Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৪

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৪

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৪
সাইদা মুন

রাত ৮টা ৩০ মিনিট।
তালহা বসে আছে পড়ার টেবিলের সামনে। চারপাশ একদম শান্ত, এমনকি ঘরের বাতাসেও নীরবতার একটা গভীরতা বিরাজ করছে। মেহরীন আর তাহিয়া দু’জনই তালহার দুপাশে বসে আছে। সারাদিনের ক্লান্তি, জেলের দখল সব মিলিয়ে আসার পর দু’জনই হালকা ঘুমিয়েছিল খাওয়ার পরে।
কিছুক্ষন নিস্তব্ধতার পর তালহা গম্ভীর কন্ঠে বলল,

—কলেজ গেটে পৌঁছে দিয়ে আমার লাস্ট কথা কি ছিল?
তালহার কথায় তাহিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঢুক গিলে প্রস্তুত হলো উত্তর দেওয়ার জন্য। মেহরীন চুপচাপ মাথা আরও নত করে বসে আছে। বাসায় এসে সালমা বেগম আর রিতুর বকা খেয়ে সে ভীষণ আপসেট। তাদের কথায় আরও নিজেকে অপরাধী লাগছে তার। তিতলি বেগমের জোরাজুরিতে দুলোকমা খেয়েছিল। তারপর বালিশে মুখ গুজে কান্না করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, তাও মনে নেই। কান্নার ফলেই তার চোখ-মুখ লাল রঙ ধারণ করেছে। ফোলা চোখ-মুখটা তালহার সামনে রাখতে চায় না, তাই মাথা নত করে রেখেছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—ভাইয়া, তুমি বলেছিলে, বিকেল চারটার আগে যেন আমাদের চারপা বাড়িতে প্রবেশ করে…
মিনমিনিয়ে বলেই সে চোখ নামিয়ে নেয়। ভাইয়ের রাগী লুক তার কাছে জমের মত ভয়ংকর। ভাইকে সে সবচেয়ে বেশি ভালো ও বাসে, আবার সবচেয়ে বেশি ভয়ও পায়। তালহা একবার তাহিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। হয়তো সেও চাইছে না, তার রাগ ছোট বোনকে দেখাতে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কড়া গলায় বলল,
—তাহলে সন্ধ্যা ছয়টায় কেন বাসায় আসতে হলো?
তাহিয়া ঠোঁট উল্টে বলল,

—ভাইয়া, ভুল হয়েছে। আর এমন হবে না, আর তোমার কথার বাইরে যাব না, প্রমিস।
তাহিয়ার কথা শুনে তালহা মেহরীনের দিকে আড়চোখে চেয়ে বলল,
—অনুতপ্ত কি শুধু একজন-ই হয়েছে?
মেহরীন বুঝল, তালহা ঠিক একই উত্তর তার থেকেও চাইছে। তাই সেও নিচু গলায় আওড়াল,
—সরি, ভুল হয়ে গেছে। আর এমন দুঃসাহস দেখাব না।
তালহা এবার দুই হাতের আঙুল একত্রিত করে একটু ভেবে বলল,
—স্ট্যান্ড আপ।
দু’জনই আতঙ্কিত চোখে তাকাল। ‘কানে ধরাবে নাকি?’ এই প্রশ্নটাই প্রথমে মাথায় আসল। দ্রুত দু’জনই হকচকিয়ে বলল,

—প্রমিস, আর এমন করব না, প্লিজ কানে ধরাবেন না।
তালহা চেয়ারে হেলান দিয়ে দু’জনের দিকে একবার করে তাকাল। হঠাৎ বলল,
—একটা ম্যাজিক্যাল ওয়ার্ডের নাম জানিস?
মেহরীন আর তাহিয়া একসাথে কপাল কুঁচকে তাকালো,
—কোন ওয়ার্ড?
তালহা ভ্রু উঁচিয়ে, দাঁত বের করে হালকা স্মার্ক হেসে বলল,
—পানিশমেন্ট।
দু’জনই এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। তালহা হাত ঘুরিয়ে সিরিয়াস হয়ে বলল,

—এই ওয়ার্ডটা খুব পাওয়ারফুল। একবার ঠিকঠাক ডোজে দিলে মানুষ এমন শিক্ষা পায়, ভুলটা আজীবন মাথায় গেঁথে থাকে। ভবিষ্যতে সেই ভুলের ধারেকাছেও যায় না।
তাহিয়া মুখ বাঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—এটা ম্যাজিক্যাল নয়, পিওর টর্চারাল ওয়ার্ড।

এক পা উঁচু করে, দু হাত কানে দিয়ে মুখ ভোতা করে দাঁড়িয়ে আছে মেহরীন। পাশে তাহিয়া। এটাকে তালহা আপাতত নরমাল শাস্তি বলে ঘোষিত করেছে। পরবর্তীতে আরও শাস্তি রয়েছে। একবার এদিক, একবার ওইদিকে পড়ে যেতে যেতেও নিজেদের সামলানোর চেষ্টা করছে দুজন। পা ভুল করে নামতেই টাইমটা বাড়িয়ে দিচ্ছে তালহা। শুরুতে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকা দিয়ে শুরু হয়েছিল, এখন তা আধাঘণ্টায় রূপান্তরিত হয়েছে।
এর মাঝেই মেহরীন আবার পড়তে গিয়ে পা নামাতেই তালহা কড়া কণ্ঠে বলে উঠল,

—আরও দুই মিনিট বাড়ল।
মেহরীন মুখ ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে। তাহিয়া অসহায় চোখে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে। তাদের নাজেহাল অবস্থা দেখে তালহা মনে মনে হেসে ওঠে, কিন্তু নিজেকে সামলে মুখের গম্ভীর ভাবটাই স্পষ্ট রাখল। শরীর ঝারা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে বলল,
—আমি আসতেছি কিছুক্ষনেই, যেভাবে রেখে যাচ্ছি ঠিক সেভাবেই যেন এসে দেখি।
বলেই তালহা বেরিয়ে আসে তাদের রুম থেকে। সে জানে, এখন ভুলেও তার কথা এই দুজন মান্য করবে না। উলটো, কান ছেড়ে রিলাক্সে বসে তাকে নিয়ে সমালোচনা করবে। মূলত এজন্যই সে বেরিয়ে এসেছে। এতক্ষন এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা কি চারটে খানি কথা? একটু বেশিই জুলুম হয়ে যাবে। দুজনই তো তার ভালোবাসার মানুষ। চাইলেও এত বড় জুলুম সে করতে পারবে না তাদের সাথে। নিজের ভাবনাতে নিজেই মাথা চুলকে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়।

খাবার টেবিলে বসে আছে সিকদার বাড়ির সব মানুষজন, শুধু অনুপস্থিত তাহসান। কলেজ শেষেই সে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল নিজের বিজনেস মিটিংয়ের জন্য। আজ সেখানেই থাকার কথা, তবে তাহিয়াদের ঘটনা শুনে মিটিং শেষ করেই সে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। আসতে একটু রাত হবে বলেছিল তিতলি বেগম।
মেহরীনের কেমন যেন সকলের সামনে যেতে ভীষণ ইতস্তত লাগছিল। আসতে চাইছিল না নিচে, তবে তাহিয়া জোর করে নিয়েই এসেছে। টেবিলে বসে সবাই টুকটাক কথা বলছে। পরিস্থিতি বদলাতে তালহার চাচারা তাদের পরীক্ষা কেমন হয়েছে, পড়া বিষয়ক নানান প্রশ্ন করছে। মেহরীন তাহিয়াও উত্তর দিচ্ছে, ছোট ছোট শব্দে।
তালহা এখনো খেতে নামেনি। শুনেছিল বিকালের ইম্পর্ট্যান্ট একটা মিটিং ফেলে নাকি তাদের কাছে গিয়েছিল। সেটাই এখন অ্যাটেন্ড করছে। সে বলেই দিয়েছে, তার আসতে লেইট হবে, সবাই যেন খাওয়া শুরু করে।
মেহরীন ধীরে ধীরে অল্প অল্প ভাত নিয়ে মুখে পুরছে, আবার তা চাবাচ্ছে অনেকক্ষণ লাগিয়ে। প্লেটে যে ভাত ছিল, তার অর্ধেকও শেষ হয়নি এখনো। তার হাত নড়াচড়া লক্ষ করে তাহিয়া কয়েকবার গুতো দিয়েছিল। তবু কোনো পরিবর্তন হয়নি তার মধ্যে।

বেশকিছুক্ষন যেতেই, যখন সকলের খাওয়া অর্ধেক পথে, তখন নেমে আসে তালহা। হয়তো মিটিং শেষ। তালহা এসেই কোনো কথা না বলে সোজা মেহরীনের পাশের খালি চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল। তিতলি বেগম উঠে ছেলের প্লেটে খাবার দিতে চাইলে তালহা মানা করল। মাকে খেতে বলে, নিজেই নিজের প্লেটে ভাত বাড়তে লাগল। দুই চামচ নিজের প্লেটে নিয়ে আরেক চামচ ভাত সকলের চোখের আড়ালে মেহরীনের প্লেটে ঢেলে দিল।
তা দেখতেই মেহরীন চমকে প্লেট সরিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তালহা কড়া চোখের কবলে পড়ল। গম্ভীর কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,

—সবটা যেন খাওয়া হয়।
মেহরীন এদিক সেদিক চোখ ঘুরিয়ে বাকিদের দিকে একনজর তাকাল। কেউ দেখেছে কিনা, তা ভেবে। তবে সবাই নিজেদের মতো খাওয়া আর কথায় ব্যস্ত, তাই তালহার এই কাজ কারো চোখে পড়ল না। তালহা একে একে নিজের পাতে যা নিচ্ছে, তাই সমান পরিমাণে মেহরীনের পাতেও তুলে দিচ্ছে।
সকলেরই খাওয়া শেষ, একে একে সবাই উঠে পড়েছে, বাকি শুধু তালহা আর মেহরীন। তালহারও খাওয়া শেষ, তবু অল্প কয়েকটা ভাত নিয়ে প্লেটে নড়াচড়া করছে। বসে আছে মেহরীনের জন্য। জানে, সে উঠে গেলে মেহরীনও উঠে যাবে আর খাবেনা।

মেহরীন কষ্টমুষ্ট করে শেষ লুকমাটা মুখে নিয়েই চেয়ারে হেলান দিয়ে জোরে শ্বাস নিল। দুই বেলার খাবার একবেলাতেই খাইয়ে দিয়েছে এই তালহা। চোখ রাঙানোতে কিছু বলতেও পারেনি সে। মেহরীনের অবস্থা দেখে তালহা দ্রুত চোখ নামিয়ে তার পেটের দিকে নজর রাখল। বসে থাকার ফলে জামাটা পেটের সঙ্গে চেপে লেগে আছে, আর তাতেই বেশি খাওয়ার ফলে ফোলে যাওয়া পেটটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে থেকেই মুচকি হেসে ফেলল সে।
হঠাৎ তাকে হাসতে দেখে মেহরীন কড়া চোখে তাকাল। মনে মনে গালি দিয়ে বসল, “অসভ্য লোক এতক্ষণ জ্বালিয়ে এখন আবার দাঁত কেলানো হচ্ছে”। মুখ ফুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—হাসছেন কেনো?
তালহা বাম হাতের কনুই টেবিলে রেখে, গালে হাত দিয়ে কাত হয়ে মেহরীনের দিকে তাকাল। এবার ঠোঁট কামড়ে হাসছে সে। মেহরীন অস্বস্তিতে পড়ল। লোকটা এভাবে তাকালে তো লজ্জা লাগছে। নড়েচড়ে বসে ফের জিজ্ঞেস করল,
—কি হলো, হাসছেন কেনো?
তালহার মুখের হাসি আরও প্রশস্ত হলো। পরমুহূর্তে এমন এক কাজ করল যে মেহরীন তাজ্জব বনে গেল। তালহা চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতেই আচমকা ডান হাত বাড়িয়ে এক আঙুল দিয়ে মেহরীনের পেটে গুতো দিয়ে বসল। বড় চোখ করে চেয়ে আছে মেহরীন, ঘটনার মর্ম বুঝে ওঠার আগেই তালহা একটু নুয়ে, নিচু স্বরে হেসে বলল,

—আই লাইক দিস… ডোন্ট আস্ক মি হোয়াই!
কথাটা বলেই সে বড়বড় পা ফেলে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। পেছনে ফেলে গেল লজ্জায় মিয়িয়ে থাকা মেহরীনকে। সে জানে মেয়েটা এখন লজ্জায় লাল-নীল হবে। কাঠের চেয়ারটা শক্ত করে চেপে বসে আছে মেহরীন। তালহা আশেপাশে নেই তবু মাথা তুলতে পারছে না। মনে হচ্ছে তাকালে আশেপাশের আসবাবপত্রও তাকে লজ্জায় ফেলবে।
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার মাঝেই হঠাৎ কারো কর্কশ কণ্ঠ কানে পড়ল। দ্রুত মাথা তুলতেই দেখল সালমা বেগম রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে আরও এক ধমক দিলেন,

—উঠছ না কেনো? আমাদের কি নিজের চাকর পেয়েছো যখন খুশি খেয়ে উঠবে আর থালাবাসন একে একে মাজব আমরা? সকলের সঙ্গে খেলে বাসন ও সকলের সঙ্গেই দিতে হবে। এ বাড়ি কারো মামার বাড়ির রসের হাড়ি নয়।
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে মেহরীনের সামনে পড়ে থাকা এটো প্লেটটা নিয়ে হিশহিশিয়ে চলে গেল। মেহরীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। সে জানে, কারো কথা এত গুরুতরভাবে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সবাই যে একরকম হবে, এমন কোথাও লেখা আছে কি? আর সেই বা কে? এই বাড়ির কারো আপন কি সে? কারো কিছু লাগে কি সে? রক্তের সম্পর্ক আছে কারো সাথে? না, নেই তো কিছুই।

মেহরীন নিজেকে বোঝায়, সবাই ভালো আচরণ করবে এমন আশা করা অযৌক্তিক। বরং, সে অনেক ভালো আছে। তার যেই পরিস্থিতি ছিল তালহাকে না পেলে হয়তো আজ রাস্তাঘাটে একা লাথি-উষ্ঠা খেয়ে দিন কাটত, মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেত। তখন কি এত ভালোবাসা পেত? এখন সে একটা পরিবার পেয়েছে, কত মানুষের সাপোর্ট পেয়েছে। তা কি সে পেত? এসবের তুলনায় এই সামান্য বকা কিছুই নয়।
এই ভাবনায় নিজেকে সামলে মেহরীন রান্নাঘরের দিকে এগোল। হাত ধুয়ে, তাদের একটু হাতে হাতে সাহায্য করবে বলে। কিন্তু দরজার কাছে এসে পা নিজে নিজে থেমে গেল।
ভেতরে তিন জায়ের কথোপকথন চলছিল। সালমা বেগম রাগে নানান কথা বলছেন, বাকি দুই জা তা শুনছেন, ফাঁকে ফাঁকে জবাব দিচ্ছেন।

—দেখো বড় ভাবি, আমি কিন্তু সিরিয়াসলি বলছি, কথাটা সিরিয়াস ভাবে নাও।
তিতলি বেগম ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন,
—হয়েছে, তোর বলা? এবার চুপ যা। মেয়েটা মুটেও তেমন না। এ বয়সে দু-একটা ভুল করেই সবাই। আমরাও তো কতই না ভুল করেছি স্কুল কলেজ লাইফে।
মেহরীনের হয়ে সাফাই গাইতে দেখে সালমা বেগম বিরক্ত হয়ে “চ” সূচক শব্দ করলেন,
—এই মেয়ে অনেক শেয়ানা, ভাবি। দেখবে একদিন অনেক বড় অঘটন ঘটাবেই। না আছে মা-বাপের ঠিকানা, না আছে কোনো পরিচয়। কেমন না কেমন মেয়ে। তোমার ছোট ভাইয়ের বউও বলেছিল আমাকে এ বিষয়ে। তখন এত মাথায় নেইনি, তবে এখন শিউর। সময় থাকতে ব্যবস্থা নাও।
ছোট জায়ের কথায় অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল বাকি দুজন। সে কিছু একটা কথা পেলেই চলে, তার কথায় সম্মতি না দেওয়া অব্দি সারাক্ষণ একই কথা বলেই চলে। তাই তাকে চুপ করাতে তিতলি বেগম বললেন,

—আচ্ছা বাপু, আমি খেয়াল রাখব। তুই শান্ত হ এবার।
দুচোখ জলে টইটম্বুর হয়ে ওঠে মেহরীনের। বুকের ভেতরটা যেন অকারণে ভারী হয়ে আসছে। তার মনে প্রশ্ন জাগে, মা-বাবার পরিচয় না থাকলেই কি একটা মেয়ে মানুষ খারাপ হয়ে যায়? নাকি এই সমাজটাই এমন, মেয়েটা এতিম তাই গায়ে খারাপির দাগ এঁটে দেয়? সে তো কোনো খারাপ কাজ করেনি, তবু কেন প্রতিটা চোখ তাকে বিচার করছে, সন্দেহে মাপছে? কারণ তার কোনো পরিচয় নেই তাই? কেন মা-বাবার পরিচয়হীন ছেলে-মেয়েদের দিকে তাকালেই মানুষের মুখ বদলে যায়?
এই সব প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসে। ড্রয়িংরুমের বেসিনে কোনোমতে হাত ধোয়, জলটা ঠিকমতো চোখে দেখছে না, কারণ চোখের সামনে সব ঝাপসা। চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। কেউ দেখে ফেলবে, এই ভয়ে দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে হাঁটা দেয় সে। তার এই ভেঙে পড়া রূপ কাউকে দেখাতে চায় না সে।

রুমে ঢুকেই আর নিজেকে সামলাতে পারল না মেহরীন। দরজা বন্ধ হতেই ফোঁপিয়ে ওঠে সে। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট হু হু করে বেরিয়ে আসে। ভীষণভাবে মা-বাবার কথা মনে পড়ছে, যাদের মুখ সে কখনো দেখেনি। তবু তাদের অভাবটাই প্রতিটা মুহূর্তে অনুভব করছে। কিন্তু তাদের থেকেও বেশি মনে পড়ছে তার দাদির কথা। সেই একমাত্র মানুষটা, যিনি কখনো তাকে পরিচয়ের প্রশ্নে ছোট করেননি। যিনি সবসময় বলতেন, মানুষের পরিচয় তার জন্মে নয়, তার মন আর কাজেই।
দাদির সেই কথাগুলো আজ আরও বেশি করে বুকে বিঁধছে। দাদির মতো চিন্তাভাবনা যদি সবার হতো, তবে কি মন্দ হতো?
তার কান্না বিছানায় শুয়ে থাকা তাহিয়াকে হকচকিয়ে তোলে। তাহিয়া উঠে তড়িঘড়ি এগিয়ে আসে। মেহরীনকে ধরতেই সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছে,

—আমি সত্যি তোর খারাপ চাই না, তাহিয়া…
কান্নার কারণে কথাগুলো ভাঙা ভাঙা। এদিকে মেহরীনের চোখের জল দেখে তাহিয়াও কাঁদছে, তবু সে চেষ্টা করছে মেহরীনকে শান্ত করার। মেহরীনের মাথায় হাত বুলিয়ে বারবার বলছে,
—কি হয়েছে, মেহু? কেউ কিছু বলেছে? আমাকে বল। আমি তো জানি, তুই আমার বোন, তুই আমার খারাপ চাইতেই পারিস না। এই মেহু, শোন, কাদিস না।

এভাবেই প্রায় পাঁচ মিনিট লাগিয়ে তাহিয়া মেহরীনকে শান্ত করেছে। ক্লান্ত মেয়েটিকে বিছানায় বসিয়ে পানি আনতে যেই দরজা খুলল, অমনি পকেটে দুহাত গুজে, গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা তালহাকে দেখতে পায় দরজার মুখে।
বোনকে দেখে তালহা সাইড হয়ে দাঁড়ায়। তাহিয়া কিছু বলতে ব্যস্ত হওয়ার আগেই তার চোখের ইশারায় বুঝতে পারে, তালহা সব শুনেছে। তাহিয়া আর কিছু না ভেবে নিচে নেমে আসে। পরপর পানি নিয়ে ফিরে আসে রুমে। এসেই দেখল তালহা দাঁড়িয়ে আছে মেহরীনের ঠিক সামনে, নিশ্চুপে তাকিয়ে মেহরীনের দিকে। আর মেহরীন, সে তো ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। তাহিয়া-কে দেখে তালহা পেছন ঘুরে নিজের ঘরের দিকে হাটা শুরু করে। যেতে যেতে আদেশের সুরে বলল,

—তাহিয়া, তোর ছেচকাদুরে বান্ধুবিকে নাক-মুখের পানি মুছিয়ে আমার ঘরে পাঠিয়ে দিস।
ভাইয়ের কথায় তাহিয়া হেসে ওঠে। এক মুহূর্ত দেরি না করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তারপর পানির গ্লাসটা মেহরীনের দিকে এগিয়ে দেয়। সঙ্গে টিস্যুর বক্সও ঠেলে দেয় সামনে। হালকা টিটকারি মেরে বলে,
—ভাবি, দ্রুত নাক-মুখ মুছে ফেলেন। ভাইয়া আপনাকে ডাকছে।
তাহিয়ার “ভাবি” ডাকটা কানে যেতেই মেহরীন এক ঝলক রাগী চোখে তাকায় ওর দিকে। সেই দৃষ্টিতে বিরক্তি আছে, আবার লজ্জাও লুকোনো। কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়। মাথাটা নিচু করে ওয়াশরুমের দিকে এগোয়, হাতমুখ একটু ধুয়ে নেবে, নিজেকে সামলে নেবে।

আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। চোখের নিচে ফোলাভাব, গালে কান্নার দাগ। কপাল কুঁচকে যায় অজান্তেই। নিজের সাথেই কথা বলে ওঠে,
—ইদানীং তুই কি একটু বেশিই কাদুরে হয়ে যাচ্ছিস না মেহরীন? কই, আগে তো চাচীর কত খারাপ খারাপ কথাও দিব্যি হেসে খেলে উড়িয়ে দিতি। তাহলে এখন কেন তাদের সামান্য কথাতেই এত মন খারাপ করিস?
একটু থেমে আয়নার ভেতরের মানুষটার দিকে সন্দেহভরা চোখে তাকায়।
—বড়লোকদের সঙ্গে থাকতে থাকতে বড়লোকি মন হয়ে উঠেছে নাকি তোর, হু…?
নিজের প্রশ্নেই নিজে হালকা করে হাসে। হাত বাড়িয়ে ফেইসওয়াশ নেয়। পানি দিয়ে মুখ ভিজিয়ে দুই গালে আলতো করে ঘষতে ঘষতে আবার বলল,

—না মেহরীন, তোর জন্য ওই ছোটলোকি মনটাই পারফেক্ট। ওইটাই তোর শক্তি।
চোখ তুলে আবার আয়নার দিকে তাকায়। নিজেকে শাসিয়ে বলল,
—দুইদিন আদর পেয়েছিস বলে মাথায় উঠে যাবি নাকি? আগে যা ছিলি, সব ভুলে যাবি? নিজের জায়গা, নিজের যোগ্যতা ভুলে গেলে চলবে?
শেষ কথাটার সঙ্গে সঙ্গে সে মুখ ধুয়ে নেয়। ঠান্ডা পানিতে চোখের জ্বালা একটু কমে আসে। গলায় জমে থাকা ভারী অনুভূতিটা চাপা দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

মেহরীন ধীর পায়ে তালহার রুমে প্রবেশ করল এবং প্রথমেই দরজাটি ধীরে বন্ধ করল। ছিটকিনি লাগিয়ে পেছন ফিরতেই তার কানে গেল তালহার কণ্ঠস্বর,
—যাক, এ কথাটা অন্তত মনে আছে।
মেহরীন এক মুহূর্ত থেমে তাকাল সোফায় বসে থাকা তালহার দিকে। মেরুন রঙের টিশার্টটি তার গায়ে বেশ ফিটফাট হয়ে আছে, যার ফলে বাহুগুলো হালকা ভেসে উঠেছে। সঙ্গে পরা কালো রঙের টাউজার। চোখে আজ চশমা নেই, হয়তো ল্যাপটপ নিয়ে বসেনি। চশমাটা চোখে থাকলে একটু বেশিই আকর্ষণীয় লাগে। একদম ইনোসেন্ট ইনোসেন্ট লাগে। তবে চশমা ছাড়াও চোখজোড়া মারাত্মক। সেই চোখের শান্ত চাহনিটা সরাসরি মেহরীনের দিকেই।

বরাবরের মতোই মেহরীনের মনের লাড্ডু ফুটে উঠল। ভেতরের সকল অনুভূতিরা যেন একসঙ্গে বেরিয়ে আসল। তালহাকে দেখে তার বেহায়া মনটা একটু আগের মনখারাপি ভুলে, নির্লজ্জতায় ভরে উঠল। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে তালহার সুন্দর্য উপভোগ করতে মন চাইছে। তবে একজন মেয়ে হিসেবে এই কাজ করা নেহাতই ছ্যাচড়ামি হবে। কিন্তু নিজের জামাইটা তো তার নিজেরই হলো নাহয় কিছুটা ছ্যাছড়া।
স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়ানো মেহরীনকে দেখে তালহা নিজেই উঠে দাঁড়াল। বারান্দার দিকে যেতে যেতে সে বলল,

—চলো, বারান্দাবিলাস করি।
মেহরীনের মনে এক মুহূর্তের জন্য প্রশ্ন জাগল, “বারান্দা বিলাস?” কিন্তু সে তা ভাবতে বেশি সময় নষ্ট করল না। তার ধ্যান এখন তালহায়। পেছন পেছন ছুটল কদম অনুসরণ করে বারান্দার দিকে চলল সে।
দুজন দাঁড়িয়ে বারান্দায়, রেলিঙের উপর হাত দিয়ে কিছুটা হেলান দেওয়া। তালহা তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে, আর মেহরীন তাকিয়ে আছে তার দিকে। শীতের রাত, চারদিক থেকে নরম, ঠান্ডা বাতাস বয়ে আসছে। শীত অনুভব করে মেহরীন একটু কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। তার কাছাকাছি উপস্থিতি টের পেয়ে তালহা ঘাড় ঘুরিয়ে মেহরীনের দিকে তাকাল। মেয়েটার নাক-চোখ এখনো লাল। সেই দশ-পনেরো মিনিট আগে কেদেছিল। তবে কেন এখনো লালচে হয়ে আছে?

এই প্রশ্ন ভাবতেই সে সরাসরি মেহরীনের দিকে ঘুরল। দু’হাতের আঁজলায় মেহরীনের মুখটা নিয়ে নিল। দু’গালের নরম মাংসের উপর বুড়ো আঙুল ছোয়ায়, পরপর একটু চাপ দিয়ে আঙুল ঘেঁষল গালে। সঙ্গে সঙ্গে সাদা গালের চামড়ায় হালকা লাল আভা ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ পর, তা নিজে থেকেই মিয়িয়ে গেল। ব্যাপারটা তালহার খুবই মজা লাগল। এবার সে একই কাজ বারবার করতে লাগল।
এদিকে মেহরীন কপাল কুচকে তালহার কাণ্ডকারখানা দেখছে। লোকটা আসলে কি করছে, সে পুরোপুরি বোঝে উঠছে না। তার ভাবনার মধ্যে হঠাৎই তালহা জুড়ে দুগাল গাল চেপে ধরল। গাল চেপে ধরার সঙ্গে সঙ্গেই মেহরীনের ঠোঁট দুটো উঁচু হয়ে উঠল। সেদিকে চোখ যেতেই থমকে দাঁড়াল তালহা।
গাল এভাবে ধরায় মেহরীন ব্যথায় নড়তে লাগল এবং অস্পষ্ট কন্ঠে বলতে লাগল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৩

—ছাড়ুন, ব্যথা পাচ্ছি…
মেহরীনের কথায় তালহা ফুস করে শ্বাস ছাড়ল। অষ্টদ্বয়ে হালকা আঙুল ছুয়ে দিয়ে হাত সরিয়ে আনল। পরপর গভীর শ্বাস নিয়ে বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসে পড়ল। মেহরীনও দেরি না করে তার পাশে বসে পড়ল, চোখেমুখে মিশে আছে কৌতূহল।
কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে তালহা। হঠাৎ আবার মেহরীনের দিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকে বলল,
—এত কোমল, একদম মারশমেলোর মতো, একদম চিবিয়ে ফেলতে মন চাচ্ছে…..

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৫