মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৪
নূরায়েশা মাহনূর
– আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দাও তোমরা, ওর এতবড় সর্বনাশ করো না। দয়া করো, দয়া করো।
অন্ধকারের বুকে এক অপরিচিত কণ্ঠ ফোঁপাতে ফোঁপাতে মৃত্যুবর্ষার সুর তুলছে। দূরের প্রান্ত থেকে আধো-চেতন, অগ্নিশূন্য চাহনিতে দৃষ্টি তাকিয়ে রইল সেদিকে। শরীর শুষ্ক খোলসে পরিণত, রক্তপ্রবাহে অবশতার হিমঝড় বয়ে চলেছে। মাথার ভিতর কুয়াশার পাহাড়, কোনো নেশাজাতীয় কিছু তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গ্রাস করেছে। পলক-শূন্য দৃষ্টি সামান্য জোর সঞ্চয় করে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু খড়ের গাদার উপর ভর দিতে হাত ডুবল খড়ের গভীরতায়, ভারসাম্য হারিয়ে পুনরায় ধসে পড়ল সে।
– মেয়েটা জেগে উঠেছে।
কেউ একজন কর্কশ গলায় ঘোষণা দিলো । সাথে সাথেই এক অবয়ব সামনে এসে উবু হয়ে দেখলো রমনীকে। অন্ধকার ভেদ করে দৃষ্টি দেখলো এক শিকারির হাসি। কতগুলো ধারালো দাঁতের শ্বেতরাশি বিদীর্ণ করে দিচ্ছে তার আতঙ্কের দেয়াল। শ্বাসের গাঢ় দুর্গন্ধে ঘেরা সেই মুখ ঝুঁকে আছে তার ওপর। দৃষ্টি আঙুলে শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে লোকটার বুকে ধাক্কা দিল। কিন্তু তার নারীত্বের অবসন্ন আঘাতে লোকটার শরীর এক বিন্দুও নড়ল না।
– তেজটা খেয়াল করছেন, ভাই? আপনারে ধাক্কা মারে। সাহস কত!
পাশের অন্ধকার কোণ থেকে ভেসে এল এক তরুণের বিদ্রূপমাখা কণ্ঠ। দৃষ্টি তখনও সময়ের শিকল ভেদ করে বুঝে উঠতে পারছে না, আসলে তার চারপাশে কী ঘটছে।
উবু হয়ে থাকা লোকটি ধীরে, বিকৃত উপভোগে, আঙুলের ডগা চালিয়ে দিল তার কপালের উপর থেকে ঠোঁটের কিনারা অব্দি। মাংসের উপর সেই স্পর্শ বিষধর সাপের সর্পিল হেঁটে যাওয়ার মতে মনে হলো। দৃষ্টি মুখ ফিরিয়ে নিল দ্রুত।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– এই আগুনে পানিটুকু ঢালতে পারলেই তো আসল স্বাদ…
– এই! আমার মেয়েটারে স্পর্শ করবি না! ছাড় ওরে, শুয়ো*রের বাচ্চা, নরপশুর দল ছাড় বলছি!
মধ্যবয়সী এক পুরুষের গর্জন বাতাসের স্তর চিরে ছুটে এল। তার শেষ শব্দগুলো শেষ হওয়ার আগেই এক যুবক এগিয়ে এসে মুষ্ঠি তুলে সজোরে আঘাত করল তার মুখের ঠিক মাঝ বরাবর। ঘুষির অভিঘাতে চোয়ালের হাড়ে বজ্রপাত হলো, মুখমণ্ডল বেঁকে গেল বিকৃত রক্তিমতায়।
পাশের দিক থেকে এক নারীর দমবন্ধ করা গোঙানি ভেসে উঠল। তার মুখ গামছায় শক্ত করে বাঁধা, মাথা অনবরত নেড়ে যাচ্ছে অনুনয়ের মরিয়া ভঙ্গিতে। কিন্তু সে আর ওই মধ্যবয়সী পুরুষ দুজনেরই হাত পিছনে বেঁধে রেখেছে বাঁশের কাঞ্চির সাথে। দৃষ্টি ধীরে মাথা ঘুরিয়ে শিশুসুলভ কাঁপা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করল,
– ক…কি হচ্ছে এখানে?
ঠোঁটের কোণে শিকারির হাসি টেনে লোকটা উত্তর দিল,
– সেটা অল্পক্ষণ পরেই টের পাবে, সুইটহার্ট।
লোকটার গলার স্বরে ঘনীভূত মাদকতার ছোঁয়া। আঙুলে সিগারেট জ্বালিয়ে, দৃষ্টির অনাবৃত মুখের সামনেই আগুনের ক্ষুদ্র শিখা নেচে উঠল। প্রথম টানটায় তামাকের গাঢ় গন্ধ মিশে গেল নিঃশ্বাসে, তারপর ধোঁয়ার পাক ঘুরিয়ে সে ছুঁড়ে দিলো দৃষ্টির মুখমণ্ডলের উপর। দৃষ্টি কাশি চেপে রাখতে না পেরে নাক-মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে নিলো।
লোকটা চোখের ইশারায় পাশে দাঁড়ানো এক ছেলেকে ডাকতেই, তার হাতে এগিয়ে দিলো মোটা দড়ির কুণ্ডলী। ঠোঁটে ঝুলন্ত সিগারেটের ছাই অনিচ্ছায় কেঁপে উঠলেও হাতের কাজ থামল না। দৃঢ় টানে দৃষ্টির দুই হাত পেছনে বেঁধে ফেলল সে। রক্তপ্রবাহ থমকে যাওয়ার মত টান অনুভূত হতেই দৃষ্টি প্রাণপণে শরীর ছটফট করে মুক্তির চেষ্টা চালাতে লাগল।
দৃষ্টির সমগ্র দেহে সূক্ষ্ম ঘামের স্তর জমে উঠেছে। ভেতর থেকে তাপ আর ভয়ে মিশে বাষ্প হয়ে বেরিয়ে আসছে। চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে কুৎসিত, হীন রসিকতার কর্কশ হাসি। শরীর ধীরে অবশ হয়ে আসছে, মাথা শিলাখণ্ডের মতো ভারী। আর সহ্য হলো না হঠাৎই চোখের পাতা ঝাঁকিয়ে খুলে ফেলল সে।
ঘুমের গভীরতা থেকে ছিটকে উঠে এল বাস্তবের তীব্রতায়। সারা শরীর ভিজে গেছে, ঘাম জমে গায়ে সেঁটে থাকা পাতলা কাপড়ও ভিজে গিয়েছে খানিক । দৃষ্টি উন্মাদের মতো নিজের শরীর টিপে টিপে দেখছে, গলা আর গালের ঘাম হাতের তালুতে মুছে ফেলছে তাড়াহুড়োয়। বুকের ভেতর শ্বাস ওঠানামা করছে অনিয়মিত ঢেউয়ের মতো। আবারও ফিরে এল সেই দুঃস্বপ্ন সেই রাতের দমবন্ধ করা স্মৃতি।
বিছানা ছেড়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে গেল আয়নার দিকে। ঘর তখন অন্ধকারের গভীরে ডুবে আছে, কেবল বারান্দার কাচ ভেদ করে পূর্ণচাঁদের স্নিগ্ধ আলো ঢুকে পড়ছে। সেই আলো এসে পড়ল দৃষ্টির কাঁধ বেয়ে নিচে, আধো আলো আর আধো আঁধারের মিলনে তৈরি হলো এক রহস্যময় অবয়ব।
আয়নার প্রতিফলনে সে দেখল নিজেকে। অনুভূতিহীন, প্রাণহীন চাহনিতে দাঁড়িয়ে আছে কোনো অচেনা মানুষ। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদের দিকে। আকাশের বিস্তৃত নীলাভ ক্যানভাসে থালার মতো উঁকি দিচ্ছে পূর্ণচাঁদ, চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অগণিত তারার মেলা। চাঁদের কোমল রুপালি আভা গলগলিয়ে ঝরে পড়ছে মাটির বুকে। চারদিক এক স্বপ্নময় মায়াজালে মোড়ানো। সেই আলোর ভেতরেই চোখ স্থির রেখে ফিসফিস স্বরে দৃষ্টি উচ্চারণ করল,
– দেখেছো চাঁদ, তুমি একা নও… আমিও তোমার মতোই কলঙ্ক বহন করি।
ঠিক সেই মুহূর্তে এক ছায়া এসে ঢেকে দিলো তাকে। চাঁদের আলো ছায়ার চারপাশ ভেদ করে ঠিকরে পড়ছে। তবু দৃষ্টির চারপাশে ঘন কালো অন্ধকার ছড়িয়ে দিলো। আশেপাশের সবকিছু রয়ে গেল আলোকিত, কেবল সে নিমজ্জিত রইল ছায়ার আচ্ছাদনে। অর্থাৎ অচল, নীরব অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে তার একদম সামনে।
দৃষ্টি প্রাণহীন চাহনিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। অবয়বটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। প্রথমে এক কদম পিছু হটল দৃষ্টি, কিন্তু পরক্ষণেই দৃঢ় হয়ে সোজা দাঁড়িয়ে গেলো। ছায়াটি তার পাশে এসে থামতেই, চাঁদের আলো আবারও ফুঁড়ে এসে ভরে দিলো দৃষ্টির সমগ্র দেহ। যেন কিছুক্ষণ আগের অন্ধকার কেবল তার জন্যই এক ক্ষণিক পরীক্ষা ছিল।
– কখন উঠলেন?
মৃদু, স্বরে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো সাইফ। দৃষ্টি কোনো জবাব দিলো না। এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে। রেলিঙের কাছে গিয়ে অলস ভঙ্গিতে ঝুলে থাকা লম্বা চুল আঙুলে পাকিয়ে আলগোছে খোপা বাঁধল। সাইফ নীরবে এসে দাঁড়াল তার গা ঘেঁষে ঠিক পাশে।
– আবার কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেননি তো?
দৃষ্টি ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের রেখা টেনে বলল,
– আমার জীবনটাই তো এক দুঃস্বপ্নে বন্দি… নতুন করে আর দেখার মতো কী-ই বা বাকি আছে?
পাশ থেকে এক দীর্ঘশ্বাসের নীরব কম্পন ভেসে এল, দৃষ্টি অনুভব করল তা, কিন্তু মুখ ফেরাল না। দৃষ্টি ভেসে গেল দূরের অস্পষ্টতায় যেখানে আকাশের গাঢ় নীল আর চাঁদের ফিকে আলো মিলেমিশে এক অনন্ত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
– আচ্ছা, ইজতিহাদ ভাই… আপনি আমাকে কেন ভালোবাসেন বলবেন? আমার মতো একজনকে ভালোবাসার কোনো কারণ তো আমি খুঁজে পাই না।
হালকা এক হাসি ছড়িয়ে দিল সাইফের ঠোঁট। সেই হাসির মৃদু শব্দ তরঙ্গ এসে পৌঁছাল দৃষ্টির কানে। অথচ হাসির উপাদানটি সে খুঁজে পেল না। সত্যিই কি হাসার মতো কিছু ছিল? রমণী তা বোঝে নি।
– আমি আপনাকে কোনো কারণ ছাড়াই ভালোবাসি।
এবার দৃষ্টির ঠোঁটেও ফুটে উঠল ক্ষীণ হাসি। তবে কি সত্যিই, তাকে ভালোবাসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই? নাকি সে আসলেই ভালোবাসা পাওয়ার উপযুক্ত নয়? এই ভাবনাই ভেসে বেড়াল তার চোখে। সাইফ এবার ঘুরে দৃষ্টির দিকে তাকাল।
– ভাববেন না, আপনাকে ভালোবাসার কোনো কারণ নেই। বরং আপনাকে ভালোবাসার সহস্র কারণ আছে আমার কাছে। আপনার প্রতিটি লোমকূপ পর্যন্ত আমার ভালোবাসার অংশ । এত এত কারণের ভিড়ে আমি বিভ্রান্ত হয়ে যাই। পাগলা ঘোড়ার মতো টগবগিয়ে ওঠে মন। তখনই নিজের হৃদয়কে বোঝানোর জন্য বলি, আপনাকে আমি কারণহীন ভালোবাসি। কোনো স্বার্থের জন্য নয়, সৌন্দর্যের জন্য নয়… কলঙ্ক, দাগ, অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমি আপনাকে ভালোবাসি।
দৃষ্টি এবার চোখ তুলল সাইফের দিকে। পলকের কিনারায় টলটল করছে জলকণা। সামান্য দুললেই গড়িয়ে পড়বে গাল বেয়ে। সেই নোনা আভা কি সাইফের চোখে ধরা পড়ল? সে কি টের পেল, কতটা দুঃখ জমে আছে এই নীরবতার আড়ালে? কিন্তু দৃষ্টি মুখ ফেরাল, সামনে তাকিয়ে রইলো, কোনো কিছুই বুঝতে দিলো না সাইফকে।
– আপনি যত খুশি কেঁদে নিন… একবার কান্না থামিয়ে হেসে ফেললেই, আর কখনো কাঁদতে দেব না আপনাকে।
আশ্চর্য! এই মানুষটা কীভাবে সব বুঝে ফেলে? সে কি কোনো গোপন জাদুর অধিকারী? নাকি মন পড়ার ক্ষমতা রাখে? দৃষ্টি নিজেই উত্তর খুঁজে পেল না। হঠাৎ, সে ভেঙে পড়ল। চোখে জমে থাকা জল টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। শ্বাসভাঙা কান্না মুহূর্তেই রূপ নিল ঢুকরে কাঁন্নায়।
রেলিঙ শক্ত করে চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়ল দৃষ্টি, কাঁপতে কাঁপতে হাওয়ার জন্য হাঁসফাঁস করছে। তবুও সাইফ নড়ল না, ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। দূরে কোথায় চাহনি নিবদ্ধ। কাঁদতে দিল সে দৃষ্টিকে, থামাল না একবারও।বুকভাঙা কান্নায় নিঃশেষ হয়ে আসছে দৃষ্টি, বুকের ভেতর জ্বালা করে উঠছে অসহ্য যন্ত্রণা। সেই চিনচিনে ব্যথা হৃদযন্ত্রকে খামচে ধরছে। এক হাত বুকের কাছে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে উঠল,
– আল্লাহ… এই যন্ত্রণার শেষ কোথায়? আমার যে আর সহ্য হচ্ছে না…
তার ফিসফিসে উচ্চারণ সাইফের কানে গিয়ে লাগল, আর তাতে তার চোখের কোণও ভিজে উঠল । দুহাত পেছনে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
মেঝেতে উবু হয়ে কাঁদছে দৃষ্টি; চোখের জল গাল বেয়ে বুক পেরিয়ে টুপটুপ করে পড়ছে মেঝেতে। হেঁচকি তোলা সেই কান্না ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে এল। তখনই সাইফ এগিয়ে এসে বসে পড়ল দৃষ্টির পাশে, রেলিঙে হেলান দিয়ে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো একসাথে ঢেলে দিচ্ছে দুজনের উপরেই। সাইফকে পাশে বসতে দেখে দৃষ্টি ধীরে মাথা তুলল, সোজা হয়ে বসে তার দিকে তাকাল। মৃদু স্বরে উচ্চারণ করল,
– আপনার কাঁধে একটু মাথা রাখি, শেখ সাহেব?
সে কি করুণ মিনতি! সাইফ আলতো হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে নিল নিজের কাছে। কোনো শব্দ করল না দৃষ্টি নীরবে মাথা রেখে দিল সাইফের কাঁধে। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে, তবু গালে দাগ কেটে গেছে নোনাজল। এভাবেই রইল তারা প্রায় বিশ মিনিট ধরে। দুজনেই তাকিয়ে রইল দূরের আকাশে ঝুলে থাকা রূপালি থালার মতো চাঁদের দিকে।
– একটা গান শুনাবেন? ইচ্ছে হচ্ছে…
দৃষ্টির সরল অনুরোধে সাইফ চোখ তুলল। সে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে তার দিকেই, উত্তরের জন্য অধীর হয়ে আছে। সাইফের ঠোঁটে ভেসে উঠল ক্ষীণ মুচকি হাসি। উঠে গিয়ে রুম থেকে গিটারটা তুলে আবার এসে বসল তার পাশে। আঙুলে প্রথম সুর তুলল, গিটারের তারে চাঁদের আলো ঝরে পড়ছে। তারপর মৃদু কণ্ঠে গেয়ে উঠল,
~ পুষে রাখে যেমন ঝিনুক,
খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ…
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক,
খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ…
দৃষ্টি দু’হাটু ভাঁজ করে, থুতনি রেখে বসে আছে হাঁটুর উপর। গভীর চাহনিতে তাকিয়ে আছে সাইফের দিকে। গান আর সুরের মাঝে হঠাৎই তার ভেতর বয়ে গেল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। বুকের ভেতর জমে থাকা ভার খানিক হালকা লাগছে।
~ তেমনি তোমার নিবিড় চলা,
ভিতরেরই বন্ধরে…
আমার ভিতর বাহির অন্তরে অন্তরে,
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে…
সাইফের দৃষ্টি এখন নিবদ্ধ কেবল তার উপরেই। চাঁদের আভায় এক অপ্সরা নেমে এসেছে ধরাধামে। দৃষ্টির নীলাভ অবয়ব আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। মেয়েটির চোখ দুটি স্থির, গভীর, আরেক পৃথিবীর দরজা খুলে দিচ্ছে। সরাসরি সেই চোখের গভীরে তাকিয়ে সাইফ আবার গেয়ে উঠল,
~ আমার ভিতর বাহির অন্তরে অন্তরে,
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে…
আমার ভিতর বাহির অন্তরে অন্তরে,
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে…
সুরের আবেশ শেষ হতেই দৃষ্টি ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল, ঠোঁটে একটুখানি প্রশান্তির রেখা।
– ভালো গান করেন আপনি। সুন্দর ছিলো।
সাইফ গিটারটা পাশে রেখে আরেকটু এগিয়ে এল,মাঝে থাকা দূরত্বটুকুও আরেকটু কমিয়ে দিলো। দৃষ্টি হাঁটু জড়িয়ে আবার মাথা কাত করল, চোখের কোণ থেকে তাকাল সাইফের দিকে। সাইফ আলতো করে হাত এগিয়ে নিয়ে তার কপালের সামনে থাকা চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল।
– আপনি জানেন, আপনি অপ্সরা-তুল্য সুন্দর? তার সঙ্গে ভীষণ বেদনাদায়ক সুন্দরও। আপনাকে দেখলেই বুকের ডান পাশে কেমন চিনচিনে ব্যথা জাগে।
– অপ্সরাও দেখে ফেলেছেন আপনি?
সাইফ মৃদু হাসল।
– উহু, অপ্সরা দেখিনি। তবে ছোটবেলা থেকে যত গল্প শুনেছি, তাতে মনে হয় আপনি-ই সেই অপ্সরা। ভুল করে কেউ আপনাকে দেখে ফেলেছিল হয়তো, আর সেই থেকেই তুলনা শুরু।
দৃষ্টি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
– জানেন, এই যে আপনি এত উল্টোপাল্টা কথা বলেন, এটার জন্য আপনি চারটা বউ ডিজার্ভ করেন।
– কেন?
– একজন মারলে ব্যথা কম লাগবে তাই।
– কিন্তু আপনি তো মারেন না।
– মারি না, কিন্তু মারতে তো কতক্ষণ লাগে!
– আপনার হাতে মার খাওয়ার জন্য হলেও আপনাকে সারাজীবন চাই আমার বউ। ৪ জন লাগবে না প্রয়োজনে ৪ জনের মাইর আপনি একাই দিয়েন তাও আপনাকে আমি চাই।
– আপনি পাগল! আস্ত একটা উন্মাদ।
– আপনার জন্যই। এই পাগলের তকমা নিয়েই সারাজীবন থাকতে চাই আমি।
– এই যে এত ভালোবাসা দেখাচ্ছেন আবার ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিবেন না তো আমাকে? আমাকে নিঃশেষ করার জন্যই এত আয়োজন করছেন না তো আবার? ভেবে দেখেন, এবার আমি ভেঙে গেলে বোধহয় সত্যি সত্যিই মরে যাবো!
সাইফ তাকালো দৃষ্টির পানে। কি বলছে দৃষ্টি বুঝতে একটু সময় লাগলো তার। যখনই তার মস্তিষ্ক বুঝে ফেললো সে চমকে উঠলো। মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
– আপনি…
– আমাকে ধরে রাখুন শেখ সাহেব। আমাকে হারিয়ে যেতে দিয়েন না। আমি থাকতে চাই আপনার সাথে। একটা গোটা জীবন আপনার সাথে বাঁচতে চাই৷ শুধুমাত্র আপনার জন্যই আমি বেঁচে আছি। নাহলে কবেই আমার ক্ষুদ্র অস্তিত্ব বিলিন হয়ে যেতো এই পৃথিবী থেকে। যেদিন আপনি আমার হাত ছেড়ে দিবেন সেদিনই আমার শেষ দিন হবে৷
বলতে বলতেই চোখের পানি ছেড়ে দিলো দৃষ্টি। সাইফ পাগলের মত ঝাপিয়ে পড়লো দৃষ্টির উপর। দৃষ্টির দুগালে হাত রেখে অজস্র চুমু খেলো দৃষ্টির সারা মুখে। এরপর শক্ত করে আগলে নিলো বুকের কাছটায়। বুকের মাঝে থেকেই দৃষ্টি আবারো বলে উঠলো,
– আমার আপনি ছাড়া আর কেউ নেই জানেন? আমাকে ছেড়ে যাবেন না তো?
কি করুন শুনালো দৃষ্টির কন্ঠস্বর। সাইফের রুহ কেঁপে উঠলো। আরেকটু প্রগাঢ় ভাবে চেপে ধরলো। দৃষ্টিও শক্তহাতে জড়িয়ে নিলো সাইফকে।
– আমি সারাজীবন আপনার সাথেই থাকবো বউ। জীবনটা তো অনেক ক্ষুদ্র আর আমি না হয় এই ক্ষুদ্র জীবন আপনার নামেই উৎসর্গ করলাম, যার একচ্ছত্র আধিপত্য কেবল আপনার!
ঘড়ির কাঁটা অবিচল জানিয়ে চলেছে রাত গভীর হয়ে ২:১১ ছুঁয়েছে। কিন্তু চুপ মেরে বসে আছে সাইফ ও দৃষ্টি। খাটের কিনারে বসে দৃষ্টি, আর খানিক দূরে কাউচে সাইফ। দুজনের চোখে নিদ্রাহীনতার সমান্তরাল রেখা। সেই সকাল থেকে অজ্ঞান দেহে পড়েছিলো দৃষ্টি; কিছুক্ষণ আগেই মাত্র চেতনা ফিরেছিলো। এরমাঝে আবার ডাক্তার এসে পরীক্ষা সেরে, দিয়ে গিয়েছেন ঘুমের ইঞ্জেকশন , যার প্রভাবে দিন ফুরিয়ে রাতের কপালে এসে ঠেকেছে তার জাগরণ। আর সেটাই এখন মহা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুতেই ঘুম আসছে না তার ; ঘুম বারবার চোখের দোরগোড়ায় এসে ফিরে যাচ্ছে।
দৃষ্টির এই জাগরণে সাইফও বন্দি। ক্ষুধা মেটানো শরীর এখন কাউচে আধশোয়া, কিন্তু দৃষ্টিকে পাহারা দেবার অনিবার্য দায় তার পলক পর্যন্ত চুরি করে নিয়েছে। কিছুক্ষণ আগে পাঞ্জাবির আনুষ্ঠানিক বন্ধন ছেড়ে টিশার্ট-ট্রাউজারে নিজেকে শিথিল করলেও চোখের চাহনি তীক্ষ্ণ, কোনো অনাহূত স্বপ্নকেও সে প্রবেশাধিকার দেবে না।
কিন্তু দৃষ্টির মনোজগতে ঢেউ তুলেছে অন্য দ্বন্দ্ব। সজ্ঞানে সাইফের সঙ্গে একই বিছানা ভাগ করা এ চিন্তাটাই তার অন্তরের পাথরে কাঁটার খোঁচা। কিন্তু সাইফইবা ঘুমাবে কোথায়? আগেই সে রুক্ষ স্বরে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই কক্ষের দ্বার সে পেরোবে না। অথচ কাউচও মাত্র দু’সিটের। যেখানে এই কাটখোট্টা মানুষটাকে রাতভর গুটিসুটি মেরে শোওয়ানো মানে সরাসরি এক ধরনের দণ্ডপ্রদান।
শেষমেশ বহু ভাবনার গহ্বরে ঘুরে দৃষ্টি স্থির করল খাটের এক প্রান্তে সামান্য জায়গা ছেড়ে দেবে। গলা সামান্য খাঁকারি দিয়ে, স্বরের মধ্যে সংযম রেখে বলে উঠল,
– শুনুন, এইভাবে পাহারাদারের মতো বসে না থেকে এক পাশে এসে শুয়ে পড়ুন।
সাইফ হঠাৎই উঠে দাঁড়িয়ে সুইচে হাত ছুঁইয়ে অন্ধকার নামিয়ে আনল, এক কোণে স্বপ্নালু নরম আলো জ্বালিয়ে দিলো । তারপর গটগট শব্দে পা ফেলে বিছানার দিকে এগিয়ে এসে নির্দ্বিধায় শুয়ে পড়ল। এতক্ষণ যেন এই এক বাক্যের অপেক্ষাতেই ওঁত পেতে ছিল সে।
দৃষ্টি হতবাক লোকটার বিন্দুমাত্র সময় নষ্টের অভ্যাস নেই। বলা শেষ, কাজ শুরু। আশ্চর্যের বিষয়, মুখে বাড়তি কোনো শব্দও করলো না। বারণও করলো না!
– লাইট তো নিভে গেছে, বসে থেকে আর কী হবে?
সাইফের গলার মৃদু স্বর ভেসে আসতেই দৃষ্টি ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল। খাটের একেবারে প্রান্তে গিয়ে ঠেকল সে। সামান্য নড়াচড়া করলেই মেঝের শীতলতার সঙ্গে আলাপ হয়ে যাবে তার । উল্টো ঘুরে অন্তরে দোয়া-দরূদ পড়া শুরু করল সে।
ঠিক তখনই কোমরে পড়ল এক অপ্রত্যাশিত টান।সাইফ তাকে নিজের দিকে টেনে এনে বুকে ঠেসে ধরল, ঘাড়ের ওপর ভর দিলো তার থুতনি। স্বর নেমে এলো নরম ফিসফিসে স্রোতে,
– বহুদিন শান্তির ঘুম পাইনি… আজ একটু ঘুমাতে দিন।
দৃষ্টি তড়াক করে ফিরে তাকাল সাইফের দিকে।
– কালকেও তো…
– উহু, কালকে আপনি জ্বরের ঘোরে অনেক জ্বালিয়েছেন।
– আপনার মাথায় আঘাত আমার কারণেই লেগেছে, তাই না?
কথাগুলো সাইফের কানে পৌঁছোল বটে, কিন্তু সে কোনো সাড়া না দিয়ে দৃষ্টির বুকে মাথা গুঁজে দিল।একেবারে শিশুর মতো আঁকড়ে ধরলো।
– একদম নড়বেন না। ঘুমোতে দিন। আর হ্যাঁ, এটার জন্য কাল আপনাকে বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। এখন ঘুমাই।
শব্দগুলো ফেলে দিয়ে সে চোখ বুজে নিল। দৃষ্টিও নীরবে শুয়ে রইল। কিছুক্ষণের মধ্যে সাইফ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। এমন শান্ত, এমন ভারী যে মনে হচ্ছিল বহু বছরের ক্লান্তি আজ এসে আশ্রয় পেয়েছে।
তবে দৃষ্টির চোখে ঘুম নেই, হাতের ছোঁয়ায় সাইফের চুলে মৃদু বুলিয়ে যাচ্ছে। অন্য হাত ধীর ছন্দে বুলিয়ে দিচ্ছে তার পিঠে। অজান্তেই কোনো লুকোনো মায়া ঢেলে দিচ্ছে সে। বহুদিন পর বুকের ভেতরে হালকা উষ্ণতার ঢেউ উঠেছে; ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে এক গোপন হাসি। মুখের ফ্যাকাসে রং উবে গিয়ে ভোরের প্রথম আলোয় ধোয়া সতেজতা ছড়িয়ে পড়েছে।
মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৩
তবুও সুখের এই ভেলায় এক অদ্ভুত চিন্তা তার মাথায় । বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সে দেখেছিল কেউ বাড়ির পিছন দিকে যাচ্ছে। তখন গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু এখন সন্দেহের কাঁটা খোঁচাচ্ছে মগজে। এত রাতের আঁধারে সেখানে যাবে কে? আর কেনই বা যাবে?
