The Silent Manor part 76
Dayna Imrose lucky
একজন অনুচর মদ হাতে এগিয়ে আসে।মীর ক্রোধে জ্বলে বলল “সাহস থাকে তো হাত দুটো খুলে দে।ভিতুর মত বেঁধে রেখে বাহাদুরি দেখাচ্ছিস কেন?’
কাবির বেত হাতে বসলেন চেয়ারে। বললেন “অনেক বেশি কথা বলিস রে মীর। তোর তেজ অনেক।”
‘তেজ থাকবে না কেন, হায়দার বংশের সন্তান যে। যদি একবার আমি ছুটতে পারি না, তবে তোর অবস্থা খা’রাপ হবে।”
“ছাই করবি তুই আমার।”
মীর কিছু বলে না। তাঁদের সাথে বুদ্ধি দিয়ে লড়তে হবে। শক্তি নয়। আপাতত নিজেকে তাদের সামনে দমিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।মীর ঘাড়টা চেয়ারের সাথে হেলিয়ে দিতে চেয়েছিল।পারল না।চেয়ারে মাথা রাখার স্থানে কাঁটা।মীর মাথা খাঁড়া করল।নীরব কণ্ঠে বলল “তুই আমাকে বন্দি করেছিস ভালো হয়েছে।নয়ত আমার সত্য পরিচয় জানতে পারতাম না। তোকে ধন্যবাদ আমার পরিচয় জানানোর জন্য।” এতটুকু বলে থেমে মীর কাবির এর দিকে হিংস্র’তার সাথে তাকায়।মীর এর চাহনির সাথে কাবির সুফিয়ান এর চাহনির বর্ণনার সাথে মিল পেলেন।সে গোপনে একবার ঢোক গিললেন।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মীর ফের বলল “এখন বল, আমাকে বন্দি করে রাখার মূল উদ্দেশ্য কি?’
কাবির জবাবের প্রথমে হেসে নিলেন।বিশ্রী হাঁসি। থেমে বললেন “আমাদের বংশের নিয়ম তো জানিস, একশো একটা খু’ন করা। এরকম করেই তো এত বছর পরেও ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছি।খু’নের পরিমাণ যখন আটানব্বই তে এসে থামল তখন আমার বাবা দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। ভেঙ্গে পড়েছিলাম অনেক। এরপর পণ্ডিত বলেন চৌধুরী বংশের একজন কে হ’ত্যা করতে হবে।আর একজন হায়দার বংশের।বাকি একজন তোমার মত করে।হয়ত রাশিফল অনুযায়ী এটাই সঠিক ছিল। আমি খুঁজতে থাকি চৌধুরী বংশ। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যাই আমজাদ চৌধুরী কে।পেয়ে যাই উনার ভাইকে।
তুই জানিস, আমজাদ চৌধুরীর বড় ভাই,ঐ যে তৃষ্ণার বাবা কিভাবে মা’রা গেছেন?আমিই মেরেছি। কাজের জন্য শহরের উদ্দেশ্যে গেলে সেখানে বসে মা’রি। এভাবে একটা লক্ষ্য আমার পূরণ হয়।বাকি ছিল হায়দার বংশ। তোদের মধ্যে এখনো কেউ বেঁচে আছে কিনা সেটা জানা খুব কঠিন ছিল। যেভাবে খোঁজার সেভাবে খুঁজতে থাকি। পাচ্ছিলাম না। এভাবে একদিন জানতে পারি, শালুক বেগমের বোনের সন্তান জন্মের আগেই মারা গেছে।এক দাসীর থেকে সংবাদ পাই। আমি চিন্তিত হলাম। যদি তাঁর সন্তান মারাই যাবে, তবে ঐ থমাস শন কার সন্তান কে নিজের বলে পরিচয় দিচ্ছে? আমি ঐ দাসীকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করি।
সত্যটা বলতে চেয়েছিল না।আমি তাঁকে টাকার লোভ লেখাই। এরপর গড়গড় করে সব সত্য বলে দেয়। জানতে পারি,তুই মীর সুফিয়ান হায়দার এর বংশধর। আমি এরপর কৌশলে তোদের সাথে ঘনিষ্ঠ হই। তোকে পর্যবেক্ষণ করি।তোর কথাবার্তা হাবভাব সব মিলে যায় সুফিয়ান হায়দার এর সাথে। আমি নিশ্চিত হই। এরপর কৌশল বের করতে থাকি কিভাবে কি করব! উপায় বের হয়। শেফালী কে হাত করি।তোর বিয়ের দিন কে কাজে লাগাই। কিন্তু এর ভেতরে আমাদের মাঝে আর একজন এসে হাজির হল।” এতটুকু বলে থামে কাবির। গভীর দম ফেললেন।মীর জিজ্ঞেস করল “কে সে?
“নওয়াব শেহজাদা। জানতে চাস সে কে! তোদের চির শত্রু ছিল। সুফিয়ান হায়দার শেষ করে দিয়েছিল ওঁর মায়ের বংশ। হাসিখুশি ভরা জীবনটা শেষ করে দিয়েছিল।কিন্তু কিভাবে জানিস! তবে শোন, দীর্ঘবছর সুফিয়ান হায়দার বিদেশের মাটিতে ছিল। অনেকেই জানে না কাজ ব্যতীত এত বছর কেন রাশিয়া ছিল? তাঁর কারণ ছিল নওয়াব সিরাজ সাঁই এর কন্যার জন্য।সেও বিদেশে থাকত। সুফিয়ান বিদেশ গেলে দেশের মানুষ বলে পরিচয় হয়। সুফিয়ান এর প্রতি সেই মেয়ের প্রেম ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আকৃষ্ট হয়।
সুফিয়ান সুফিয়ান বলে পা’গল ছিল। কিন্তু সুফিয়ান মন থেকে ঐ মেয়েকে পছন্দ করতে পারছিল না। কিন্তু ঐ মেয়ে কৌশল করে হলেও সুফিয়ান কে বিয়ে করে। একজন নারী চাইলে দেহের লোভ দেখিয়ে পুরুষ কে খায়েল করতে পারে। কতক্ষন আর সে-ই পুরুষ নজর এড়িয়ে যাবে! কিন্তু সুফিয়ান ইচ্ছেমত ব্যবহার করছিল শুধু ঐ মেয়েকে। এভাবে কিছু বছর রাশিয়া থেকে যায়।ঐ মেয়ে আসতে দিতে চেয়েছিল না সুফিয়ান কে দেশে। কেননা,নওয়াব সিরাজ সাঁই আর সিলমন হায়দার এর আত্মীয়তা কখনো সম্ভব ছিল না। কিন্তু সুফিয়ান দেশে আসার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ওঁর বোন এর জন্য। ওঁর বাবা মা আত্ম’হত্যা করেছিল শুনে। ওঁর বোন।এই সংবাদ পেয়ে সুফিয়ান দেশে ফিরে আসে।এসে তো দেখে সব শেষ।” এতটুকু বলে ফের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন কাবির।মীর খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
কাবির আবার বলেন “নওয়াব সিরাজ সাঁই এর মেয়েও দেশে আসে। তবে সে আসতে আসতে শুনে সুফিয়ান আলিমনগর।সে সুফিয়ান এর খোঁজ নিয়ে জানতে পারে সেখানকার জমিদার এর মেয়ের সাথে চুটিয়ে প্রেম করছে সে।তখন সাঁই এর মেয়ে নওয়াবী মালিকা অন্তঃসত্ত্বা।সে অন্তঃসত্ত্বা জানার পর বাইজি কন্যা মেহের কে দিয়ে এক রাতে সংবাদ পাঠিয়েছিল সুফিয়ান এর কাছে। বাইজি কন্যা মালিকার বন্ধু ছিল। তখন সুফিয়ান বলেছিল “সন্তান সহ মালিকা মরে যাক।তাতেও আমার কিছু যায় আসে না।কারণ আমি ওকে ভালোবাসি না।নিজেই এসেছিল দেহ বিলিয়ে দিতে।এটা ওঁর ফল। আমি ওকে আর ওঁর সন্তান কে গ্রহণ করব না। তাঁতে ও আমার যা করুক।”
এমন সংবাদ পৌঁছে দেয় মেহের মালিকার কাছে।মালিকা ভেঙ্গে পড়ে।তাঁর মা বাবা চাইলে সুফিয়ান এর ক্ষতি করতে পারত। কিন্তু মালিকা তা চায়নি। তাঁর ভালোবাসা ছিল নিখুঁত। কিন্তু তাঁদের জীবন টা নরক হয়ে যায়।লোক সমাজে নানান কথা শুনতে হত।এভাবে অনেক সময় কাটে। একদিন মালিকা তাঁর ভাইকে বলেছিল, আমি মরলে আমার কবরখানা হায়দার বাড়িতে দিও।যাতে সুফিয়ান হায়দার এর পাশে সুতে পারি।সময় চলে যায়।সুফিয়ান হায়দার এর ব্রিটিশদের সাথের ডিল সম্পন্ন হয়।ফারদিনাকে নিজের হাতে মে’রে ফেলে। এরপর নিজেই ঠুকরে ঠুকরে মরছিল।কারণ সে ফারদিনাকে সত্যিই ভালোবেসেছিল।” কাবির এখানে এসে বিরতি নেয়। তাঁর চোখে জল দেখা যায়। মীর কিছুটা আশ্চর্য হল। শয়তান এর চোখে জল দেখে।
কাবির ফের বললেন “যেদিন ফারদিনাকে লা’শ ভেবে সিন্ধুতলি নেয়া হয়, সেদিন মালিকার সন্তান জন্ম নেয়। ছেলে সন্তান।আর মালিকা সেদিন আত্ম’হত্যা করে মৃত্যু গ্রহণ করে। শুধু মৃত্যুর আগে একটা কথাই বলেছিল, বেঁচে থেকে সন্তান কে তাঁর বাবার পরিচয় কি দেব!’ ভাগ্যির কি লিলাখেলা দেখ- সেদিন ফারদিনা বেঁচে উঠলে তাঁর করা কবরেই কিন্তু মালিকাকে কবর দিয়েছিল মৌলভী সাহেব। মৌলভী সাহেব সব জানতেন কিন্তু কাউকে কখনো বলেননি কিছু। তোমার ছোট্ট মা-ও এই ব্যাপারে অনেক কিছু জানতেন কিন্তু সেদিন যে ফারদিনার কবরে মালিকাকে কবর দেয়া হয়েছিল এটা জানতেন না। সুফিয়ান এর কাছে সেদিন সংবাদ এসেছিল মালিকার ছেলে সন্তান হয়েছে। কিন্তু তাঁর কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না।কারণ তাঁর সবটা জুড়ে ছিল যে ফারদিনা।
এরপর তিনিও চলে যান।” কাবির বড় করে নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মোহময় কণ্ঠে বললেন “জানিস মীর,পাপ কখনো আমাদের ছাড়ে না। সুফিয়ান যেটা মালিকার সাথে করেছিল ঠিক সেটাই হল তাঁর বোনের সাথে। তাঁর পরিবার ও ঠিক মালিকার পরিবারের মত শেষ হয়।আর বেঁচে থেকে শুধু অনুতপ্তের আগুনে পুড়ছিল। তোর প্রশ্ন থাকতে পারে,নওয়াব সিরাজ সাঁই চাইলে প্রতিশোধ নিতে পারতেন, তবে কেন নেননি? উত্তর হচ্ছে,মালিকা জানতে পেরেছিল সুফিয়ান এর বোনের সাথে ঠিক কি হয়েছে!সে সেদিন সেসব জেনে হেসেছিল। বলেছিল ‘আমার বিচার আমার নয়,বরং প্রকৃতিই করে দিচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা করে দিচ্ছে।’ কিন্তু সুফিয়ান হায়দার মৃত্যুর আগে কিছু কথা বলতে চেয়েছিল, সে-ই কথাগুলো এসবের মধ্যে কোনটাই নয়। তবে সে কি বলতে চেয়েছিল তা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না।”
কাবির থামেন।মীর কিছু বলতে পারছে না।কাবির নিজেই ফের বললেন “এখন তুই আর নওয়াব শেহজাদা এক রক্তের বংশধর। শেহজাদা হয়ত তোর থেকে বয়সে বড় হবে। তুই যেরকম এক কথায় হায়দার পরিচয় দিচ্ছিস, শেহজাদা হায়দার বংশের পরিচয় দিচ্ছে না। নামের সাথে নানার পদবী ব্যবহার করছে।ঘৃণায়। না দেয়ার ই কথা। তুই তো জমিদার এর ঘরে বড় হয়েছিস। পরিচয় ছিল। কিন্তু শেহজাদার বংশ তো পিতৃপুরুষের পরিচয় ছিল না। সুফিয়ান হায়দার একজন বড় মাপের খেলোয়াড় ছিল। কিছুটা ভালো কিছুটা নিকৃষ্ট ছিল। তাঁর বংশধর এর মধ্যে বোধহয় তোরা দু’জনই বেঁচে আছিস। তোদের মা বাবা,দাদা দাদী বেঁচে নেই হয়ত।”
কাবির থেমে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে করতে বললেন “এবার আসি আমার আর শেহজাদার সম্পর্ক নিয়ে। আমাদের মধ্যে তেমন কোন সম্পর্ক নেই। চলতি পথেই ওর সাথে দেখা।শেহজাদা একদিন জঙ্গলে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিল। সে-ই সুর শুনে মায়া ছুটে যায়। ওকে দেখে প্রেমে পড়ে। কিন্তু তুই মাঝখান থেকে এসে হাজির হয়েছিস।সেদিন তুইও থাইল্যান্ড থেকে এসেছিলিস। এমতাবস্থায় ও কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। এভাবে সময় গড়ালে কিছুদিন আগে ওর সাথে আমার পরিচয় হয়। বন্ধুত্ব হয়।হয়ত বয়সের অনেক পার্থক্য। তুই প্রশ্ন করতে পারিস, ওকে কেন মারলাম না,মায়া হয় ওঁর জন্য। জীবনে কিছু পায়নি ও। ওঁর মুখে সত্য জানার পর পরিকল্পনা করি। কিভাবে কি করব!আর এর ভেতরে তোর জমজ ভাই হাজির হয়।ও খুব সরল সোজা ছিল।হয়ত ওঁর মৃত্যু বি’ষপানে লেখা ছিল।
যেদিন তোর বিয়ে সেদিন রাতে তোকে অপহরণ করার চিন্তাভাবনা করি। তবে আমি সেখানে ছিলাম না।শেহজাদা ছিল।আর ওই তোকে কথা বলার বাহানায় বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর বাইরে ডাকে।আর তোর সাজে বাসর ঘরে নীড় হায়দার প্রবেশ করে।নীড় কে ভুলিয়েভালিয়ে নেয় শেহজাদা।লোভ দেখায় একটি মেয়ের দেহের।সহজ সরল যত হোক, পুরুষ তো।দেহের লোভে সেও শেহজাদার কথামত বর সাজে। প্রশ্ন করেছিল নীড় ‘আমাকে দেখে ওঁরা চিনে ফেলবে তো!যে আমি বর নই!’ বুদ্ধিমান শেহজাদা এখানেও কৌশলে নীড় কে বোকা বানায়।নীড় কে সব শিখিয়ে দেয় শেহজাদা।কিভাবে কি বলতে হবে মায়াকে।মায়াও বিশ্বাস করে সেই মীর।
এবং সেদিন নীড় জঙ্গলে বাঁশি বাজিয়েছিল সেটা নীড় বলে। এবং একটি বাঁশি উপহার দেয়।শেহজাদা জানত সেদিন নীড় বি’ষপানে মারা যাবে।আর তাই হল।এরপর আমি শেহজাদাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি নীড় কে মেরে মীর কে অপহরণ করে রেখেছো কেন? ও বলল, যাতে মীর মরে গেছে বলে আর কেউ খোঁজাখুঁজি না করে।আর মায়াকে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত মীর কে এভাবেই আটকে রাখবো। বিয়ের পর ওকে বলি দেব।’ শেহজাদা মায়ার প্রেমে উন্মাদ। যেরকম উন্মাদ ছিলেন সুফিয়ান হায়দার ফারদিনার প্রেমে। ঘুরেফিরে যেন সুফিয়ান হায়দার ও জমিদার কণ্যা হাজির হয়েছে।কি হবে এর শেষ জানিনা। মাঝখানে দুই ভাই।মীর হায়দার – নওয়াব শেহজাদা।দুই জনের শরীরে একই রক্ত।একই শক্তি কে জিতবে!মীর,তুই ভাবছিস তোকে হয়ত আমি মেরে র’ক্তাক্ত করেছি।উমম না।শেহজাদা মেরেছে।তোর সরল সহজ নীড় ভাইকে বি’ষ খাইয়ে মা’রার পর থেকে আমার কেমন যেন পাপের জন্য অনুশোচনা হয়। কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস করে অনেক কিছু করেছি।আর নয়। কিন্তু শেহজাদাকে দেখানোর জন্য এতটুকু অত্যা’চার তোকে করতে হচ্ছে।”
কাবির থামেন।চোখ দুটো মুছে। একজন অনুচর কে ইশারা করল।সে হাতে একগ্লাস জল নিয়ে এগিয়ে এলেন।মীর এর দিকে এগিয়ে দিলেন। কাবির বললেন ‘তোর পিতৃপুরুষ সুফিয়ান হায়দার জল না খেয়েই মা’রা গেছে।তোর সাথে এমনটা হোক চাই না। কিন্তু সে-ই সুফিয়ান হায়দার এর প্রতিরূপ হিসেবে যেন নওয়াব শেহজাদা এসেছে।ওর সাথে পেরে ওঠা সহজ হবে না।তোর শরীর টা তো রাঙা। কিন্তু ও শ্যামবর্ণের অধিকারী।” মীর ঠিক বুঝতে পারছে না কাবির ঠিক কি চাইছে। তবে সব সত্য জানার পর কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে সে। সুফিয়ান হায়দার এর জন্য আরো একটি পরিবার শেষ হয়েছে।কারো কণ্যা,কারো বোন,কারো মা!সে হতভম্ব হল।
জলটা খেল কাবিরের সাহায্যে।কাবির বললেন “বিয়ের আগের দিন তোর দিকে জঙ্গলে শেহজাদা তীর ছুঁড়ে হিন দিয়েছিল ওঁর।ও মায়াকে ঠিক জয়ী করে নিবে। আজ তো মায়ার সাথে দেখা করার কথা ছিল।হয়ত দেখা হয়েওছে।” বাক্যটি শুনে মীর এর গা জ্বলে উঠল।চোখ থেকে টুপটাপ করে জলও ঝড়ে। অন্যদিকে শেহজাদা কাবির মিলে তাঁর জমজ ভাইটিকে মেরেছে শুনে কষ্ট হচ্ছে।বাড়ির সকলে নিশ্চয়ই তাঁকে মৃত বলে জানছে। শরীর টা নাড়ানোর চেষ্টা করছে।পারছে না।চেয়ারটা লোহার।মেঝের সাথে খাপ খাওয়ানো।হাত দুটো শক্ত করে বাঁধা।পা দুটো বাঁধাহীন। তবু ছোটার পথ নেই।মীর আপাতত চেষ্টাও করছে না।একটা শব্দ উচ্চারণ করল “শেহজাদা এখন কোথায়?”
“আছে হয়ত কোথাও। বসে বসে মায়ার কথা ভাবছে। সুফিয়ান এর মত শেহজাদাকে যে দেখে সে-ই মুগ্ধ হয়।আজ নিশ্চয়ই মায়াও হয়েছে। এরপর হয়ত অচেনা বাঁশিওয়ালা কে নিয়ে ভাববে। ওঁর বোন বা কোন বান্ধবী নিশ্চয়ই সাথে ছিল।ও বোঝাবে,মীর এখন মৃত। ওকে আগলে বেঁচে থাকার মানে নেই। নতুন জীবন শুরু কর।”
মীর শুধু কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে শুনছে কাবির এর কথাগুলো। তাঁর মায়ার, প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর চারপাশে অন্যকেউ ঘুরছে।সে বিয়েও করতে চাইছে!মীর কে মৃত ভেবে নিশ্চয়ই মায়া খুব কষ্ট পাচ্ছে। পরিবার নিশ্চয়ই চাইবে ও ভালো থাকুক।কারো হাতে তুলে দিতে চাইবে। হায়দার বংশের সন্তান জানলে আমজাদ চৌধুরী নিজের মেয়েকে শেহজাদার হাতে তুলে দিবে তাঁতে কোন সন্দেহ নেই মীর এর।
কাবির ঠাণ্ডা মাথায় বসে আছে।মীরও নিশ্চুপ।মীর আগ বাড়িয়ে বলল “শেহজাদার সাথে দেখা করতে চাই। আমাকে এভাবে মেরেছে কেন জিজ্ঞেস করব! আড়ালে মুখ লুকিয়ে মা’রার কি দরকার ছিল?”
“ও প্রেমে পাগল।মায়ার। ওকে বিয়ে করেছিস,সময় কাটিয়েছিস, ওঁর এসব মনে পড়লে হয়ত কষ্ট হয়। রেগেমেগে তোকে তখন মেরেছে।”
“পা’গল নিশ্চয়ই।আর কিছুদিন পর রাস্তায় বের হবে। মানুষ ওকে পাগল বলে সম্বোধন করবে।” বলে মীর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে।
“মৃত্যুর দুয়ারে এসেও তোর ভয় নেই!” কাবির বললেন।
“ভয় কিভাবে পাব, যেখানে পিতৃপুরুষ জীবন বাজি রেখে গোটা গ্রামকে বাঁচিয়েছে! সেখানে নিজের ক্ষুদ্র জীবন এর জন্য ভিতু সেজে বসে থাকা বোকামি।”
“তারচে,আমি বলি কি শোন। মায়াকে ভুলে যা।ও মায়াকে বিয়ে করে ওঁর বাসস্থানে নিয়ে যাক।”
“ও মায়াকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে,আর আমি এখানে বসে বসে আঙ্গুল চুষব!”
“এত রাগ কেন তোর!”
“র’ক্তে লেখা।”
“ভুলে যাস না,শেহজাদাও কিন্তু তোরই রক্তের।আমাকে এক পণ্ডিত কি বলেছিলেন জানিস!
“এসব পাগ’লের কথা আমার শুনতে ইচ্ছে করছে না।”
“আরে শোন, উনি বলেছেন, যদি র’ক্তের দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় তবে খুব সহজে কেউ কাউকে হারাতে পারে না।খু’ন ও করতে পারে না। মানে সহজে হয়ে ওঠে না এসব। আমি ভাবছি তোদের দুজনের মধ্যে কে জিতবে?মীর হায়দার নাকি হায়দার বংশ কে ঘৃণা করা নওয়াব শেহজাদা!যেই জিতুক, আমিত এখন শুধু দুজনের কাহিনী দেখব।” থেমে আবার বললেন “কাহিনী আর কিভাবে দেখব,তুই তো বন্দি।বাকি রইল শেহজাদা।ও মায়ার সাথে কি করে না করে, সেসব তথ্য এসে দিবে।আর তখন তোর অভিব্যক্তি কেমন হয় ওটাই দেখব।”
মীর ভেতরে ভেতরে পু’ড়ছে। তবে তা কাবির কে বুঝতে দিচ্ছে না।মায়ার সাথে যদি আজ সত্যি শেহজাদার দেখা হয়ে থাকে তবে নিশ্চয়ই মায়াকে নতুন জীবনে পা রাখার জন্য তাঁর সাথেরজন বলবে। বোঝাবে।মায়ার মাথা খাবে।অবশ্য খাওয়ার ই কথা। কেননা সে থেকেও যে নেই এখন।মীর কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।
“মৃত মানুষ কে বেশিদিন কেউ মনে রাখে না। সময়ের সাথে সাথে যে ভুলতেই হয়।এটাই প্রকৃতির নিয়ম।” মায়া বারান্দায় বসে আছে। চেয়ারে দু পা তুলে হাত দিয়ে ধরে রেখেছে। চেয়ে আছে নীড় এর কবরের দিকে। তাঁর কাছে মীর। তৃষ্ণা সে-ই কখন থেকে শ্যামপুর এর নওয়াব শেহজাদার কথা বলেই যাচ্ছে বলেই যাচ্ছে বিনা বিরতিতে।মায়া কোন কথারই প্রতিক্রিয়া করছে না।
তৃষ্ণা মায়ার থুতনি ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল “আমি কি বলছি শুনছিস না!তোর এরকম শুকনো মুখ ভালো লাগে না। আমি নিশ্চিত ওই অচেনা বাঁশিওয়ালা তোকে পছন্দ করে।তাই সে তোর নাগালের মধ্যেই বাঁশি বাজাত।আর তুইও প্রতি সময় জুলিয়েট এর মত ছুটে যেতিস। যেমনটি যেত ফারদিনা। আমি আজকে একটা জিনিস খেয়াল করেছিস জানিস, ছেলেটিকে না, অনেকটা সুফিয়ান হায়দার এর মত লাগছে।কি। সুন্দর।” তৃষ্ণা বলল একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে।
মায়া চুপচাপ।সে কিছু ভাবছে। তবে মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে নিশ্চয়ই করুণ কিছু ভাবছে না। তৃষ্ণা তা দেখে বলল “তুই তো সুফিয়ান হায়দার এর ভক্ত। নিশ্চয়ই তাঁর মতন শেহজাদাকে দেখে তোর ভালো লেগেছে!”
মায়া নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতেই মৃদু হাসল।
The Silent Manor part 75
তৃষ্ণা তাঁর হাঁসি দেখে উচ্চ স্বরে হেঁসে উঠল।মায়া তৃষ্ণা কে দেখে অবাক হচ্ছে। নিজের চাচাতো বোন কে খুশি দেখতে কত চেষ্টা তাঁর।মায়া জোর করে হেসেছে তখন।মন থেকে হাসিটা এখনো সৃষ্টি হচ্ছে না।ক্ষণে ক্ষণে দেখা মিলে কল্পনায় মীর এর।ভাবে, কোনভাবে মিরাকেল করে আল্লাহ যদি মীর কে ফিরিয়ে দিত…
