Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৩+৩৪

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৩+৩৪

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৩+৩৪
সাজিয়া জাহান সুবহা

সাফওয়ানের আকস্মিক আক্রমণে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে রইলো সায়েরী। এমন আগ্রাসী হয়ে উঠার কারণ খুঁজতে ব্যস্ত হলো তার শূন্য মস্তিষ্ক। ফ্লোরের সাথে পিসে যাওয়া ফুলগুলো দেখে সে হাহাকার করে উঠলো,
‘ এটা কি করলেন আপনি? জিমন ভাইয়া কতো ভালোবেসে দিয়ে… আহ!!!
কিছু বুঝে উঠার আগেই তার হার মুচড়ে পিঠের দিকে চেপে ধরলো সাফওয়ান। ব্যাথায় কুঁকড়ে গেলো সায়েরী। ছটফটিয়ে উঠতেই অন্য হাতে তার নরম গাল চেপে মুখ উঁচু করে ধরলো সাফওয়ান। রাগ্বত স্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,

‘ ভালোবেসে দিয়েছে? এই বয়সে এসে ভালোবাসা শিখাচ্ছো তুমি আমাকে? ‘
ব্যাথায় জর্জরিত হয়ে চোখে জল জমে উঠলো সায়েরী’র। মনে হচ্ছে দাঁত ভেদ করে মাংস ঢুকে যাবে। এতোটা জোরে চেপে ধরেছে। অস্ফুট স্বরে সে বলে উঠলো,
‘ ছাডুন! ব্যাথা পাচ্ছি। ‘
সায়েরীর ব্যাথায় কাতর মুখশ্রী দেখে সাফওয়ান যেনো দমে গেলো একটুখানি। আলগা হলো হাতের জোর। কিন্তু তখনো তার রাগ কমেনি পুরোপুরি। আলতো হাতে সায়েরীর নরম গাল চেপে ধরে মুখোমুখি ঝুঁকল। গম্ভীর কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ প্রেম করার খুব শখ জেগেছে তাইনা? করাচ্ছি তোমাকে প্রেম। ‘
সায়েরী অবুঝ দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। সাফওয়ানের রাগের উৎস খুঁজে না পেলেও আচমকা তার উপর আগ্রাসী রূপে আক্রমণ করার জন্য মনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়লো। ভালোলাগাটুকু নিমেষেই উড়ে গেলো। তীব্র অভিমানে গাল ভিজলো। কিন্তু মুখ ফুটে একটা বাক্য ব্যয় করলো না। তার চুপসে যাওয়া মুখ দেখে সাফওয়ানের অবশিষ্ট রাগটুকু হাওয়া হয়ে গেলো যেনো। হাতের বাধন আগলা করতেই সায়েরী এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে। মুখ ফিরিয়ে নিজ হাতের দিকে চোখ পড়তেই দেখলো হলদে,নরম হাতে চার আঙ্গুলের ছাপ বসে লালছে হয়ে আছে। টলমল চোখজোড়া তুলে সে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। চাপা রাগে নাক ফুঁসছে তার। তিরতির করে কাঁপছে পাতলা ঠোঁটজোড়া। এই দৃশ্য দেখে সাফওয়ান ভাষা হারিয়ে ফেললো। বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। মিনিট খানিক পূর্বের আকাশ সম রাগ কোথায় মিলিয়ে গেলো সে নিজেও ঠের পেলো না।
ঠিক সেই মুহূর্তে লাইব্রেরি রুমে হাজির হলো জিমন। হাতে ছোট্ট একটা গিফট বক্স। দরজার কাছে এসে থমকে গেলো বেচারা। তার দেওয়া জিনিসগুলো ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে দেখে বোকা বনে গেলো। সেই সাথে সাফওয়ানের উপস্থিতি আরো বেশি কৌতুহলী করে তুললো তাকে। অবাক কন্ঠে সে বলে উঠলো,

‘ এসব কি? গিফটগুলোর এই অবস্থা কে করলো? ‘
জবাব দিলো না কেউ। সায়েরী কাঁধের ব্যাগ শক্ত হাতে ধরে গটগট পায়ে জিমন’কে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলো। দুজনের অদ্ভুত আচরণ দেখে জিমন রীতিমতো হতবাক।
‘ হলো কি তোদের? সায়েরী এভাবে চলে গেলো কেনো? আমি যে গিফটস দিলাম সেগুলোও…… ‘
বাকি কথাটুকু শেষ করার আগে আচমকা তেড়ে আসলো সাফওয়ান। রাগ্বত স্বরে চেঁচিয়ে বললো,
‘ তুই কোন সাহসে ওকে ফুল দিয়েছিস? কবে থেকে চলছে এসব? ‘
জিমন ভড়কে গেলো। কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুঝে উঠতে পারলো না তার ভুলটা কোথায়। তারপর সাফওয়ানের রাগের কারণ ধরতে পেরে পেট ফেটে হাসি বেরুলো তার। হেসে উঠলো উচ্চস্বরে। তার আচরণে সাফওয়ান যরাপণায় বিরক্ত। জিমন হাসি চেপে কোনো মতে বললো,

‘ তুই কি ভেবেছিলি? আমি ফুলগুলো সায়েরীর জন্য দিয়েছিলাম? ‘
ভ্রুঁ কুঁচকালো সাফওয়ান। কৌতুহলী কন্ঠে বললো,
‘ তা নাহলে কার জন্য দিয়েছিস? ‘
‘ আবে পিউ’র জন্য দিয়েছিলাম। সায়েরী’কে দিতে যাবো কেনো? ‘
‘ পিউ? পিউ কে? ‘
কপাল চাপড়ালো জিমন। বিরক্ত মুখে জবাব দিলো,
‘ এখন কি পিউ কে সেটা তোকে নতুন করে জানাতে হবে? আমার আগে থেকে পিউ’কে তুই ভালো চিনিস। ‘
হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো সাফওয়ান। বললো,

‘ ওহ হ্যাঁ। তোর তো গার্লফ্রেন্ড আছে। ‘
জিমন আবারো হেসে উঠলো। সাফওয়ানের কাঁধ চাপড়ে বললো,
‘ ওরে আমাদের প্রেমিক পুরুষ রে! নতুন নতুন প্রেমে পড়ে দিন দুনিয়া ভুলে বসেছিস দেখি।’
একটু থেমে আবারো বললো,
‘ বাপরে, কাল যে অ্যাকশন ফিল্ম দেখলাম। এরপর থেকে সায়েরীকে বোনের নজরে না, নজর তুলে তাকানোর সাহস করেছি এই অনেক। এই অধমের সাধ্য নেই তোর মতো অগ্নিয় লাভার সাথে লড়ার। পিউ রাগ করেছে বলে ফুলগুলো ওর জন্য পাঠাচ্ছিলাম এই যা। ‘
সাফওয়ান ভ্রুঁ চুলকে মৃদু হাসলো। রবিনের কথা মনে পড়ায় পুণরায় গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ চৌধুরীর ছানা টা কোথায়? মরেছে? ‘
জিমন আৎকে উঠলো,

‘ নাওযুবিল্লাহ্! মরবে কেনো? ও মরলে কোন জটিলতায় ফাঁসবি জানিস? কাল আমি আর মিহাদ মিলে হসপিটালে দিয়েই চলে এসেছিলাম। এডমিট করাতে গেলেই তো ফেঁসে যেতাম। আমার পরিচিত একজন আছে ওখানে। শুনলাম ওর ফ্যামিলি এসেছিলো রাত তিনটায়। অবস্থা বেশ খারাপ ছিলো। সকালের দিকে স্টেবল হয়েছে। তবে…হাতটা ঠিক হওয়ার চান্স নেই একদম। ‘
সাফওয়ান দায়সারা ভাব নিয়ে বললো, “বেশ হয়েছে।”
জিমন হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। বললো,
‘ রাগটা একটু কমা ভাই। যার জন্য এসব করলি তার দিকটাও ভাব। তোর এই হুটহাট রাগ ওর উপর কিরূপ প্রভাব ফেলবে ভাবতে পারছিস? এমনিতেই তোর গম্ভীর স্বভাবের জন্য সে পাশ ঘেঁষতে চাইনা। এই রূপ দেখলে তো…..। একটু আগেও কিছু না জেনে বুঝে মেয়েটার উপর ঝড় বয়ে দিলি। এভাবে কোনো সম্পর্ক ঠিকবে? ঠিকবে বলছি কেনো, তোর-টা শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাবে। ‘
সাফওয়ান কান খাড়া করে শুনলো সবই। কিন্তু প্রতিউত্তর করলো না। জিমন হাত ঘড়িতে সময় দেখে কিছু একটা ভেবে বললো,

‘ নিচে তো সায়েরীর বন্ধুদের দেখলাম না। সবাই হয়তো চলে গিয়েছে। কলেজও ইতোমধ্যে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। বেলা সাড়ে তিনটা বাজতে চললো। মেয়েটা নিশ্চয় একা একা ফিরছে। এই সময় গাড়িঘোড়া পাবে বলে তো মনে হয় না। তারউপর তুই বকাঝকা করেছিস। ও তো একটুতেই কেঁদে ভাসিয়ে দেই জানি। কে জানে কোন অবস্থায় আছে। আবরার যদি তোর এসব কর্মকাণ্ডের কথা জানে তাহ….. ‘
জিমনের কথা শেষ হওয়ার আগে একপ্রকার ছুটে বেরিয়ে গেলো। জিমন বারকয়েক ডেকেও সাড়া পেলো না কোনো। বিড়বিড় করে সে বললো, ‘এই ছেলে পাগল হয়ে গিয়েছে।’

কোলাহলপূর্ণ রাস্তা। শাঁই শাঁই করে ছুটছে একের পর এক গাড়ি। কিন্তু একটাও খালি নেই। কড়া রোদের অতিষ্ঠ হয়ে গাছের ছায়াতলে দাঁড়ালো সায়েরী। লাইব্রেরি রুম থেকে ফিরে বন্ধুদের না পেয়ে ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলো সে। অবশ্য সে নিজেই বলেছিলো চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু যখন এসে দেখলো বন্ধুরা নেই। তখন সাফওয়ানের রাগ সব গিয়ে ঠেকলো বন্ধুদের উপর। কেনো তারা চলে গেলো? এখন আবার গাড়ি পাচ্ছে না। তার হয়েছে যতো জ্বালা। ভিতরে জমানো চাপা রাগ উগড়ে দিতে না পেরে এবার সে কড়া রোদের মাঝেই হেঁটে চললো। ভাবখানা এমন যেনো হেঁটে হেঁটেই আজ বাড়ি অবধি ফিরবে। যতো ক্লান্তি আসুক না কেনো।

হাঁটতে হাঁটতে কলেজ গেইট থেকে অনেকটা দূর চলে চলে আসলো সে। বেশ অনেক্ষন পর কানের কাছে হর্নের শব্দ পেয়ে রাস্তার কিনারা ধরে এগোতে লাগলো। অন্যমনস্ক হয়ে হেঁটেই চললো। অনেক্ষন পর লক্ষ্য করলো হর্নের শব্দটা থামছেই না। থেমে থেমে বেজেই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেনো সায়েরীর মনযোগ পাওয়ার চেষ্টা করছে। ব্যাপারটা বোধগম্য হতেই দাঁতে দাঁত চেপে ধরে পেছন ঘুরলো সায়েরী। এক্ষুনি গাড়ির মালিকের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্দ্বার করবে এমন একটা ভাব নিয়ে পিছন ফিরে তাকালো সে। কিন্তু সম্মুখে অতি পরিচিত কালো স্করপিউ গাড়িটা দেখে থমকে গেলো। দূর থেকেই দেখলো গাড়ির সামনের কাঁচের অপর পাশে ড্রাইভিং সিটে বসা মানুষটার বাদামি চোখজোড়ার গভীর চাহনি স্থির হয়ে আছে তার দিকে। সায়েরী দমে গেলো।

নজর ঘুরিয়ে নিলো দ্রুত। যতোই তর্জন গর্জন করুক না কেনো, মানুষটার সামন্য চাহনিতেই নেতিয়ে পড়ে সে। এখনও নেতিয়ে পড়লো। পারলো না শক্ত কন্ঠে ভিতরের সব রাগ, ক্ষোভ উগড়ে দিতে। তপ্ত শ্বাস ফেলে পুণরায় যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো সে। ততক্ষণে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়েছে সাফওয়ান। লম্বা লম্বা পা ফেলে মুহুর্তের মধ্যেই সায়েরীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। অন্যমনস্ক সায়েরী আচমকা এমন কান্ডে হকচকিয়ে গেলো। অবুঝ নয়নে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। শান্ত, স্বাভাবিক মুখ সাফওয়ানের। সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না সে কি এখনো রেগে আছে কিনা। তবে মনে মনে প্রশ্ন তুললো, ” কেনো এসেছে আবার? আরো কিছু বলা বাকি আছে নাকি? ” তবে মুখ ফুটে কিছু বললো না। বরং তাকে অবাক করে দিয়ে সাফওয়ান নিজে শান্ত, শীতল কন্ঠে বলে উঠলো,

“গাড়িতে উঠো। ”
সায়েরী চমকালো। ভড়কে গেলো এই কন্ঠ শুনে। সাফওয়ানের রাগ্বত, গম্ভীর স্বর যতোটা ভয়ংকর। শান্ত, মোলায়েম কন্ঠটা ততোটাই আদুরে। বিগত কয়েক দিনে পরপর এতোবার এই আদুরে কন্ঠের বাণী শুনে সায়েরী বাকরুদ্ধ। যা এতো বছরে হলো না, তা পরপর কয়েকদিনে হচ্ছে। মানে কি এসেবের? সায়েরীর নিরবতা দেখে সাফওয়ান অধৈর্য হয়ে উঠলো। কড়া রোদের মাঝে ত্বক জ্বলছে তার। ব্যাস্ত ভঙ্গিতে সে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ গাড়িতে উঠো। এই সময় অন্য কোনো গাড়ি পাবে না। আমি ড্রপ করে দিচ্ছি। ‘
টনক নড়লো সায়েরীর। কপালে ভাঁজ ফেলে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। জুতা মেরে গরু দান করতে এসেছে এই ছেলে? বিরক্ত মুখে সে পাশ কাটিয়ে অগ্রসর হলো সামনের দিকে। এসব ন্যাকামো দেখে তরতরিয়ে রাগ বাড়ছে তার। সায়েরীর এমন উদাসীনতা মেনে নিতে পারলো না সাফওয়ান। খপ করে হাত টেনে ধরলো। সায়েরী তাকাতেই কন্ঠে খানিকটা জোর ঢেলে বললো,

‘ কথা কানে যায়নি? গাড়িতে উঠতে বলেছি। ‘
এবারেও জবাব আসলো না কোনো। সাফওয়ান অধৈর্য হয়ে আশেপাশে সতর্ক নজরে তাকিয়ে হুট করে কাছে টেনে নিলো সায়েরীকে। কন্ঠে খাদ নামিয়ে বললো,
‘ রাস্তায় সিন ক্রিয়েট করতে বাধ্য করবে না। চুপচাপ গাড়িতে উঠো। ‘
সাফওয়ানের ধরে হাতটা ছাড়ানোর জন্য মোড়ামুড়ি শুরু করলো সায়েরী। এবার চুপ থাকতে না পেরে বিরক্ত কন্ঠে বললো,

‘ হাত ছাড়ুন। কোত্থাও যাবো না আমি আপনার সঙ্গে৷ দরকার হলে সারা রাস্তা হেঁটে যাবো। তবুও আপনার সাথে যাবো না। ‘
বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। আশেপাশে তাকিয়ে সায়েরীর হাতখানা আরো একটু জোর প্রকাশ করে চেপে ধরলো। টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললো,
‘ তুমি যাবেনা, তোমার ঘাড় যাবে। ‘
একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিলো সায়েরীকে। সায়েরীর সিটে পড়লো ধপ করে। ধাতস্থ হয়ে উঠে যেই দরজা খুলতে যাবে, তার আগেই গাড়িতে উঠে বসলো সাফওয়ান। এবং দক্ষ হাতে সঙ্গে সঙ্গে লক করে দিলো গাড়ি৷ ব্যাপারখানা বুঝতে পেরে ঘাড় ফিরিয়ে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো সায়েরী। রাগে, দুঃখে রীতিমতো কান্না পাচ্ছে তার। গাড়ির দরজার ছোট্ট বাটনে সাফওয়ান আঙ্গুল চেপে ধরে আছে। সেটা দেখে সায়েরী ঝুঁকে আসলো তার দিকে। সাফওয়ানের হাত সরিয়ে গাড়ি আনলক করার চেষ্টা করতে করতে চেঁচিয়ে উঠলো,

‘ লক খুলুন। আমি থাকবো না এখানে। আপনার সাথে যাবো না। খুলুন বলছি। আপনার সাথে কোথাও যাবো না। দরজা খুলুন। ‘
বারকয়েক টানাটানি করেও হেলদোল হলো না সাফওয়ানের শক্তপোক্ত হাতের। উল্টো সায়েরী নিজেই হাঁপিয়ে উঠলো। তার অবস্থা দেখে সাফওয়ান একটুখানি ঝুঁকল তার কানে কাছে৷ মৃদু কন্ঠে বললো,
‘ আমি না চাওয়া অবধি এই লক খুলবে না বোকাপাখি। অযথা এনার্জি লস করছো৷ ‘
রাগ,ক্ষোভ,অপমান,অভিযোগ সব অনুভূতি মিলিয়ে এবার গাল ভিজে উঠলো সায়েরীর। সাফওয়ানের হাতের উপর হাত রেখে সে সেই অবস্থাতেই ফিরে তাকালো। সরাসরি দৃষ্টি গাঁথলো সাফওয়ানের বাদামি চোখজোড়াতে৷ কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টায় কেঁপে কেঁপে উঠছে তার পাতলা ঠোঁটজোড়া। সেই কম্পিত ঠোঁট নেড়ে সে ক্ষুব্ধ গলায় বলে উঠলো,

‘ আপনি একটা অসহ্য। ‘
কথার সাথে সে খামচে ধরলো সাফওয়ানের হাতের উল্টো পিঠ। কিঞ্চিৎ লম্বা নখ গেঁথে গেলো ধবধবে ফর্সা চামড়ায়। একটুখানি ব্যাথায় চোখ কুঁচকে ফেললো সাফওয়ান। পরপর আবার স্বাভাবিকও হয়ে গেলো। সায়েরীর সেসবে খেয়াল নেই। রাগের বশে কি করে বসেছে ঠেরই পেলো না সে। তার কথার প্রতিউত্তরে সাফওয়ান দায়সারা ভাব নিয়ে বললো,

‘ আমি অসহ্য, গোমড়ামুখো, অ্যানাকন্ডা, যমরাজ এসব জানা আছে। নতুন কিছু থাকলে বলো। ‘
সায়েরীর রাগ বাড়লো আরো একধাপ। এই ছেলে এতোটা নির্লিপ্ত হয়ে আছে কিকরে? এতো কিছু বললো তবুও শান্ত আছে কীভাবে এখনো? সায়েরীর ভাবুক মুখখানার দিকে তাকিয়ে আড়াআড়িভাবে ভ্রুঁ নাচাল সাফওয়ান। বললো,
‘ কি? নতুন কিছু নেই বলার? না থাকলে সরো। গাড়ি স্টার্ট করি। নাকি এভাবেই আমার উপ….. ‘
সাফওয়ানের বলতে দেরি। কিন্তু সায়েরীর সরে আসতে দেরি হলো না। গাল ফুলিয়ে সিটে বসে পড়লো সে। গাড়ি স্টার্ট হলো। চাকা সামনের দিকে অগ্রসর হতেই আচমকা টান সামলাতে না পেরে ঝুঁকে পড়লো সায়েরী। মাথায় ধাক্কা লাগতে গিয়েও লাগলো না। লক্ষ্য করলো তার কপালের কাছে এগিয়ে এসেছে শক্তপোক্ত পুরুষালি হাতের তালু। সেটা এগিয়ে না আসলে হয়তো আজ মারাত্মক আঘাত লাগতো মাথায়। নিজেকে সামলে পুণরায় ঠিকটাক হয়ে বসলো সায়েরী। শুনা গেলো সাফওয়ানের রাশভারি কন্ঠস্বর,

‘ সিট বেল্ট লাগাও। ‘
সায়েরী যেনো শুনেও শুনলো না। অনড় হয়ে বসে রইলো জানলার দিকে মুখ করে। সাফওয়ান একই বাক্য পুণরায় আওড়াল। কিন্তু ফলাফল আগের মতোই। শূন্য। সেকেন্ড দুয়েক সায়েরীর গম্ভীর মুখকানার দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো সে। নিজের সিট বেল্ট খুলে হুট করে ঝুঁকে আসলো সায়েরীর মুখোমুখি। হকচকিয়ে গেলো সায়েরী। আচমকা সাফওয়ান’কে এতোটা কাছাকাছি দেখে সে লেপ্টে গেলো সিটের সঙ্গে। সাফওয়ানের দৃষ্টি সরাসরি সায়েরীর হতবাক দৃষ্টিতে নিবদ্ধ। কিন্তু তার শক্তপোক্ত হাত হুট করে ছুঁয়ে দিলো সায়েরী’র সরু কোমর। দৃশ্যমান রূপে কেঁপে উঠলো সায়েরী। বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে ডিম্বাকৃতির হয়ে উঠলো চোখজোড়া। হকচকিয়ে উঠে সে বললো,
‘ ক..কি করছেন!! ‘

প্রতিউত্তর পেলো না কোনো। শুধু অনুভব করলো সাফওয়ানের পুরুষালি হাত তার কোমর ছুঁয়ে পিঠে গিয়ে থেমেছে। কিছু একটা খুঁজছে যেনো। সরু আঙুলের শীতল ছোঁয়ায় সায়েরীর শরীরের লোমকূপ অবধি কেঁপে উঠলো। আনমনে কবে চোখ খিচে ফেললো, তা নিজেও ঠের পেলো না। হৃদস্পন্দনের গতি বেসামাল ছুটছে। দ্রিমদ্রিম শব্দটা কানে বাজছে যেনো। সময় নিয়ে সায়েরীর পিঠের দিকে পড়ে থাকা সিট বেল্ট বের করে ঠিকঠাক করে লাগিয়ে দিলো সাফওয়ান। খট করে আওয়াজ হতেই চোখ মেলে তাকালো সায়েরী। বেল্ট লাগিয়ে দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলালো সাফওয়ান। সায়েরীর বোকা বোকা নজর দেখে তীর্যক হাসলো। কন্ঠে খাদ নামিয়ে আড়াআড়িভাবে ভ্রুঁ নাচিয়ে বললো,
‘ সিট বেল্ট লাগাচ্ছিলাম। অন্যকিছু আশা করছিলে বুঝি? ‘

বিমূঢ় সায়েরী সূক্ষ্ম ইঙ্গিতটুকু বুঝতে পেরে গুটিয়ে গেলো একেবারে। ফোলা ফোলা গালজোড়া রক্তিম হয়ে উঠলো তীব্র লজ্জায়। নিশ্বাস আটকে গলায় জোর ঢালার আপ্রাণ চেষ্টা করে বললো,
‘ ম..মোটেও কিছুর আশা করিনি। আপ..আপনি! আপনি সরছেন না কেনো? গাড়ি চালু করুন। বাড়ি যাবো আমি। ‘
সাফওয়ানের দিকে না তাকিয়েই কথাটুকু বললো সে। এখনো ধরাস ধরাস কাঁপছে বুক। তার রক্তিম গালজোড়ার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সরে আসলো সাফওয়ান। নিশ্চুপ ভঙ্গিমায় গাড়ি চালু করলো। জ্যাম না থাকায় মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলো গন্তব্যে। স্বস্তির শ্বাস ফেলে তাড়াহুড়ো করে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে লাগলো সায়েরী। যতো দ্রুত পারে এখান থেকে বেরুতে পারলেই যেনো স্বস্তি। অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ টান দিতে গিয়ে ব্যাথা পাওয়া হাতে চাপ পড়লো জোরে। ব্যাথায় অস্ফুটস্বরে আওয়াজ করে উঠলো সে। চমকে উঠলো সাফওয়ান। লক্ষ্য করলো সায়েরীর নরম হাতের তালুতে লম্বাকার কাটা দাগ। সাথে সাথে তার মনে পড়ে গেলো লাইব্রেরী রুমে রাগের বশে সায়েরীর হাত থেকে ফুলগুলো কেড়ে নেওয়ার সময়ও সায়েরী ব্যাথায় এমন শব্দ করে উঠেছিল। ব্যাথাটা তবে তখনের? খুব সম্ভবত গোলাপের কাঁটায় কেটেছে। মনে মনে নিজের রাগের উপর বেশ বিরক্ত হলো সাফওয়ান। হাত বাড়িয়ে টেনে নিলো সায়েরীর নরম হাত। সায়েরী তাকাতেই সে নরম কন্ঠে বললো,
‘ ব্যাথা পেলে কি করে? ‘

কপালে ভাঁজ পড়লো সায়েরীর। নিজে ব্যাথা দিয়ে এখন দরদ দেখাতে এসেছে? যত্তসব ন্যাকামি। হাত টেনে নেওয়ার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু সাফওয়ানের শক্তির কাছে হার মানতে হলো তাকে। হাতখানা ধরে রেখেই গাড়ির ডেক্সে কিছু খুঁজতে লাগলো সাফওয়ান। সামান্য একটা ব্যান্ডেজের আশা করছিলো সে। কিন্তু পেলো না। পাবে কি করে? কখনো এমন কিছুর প্র‍য়োজন পড়েনি বলে রাখেনি সাথে। এদিকে সাফওয়ানের মনযোগে ব্যাঘাত ঘটতে দেখে টান মেরে হাত ছাড়িয়ে নিলো সায়েরী। ব্যাগ তুলে বেরিয়ে গেলো গাড়ি থেকে। সাফওয়ান বিচলিত নজরে তাকিয়ে। তার দিকে ফিরে ধরাম শব্দ তুলে গাড়ির দরজা লাগিয়ে গটগট পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলো সায়েরী। ভারী আওয়াজে চোখ খিচে ফেললো সাফওয়ান। শখের গাড়ির সাথে এমন জুলুম দেখেও কিচ্ছুটি বলার ভাষা নেই যেনো। টান টান হয়ে বসে স্টিয়ারিং হতে একহাত উঠিয়ে জানলার উপর কনুই ঠেকালো। কপালের মাঝখানে দুই আঙুল দিয়ে ঘঁষে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো। বিড়বিড় আওয়াজে নিজেই নিজেকে বললো,
‘ অল দ্যা বেস্ট মিস্টার খান! নিজে তো জেদি। এবার তোর চেয়েও মহা জেদি কপালে জুটেছে। ‘

হাসপাতালের নিস্তব্ধ কেবিন। বেডের উপর হাত,পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে রবিন। নিবু নিবু চোখ। শরীর জুড়ে অসহনীয় ব্যাথা। খাওয়ার জন্য মুখ অবধি খোলতে পারছে না। সাফওয়ানের শক্ত ঘুষিতে চোয়ালের হাড় ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেছে যেনো। ডান হাত প্লাস্টার করা। ঝুলে আছে গলায়। মাথায় ইয়া মোটা ব্যান্ডেজ। জ্ঞান ফিরার পর নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করে বিমূঢ় হয়ে ছিলো সে। ভেবেই নিয়েছিলো, এই জীবন আর ফিরে পাবে না। দেহের অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো বেঁচে থাকতে দ্বিতীয় বার লাগতে যাবে না সাফওয়ান নামক যমরাজের সাথে। এক বারেই শিক্ষা পেয়ে গিয়েছে সে।

কেবিনের দরজা খোলার শব্দে ঘোর কাটলো রবিনের। নড়নচড়ন বাধে চোখ ঘুরিয়ে দেখলো তার একমাত্র বড় ভাই তাশরীফ চৌধুরী এসেছে। সে কোনো এক কাজে শহরের বাইরে ছিলো। আজই ফিরেছে ভাইয়ের অবস্থার কথা শুনে। তার বাবা তৌফিক চৌধুরী বেশ কয়েকবার এসে ঘুরে গিয়েছে। রাতভর হাসপাতালেই ছিলো। মাস দুয়েক পর ইলেকশন বলে তিনি ঠিকঠাক সময় করে উঠতে পারছেন না। তাশরীফ চৌধুরী এসে রবিনের বেডের পাশে চেয়ার টেনে বসলো। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তার সহকর্মী আবিদ। রবিনকে পরখ করে নিয়ে তাশরীফ আবিদের কাছে জানতে চাইলো,

‘ কোনো খবর পেয়েছো? কীভাবে হলো এসব? ‘
আবিদ মাথা নেড়ে বললো,
‘ খবর পেয়েছি স্যার। ছোট স্যারের দুজন বন্ধু এসেছে। রাত থেকে এখানেই আছে। ওরা বলেছে সব ‘
আলগোছে উঠে দাঁড়ালো তাশরীফ। কেবিনের জানলার কাছে গিয়ে ব্যাস্ত শহরের দিকে নজর দেখে বললো,
‘ কার এতো বড় বুকের পাঠা হয়েছে যে রবিন চৌধুরী’র গায়ে হাত তুলে? নাম বলো। ‘
আবিদ থেমে থেমে জবাব দিলো,
‘ স্যার স..সাফওয়ান। সাফওয়ান তেহজিব খান। সান অফ পলিটিশিয়ান নওশাদ খান। ” ওয়াসিয়ান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি’স “এর মালিকের ছেলে, ভাইপু। ‘

তাশরীফ চমকালো। চোখের দৃশ্যপটে ভেসে উঠলো সুদর্শন যুবকটার ভয়ংকর রূপ। আনমনে থুতনিতে থাকা কাটা দাগে হাত চলে গেলো তার। মনে পড়ে গেলো বছর চারেক আগে শহরে নতুন আসা চৌদ্দ কি পনেরো বছর বয়সী এক কিশোরীকে দেখে বিগড়ে গিয়েছিলো সে। ধবধবে ফর্সা, আকর্ষণীয় দেহের গড়নের সাথে মুখজুড়ে রূপকথার রাজকন্যার মতো সৌন্দর্য ছিলো সেই মেয়ের। চোখ ধাধানো সৌন্দর্য যাকে বলে। দেখে মনে হচ্ছিলো ষোলো কিংবা সতেরো বছরের মেয়ে। প্রথম বার দেখেছিলো চার-পাঁচ জন বন্ধু বান্ধব নিয়ে স্কুল ড্রেস পরিহিতা অবস্থায়। তাশরীফ তখন ভার্সিটি তৃতীয় বর্ষে। এমন চোখ ধাধানো সৌন্দর্যে মাতোয়ারা হয়ে সে পরপর দুইদিন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছিলো মেয়েটাকে। তৃতীয় দিনই স্কুল ছুটির পর ফাঁকা রাস্তায় খুব সাবলীলভাবে প্রেম নিবেদন করে বসেছিলো। কিন্তু মেয়েটা পাত্তাই দিলো না। বড্ড অনীহার চোখে তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো।

ব্যাপারটা তাশরীফের অহংকারে লেগেছিলো বেশ। সামনে গিয়ে হাত চেপে আটকালো মেয়েটাকে। ভেবেছিলো অল্প বয়সী মেয়ে, ভয়ে গুটিয়ে থাকবে৷ কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে হাত ধরা মাত্রই নরম হাতের জোরালো থাপ্পড় পড়েছিলো তার গালে। সেই সাথে তেজস্বী কন্ঠে ধমকানি। হতবাক হয়ে তাশরীফ শুধু দেখেই গেলো রাগে গোলাপি হয়ে উঠে দুধে আলতা মুখশ্রীর দিকে৷ মেয়েটা চোখ রাঙ্গিয়ে চলে গেলো। তাশরীফের ঘোর কাটলো আরো অনেক পরে৷ এবং অল্প বয়সী মেয়ের কাছ থেকে এমন অপমানিত হয়ে সে উন্মাদ হয়ে উঠলো যেনো। পরের দিন আবারো হাজির হলো স্কুল গেইটের কাছে। বেশ খানিক্ষন পর তার সামনে এসে থামলো একটি কালো রঙের গাড়ি। ব্যাক সিট থেকে বেরিয়ে আসলো পরিচিত রূপবতী মেয়েটি।

তাশরীফ নড়েচড়ে দাঁড়ালো৷ কাছাকাছি গিয়ে কিছু বলতে উদ্যত হবে তখনই গাড়ির অন্যপাশ থেকে বেরিয়ে আসলো লম্বাটে গড়নের এক ছেলে৷ সরাসরি তাশরীফের সম্মুখীন হয়ে সে শক্ত কন্ঠে শাসিয়ে বলেছিলো, তার একমাত্র ছোট বোনকে দ্বিতীয় বার যেনো উত্ত্যক্ত না করে৷ নয়তো ব্যাপারটা ভীষণ খারাপ হবে৷ সদ্য এমপি পদ পাওয়া বাবার ছেলে হয়ে তাশরীফ সহ্য করতে পারলো না ছেলেটার এই তেজ৷ বিশ্রী হেসে রূপবতী কিশোরী’র দিকে কু-দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাজে মন্তব্য করে বসে সে৷ সঙ্গে সঙ্গে চোয়াল বরাবর শক্ত হাতের ঘুষি পড়ে তার। আকস্মিক আক্রমণে তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ে তাশরীফ। রাস্তার কিনারে ভাঙ্গা ইটের কোণায় পড়ে থুতনিতে বাজেভাবে কেটে যায়৷ আশ্চর্যজনক ভাবে জ্ঞান হারিয়ে বসে সে। জ্ঞান ফিরার পর ক্রোধে ফেটে পড়ে সে প্রতিশোধ নিতে চাই। কিন্তু সেখানেও ব্যার্থ হয় বাজেভাবে। তাশরীফ আজও মেনে নিতে পারে না সেই ব্যর্থতা। মাত্র বছর বিশ একুশের এক ছেলে তাকে এমন অপদস্ত করেছে তা মনে পড়লে আজও ক্রোধে দগ্ধ হয়ে উঠে ভিতরটা। যার প্রতি এই ক্রোধ, সেই ছেলেটাই হলো সাফওয়ান। সাফওয়ান তেহজিব খান। নামটা শুনলে আজও চোখে ভাসে কিশোর বয়সের ছেলেটার দাম্ভিক সুদর্শন মুখশ্রী, গম্ভীর মুখভঙ্গি। কন্ঠের সেই তেজ। তাশরীফ বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো। আবিদ নামক যুবকের উদ্দেশ্যে বললো,

‘ মেয়েটা কে ছিলো? ডিটেইলস পেয়েছো? ‘
সঙ্গে সঙ্গে হাতের মোবাইলটা এগিয়ে দিলো আবিদ। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করা হাস্যজ্জল মেয়েটাকে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো তাশরীফ। মনে পড়ে গেলো সপ্তাহ তিনেক আগে এই মেয়ে তার মুখের উপর চেক ছুড়ে মেরেছিলো। আর কি সব বলেছিল? তার মানসিকতা খারাপ? কথাগুলো মনে পড়তে মেজাজ বিগড়ে গেলো তার৷ ভুলে বসেছিলো সব। আজ আবারো মনে পড়ে গেলো। পাশ থেকে আবিদ বললো,

‘ স্যার, আপনি অনেক আগেই বলেছিলেন মেয়েটার ডিটেইলস বের করতে। সব ডিটেইলস আছে আমার কাছে। ‘
তাশরীফ মোবাইল স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখে ভাবলো সাফওয়ানের কথা। তার জানামতে সাফওয়ান নিজের কাছের মানুষদের ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে নাক গলানোর মতো ছেলে না। ছেলেটা নিজের ছোট্ট জগতে ফ্যামিলি, ফ্রেন্ডস নিয়েই ব্যস্ত থাকে৷ বাকি দুনিয়ায় কি হলো না হলো এতো কিছু দেখার, জানার ইচ্ছে শক্তি কোনোটাই নেই তার। সেখানে আজ এই ছেলে একটা মেয়ের জন্য রবিনকে কিডন্যাপ করেছে। যে হাত দিয়ে মেয়েটাকে ছুঁয়েছে সেই হাত ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে৷ ব্যাপারটা নজরে লাগার মতো। সাফওয়ানের স্ট্যান্ডার্ড এর কথা ভেবে সে পুণরায় তাকালো ছবিটার দিকে। প্রথম দেখাই চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য বলে মনে হলো না। কিন্তু খানিক্ষন লক্ষ্য করার পর অনুভব করলো মেয়েটা সুন্দরের চেয়ে মায়াবতী বেশি। গোলগাল মুখ, হলদে রাঙ্গা গায়ের রঙ। মুখজুড়ে অদ্ভুত এক মায়া।

ফুলোফুলো গালজোড়া হাসির তালে আরো ফুলে আছে। বাম গালের মাঝ বরাবর গর্ত হয়ে আছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ডাগরডাগর চোখজোড়া। লম্বা পাপড়ি যুখ কৃষ্ণ বর্ণের আঁখি জোড়ায় অন্যরকম এক সুন্দর ভর করেছে যেনো। সব কিছু খুটিয়ে দেখে সাফওয়ান খান নামক পাথর মানব গলে যাওয়ার কারণটা খুব সহজেই ধরে ফেললো তাশরীফ। মনে মনে ভাবলো, এই মায়াজালে আটকা পড়েছে তবে জুনিয়র খান সাহেব? নট বেড।
আবিদকে মোবাইল ফিরিয়ে দিয়ে কুটিল হাসলো সে। একটাবার কারো দুর্বলতা ধরে ফেলতে পারলে, খুব সহজ হয়ে যায় মানুষটাকে বশে আনা। বহু বছর পর আজ তাশরীফ খোঁজ পেলো সাফওয়ানের অন্যতম দুর্বলতা। সাফওয়ানের বোন কিংবা অন্য ফ্যামিলি মেম্বারদের কখনো আঘাত করার সুযোগ পায়নি। সর্বদা সুরক্ষা নিয়ে চলে কিনা। কিন্তু এই মেয়ে তো সাধারণ একদম। একে বাগে আনতে বেশি কাঠ-খড় পোড়াতে হবে না নিশ্চয়ই?

ক্যানটিনের এক কোনায় চেয়ার পেতে বসে আছে ইপ্সিতা এবং তার দুই সঙ্গী। হিনা এবং জুঁই। মাত্র গতকাল সকালে শুনেছে তারা রবিনের কথা। এবং রবিনের এই অবস্থা কে করেছে সেটা জেনে ভারী অবাক হয়েছে তারা। আজও ইপ্সিতা চিন্তিত মুখে বসে। হিনা ফ্যাকাসে মুখ করে বললো,
‘ দেখ, আমি কিন্তু এসবের মাঝে ছিলাম না। হ্যাঁ ছবিটা আমিই তুলেছিলাম। কিন্তু তুই তো… ‘
ইপ্সিতা ধমকে উঠলো,
‘ চুপ থাকবি তুই? কতোবার বলেছি তোর নাম আসবে না কোথাও। কলেজে এসব বলবি না৷ কে কোনদিক থেকে শুনে ফেলে কোনো ইয়ত্তা নেই। ‘

পুণরায় নিরবতা। তিনজনই চিন্তিত মুখে সে। আচমকা ধব করে শব্দ হলো টেবিলে। থাবা মেরেছে কেউ। চমকে উঠে চোখ তুলে তাকালো তিনজন। সম্মুখে নীতি দাঁড়িয়ে আছে মুখে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে। পেছনে রায়ান,জিমন এবং মিহাদ। তিনজনের হকচকানো মুখ দেখে মিহাদ মুখ দিয়ে আফসোসের স্বরে চু চু ধরনের শব্দ করে বলে উঠলো,
‘ ইশ! কেমন ভয় পেয়ে গিয়েছে সোনামণি’রা। ‘
তারপর চেয়ার টেনে বসে বললো,
‘ এতো চমকে কেনো বলোতো? গোপন আলাপ চলছিলো বুজি হুম? ‘
চুপসে গেলো তিন রমনীর মুখ। নীতি, রায়ান,জিমন হেসে উঠলো। মিহাদের পাশে চেয়ার বসলো নীতি। বাকি দুজন দাঁড়িয়ে। ইপ্সিতার মুখোমুখি হয়ে সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

‘ কি ব্যাপার পাপা’র কাক পাখি। আজ উড়ছো না যে? ধরা পড়ার ভয় পাচ্ছো বুজি? ‘
থতমত খেয়ে গেলো ইপ্সিতা সহ বাকি দুজন। ইপ্সিতা দমে গেলেও রাগী কন্ঠে আমতাআমতা করে বললো,
‘ ক..কেনো ভয় পাবো? ধরা পড়তে যাবো ই বা কেনো? আমি চুরি করেছি নাকি? আজেবাজে বকবে না। ‘
মিহাদ ভয় পাওয়ার ভান করে হাত চেপে ধরলো বুকে। অবাক চোখে নীতির দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ আজেবাজে বকছিস কেনো নীতি? ইপ্সিতা আজওয়ার কি চুরি চাপারি করতে পারে নাকি? সে তো অন্যদের দিয়ে করায়। ‘

নীতি মাথা নেড়ে বললো, ” হ্যাঁ হ্যাঁ। ”
জিমন এবং রায়ান ঠোঁট চেপে হাসছে। মিহাদ পুণরায় বলে উঠলো,
‘ জীবনে শুধু এতোটুকু বড় লোক হতে চাই বুঝলি। এই যেমন ধর, একজনকে দিয়ে ছবি উঠালাম, একজনকে গিয়ে সেটা এডিটিং করাবো। অজন্য একজনকে দিয়ে পাবলিশ করাবো৷ আমি নাকে তেল লাগিয়ে ঘুমাবো আর তারা আমার সব কাজ করবে৷ আহ! জীবনে এটুকু বড়লোক হওয়া বাকি। ‘
হাসি চেপে রাখতে না পেয়ে ফিক করে হেসে উঠলো জিমন। এবং সঙ্গে সঙ্গে আবার নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরলো। নীতি এবং রায়ানের মুখেও মিটিমিটি হাসি। এদিকে হিনা এবং জুঁইয়ের অবস্থা নাজেহাল। রীতিমতো ঘাম ঝরছে কপাল বেয়ে। ইপ্সিতা শেষ বারের মতো শক্ত মনোবল ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বললো,
‘ তোমার জীবনের গল্প শুনতে বসে নেই আমি এখানে। সরো, আমাদের ক্লাস আছে। ‘

‘ আরেব্বাপ ক্লাসও করো? কবে থেকে? চারবছরে আমি বোধহয় সেই গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসগুলো মিস করে দিয়েছি, যেগুলোতে তুমি উপস্থিত ছিলে। চু চু। আফসোস লাগছে এখন। কীভাবে এতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস মিস করে দিলাম! ‘
কটমট চোখে তাকিয়ে রইলো ইপ্সিতা। নীতি এবার সিরিয়াস হলো। ইপ্সিতার মুখোমুখি ঝুঁকে কাটকাট কন্ঠে বললো,
‘ সাফওয়ান এবং সায়েরীর ছবিটা তুমি রবিনকে কেনো দিয়েছো?
‘ আমি কোনো ছবি দেইনি রবিনকে। ‘
‘ মিথ্যে বলবে না। তোমার ফোন দুদিন আগেই হ্যাক করেছি। ‘
আৎকে উঠলো ইপ্সিতা। অবাক কন্ঠে বললো,
‘ কি বললে? আমার..আমার ফোন? হাউ ডেয়ার ইউ? ‘
ইপ্সিতা চেঁচিয়ে উঠতেই মিহাদ জোর গলায় বলে উঠলো,

‘ আহা! আওয়াজ নামিয়ে কথা বলো সুন্দরী। তোমার সুন্দর সুন্দর কীর্তি কালাপের কথা সকলে শুনে ফেলবে তো। ‘
রাগে ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠলো ইপ্সিতার। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। আঙ্গুল তুলে শাসিয়ে উঠলো নীতিকে,
‘ এর জবাবদিহি তোমার করতেই হবে। ভুলে যেওনা আমি কার মেয়ে। আমার পাপা জানলে….. ‘
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মিহাদ কানে দিয়ে চোখ কুঁচকে বলে উঠলো,
‘ এই পেঁপের পাতাকে চুপ করা রে কেউ৷ আমার কানের নাদান পোকা গুলোর ইন্না-লিল্লাহ হয়ে যাচ্ছে। ‘
নীতি উঠে দাঁড়ালো। গম্ভীর মুখ করে এগিয়ে মুখোমুখি হলো ইপ্সিতার। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কন্ঠে বললো,
‘ রবিন যে হাসপাতালে আছে সেটা নিশ্চয়ই জানো? তার এই অবস্থার পেছনে যে সাফওয়ান রয়েছে এটাও হয়তো নতুন করা বলা লাগবে না। সেদিন রাতেই রবিন অচেতন অবস্থায় থাকাকালীন ওর ফোন চেক করেছিলো রায়ান৷ যে দুটো ছবি কলেজ গ্রুপে পোস্ট করা হয়েছিলো সেই ছবিগুলো তুমি পাঠিয়েছ রবিনকে। ওই ছেলে তো এমনিতেই মেয়েবাজ৷ এটারই ফায়দা তুলতে চেয়েছো তুমি। সায়েরীর নামে খারাপ কথা ওর কানে ঢুকিয়ে সায়েরীকে বদনাম করতে চেয়েছিলে। কি ভুল বললাম কিছু? ‘

ইপ্সিতা নিশ্চুপ। নীতি বাঁকা হাসলো। পুণরায় বলে উঠলো,
‘ আমরা জানতাম তুমি এতো সহজে মেনে নিবেনা নিজের দোষ। তাইতো পরশু খুব কায়দা করে তোমার ফোন হ্যাক করিয়েছি। তুমি ঠেরও পেলে না। পাবে কি করে? আমরা তো জাস্ট চেক করেছিলাম। রবিনের সাথে তোমার ঠিক কেমন সম্পর্ক আছে সেটার প্রমাণও কিন্তু পেয়ে গিয়েছি৷ রবিনকে তুমি কি কি বলে সায়েরীর দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছিলে সব রেকর্ডিং আছে আমাদের কাছে। সায়েরীর আশেপাশে যদি আর দেখেছি না….. কি হাল হবে ভাবতেও পারবে না৷ নিজের সীমার মধ্যেই থেকো। ‘
নীতির বলা একেক একটা কথা কথায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাগের উৎপত্তি ঘটাচ্ছে ইপ্সিতার। হিংসায় অন্ধ হয়ে সে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,

‘ ওই মিডলক্লাস মেয়েটা কি মাথা কিনে নিয়েছে তোমাদের? কে হয় ও? যার জন্য তোমরা আমার সঙ্গে লড়তে এসেছো? হু দ্যা হেল ইজ শী?
ইপ্সিতার এই কথা শুনে চার বন্ধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলো। বোকা বনে গেলো ইপ্সিতা। নীতি তার কাধে এক হাত রেখে ময়লা ঝাড়ার মতো করে নিচু কন্ঠে বললো,
‘ এই যে বললে হু দ্যা হেল ইজ শী? এই কথাটা দ্বিতীয় বার যেনো মুখ দিয়ে বের না হয়৷ স্পেশালি সায়েরীর জন্য। ও কে সেটা মেটার করে না। পয়েন্ট ইজ…ও কার? যাও, আন্সার টাও বলে দিচ্ছি। তোমার গ্রেটেস্ট ক্রাশ, কলেজের সকল মেয়েদের হার্টথ্রুব, ছেলেদের আইডল, সাফওয়ান তেহজিব খান’র স্পেশাল পার্সন হয় সায়েরী সুবহা। আর সাফওয়ানের স্পেশাল মানে মেয়েটা নিশ্চয় সাধারণ হয়ে পারেনা। বরং সাধারণের মাঝেও অসাধারণ সে। আর যেখানে সে সাফওয়ানের জন্য স্পেশাল। তাইলে আমাদের জন্য স্পেশাল হবে না কেনো? তার কোনো প্রয়োজন নেই আমাদের মাথা কিনে নেওয়ার। আমরা এমনিতেই তাকে মাথায় করে রাখবো৷ তাই তোমাকে শেষ বারের মতো ওয়ার্ন করছি.. স্টে এ্যাওয়ে ফ্রম হার। নয়তো পরেরবার বুঝাতে নয় কেলাতে আসবো৷ ‘
কথা শেষ করে ঘুরে দাঁড়ালো নীতি। তার কাঁধে চাপড় মেরে রায়ান নিম্ন কন্ঠে বললো,

‘ প্রাউড অফ মাই কুইন। ‘
নীতি হেসে ফেললো৷ পরপর রায়ানের হাত জড়িয়ে অগ্রসর হলো সামনের দিকে। পেছনে জিমন। মিহাদ এতোক্ষণ পর উঠে দাঁড়ালো ধীরে সুস্থে। টেবিলে থাকা ক্যান’র বোতলটা তুলে নিয়ে বললো,
‘ সরি লেডিস। আসলে নীতির এতোগুলো কথা শুনতে শুনতে আমার গলা শুকিয়ে গিয়েছে। আমি এটা নিয়ে গেলাম৷ ইউ গাইস এনজয় হুহ্? ওহ! তোমাদের তো আবার ক্লাস আছে৷ যাও যাও, এতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস মিস করা যাবে না।

ইপ্সিতা চোয়াল শক্ত করে চেয়ার চেপে ধরলো। সেটা দেখে দ্রুত কেটে পরলো মিহাদ৷ রাগে, ক্ষোভে টেবিলের উপর থাকা সব কিছু এক ধাক্কায় গুড়িয়ে ফেললো ইপ্সিতা। ক্যান্টিনের সকলের উৎসুক দৃষ্টি গাঁথল তার দিকে। সায়েরী নামক মিডলক্লাস, সাদামাটা মেয়েটা সাফওয়ানের স্পেশাল পার্সন। এই কথাটা সে মেনে নিতে পারছে না৷ তার রূপ,বংশ পরিচয় সব কিনা ওই সামান্য মেয়েটার কাছে হেরে গেলো? কথাটা মাথায় আসতেই রাগে ধপধপিয়ে উঠলো মাথা। জুঁই ভয়ে ভয়ে বললো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩১+৩২

‘ দেখ ইপ্সি। অনেক হয়েছে। আগে নাহয় সাফওয়ান সিঙ্গেল ছিলো। কিন্তু এখন সে পছন্দ করে একজনকে। রবিনের কি হাল করেছে দেখলি না? আর কোনো পাগলামি করিস না প্লিজ৷ সাফওয়ান মোটেও ছেড়ে কথা বলবে না। ‘
ইপ্সিতা শুনেও বললো না কিছু৷ বুকের ভিতর পুড়ে যাচ্ছে যেনো। এই জ্বলন অপমানের, ব্যর্থতার, হিংসার৷ সে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু ওই মিডলক্লাস মেয়েটা কিনা সাফওয়ানের সাথে সুখে থাকবে? ভাবতেই মাথা খারাপ হয়ে উঠলো তার৷ আগুন লেগেছে যখন দুদিকে লাগুক। এই দহন সাফওয়ান – ও অনুভব করুক৷ ওই সাদামাটা মেয়েটার কপালে এতো সুখ কীভাবে সই তা ইপ্সিতা আজওয়ার দেখে নিবে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৫+৩৬