Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১১

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১১

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১১
সাজিয়া জাহান সুবহা

‘ আস্তে হাট বলদ। শুকনো মাটিতেও কেউ হোচট খায়? চারচোখ কি কম পড়েছে নাকি? আরো দুটো এনে দেবো? ‘
বিরক্ত মুখে আয়ানের বাহুডোর থেকে সরে আসলো তোহা। শাড়ী ঠিক করে চোখের চশমাটা আরেকটু ঠেলে দিয়ে মুখ কুঁচকে চলে গেলো আগের স্থানে। আয়ান ভারী অবাক হলো তোহা তাকে ইগনোর করছে দেখে। নুহাশ এবং ফায়াজ শব্দ করে হেসে উঠলো। সেই সকাল থেকেই তোহা আয়ানকে এড়িয়ে এড়িয়ে চলছে। বিষয়টা সবারই নজরেই আসলো। কিন্তু কারণ খুঁজে পেলো না কেউ। পাবে কি করে, যেখানে আয়ান নিজেই অবগত নয় তোহার রাগের কারণ সম্পর্কে। বাকি বান্ধবীদের চেয়ে তোহা একটু নাদুসনুদুস টাইপের। হাইট টাও মোটামুটি। আজকে সাদা পাড়ের লাল শাড়িতে তাকে একদম পুতুল পুতুল লাগছে। এখন আবার গাল ফুলিয়ে বসে আছে।

নুহাশ সবসময় তোহাকে খ্যাপানোর জন্য “আলুর বস্তা” বলে ডাকে। আজ আয়ানের মনে হলো এই আলুর বস্তাটা গাল ফুলিয়ে থাকলে ভীষণ কিউট লাগে। বাকি বন্ধুদের চেয়ে আয়ান খুবই বুঝদার। তোহা এবং নুহাশের হাজার ঝগড়া মিটমাট করেছে সে। সর্বদা চেষ্টা করে এসেছে এই বন্ধুত্বে যাতে কখনো ফাটল না ধরে। অথচ আজকে এই বিনা দোষী আয়ানের উপর রাগ করে আছে তোহা! ব্যাপারটা মোটেও হজম হচ্ছে না আয়ানের কাছে। সে কিছু বলবে সেই আশায় তোহার কাছে যেতে নিলেই তোহা উঠে চলে গেলো। উপায় না পেয়ে আয়ানও গেলো পিছে পিছে।
দীঘির পাড়টা আজ নিরিবিলি। সেখানে একটু স্বস্তিতে কিছু মুহুর্ত কাটাবে বলে এসেছিলো তোহা। কিন্তু হুট করেই আয়ান এসে হাত টেনে ধরে তার। কনুইয়ে টান নিজের মুখোমুখি করে জিজ্ঞেস করে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ সমস্যা কি! এমন করছিস কেনো সকাল থেকে? ‘
হাত ছাড়ানোর জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করলো তোহা। কন্ঠে রাগ নিয়ে বললো,
‘ হাত ছাড় আয়ান। সর সামনে থেকে। সহ্য হচ্ছে না তোকে। ‘
‘ আরে বাপ বলবি তো কি হয়েছে। মাথায় কি ভূত চেপেছে নাকি? ‘
‘ হ্যাঁ চেপেছে। তোর কি তাতে? হাত ছাড় বলছি। তোর সো-কল্ড গার্লফ্রেন্ডগুলোর মতো না আমি। যে হাত ধরবি আর চুপচাপ হজম করে নিবো। ‘

হাতজোড়া আপনাআপনি আলগা হয়ে গেলো আয়ানের। অবিশ্বাস্য নয়নে সে তাকালো তোহার দিকে। প্রবল আত্মসম্মানবোধ রয়েছে তার৷ তোহাও জানে ব্যাপারটা। আর জেনে বুঝেই আজ সে ইন্ডিরেক্টলি আয়ানকে ক্যারেক্টারলেস বলেছে! তোহা বলেছে! গার্লফ্রেন্ডগুলো বলতে কি বলতে চেয়েছে তোহা? ক’টা গার্লফ্রেন্ড তার! একমাত্র প্রভা ছিলো। তাও কিনা ৬-৭ মাস আগেই ব্রেকআপ হয়ে গিয়েছে। তোহা জানে সবটা। তবুও এমন জঘন্য কথা কি করে বলতে পারল সে! আয়ান কিছু বলবে তার আগেই পার্স থেকে একটা খাম বের করে আয়ানের দিকে ছুড়ে মারলো তোহা। কন্ঠে ক্ষোভ নিয়ে বললো,

‘ নে ধর। রিটার্ন চিঠি পাঠিয়েছে তোর নিউ ক্রাশ। এবার মন খুলে প্রেম কর গিয়ে। ‘
আয়ানের জবাবের অপেক্ষায় না থেকে গটগট করে চলে গেলো তোহা। আয়ান বুঝে উঠতে পারলো না কোন ক্রাশের কথা বলে গেলো তোহা। সে তো কোনো ক্রাশ ফ্রাশকে চিঠি পাঠায়নি। আর এই যুগে এসে গাধার মতো চিঠি পাঠাতে যাবেই বা কেনো!
হাতের খামটা উলটে পালটে দেখলো সে। এককোণায় ছোট্ট করে লিখা আছে “মিনি সিদ্দিকী”। ভারী অবাক হলো আয়ান। এই নামের কাউকে তো সে চিনেই না।

কাগজের টুকরোটার ভেতর থেকে ভেসে আসা তাজা বেলি ফুলের গাজরাটা দেখে ভারী অবাক হলো সায়েরী। কিন্তু তার চেয়ে দ্বিগুণ অবাক হয়ে গাজরাটা একপ্রকার ছিনিয়ে নিলো নীতি৷ অবাক কন্ঠে বললো,
‘ সাফওয়ান তোমাকে গাজরা দিয়েছে কেনো? মাই গড! আমি কি কিছু মিস করে গেলাম নাকি? তুমি..তুমি সত্যি করে বলোতো কি চলছে? ‘

থমথম খেয়ে গেলো সায়েরী। কি চলছে মানে কি? কি চলবে আবার! ওই গোমড়ামুখো দৈত্য দানবটা গাজরা দিলো কেনো সেটা সায়েরী কীভাবে জানবে?? হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে সায়েরী বলে উঠলো,
‘ আরে আপু, আমি তো ভাইয়াকে বলেছিলাম গাজরা এনে দিতে। কিন্তু ভাইয়া ভুলে দিয়েছিলো। আমি রাগ করেছি বলেই হয়তো সাফওয়ান ভাইকে বলেছে। ‘

ভ্রুঁ কুঁচকালো নীতি। আবরার বললো আর সাফওয়ান রাজি হয়ে গেলো ফুল কিনতে!! ধুর! সে হয়তো বেশি বেশি ভাবছে। নিশ্চয়ই আবরার জোর করেছে। নাহয় কারো কথায় চলার মানুষ তো সাফওয়ান না। আপাতত বেশি না ভেবে সায়েরীর খোপায় বেলি ফুলের গাজরাটা সুন্দর করে লাগিয়ে দিলো। বাহ! এই জিনিসটারই কমতি ছিলো বোধহয়। স্টেজে থেকে জিমনের গলার আওয়াজ ভেসে আসতেই সতর্ক হলে গেলো সকলে। সারি সারি চেয়ারগুলোতে বসে পড়লো স্টুডেন্টসরা। যাদের পার্ফমেন্স আছে শুধু তারাই আলাদা রইলো। জিমন খুব সুন্দর করে স্বাগতম জানালো নতুন অতিথিদের। কিছু সিনিয়র এসে হাতে হাতে ফুল দিয়ে নতুন যাত্রায় স্বাগতম করলো সকলকে।

স্টেজের পেছন দিকটায় সব পারফর্মারদের সাথে মিহাদের অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকা সায়েরীর নজর পড়লো কাঠফাটা রোদের উত্তাপে ঝলসে যাওয়া বিশাল মাঠের এককোনায় শুভ্র রঙের পাঞ্জাবি পড়া যুবকটার উপর। পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে ব্যাস্ত পায়ে এগিয়ে আসছে সে। তার হালকা ব্রাউন সিল্কি চুলগুলো রোদের ঝলকানিতে চিকিচিক করছে। ধবধবে ফর্সা নাকটা গরমে লালছে আকার ধারণ করেছে। ঘামে ভেজা শরীরটাতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে তার জিম করা পেশিবহুল বাহু। পাঞ্জাবির হাতা ফেটে যেনো বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে সেগুলো। কি ভীষণ বিরক্তিতে চেপে ধরছে নিচের দিকের লালছে ঠোঁটটা। বরাবরের মতোই কুঁচকে রাখা কপাল। শক্ত চোয়াল। বহু বহু দিন পর আজ যেনো সায়েরী এভাবে দেখছে এই গোমড়ামুখো ছেলেটাকে। মনের কোনে ক্ষনিকের জন্য সে আবারো আকর্ষিত হয়ে উঠছিলো যুবকটার সুদর্শন রূপে৷ চারবছর আগের মতো আজও সায়েরীর মন মস্তিষ্ক প্রশ্ন তুললো “ছেলেরা এতো সুন্দর হয় নাকি! তাও আবার এমন রগচটা, খারাপ ছেলে। উপর ওয়ালা যেনো খুব নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছে এই ছেলেকে। কিন্তু স্বভাব পেয়েছে সুদর্শন চেহারাটার চেয়ে অত্যাধিক কুৎসিত। এমন বাজে ছেলের সাথে এই রূপ যেনো একেবারেই বেমানান।”

‘ মিহাদ কোথায়, নীতি? ‘
গম্ভীর কন্ঠটা কর্ণগোচর হতেই চমকে উঠলো সায়েরী। এতোটা ভাবনায় বিভোর ছিলো যে কখন সাফওয়ান সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা ঠেরই পায়নি। তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নিলো সে। নীতি বিরক্তমুখে জবাব দিলো,
‘ ওই বেদ্দপের খোঁজ আমার কাছ থেকে নিতে আসবি না। রেসপনসেবলিটি বলতে কোনো সেন্স নেই এই ছেলের। সেই সকাল থেকে আমরা এখানে পরে আছি আয়োজনে। আর সে প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার পরেও আসতে পারলো না। ‘
ঠোঁট নেড়ে বিড়বিড় করে কিছু বলতে বলতে মিহাদকে ফোন লাগালো সাফওয়ান। পরপর দুবার রিং বেজে কেটে যাওয়ার পর তৃতীয় বারে কল রিসিভ করলো মিহাদ। কিছুটা আড়ালে গিয়ে রাগী মুখে মিহাদের সাথে কথা সারলো সে।তারপর মিলিয়ে গেলো ভিড়ের মাঝে। হৈ হুল্লোড়ে কাটতে লাগলো মুহুর্তগুলো।একটু একটু করে কেটে যেতে লাগলো অনুষ্ঠানের সময়।

কোলাহলে মেতে থাকা তরুণীটির মোবাইল বেজে উঠতেই সতর্ক হয়ে নির্জনে ঠাই নিলো সে। মোবাইল বের করে স্ক্রিনে দৃষ্টিপাত করতেই দেখতে পেলো দীর্ঘ সময়ের প্রত্যাশিত মানুষটার নাম জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে। চঞ্চল হয়ে উঠলো তরুণীর মন। শুষ্ক ঠোঁটজোড়া জিভ দিয়ে ভিজিয়ে ব্যাস্ত হাতে কল রিসিভ করলো সে। হাঁপিয়ে উঠা কন্ঠে বললো,
‘ হ..হ্যালো? ‘
উপাশ থেকে শুনা গেলো মানুষটার ব্যাস্ত কন্ঠ,
‘ আপনি কোথায় নাজরাত! ভেবেছিলাম সারপ্রাইজ দিবো। কিন্তু আধঘন্টা খোঁজেও আপনাদের কারো দেখা নেই। প্রোগ্রামে আসেননি আপনি? ‘
চমকে উঠলো নাজরাত। অবাক কন্ঠে জানতে চাইলো,

‘ আপনি ক্যাম্পাসে? ‘
‘ হ্যাঁ। মেইন গেইটের সোজা ঝাউ বাগানে আছি৷ ‘
‘ ওখানেই থাকুন। আসছি আমি। ‘
চঞ্চল পায়ে শাড়ির কুচি সামলে হেঁটে চললো নাজরাত। স্টেজের সামনের ভীড় ঠেলে সামনে এগোতেই দেখা মিললো কাঙ্খিত ব্যাক্তিটির। নীল পাঙাবি গায়ে গরমের মধ্যে গাছের ছায়াতলে অপেক্ষা করছে মানুষটা। নাজরাত দূর থেকেই দেখতে পেলো সাদিফের ঘামে ভেজা কপাল, ঘাড়। কপালে আঁচড়ে পরা কিছু সংখ্যক চুলগুলো বা হাত দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে হাত ঘড়িতে চোখ বোলালো সে। মুখ দিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে আবারো দেখতে লাগলো আশেপাশে। যদি দেখা পায় কাঙ্খিত মানুষটার, সেই আশায়। নাজরাত হাসলো।

এতোক্ষন তাড়াহুড়ো করে এসে এখন ধীর গতিতে পা বাড়ালো সাদিফের দিকে। হুট করেই চোখাচোখি হলো দুজনের। সাদিফ ভুলবশত চোখ ফেরাতে চেয়েও যেনো পারলো না। আটকে গেলো নীল শাড়ি পরিহিতা অর্ধাঙ্গিনীর এলোমেলো রূপে। কুচিতে একহাত রেখে সাবধানে হেঁটে আসছে নাজরাত। উত্তপ্ত রোদের তেজ এসে পড়েছে তার মুখশ্রীতে। নাকে জমেছে বিন্দু বিন্দু শিশির কণার মতো ঘাম। পিঠ অবধি ছড়িয়ে আছে উন্মুক্ত চুলগুলো। কিছু কিছু চুল লেপ্টে আছে ঘামে ভেজা ঘাড়ে, কাঁধে। কথায় আছে ভালোবাসার মানুষটাকে সব রূপেই অপরূপা লাগে। আজ যেনো কথাটার প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী সাদিফ।

এই যে নাজরাতের এলোমেলো রূপটা তাকে আটকে দিয়েছে। বুকের ভিতরটা ধরফরিয়ে উঠছে প্রিয়তমাকে একটু ছুঁয়ে দেওয়ার আকুলতায়। কিন্তু নিজেকে সংযত করে নিলো সে। তবে নজর সরালো না এক সেকেন্ডের জন্যও। তার শীতল চাহনি ভেতর থেকে নাড়িয়ে তুলছিলো নাজরাতকে। লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে বারবার এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো সে। সাদিফের এমন চাহনি থেকে বাঁচতে হাতের বোতলটা এগিয়ে দিলো সে। টনক নড়লো সাদিফের। মুচকি হেসে বোতলটা নিলো সে। কয়েক ঢোক পানি পান করে অল্প পানি দিয়ে মুখ এবং চুল ভিজিয়ে নিলো।
অন্যদিকে দুদিন ধরে জমিয়ে রাখা অভিমানগুলো সাদিফের সামনে আসতেই যেনো আপনা আপনি মিলিয়ে যেতে লাগলো নাজরাতের। অথচ নাজরাতের পরিকল্পনা ছিলো সাদিফকে আচ্ছা মতো জব্দ করার। কিন্তু সামনে আসাতে কথাই বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে।

‘ অনুষ্ঠান আর কতোক্ষন চলবে? ‘
‘ শেষ হতে হতে প্রায় বিকেল হবে। ‘
হাত ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে কিছু চিন্তা করলো সাদিফ। বিকাল অবধি অপেক্ষা করা সম্ভব নয় একেবারে। দু ঘন্টার মধ্যে গন্তব্যে না পৌঁছালে সব আয়োজন ভেস্তে যাবে। নাজরাতের দিকে তাকিয়ে সাদিফ বললো,
‘ অনুষ্ঠান দেখা হয়ে গেলে আমার সাথে চলো৷ ‘
ভাবুক কন্ঠে নাজরাত জানতে চাইলো,
‘ কোথায়!! ‘

ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো সাদিফ। নাজরাতের দিকে খানিক ঝুকে গিয়ে ফিসফিস করে জবাব দিলো,
‘ ইটস অ্যা সারপ্রাইজ! ‘
হুট করে সাদিফ এভাবে ঝুকে পরায় দু কদম পিছু হাঁটলো নাজরাত। আশেপাশে তাকিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে সাদিফ বললো,
‘ বাকিরা কোথায়! দেখছি না যে? ‘
‘ আছে ভেতরেই। সায়েরী আর তোহার পারফরম্যান্স আছে একটু পরেই। ‘
‘ বাহ! তাহলে তো দেখতেই হয়। বেশি লেইট হবে না তো? দেড় ঘন্টার বেশি সময় থাকা যাবে না কিন্তু। ‘
‘ বাদ দিন না তাহলে। তেমন বিশেষ কিছু না এমনিতেও। আপনি চলুন কোথায় যাবেন বলছিলেন। ‘
ভ্রুঁ কুঁচকালো সাদিফ। নাজরাতের একহাত নিজের হাতের ভাজে নিয়ে পা বাড়ালো ভিড়ের মাঝে। যেতে যেতে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,

‘ সম্পর্কের মর্যাদা দিতে শিখুন নাজরাত। ওরা আপনার ফ্রেন্ড। আমি আসার আগে থেকেই তারা আছে আপনার জীবনে। মানলাম বর্তমানে আপনার জন্য আপনার আর আমার মধ্যে বেড়ে উঠা সম্পর্কটা সবকিছুর উর্ধ্বে। তাই বলে অন্য সম্পর্কগুলোকে অমর্যাদা করবেন না কখনো। এই যে মুখের উপর বলে দিলেন লেইট হবে বলে বান্ধবীদের পারফরম্যান্স দেখবেন না। এটা কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগেনি। ওদের পারফরম্যান্স দেখে যে আমাদের বিশেষ লাভ হবে এমন কিছু না। কিন্তু ওরা খুশি হবে আপনি থাকলে। তাছাড়া আর কিছু মাস পর এমনিতেই হারিয়ে ফেলবেন বন্ধুদের। তাই যতদিন আছেন, ওদের সময় দিন। সবসময় নিজেকে নিয়ে মজে থাকাটা কিন্তু স্বার্থপরতার পরিচয়। আর যাই হোক, আমি জানি আমি কোনো স্বার্থপর মেয়েকে ভালোবাসিনি। ‘
খুব মনযোগ দিয়ে সাদিফের কথাগুলো শুনছিলো নাজরাত৷ প্রতিটা বাক্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করলো সে। এবং বুঝতেও পারলো যে সে ভুল ছিলো। একটু লজ্জাবোধ করলো সে নিজের কর্মে। তবে মন পুলকিত হয়ে উঠলো সাদিফের মানসিকতা দেখে। সেই সাথে সাদিফের বলা শেষ কথাটা শুনে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো, আর কখনো এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার পথ রাখবে না সে। সাদিফের কথাটার সত্যটা রাখবে। বুঝিয়ে দেবে, ভুল মানুষকে ভালোবাসেনি সে।

গ্রীন রুমে পায়চারি করতে করতে হাঁপিয়ে উঠলো নীতি। কোমড়ে দুহাত রেখে একবার দেখলো বেঞ্চে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকা মিহাদের দিকে। উষ্কখুষ্ক চুল,টকটকে লাল চোখ এবং ঠোঁটজোড়া ফ্যাকাসে হয়ে আছে মিহাদের। গলা বসে গেছে সর্দি’র কারণে। নীতি বুঝে উঠতে পারলো না এই ছেলেকে বকবে না মায়া দেখাবে। একটু পরেই মিহাদ এবং সায়েরীর সিরিয়াল। কিন্তু এই অবস্থায় কিছুতেই গানের গলা ভালো আসবে না মিহাদের। কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না নীতি। সায়েরী নিজেও গালে হাত ঠেকিয়ে বসে রইলো। তার অবশ্য এতো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এসবের দ্বায়িত্ব যাদের উপর রয়েছে তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে বলে একটু চিন্তা হচ্ছে। এই শেষ সময়ে এসে মিহাদের জায়গা অন্য কাউকে দেওয়াটা ও সম্ভব নয়।

‘ পেয়েছি!!! পেয়ে গিয়েছি পার্টনার। ‘
হঠাৎ নীতির চিৎকারে ভয় পেয়ে গেলো সায়েরী। ধরফরিয়ে উঠে গেলো মিহাদ। শার্ট উলটে বুকে থু থু দিয়ে বললো,
‘ হয়েছে কি রে? এতো জোরে কেউ চিল্লায় নাকি? আরেকটু হলেই আমার মাসুম জানটা অক্কা পেতো। ‘
মিহাদের কথায় খুব একটা পাত্তা দিলো না নীতি। আগের মতোই উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
‘ সায়েরী! পেয়েছি তোমার জন্য পার্টনার। ‘
‘ এই শেষ মুহূর্তে কার সাথে এডজাস্ট করবো আপু? লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে দাও না একেবারে৷ ‘
শেষ সময়ে এসে এমন ঝামেলায় পড়ে কথাটা বললো সায়েরী। কিন্তু নীতি নাছোড়বান্দা। কিছুতেই অনুষ্ঠানে বিঘ্ন ঘটতে দিবে না সে। সায়েরীর পাশে বসে হাসি হাসি মুখ করে সে বললো,

‘ কোনো ঝামেলা হবে না। সব পারফেক্টলি হবে দেখো। আর যেখানে সাফওয়ান খান রয়েছে, সেখানে প্রোগ্রাম পারফেক্টলি হবে না তা হয় নাকি? ‘
আনমনে “হুমম” বলে হাতের কাগজটার দিকে নজর দিলো সায়েরী। পরমুহূর্তেই লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে বললো, “অসম্ভব!”
আরেকদফা চিৎকার শুনে বেঞ্চ থেকে পড়তে পড়তে বাঁচলো মিহাদ। নীতি সায়েরীর দুহাত ধরে মিনতি করতে করতে বললো,

‘ তুমি চাইলেই সবটা সম্ভব। ‘
‘ তোমার ওই দৈত্য দানব বন্ধুর সাথে স্টেজ পারফরম্যান্স তো দূরের কথা, দু মিনিট নিরবতা পালন করাও সম্ভব না। দেখা গেলো উলটা পালটা কিছু দেখে রাগের মাথায় আমাকে টপ করে ধরে টুপ করে ছুড়ে মারলো স্টেজ থেকে। ‘
‘ তুমি বেশি বেশি ভাবছো সায়েরী। সাফওয়ান মোটেও এমন না। ‘
‘ সে কেমন সেটা আমি জানতে চাইনা আপু৷ তুমি বরং ওই ইপ্সিতাকেই বলো। সে নাচতে নাচতে রাজি হয়ে যাবে৷ ‘
‘ ব্যাপারটা তুমি যতোটা হালকাভাবে নিচ্ছো সেটা কিন্তু মোটেও এমন হালকা নয়। আমাদের কলেজের অথোরিটি কমিটির হেড এসেছে। সাথে আরো কয়েকজন কমিটি মেম্বার রয়েছে। আজকের প্রোগ্রামে শুধুমাত্র তুমি আর মিহাদ ছিলে কাপল সং পারফরম্যান্স লিস্টে। বাকি যে তিনটা গানের লিস্ট করা হয়েছিলো সব টিমের সাথে। এখন তোমরাও যদি এভাবে বেঁকে বসো তাহলে কীভাবে হবে? অন্তত একটাও ডুয়েট পারফরম্যান্স না থাকলে প্রিন্সিপালের কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড সায়েরী। প্লিইইজ!! ‘

নীতির অনুরোধে ভাবনায় পড়ে গেলো সায়েরী। তখনই কানে এলো চির বিরক্তিকর কন্ঠের বাণী “হাইইইই সাফওয়ান!”। নীতি এবং সায়েরী দুজনেই ঘুরে তাকালো। কানে হাত চেপে চোখ বুজে ফেললো মিহাদ। নীতি এবং সায়েরী পেছন ঘুরতেই দেখলো কয়েকজন জুনিয়র ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে তাদেরকে কিছু বোঝাচ্ছে সাফওয়ান। ঠিক তার পেছনেই আবেদনময়ী ভঙ্গিতে দাঁড়ানো ইপ্সিতা। ফিনফিনে পাতলা গোল্ডেন পাড়ের সাদা শাড়ি গায়ে। ব্যাকলেস গোল্ডেন ব্লাউজ,হাইলাইট করা চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে। পাতলা শাড়ির মধ্যে বডি শেপ দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। মুখে একগাদা মেকআপ৷ কিন্তু তার ঝলসানো রূপে সবই সুন্দর লাগছে। তবে এমন খোলামেলা পোশাকে দৃষ্টিকটু লাগছে ভীষণ। ইপ্সিতার প্রথম ডাকটা বোধহয় শুনলো না সাফওয়ান। কিংবা শুনেও ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলো না। তার নিরবতা দেখে চুল উড়িয়ে পাশে গিয়ে সাফওয়ানের বাহু জড়িয়ে ধরলো ইপ্সিতা। ন্যাকামি স্বরে জানতে চাইলো,

‘ কি করছো এখানে। এসব বোরিং ফাংশন ছাড়ো আর চলো বাইরে গিয়ে লাঞ্চ করে আসি। সেই কখন থেকে বলছি কিন্তু তু… ‘
একনাগাড়ে সামনের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলো ইপ্সিতা। কিন্তু সাফওয়ানের দিকে তাকাতেই হাসি হাসি মুখখানা হুট করেই চুপসে গেলো তার। সেখানে ছাপ উঠলো ভয়ের। সাফওয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার বাহুতে জড়িয়ে রাখা ইপ্সিতার হাতটার দিকে। চোয়াল শক্ত করে আছে সে। কপালের দুপাশে রগ ফুলে উঠেছে। ইপ্সিতা দ্রুত হাত ছেড়ে দু’কদম পিছে হাঁটলো। সাফওয়ানের সামনে দাঁড়ানো ছেলে তিনজন ইপ্সিতাকে দেখেই মাথা নিচু করে ফেলেছিলো। এখন সাফওয়ানের হাতের ইশারা পেতেই দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো তারা। বা হাত দিয়ে ঘাড় ম্যাসাজ করতে লাগলো সাফওয়ান।

নীতি জানে রাগ কমানোর জন্য এমনটা করছে সাফওয়ান। তাই দ্রুত এগিয়ে গেলো সে। ইপ্সিতার সামনে থেকে সাফওয়ানের হাত টেনে নিয়ে গেলো অন্যদিকে। যেতে যেতে এক শক্ত চাহুনি ছুড়ে গেলো সে ইপ্সিতার দিকে সাফওয়ান। যেটা দেখেই অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো ইপ্সিতার। কি ভয়ানক সেই দৃষ্টি! কিন্তু দিনশেষে এই ছেলেটার উপরই ফিদা সে। যাকে পাওয়ার জন্য সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারবে ইপ্সিতা। আর যেখানে সাফওয়ানের বাবা নিজেই ইপ্সিতার বাবার এতো ভালো বন্ধু। সেখানে সাফওয়ান বাঁধা হতে চেয়েও হতে পারবে না, সেটা জানে ইপ্সিতা। তাই সাফওয়ানের গমন পথের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো সে। বিড়বিড় করে বললো, “যতো উড়ার উড়ে নাও ডার্লিং। দিনশেষে তোমার ঠাই এই ইপ্সিতা আজওয়ারের কাছেই হবে।”

তোহার পারফরম্যান্স চলছে। তিন জোড়া ছেলে মেয়ে একই ভঙ্গিতে গানের তালে তালে পা মিলাচ্ছে স্টেজে। দূর থেকে তোহার নাচ দেখছে তার বন্ধুমহল। সারি সারি চেয়ারগুলোর মধ্যে বসে আছে ফায়াজ, আয়ান, সায়েরী, সাদিফ, নাজরাত, সাফ্রিন এবং তার পাশে নুহাশ। বাকিরা খুব খুশিমনে নাচের আনন্দ নিলেও ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ছটফট করতে লাগলো সায়েরী। তার চিন্তিত মুখশ্রীতে বরাবরের মতোই প্রথমে নজর পড়লো আয়ানের। সে ভ্রুঁ কুঁচকে জানতে চাইলো,

‘ কি হয়েছে রে পিচ্ছি? এমন ছটফট করছিস কেনো? ‘
দাঁত দিয়ে নক কাটতে কাটতে সায়েরী জবাব দিলো—
‘ বিরাট বড় ব্লেন্ডার হয়ে গেছে দোস্ত৷ মিহাদ ভাইয়ার জ্বর হয়েছে, ঠান্ডার কারণে গলা বসে গিয়েছে। ‘
‘ সে কি! তাহলে এখন গাইবে কিভাবে? ‘
‘ সেটাই তো। আমি বলেছিলাম নীতি আপুকে আমাদের লিস্ট থেকে বাতিল করে দিতে। কিন্তু আপু বলছে মিহাদ ভাইয়ার জায়গায় এখন সাফওয়ান ভাই গাইবে।’
চমকে উঠলো আয়ান। বিষ্ময় ভরা কন্ঠে বললো,
‘ সাফওয়ান ভাই আর তুই!অবিশ্বাস্য! ‘
‘ সেটাই তো। উনার আশেপাশে থাকলে নিজেকে জেলখানার কয়েদি মনে হয় আমার। আমার পক্ষে কোনোভাবে সম্ভব নয় এই পারফরম্যান্স করা। ‘

আয়ান কি বলবে ভেবে পেলো না। সে জানে সায়েরী যমরাজের মতো ভয় পায় সাফওয়ানকে। সারাক্ষণ নিজের চঞ্চলতায় চারপাশ মাতিয়ে রাখা মেয়েটা সাফওয়ানের এক ঝলক দেখা মাত্রই গুটিয়ে যায় শামুকের মতো। সেখানে আজকে কিভাবে কি করবে সায়েরী! ভাবতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠছে আয়ানের। এর মাঝেই শেষ হলো নাচ। হাততালি-তে মুখরিত হয়ে উঠলো চারিপাশ। পূণরায় নিজের স্থানে গিয়ে স্পিকারের সামনে মুখ তুললো জিমন। সামনে বসা স্টুডেন্টস দের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলতে শুরু করলো,
‘ সো স্টুডেন্টস, সকাল থেকে খুব তো হলো হৈ হুল্লোড়। একের পর এক সুন্দর সুন্দর পারফরম্যান্স আমরা উপভোগ করেছি। কেননা এখন মুহুর্তটাকে একটু রোমাঞ্চকর বানানো যাক? ‘
হৈ হৈ করে উঠলো সকলে। হাসলো জিমন। অনেকটা দূরে অবস্থানরত সায়েরীর সাথে চোখাচোখি হতে প্রসারিত হলো সেই হাসি। আবারো বলে উঠলো সে,

‘ তো আজকের এই মুহূর্তটাকে একটু প্রশান্তিদায়ক এবং রোমাঞ্চকর করে তুলতে নিজের সুন্দর গলায় গান গেয়ে শুনাবেন উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সায়েরী সুবহা। এবং তার সাথে রয়েছে… (উচ্চস্বরে) দ্যা কিং অফ আওয়ার ক্যাম্পাস..সাফওয়ান তেহজিব খান!!! ‘

মুহুর্তের মধ্যেই কোলাহল বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেলো। যারা বিগত কয়েকবছর যাবত সাফওয়ানকে কলেজে দেখে আসছে তারা কেউ আশা করেনি আজ প্রাই আড়াই বছর পর পূণরায় সাফওয়ানের গলায় গান শুনতে পারবে বলে। তাই তাদের উত্তেজনার মাত্রাও দ্বিগুণ। অন্যদিকে এনাউন্সমেন্ট শুনা মাত্রই জমে গেলো সায়েরী। তার দিকে গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে রইলো আয়ান ব্যাতিত বাকি ছয়জন। তারা কেউই প্রত্যাশা করেনি শেষ মুহূর্তে এসে এতো বড় চমক পাবে বলে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারলো না। সবার দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে চকচকে কালো গিটার কাধে ঝুলিয়ে স্টেজের সামনে উপস্থিত হলো সাফওয়ান। তার দেখা পাওয়া মাত্রই নিরবতা ছেয়ে গেলো সবখানে। পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে ভিড়ের মাঝে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো সে। তার দৃষ্টিকে অনুসরণ করে পেছনের দিকের সারিতে ফিরে তাকালো সবাই। হুট করে সবার নজর গাঁথলো সায়েরীর উপর। সাফওয়ানের সাথে চোখাচোখি হতেই ভরকে গেলো সায়েরী। খামছে ধরলো আয়ানের হাত। আয়ান অনুভব করলো সায়েরীর শরীরের মৃদু কম্পন। স্নেহের সহিত সে হাত রাখলো সায়েরীর মাথায়। সায়েরী তাকাতেই মুচকি হেসে বললো,

‘ ভয় পাচ্ছিস কেনো পাগলী! আমি জানি তুই পারবি। আর কিছু গন্ডগোল হলেই বা কি? চিন্তা করিস না, আমরা আছি তো তোর সাথে। ‘
মৃদু হাসলো সায়েরী। আয়ানের সাথে বাকিরাও আশ্বস্ত করলো তাকে। তাড়া দিলো স্টেজের দিকে যাওয়ার জন্য। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো সায়েরী। সে সাফওয়ানের কাছাকাছি আসতেই ধুপধাপ পা ফেলে স্টেজে উঠে গেলো সাফওয়ান। কিন্তু সিড়ির দুই ধাপে পা ফেলতেই শাড়িতে পা আটকে গেলো সায়েরীর। চমকে উঠলো সকলে। সায়েরী আৎকে উঠলো। এই বুঝি হুমড়ি খেয়ে পড়লো সে। কিন্তু কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই একজোড়া বলিষ্ঠ হাত আগলে নিলো সায়েরীর ছোট্ট শরীরটাকে। চমকে উঠলো সায়েরী। আশেপাশের খেয়াল হতেই দ্রুত সরে আসলো সে সাফওয়ানের বাহু থেকে। সায়েরী সোজা হয়ে দাঁড়াতেই হুট তার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়লো সাফওয়ান। এবার যেনো দ্বিগুণ মাত্রায় চমকালো সায়েরীসহ উপস্থিত সকলে।তারা যেনো ফ্রীতে বিনোদনের উৎস পেয়ে গেলো।

কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে রইলো সকলে। কিন্তু বরাবরের মতোই কোনো কিছুর তোয়াক্কা করলো না সাফওয়ান। বড় দ্বায়িত্বের সাথে সিড়ির ধাপে আটকে যাওয়া সায়েরীর এলোমেলো কুচি ঠিক করে দিলো। এরপর উঠে দাঁড়ালো সে। সায়েরীর বিষ্ময়ভরা মুখশ্রীকে বিশেষ পাত্তা দিলো না সে। হাত এগিয়ে ইশারা করলো স্টেজে রাখা চেয়ারে বসার জন্য। চুপচাপ সেটাই করলো সায়েরী। পরপরই এগিয়ে গেলো সাফওয়ান। চেয়ারের পাশ থেকে গিটারটা নিয়ে বসে পড়লো চেয়ারে। দুজনের মাঝখানে একটাই স্পিকার রাখা। সায়েরী খাটো হওয়ায় স্পিকারটা তার সুবিধার জন্য অনেকটা নিচের দিকে করে রাখা হয়েছে। যা সাফওয়ানের গলা অবধি এসে ঠেকেছে। চেয়ারের সাথে একপা লাগিয়ে অন্যটা ফ্লোর স্পর্শ করছে সাফওয়ানের।

মাথা ঝুকিয়ে গিটারে হাত রেখে একনজর সায়েরীর দিকে তাকালো সে। চিন্তিত মুখ হাত কচলাচ্ছিল সায়েরী। তার মুখে ফুটে উঠেছে চিন্তার ছাপ। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে থুতনিতে জমা ঘামটুকু মুছে নিলো সে। তখনই কানে আসলো সাফওয়ানের শীতল কন্ঠ,
‘ অন্য কারো ভয়ে নিজের ভেতরের সত্তাকে ভুলে বসবে না। মানুষ তোমার বাহ্যিক সব কেড়ে নিতে পারবে, কিন্তু তোমার আত্মবিশ্বাস তোমার শক্তি হয়ে থাকবে। বি কনফিডেন্ট! ‘
প্রশ্নবিদ্ধ চোখে সাফওয়ানের দিকে তাকালো সায়েরী। তার চোখে চোখ রেখেই সাফওয়ান আশ্বস্ত গলায় বললো,
‘ গো অ্যাহেড।আই নো ইউ ক্যান ডু ইট। ‘
কথাটাই কিছু একটা যেনো ছিলো। মনের ভিতরের জমে থাকা ভয়ের রেশ মিলিয়ে যেতে লাগলো অল্প অল্প করে। চারিদিকে পিন ড্রপ নিরবতা। এরমধ্যেই ভেসে এলো সাফওয়ানের দক্ষ হাতের গিটারের টুং। লম্বা শ্বাস নিলো সায়েরী। গিটারের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে শুনা গেলো সায়েরীর সুন্দর কন্ঠস্বর…..

তোমার আমার পথ চলায় ,
কখনো কি হাতের ছোঁয়ায় ;
হাসি ফুটবে…চোখের কোণে..এএএ!!
নাকি অগোছালো সব সকালে
এলোমেলো কিছু খেয়ালে ,
আমি থমকে রবো..অকারণে..এএএ!!
আমায় মেখে রেখো সাথে ,
প্রিয় সুবাসে মায়াতে ,
খোঁজে রঙিন কোনো জামার হাতায়!
মন গুছিয়ে নেবার ছলে ,
সুখ রাখলে তোমার কোলে..এএ
তুমিও থেকো প্রিয় কবিতায়…!!

পিনপিন নিরবতার মাঝে সায়েরীর রিনরিনে কন্ঠস্বরটা যেনো ঝিম ধরিয়ে দিলো চারিদিকে। মাথা ঝুকিয়ে গিটার বাজানো অবস্থায় সাফওয়ানের ঠোঁটেও ধরা দিলো মুগ্ধতায় ভরা মৃদু হাসি। সম্মুখে সকলের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস ফেললো সায়েরী। মিলিয়ে গেলো মনের সব দ্বিধা। আড়চোখে সাফওয়ানের দিকে তাকালো সে। গিটারের ধ্বনি তীব্র হলো। চোখ বুঝলো সাফওয়ান। অবশেষে উপস্থিত সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কানে বাজলো সাফওয়ানের নেশাময় কন্ঠস্বর,

কতোটা বৃষ্টি হয়ে তোমার চুলে…
আমি ঝরলে খোপার ফুলে ;
আজ ভিজিয়ে দেবার খেলায়!!
রেখে দিও সামলে তুলে ,
মনের ইচ্ছেগুলো খুলে ;
আমার ভালোবাসার বেলায়…
আমায় মেখে রেখো সাথে ,
প্রিয় সুবাসে মায়াতে ,
খোঁজে রঙিন কোনো জামার হাতায়!
মন গুছিয়ে নেবার ছলে ,
সুখ রাখলে তোমার কোলে..এএ
তুমিও থেকো প্রিয় কবিতায়…!!

উপস্থিত সকলের মনে দোলা লাগিয়ে দিলো সাফওয়ানের নেশালো কন্ঠস্বর। সায়েরী নিজেও মন্ত্রমুগ্ধের মতো একধ্যানে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ানের দিকে। এই প্রথম সাফওয়ানের কন্ঠের গান শুনলো সে। তার ধারণাও ছিলো না এই রগচটা ছেলেটার এতো ভালো একটা দিক আছে। সাফওয়ান চোখ মেলে তাকাতেই সায়েরীর চোখে চোখ পড়লো তার। কিন্তু প্রতিবারের মতো হকচকিয়ে চোখ সরালো না সায়েরী। আগের মতোই তাকিয়ে রইলো একধ্যানে। খুব কাছ থেকে একটা ছেলে মুখ দিয়ে শিস বাজিয়ে উঠলো। চমকে উঠে ধ্যান ভাঙলো সায়েরীর। সাফওয়ানের দক্ষ হাত তখনো সুর তুলছে গিটারে। খানিক লজ্জা পেলো সায়েরী। লম্বা শ্বাস ফেলে পূণরায় গেয়ে উঠলো,
🎶🎵🎶
তোমায় কাছে পাবার আশায়,
খুব খুব দূরে ছুটে যায়…
কিছু নিরব রাতের শেষে!
ফিরে আসি তোমার পাহারায়,
কিছু নিরব প্রেম ইশারায় ;
চেনা সুরে..ছায়ায় মিশেএএএএ!!!
আমায় মেখে রেখো সাথে,
প্রিয় সুবাসে মায়াতে,
খোঁজে রঙিন কোনো জামার হাতায়!
মন গুছিয়ে নেবার ছলে,
সুখ রাখলে তোমার কোলে..এএ
তুমিও থেকো প্রিয় কবিতায়…!!

পুণরায় সাফওয়ান গাইলো—

তোমার আমার পথ চলায়,
কখনো কি হাতের ছোঁয়ায়;
হাসি ফুটবে…চোখের কোণে..এএএ!!
পরবর্তীতে তাল মিলালো সায়েরী—
নাকি অগোছালো সব সকালে
এলোমেলো কিছু খেয়ালে,
আমি থমকে রবো..অকারণে..এএএ!!
হুট করে চোখাচোখি হলো দুজনের। ঠোঁটের কোণে ধরা দিলো মুগ্ধ করা হাসি। শুনা গেলো দুজনের নেশালো কন্ঠ —
আমায় মেখে রেখো সাথে,
প্রিয় সুবাসে মায়াতে,
খোঁজে রঙিন কোনো জামার হাতায়!
মন গুছিয়ে নেবার ছলে,
সুখ রাখলে তোমার কোলে..এএ
তুমিও থেকো প্রিয় কবিতায়…!!

করতালিতে মুখরিত হলো পরিবেশ। ঘোর ভাঙ্গলো সায়েরীর। দূর থেকে দেখলো নুহাশ চেয়ারে উঠে শিস বাজাচ্ছে। ফিক করে হেসে দিলো সায়েরী। টিচারদের সাথে বসে থাকা গেস্টরা তারিফ করলো দুজনের। বিশেষ করে সাফওয়ানের। একজন গণ্যমান্য পলিটিশিয়ানের ছেলে হওয়ায় সুনাম করলো দ্বিগুণ। সাফওয়ান অবশ্য এতো কিছুতে বিশেষ পাত্তা দিলো না। সায়েরীর আগেই পা বাড়ালো স্টেজ থেকে নেমে যাওয়ার জন্য। পিছে পিছে এগোলো সায়েরীও। সিড়ির ধাপ পেরিয়ে মাঠে পা রাখতেই হুট করে সাফওয়ানের পিঠের দিকের পাঞ্জাবি খামচে ধরলো সায়েরী। চমকে উঠে সহসা থেমে গেলো সাফওয়ান। ঠিক তার পিছনে আড়াল হয়ে আছে সায়েরী। ঘাড় ফেরালো সাফওয়ান। দেখতে পেলো সায়েরীর ভয়ার্ত মুখশ্রী। ভ্রুঁ কুঁচকালো সাফওয়ান। গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইলো,

‘ কি সমস্যা? ‘
ঠোঁট উলটে মিনমিন করে সায়েরী জবাব দিলো,
‘ শ..শাড়ির কুচি খুলে গিয়েছে। ‘
একহাতে পেটের উপরের কুচিগুলো এবং অন্যহাতে সাফওয়ানের পাঞ্জাবি খামচে ধরে রয়েছে সায়েরী। সাফওয়ান সামনে থেকে সরলেই সবার সামনে ভীষণ এক লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তাকে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বিরক্তিতে মুখ “চ” ধরনের শব্দ করলো সাফওয়ান। দূর থেকে ইশারা করলো নীতিকে। সে এগিয়ে আসলো দ্রুত। নীতি সামনে এসে দাঁড়াতেই দ্রুত একহাতে কুচিগুলো কোনোরকমে কোমরে গুজে নিলো সায়েরী। সাফওয়ান বিরক্তমুখে যেতে যেতে নীতিকে বললো,
‘ সামলা এই ইডিয়েটকে। ‘
নীতি বুঝতে পারলো না কিছুই। সায়েরীকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে নীতির হাত ধরে ছুটলো গ্রীন রুমের দিকে। এই শাড়ির কোনো ভরসা নেই। যেকোনো মুহুর্তে জনসম্মুখে সায়েরীর মান সম্মান নিলামে তুলে ছাড়বে।

সাদিফের পুরুষালি হাতের ভাজে নিজের ঘর্মাক্ত হাতটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ যাবত উৎসুক হয়ে তাকিয়ে ছিলো নাজরাত। শেষ মেশ না পেরে নিচু কন্ঠে সাদিফকে বললো,
‘ সাদিফ, এবার হাতটা ছাড়ুন না। দেখছে সবাই। ‘
এতোক্ষণে যেনো হুশ হলো সাদিফের। কান থেকে ফোন নামিয়ে হাত সরালো নাজরাতের হাত থেকে। দুজনের হাত ঘেমে নেয়ে একাকার। যখন সায়েরী গান করছিলো ঠিক তখনই হঠাৎ নাজরাতের হাতখানা নিজের হাতের পাঁচ আঙুলের সাথে মিশিয়ে চোখ বুজে গানের সাথে মুহুর্তটাকে উপভোগ করছিলো সাদিফ। গান শেষ হতেই গুরুত্বপূর্ণ কল আসায় খানিক আড়ালে গেলো সে। কিন্তু তখনো ছাড়লো না নাজরাতের হাত। এতোক্ষণ যাবত চেপে রাখার কারণে হাত লাল হয়ে উঠেছে নাজরাতের। সেদিকে তাকিয়ে সে সাদিফকে বললো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১০

‘ এতোক্ষণ কেউ হাত ধরে রাখে। রক্ত জমে গিয়েছে! ‘
হাসলো সাদিফ। পুণরায় হাত ধরলো নাজরাতের। গেটের দিকে পা বাড়িয়ে যেতে যেতে বললো,
‘ ছাড়বো বলে তো হাত ধরিনি। এই যে হাতটা ধরেছি, এই হাত ধরাটা সাময়িক নয়। না হবে এই পথ চলা অল্প দিনের অভিযান!! ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২