদিকে ছেলেটার কাজ শুনে মাথায় আগুন জ্বলছে।
কিছুটা নিজেকে সামলে মেয়েটা আবার বলে,

—ও সেদিন শর্ত দিয়েছিল, যদি আমি ওর সঙ্গে রুমে যাই… তবেই নাকি আমাকে মেনে নেবে, বিয়ে করবে।
—কি?!
প্রায় সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে। মেয়েটা আরও ছোট হয়ে যায়। মাথা নিচু করে বলে,
—আমি ওর মিথ্যা প্রতিশ্রুতিকে সত্য ভেবে রাজি হয়ে যাই।
চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। তারপর মেয়েটা আবার বলতে শুরু করে,
—তারপর থেকে ও আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত, ভালোবাসা দেখাত। আমি ভাবতে লাগলাম, হয়তো সত্যিই আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু জানতাম না, আসলে ও আমাকে ভালোবাসত না, ও শুধু আমার শরীরটাই চাইত।
তার চোখ ভিজে ওঠে,

—কয়েকদিন ধরে শরীরটা ভালো লাগছিল না। এক বান্ধুবির কথায় প্রেগন্যান্সি টেস্ট করাতেই ধরা পড়ে আমি প্রেগন্যান্ট। আজ আমি ওর কাছে এসেছি, কিন্তু ও আমাকে মানতেই চায় না।
হতাশ কণ্ঠে সে বলে,
—না পারতে আজ পায়ে ধরেছি। তাও মানছে না। এখন কী করব আমি? ও যদি আমাকে না নেয়, আমার তো বাঁচার কোনো পথ নেই।
মেয়েটার শেষ কথাটুকু যেন সবার বুকে এসে আঘাত করে। সবাই লাল চোখে ছেলেটার দিকে তাকায়। ছেলেটা অস্থিরভাবে মাথা নাড়ছে, চুলকাচ্ছে, ধরা পড়ে গেছে, বুঝে গেছে। তনিমা পাশ থেকে একটা গাছের ডাল তুলে এনে ব্রেঞ্চের পাশে আছড়ে মারে,

—তুই তো আনোয়ারের বড় ছেলে জানোয়ার।
ছেলেটা আঁতকে উঠে তাকায়,
—আপনি আমার বাপের নাম জানলেন কেমনে?
তনিমা নিজেই একটু চমকে যায়। তার আন্দাজে বলা কথাটা মিলে গেছে। সেই সুযোগে সে গলা শক্ত করে বলে,
—খালি তোর বাপ না, তোর পুরো বংশ চিনি। এখন বল, মেয়েটার সঙ্গে এমন করলি কেন? নইলে এখুনি তোর বাপ আর পুলিশ, দু’জনকেই ফোন দেব।
ছেলেটাকে সবাই মিলে চাপ দিতেই সে কাঁপা গলায় বলে,

—আমি বিয়ে করব না
রাফি সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে,
—কেন করবি না?
ছেলেটা আমতা আমতা করে—
—এ..এমন মেয়েকে কে বিয়ে করবে?
—এমন মেয়ে মানে কী?
ছেলেটা সাহস করে বলতে যায়,
—যে মেয়ে বিয়ের আগে অন্য ছেলের সঙ্গে…
কথা শেষ করার আগেই রাফি ছেলেটার কান টেনে ধরে,
—এই জানোয়ার! অন্য ছেলে মানে কী? তোর কথায়ই তো গিয়েছিল, তোর সাথেই।
মেয়েটা মুখ চেপে কাঁদতে থাকে। অশ্রুসিক্ত চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
—তুমি এমন কথা বলতে পারলে?
ছেলেটা নির্দয় গলায় বলে,

—তুই যদি আমার সাথেই বিয়ের আগে যেতে পারিস, তাহলে অন্য কারো সাথে যাসনি, তার কী গ্যারান্টি?
এই কথায় মেয়েটার মাথার ভেতর যেন বাজ পড়ে। সে বোবা হয়ে তাকিয়ে থাকে। কী বলবে, ভেবে পায় না। মেহরীন আর বসে থাকতে পারে না। উঠে গিয়ে ছেলেটার গালে ঠাস করে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।
—তোদের মতো জারজদের জন্যই দুনিয়াটা এত নষ্ট হয়েছে। তোরা মিথ্যে ভালোবাসা দেখিয়ে একটা মেয়ের জীবন এক নিমিষেই শেষ করে দিস, তারপর আবার তার চরিত্রে আঙুল তুলিস!
রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে মেয়েটার দিকে তাকায়,

—আর তুমি! মা–বাবার আড়ালে এসব বা*লপাকনামি করতে কে বলেছিল? এখন বুঝছো মজা? কাকে বিশ্বাস করলে দেখেছো তো? এমন একজনকে, যে আজ অনায়াসে তোমাকে অস্বীকার করছে।
ছেলেটা মাথা নিচু করে বসে থাকে। মেয়েটা হিচকি তুলে কাঁদতে থাকে। হঠাৎ সে উঠে এসে মেহরীনের পায়ে লুটিয়ে পড়ে,
—আপু, তোমার পায়ে পড়ি। ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না। ওকে আমার করে দাও। ওকে বোঝাও না, আমাকে যেন বিয়ে করে।
এসব দেখে সবাই থতমত খেয়ে যায়। মেয়েটাকে ধরে তুলে কোনোমতে দাঁড় করানো হয়। ছেলেটা পালাতে চাইছিল, কিন্তু রাফি দুই-তিনটা থাপ্পড় দিয়ে জোর করে ব্রেঞ্জের সাথে বেঁধে বসিয়ে রাখে। পার্কের বাতাস তখন ভারী। কারও মুখে আর কথা নেই।
সবাই এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। রাফি কপাল ঘেঁষে ফিসফিস করে বলল,

—এখন কি করব? এই বাদাইম্মা তো এখন বিয়ে করবেই না।
তাহিয়া হঠাৎ উঠে বলল,
—চল এক কাজ করি, আমরাই এদের ধরে বিয়ে দিয়ে দেই। সামনেই কাজি অফিস আছে, আসার সময় দেখলাম।
তার কথায় ফারিন চোখ কুঁচকে বলে উঠল,
—এই অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ে বিয়ে দিতে গেলে হাজতে ভড়বে আমাদের।
তনিমা এক পা এগিয়ে ধ্বনিময় কণ্ঠে বলল,
—ধুর না, চল বিয়ে করাই। কাজিকেই সব খুলে বলব, তাও যদি না মানে। কোনো ঝামেলা হলে আব্বুকে কল দিলেই হয়ে যাবে।
রাফি মাথা ঘুরিয়ে ভেবে বলল,

—কিন্তু টাকা? এই যে ছেলে বিয়েতে রাজি হচ্ছে না, টাকা বের করবে কীভাবে? কম হলেও দুই-তিন হাজার লাগবে।
মেহরীন মাথা নাড়ল, শান্তভাবে বলল,
—টাকা আমি ম্যানেজ করব।
সবাই অবাক চোখে তাকাল।
—এতো টাকা কই পাবি?
—আমার চাচা শশুড়রা সেদিন সালামি দিয়েছিলো। আজ তোদের সাথে আসব বলে তিন হাজার নিয়ে এসেছি। তাই দিয়ে হয়ে যাবে।
ফারিন নাক চেপে বলে,
—এত টাকা এমনি বিফলে দিবি? এতে তোর কি লাভ? নষ্টামি করবে এরা আর টাকা যাবে আমাদের?
মেহরীন অস্থির হয়ে বলে,
—আহ, যাক। আমার এমনিতেও টাকার দরকার নেই। যা যা লাগে, উনিই এনে দেন। মেয়েটাকে দেখে মায়া লাগছে ভীষণ।
তার কথায় সবাই কিছুক্ষণ ভেবে একমত হলো,

—আচ্ছা, চল। এমনিতেও কত টাকা কত দিকে যায়। বিয়ে করিয়ে দিলে আমাদেরই সওয়াব।
এরপর সবাই একসাথে ছেলেটিকে ধরে বেঁধে নিয়ে যায় কাজি অফিসের দিকে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের দেখে কাজি প্রথমে রাজি হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতি ও মেয়েটির অবস্থার কথা শুনে, ভয়ে ভয়ে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়। তনিমা তখন আশ্বাস দেয়, তার বাবা আইনমন্ত্রী, কোনো ঝামেলা হলে নিজেই দেখবেন। সেই ভরসাতেই কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করে।
বিয়ের সময় মেয়েটি হাসিমুখে কবুল বললেও ছেলেটা দৃঢ় অনিচ্ছা প্রকাশ করছে। তনিমা তখন পুলিশি মামলা, ঝামেলার ভয় দেখিয়ে রাজি হতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত ছেলেটা জোরপূর্বক কবুল বলে।
সবশেষে কাজিকে তিন হাজার টাকা দিয়ে সবাই বেরিয়ে আসে। রাফি, তনিমা, ফারিন, মেহরীন, সবাই একসাথে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে। বাহিরে পা রাখতেই সবাই যেন একসঙ্গে দম ছাড়ে। সকলের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে,

“আলহামদুলিল্লাহ।”
ছেলেটা বেরিয়েই মুখ শক্ত করে মেয়েটার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই রাফি এক পা এগিয়ে এসে তার কলার চেপে ধরে থামিয়ে দেয়।
—এই, কোথায় যাচ্ছিস?
ছেলেটা চোখ রাঙিয়ে বিরক্ত গলায় বলে,
—যা হওয়ার হয়েছে। বিয়ে তো করালেনই। এখন আর কী করার বাকি আছে?
রাফির কণ্ঠ এবার ঠান্ডা,
—আর কী মানে? তোর জন্য আমাদের তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এত সহজে চলে যাবি ভাবছিস?
ছেলেটা একটু থমকে বলে,

—তাহলে কী চান? জলদি বলুন বাকিদিক সামাল দিতে হবে।
ফারিন টিটকারি মেরে বলে উঠল,
—এতক্ষন বউই মানছিলি না আর বিয়ে হতে না হতেই বউকে নিয়ে টানাটানি শুরু করেছিস।
ছেলেটা চোখমুখ কুচকে রাখে। এই ফাঁকে তনিমা সামনে এসে স্পষ্ট কণ্ঠে বলে,
—সোজা কথা। সামনে দোকান আছে। আমরা পাঁচজন, তোরা দু’জন, মোট সাতজন। সাতটা মজো, সাতটা চিপস আর সাতটা আইসক্রিম আনবি। এটা ট্রিট ধরেই মিটমাট।
কথা শেষ হতেই ছেলেটাকে প্রায় ধরে টেনেই দোকানের দিকে নিয়ে যায়। কোনো দরকষাকষি ছাড়াই সব কিনে আবার পার্কে ফিরে আসে তারা।

দুপুর তখন প্রায় সাড়ে তিনটা। রোদটা একটু ঢলে পড়েছে, বাতাসে হালকা ক্লান্তির গন্ধ। সবাই আগের জায়গাতেই বসে পড়ে। পরিবেশটা আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে। হাসি, গল্প, খাওয়া, সব মিলিয়ে যেন হঠাৎ করে একটা ছোটখাটো আনন্দের মুহূর্ত তৈরি হয়ে গেছস। মেয়েটা স্পষ্টই খুশি। কখনো সবার সঙ্গে গল্প করছে, কখনো খেতে খেতে হাসছে, আবার সুযোগ পেলেই ছেলেটাকে খোঁচা দিচ্ছে। আর ছেলেটা? সে চুপচাপ বসে আছে, মুখ কালো, যেন এই আনন্দের সঙ্গে তার কোনো যোগই নেই, উল্টো বিরক্ত।
পার্টিটা একটু জমাতে গান চালানোর কথা ওঠে। রাফি একটু হতাশ গলায় বলে,

—কিন্তু ডাটা নেই। গান বাজাবো কীভাবে?
এই কথা শুনে ফারিনের চোখ পড়ে সামনের বেঞ্চে বসে থাকা এক ভদ্রলোকের দিকে। লোকটা একা বসে মোবাইলে ভিডিও দেখছে, মাঝে মাঝে সিগারেট টানছে।
তা দেখে ফারিন বলল,
—ওই আংকেলটার কাছে হটস্পট চাইতে পারিস। মনে হয় দিলে দেবে।
রাফি একটু দ্বিধা নিয়েই উঠে যায়। লোকটার সামনে দাঁড়াতেই সে মাথা তুলে তাকায়,
—হ্যাঁ?
রাফি ভদ্রভাবে হেসে বলে,

—আংকেল, একটু হটস্পট দিলে খুব উপকার হতো।
লোকটা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,
—কিসের জন্য?
রাফি শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
—আসলে আমরা একটু গান বাজাতে চাই। বন্ধুরা মিলে বসেছি তো।
লোকটা হালকা হেসে বলে,
—আচ্ছা, দিচ্ছি। তা কী উপলক্ষে এত আয়োজন?
পাসওয়ার্ড দিতে দিতে প্রশ্ন করায় রাফি সহজভাবেই বলে ফেলে,
—আসলে একটু আগে দুইজনের বিয়ে করিয়ে এনেছি। ওদের জন্যই আরকি। আবার আমরা বন্ধুরাও আছি একটু আনন্দ করব।
লোকটা অবাক হয়ে তাকায়,

—তোমরা তো নিজেরাই এখনো ছোট, আবার কার বিয়ে?
রাফি পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে বলে লোকটাকে। শুনে লোকটা মাথা নেড়ে বলে,
—ভালোই করেছো। এসব না করলে সমাজ ঠিক হবে না।
পাসওয়ার্ড নিয়ে রাফি ফিরে আসে। গান চালু হতেই পরিবেশ আবার বদলে যায়। একটার পর একটা গান, কেউ গাইছে, কেউ তালে তালে হাত দোলাচ্ছে। দূরে বসে লোকটা চুপচাপ সব দেখছে, হাসছে, মাঝেমধ্যে ফোনে কথা বলছে।
হঠাৎ তনিমা গান বদলায়,

“এসেছে এসেছে আবার ইলেকশন,
জিতবে নৌকা নাই কোনো টেনশন,
ষোলো কোটি মানুষের একটাই ডিসিশন,
জিতবে নৌকা নাই কোনো টেনশন…
ওয়ান্স এগেইন শেখ হাসিনা,
ওয়ান্স এগেইন শেখ হাসিনা,
জয় বাংলা…”

গানের তালে তালে এবার সবাজ গলা চড়িয়ে ওঠে। কিন্তু বেঞ্চে বসে থাকা লোকটার মুখের হাসি বদলে ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। রাগ জমতে থাকে চোখেমুখে।
হঠাৎ অর্ধেকে এসেই গান থেমে যায়। নেট চলে যেতেই সবাই থেমে যায়। কেউ মোবাইলের দিকে তাকায়, কেউ প্রশ্নভরা চোখে লোকটার দিকে। তবে কোনো কথা না বলেই লোকটা উঠে দাঁড়ায়, মুখ শক্ত করে সেখান থেকে গটগট পায়ে চলে যায়।
তার এমন আচরণে মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ। কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, লোকটার হঠাৎ কি হলো। এত রাগলই বা কেনো?

তবে তারা সেসবের দিকে আর পাত্তা না দিয়ে আবার খাওয়ায় মন দেয়। যে যার মতো গল্প করছে, কেউ হাসছে, কেউ আগের ঘটনার রেশ টেনে আনছে, কেউ আবার চুপচাপ বসে শুধু শুনছে। বিয়ে করা নতুন দম্পতিকেও বসিয়ে রেখেছে জোর করে। সময় যে কীভাবে কেটে গেছে, কেউ খেয়ালই করেনি। প্রায় আধাঘণ্টা পেরোতেই সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্য একটাই, এবার বাড়ি ফেরা।
চারটা বেজে গেছে। তাহিয়ারা তো তালহার ভয়ে আগেই গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে, আগে আগে ছুটতে শুরু করেছে। সবাই একে একে পার্কের ভেতর থেকে বেরিয়ে গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ পার্কের ভেতরের সেই লোকটা সামনে এসে তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়ে। লোকটাকে দেখেই সবার কপাল কুঁচকে যায়। তখন ওভাবে চলে গেল কেনো, আবার এখন কী চায় সে? এই প্রশ্নটা চোখেমুখে ভাসতে না ভাসতেই সামনে এসে থামে একটা পুলিশের গাড়ি। গাড়ির হঠাৎ ব্রেকের শব্দে চারপাশ যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায়।
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যায়,

—আমি কল দিয়েছিলাম আমি…
কথা বলতে বলতেই পুলিশ কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে আসে। রাফিদের সামনে এসে হাত তুলে দেখিয়ে দেয়,
—এরাই এরাই কম বয়সি ছেলে মেয়েদের বিয়ে করিয়েছে।
লোকটার কথায় সবাই হতভম্ব। আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে হচ্ছে কি। তাদের আচরণে তারা সম্পূর্ণ হতবাক। তবে আরও বড় ধাক্কা আসে তাদের সাথের ছেলেটার কথায়। লোকটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছেলেটিও বলে ওঠে,

—হ্যা হ্যা আমাকেই জোর করে এই মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছে। আমাদের এখনো বিয়ের বয়স হয়নি। আমি বলেছিলাম বয়স হলে বিয়ে করব। তবে তারা ব্ল্যাকমেইল করেছে।
এই কথায় রাফিদের চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থা। কেউ কিছু বলার আগেই কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল এগিয়ে এসে তাদের কিছু বলতে না দিয়েই, ধরে গাড়িতে তুলতে শুরু করে। রাফি চিৎকার করে ওঠে,
—আরে করছেন কি আগে শুনবেন তো আমাদের কথা…
কিন্তু কেউ থামে না। একজন পুলিশ সংক্ষিপ্ত গলায় বলে,
—যা বলার সব পুলিশ স্টেশনে গিয়ে বলবে।
আর এক মুহূর্তও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে একে একে সবাইকে জোর করে গাড়িতে তোলে। সঙ্গে সেই ছেলে-মেয়েদেরও। গাড়িতে উঠতেই স্টার্ট নেয় গাড়ি। গাড়ির পেছনের বড় ফাঁক দিয়ে তখন রাফিরা তাকিয়ে আছে সেই লোকটার দিকে। যে তাদের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে একরকম বিশ্বজয়ের হাসি হাসছে। ওই হাসিটা দেখে একেকজনের চোখে রাগ জ্বলে ওঠে।

রাগে এবার রাফির দিকে তাকিয়ে মেহরীন দাঁত কিরমিরিয়ে প্রশ্ন করল,
—এই লোক এসব জানল কিভাবে?
রাফি আমতা আমতা করে উত্তর দেয়,
—মানে হটস্পট আনার সময় বলেছিলাম। তবে তখন তো বলেছিল ভালো কাজই করেছি। হঠাৎ এমন পল্টি নিল কেনো বুঝলামই না…
মেহরীন রাগে হিসতে হিসতে শাসিয়ে উঠে,

—রাফির বাচ্চা তুই সবসময় এমন করছ। ঝামেলায় ফালাস। বুঝতে পারছিস কত বড় ঝামেলায় পড়েছি আমরা?
রাফি মাথা নুইয়ে নেয়। সেও ভাবতে পারেনি এমনটা হবে। মনে মনে বিরবির করতে থাকে নানান কথা, “আমি কি জানতাম নাকি এমনটা হবে”। তাকে এভাবে বিড়বিড় করতে দেখে মেহরীন রেগে ধাক্কা মেরে বলে উঠল,
—ভের ভের কা গরোর?
রাফি পিটপিট করে তাকিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
—আঁর তো উন্নিশে উন্নিশে লাগের।
(আমার তো বমি বমি লাগছে।)
তার নাটক দেখে মেহরীন ফুস করে শ্বাস ছাড়ে,
—আঁরতুন তুয়ার ন্যাট্যমি ফুয়াদ ন লার।
রাফি অসহায় মুখে বলে,
—আই এহন কেন গরতাম?
—তুই কিয়ুন পন্ডিতি গরিলে?

রাফি কাচুমাচু হয়ে বসে পড়ে। আসলেই সে কেনো সব বলতে গেল বলদের মতো। এখন তো ব্যাপারটা অনেক বড় পর্যায়ে যাবে। এদিকে তাদের মুখে অদ্ভুত সব কথাবার্তা শুনে তাহিয়ারা সহ পুলিশ কনস্টেবল পর্যন্ত ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে। তাহিয়া কান্না থামিয়ে গোল গোল চোখে প্রশ্ন করে,

—তোরা কিসব বলছিস?
মেহরীন ঝারি মেরে বলল,
—কথা বলছিলাম শুনিসনি?
তনিমা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
—তা তো শুনেছি। তবে কি চাংচুং ফাং বললি কিছুই তো বুঝলাম না।
রাফি বলল,
—এটা চিটাইংগা ভাষা তোরা বুঝবার ন…
ফারিন ধমক দিয়ে ওঠে,

—হপ চুপ কর, আর বলিস না। এতক্ষনের একটা কথাও মাথায় ঢুকেনি। এগুলো থেকে তো চাইনিজ ভাষা বোঝাও সহজ।
তনিমাও সায় দেয়,
—আসলেই এদের ভাষা শুনে মনডা চাচ্ছে আবার ভাষা আন্দলন করি।
তাদের একেরপর এক অপমানিত কথার অপমানে মেহরীন আর রাফি একসঙ্গে ছ্যাঁৎ করে উঠে। তাদের মাতৃভাষা নিয়ে অপমান, এটা তারা সহ্য করবে কেন? মেহরীন হাত নাড়িয়ে থামিয়ে বলে ওঠে,
—এক্কান হতা পুনো তুয়ারাল্লাই তুয়ারার ভাষা যেল্লে সহজ আরাল্লাই ও আরার চট্টগ্রামোর ভাষা ইবে ইল্লে সহজ বুইজ্জুনা….
রাফি ফাঁকে মুখ ভেংচে বলে উঠে,

—যারা চট্টগ্রামের ভাষা বুঝে না তারা হলো বইঙ্গে।
সঙ্গে সঙ্গে সবাই চেঁচিয়ে ওঠে,
—কিইই..? গালি দিলি?
তাদের অযথা বকবকে এবার পুলিশ কনস্টেবল এক ধমক দিয়ে উঠে, সঙ্গে সঙ্গে সবাই চুপ। এভাবেই অর্ধেক রাস্তা যেতে গাড়ি জ্যামে আটকা পড়ে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির লাইন যেন তাদের আটকে পড়া অবস্থারই প্রতিচ্ছবি।
তাহিয়ার চোখ বেয়ে পানি গড়াচ্ছে। ফারিন আর মেহরীন তাকে সামলাতে ব্যস্ত। রাফি নখ কামড়াতে থাকে দুশ্চিন্তায়। আর তনিমা, সে যেন পুরো ব্যাপারটা বেশ উপভোগই করছে। কোনো চিন্তাই নেই। হঠাৎ তনিমা আশেপাশে তাকাতে তাকাতে রাস্তার ধারের একটা পোস্টারে চোখ পড়তেই চেঁচিয়ে ওঠে,

—এই দেখে দেখ, সামনে দেখ।
সবাই সেদিকে তাকাতেই চোখে পড়ে একটা পোস্টার। পোস্টারে লেখা,”বিএনপি নেতা, আব্দুল কাদেরকে ভোট দিবে….”
তা পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে তাহিয়া কান্না থামিয়ে বলে,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪১

—এইটাই ওই পার্কের লোকটা না?
একসঙ্গে বাকিরা বলে ওঠে,
—আরে হ্যা…
রাফি হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে,
—এবার বুঝলাম আসল কাহিনি। এর নেট নিয়ে যে হাসিনার গান লাগিয়েছিলাম এই উসুল মনে হয় এভাবে নিয়েছে…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৩