ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৩
জান্নাত চৌধুরী
রাত ১১টার , তার ও বেশি। অন্ধকারাচ্ছন্ন রজনীর আকাশে তারা আর চাঁদের সমাহার। আশেপাশে কত কত জোনাকি তার আলো বিলাচ্ছে-
বড্ড উদাসীন লাগছে কাব্যকে, হাত সবে মাত্রই জ্বালানো সিগারেট। পরপর কয়েকবার গাঢ় টান দিয়ে ধোয়া গিলছে। এলোমেলো চিন্তায় মাথা ভার হয়ে রয়েছে তার। এ অব্দি কত প্রশ্নের হিসাব কষা বাকি তার জন্য। জীবন আপতত দুমুখো সাপে কাটছে আর নয়তো সাপের মুখে চুমো , ব্যাঙের মুখে চুমু খাওয়া এমন কিছুই ঘটছে।
পথঘাট বেশ ফাঁকা। পশ্চিমা ছোট এক জঙ্গল পেরিয়ে সামনে বৃহৎ এক পুকুর। বড্ড নিরিবিলি এক স্থান , সচরাচর এসব স্থানে কারো আগমন ঘটে না। গ্রামের লোক ভুতে ভীষণ বিশ্বাসী , তাদের ধারণা বহুদিন কোনো স্থান পরিষ্কার না করা হলে, অথবা কোনো জঙ্গল বা বন্দি স্থান এসব স্থানে ঠিক ভুত বসবাস করে। ব্যপারটা ভীষণ হাসির। তবে আপতত কাব্য হাসছে না;
অস্থিরতার নিরাময় প্রয়োজন। জঙ্গলের মাঝ দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসতে আসতে পুরো দুইখানা সিগারেট শেষ করলো। আবারো তৃতীয় নাম্বার সিগারেটে আগুন দিয়ে ঠোঁটের কোণে চেপে ধরলো। কিসের এতো ব্যাকুলতা ঘিরেছে তাকে ? এই প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন তার জন্য।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এলোমেলো হেঁটে শেষমেশ এসে ঠেকলো পুকর পাড়ে। পানির ওপর চাঁদের ছায়া পড়ছে। দূরে এক আম গাছের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো সে তবে, খেয়াল গেলো গাছের গুঁড়িতে কেউ বসে রয়েছে। সত্যি কি বসা? নাকি ইহা ভ্রম। দোনোমনো করছিলো কাব্যের মন , হঠাৎ মনে হলো মস্তিষ্ক তার সাথে ছলনা করছে। সিগারেটে আবারো গাঢ় এক টান দিয়ে লোকটার গতিবিধি দেখতে লাগলো। গাছের গুঁড়িতে বসা ব্যক্তিটিও সিগারেট টানছে। কাব্য নিশ্চিত হলো ওটা কোনো যুবক , মেয়েরা নিশ্চয়ই আঁধারিতে সিগারেট টানবে না। এবার হাঁটা ধরলো ;
দৃষ্টি সামনের পানে স্থির রেখেই টলতে টলতে এসে দাড়ালো গাছের গুঁড়িটার কাছে। সিগারেটেরশেষ অংশ পুকুরের পানিতে ফেলে ধপ করে বসে পড়লো ব্যক্তিটির পাশে।
-“অস্থির মনে হচ্ছে, নাকি চিন্তিত ?
আরাধ্য সিগারেট ঠোঁটে গুঁজলো ,ঘার কাত করে একবার তাকিয়ে আবারো পানির দিকে দৃষ্টি রেখে রহস্য হাসলো। কাব্য বলল ,
-“একটা সিগারেট দে?”
আরাধ্য পকেটে হতে এক প্যাকেট সিগারেট আর লাইটার বের করে এগিয়ে দিলো। কাব্য আবারো সিগারেট ধরিয়ে টানতে থাকলো। দুজনের মাঝে খানিক নীরবতা কাটলো। গাছের গুঁড়ির পাশে ছোট ছোট কতগুলো মাটির দলা , আরাধ্য কয়েকটা হাতে তুলে নিয়ে মাঝ পুকুরে চাঁদে আলো লক্ষ্য করে ছুড়লো। মুহূর্তেই ঢেউ দিলো পানি , পরপর কয়েকটা ঢিল পড়তে পানিতে কম্পন হচ্ছিলো। আরাধ্য অনুভব করলো এই কম্পন। মধ্যরাতে ছমছম পরিবেশে পানি টুপ টুপ শব্দটুকু বেশ লাগছিলো শুনতে। কাব্যের কী হলো কে জানে ? আস্তে করে আরাধ্যের কাধে মাথা রাখলো এরপর আবারো সিগারেট টানতে থাকলো। আরাধ্য একটুও চমকালো না বোধ হয় অথচ তার চমকিত হবার কথা ছিলো। পর পর আরো দুই তিনটে ঢিল ছুড়লো পানিতে। অতঃপর হাতের কাছে আর কিছু পেলো না। বেশ কিসময় আবারো নীরবে কাটিয়ে কাব্য বলে , “ অস্থির হৃদয়ে স্বস্তির কারণ কী ভাই ?”
-মৃত্যু!
কাব্য মাথা ঝাঁকালো , “ উহু ”
আরাধ্য ঘার কাত করে একবার দেখলো কাব্যে মুখটা। দুজনের এক অংশের বেশ মিল ভ্রুর কাছে কাটা দাগ টা। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আরাধ্য ;
কাব্য ফের বলল , “ মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে ভাই? বড্ড ক্লান্তি ধরছে।”
আরাধ্য একটু বিরক্তি গলায় ফিসফিসিয়ে বলল , “ কাজ বাজ নেই এইখানে কার বাল ফালাইতে আইছো ?”
-দেও না ভাই।
আরাধ্য চেয়েও রাগ করতে পারলো না। হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো কাব্যের মাথায়, থেকে থেকে চুল টেনে দিতে থাকলো। কাব্য শ্বাস ফেলল। সব কেমন এলোমেলো চলছে । আরাধ্য জিজ্ঞেস করল ,
“ কী হয়েছে ?”
কাব্য অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল , “ কারো বউয়ের প্রতি প্রেমের নজরে তাকানো নিশ্চয়ই পাপ?”
-“ইরার কথা বলছিস ?”
কাব্য সোজা হয়ে দুই হাতে হাঁটু ধরে বসল , “ বড্ড মনে ধরলো তাকে?
একজোড়া ভায়ার্ত চোখ ছিন্নভিন্ন করছে আমায়। ”
-“কেনো যেচে মৃত্যু চাইছিস ‘অভিরূপ’? বড্ড আদরের জিনিস মারতে কষ্ট হবে তো।”
কাব্য হাসল , “ ললাটের লিখনে যদি সে আমার হয় তবে?”
আরাধ্য হেসে ফেললো , “ তবে তার মৃত্যু নিশ্চিত।”
কাব্য উচ্চস্বরে হেসে উঠলো , “ মেরে দে আমায়। এতো বিষাক্ত জীবনের মানেটাই বা কী ?”
-“আমার হাতে মরার দেখি বড্ড শখ তোর ? শুয়োরের বাচ্চা।”
-”চেতে যাচ্ছো তো ভাই ব্যপারটা ঠিক যায়না তোমার সাথে।”
আরাধ্য মলিন হাসল। কাব্য করলো কী মাটিতে জড়ো হয়ে শুয়ে পড়লো। মাথাটা রাখলো আরাধ্যের কোলে। আরাধ্য বলল –
“আইনের কর্তা হয়ে অপরাধীর কোলে মাথা রেখে দুঃখ বিলাস করছিস। ঘেন্না লাগছে না? ”
-”লাগছে তো নিজের উপর।
-”উঠে বস শুয়োর !”
কাব্য বিন্দুমাত্র নড়লো না। রাত বাড়তে থাকল , জঙ্গলে পাশের শেয়ালের ডাক কান বাজছে , ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ কানে বাজছে। কাব্য ডাকল , “ভাই।”
-হুম;
-”আমার আজকাল ভয় হয় ভাই। আর কত লুকিয়ে চলবে সব?”
অকপটে হাসল আরাধ্য , “ বহিঃপ্রকাশ যখন হবে তখনি নাহয় সমাপ্তি ডাকা যাবে।”
কাব্য চোখ বুঝে নিলো , আম্মার জন্যে মন জানি কেমন করছে। একবার দেখা দিয়ে আসি! ”
-”আব্বাজান খুঁজছে তোকে। এত বছরে তার পরিচয়হীন ছেলের জন্যে মন উতলা হয়ে উঠেছে। ”
কাব্য চট করে উঠে বসলো , “হয় নাকি?”
আরাধ্য উত্তর করলো না। কাব্য বলল , “ কপাল খুললো তবে, কি বলছো? ”
-”হবে হয়তো!”
কাব্য গাঢ় নিঃশ্বাস ছাড়লো। আরাধ্যের চোখ দুটোর ওই শান্ত দৃষ্টিতে কিছু একটা রয়েছে। এত নিশ্চুপ সে কবে থেকেছে? কাব্য ভাবনা ছেড়ে জিজ্ঞেস করল , “ এত অস্থিরতা কিসের? ”
-”কারো সময় শুরু, কারো হয়তো শেষ।”
কাব্য ভ্রু কুচঁকায় , “ মানে।”
-”সব কথার মানে থাকতে আছে নাকি?”
কাব্য কথা বাড়ালো না। আরো কিছু সময় নিশ্চুপে বসে রইলো দুজন;
রাত বোধ হয় ২টা নাগাদ। হঠাৎ ঘাড়ের কাছে কারো গরম নিঃশ্বাস অনুভব করলো ইফরাহ। ঘুম ভেঙ্গে গেলো তার। তবে , কী আশ্চর্য পুরো ঘর অন্ধকার। অথচ তার ঠিক মনে আছে সে আলো জ্বালিয়ে ঘুমিয়েছিলো। তবে কি বিদ্যুৎ নেই ? হবে হয়তো। ইফরাহ আবারো ঘুমোতে চাইলো , যেই চোখ দুটো লেগে আসার মতো ঠিক তখনি আবারো কারো গরম নিঃশ্বাস অনুভব করলো সে। দ্রুত উঠে বসলো , ভয়ার্ত কাঁপা কাঁপা গলায় আওয়ালো , “কে … কে? ”
কোনো উত্তর এলো না। মন গহ্বরে ভয়ের বাসা বাঁধলো , শরীরের লোমকূপ গুলো ভয়ে জেগে উঠেছে। শীত শীত অনুভব হলো তার।
অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে কিছুই নজরে আসছে না। আবারো এক শীতল বাতাস সর্বাঙ্গে প্রভাবিত হলো ইফরাহ। শরীর টা কেমন জানি ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো তার। ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে;
আশেপাশে হাতিয়ে বুঝতে চাইলো কেউ আছে কিনা তবে , ব্যর্থ হলো।
কিছু সময় চুপচাপ বসে এদিক ওদিক দৃষ্টি ঘুরিয়ে সবটুকু পর্যবেক্ষণ করলো। মন বলছে কথাও কেউ নেই! এই ভাবনা কে প্রশয় দিয়ে নিজেকে শান্ত করতে চাইলো। তবে , ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো মোমবাতি খোঁজে। একটু একটু করে হেঁটে কোথায় এলো ঠিক বুঝতে পারলো না সে। হঠাৎ কানের কাছে কারো শীতল স্পর্শ পেতেই শরীর হিম হয়ে যায়। ইফরাহ আবারো জিজ্ঞেস করল , ”কে…? দয়া করে এমন করবে না। আমায় ভীষণ ভয় করছে , দেখা দিন।”
এবার ভয়ংকর কিছু হলো। পুরুষালী শক্ত দুটো শক্ত চেপে ধরলো ইফরাহর কোমড়! গা গুলিয়ে এলো ইফরাহর, ঘৃণা মুখ কুঁচকে এলো। স্পর্শ ছিলো এতোটাই গায় যা ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে হাত গিয়ে ঠেকলো ইফরাহর নরম পেটের দিকে। আরেক দফা চমকিত হলো মেয়েটা। দাঁতে দাঁত চেপে রাগান্বিত স্বরে বলল, “ কে আপনি ? মরণে এত তীব্র আকর্ষণ কেনো?”
একহাতে পেটের মাংস খামচে ধরলো ছায়া মানব।
-”নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আময়িক এক প্রলোভন সকলের থাকে প্রিয়তমা! আমি ব্যতিক্রম নয়;
নখ গেঁথে গিয়েছে হয়তো, জ্বালা ধরেছে। ইফরাহ চোখ বুজে , কিছুটা বুঝে ওঠার আগেই এক ঝটকায় ঘুরিয়ে দিলো তাকে। শক্ত পক্ত এহ থাপ্পড় পড়লো ইফরাহর গালে। মূহূর্তেই চোখ মুখ অন্ধকার দিয়ে আসে তার। চোখের সামনে অন্ধকার ঘরটা কেমন ঘোলা লেগে যায়। মিনট কয়েকের মাঝে জ্ঞান হারালো সে।
ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪২
ছায়ামানব আগলে নিলো তাকে। আলতো করে মাথাটা রাখলো বুকের বাম দিকে। বুকে মাঝের হৃদ যন্ত্রে অস্বাভাবিক ধুকধুক শব্দটা। ধীরে ধীরে কমে এলো তার। আস্তে করে এক চুমু খেলো ইফরাহর ললাটে। এরপর কোলে তুলে নিলো ইফরাহর ছোটখাটো দেহটা।
