Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৯

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৯

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৯
সাজিয়া জাহান সুবহা

ঘড়ির কাটা সাড়ে দশটায় পৌঁছাতেই ঘুম ভাঙলো তোহার। হাতড়ে মোবাইলটা হাতে নিতেই নোটিফিকেশনে চোখ পড়লো তার। স্ক্রিনে টাচ করে যা দেখলো তাতে হুশ উড়ে গেলো। “প্রভা রহমান” আইডি থেকে রাত ২টায় কাপল পিক দিয়ে পোস্ট করেছে গট এনগেজড। চোখ বড় করে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো সে। এই মুহূর্তে কি রিয়েকশন দেওয়া উচিৎ সেটাও যেনো ভুলে বসেছে সে। হঠাৎ বিকট আওয়াজে হাতের মোবাইলটা কেঁপে উঠলো তার। সে ও কেঁপে উঠলো আচমকা শব্দে।

‘ হ..হ্যালো? ‘
‘ ওই আনা কানা! চার চোখের দুই চোখ কি দিনরাতের আকদ্ অনুষ্ঠানেই ফেলে এসেছিস নাকি? ক’টা বাজে ধ্যান আছে তোর? কাল প্রোগ্রাম, আজকের রিহার্সাল কি তোর জামাই করবে? ‘
‘ আয়ান কি এসেছে? ‘
‘ তোকে কি বলছি আ.. ‘
‘ উফ নুহাশ যা জিজ্ঞেস করছি বল না!! ‘

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ ওই হালারপু ভ্যাটকি মাছের মতন ঘুমাচ্ছে এখনো। ফোন দিয়েছিলাম বললো আসবেনা। শরীর খারাপ করেছে। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারব কাল ওভার খেয়ে এখন বাথরুম টু বেডরুম দৌড়ানি দিচ্ছে। ‘
‘ প্রভার এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে দোস্ত। ‘
‘ কি হয়েছে! কোন প্র..বলিস কি!! ওই ডাইনির কপালে জ্বিন জুটছে কবে? ‘
‘ এতো কিছু ভাবতে পারছি না। আয়ান কি বাসায়? ‘
‘ হুহ! এই ডাইনির শোকে ওই ব্যাটা দেবদাস হয়ে ঘরে পড়ে আছে। তুই আয় আমি দেখছি আয়ান্ন্যারে। ‘
‘ না না তোরা থাক ক্যাম্পাসে। আমার ব্যাপারটা সামলে নিস। আমি আয়ানের বাসায় যাচ্ছি। ‘

চঞ্চল হাতে তৃতীয় বারের মতো কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে গেলো। গাঢ় সবুজ শাড়ি পরিহিতা মাঝবয়েসী নারীটিকে দেখে মিষ্টি হেসে সালাম জানালো তোহা। তিনিও হাসিমুখে জড়িয়ে ধরলেন তোহাকে। ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে ঘরে ঢুকালো তোহাকে।
‘ বাব্বাহ! আজ কি করে এমুখো হলি বলতো? ‘
‘ আর বলোনা আন্টি। তোমার লাগামছাড়া ছেলে জীবন নরক করে দিলো সবার। কাল প্রোগ্রাম আমাদের, অথচ এই ছেলে ঘরে মুখ লুকিয়ে বসে আছে। এজন্যই আমাকে আসতে হলো। ‘

‘ ভালো করেছিস। না জানি কি হয়েছে হঠাৎ। কাল খুব উৎসাহ নিয়ে নাজরাতের আকদে্ গিয়েছিল। বলেছিলো বর আসবে সন্ধ্যায়, সে বাসায় ফিরবে রাত করে। কিন্তু সন্ধ্যা হতে না হতেই ঘরে ফিরে এসেছে। না কিছু খেয়েছে, না এখনো বের হচ্ছে ঘর থেকে। এতো বড় ছেলের পিছনে কতোক্ষন ঘ্যানঘ্যান করা যায় বলতো মা!! ‘
‘ চিন্তা করছো কেনো! সেই ছোট্ট বেলা থেকে দেখে আসছি আয়ানের এসব ত্যাড়ামি। এক্ষুনি বের করছি এই ঘরকোনা-টা কে। ডুপ্লিকেট চাবি দাও আমাকে। ‘

চাবির সাহায্যে দরজা খুলে রুমে পা রাখতে ভ্যাপসা একটা গন্ধ এসে নাকে লাগলো তোহার। অন্ধকার রুম। পর্দা টানা জানলা দিয়ে অল্প আলো আসছে, সেই আলোতেই দেখতে পায় বিছানায় এলোমেলো অবস্থায় চাদর পেঁচিয়ে শুয়ে থাকা আয়ানকে। জানালার পর্দা মেলে দিয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে পানি ভর্তি গ্লাস হাতে তুলে নিলো তোহা। রোদের ঝলকানিতে চোখ কুচকে ফেললো আয়ান। পরপরই তার মুখে পানি ছুড়ে মারলো তোহা। ধরফরিয়ে উঠে বসলো আয়ান। তোহাকে দেখে চমকালো ভীষণ।

‘ তুই!! তুই সকাল সকাল এখানে কি করছিস? ‘
‘ একটু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখ, সকাল আর সকাল নেই। বেলা গড়িয়ে দুপুর হচ্ছে। ‘
‘ সে যাই হোক। তুই এখানে এসেছিস কেনো? ‘
‘ ছিঃ ছিঃ!! এই তোর বন্ধুত্ব? সেই ছোট্ট বেলা থেকে একসাথে কোলে পিঠে মানুষ হয়েছি একসাথে। আর এখন তোর বাসায় আসতে আমার কারণের দরকার পড়লো! আল্লাহ! এই দিনটা দেখার আগে তুমি চশমা অফার করলে না কেনো!! ‘

‘ দেখ তোহা,এমনিতেই মাথা খারাপ আমার। অযথা ঘ্যানঘ্যান না করে কি দরকারে এসেছিস সেটা বল। ‘
‘ তোকে নিয়ে যেতে এসেছি। উপর মহল থেকে অর্ডার এসেছে। ‘
‘ আমি কোথাও যাচ্ছি না। ভালো লাগছে না আমার। তুই যা এখান থেকে। ‘
দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরে বসে রইলো আয়ান। তোহাও নিঃশব্দে গিয়ে বসলো তার পাশে। নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ ব্রেকাপের পর তো স্বাভাবিক ছিলি। চার মাস হয়ে গেছে তোদের বিচ্ছেদের। আজ হঠাৎ তাহলে ওকে অন্য কারো সাথে দেখে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিস কেনো?? ‘
‘ তারমানে তুই দেখেছিস ওর এনগেজমেন্টের ছবি? এজন্যই এসেছিস এখানে। ‘
‘ হ্যাঁ। দেখ, ফায়াজ আর নুহাশ থেকে তুই খুব ম্যাচিউর। প্রত্যেকটা কিছুতে আগ-পিছ ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়া থাকিস। ভালো খারাপের ধারণা বাকি বন্ধুদের চেয়ে তোরই বেশি। অথচ তুই -ই জীবনে প্রথম ভুলটা করলি একটা ভুল মানুষকে ভালোবেসে। ‘

‘ ওটা ভালোবাসা ছিলো না। ‘
‘ তাহলে কী ছিলো? যদি ভালো নাই বাসিস তাহলে এতো কষ্ট পাচ্ছিস কেনো? ‘
‘ আমি মোটেও কষ্ট পাচ্ছি না তোহা। প্রভার সাথে আমার সম্পর্ক কেমন তোরা ভালো করেই জানিস। আমার ভালো লাগতো ওর সঙ্গ। দেখতে সুন্দরী ছিলো বলে আকর্ষিত হয়েছিলাম। আর সেও যখন হুট করে প্রপোজ করলো আমি না করার কারণ দেখিনি। কিন্তু এতো মেলামেশার পরেও কখনো আমি ওর কাছে সেই মানসিক শান্তিটা পায়নি যেটা আমি তোদের কাছে পায়। হ্যাঁ, বন্ধু আর গার্লফ্রেন্ড এর আলাদা জায়গা হয়। তবে আমি খুব পরে হলেও বুঝতে পেরেছিলাম সে আমার জন্য নয়। প্রথম প্রথম ওর যে ব্রেইব বিহেভিয়ার, খোলামেলা চলাফেরা, চঞ্চল স্বভাবগুলো আমার নজর কেড়েছিলো, ধীরে ধীরে সে স্বভাবগুলোর জন্য আমার কাছে ও বিরক্তির কারণ হয়ে দাড়ালো। জানিস তো,আমি যথেষ্ট চুপচাপ স্বভাবের। সবসময় সবকিছু মুখ ফুটে আমি বলি না। আর সে কখনো চেষ্টাও করেনি কিছু বুঝে নেওয়ার।

সেসব কিছুও আমি মেনে নিয়েছিলাম। কারণ আমি ভেবেছি আমি তাকে ভালো না বাসলেও সে বাসে। যেটা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে জঘন্য একটা ধারণা। সম্পর্কের সাত মাসের মাথায় যখন সে জানালো আমার সাথে ওর যাচ্ছে না। সি ডিজার্ভ বেটার দ্যান মি! সেদিন আমার খুব রাগ হয়েছিলো। আমাকে ডাম্প করে চলে গিয়েছে সে। যেখানে ওর সব উশৃংখলতা আমি মুখ বুজে সহ্য করে গিয়েছিলাম। হাজারটা ছেলের সাথে মেলামেশা দেখে রাগ না করে বুঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। আর সে আমাকে বলে গেছে আমার মানসিকতা খারাপ। আমি ওভার এগ্রেসিভ। আমার সাথে সে এমন বাধাঁ বাধাঁ জীবন কাটাতে পারবে না। সি ওয়ান্ট ফ্রিডম। ফাক হার ফ্রিডম। ‘

শেষের কথাটা রাগে চোয়াল শক্ত করে বললো আয়ান। তোহা মুখ কুঁচকে ফেললো সেটা শুনে। একসাথে এতো কথা বলে বড় বড় দম নিলো আয়ান। সে কখনোই এতো কথা একসাথে বলে না। সময় সুযোগ বুঝেই বলে। আয়ানের এতো কথার প্রেক্ষিতে তোহার কোনো রিয়েকশন না দেখে তার কাধে ধাক্কা দিলো আয়ান।
‘ কানা থেকে বোবা বনে গেলি নাকি? ‘
‘ জ্বি না। তোর মাউথ স্প্রের সু গন্ধে নাকা বনে গেছি। ফ্রেশ হয়ে আয় যাহ!! ‘
আয়ান বালিশ ছুড়ে মারলো তোহার উপর। তোহা হাসতে হাসতে লুটিপুটি খাচ্ছে। আয়ান বেড সাইড টেবিল থেকে পানির জগটা হাতে নিতেই তোহা অলিম্পিক স্পিডে দিলো ভো দৌড়। সেদিকে তাকিয়ে শব্দ করে হাসলো আয়ান। খিটখিটে মেজাজটা এখন খানিক ফুরফুরে হয়েছে মনের কথাগুলো বলতে পেরে। এখন আর ঘরে বসে থাকা যাবে না। নাহলে তাকে দেবদাস উপাধি দিতে বেশি সময় নিবে না তার গুণধর বন্ধুরা।

এই নিয়ে ছয় বারের মতো ফোন করলো নীতি। কিন্তু সায়েরী রিসিভ করলো না। হোক আজকে লাস্ট রিহার্সাল। সে যাবে না ওই রুমে। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। জেনে শুনে সিংহের গর্তে পা দেওয়ার কোনো মানেই হয়না। তাই তো কলেজে আসার পর থেকে অনার্স ভবনের পাশ দিয়ে পা মাড়ায়নি সে। এখন বসে আছে লাইব্রেরি রুমে। আজ লাইব্রেরি সম্পূর্ণ খালি। সবাই হয়তো প্রোগ্রামের আয়োজনে ব্যস্ত। ভালোই হলো। এখানে আরাম করে কিছুক্ষণ সময় কাটানো যাবে। সে আসতেই চায়নি আজ। শুধু মাত্র নাজরাতের জোড়াজুড়ি তে আসতে হলো। এখন কি করবে সে এই লাইব্রেরি রুমে একা বসে বসে! না আছে চিপস, না কথা বলার মতো কেউ। সায়েরী কিভাবে কাটাবে চুপচাপ এতো সময়! বুকসেল্ফ থেকে অনেক বাছাইয়ের পর “ফ্রিডম এট মিডনাইট” বইটি নিয়ে দুয়েক পাতা পড়লো সে। তখনই তুমুল জোরে বেজে উঠলো মোবাইলটা। সায়েরীর মনে হলো আর একটু হলেই যেনো তার ছোট্ট হার্ট-টা ব্লাস্ট হয়ে যেতো। আননোন নাম্বার দেখে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে শেষমেশ কল রিসিভ করলো সে।

‘ আসসা.. ‘
‘ হেই পার্টনার! কোথায় তুমি? ‘
‘ মিহাদ ভাইয়া? ‘
‘ আমিও তো জানি আমার নাম মিহাদ। কিন্তু তুমি বলো তুমি কোথায় আছো? এভাবে শেষ সময়ে এসে তুমি এতোবড় প্রতারণা করে,আমাকে মাঝপথে ছেড়ে যেতে পারোনা পার্টনার। প্লিজ কাম টু মি..থুক্কু প্লিজ কাম টু রিহার্সাল রুম। ‘

‘ কিন্তু আমি তো নেই। ‘
‘ নেই মানে? ও মাই আল্লাহ! আমি কি আত্মার সাথে কথা বলছি? এতো অকালে তুমি অক্কা পেলে কি করে হ্যাঁ? এবার আমার কি হবে!!! ‘
‘ মিহাদ ভাইয়ায়া!!! দয়া করে আমাকে বলতে দিবেন কিছু? ‘
‘ বাচ্চা কাচ্চা মানুষের এতো গলায় জোর! আচ্ছা চুপ করলাম। গাও তুমি। ‘
‘ আগে আপনি বলুন আপনি কোথায় আছেন? ‘
‘ কোথায় আবার! রিহার্সাল রুমে। ‘
‘ ওহ! আচ্ছা ওই অ্যানাক…..(ফিসফিস করে) না মানে সাফওয়ান ভাই কি আছে? ‘
সায়েরীর এমন চুপিচুপি করা প্রশ্নে মিহাদও সায়েরীর মতো ফিসফিস করে বললো,

‘ তুমি কি এই জুনিয়র খান সাহেবকে নিয়ে ভয় পাচ্ছো নাকি পার্টনার? আরে ফিকার নট। তোমাকে আবরারের সাথে কোলে পিঠে মানুষ করেছি কি এই ব্যাটার ভয়ে ভয়ে বেঁচে থাকার জন্য নাকি হুহ! আমি থাকতে এই সাফওয়ানের বাচ্চা তোমার দিকে বাঁকা চোখেও তাকাতে পারবে না। সে আবার আমাকে খুব মানে তো,আমার কথার খিলাফ করবে না। তুমি নিশ্চিন্তে চলে এসো। ‘
মিহাদের কথায় শব্দ করে হেসে উঠলো সায়েরী। সাফওয়ানের সামনে থাকলে এতোক্ষণ ভেজা বিড়ালের মতো মিয়াও মিয়াও করতে থাকতো মিহাদ। আর এখন বড় গলা করে দাপট দেখাচ্ছে।

যাইহোক, মিহাদের সঙ্গ পেয়ে মনে খানিক সাহস জুগিয়ে রুম থেকে বের হলো সে। তৃতীয় তলাটা আজ জনমানবহীন। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো সে। সিড়ির পাশের রুম ক্রস করে যাওয়ার সময় হঠাৎই কেউ বেরিয়ে আসলো রুম থেকে। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ধাক্কা লাগলো দুজনের। সায়েরী মুখ থুবড়ে পড়লো অজানা মানবের বলিষ্ঠ দেহের উপর। তার বুচা নাকটা মনে হয় আরো ঢেবে গিয়েছে। নাকে হাত দিয়ে মাথা উঁচু করে যেই কিছু বলতে যাবে অমনি কেউ তার হাতের বাহু চেপে হ্যাঁচকা টানে রুমের ভিতরে ছুড়ে ফেললো।

পড়তে গিয়েও বেঞ্চ ধরে নিজেকে সামলে নিলো সায়েরী। সম্মুখে চোয়াল শক্ত করে রাগী চোখে তাকিয়ে থাকা সাফওয়ানকে দেখে গলা শুকিয়ে আসলো তার। ব্রাউন গেঞ্জিটার হাতা গুটিয়ে সায়েরীর দিকে এক পা এগিয়ে আসতেই দু তিন পা পিছিয়ে বেঞ্চের সাথে ঠেসে দাড়িয়ে গেলো সায়েরী। কিন্তু সাফওয়ান থামলো না। গম্ভীর মুখ করে খুব কাছাকাছি এসে ধপ করে দুহাত রাখলো সায়েরীর দুপাশে বেঞ্চটাই। ভারী আওয়াজে কেঁপে উঠে চোখ খিচে বন্ধ করে ফেললো সায়েরী। সাফওয়ানের এতো কাছাকাছি আসাতে বুকের ভিতরটা দুরুদুরু করছে তার।কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই শোনা গেলো সাফওয়ানের রাশভারি কন্ঠ…

‘ সেদিন তো খুব বড় গলা করে আমাকে ফাঁসিয়ে এসেছিলে। এখন ভয় পাচ্ছো কেনো? ‘
‘ সস..সরি ভভা..ভাইয়া আমমিইই.. ‘
‘ শাট আপ! এমন একটা চিপ মেন্টালিটির কান্ড ঘটানোর আগে মাথায় আসেনি এর পরিণাম কি হতে পারে? (একটু থেমে) অবশ্য তোমার মতো মাথা মোটা মেয়ের কাছ থেকে এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করাও যায় না। ব্লাডি স্টুপিড।
অপমানে মুখখানা চুপসে গেলো সায়েরীর। সাফওয়ানের অপমানসূচক কথায় ঘোর বিরোধিতা করে বললো,
‘ আমি মাথা মোটা হলে আপনি কি তবে? কে বলেছিলো আমাকে দরজার সাথে অমন করে চেপে ধরতে? আপনি ওভাবে আটকে না রাখলে তো আমরা… ‘
“চেপে ধরছে!”
“দরজার সাথে!”

হঠাৎ চিৎকার শুনে ভরকে গেলো সাফওয়ান ও সায়েরী। ঘাড় ফিরাতেই দেখলো দরজার মুখে আতংকিত মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে মিহাদ এবং নীতি। তাদের অবিশ্বাস্য দৃষ্টি সাফওয়ান এবং সায়েরীর দিকে। ব্যাপারখানা বোধগম্য হতেই দ্রুত সায়েরী থেকে সরে দাড়ালো সাফওয়ান। বলল,
‘ তোরা এখানে কি করছিস? ‘
রুমে প্রবেশ করতে করতে মিহাদ হাহাকার করে বলে উঠলো,
‘ এখানে না এলে আজ এই সিন কি করে দেখতাম! (সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে) তুই!তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি আমি? আজ আমাকে এই দিনটাও দেখতে হলো! ছিঃ ছিঃ ছিঃ তুই এমনটা কি করে করতে পারলি সাফওয়ান! এই মেয়েকে তুই দরজার সাথে চেপে ধরেছিলি! এখন আবার ফাকা রুমে কাছাকাছি… আল্লাহ! এই দৃশ্য দেখার আগে লেন্স এর ব্যবস্থা করলে না কেনো? ‘

‘ চুপ! না জেনে উল্টাপাল্টা বকবি না। ‘
‘ উল্টাপাল্টা বকলো কই! মাত্রই সায়েরী বললো তুই ওকে দরজার সাথে চেপে ধরেছিলি। তাই না সায়েরী? ‘
নীতির প্রশ্নের জবাবে সরল মনে মাথা নেড়ে সায় জানালো সায়েরী। সম্মতি পেয়ে আবারো হায় হতাশ শুরু হয়ে গেলো মিহাদের। অন্যদিকে সায়েরীর এমন বোকাদের মতো আচরণে সাফওয়ানের রাগ বাড়লো আরো একধাপ। দাঁতে দাঁত চেপে সে তিরস্কার করে বলে উঠলো,
‘ মাথা মোটা কোথাকার! ‘

কথাটা কানে যেতেই চটে গেলো সায়েরী। কেনো তাকে বারবার অপমান করে এই ছেলে! সে কি মিথ্যে কিছু বলেছে নাকি! মিহাদ ও নীতি থাকায় সাহস জুগিয়ে চড়া গড়ায় অভিযোগ করে উঠলো সায়েরী,
‘ আপনি কেনো বারবার আমাকেই দোষারোপ করছেন! আমি বলেছিলাম আপনাকে ওই রুমের বাইরে এসে দাড়ানোর জন্য? না আপনি এসে আমাকে আটকাতেন না ওই সিচুয়েশনে আমাদের পড়তে হতো। কালকের প্রোগ্রামটাই মাটি করে দিয়েছেন আপনি। আপনার জন্য ঠিকঠাক টাকাও নিতে পারিনি। ‘
‘ ওহ! এজন্যই প্রতিশোধ নিতে তুমি জুস ফেলে আমার জামা নষ্ট করেছিলে তাইতো? ‘
‘ ওটা ভুলক্রমে হয়েছে। তাই বলে আপনি আমাকে কোলে তুলে ফেলে দিলেন? ‘

বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো সাফওয়ান। গাল ফুলিয়ে অসহায় ভরা তপ্ত শ্বাস ফেললো বেশ কয়েকটা। এই মেয়েকে দিয়ে কিছু হবেনা। কোন জায়গায়, কার সামনে কি বলতে হয় এই সেন্সটুকুও নেই এই মেয়ের মাথায়। আড়চোখে একবার মিহাদ ও নীতির দিকে তাকালো সে। অতি বিষ্ময়ে যেনো পাথর বনে গেছে তারা দুজন। হা করে ড্যাবড্যাব চোখে তারা একবার সায়েরীর দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার সাফওয়ানের দিকে। তাদের চাহনির অর্থ সায়েরীর মোটা মাথায় না ঢুকলেও সাফওয়ান বুঝতে পারলো স্পষ্ট। বুঝতে পেরেই চরম অস্বস্তিতে পড়ে গেলো সে। কথা ঘোরাতে প্রশ্ন করলো,

‘ তোরা এখানে কি কারণে এসেছিলি? ‘
মিহাদ ফট করে জবাব দিলো
‘ কোলে নিতে! ‘
‘ হোয়াট! ‘
‘ ন..না ম.মানে ইনফর্ম করতে এসেছিলাম। তোর সো কল্ড ফ্যামিলি ফ্রেন্ড জেদ ধরেছে, কাল প্রোগ্রামে সে তোর সাথে ডুয়েট করবে। এমন কি হয় নাকি বল! এতোদিন তার কোনো হদিস ছিলো না। আর আজ এসেছে এসব আজাইরা প্যাছাল নিয়ে।রিডিকিউলাস। ‘
‘ ওকে বলে দে কাল আমার কোনো পারফরম্যান্স নেই। অযথা যাতে ঝামেলা না করে। ‘
‘ মানে কি সাফওয়ান! মজা করছিস তুই? তোকে ছাড়া প্রোগ্রাম হবে? ‘
নীতির প্রশ্নে সাফওয়ান বিরক্ত মুখে জবাব দিলো,

‘ আমি কি কলেজ অথরিটি যে আমাকে ছাড়া প্রোগ্রাম হবে না? জিমন পরিচালনা করবে। তোর সাথে রায়ান আছে তো সব দেখার জন্য। আমি থাকবো ক্যাম্পাসে। আমার যা রেসপনসেবলিটি আছে সব পূরণ করবো। তোদের ফালতো চিন্তাভাবনা শেষ হয়ে থাকলে নিচে আয়। ‘
ধুপধাপ পা ফেলে রুম ত্যাগ করলো সাফওয়ান। যেতে যেতে এক শক্ত চাহনি ছুড়ে দিলো সায়েরীর দিকে। সায়েরী কি বুঝলো সে চাহনির অর্থ! হয়তো বুঝেছে। সেই সাথে এ ও বুঝে নিয়েছে যে সাফওয়ান মনে মনে আরো একবার তাকে মাথা মোটা বলে আখ্যায়িত করে গিয়েছে। নীতি আর মিহাদের দিকে চোখ পড়তেই ভড়কে গেলো সায়েরী। দুজনেই কেমন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার আছে।
‘ এই রাগের ভান্ডার তোমাকে কোলে তুলেছিলো! ‘

মিহাদের কোতুহলী কন্ঠ। অস্বস্তিতে মিইয়ে গেলো সায়েরী। আমতাআমতা করে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই তার মোবাইলটা বেজে উঠলো। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সে। অজুহাত দেখিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। তার গমন পথের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো বাকি দুজন। ব্যাপারটা যেনো হজম করতে পারছে না তারা। এসিপি পদ্মমানের মতো আঙ্গুল নাচিয়ে মিহাদ বললো,
‘ পাতা লাগাও নীতি পাতা লাগাও। ডাল মে কুচ তো পিলা হে। ‘
‘ কালার জায়গায় তুই পিলা পাইলি কই? ‘
‘ আবে গাধী প্রেমের রঙ কি কালো হয় নাকি? ‘
‘ তোকে কে বললো ওরা প্রেম করছে? ‘
‘ এখন করছে না কিন্তু করতে কতোক্ষন! ‘

‘ সিরিয়াসলি মিহাদ! সাফওয়ান আর সায়েরী! তুই ভাবতে পারছিস কি বলছিস সেটা? এই বাচ্চা মেয়েকে সাফওয়ান একহাতে মোচড় দিলেই তো ভেঙে গুড়িয়ে যাবে সে। তোর মনে হয় তার দ্বারা সম্ভব সাফওয়ানের রাগ, জেদ সামলানো? ‘
গভীর ভাবনায় বিভোর হয়ে কিছু ভাবলো মিহাদ। গম্ভীরমুখে বললো,
‘ মেইন পয়েন্ট তো সায়েরী নয়। সে কি ফিল করলো না করলো হু কেয়ার’স! ‘
‘ মানে? ‘

‘ মানে হচ্ছে এই রাগী বাবাজী।আজ সে সায়েরীর কাছাকাছি এসেছে। যেখানে তোকে আর ইরাবতী…মানে ইরাকে ছাড়া অন্য কাউকে সে পাশ ঘেষতেই দেয়না। সেই জায়গায় নিজ থেকে সায়েরীর কাছে আসা মানে তো অনেক বড় কিছু। সাফওয়ান যদি একবার স্থির করে সায়েরী তার। তাহলে তাকে আটকানোর সাধ্য কিন্তু কারোরই নেই। সেটা তুইও জানিস আর আমিও জানি। ‘
‘ হতে পারে তুই বেশি বেশি ভাবছিস। ‘
‘ হতে পারে। কিন্তু একটা চেষ্টা করে দেখলে ক্ষতি কি! ‘
‘ কীসের চেষ্টা? ‘
মিহাদ রহস্যময় হাসে। যদি তার ধারণা সঠিক হয় তবে সাফওয়ানের মনে একটু হলেও সফট কর্ণার আছে সায়েরীর জন্য। এবার শুধু একটু বাজিয়ে দেখার পালা।

‘ মিহাদ ভাইয়া, কিছুক্ষণ পর রিহার্সাল করলে হয়না! আমার খিদে পেয়েছে। ‘
‘ খিদে পেয়েছে! কিন্তু ঘন্টা খানিক আগেই তো কেক খেয়েছো দেখলাম। ‘
‘ আরে ওটা তো তখনের ক্ষুধা মিটাতে খেয়েছি। এখন নতুন খিদা লেগেছে। কেক খেয়েছি তিন ভাগের এক অংশের অর্ধেক । এখন নতুন খিদাটা মিটাতে হবে। আমি যাচ্ছি, হ্যাঁ? ‘
মিহাদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সায়েরীর যাওয়ার পথে। কি বলে গেলো মেয়েটা! নতুন খিদা, পুরাতন খিদা! খিদা কি আবার প্রকারভেদে হয় নাকি! পাশ থেকে নীতি হাল্কা ধাক্কা দিলো মিহাদকে। কাজে মনোযোগ দিতে দিতে বললো,
‘ এতো বুঝার চেষ্টা করিসনা ভাই। এটা সায়েরী। তার লজিক তোর মাথার উপর দিয়ে যাবে। ‘

মনের খচখচানি নিয়ে আবারো ফোন চেক করলো নজরাত। নাহ! কোনো মেসেজ, কল কিছুই নেই। দিনের অর্ধেক কেটে গেলো অথচ সাদিফ একটাবার খোঁজ নিলো না তার! অভিমানে ভিতরটা চুরমার হয়ে যাচ্ছে নাজরাতের। এই তার ভালোবাসা! দিন পেরুতেই ভুলে গেলো যে তার বিয়ে করা একটা বউও আছে। নাজরাত কয়েকবার ভাবলো নিজ থেকে একটা ফোন করবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই পিছিয়ে গেলো সে। কেনো সে আগ বাড়িয়ে জানতে চাইবে! করবে না ফোন,যতক্ষণ না সাদিফ নিজ থেকে খোঁজ নিচ্ছে নাজরাত ফিরেও তাকাবে না। মনে মনে সাদিফকে নিয়ে আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝে হঠাৎ সায়েরীর চিৎকার শুনে চমকে উঠলো নাজরাত।

‘ কীহ? শাড়ি!! পাগল হয়ে গেলি তোরা? ‘
‘ আজব! পাগল হবো কেনো! প্রোগ্রামের থিম হচ্ছে শাড়ি আর পাঞ্জাবি। আমাদের ব্যাচ আর অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ড্রেস কোড হচ্ছে হোয়াইট আর গোল্ডেন অথবা হোয়াইট আর রেড। আমি আর তোহা তো ভেবে নিয়েছি কোন রঙের শাড়ি পরবো। ‘
মুখখানা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো সায়েরীর। যে মেয়ে ঠিকঠাক গায়ে সালোয়ার কামিজের উড়না সামলাতে হিমশিম খায়। সে পড়বে শাড়ি! অসম্ভব! এমন ভরা মজলিসে শাড়ি পড়া মানে স্ব-ইচ্ছায় নিজেকে হাসির পাত্রি বানানো। সায়েরী জীবনেও করবে না এই কাজ।

‘ অসম্ভব! আমি এসব শাড়ি টারি তে নেই। আমাকে দিয়ে হবে না এসব। ‘
‘ তুই বেশি বেশি ভাবছিস সায়ু। সাফা, আমি আর নাজরাত যদি পড়ি তাহলে তুই কেনো বাদ যাবি হ্যাঁ! দরকার হলে প্রতি ভাজে ভাজে পিন লাগিয়ে রাখিস তবুও শাড়ি পড়ে আসিস দোস্ত প্লিজ। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮

দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বললো সায়েরী। জীবন গেলেও এই ফালতু কাজ করবে না সে। ইম্পসিবল। অসহায় ভরা শ্বাস ফেললো তোহা ও সাফ্রিন। এই মেয়েকে যে মানানো যাবে না সেটা তারা বুঝে গেছে। অন্যদিকে সায়েরী গভীর ভাবনায় ডুব দিলো। যেখানে দেখতে পেলো বাঙালি সাজে হাজারটা ছেলে মেয়ের মাঝে গোল হোয়াইট গাউন পরিহিতা এক অসহায় অবলা নারী। একি! মেয়েটা তো তার মতোই দেখতে! সবাই কেমন বাঁকা বাঁকা নজরে তাকাচ্ছে তার দিকে। আজব! সে কি বিনা কাপড়ে এসেছে নাকি! কাপড় পড়েই তো এসেছে। এমন হেনস্তা করার মানে কি ভাই!! এদের এই চাহুনি সারাটাদিন কীভাবে সহ্য করবে সায়েরী! হাউ!!!!

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১০