Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩
সাজিয়া জাহান সুবহা

“এখানে কি হচ্ছে কেউ একটু বলবে আমাকে? তোমরা দুজন এখানে কি করছো ভাইয়া??”
সাফ্রিনের কথায় তার দিকে ফিরে তাকালো সাফওয়ান ও সাদিফ উভয়েই। বাকি বন্ধুরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সাফ্রিন ও সাদিফ ও সাফওয়ানের দিকে। বুঝে উঠতে পারলো কি সম্পর্ক তাদের মাঝে। সাদিফের দিকে নির্বিকারে তাকিয়ে আছে নাজরাত। হঠাৎ করেই চার চোখ এক হয়। চট করে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো নাজরাত। অদ্ভুত লজ্জায় দুগালে লালছে আভা ছড়িয়ে পড়ছে তার।
সাফ্রিন অস্থির কন্ঠে আবারো বললো,

‘ ভাইয়া! বলছো না কেনো? ‘
সাফওয়ান শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ ফুপি বলেছিলো না তার ঘরে বউমা আসতে চলেছে শীগ্রই। সেই বন্দোবস্ত করতেই তো এসেছি। ‘
অবাক হলো সাফ্রিন। বিষ্ময় কন্ঠে বললো,
‘ ব..বউ মা!! তার মানে নাজ..নাজরাত!! ‘
অল্প মাথা ঝুকিয়ে সম্মতি জানালো সাফওয়ান। সাথে সাথেই চাপা কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো সাফ্রিন। সাফওয়ান চোখ রাঙালো। সেটা দেখেই সাফ্রিন থেমে গেলো। কিন্তু চোখে মুখে তখনো চাপা উত্তেজনা তার।
হঠাৎ নুহাশ হতাশ কন্ঠে বললো,
‘ হবু বউয়ের সাথে দেখা করতে আসছেন মানলাম। আমরা কি চোখে পড়ছিনা? এই সাফা আমরা কি অদৃশ্য হইয়া গিয়েছি নাকি রে?? ‘

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

হাসলো সাদিফ। এগিয়ে গিয়ে কুশলাদি করলো সবার সাথে। নাজরাত তখনো নিশ্চুপ এক জড়বস্তুর মতোই দাঁড়িয়ে। কথা ছিলো সাদিফ এবং নাজরাতকে আলাদা স্পেস দেওয়ার। কিন্তু সাদিফ নিজেই বললো সবাই একসাথে মিলে লাঞ্চ করবে। সে অনুযায়ী লম্বা আয়তনের টেবিলটায় গোল হয়ে বসলো তারা নয় জন। নাজরাত ও সাফ্রিন পাশাপাশি চেয়ারে ছিলো। কিন্তু বসা মাত্রই আবার দাঁড়িয়ে পড়লো সাফ্রিন। তার দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকালো সবাই। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সাফওয়ান ও সাদিফকে দুদিকে রেখে মাঝখানে গিয়ে বসলো সে। সাদিফের একেবারে মুখোমুখি হয়ে পড়লো নাজরাত। লজ্জা,অস্বস্তি ও অস্থিরতায় গুটিয়ে বসে রইলো সে। সাফ্রিন আর সায়েরীও বসলো সামনাসামনি। কিন্তু সাফওয়ানের মুখোমুখি থাকায় বিরক্তি আর চাপা রাগে চুপচাপ বসে রইলো সায়েরী।
সকলের নিরবতা ছিন্ন করে সাফ্রিন গম্ভীর কন্ঠে হঠাৎ বলে উঠলো,

‘ তা নাম কি তোমার? ‘
নাজরাতের দিক ইঙ্গিত করে হঠাৎ এই প্রশ্ন করায় ভরকে গেলো সে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইলো সাফ্রিনের দিকে।
তাকে নিশ্চুপ দেখে সাফ্রিন অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
‘ আরে! মেয়ে কি কথা বলতে পারে না নাকি! রেসপন্স করছে না কেনো? ‘
সাফ্রিনের অদ্ভুত আচরণ দেখে আয়ান চাপা স্বরে বললো,
‘ কি করছিস সাফা! ‘
সাফ্রিন আবারো অবাক কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ সেকি! আপনি তো দেখছি আস্ত অভদ্র। আমার দুই ভাইয়ের সূত্রে আমিও এসেছি পাত্রি দেখতে। আর আপনি ছেলেপক্ষের এমন সুইট কিউট একটা মেয়েকে তুই তুকারি করছেন! ‘
সাফ্রিনের এমন কথায় হেসে উঠলো সবাই। নুহাশ নাজরাতের মাথায় হাত রেখে বললো—
‘ দুঃখিত। ওর কথা কে মনে নিবেন না। আপনি এইদিকে দেখুন। এই হলো পাত্রী। নাম হচ্ছে গিয়ে দিনরাত থুক্কু নাজরাত। তার ব্যাপারে কি বা বলবো! মাশা আল্লাহ্‌ মেয়ে আমাদের একেবারে খাঁটি ইমিটেশন। এতে কোনো সোনা পাবেন না আপনি। আলহামদুলিল্লাহ্‌ সে সব কাজ কর্ম গুছানোর চাইতে বাড়ানোতে বেশি অভিজ্ঞ। আর অভদ্রতামির তো কথাই বললাম না। আল্লাহর রহমতে মেয়ে আমাদের জন্মগত অভদ্র। জীবনেও কারো সাথে ভদ্রতামি করেনো।
নুহাশের কথায় অবাক হতে গিয়েও উচ্চস্বরে হেসে ফেললো বন্ধুরা। সাদিফ নিজেও ঠোঁট চেপে মাথা ঝুঁকিয়ে হাসে। সাফওয়ান ও হাসে নিঃশব্দে। অন্যদিকে লজ্জায়, অস্বস্তিতে মাথা নুইয়ে ফেললো নাজরাত।
সাফ্রিন হাসি চেপে আবারো গম্ভীর কন্ঠে বললো,

‘ ঠিক আছে, ঠিক আছে। এতো বাশঁ মেরে ফুটেজ নেওয়ার কিছু নেই। এমন কথা মেয়ে দেখতে গেলে সবাই বলে। তা পড়ালেখা কতদূর? ‘
নুহাশ আতংকিত কন্ঠে ফিসফিস করে বললো,
‘ ইশশ!! আস্তে বলতে পারেন না! মেয়ে শুনলে আবার না গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদে উঠে। ‘
সাফ্রিনও ফিসফিস করে জানতে চাইলো, ‘ কেনো!! ‘
নুহাশ দুঃখী গলায় জবাব দিলো,
‘ কীভাবে যে বলি এই আনন্দের কথা! ছোটবেলায় আমাদের পাত্রীর খুব শখ ছিলো লেখাপড়া করার। স্কুলে যেদিন প্রথম ক্লাস ছিলো সেদিন তিন চারটা কুত্তা মিলে তারে এমন ধাওয়া করছে! আল্লাহ! আল্লাহ! নসিব খারাপ ছিলো বলে বেঁচে গিয়েচগে। এর পর থেকে কেউ এই প্রশ্নটা করলেই সে ভয়ে মাটিত গড়াগড়ি খেয়ে কাঁদে।
সাফ্রিন হাসি চেপে দুঃখী গলায় বললো,

‘ আহারে! বড্ড খুশি হলাম এই কথা শুনে। ‘
নুহাশ আবারো বললো,
‘ কিন্তু আপনি চিন্তা করবেন না। আপনের ভাইপু- ভাতিজি দের খুব ভালো শিক্ষায় মানুষ করবে আমাদের পাত্রী। একেবারে নিজের মতো বানাবে। আমাদের পাত্রী যে একেবারে খাঁটি ইমিটেশন।
এই পর্যায়ে এসে বিব্রতবোধ করলো সাদিফ, নাজরাত উভয়েই। বাচ্চার কথাটা শুনে আরো গুটিয়ে গেলো নাজরাত। গলা খাকাড়ি দিলো সাদিফ। সাফ্রিন ও নুহাশ হতে খনিকের বিরতি নিয়ে অর্ডার করার ব্যাপারে জানতে চাইলো। সবার মতামত নিয়ে কাচ্চি অর্ডার করলো নয় প্লেট। সায়েরী দ্রুত বলে উঠলো,
‘ নয় প্লেট না ভাইয়া আট প্লেট। ‘
সাদিফ বললো,
‘ কেনো আপনি কি কাচ্চি খাবেন না? অন্য কিছু অর্ডা…. ‘
‘ না ভাইয়া। আর কিছুই অর্ডার করতে হবে না। (ওয়েটার কে উদ্দেশ্যে করে) আপনি আট প্লেট কাচ্চি নিয়ে আসুন সাথে একটা এক্সট্রা প্লেট। ‘
সম্মতি জানিয়ে চলে গেলো ওয়েটার। খাবার আসতেই যে যার প্লেট নিয়ে নিলো। অবশিষ্ট খালি প্লেটে নিজ প্লেট হতে অল্প কাচ্চি দিয়ে দিলো ফায়াজ,নাজরাত ও তোহা। নুহাশ নিজেও প্লেট হতে কিছু রাখতে চাইলেই প্লেটটা টেনে নিয়ে সায়েরী চাপা স্বরে বললো ‘

‘ মেরে ফেলবি নাকি! এতোগুলো খাওয়া সম্ভব আমার দ্বারা!’
সায়েরী নিম্ন কন্ঠে বললেও কথাটা স্পষ্ট কানে আসলো সাফওয়ান ও সাদিফের। দুই ভাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সায়েরীর প্লেটের দিকে। এতো অল্প খাবার খেয়ে পেট ভরবে এই মেয়ের!
সাদিফ বললো,
‘ আপনি এতো অল্প খাবার খাবেন? আর এক প্লেট অর্ডার করতে পারতাম তো। ‘
সাফ্রিন ফিচেল হেসে বললো,
‘ আরে ওর কথা বলো না ভাইয়া। এই অল্প খাচ্ছে সেটাই অনেক। এমনিতে এই সময় বাসায় থাকলে পড়ে পড়ে ঘুমাতো। দেখো না ১০ বছরের বাচ্চাও এর চেয়ে বেশি খা…. ‘

সাফ্রিনের কথা শেষ করার আগেই তার পায়ে জোরে লাথি দিলো সায়েরী। কিন্তু বিধি বাম, সাফ্রিনের প্রতিক্রিয়া করার বদলে অস্পষ্ট শব্দ করে লাফিয়ে উঠলো সাফওয়ান। তার হঠাৎ প্রতিক্রিয়ায় অবাক হলো সকলেই। ভয়ে সায়েরী চুপসে গেলো। কলিজাটা যেনো গলায় আটকে গেছে। এই বুঝি তার ছোট্ট শরীরটাকে দুহাতে তুলে আছাড় মারবে সাফওয়ান ভাই। সেই আশংকায় চোখ মুখ খিছে শক্ত হয়ে রইলো সে। সাফওয়ান রাগী চোখে তাকালো সায়েরীর দিকে। সাফ্রিন আন্দাজ করতে পারলো সায়েরীর কারসাজি। যেই না সাফওয়ান ধমক দিয়ে কিছু বলতে যাবে অমনি সাফ্রিন তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,

‘ স…স্যরি ভাইয়া। আম..আমি মানে..মশা হ্যা মশা বসেছিলো পায়ে তাই পা নাড়তে গিয়ে লেগে গিয়েছে। স্যরি। ‘
সায়েরী চোখ পিটপিট করে তাকালো সাফ্রিনের দিকে। সাফওয়ান একনজর সায়েরীর দিকে তাকিয়ে বসে পড়লো চুপচাপ। সাফ্রিন রাগী চোখে তাকায় সায়েরীর দিকে। যা দেখে ঠোঁট নাড়িয়ে সায়েরী ইশারায় বললো — “স্যরি”।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আবারো কথা তুললো নুহাশ।
‘ নিজের ভাই সম্মন্ধেও কিছু ইনফো দিইয়া দেন বেয়াইন সাহেবা। আমরা তো আর কোনো অকর্মারে মেয়ে বিয়ে দিব না। ‘
নুহাশের কথাটা কানে যেতেই চট করে সাফ্রিনের দিকে তাকালো সাদিফ। তার দৃষ্টির একটাই অর্থ, “নুহাশের মতো খাঁটি ইমিটেশন ওয়ালা সুনাম আমি চাই না”। সাদিফের তাকানো দেখে হাসলো সাফ্রিন। গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

‘ মাশা আল্লাহ্‌! ভাই আমার লাখে এক। খুবই সিম্পল ফ্যামিলি তাদের। বাবা আর চাচার বিজনেস আছে। মা ঘর সামলায়। এক ছোট ভাই আছে গ্রেজুয়েশন করছে। আর ভাইয়া বর্তমানে একটি আইটি কোম্পানিতে জব করছে। পাশাপাশি মার্স্টার্স-টাও করছে। আর হ্যাঁ কোনো ধরনের বাজে স্বভাব কিন্তু আমাদের পাত্রর মাঝে নেই। খুবই ভদ্র ছেলে সে। যেহেতু আমার ভাই তাই স্বভাবতই ইনিও একটু কম কথা বলে। তবে উচিত টাই বলে। আমার মতে আপনাদের মেয়ের জন্য আমার ভাইয়ের চেয়ে বেস্ট অপশন আর হতেই পারে না। এবার আপনারাই বলুন।
আয়ান একটু পিঞ্চ মেরে জবাব দিলো,

‘ রাতে বসে বসে এই বক্তব্য মুখস্থ করেছেন মনে হচ্ছে! এনিওয়ে, ছেলের কোয়ালিফিকেশন আমাদের ভালো লেগেছে। তবে বিয়ে যেহেতু তারা করবে তাই দুজন নিজেদের মাঝে কথাবার্তা বলে নিলেই ভালো। ‘
আয়ানের কথা শুনা মাত্রই লুঙ্গি ডান্স দিয়ে নাচতে মন চাইলো নাজরাতের। এমনিতেই সাফ্রিনের মুখে সাদিফের গুণগান শুনে মনে মনে ছয় বার কবুল বলে ফেলেছে সে। ইচ্ছে করছে আয়ানকে জোরছে একটা জাপ্পি পাপ্পি দিতে। কিন্তু এটা করা যাবে না। নিজের ইমোশন গুলোকে কন্ট্রোলে রেখে চুপচাপ ভদ্র মেয়ের রূপ ধারণ করে বসে রইলো সে। কখন সবার লাঞ্চ করা শেষ হবে আর কবে সে তার সুপার ডুপার হ্যান্ডসাম বর ওহ না হবু বরটার সাথে একটু পার্সোনাল টাইম স্পেন্ড করার পাবে এই আশায় গলা দিয়ে খাবারও নামতে চাইছে না।

নিরিবিলি লেকের পাড়। ঘাসের উপর প্রায় তিন ফুট মতো লম্বা কাশফুলের সমাহার। সবুজ জায়গাটা জুড়ে সাদা কাশফুলগুলো দেখতে ভীষণ আকর্ষণীয় লাগছে। কোলাহলবিহীন লেকের পাড়টাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সাদিফ ও নাজরাত। বাতাসে উড়ছে নাজরাতের লম্বা উড়না। বেনী করা চুল হতে অল্পসংখ্যক চুল বেরিয়ে উড়ছে চোখে মুখে। সাদিফ ফিরে তাকালো। স্পষ্ট নজর গাঁথলো পাশে অবস্থানরত মানবীর দিকে। যার চোখে মুখে ক্লান্তি ভাব। চোখ লেকের পানিতে। নাজরাত ফিরে তাকায়। সাথে সাথেই চোখাচোখি হয় দুজনের। নাজরাত চোখ নামিয়ে নেয়। কিন্তু সাদিফের চোখের মনিকোঠায় তখনো ভাসছে নাজরাতের প্রতিবিম্ব। গলা ঝেরে সাদিফ বললো,

‘ আপনি কি কোনোভাবে এই বিয়েতে অমত পোষন করছেন? নিজের ফ্যামিলিকে বলতে পারছেন না কিংবা অন্য কাউকে পছন্দ করেন এমন কিছু?? ‘
‘ ন..না নাহ! কি বলছেন এসব!! এমন কিছুই না। ‘
‘ তাহলে আজ আমাকে এখানে ডাকার কারণ কি? মানে বিয়েতে যদি মত থেকেই থাকে তবে কাল আমার ফ্যামিলির সাথে দেখা করতে তো সমস্যা থাকার কথা না। ‘
‘ আপনি যেটা ভাবছেন এমন কিছু না। আসলে আমি বিয়েতে রাজি ছিলাম ন…মানে রাজি আছি, কিন্তু এখন না। ‘
ভ্রুঁ কুঁচকালো সাদিফ। বললো,
‘ সরি? আমি ঠিক বুঝলাম না। ‘
‘ দেখুন, আপনাকে আমার পছ..মানে বিয়ে করতে আপত্তি নেই। কিন্তু আমি ঠিক এই মুহূর্তে বিয়েটা করতে চাচ্ছি না। ‘
‘ তো…আপনি চাইছেন আপনার হয়ে আমি বিয়েটা ভেঙ্গে দিই তাইতো? ‘
সাদিফের বলতে দেরি, কিন্তু নাজরাতের প্রতিক্রিয়া করতে দেরি নেই। সাদিফ বিয়ে ভেঙে দিবে শুনেই সে চেঁচিয়ে উঠলো,

‘ নাআআআ!! বিয়ে আমি শুধু আপনাকেই করবো। ভাঙ্গতে হচ্ছে কেনো!! ‘
চমকে উঠে সাদিফ। বিষ্ময় ভরা চোখ তুলে তাকায় নাজরাতের দিকে। নাজরাত যখন বুঝতে পারে কি বলতে কি বলে ফেলেছে, তখন সে নিজেও চমকে উঠে। চোখ খিচে মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে তার। সাদিফ হাসে। তার সম্মুখে দাড়িয়ে থাকা মানবীর লজ্জাজড়িত মুখশ্রীটা দেখে তার কেমন একটা প্রশান্তি অনুভব হয়। নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রেখে সে জানতে চাইলো,
‘ তা এখন আমাকে কি করতে হবে? ‘
নাজরাত নিজেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। মাথা নিচে রাখা অবস্থাতেই জবাব দেয়—
‘ আমি বলছি না বিয়েতে আমার মত নেই। আসলে কিছু মাস পরেই আমার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। এর মাঝে আমি চাইছি না বিয়ে করতে। মানে এনগেজমেন্ট অবধি ঠিক আছে। কিন্তু….বিয়ে, সংসার এসবের মাঝে আমার মনে হচ্ছে না আমি আমার পড়ালেখায় ফোকাস করতে পারবো। তাই আমি চাইছি শুধু বিয়ের ডেইট টা পিছাতে। আই হোপ আপনি বুঝতে পারছেন!! ‘

জবাবের আশায় উৎসুক দৃষ্টিতে সাদিফের দিকে তাকায় নাজরাত। কিন্তু সাদিফের নজর লেকের ঢেউ খেলা পানিতে। মুখশ্রী গম্ভীর। নাজরাতের বুক ঢিপঢিপ করে। হয়তো তার প্রস্তাবটা গ্রহণ করবে না সাদিফ। এমন আশংকায় চুপসে যায় তার মুখ। গম্ভীর কন্ঠে সাদিফ বললো,
‘ চলুন যাওয়া যাক? ‘
প্রশ্ন করলেও উত্তরের অপেক্ষা না করে রাস্তার দিকে এগোতে লাগলো সাদিফ। নাজরাতের মন ক্ষুন্ন হলো। কিছু না বলে সেও পা মিলালো সাদিফের সাথে। নিরবতার মাঝেই অনেকটা পথ পার করলো দুজনে। হঠাৎ ৯-১০ বছরের একটা মেয়ে দৌড়ে এসে দাড়ালো তাদের সামনে। পরণে ছেড়া ময়লা পোশাক। গায়ের সাথে উড়না দ্বারা পেছিয়ে রাখা একটা ঝুড়ি। যার মাঝে কদম,বেলি ও কাঠ গোলাপ দেখা যাচ্ছে।

‘ ভাইজান ফুল কিন্না লন না। তাজা ফুল। ‘
নাজরাত ভাবে হয়তো সাদিফ মেয়েটাকে উপেক্ষা করে চলে যাবে। কিন্তু নাজরাতকে অবাক করে দিয়ে হাসিমুখে মেয়েটার গালে হাত রাখলো সাদিফ। মিষ্টি হেসে জানতে চেইলো,
‘ কি নাম তোমার? ‘
‘ কলি। ‘
‘ বাহ! তুমি নিজেও তো একটা ফুল তবে। ‘
কলি নামক মেয়েটা নিজের তারিফ শুনেই দাঁত দেখিয়ে হাসে। ঝুড়িতে রাখা ফুলগুলোর দিকে ইশারা করে বলে,
‘ ফুল লন না ভাইজান। সকালেই আনছি। তাজা আছে এহনো। ‘
‘ কতো করে দিবে? ‘
‘ কদম ফুল একটা বিশ টেকা। কাঠ গোলাপ আর বেলি ফুলের মালা ত্রিশ টেহা কইরা। ‘
‘ কদম দাও তবে দুটো। ‘
সাদিফের বলার সাথে সাথে হাসিমুখে ঝুড়ি হতে তাজা দুটি কদম ফুল তুলে নিলো কলি। মানিব্যাগ হতে চকচকে একখানা একশো টাকার নোট বের করে কলির দিকে বাড়িয়ে দিলো সাদিফ। কলির গাল টেনে মিষ্টি কন্ঠে বললো,

‘ সবটা তুমি রেখে দাও। ‘
কদম দুটি সাদিফের হাতে গুজে একগাল হেসে দৌড়ে চলে গেলো কলি। এতোক্ষণ যাবত সাদিফের দিকে মুগ্ধ নজরে তাকিয়ে থাকা নাজরাত হঠাৎ উপলব্ধি করলো সাদিফ তার মুখোমুখি দাড়িয়ে। নড়েচড়ে দাড়ালো নাজরাত। কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই তার দিকে কদম দুখানা বাড়িয়ে দিলো সাদিফ। হতবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো নাজরাত। সাদিফ মুখে হাসি বজায় রেখে বললো,
‘ কদম ফুল দ্বারা স্বাগতম জানালাম আজ এই ক্ষনে আমার মধ্যাহ্ন দুপুর হওয়ার জন্য। লাল গোলাপের সুভাসের সাথে নাহয় আপনাকে বরণ করে নিবো, একান্ত আমার হওয়ার জন্য। ‘
নাজরাত চমকায়। অদ্ভুত অনুভূতিতে কেঁপে উঠে তার দেহ, মন। সেই কম্পিত হাত বাড়িয়ে সে গ্রহণ কদম ফুল দুটি। সাদিফের নজর তখনো নাজরাতের উপরে নিবদ্ধ। কদম ফুল দুটি বুকের সাথে মিশিয়ে সাদিফের দিকে তাকিয়ে অধরজোড়া প্রসারিত করে হাসলো নাজরাত। মধ্যাহ্ন দুপুরে সুর্যের তীর্যক আলোয় সাদিফের নজরে ভীষণ অমায়িক লাগলো সে হাসি।

সময় তিনটা বেজে বিশ মিনিট। মিষ্টি কালারের শাড়ি গায়ে জড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে নাজরাত। চুলগুলো হালকা ডিজাইন করে খোঁপায় বাধা। মেকাপ কিট আর অর্নামেন্টস নিয়ে দিশেহারা অবস্থা তার। কোনটা রেখে কোনটা নিবে বুঝে উঠতে পারছে না সে। টেবিলের উপর তাক করে রাখা মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে ফুসে উঠলো নাজরাত।
‘ তোদেরকে কি হা করে তাকিয়ে থাকার জন্য ভিডিয়ো কলে বসিয়ে রেখেছি আমি!! কখন থেকে জানতে চাচ্ছি কোন ইয়ারিং এর সাথে কোন লকেট মানাবে? শাড়িরটার সাথে লাইট লিপস্টিক পরবো কি না? ‘
মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে থাকা ছায় জোড়া চোখের দৃষ্টি নাজরাতের উপর নিবদ্ধ। এতোক্ষণ যাবত কি করবে? কি পরবে? কিভাবে কথা বলবে এমন হাজারটা প্রশ্ন করে বন্ধুদের কানঝালাপালা করে রেখেছে নাজরাত। সায়েরী ও নুহাশ একসাথে লম্বা হাই তুলে চোখ বুজলো।
ফায়াজ ভাবুক কন্ঠে বললো,

‘ নাজরাত! এতোক্ষণ না দেখলাম কপালে দিলি একটা ক্রিম, চোখের উপর একটা, নিচে একটা, নাকে একটু কালো কালো একটা, গালে লাল আবার একটু সাদা সাদা….এতো ময়দা মাখলি কিন্তু বুঝা যাচ্ছে না কেনো? গেলো কই সেসব? ‘
নাজরাত ভাব নিয়ে জবাব দিলো,
‘ ওসব আটা ময়দা না। আর বুঝা না যাওয়ার জন্যই তো দিয়েছি এতোসব। ইটস কলড নো মেকাপ মেকাপ লুক। ‘
নুহাশ ফুঁসে উঠলো। বললো,
‘ হুহ! নো মিকাপ মিকাপ লুক। ওই তুই নো মেকাপ করবি না মেকাপে সাগরে সাদিফরে নিয়ে ভেসে যাবি এটা আমাদের জেনে কি লাভ? তোরে দেখতে আসবে হলো সাড়ে চার কি পাঁচটায়। আর তুই সেই দুইটা হতে এমনে মোবাইল ধরে বসিয়ে রাখছিস আমাদের। এই তিন মেয়েকে কল দিতেও তো হতো। আমাদের দিলি কেনো? ‘
নুহাশের কথা শুনে সাফ্রিন বলে উঠলো,

‘ ওই তুই ভাইয়াকে নাম ধরে ডাকলি কেনো? তোর বয়সে বড় হয়, সম্মান দে। ‘
আয়ান বললো,
‘ তা বরের সম্মানিত ছোট বোন! গতকাল যে ছেলেপক্ষ সেজে এতো ররংঢং করলি, আজ কেনো মেয়ে দেখে ফেলছিস আগেভাগে? ‘
‘ এই তুই রংঢং বললি কেনো? আমাকে রংঢং করতে কখন দেখেছিস হ্যাঁ? ‘
তোহা হাই তুলে বললো,
‘ তোরা কান্টিনিউ কর ভাই। আমি যায়। সায়েরী মনে হয় এতোক্ষণে ঘুমের দেশে তলিয়ে গিয়েছে। দেখনা ওর স্ক্রিনে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। ‘
আয়ান বললো,

‘ এই দিনরাত আই মিন নাজরাতের আদা ময়দার টিউটোরিয়াল দেখতে দেখতে এবার আমরই ঘুম পাচ্ছে। ‘
নাজরাত রাগ দেখিয়ে বললো,
‘ যা যা। থাকতে হবে না তোদের। আমি নিজেই যথেষ্ট আমার জন্য। ‘
নুহাশ আবারো ফুঁসে উঠে বললো,
‘ দেখেছিস তোরা দেখেছিস! এই লেডি মীরজাফর দুই ঘন্টা ধরে প্যানপ্যান করে কানের মাসুম পোকাগুলার ইন্না-লিল্লাহ করে দিলো। চুপচাপ সহ্য করছি। আর এখন কেমন আচরণ করছে দেখ! শুন, দেখিস তুই সাদিফের ভালোবাসায় ডুবে মরবি হারামি। ‘
‘ মরলে আমি মরবো। তুই নিজের জান বাচিঁয়ে ভাগ এখান থেকে শয়তান। ‘
‘ হ এখন তো মনে হবে আমদের শয়তান। ভালা মানুষ তো খালি তোর সাদিফ। ‘
‘ তুই.. ‘

নাজরাত কিছু বলার আগেই সাফ্রিন চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ উফফ্! থাম তোরা। আর এইযে নববধূ, আমার ফুপি কিন্তু একটু গম্ভীর আছে বটে। ভদ্র হয়ে যাবি। ‘
নাজরাত আৎকে উঠলো শুনে। বললো,
‘ বলিস কি! এমনিতেই নার্ভাস ছিলাম আবার তুই.. ‘
তোহা অবাক কন্ঠে বললো,
‘ ঘন্টা ধরে বসে বসে সাজুগুজু করছিলি। আর এখন বলছিস নার্ভাস ছিলি! বাহ! এমন নার্ভাস আমরাও হতে চাই। ‘
নাজরাত মেকি হেসে জবাব দিলো,
‘ কি করবো বল! তোদের জিজা আস্ত একটা হট আইটেম। এমন চালতি ফিরতি আইটেম বোম কে হাতছাড়া করা যায় বল তো! দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই বোম কে নিজ কারাগারে বন্ধি করার মিশনে নেমেছি। একটু প্রিপারেশন না নিলে কি হয়! ‘
নুহাশ নাক মুখ কুঁচকে ফেললো নাজরাতের কথা শুনে। বমি করার ভান করে বললো,
‘ ওয়াক!! আল্লাহ্‌ আমার বমি আসে ক্যারে! আম্মা! পলিথিন নিয়া আসো তো.. ‘
নুহাশের অভিনয় দেখেই হেসে উঠলো সবাই। নাজরাত যেনো পারলে এক্ষুনি মোবাইলের ভিতরে ঢুকে গলা টিপে ধরবে নুহাশের।

সকলের চেঁচামেচি শুনে এবার সায়েরী ঘুমু ঘুমু বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আস্তে হাসতে পারিস না তোরা? শেওড়াগাছের পেত্নী আর পেত্নীর জামাইয়ের মতো হাসি সব কয়টার। আর একটু হলে ঘুমের মাঝে আমার মাসুম হার্ট টা অক্কা পেতো। ‘
নুহাশ হতাশ কন্ঠে বললো,
‘ বইন রে তুই কেমনে পারোস এতো ঘুমাইতে বল তো আমাকে। ঘুমাস ভালো কথা কিন্তু মোটা হোস না কেন? ‘
‘ রাত জেগে ফোন আলাপ করার মতো কেউ নেই বলেই আজ আমি ঘুমকাতুরে। আচ্ছা আমার কথা বাদ। নববধূ? তোর এই শাকচুন্নি মার্কা হাসি দিবি না কেমন? সুন্দর করে মুচকি হাসি দিবি। ‘
ফায়াজ বললো,

‘ আর হে… হাঁটতে বললে গুটিগুটি পায়ে হাটবি। স্টাইল মনে আছে তো? ওইযে…. ওয়ান, টু…. ছ্যা ছ্যা ছ্যা… ‘
নাজরাতের সাথে সাথে সকলেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো এবার। আরো কিছুক্ষণ কথা বলে কল কেটে দিলো নাজরাত। শাড়ি ঠিক করে উঠে দাড়ালো। নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সন্তুষ্টির হাসি হাসলো সে। মাথায় আঁচল দিয়ে একবার চেক করে দেখলো কেমন লাগছে। আয়নায় নিজের দিকে তাকাতেই চোখের দৃশ্যপটে ভেসে উঠলো সাদিফের হাসিমুখ। লজ্জায় দুহাতে মুখ ঢাকলো সে। এখনি এই অবস্থা না জানি লোকটা সামনে আসলে কি হবে তার!
দরজায় পরপর করাঘাত করতেই দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে দিলো নাজরাত।

“কেমন মেয়ে দেখ, বলে কিনা নিজে নিজে রেডি হবে…অন্য কেউ না থাকলে হ……”
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো নাজরাতের মা সাথে ছোট চাচি । নাজরাতকে দেখে কথা থেমে গেলো তার মায়ের। ছোট চাচি মুগ্ধ কন্ঠে বললো,
‘ ভাবি! কি সুন্দর লাগছে আমাদের মেয়েকে! মাশাল্লাহ!! ‘
নাজরাত লজ্জা পায়। তার মায়ের চোখ পানিতে ভরে আসে। দেখতে দেখতে মেয়েটা আজ কতো বড় হয়ে গিয়েছে। আজ মেয়ের বিয়ের আয়োজন চলছে। সব কেমন চোখের পলকেই ঘটে গিয়েছে। তিনি কিছু বললেন না। দুহাতে নাজরাতের মুখ তুলে কপালে চুমু খেয়ে দ্রুত প্রস্থান করলেন। নাজরাতের বুক ভারী হয়ে আসে। তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে কথা ঘুরাই ছোট চাচি।

‘ এভাবে সঙ সেজে কি দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? আপনার রাজকুমার তো চলে এসেছে। ‘
‘ চলে এসেছে!!!! ‘
‘ জ্বি হ্যা। তুমি রুমেই থাকো। একটু পর যখন ডাকা হবে তখন নিয়ে যাবো কেমন? ‘
মাথা নাড়লো নাজরাত। বুক ঢিপঢিপ করছে তার। অস্থির অস্থির লাগছে। রুমের এমাথা থেকে ওই মাথা অবধি কিছুক্ষণ পায়চারি করলো সে। অস্থিরতা কমার বদলে ধাপে ধাপে আরো বাড়তে লাগলো। শরীর ঘামছে। না, হাটলে চলবে না। ফ্যানের নিচে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলো। অল্প কিছুক্ষণ পরেই তার মা এবং ছোট চাচি আসলো রুমে। তাদের দেখে আবারো ঘাবড়ে গেলো নাজরাত। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে ছোট চাচির সাথে পা বাড়ালো ড্রইংরুমের উদ্দেশ্যে। মাথা নিচু করেই সবার উদ্দেশ্যে নিচু কন্ঠে সালাম জানালো সে। সাদিফের ভাবি হাত টেনে নিজের এবং সাদিফের মায়ের মধ্যিখানে বসালো তাকে। নম্র কন্ঠে বেশ দুয়েকটা কথাও জানতে চাইলো। মাথা নিচু রেখেই নিম্ন কন্ঠে জবাব দিলো নাজরাত। তাকে পাশে রেখে দুই পরিবার আরো কিছু কথা বললেন নিজেদের মাঝে।

‘ ছোট মা, আমি বলছি কি ওরা একটু নিজেদের মাঝে কথা বলে নিলেই মনে হয় ভালো হতো। দুজনের পছন্দ অপছন্দেরও একটা ব্যাপার আছে তাইনা?? ‘
সাদিফের ভাবি নামক ব্যাক্তিটির কথাটা শুনে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসলো নাজরাতের। কি আশ্চর্য মাত্র গতকাল একা গিয়ে কথা বলে এসেছে লোকটার সাথে সে। অথচ আজ এমন অনুভূতি হচ্ছে কেনো!! সাদিফের মা নাজরাতের পরিবারের কাছে অনুমতি চাইলেন দুজনকে আলাদা কথা বলতে দেওয়ার জন্য। অনুমতি পেতেই ছোট চাচি নাজরাত ও সাদিফকে নিয়ে উঠে আসলো। এতো সময়ের মাঝে একটা বারের জন্যও সাদিফের দিকে চোখ তুলে তাকালো না নাজরাত। ছোট চাচি বললো সাদিফকে নিয়ে ছাদে যেতে। শাড়ি সামলিয়ে খুব সাবধানে সিড়ি বেয়ে উঠলো নাজরাত। সাথে সাদিফ। মুক্ত পরিবেশে এসে লম্বা দম নিলো সাদিফ। তার চেয়ে পাঁচ হাত দূরত্বে অবস্থানরত নারীটির দিকে তাকিয়ে আবারো মুগ্ধ হলো সে। মিষ্টি কালারের শাড়ি পরিহিতা মাথায় আলতো ঘোমটা টেনে নিচু হয়ে থাকা মেয়েটাকে ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছে দেখতে। রেলিংয়ের সাথে ঠেস দিয়ে নাজরাতের পাশাপাশি দাড়ালো সাদিফ। বললো,

‘ কেমন আছেন? ‘
‘ ভ..ভালো আছি। আপনি? ‘
‘ ভালো। আপনি কি নার্ভাস ফিল করছেন? ‘
‘ ন..না তো। ঠ..ঠিক আছি আমি। ‘
‘ এতো ঘামছেন কেনো তবে? ‘
উত্তর দিলো না নাজরাত। আগের মতোই মাথা নুইয়ে দাড়িয়ে রইলো।
‘ আপনার কথাটা আমি জানিয়েছি মাকে। ‘
এতো সময় বাদে চোখ তুললো নাজরাত। প্রশ্নের জবাব শুনার আশায় তাকালেও এক নজরেই যেনো থমকে গেলো তার গোটা পৃথিবী। ক্ষানিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা মানবটার সর্বাঙ্গে আটকে রইলো তার মুগ্ধ দুই চোখের দৃষ্টি। হোয়াইট শার্টের উপর ডার্ক ব্লু কোট সাথে ম্যাচিং প্যান্ট। হাতে চকচক করছে ধূসর বর্নের চেইনের ঘড়ি। ব্লাক পলিশড সু। জেল দ্বারা সেট করে রাখা চুল। সবমিলিয়ে ভীষণ সুন্দর লাগছে সাদিফকে। নাজরাত স্থান কাল ভুলে হা করে তাকিয়ে রইলো। সাদিফ প্রথমে ব্যাপারটা লক্ষ না করলেও পরবর্তীতে লক্ষ্য করতেই খানিক বিব্রতবোধ করলো। একটু হাসিও পেলো নাজরাতের এমন চাহনিতে।

‘ নাজরাত!! ‘
‘ হুহ… ‘
‘ আমি আপনাকে কিছু বলেছিলাম, আপনি কি শুনছেন?? ‘
‘ স..সরি। আমি..আমি আসলে খেয়ল করিনি। আপনি বলুন।আমি শুনছি। ‘
‘ মাকে আমি আপনার পরীক্ষার কথাটা বলেছি। উনাদের কোনো সমস্যা নেই বিয়ে পিছিয়ে নিতে। অ্যান্ড পার্সোলানি আমি চাই আপনি আপনার পড়াশুনাটা কান্টিনিউ করুন। এই দিক থেকে কোনো বাধা আসবে না সিউর থাকতে পারেন। ‘
নাজরাত আপনমনে বিড়বিড় করে বললো,
‘ আমি নিজেই তো আসল বাধা। মাথা খারাপ নাকি আমার যে বিয়ের পরও এই প্যারা স্ব-ইচ্ছায় হজম করবো!! ‘
‘ কিছু বললেন? ‘
‘ ন..নাহ। ‘
‘ আপনার কিছু জানার নেই? ‘
‘ কোন ব্যাপারে? ‘
‘ আপনার হবু বরের ব্যাপারে! ‘

সাদিফের নির্লিপ্ত কথাটা শুনেই বুকের মাঝে উথাল-পাতাল ঝড় বয়ে গেলো নাজরাতের। “হবু বর” এই সুদর্শন ছেলেটা তার হবু বর!! পূণরায় গালজোড়া লাল হয়ে উঠতে লাগলো নাজরাতের। মাথা নুইয়ে রাখলে সে। সেদিকে একনজর তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলো সাদিফ। নাজরাত লজ্জা পাচ্ছে দেখে কথা বাড়ালো না সে। অনুমতি নিয়ে পা বাড়ালো সিড়ির দিকে। পেছন পেছন আসলো নাজরাত। ছাদের দরজা অবধি গিয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায় সাদিফ। তার দেখাদেখি নাজরাতের পাও থেমে গেলো আপনাআপনি। নাজরাতের চোখে চোখ রেখে সাদিফ মোহনীয় কন্ঠে বললো,
‘ শাড়িতে আপনাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২

সাদিফের কন্ঠটা কর্ণগোচর হতেই হৃদচলাচল খনিকের বন্ধ হয়ে আসলো নাজরাতের । সাদিফ চলে গেলো বড় বড় পা ফেলে। কিন্তু থমকে গেলো নাজরাতের সর্বাঙ্গ। অদ্ভুত ভালোলাগায় ছেয়ে গেলো তার দেহ, মন। রক্তিম হয়ে উঠলো গালজোড়া। দুহাতে মুখ ঢেকে আনমনেই হেসে উঠলো সে। তার এই ভালোলাগাময় অনুভূতি গুলো একটু একটু করে গড়ে উঠছে এই পুরুষটাকে ঘিরে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪