আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৯
suraiya rafa
রাতটা যেন দিগুণ হয়েছে আজ । শেষ হওয়ার নামই নেই। ক্রমশ প্রহেলিকায় মুড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশ। প্রতি মূহুর্তের সেই বুক ধড়ফড় অনুভূতিটাও নিস্তেজ হয়ে মিশে গেছে অমানিশার আঁধারে। ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে শরীর। অথচ এরীশের উৎপীড়িত মস্তিষ্কটা তখনও বিভ্রমে তলিয়ে। মরিচীকার অতল গহ্বরে ডুবে যেতে যেতে ফুরিয়ে এসেছে শক্তি তার । অতীতের বিদগ্ধ স্মৃতি আর আপোষহীন য’ন্ত্রণাগুলো জাদুকরী তৃণলতার মতোই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে তাকে ।
এরীশের অতীত যেন এক চোরাবালির রহস্যদ্বার। বাস্তব তবুও ধোঁয়াসা। এরীশের অস্তিত্বই কেবল জানে বালক অরণ্য থেকে মাফিয়া বস রীশষ্কা হয়ে ওঠার বর্বরতা। যেই নির্মম স্মৃতির অধ্যায় পায়ে পিষ্ট করে বিনাশ করেছে মাফিয়া বস।অথচ আজ আবারও সেই অতীতের ধুম্রজালে আঁটকে পড়েছে অস্তিত্ব তার। একটা মেয়ে!শুধু ওই একটা মেয়ের আগমনে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে এতোবছরের আরাধনা। ভেঙে গেছে স্মৃতির বাঁধ। ওই চোখ , ওই নীল চোখ ,ওই মোহনীয় সরল দৃষ্টি,ঝিলের জলের মতোই টলমলে অশ্রুরুদ্ধ নয়ন দু’টো এতোবছরের আত্মসংযম ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে তার। পাওয়ার, প্রতিপত্তি,অহংকারের দৃঢ়তা সব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ধূলোয় মিশে গিয়েছে।শেষ! সবকিছু শেষ! নিঃস্ব এরীশ ইউভান।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তবুও! হ্যা তবুও, এরীশ ওই মেয়েটাকেই চায়। অরণ্য শুধু ঈশানীকেই চায়। মাফিয়া বস তার সাকুরাকেই চায়। এটাকে কি বলা যায়? অবসেশন! নাকি এ্যাডিকশন! আর কত? আর কতটা সহ্য করলে হবে এই শাপমোচন?
নাকি পৃথিবীর ধরাবাঁধা নিয়মের বেড়াজাল ছিন্ন করে পাপ আর পবিত্রের এই মিলন হেতু নিছক মিথ্যে? সবটাই মরিচীকা! যদি তাই হয় তবে এরীশ সেটাও রুখবে। পৃথিবীকে বুঝিয়ে দিবে তার ক্ষমতা। কুমিরের আর ঠান্ডার ভয় কিসের? সে তো চিরন্তন জলনিবাসী। এরীশও তাই, আজন্মকালের অভিশপ্ত!
অতীতের অতলে ডুবে যেতে যেতে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে এরীশ। অবর্ণনীয় ব্যথায় পিঙ্গলাভ হয়ে উঠেছে তার র’ক্তা’ক্ত মুখ। ফিরে যাওয়ার পাঁয়তারায় ছটফট করছে মস্তিষ্ক, অথচ অদৃশ্য একটা কালো হাত ক্রমশ টেনে নিয়ে যাচ্ছে শরীরটাকে। একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে সে মরিচীকায়। যেখানে আলো নেই, বাতাস নেই, কোথাও কারোর অস্তিত্ব নেই। এরীশের দম বন্ধ হয়ে এলো,একটুখানি অক্সিজেনের তাড়নায় ধড়ফড় করেতে করতে হঠাৎই রুদ্ধ হয়ে এলো শ্বাসপ্রশ্বাস ।
মরীচিকার মতোই ধীরে ধীরে আধারে অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগলো শরীর তার।ঠিক সেই মূহুর্তে অকস্মাৎ কর্কষ এক গোঙানির আওয়াজে ভাবনার অতল থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এলো এরীশ। হাঁপড়ের মতো নিঃশ্বাস ফেলে আলতো নড়েচড়ে উঠলো সে। ব্যথায় জর্জরিত শরীর। মাথার নিচে র’ক্তে’র জোয়ার। সবকিছু উপেক্ষা করে আধো আধো চোখ খুলতেই দৃষ্টি সীমানায় ভেসে উঠলো ঝাপসা দু’টো অবয়ব। চোখের পাতায় নিভু নিভু পলক ছেড়ে আরেকটু ভালোভাবে খেয়াল করতেই বুঝলো অতর্কিত বেদনায় কাতরাচ্ছে জিসান,তার ঠিক মুখোমুখি দণ্ডায়মান তুষার, যার আ”ক্রম’নাত্তক দূর্ধষ হাত আঁটকে আছে জিসানের বাঁকানো গ্রীবায়। বড় সাইজের একটা ড্রা”গ ভর্তি সিরিঞ্জ সাইকোটার ঘাড়ে গুঁজে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সে।
কয়েক মূহুর্ত নীরবে অতিবাহিত হলো, আস্তে আস্তে ঠোঁট বিস্তৃত হলো তুষারের। সিরিঞ্জের সবটুকু ড্রাগ জিসানের শরীরে পুশ করতে করতেই ধ্বনিত হলো তার ঠান্ডা নিরুত্তাপ কণ্ঠস্বর,
— লেট মি ইন্ট্রোডিউস মাই সেলফ। তুষার! দ্যা মাস্টার মাইন্ড তুষার। আমি ম্যানিউপুলেট করিনা, আমি শুধু বোঝাপড়া করি। এরীশ ইউভানের শক্তি আমি। তুষার জাওয়াদকে বাইরে রেখে এরীশ ইউভানকে শেষ করার ইচ্ছেটা একটু বেশিই বারাবাড়ি হয়ে গেলো না?
এই মূহুর্তে কথার চালে ছক্কা হাঁকানোর মতো সামর্থ্য নেই জিসানের। সহসা হুংকার ছেড়ে নিজের আদিবাসী সৈন্যদের আ”ক্রম”ণের আহ্বান দিলো সে। গডফাদারের আদেশে চারিদিক থেকে অস্বাভাবিক বিকৃত উলুধ্বনি বাজিয়ে হইরই করে ছুটে এলো সব।
বিপরীতপ্রান্তে তখন অশনী সতর্কতা। কোনোকিছুর ইঙ্গিত না দিয়েই আচানক গুলি ছুড়ে দুটো গার্ডের হাত থেকে শিকল খুলে দিলো তুষার। ঘটনা এতো দ্রুতই ঘটলো যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো মাফিয়া গার্ড। পরমূহুর্তেই যন্ত্রমানবের ইশারায় একযোগে উঠে দাঁড়ালো সব। হাত বাঁধা অবস্থাতেই প্রস্তুতি নিলো আ”ক্র”মণের।
শরীরের প্রতিটি শিরায় উপশিরায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রা’গের আধিক্যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সব অস্বাভাবিক ভাবে বেঁকে যেতে লাগলো জিসানের। হুড়মুড়িয়ে মেঝেতে পড়ে গেলো হাতের কাছের ক্রীসটা। হঠাৎই মনুষ্যরূপি জম্বির ন্যায় আচরন করতে লাগলো সে। অসহ্য য”ন্ত্রতায় দানবের মতো গজরাতে গজরাতে প্রথমবারের জন্য পিছিয়ে গেলো সে কয়েক কদম।
ঠিক সেই মূর্হুতে ফাঁদের বেড়াজাল ছিন্ন করে দীর্ঘ এক লাফে বেড়িয়ে এলো বোজো। তার শক্ত দাম্ভিক পদক্ষেপে অকস্মাৎ থরথর করে কেঁপে উঠলো পাথুরে মেঝে। চারিদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে সামনে এগুতেই জন্তুটার র”ক্তিম চোখ আর লকলকে জিহ্বা ভেদ করে বেড়িয়ে আসা শ্বদন্ত দেখে ভয়ে তটস্থ হয়ে গেলো সব। হন্যে হয়ে এদিক সেদিক ছুটতে লাগলো ব্রাজিলিয়ান আদিবাসীর দল। সবকিছুকে ছাপিয়ে বোজো এগিয়ে গেলো এরীশের নিকট। শিয়রে এসে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত করুন সুরে ডেকে উঠে মনিবের র”ক্তা’ক্ত শরীর শুঁকতে লাগলো সে । অথচ মাফিয়া বসের ক্লান্তিমাখা চোখ দু’টো তখনও ওই ছোট্ট স্ট্রোলারের মাঝেই নিবদ্ধ।
ওদিকে বোজোর অতর্কিত আগমনে এক মূহুর্তের জন্য অন্যমনষ্ক হতেই ছুটে এসে ধাতব নানচাক্সের চৌকো অংশটা আচানক তুষারের পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো জিসান। মূহুর্তেই ত্বকের আস্তর ভেদ করে শরীরের ভেতর ঢুকে গেলো বস্তুটা, গলগলিয়ে বেড়িয়ে এলো টাটকা র’ক্তে’র স্রোত। হকচকিয়ে উঠলো যন্ত্রমানব, নানচাক্সটাকে প্রতিরোধ করার প্রয়াসে রুদ্ধ হাতে ঠেলে সরালো জিসানকে।
এই পর্যায়ে এরীশের কপাল বেঁকে গেলো। তড়তড় করে সজাগ হয়ে উঠলো মস্তিষ্ক। সমস্ত শারীরিক পীড়া ভুলে ধীরে ধীরে ওঠার চেষ্টায় মরিয়া হলো সে।
ওদিকে নানচাক্সটাকে দু’হাত দিয়ে টেনে ধরে এলোমেলো গতিতে পিছিয়ে গেলো তুষার।ছলছলে ব্যথারুদ্ধ চোখ তুলে সম্মুখে দৃষ্টিপাত করতেই কদাচিৎ স্বরে গা কাঁপিয়ে হেসে উঠলো জিসান। দৈত্যের মতো হাসির ঝঙ্কারে চারিপাশ কেমন থমথমে হয়ে রইলো। হাসতে হাসতেই তুষারের আশ্চর্য দৃষ্টিপানে তাকিয়ে কুটিলতায় ভ্রু নাচালো সে,ঠোঁট নেড়ে আওড়ালো,
— ঠান্ডা মাথায় চাল টা তুমি ভালোই দিয়েছিলে মাস্টার মাইন্ড।বাট ওয়ান মিস্টেক!
যন্ত্রণায় নীলবর্ণ ধারণ করেছে তুষারের মুুখ। তবুও দাঁতে দাঁত পিষে সন্দিগ্ধ চোখে চেয়ে রইলো সে। এ পর্যায়ে রাগে চোখমুখ শক্ত হয়ে আসে সাইকোটার, গ্রীবাদেশে আঙুল বুলিয়ে আর্তস্বরে কঁকিয়ে ওঠে সে,
—ইশশ! এখনো জ্বালা করছে।
পরপরই এদিকওদিক ঘাড় ফুটিয়ে বলে,
— তুমি না জানলেও মাফিয়া বস ঠিকই জানে। দ্যাট, আই হ্যাভ আ রোবোটিক লেগ। যার ফলে হাই পাওয়ারি ড্রাগ আমাকে সাময়িক দূর্বল করে দিলেও পুরোপুরি কাবু করতে পারেনি।
তখনো বাকরুদ্ধ তুষার। শ্বাস টেনে তোলার ক্ষমতা তার নেই। অনর্গল র”ক্তক্ষরণে শারীরিক শক্তি লোপ পাচ্ছে ক্রমশ,অগত্যা উপায়ন্তর না পেয়ে এরীশকে আড়াল করে মেঝেতে বসে পড়লো সে হাঁটু ভেঙে।
জিসান নিঃশব্দে হাসলো। ওষ্ঠের সেই বিস্তৃতি অটুট রেখেই পা টেনে টেনে এগিয়ে গেলো ইয়াশের নিকট।
পদ্মের মতো কোমল চোখ দু’টো একটু একটু নড়ছে। বোধ হয় ঘুম ভাঙছে তার।
তা দেখে ছোট্ট স্ট্রোলারের দিকে মুখ বাড়িয়ে চোখের কোণে পৈশাচিক তৃপ্তি নিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ালো জিসান ,
— এতো শীঘ্রই জেগে উঠছো যে? তোমার ড্যাডি আর আঙ্কেলকে হারিয়ে দিয়েছি, এবার কি তুমি আমার সাথে লড়বে?
— আমি লড়বো!
পেছন থেকে ভেসে আসা অতর্কিত এক নারী কণ্ঠের দাপটে আচানক ঘাড় ঘোরালো জিসান। মশালের জ্বলন্ত আলোয় দেখা মিললো এক রমণীয় অগ্নিমূর্তির। যার অবয়ব জুড়ে অদ্ভুত তেজস্বী ভাব । চোখ দু’টো যেন রহস্যের আঁধার। দূর্বোধ্য সেই রমণী কয়েক কদম এগিয়ে আসতেই ঠোঁট চেপে বিদ্রুপ করে হেসে ওঠে জিসান। এরীশ আর তুষারকে চোখ দিয়ে ইশারা করে কৌতুক স্বরে বলে,
— দেখতে পাচ্ছো কারা বসে আছে এখানে? দ্যা মাফিয়া বস রীশষ্কা। যার ভয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড থরথর কাঁপে।
তারপর মেয়েটার আপাদমস্তক ইশারা করে বলে,
— সেখানে তুমি এক তুচ্ছ রমণী এসেছো আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিতে?
— তুচ্ছ!
পরপর একই শব্দ আওড়ালো মেয়েটা। কথাটা বলতে গিয়ে ঠোঁটের নীড়ে ভেসে উঠলো চাপা হাসির লেশ। পর মূহুর্তেই চাহনিতে উত্তাপ নিয়ে বললো,
— রিয়ানা! আমার নাম রিয়ানা!
তখনই মেয়েটার পাশ ঘেষে এসে দাঁড়ালো বোজো। কুটিল দৃষ্টে কয়েকমূহুর্ত জিসানকে পরখ করলো সে, পরপরই কোনোরূপ পূর্বাভাস ছাড়াই আচানক দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো এককোণে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা সদৃশ সেই মানবের উপর। চোখের পলকে ছিন্নভিন্ন করে ফেললো দেহ তার। যা দেখা মাত্রই ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো জিসান। সংবিৎ ফিরে পেতেই বজ্রাহাতের ন্যায় চিৎকার দিয়ে উঠলো সে,
— আমাররর ভাইইই!
তার করুন দৃষ্টি আগুনের ফুলকির মতো জ্বলে উঠলো। সমস্ত ক্রোধ গিয়ে স্থির হলো বোজোর উপর। তৎক্ষনাৎ আরেকটা নোংরা কৌশল ফলালো জিসান। ধীর পায়ে পিছিয়ে গিয়ে, নীরবে বেজমেন্টের গুপ্ত দরজাটা খুলে দিলো সে। মূহুর্তেই দরজা ভেদ করে শয়ে শয়ে বেড়িয়ে এলো ভূভুক্ষ হিং”স্র ব্ল্যাক প্যান্থার আর জার্মান শেফার্ডের দল ।
হিংস্র জানোয়ার গুলোর তীক্ষ্ণ লোলুপ দৃষ্টি বোজোকে অস্থির করে তুললো। কিছুক্ষণ পরখ করে দানবীয় স্বরে গর্জে উঠলো সে । ক্রোধান্বিত হয়ে ঘোঁ ঘোঁ আওয়াজ করতেই, সবগুলো কুকুর ছুটে এসে ঝাপিয়ে পরলো বোজোর উপর। একের পর আ”ক্র”মন চালিয়ে র”ক্তা”ক্ত করে ফেললো শ্বেতকায় লোমশ বোজোকে। বোজো হিংস্র আর শক্তিশালি দুটোই। তবে শতাধিক হিংস্র প্রানির সঙ্গে পেরে ওঠা তার পক্ষেও সম্ভব নয়। তারউপর ব্ল্যাক প্যান্থার প্রজাতির কুকুর গুলো চিতাবাঘের মতোই দ্রুতগামী।
ফলস্বরূপ চারিপাশ থেকে ধেয়ে আসা স”হিংস থাবায় নাজেহাল হয়ে পড়লো সে। আ”ক্রম”ণের কয়েক মূহুর্ত বাদেই শক্তি হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো বিশালদেহী বোজো। সাদা লোমশ শরীর র”ক্তে লাল হয়ে উঠেলো তার। চোখ মুখের বেহাল দশা, তবুও থামছে ওদের নৃ”শংস’তা। একের পর চালিয়ে যাচ্ছে আ”ক্রমন। এক পর্যায়ে হিংস্র কুকুর গুলো বোজোর উপর এমনভাবে চড়ে বসলো যে ওর শরীরটা অবধি বুঝে ওঠা দ্বায়।
নিজের সবচেয়ে কাছের সহচর, ছোটবেলার সঙ্গী, বিপদের বন্ধুর এই বিধ্বস্ত হাল থেকে ছটফট করে উঠলো এরীশ । প্রথমবারের মতো পরাজিত শোনালো তার কণ্ঠস্বর,
— ফর গড সেক, কুকুর গুলোকে সরিয়ে ফেল জিসান। বাঁচতে দে আমার বোজোকে।
প্রত্যুত্তরে জিসান দাঁত বের করে হাসলো। নিস্পৃহ কণ্ঠে জবাব দিলো,
— ভাইয়ের মৃ”ত্যুর প্রতিশোধ নিবোনা তা কি করে হয়?
— এই মূহুর্তে আমার হাতদুটো খোলা থাকলে বিশ্বাস কর, হৃদপিন্ড ছিঁড়ে আনতাম আমি তোর !
মাফিয়া বস রুদ্ধশ্বাসে কথাটা বলতেই নিটোল পায়ে ওর দিকে এগিয়ে আসে জিসান। ঘাড়টাকে সামান্য কাত করে বিগলিত হেসে জবাব দেয়,
— যদি আমিও এই একই কাজ করি, তাহলে কেমন হয়?
কথাটা বলতেই ওপাশ থেকে গুলি ছোড়ে রিয়ানা। ছুটে আসা বুলেটের সংঘর্ষে ছিন্ন বিছিন্ন হয় ধাতব শেকলের বাঁধন। সঙ্গে সঙ্গে গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায় এরীশ। চোখের মাঝে হানা দেয় আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। একদিকে ঘুমন্ত ছেলে অপর দিকে আদরের বোজোর ছিন্নভিন্ন দেহ, আর পরিশেষে পায়ের কাছে হাঁটুমুড়ে বসে থাকা মূমুর্ষ তুষার। ঝাপসা চোখে চারিদিকে একনজর পরখ করে জিসানের দিকে ঘুরে তাকালো সে। হাত বাড়িয়ে প্রথমে ডান পায়ের তীরটাকে টেনে বের করলো। চামড়া মাং”স ছিঁ”ড়েখুঁড়ে বেড়িয়ে এলো সেটা। একইভাবে বাম পায়েরটাকেও বের করলো এরীশ। অসহনীয় তীব্র এই যন্ত্রণার পরেও ব্যথাহীন পাথুরে তার মুখ।
অনুভব শক্তি লোপ পেয়েছে যেন। দৃষ্টি জুড়ে কেবল প্রতিহিংসার দাবানল। জিসান সেদিকেই তাকিয়ে ছিল,হঠাৎই তার চোখের চাহনিতে ঝলসে উঠল বুক।
এক মূহুর্তের জন্য নিজেকে আবিস্কার করলো এরীশের আগ্রাসী কবলের নিচে। পরক্ষনেই বিভ্রম থেকে বেড়িয়ে আচানক আ”ক্রম”ণ করলো সে। পারদর্শী হাতে নানচাক্স টাকে ছু’ড়ে দিতেই শান্ত শীতল অথচ অপ্রতিরোধ্য ভঙ্গিতে সেটাকে রুখে দিলো মাফিয়া বস। জোরালো হাতে ঘুরিয়ে এনে শয়তানটাকে কব্জাবন্দী করতেই নিজের রোবটিক পা দিয়ে এরীশের হাঁটু বরাবর প’দাঘা’ত করলো জিসান। আহত এরীশ পিছিয়ে গেলো, খুলে দিতে বাধ্য হলো হাতের বাঁধন। জিসান পেছনে ঘুরে আবারও একই ভঙ্গিতে আ”ঘাত করবে, ঠিক তখনই কোমরের ফাঁক থেকে বের করে তরল জাতীয় কিছু একটা জিসানের মুখের উপর ছু’ড়ে মা’রলো রিয়ানা। সঙ্গে সঙ্গে ওই অবস্থাতেই ঠান্ডা বরফের মতোই জমে শক্ত হয়ে গেলো তার মুখ।
এতোক্ষণে তুষার এরীশ একযোগে দৃষ্টি ঘোরালো রিয়ানার পানে। সেই অবস্থাতেই তীক্ষ্ণ স্বরে বিড়বিড়িয়ে স্বগোতক্তি করলো তুষার,
— লিকুইড নাইট্রোজেন!( যেকোনো কিছুকে জমিয়ে বরফের মতো শক্ত বানিয়ে দেয়)
দু’ভাইয়ের আশ্চর্য দৃষ্টির মুখোমুখি হয়েও বিন্দুসম ভাবাবেগ দেখা গেলো না রিয়ানার মাঝে । তার অভিব্যক্তি দূর্বোধ্য। চাবুকের মতো ধারালো দৃষ্টিজুড়ে দুঃসাহসী দ্রীপ্তি। কোনোরূপ বাক্যব্যয় ছাড়াই বাম হাতের চাপাতিটা ছুঁড়ে দিলো এরীশের নিকট। দক্ষ হাতে সেটাকে ক্যাঁচ ধরলো মাফিয়া বস। তারপর অশনি প্রলয়ের মতোই একপা একপা করে এগিয়ে যেতে লাগলো নিস্ক্রিয় জিসানের নিকট।
ওদিকে অন্যহাতের রিভিলবার দিয়ে আদিবাসীদের আ’ক্রম’ণ প্রতিহত করতে করতেই রিয়ানা এগিয়ে গেলো তুষারের নিকট। ওর মুখোমুখি হয়ে বসে নির্লিপ্ত গলায় বললো,
— টেইক আ ব্রেথ।
শ্বাস টেনে হতাহতের মতো তাকিয়ে রইলো তুষার।
ঠিক তখনই ওর পেট থেকে নানচাক্সের অংশটা টেনে বের করলো রিয়ানা। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মানবের ব্যথাক্লিষ্ট শরীর। দাঁতে দাঁত চেপে আর্তনাদ সংবরণ করলো তুষার। পারলোনা চোখের চাহনি দিয়ে আদিবাসী মেয়েটাকে ভস্ম করে দিতে। তীব্র ব্যথাটা খানিক কমে এলে কিয়ৎক্ষণের নীরবতা ভেঙে হুশিয়ারি ছুড়লো সে,
— ডোন্ট টাচ মি।
— এই মূহুর্তে টাচ না করলে তোমার মৃ’ত্যু’র আশংকা রয়েছে। সো আই ক্যান্ট হেয়ার ইউ্য।
জোরপূর্বক হেসে প্রত্যুত্তর করলো রিয়ানা। তুষার বিদ্রুপ করে বললো,
— মানুষকে বাঁচানের দ্বায়িত্ব নিয়েছো বুঝি?
— আমি শুধু বাঁচাইনা, মা”রি ও!
কথাটা বলতে হঠাৎই অন্যমনস্ক হয়ে গেলো রিয়ানা। পরপরই ভাবনা থেকে বেরিয়ে জিসানের দিকে একপল নজর বুলিয়ে একহাতে তুষারের ক্ষ”তস্থান চেপে ধরে অন্য হাতদিয়ে একটা বোতলের ছিপি টেনে খুললো সে। অতঃপর হাত সরিয়ে সেখানটায় এ্যালকোহল ঢালতে ঢালতে বললো,
— আমি প্রতিশোধ নিতে এসেছিলাম। নেওয়া শেষ, অতএব, আর কাউকে মা”রা”র প্রশ্নই ওঠে না।
— প্রতিশোধ!
নিস্পৃহ গলায় বিড়বিড়ালো তুষার। রিয়ানা আর জবাব দিলো না, মোটা গজের সাহায্যে ক্ষতটাকে ব্যন্ডেজে মুড়িয়ে দিয়ে দায়সারা গলায় বললো,
— হয়ে গেছে।
কথাটা বলে রিয়ানা সরে যেতেই তুষারের দৃষ্টি প্রগাঢ় হয়ে উঠলো। বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের ন্যায় সে তাকিয়ে রইলো সম্মুখে। তুষারের হতাহত দৃষ্টি অবলোকন করে রিয়ানা নিজেও ঘাড় ঘোরালো চকিতে। আর যা দেখলো, তাতে নয়ন বিস্ফারিত হয়ে উঠলো তার।
ওদের থেকে কয়েক হাত দূরেই শয্যায়িত আধম’রা জিসানের উপর ঝুঁকে কাঁটারি দিয়ে মাং”স কা”টার মতোই ঠাস ঠাস করে ওর বুকের প্রতিটি হা”ড় চা”পাতি দিয়ে কাটছে এরীশ । হাড়গোড় কেটে যখন হৃদপিণ্ডের হদিস পেলো, তৎক্ষনাৎ দু’হাত ঢুকিয়ে দিলো ওর র”ক্তা”ক্ত বুকের ভেতর। মুরগী ছিঁ”ড়ে ফেলার মতোই বুকের পাঁ”জ’র ছিঁড়ে সরিয়ে অতর্কিত থাবায় খা”ম’চে ধরলো ওই স্পন্দিত মাংসপি”ণ্ডখানি। ম”রণযন্ত্র”নায় ঘোঁ ঘোঁ আওয়াজ করে উঠলো জিসানের কণ্ঠনালি। তাতেও ভ্রুক্ষেপ নেই মাফিয়া বসের।
তার চোখের তারায় ঝলসানো দ্যুতি। মনুষ্যত্বের লেশমাত্র নেই, আছে কেবল জানো”য়ার স্বরূপ পা’ষবি’ক হিং”স্রতা। ওর ভ’য়াব’হ আগ্রাসী চোখ দু’টো দেখে মনে হচ্ছে ও পারলে জিসানকে আজন্মকাল বাঁচিয়ে রেখে প্রতি মূহুর্তে এভাবেই নর”ক য”ন্ত্রণা দিতো। কিন্তু আফসোস! জীবন মানুষের একটাই, যা হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাবার রাস্তা নেই।
ধিকধিক করে নড়তে থাকা ওই মাং”সপি”ণ্ড দেখেই কপাল গোছালো এরীশ। মেজাজ খারাপ হলো তার। সেই সঙ্গে অদ্ভুত এক স্পৃহা চেপে বসলো অন্তরে। আজ আবারও মনুষ্য মাং’সে’র গন্ধে অতীতের লোভাতুর সত্তাটা ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তার ভেতর ।
সময় নষ্ট করলো না এরীশ। প্রতিশোধের তাড়নায় দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে জোড়ালো টানে শরীরের ভেতর থেকে ছিঁ’ড়েখুঁ’ড়ে বের করে আনলো জিসানের হৃ’দপিণ্ড’টা। ছলকে আসা র’ক্তে’র ছাপে মুখাবয়ব সিক্ত হলো তার। র”ক্তে রঞ্জিত হলো সিল্কশার্ট।
অথচ চেহারায় নিদারুন নির্লিপ্ত ভাব। নেই কোনো অনুশোচনা আর নাতো উদ্বেগ। যেন মাং’সা’শী এক ভ’য়ং’কর ন’রখা’দক।তেমন করেই চলমান হৃদপিণ্ডটাকে হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে তৃপ্তিতে উল্লাস করে উঠলো সে। ফের ক্রোধের তাড়নায় থরথর কেঁপে উঠলো অস্তিত্ব তার।
এহেন ভয়াবহ দৃশ্য দেখে বেজমেন্টে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে নিস্ফল নয়নে তাকিয়ে আছে মাফিয়া বসের পানে। তার নীরব উল্লাসে শিউরে উঠছে গা। আজ বহুদিন বাদে আসল ব্লাডিবিস্টকে দেখতে পেলো তুষার। যাকে নিজ হাত মনস্টার বানিয়ে ছিল স্বয়ং তারই জন্মদাতা। একসময় যার পছন্দের আহার ছিল শুধুই মা”নুষে’র কাঁ’চা মাং’স। আজ আবারও জেগে উঠেছে সেই পৈশাচিকতা, দিগ্বিদিক হারিয়ে প্রতিশোধের তাড়নায় জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে মাফিয়া বস,ভুলে গিয়েছে বাস্তবতা। সেই পৈশাচিক স্পৃহা থেকেই মুখ বাড়িয়ে তরতাজা হৃ”দয”ন্ত্রটাতে কামড় বসাতে উদ্যত হয় সে, ঠিক তখনই শ্রবণেন্দ্রিয় ভেদ করে অবুঝ শিশুর ভাঙা ভাঙা ক্রন্দন। তৎক্ষনাৎ মতিভ্রম থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এলো এরীশ। সৎবিৎ ফিরে এলে পাশ ঘুরে তাকাতেই দেখলো ঠোঁট উল্টে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ছেলে তার। একটুখানি উষ্ণ আলিঙ্গন, একটু নিরাপত্তার জন্য ছটফট করছে কোমল প্রাণ।
কে জানে কতক্ষণ ধরে মায়ের সান্নিধ্য পায়নি, একটুখানি খাবার খায়নি। ক্রন্দনরত ছেলের ছোট্ট কোমল মুখটাকে পরখ করা মাত্রই হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো এরীশের পৈশাচিক অভিব্যক্তি। দ্রবীভূত হলো অন্তর। অশুভ চোখ দু’টো নিমেষেই পিতৃস্নেহে টলমল করে উঠলো তার । তৎক্ষনাৎ হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দিলো জিসানের ক্ষতবিক্ষত হৃ”দপি’ণ্ডটা।
অতঃপর ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে র’ক্তমাখা হাতেই অতি সন্তোর্পনে বুকে তুলে নিলো অস্তিত্ব তার। বুকে কোনো উষ্ণতা।নেই আদুরে প্রশ্রয়। তবুও সেই প্রসস্থ বুকে মাথা রাখা মাত্রই শান্ত হয়ে গেলো অবুঝ প্রাণ। একনজর জন্মদাতাকে পরখ করে ফের বড় বড় চোখ মেলে এদিকওদিক চাইলো সে। মায়ের খোঁজ করছে বোধ হয় বাচ্চাটা। অচিরেই ছেলেকে বুক থেকে মুখের কাছে তুলে আনলো এরীশ, আজ দ্বিতীয়বারের মতো চুমু খেলো ওই আদুরে ললাটপটে। অতঃপর কণ্ঠ খাদে নামিয়ে পরাজিত সৈনিকের মতোই বারবার বলতে লাগলো,
— আ’ম স্যরি, আই ক্যান্ট প্রটেক্ট ইউ্য,ড্যাডি ক্যান্ট প্রটেক্ট ইউ্য। আ’ম স্যরি চ্যাম্প, ড্যাডি ইজ সো স্যরি।
এরীশের ভাঙা কণ্ঠের আহাজারিতে নদীর পাড় ভাঙার মতোই ভাঙলো তুষারের বুক। চেহারা তার বরাবরেরই মতোই নির্লিপ্ত, অথচ চোখ দু’টো যেন নীরব হাহাকারের বিভীষিকা।
এরীশ আবারও ছেলেকে গুটিয়ে নিলো বুকের ভেতর ।তারপর বিধস্ত নয়নে দৃষ্টিপাত করলো র”ক্তা”ক্ত মেঝেতে নিথর হয়ে পরে থাকা মৃ’ত নেকড়েটার দিকে। এটা বোজো, এরীশের বোজো। জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এই সহচরকে ভাগ্যের পরিহাসে সেই ছোট্ট বেলায় পেয়েছিল এরীশ, আর আজ কতটা নির্মম ভাবেই না হারিয়ে ফেললো। এরীশের হয়ে লড়তে লড়তে অবশেষে এই পৃথিবী ছাড়লো সে। আর আসবে না বোজো। কোনোদিন পায়ের কাছে ঘেষে নেউটে বিড়ালের মতো লেজ নাড়বে না। মিশনের সময় সঙ্গ দিবেনা, বিপদে ঢাল হবে না। ফিরবে না আর সে, কোনোদিনও না!
ইয়াশকে কোলের মধ্যে নিয়েই পরাস্ত কদমে বোজোর দিকে এগিয়ে গেলো এরীশ। অতঃপর হাঁটু গেড়ে বসে ওর র’ক্তা’ক্ত লোমশ শরীরটাতে হাত বুলিয়ে দিলো শেষবারের মতো। নিস্তেজ ফ্যাকাসে চোখের পাতায় নীরবে হাত ছুঁয়িয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
— ভ্রাভো! ইউ ডিড গ্রেট টুডে। নাও রেস্ট ইন পিচ!
রাতের অন্তিম প্রহরেও অবিরাম তুষারপাত হচ্ছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মতোই চলছে তার অক্লান্ত বর্ষন। অমানিশার আকাশটা পাতালপুরীর মতো অন্ধকার। আধার রজনীর সেই গা ছমছমে অন্ধকার ফুঁড়ে হাসপাতালের করিডোরে এসে দাঁড়ালো এক অবয়ব। শরীর তার র”ক্তেভিজে একাকার, পরিধেয় বসন থেকে চুয়িয়ে চুয়িয়ে পড়ছে রঞ্জিত ধারা।পিঠের কাছটায় আড়াআড়ি ভাবে দু’টো দগদগে ক্ষত, র’ক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে গেছে সেখানটায়, পায়ের গতি ধীর, শান্ত। হাঁটতে পারছে না ঠিক করে। দেখে মনে হচ্ছে এই মাত্রই র”ক্তপুকুরে স্নান সেরে এসেছে সে।
এটা একটা প্রাইভেট ক্লিনিক। মাতভেইয়ের অধীনে পরিচালিত। তারউপর মাফিয়া বস সিলগালা করে দিয়েছে পুরো এরিয়া। চেনা পরিচিত মানুষ ব্যতীত হসপিটালের এরিয়ার মধ্যে জনসাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। ফলস্বরূপ নিস্তব্ধ জনমানবশূন্য চতুর্দিক। রাত বাতির আলোছাঁয়ায় অজানা এক নিঃসঙ্গতা খেলা করছে সমগ্র করিডোর জুড়ে। সেই নিঃসঙ্গ আলোছায়াকে পেছনে ফেলে ভারী ক্লান্ত পদচ্ছাপে সামনে এগুলো আগন্তুক। যেতে যেতেই বড্ড অনীহা নিয়ে ছুড়ে ফেললো হাতে থাকা র’ক্তা’ক্ত চাপাতিটাকে। অন্য হাতের রিভলবারটা তখনও হাতেই ছিল।
করিডোরের শেষ মাথায় গিয়ে থমকালো তার পদক্ষেপ। অবশেষে গন্তব্যে পৌছালো সে। পাশ ঘুরে দরজার আগল ঠেলে নীরবে ঢুকে পড়লো একটা কাঁচ আবৃত কেবিনের ভেতর। মাফিয়া বস ঢুকতেই ভেতরে উপস্থিত নার্স দু’টো মাথা নুয়িয়ে তাকে সম্মান প্রদর্শন করে হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে গেলো কেবিন থেকে । এরীশ শূন্য চোখে তাকালো একপল, তারপর দৃষ্টিঘুরিয়ে এগিয়ে গেলো সম্মুখে।
ওই তো ঈশানী। অসার, রিক্তশূন্য হয়ে বেডের উপর শুয়ে আছে। দু’হাতে তার অসংখ্য ছোট বড় ব্যান্ডেজ, কপালেও তাই। মুখের উপর অক্সিজেন মাস্ক। অবজারভেশন মনিটর থেকে ভেসে আসা হৃদস্পন্দনের টিপ! টিপ! শব্দটা যেন সোজা গিয়ে এরীশের বুকে বিঁধছে । মনে হচ্ছে জন্ম জন্মান্তরের দূরত্ব ওদের ৷ এই দূর্রত্ব সহ্য হয়না এরীশের। অসহ্য লাগে ভীষণ। হৃদয় ছটফট করে । অনুতাপের স্ফুলিঙ্গে বিদগ্ধ হয় মাফিয়া বস। ধীরে ধীরে মানবীর শিয়রে গিয়ে দাঁড়ায় সে। র’ক্ত মাখা ক্লান্ত শরীরটা একটুখানি ঝুঁকে পড়ে, রমণীর ফ্যাকাশে নিস্প্রাণ চেহারার প্রতিটি স্তরে ঘুরেফিরে দৃষ্টি গিয়ে স্থির হয় তার নিস্পন্দ নয়নে। ক্ষণকালের নির্লিপ্ততা ভুলে কানের কাছে অধর ছুঁয়িয়ে হিসহিসিয়ে ডেকে ওঠে এরীশ,
— প্রেম আমার! আমি এসেছি, তোমার অরণ্য, একবার দেখবে না?
নিস্তেজ ঈশানী তখনো আত্মমগ্নতায় বিভোর। চোখ খোলেনা সে। একই সুরে আবারও ডেকে ওঠে এরীশ ,
— আমি প্রতিশোধ নিয়েছি। তোমার একমাত্র ভয়, সুইট ডেমোনের অস্তিত্ব আমি চিরতরে পৃথিবী থেকে মুছে দিয়েছি। ও আর আসবে না তোমাকে ভয় দেখাতে, কোনোদিনও না।
বিপরীত প্রান্তে তখনো নিঃশব্দতা বিরাজমান। এরীশ গ্রীবা তুললো এবার ,রমণীর পেলব কপালে অধর ছুঁয়িয়ে অবুঝের মতো বললো,
— জান! মে আই কিস ইউ্য ওয়ানস ? বিলিভ মি একটুও কষ্ট দিবো না। জাস্ট ওয়ানস! ওকে?
এরীশ ইউভান বরাবরই বেপরোয়া নিয়ন্ত্রণহীন। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। অনুমতির ধার সে ধারলো না সে । আলতো হাতে অক্সিজেন মাস্কটা সরিয়ে সাকুরার বিবর্ণ মুখের পানে চেয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন। পরপরই কোনোরূপ ইঙ্গিত ব্যতীত অতৃপ্ত ঠোঁট জোরা চৌম্বকের মতোই গিয়ে আঁচড়ে পড়লো রমণীর শুষ্ক পুরন্ত ঠোঁটের ভাঁজে। তৃষ্ণার্থ চাতকের মতো কয়েক মূহুর্ত মাতকীয় ঘোরে ডুবে রইলো মানব। রুগ্ন সরলতার ওষ্ঠপুটে অবাধে বিচরণ চললো তার ।রুক্ষ ওষ্ঠাধর আদরে আদরে সিক্ত হয়ে উঠলো। ঠিক যেন প্রথম প্রেমের উষ্ণ আলিঙ্গন।
কিন্তু যেই মূহুর্তে অনুভব করলো মেয়েটা সামান্য নড়ে উঠেছে, তখনই যেন ভাবোদয় হলো। নিজস্ব অনুভবে লাগাম টানলো মাফিয়া বস । দৃষ্টি তুলে তাকাতেই দেখলো ক্ষীণ চোখ মেলে ওকেই দেখছে মেয়েটা । গভীর সমুদ্রের মতো নীলাভ নয়ন জোড়া কেমন ধূসর নিস্ক্রিয় দেখাচ্ছে। যেন চোখের তারায় প্রাণ নেই। এরীশ এক নজর পরখ করলো মেয়েটাকে। দেখতে গিয়েই কথা বলার শক্তি লোপ পেলো তার। অথচ কিছু একটা বলার উদ্বেগে অস্থির হয়ে আছে হৃদপিঞ্জর। একটু সময় নিলো এরীশ।
ক্ষণকালের সেই নৈঃশব্দ্য ভেদ করে জিভের ডগায় গাল ঠেললো সে । লম্বা শ্বাস টানলো, পরপরই ধ্বনিত হলো তার অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠস্বর ,
— আই লাভ ইউ্য! আই লাভ ইউ্য সাকুরা। মোর দ্যান এনিথিং। ইউ্য হেয়ার মি রাইট? আই লাভ ইউ্য!
নিজের প্রেমিক সত্তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে করতেই দু’হাতের অঞ্জলিতে ঈশানীর চিবুক আঁকড়ে ধরলো এরীশ।
ঈশানীর জীবনের বহু আকাঙ্ক্ষিত বাক্য এটি অথচ মুখ ফুটে প্রত্যুত্তর করার শক্তি কিংবা সামর্থ্য কোনোটিই তার মাঝে অবশিষ্ট নেই। চোখ ছাপিয়ে কেবল একফোঁটা বেদনাশ্রু গড়ালো রমণীর। পরিতৃপ্ত চাহনিতে সে দৃষ্টি রাখলো অরণ্যর দু’চোখে।
কয়েক মূহুর্ত সেভাবেই অতিবাহিত হলো, শুধুমাত্র চোখের মেলবন্ধনে ডুবে রইলো দু’জন। তারপর কি জানি কি হলো, আচমকা লম্বা একটা শ্বাস ফেললো ঈশানী। তারপর আরও একটা। এরপরই হঠাৎ পাল্টে গেলো অভিব্যক্তি। চোখের পলকে ছটফট করে উঠলো শরীর তার । বেড়ে গেলো শ্বাসপ্রশ্বাস। দম বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো। এরীশের বাহুবন্ধ থাকা অবস্থাতেই অদ্ভুত ভাবে হাত-পা ছুঁড়তে লাগলো রমণী। যেন ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, তেমন ভাবেই দুহাতে বেডশিট খামচে ধরে হোঁচট খেতে লাগলো এপাশ ওপাশ।
এহেন দৃশ্য দেখা মাত্রই এরীশের কলিজা কেঁপে উঠলো। প্রকম্পিত হাতে ঈশানীর চিবুক ছুঁলো সে। অস্থির হয়ে শুধালো,
— কি হয়েছে? জান কষ্ট হচ্ছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে?
প্রত্যুত্তর করার মতো ফুরসত নেই ঈশানীর। অযাচিত য’ন্ত্রণায় গ”লাকাটা মুরগীর মতোই ধ’ড়ফ’ড় করতে লাগলো মেয়েটা । শরীর তার অদ্ভুত রকম গরম হয়ে উঠলো। সমস্ত ত্বক ঝলসে যাবে যেন। দফায় দফায় ছটফটানির মাঝেই হুট করে নাকমুখ চিঁড়ে গলগল করে র’ক্ত বেড়িয়ে এলো ঈশানীর । এরীশের দু’হাত ভরে উঠলো। বাকরুদ্ধ হয়ে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো সে প্রেয়সীর র’ক্তরঞ্জিত দিশেহারা মুখের পানে। যেন কথা বলতে ভুলে গিয়েছে ,সেই সঙ্গে ভুলেছে সমস্ত অনুভব।
রমণীর গমরঙা ত্বকের আকর্ষনীয় রং ক্রমশ নীলবর্ণে ছেয়ে গেলো। অজস্র দুশ্চিন্তার মাঝেই গলা ফেঁড়ে ডাক্তার আর নার্সকে ডাকতে লাগলো এরীশ। তন্মধ্যেই হঠাৎ থেমে গেলো ছটফটানি, অকস্মাৎ নিস্তেজ হয়ে গেলো মোমঢালা নরম পা দু’টো। তারপর স্রোত তরঙ্গের ন্যায় হঠাৎ এক ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেলো সমস্ত শরীর। পরিশেষে পশ্চিম আকাশে অস্তমান সূর্যের মতোই ধীরে ধীরে বুঁজে গেলো তার নীলাভ নিখাঁদ দু’নয়ন।
এরীশের মনে হলো ঈশানীর খুব গরম লাগছে, এই কাচ আবৃত বদ্ধঘরে বোধহয় দম বন্ধ হয়ে আসছে সাকুরার। সহসাই তড়িৎ হাতে ঈশানীর শরীরের স্যালাইন,ক্যানোলা, আইভি লাইন,পালস অক্সিমিটার সবকিছু টেনেহিঁচড়ে খুলে ফেললো সে। অতঃপর রমণীর নিস্তেজ শরীরটাকে পাঁজাকোলা করে ছিটকে বেড়িয়ে এলো কেবিন থেকে। বাইরে বেড়িয়ে খুব বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারলো এরীশ। অজস্র আ’ঘা’তে ভরপুর ক্ষ’তবি’ক্ষত শরীরটা সায় দিলোনা তার কৃতকর্মে। ফলস্বরূপ করিডোরের মেঝেতেই ঈশানী সমেত হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো এরীশ । একটু সময় নিয়ে মেয়েটাকে আলগোছে শুয়িয়ে দিলো মেঝেতে। মাথাটা তুলে রাখলো স্বীয় উরুর উপর।
চারিদিকের তুষার ভেজা কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় নিমেষেই জমে গেলো শরীর। অথচ ঈশানীর বিন্দুসম ভ্রুক্ষেপ নেই তাতে, নেই কোনো তোড়জোড়। সে আগের মতোই শুয়ে আছে স্বামীর কোলে। এরীশ নিজের ঠান্ডা হাতটা ওর গালে ছোঁয়ালো এবার, হালকা ঝাঁকিয়ে নরম স্বরে ডাকলো,
— সাকুরা! এ্যাই সাকুরা! ভালো লাগছে এবার? দেখো ঠান্ডা পড়ছে, তোমার ফেবরেট স্নোফল। এ্যাই মেয়ে চোখ খোলো! দেখছো না কেন!
ঈশানীকে ডাকতে ডাকতেই এরীশের কথা জড়িয়ে আসে। মেয়েটার এমন নির্লিপ্ততায় ভীষণ রেগে যায় ও। তৎক্ষনাৎ ধ্বনিত হয় মাফিয়া বসের ক্রোধান্বিত কণ্ঠস্বর,
— আমাকে রাগিও না একদম । মে’রে ফেলবো কিন্তু । ইউ্য নো না?দ্যাট আই হেইট প্র্যাঙ্ক। তবুও কেন এমন করছো?
হতাশ হয়ে থামলো একটু, ফের নতুন উদ্যমে ছুড়ে দিলো হুংকার,
— ফাক! স্পিক আপ! ঈশানী স্পিক আপ!
জীবনে প্রথমবারের মতো ঈশানীর নাম ধরে গর্জে ওঠে এরীশ। তবুও সেই রমণী বাক্যহীন।নির্জীব অসার হয়ে ভেঙেচুড়ে এরীশ কোলের কাছেই পড়ে আজ তার শরীর। এহেন দৃশ্যে উন্মাদ হয়ে উঠলো মাফিয়া বস। বুকের ভেতরটা ফাঁকা লাগছে ভীষণ, দম বন্ধ হয়ে আসছে। প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝেও ঘেমে-নেয়ে একাকার হলো শরীর। অ’গ্নিদ’গ্ধ পতঙ্গের মতোই অস্থির হয়ে উঠলো এরীশ।উথাল-পাথাল ভাবনার অতলে হারিয়ে গেলো নিজস্বতা। আজ বহুবছর বাদে চোখ দু’টো জলে পরিপূর্ণ হলো তার । এরীশ ব্যগ্র আওয়াজে বললো,
— তুই বলেছিলি না আমার সাথে থাকবি? আমার সঙ্গে ফেরারী হবি? গোটা পৃথিবী হারিয়ে গেলেও তুই আমার হয়েই থাকবি? তাহলে এখন কেন কথা বলছিস না? কেন চোখ খুলছিস না? হোয়াই ক্যান্ট ইউ্য স্পিকআপ ড্যামইট!
এতো চিৎকার, এতো আহাজারির পরেও একটা টুঁশব্দ ও করলো না মেয়েটা। শুনলো না সে মাফিয়া বসের আকুতি, অবাধ্যের মতোই শুয়ে রইলো নিঃশব্দে । এরীশ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।ফের ভেসে এলো তার আর্তচিৎকার,
— তুইও বেঈমানী করলি? তোর জন্য সব ছাড়লাম,আর তুই আমাকে ছেড়ে গেলি। এভাবে নিঃস্ব করে দিলি আমায়! এভাবে! এর চেয়ে সহজ কিছু ছিলনা?ছু’রি দিয়ে বুকটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিতিস, নয়তো গু’লি করে মা”রতিস। এভাবেই কেন ঈশানী! হোয়াই!
নিস্তব্ধ রাতের হাহাকার যেন করিডোরের চতুর্দিকে প্রতিধ্বনিত হলো। উন্মাদ মস্তিষ্ক খেই হারালো এরীশের। আবারও ধ্বনিত হলো সেই কাতর স্বীকারোক্তি,
— ঈশানী আই লাভ ইউ্য!
ভীষণ কাতর শোনালো তার দাম্ভিক গর্জন। স্বার্থপর ঈশানী প্রত্যুত্তর করে না তবুও । মাফিয়া বসের এহেন নমনীয়তা দেখে উৎকন্ঠায় হেসে ওঠে না। তার পেলব চেহারা ক্রমশ বিবর্ণ হয়ে উঠেছে । এরীশ আর মেনে নিতে পারলো না এই নির্জীবতা। প্রচন্ড মানসিক চাপে মস্তিষ্কটা ফেটে পড়লো তার। অগত্যাই এদিকে ওদিকে না চেয়ে রিভলবারের ট্রিগার টেনে সোজা তুলে ধরলো নিজের কপালে। হিতাহিতজ্ঞান শূন্য হয়ে দুনিয়ার সকল আক্ষেপ নিয়ে চিৎকার করে বাক্য ছুড়লো,
— দিসসস ফাকিং লাভভভ!
ঠাসসসস!
অতঃপর বহুক্ষণের সেই নৈঃশব্দ্য ভেদ করলো পরপর দুটো গুলি ছোড়ার বিকট আওয়াজ। এরীশ একজন দক্ষ স্নাইপার। তার নিশানা ভুল হবার নয়। সহসাই বুলেট দু’টো কপাল বিদীর্ণ করে সোজা ম’স্তি’ষ্কে ঢুকে গেলো তার।
ফুরিয়ে যাওয়া প্রদীপশিখার মতোই দপ করে নিভে গেলো অন্তরের ঝড়।
নিস্তব্ধ রাতে ঝাঁঝালো গুলির আওয়াজে থরথর করে কেঁপে উঠলো পুরো হসপিটাল। ততক্ষণে ডাক্তার নার্স সব দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে ছুটে এসেছে টপ ফ্লোরে। করিডোরে জড়ো হতেই সকলে একসঙ্গে মুখোমুখি হলো সেই ম”র্মা’ন্তিক দৃশ্যের।
সমগ্র মেঝেতে র’ক্তে’র জোয়ার। ঠিক তার মাঝখানে একটা নিস্তেজ রমণীয় শরীরের উপর ভগ্ন ইমারতের মতোই ধীরে ধীরে ধসে পড়ছে এক পুরুষালি র’ক্তা’ক্ত শরীর। পুরুষটি আর অন্য কেউ নয়,স্বয়ং মাফিয়া বস রীশষ্কা!
পাইথন লিডার এরীশ ইউভানকে এমন বিধ্বস্ত নিথর হয়ে পরে যেতে দেখে সকলের নিঃশ্বাস আঁটকে গেলো। মূহুর্তটা যেন ওখানেই থমকে গেলো।
কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের ব্যবধানে এরীশের নিথর শরীরটা লুটিয়ে পড়লো ঈশানীর নরম বুকের উপর। নিভু নিভু ঝাপসা চোখে প্রেয়সীর মুখটাকে শেষবারের মতো দেখে নিলো মাফিয়া বস।নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। আসন্ন মৃ’ত্যু’র এক অভাবনীয় য’ন্ত্রণায় ছটফট করছে শরীর। তখনও নিজের উপর নিদারুন উপহাস করে হাসলো মানব। মনেমনে আওড়ালো,
— কোনো এক বি’ধ্বং’সী দুপুরে তুমি বলেছিলে আমার দূর্বলতাই আমাকে ধ্বং”স করে দিবে , নিঃশেষ করে ছাড়বে আমায়। আজ তাই হলো, আমার দূর্বলতা আমাকে ভেঙেচুরে নিঃশেষ করে দিলো। সমগ্র দুনিয়া থেকে চিরতরে মুছে গেলো আমার অস্তিত্ব। কেবল দূর্বলতার জন্যই ধ্বং’স হয়ে গেলো মাফিয়া বস। অবশেষে জিতে গেলে তুমি সাকুরা! জিতে গেলো তোমার অভিশাপ!
নিজের র’ক্তমাখা হাত বাড়িয়ে রমণীর শীর্ণ হাতটাকে মুঠোবদ্ধ করে নিলো এরীশ। মুখাবয়ব জুড়ে ভেসে উঠলো পরিতৃপ্ত শীতল ছাঁয়া। অতঃপর ধীরে ধীরে আঁধার নেমে এলো তার দুচোখের পাতায়। বুক চিঁড়ে বেড়িয়ে গেলো ফাঁকা এক দীর্ঘশ্বাস।
তুষারের অপারেশন শেষে শীঘ্রই অটি থেকে বেড়িয়ে টপফ্লোরের দিকে ছুটে এসেছে মাতভেই। এখানে এসে সামনের দৃশ্য দেখা মাত্রই পিলে চমকে গেলো তার। এভাবে চোখের সামনে শেষ হয়ে গেলো দুটো মানুষ অথচ আশেপাশে কেউ ছিলনা এতো অসম্ভব!
হতাহতের মতো চারিদিকে চেয়ে নার্সগুলোকে ডাকলো সে প্রথমে। কয়েকজন মাথা নত করে এগিয়ে আসতেই অস্থির হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো সে,
— অপারেশন সাকসেসফুল হওয়ার পরেও এতোকিছু হলো কি করে? কোথায় ছিলে তোমরা সব?
অনেক মাফিয়ারাই আহত হয়েছে আজ, যার দরুন সবাই ব্যস্ত সময় পার করছিল। তারউপর শেষরাত হওয়ায় কেবিনের নার্স দু’টোর চোখ লেগে এসেছিল খানিক । কিন্তু এরীশ যখন করিডোর থেকে ঈশানী সমেত বেড়িয়ে এলো, তক্ষুনি ওরা স্ট্রেচার নিয়ে ছুটে এসেছিল। কিন্তু আসতে না আসতেই কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে মাফিয়া বস যে এমন কিছু করে বসবে তা বোধ স্বপ্নেও ভাবেনি তারা। থমথমে চেহারা নিয়ে ফের দৃষ্টি ঘোরালো মাতভেই। অসার হয়ে মেঝেতে শুয়ে থাকা এরীশের দিকে চেয়ে ব্যথাতুর কণ্ঠে বিড়বিড়িয়ে স্বগোতক্তি করলো সে,
— হোয়াই রীশষ্কা!
তক্ষুনি আরও দু’জন নার্স হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে এলো কেভিন থেকে। জলদি পায়ে এগিয়ে গিয়ে মাতভেইয়ের মুখোমুখি হলো তারা। জোরে জোরে শ্বাস ফেলে রুদ্ধস্বরে জানালো,
— স্যার! স্যালাইনে ড্রা’গ পুশ করা হয়েছে। নরমাল কোনো ড্রা’গ নয়। ইট’স সাইরেনক্স!
নার্সের কথা শোনা মাত্রই স্তম্ভিত হয়ে পড়লো মাতভেই। এক নিমেষে চোখ কপালে উঠে গেলো তার।
মেডিকেল সাইন্স বলে, মানুষ মা’রা যাওয়ার পরেও দীর্ঘ সাত মিনিট তাদের মস্তিষ্ক সজাগ থাকে।যদি তা সত্যি হয়েও থাকে, তবে এরীশের সজাগ মস্তিষ্কে সেই সাত মিনিটের রাজস্ব ছিল কেবলই ঈশানীর। শেষবারের মতোই দেখলো ওই নীলাভ দু’নয়ন। প্রাণ ভরে দেখলো। ভালোবাসা নামক ধ্বং’সের এই যাত্রার শুরু থেকে শেষ, সকল কিছুর হিসেব শেষবারের মতো চুকিয়ে নিলো মাফিয়া বস। জীবনের অন্তিমলগ্নে এসেও সে আওড়ালো,
— একজীবনে তোরে শুধু চেয়েই গেলাম, পেলাম আর কই? প্রেম আমার!
অবশেষে ইতি ঘটলো দীর্ঘ রজনীর। থেমে গেলো তুষারপাত। এই জীবনের তরে হলো তবে ভালোবাসার শাপমোচন। রাতের প্রহেলিকা হটিয়ে একটু একটু করে চোখ মেলছিল প্রত্যুষের সূর্যালোক। তখনও করিডোর জুড়ে অসহনীয় নিস্তব্ধতা। গুমোট নৈঃশব্দের মাঝেই আঁধারের পর্দা ফুঁড়ে চঞ্চলা কিশোরীর মতো দোল খেতে খেতে বেড়িয়ে গেলো এক চিলতে শীতল ঠান্ডা বাতাস। ঠিক সেসময়, উষা ওঠা এই কোমল ভোরে পৃথিবীর কোথায় যেন বেজে উঠলো বেদনারুদ্ধ গানের করুন কিছু সুর।
আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৮
কোন ভুলে তুমি শুলে বলো,
এই ফুলসজ্জায়….
স্বপ্নের লাশ কাঁধে নিয়ে,
ওরা কেন চলে যায়…
জীবন পথে চলতে শেখায়,
ওই হাতেরই ছোঁয়ায়,
আজ ভাঙা বুক, খোঁজে হাসি মুখ
দেখি জলে সে চিতায়…..
প্রেম আমার….
হো ও প্রেম আমার…

এমন বিভৎস এন্ডিং আগে পরি নাই মনে হয় ।। এইভাবে কাদানোর জন্য ধন্যবাদ 😭😭
আরে না এক জোড়া আগুন পাখি গল্পটাও এমনি
Na aita koro na apu plz
Apu eta ki chilo ,,erokom kichu ekebare asha korini ,,Eshani ar Erish duijoni marajabe ???? Ami to eta vabteo pari nai ,,,Apu please please please erokom sad ending dio na,,ei part porar por Ami to shocker upor shock khaisi ,ekhon prochur kannao pacche ,,Apu please porer part ta taratari dio ar please Erish ar Eshanire firaye aino😭😭😭
এটা হওয়া উচিত ছিল না
কেনো এর শেষ টা সুন্দর হতে পারলো না কেনো এর রকম হতে হলো শেষ টা সুন্দর হতে ও পারতো 🥹🥹
sad ending dilan Kano😭😭😭
Please apu ai vabe sad ending diyo na ami to puro shocked hoye achi please apu 😭😭
Kaj ta Valo korlen na.eto asa vorosa ses kore dilen 😭
আরে এই সেড এন্ডিং এর জন্য বুজি এত ধৈর্য ধরো উপন্যাসটা পড়লাম,, রিচার্জ কয়নাত তো মাফিয় ছিলো কই সেড এন্ডিং তো হয়নি তবে এরিশ ইউভানের কেনো হলো, লেখিকা এটা ঠিক করে নাই,, 😅😭
এখনো শেষ হয়নি। তুষারের বদলে যাওয়ার মত এইটাও যদি ভুল না হয় তাহলে পড়ে আসলেই আর লাভ নেই😑
ওরা দুইজন ছাড়া আমি শুধু চেয়েছি তোমায় অসম্পূর্ণ।
তুষার কখনও এরিস এর জায়গা নিতে পারবেনা। ইয়াশ এর কাহিনী দেখালেও ভাল্লাগবেনা।ওদিকে তুষার দের সেইভাবে মিল হয়নি এখনো
অনেক কিছু বাকি থেকে যাচ্ছে যেনো😑😑
শুধু চাই একটা মিরাকেল হোক।এইটা তো বাস্তব না যে সম্ভব না।
Apu ato gula mas wait kore kore golpo pore ses a kina sad ending dila ata to hower silo na aivabe erish r esahi ek ses korte paro na tmi apu
onek dhonnobad apu, avabe kadanor jonno
plz, kono miraccle koren
এটা তো লেখিকা বলেনি যে এটা লাস্ট পর্ব কৈ আমি তো দেখলাম না।।।।।।।
I love this novel
তবে হ্যা আমিও কমেন্ট করা মাহমুদা আপর মতো একটা মিরাকেল
চাই
এটা কিছুতেই স্যাটেন্ডিং হতে পারে না 😭😭😭 নিশ্চয় লেখিকা আমাদের বোকা বানাচ্ছে এটা কিছুতেই স্যাড এন্ডিং হতে পারে না যদি হতো তাহলে তো সমাপ্ত লেখা থাকতো যেহেতু নেই সেহেতু এটা সেটিংস নয় কিছুতেই হতে পারে না 😭😭😭😭
Please last porbo ta jeno happy ending hoy please 🥺🙏😭 na hoy amra morei jabo please last episode ba porbo ta jeno happy ending hoy please 🥺 🙏😭
এই গল্পটা আমি প্রথম থেকে অনেক ধৈর্য্য নিয়ে পড়েছি। এইরকম একটা এন্ডিং আমি কল্পনাও করতে পারেনি। তবে এটা যদি স্যাড এন্ডিং হয় আমি কষ্ট পাবো ঠিকই। কিন্তু হ্যাপি এন্ডিং এর রিকুয়েস্ট করবোনা। আমার বিশ্বাস লেখিকা আমাদের জন্য ভালো কিছুই ভেবে রেখেছেন। সবশেষে আমি পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করবো। লেখিকা দিদি আমাদের বেশি অপেক্ষা করাবেন না প্লিজ। এটাই আমার রিকুয়েস্ট।❤️❤️
আমি প্রথম থেকে এই গল্পটা অনেক ধৈর্য্য ধরে পরেছি। এমন কিছু আমি ভাবতেও পারিনি। তবে যদি স্যাড এন্ডিং হয় কষ্ট পেলেও হ্যাপি এন্ডিং এর রিকুয়েস্ট করবোনা। কারন আমি জানি লেখিকা আমাদের জন্য ভালো কিছুই ভেবে রেখেছেন। সবশেষে আমি পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। লেখিকার কাছে রিকুয়েস্ট আমাদের প্লিজ বেশি অপেক্ষা করাবেন না ❤️❤️
পরের পর্বের জন্য অপেক্ষায় আছি।কারন পরের পর্ব নির্ধারণ করবে আর পড়বো কিনা।
পছন্দের জুটি না থাকলে পড়ে লাভ নেই….
একটু তাড়াতাড়ি দেবেন পর্ব গুলোর, ভীষণ অধৈর্য্য হয়ে পরছি। আর হ্যাঁ শেষ টা যেন সুন্দর হয় 🙂
আমরা আশাবাদী….
এটা কি ছিলো আপু এভাবে না কা্দাঁলে কি হইত না, 🥹
evabe Keno kadalen 😭
Suraiya Rafa apu ata thik kore nai😭😭😭
EKHON KADLAM KINTU SHESHE JANO AR NA KANNA KORA LAGE … AMI ASHABADI
ENDING TA HAPPY HOBE NA JANI BUT LAST PART TA JENO SHUNDOR H
Jani sob vhalobasa purnota payna kisu kisu valo basa opurnou ta tai sundor tobuo chaibo apu doya kore ato kosto dianna golper morta bodlaiya den ar thik thakte partasena