Home The Silent Manor The Silent Manor part 77

The Silent Manor part 77

The Silent Manor part 77
Dayna Imrose lucky

তৃষ্ণা সকাল সকাল বায়না ধরল মায়ার সাথে।আজও জঙ্গলের দিকে যাবে। এখুনি।মায়া নাকোচ করছে।মীর এর দেয়া মনে করে বাঁশিটি ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। ভাবছে মীর কে নিয়ে। কিছু স্বপ্ন যেন কল্পনায় জগত সাজায়। তেমনি মায়াও জগত সাজাচ্ছে নতুন করে মীর কে নিয়ে। যেখানে শুধু ভাবনারা ঘর বুনবে। কিন্তু ভাবনা সম্পুর্ন করতে দিল না তৃষ্ণা।এসেই সে-ই ভাবনার জগত ভাঙ্গিয়ে দিয়েছে। সকালটা পরিপূর্ণ হয়ে আছে।শীত শেষ প্রায়ই। গরমের তীব্র আগমন। আকাশটা আজ হঠাৎ মেঘলা হতে শুরু করেছে। উপকূলীয় এলাকা বলে গরম আসবেও দ্রুত, সে-ই সাথে ঝড়বৃষ্টি শুরু হচ্ছে বলে।

তৃষ্ণা অনুরোধ স্বরুপ বলল “সারাদিন ঘরের মধ্যে বসে থাকতে ভালো লাগে না।তুই অসুস্থ এই সুযোগে একটু বের হতে পারছি। আমার অনূভুতির মূল্যই নেই তোর কাছে!”
মায়া বোঝাল “এই অবস্থায় ঘোরাঘুরি করলে লোকে নানান কথা বলবে।তুই বরং একা বের হ’
তৃষ্ণা বিদ্রুপ করে বলল “তোর যেতেই হবে।শুনছি না তোর নাকোচ।”
নাছোড়বান্দা তৃষ্ণার অনুরোধ মায়া রাখতে বাধ্য হল।সে জানে তৃষ্ণার বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একমাত্র নওয়াব শেহজাদা।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সকাল গড়ানোর সাথে সাথে আকাশ মেঘলা হতে শুরু করেছে।সঙ্গে শীতল বাতাস।মায়ার এরুপ আবহাওয়া ভীষণ পছন্দের। জঙ্গলের সীমান্তে এসে দাঁড়িয়েছে দু’জন।মায়ার গায়ে জড়ানো লাল শালটা ভালো করে জড়িয়ে ধরল। দূরে নদীর তীরে তাকায়। কাউকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। নদীর অপরপ্রান্তে তাকালে দেখা যায় আকাশটা নেমে দাঁড়িয়েছে।মাঝিরা দূরেই বৈঠা ধরে নৌকা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
যিনি নদীর তীরে বসে আছেন তাঁর সাথে একটি অশ্ব।ও মনেপ্রাণে ঘাস খাচ্ছে।মায়া চোখ সরিয়ে ফেলে। তৃষ্ণা চারদিকে ছড়িয়ে তাকিয়ে বলল “নদীর তীরে নিশ্চয়ই শেহজাদা ভাই বসে আছে। উনি নিশ্চয়ই আমাদের দেখলে চিনবেন।চল যাই।”

মায়া বোঝাল “লোকটা আমাদের বেহায়য়া বলবে।তারচে আমরা অন্যদিকে হাঁটি।”
পদক্ষেপ পরিবর্তন করে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল তাঁরা। তৃষ্ণা ছোট বেলার প্রসঙ্গ তুলে। ছোট বেলায় এদিকে কত আসা হত।তখন যেন জায়গা গুলো আরো বেশি নিস্তব্ধ ছিল। অন্যরকম অনুভূতি হত।এখন আর হচ্ছে না।সব জঙ্গল সাফ।মায়া শুধু ওঁর মুখে শুনেই যাচ্ছে এসব। কিছু বলছে না‌। তৃষ্ণা পুনরায় কিছু বলার আগেই একটা অশ্ব ছুটে এসে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।মায়া ও তৃষ্ণা থমকে দাঁড়ায়।মায়া চোখ তুলে তাকায়। নওয়াব শেহজাদা অশ্বে।আজ তাঁর পরনে সাদা পাঞ্জাবি পাজামা। কালো রঙের জুতা।শাল।হাতে বাঁশি রাখাটা যেন তাঁর অভ্যাস।অশ্ব থেকে নেমে দাঁড়াল। বাঁশিটি পেছন ঘাড়ে রেখে তু হাতের ভর রাখল।মায়ার দিকে ঝুঁকে বলল “আমাকে দেখে এড়িয়ে যাচ্ছ যে!”
তৃষ্ণা আগ বাড়িয়ে বলল “আপনাকে দেখিইনি। কোথায় ছিলেন!”
শেহজাদা তৃষ্ণার দিকে চেয়ে বলল “দিব একচর।শোন, আমাকে কিছুক্ষণ রুপকথার রাণীর সাথে সময় কাটাতে দাও।”

মায়া বিষ্ময় প্রকাশ করল।ভারী দম ফেলে একবার তৃষ্ণার দিকে চাইল। তাঁর চাহনির ইশারাতে বোঝা গেল সে তৃষ্ণা কে যেতে বারণ করছে। কিন্তু তৃষ্ণা শোনার মেয়ে নয়।সেও এক পা দু পা করে পেছনে সরে যায়।শেহজাদা বলল “ভয় নেই।এই নওয়াব শেহজাদা কোন মেয়ের ক্ষতি করতে শিখেনি।চলো”
মায়া মাথা নাড়ায় কোথাও যাবে না। শেহজাদা বাঁশিটি নামিয়ে ফেলল।হুস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। তাঁর নিঃশ্বাস পড়ে মায়ার চুলে। উড়ে যায় কপালের কাছে থাকা মৃদু চুলগুলো। শেহজাদা মায়ার সৌন্দর্য দেখে বলল “রুপের কি ঝলক মাইরি।চলো নদীর পাশে বসি।”

মায়া নখ খুঁটতে শুরু করল। উদ্ভ্রান্ত পথিক এর মত লাগছে নিজেকে তাঁর।আর একটু হলে কাঁপুনি সৃষ্টি হবে। শেহজাদা এমতাবস্থায় মায়ার হাত টা ধরল। হঠাৎ হাত ধরায় মায়া চমকে উঠল। নিষ্পলক এ তাকায় শেহজাদার দিকে।শেহজাদা তাঁকে নদীর তীরের দিকে নিয়ে যায়। তীরে এসে তাঁকে ছেড়ে দেয়।বলল “তোমার অনুমতি ছাড়া হাত ধরেছি। ক্ষমাপ্রার্থী আমি। কিন্তু কি করব, বড়দের কথা না শুনলে ছোটদের এভাবেই জোর করে শোনাতে হয়।বসো ঘাসের উপর।”

মায়া বসছে না।শেহজাদা পাঞ্জাবির হাতা ভাঁজ করতে করতে দেখল মায়া বসেনি।ফের মৃদু ধমকের সুরে বলল “বস বলছি” মায়া ঘাসের উপর বসল।মনে মনে শেহজাদাকে গা’লিও দিচ্ছে।শেহজাদা মায়ার পাশে বসে বলল “গা’লি দিচ্ছ কেন?মনে মনেও এত জোরে কথা বলছো যে আমি শুনে ফেলছি। আমাকে বেয়াদব পুরুষ বলেছো।অবশ্য বলবেই তো।প্রাপ্য এটাই। বংশের গোঁড়ায়-ই দোষ ছিল।যাক গে,সেসব বলে কি হবে। তোমার প্রসঙ্গে আসি। তোমার ব্যাপারে আমি সব জানি।বিয়ের রাতে বিধবা।এটা একটা দুর্ঘটনা। তুমি খুব কষ্ট পেয়েছো।শক!বলে কথাই বলতে পারছো না। সমস্যা নেই, আমি তোমার শাড়ির রং আর কথা বলার ক্ষমতা দুটোই ঠিক করে দেব!” থেমে আবার বলল ‘শাড়ির রং ঠিক মানে বোঝো নি নিশ্চয়ই, সাদা শাড়ি থেকে রঙিন শাড়িতে তোমাকে বিভক্ত করে দেব।”

মায়া শুধু শেহজাদার কথাগুলো শুনছে।একা একা অনর্গল কথা বলেই যাচ্ছে।মায়া এবার তাকে মনে মনে পাগল বলে সম্বোধন করল। শেহজাদা বলল ‘হু। তোমার প্রেমে পা’গল। তোমাকে জঙ্গলে সেদিন প্রথম দেখেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। তুমি জানো,প্রেম ভালোবাসা আমি ঘৃণা করতাম। কিন্তু -তোমাকে একবার দেখেই বুঝে গেছি প্রেম জিনিসটা হঠাৎই হয়। তোমাকে দেখেই বুঝে গেছি, হৃদয়ের ঘরের মেহমান দরকার।আর সে-ই মেহমান তুমি।এই ভূবনে কত মুখশ্রী দেখলাম,কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল তোমাতেই” মুগ্ধ সুরেই কথাগুলো বলছিল শেহজাদা। হাঁটুতে হাতের ভর।হাতের পাশে মাথা ঠেকিয়ে বাঁকা ঘাড়ে তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে।মায়া শেহজাদার মুখে এহেন কথা শুনে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে।একি তো মুখ থেকে শব্দ বের হবে না। দ্বিতীয়ত এখানে বসে থাকতেও ইতস্তত বোধ করছে।মীর কে ঠকাচ্ছে এমনটা মনে হচ্ছে।

শেহজাদা দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল। পকেট থেকে বের করে সিগারেট ধরাল। সিগারেট ফুঁকে ধোঁয়া ছাড়ার পূর্বে বলল “যদি ধোঁয়া তোমার দিকে যায়, তবে বুঝব তুমিও আমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছো।”
মনে মনে মায়া বলল ‘ এ কোন অদ্ভুত নিয়ম,বাতাস যেদিকে যাবে ধোয়াও সেদিকে যাবে।’ শেহজাদা যেন এবারও তাঁর মনের কথা শুনে ফেলল।বলল “তোমার দিকে ধোঁয়া যাবে।দেখো বাতাস এদিকে যাচ্ছে। তুমি বা পাশে। তোমার দিকে যাবে।” বলে ধোঁয়া ছাড়লে সত্যি সত্যি মায়ার দিকে গেল।শেহজাদা বলল “তারমানে তুমিও আমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছো।” বলে সে কি হাঁসি।মায়া কিছুক্ষণ তাঁর হাঁসি পর্যবেক্ষণ করে নিজেও হাসে। অনেক চেষ্টা করছিল হাঁসি চেপে রাখার।পারেনি।

আকাশে মেঘ জমে। বৃষ্টির আশঙ্কা।অন্য স্থানের তুলনায় আলিমনগর সব যেন আগেভাগেই শুরু হয়।মায়া মেঘ দেখে ইশারায় বলল “বৃষ্টি হবে হয়ত।”
শেহজাদা বলল “আমার অনেক শখ।হবু বউয়ের সাথে বৃষ্টিতে ভিজব।আজ বোধহয় সে-ই স্বপ্ন সত্যি হবে। আমি আগামীকাল ই যাব তোমার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।ভাবছো লোকটি নিশ্চয়ই গর্দুভ,বলতে পারো। ভালোবাসার ক্ষেত্রে যে যত বোকাসোকা হয় সে-ই দিনশেষে ভালো থাকে।হয়ত তোমার বাবা প্রথম একটু অবাক হবেন। এরপর খুশিও হবেন। আশাকরি উনি রাজি হবেন।”

মায়ার চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। শেহজাদার কথা শুনে।সে এখন কিভাবে বোঝাবে,সে এসব চায় না। তাঁর ভালোবাসা মীর কে নিয়েই সে বাকি জীবনটা কাটাবে। নতুন জীবন চায় না। কক্ষনো না। তাঁর আশ্চর্যজনক অভিব্যক্তি দেখে শেহজাদা বুঝে যায় মায়া কি বলতে চাইছে।তবু তাঁর অভিব্যক্তি কে অগ্রাহ্য করে বলল “তোমার কাছে সবকিছু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে,উপরওয়ালা বোধহয় এটাই চান। তোমার জীবনে আমির আগমনটা আগে থেকেই লেখা ছিল বলেই তোমার সাথে আমার দেখা। কখনো ভাবিনি ঘুরেফিরে তোমার সাথে দেখা হবে।” শেহজাদা থামতেই মায়া কিছু বোঝাতে চাইল পুনরায়। তাৎক্ষণিক ভেসে আসল মেঘের গর্জন। দু’জনেই আকাশের দিকে তাকাল। বৃষ্টির আগমন।মায়া বাড়ি ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াল।পা ফেলল বাড়ির পথের দিকে।

শেহজাদা দু কোমরে হাত দিয়ে আকাশের দিকে চোখ বুলায়।মেঘের আলাপকালে বোঝা গেল বৃষ্টি এখুনি আসবে।মায়া ফিরতে পারবে না বাড়িতে। বৃষ্টি তাঁকে ছুঁয়ে ফেলবে নিশ্চিত।শেহজাদা চোখ নামিয়ে মায়ার পিছু পিছু হেঁটে বলল “ভিজবে মেয়ে।চলো গাছের নিচে দাঁড়াই। তুমি অসুস্থ। তাঁর ভেতরে ভিজলে আরো অসুস্থ হবে। তুমি অসুস্থ হলে যে আমার নিঃশ্বাস তখনি আটকে যাবে।” মায়া একবার থম মেরে দাঁড়াল।পেছন ঘুরল।শেহজাদার দিকে কটমট করে তাকায়।শেহজাদা মায়ার চাহনি দেখে দাঁড়িয়ে বলল “হবু স্বামীর দিকে এভাবে তাকাতে নেই।চোখে সমস্যা দিবে।একি তো গলাটা গেছে এরপর চোখও যাবে।” বলে মৃদু সুরে হাসে।মায়া মনে মনে তাকে বেয়াদব বলে দাবি করল।

পথে যেতে যেতেই বৃষ্টি শুরু হয়।শেহজাদা তাঁর অশ্ব কে একটা গাছের নিচে রাখে। তৃষ্ণা মায়াকে বলল “তোকে ভেজানো যাবে না। সমস্যা হবে‌।চল গাছের নিচে দাঁড়াই।”
মায়া বোঝায় ‘শেহজাদা লোকটি পেছনেই আছে‌। বাজে লোক।ভিজে গেলেও যাব।”
শেহজাদা অশ্বকে রেখে বৃষ্টির জল স্পর্শ করে বলল “ওহে বৃষ্টি,তুই বরই বুদ্ধিমান।কখন কোথায় কিভাবে ঝড়তে হবে জানিস। শুকরিয়া তবে।” বলে আশেপাশে কলাগাছ খুঁজতে শুরু করল।পেল না।কি করবে ভাবছে।ঠিক তেমন সময় দেখল এক মধ্যবয়স্ক লোক ছাতা নিয়ে নদীর তীরের দিকে যাচ্ছে।হাতে বৈঠা। নিশ্চয়ই মাঝি। শেহজাদা দৌড়ে লোকটার কাছে গেল।লোকটি দাঁড়িয়ে যায়।শেহজাদাকে পা থেকে পরখ করে। বললেন “বৃষ্টিতে ভিজতেছো ক্যান,পথ আটকাইলা!”

“চাঁচা, আমার বউ এমনিতেই অসুস্থ।ওই যে দেখেন। তার-উপর রাগ করে বৃষ্টিতে ভিজে চলে যাচ্ছে।আর বৃষ্টির ও বলিহারি,এমন সময় আসতে হল!ও ভিজে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।তখন কি আমার ভালো লাগবে বলুন!” লোকটি হা করে তাকিয়ে রইল শেহজাদার দিকে। এরপর ঘুরে মায়ার দিকে তাকাল।পিঠ পেছন দেখা গেল।শেহজাদা বেশ অস্থির হয়ে আছে। পুনরায় লোকটিকে বলল “চোখের সামনে বউ ভিজে যাচ্ছে, দেখতে আমার ভালো লাগছে না। কিছু করুন চাঁচা!”
লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে ছাতার নিচ থেকে মায়াকে আরেকবার দেখে। এরপর শেহজাদাকে দেখে বললেন “আমার ছাতাটা নিলেই তোমার সমস্যা নিশ্চয়ই সমাধান হইবো! নাও! আমি নদীর তীরে অপেক্ষা করতেছি।আইসা পড়ে দিয়ে যাইও।” শেহজাদা মুখে উজ্জ্বল হাঁসি নিয়ে ছাতাটা নিল।লোকটি বিড়বিড় করে বললেন “আধা পাগল মনে হয়।”

শেহজাদা উনার বিড়বিড়ানি শুনে জবাব দিল ‘আধা না চাঁচা, পুরোটাই পাগল।”
বলে চলে যায় মায়ার দিকে।পথ ভিজে যাওয়াতে মায়াও ঠিক মত হাঁটতে পারছে না। বৃষ্টির পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়। তাৎক্ষণিক অনূভব করল তাঁর শরীরে বৃষ্টির ছিট পড়ছে না।মাথার উপরে তাকিয়ে দেখল ছাতা। কৌতুহলবশত পাশে চেয়ে দেখল শেহজাদাকে।শেহজাদা ভিজছে।সে ছাতার বাইরে। লোকটাকে যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে। চুপিসারে কতবার যে নির্লজ্জ বলল তার ঠিক নেই।মায়া বাধা দিল না শেহজাদাকে। দিয়ে ফায়দা হবে না নিশ্চিত। তৃষ্ণা বলল “ভাই,ছাতা কোথায় পেলেন?

“মন থেকে কিছু চাইলেই পাওয়া যায়।যখন বৃষ্টি আসল তখন আল্লাহর কাছে চাইলাম।আর পেয়ে গেলাম।”
“চাইলেন আর পেয়ে গেলেন!”
“হুঁ।এটা তাকদির।হয়ত আল্লাহ চান আমি আর মায়া চিরপথ এভাবেই হাঁটি।”
“তিনি চান ?”
“নিশ্চয়ই চান।আর মায়াও মনে মনে চাইছিল আমাকে।যাতে ওঁর পিছু নেই।তাই পিছু নিচ্ছি।”
“কিন্তু আপনি তো পাশে হাঁটছেন”
শেহজাদা নিরুত্তর।মায়া হাসে তাঁদের দুজনের কথোপকথন শুনে।

“পাশে না হাঁটলে ওঁর মাথায় ছাতা ধরবে কে!”
“ও কি ধরতে বলেছে!” তৃষ্ণা যেন অতিরিক্ত প্রশ্ন করে ফেলছে।
শেহজাদা বিরক্তি হচ্ছিল।তবু বিরক্তিকর ছাপ মুছে বলল “যাকে ভালোবাসি তার যত্ন নিতে বলতে হয় না।বোকা পুরুষদের বলতে হয়।আমি শেহজাদা বোকা পুরুষ নই।”
“দেখেই বোঝা যায়।”
তাঁদের বক্তব্য আদান-প্রদান এর এক পর্যায়ে এসে মায়া পথের মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে। শেহজাদার দিকে তাকিয়ে ইশারা করল সে যেন এখন চলে যায়।বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে।শেহজাদা বলল “এখনো টুপটাপ বৃষ্টি ঝড়ছে।বাড়ির চৌহদ্দি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি। অসুবিধে হবে?
মায়া মাথা নাড়ায় হবে।

“একটু ভালোর জন্য অসুবিধে হওয়াতে মন্দ নয়। এরকম অসুবিধে জীবনে বারবার আসা দরকার।”
মায়া নিষ্প্রাণ চোখ জোড়ার দৃষ্টি ফেলে রেখেছে শেহজাদার দিকে।শেহজাদা ভেজা চুল গুলো উপরের দিকে তুলে জল ঝড়াচ্ছে।চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে জল ঠুকে। সুঠাম দেহের গঠন টা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।মায়া চোখ সরিয়ে নিল।
বৃষ্টি থামেনি। বৃষ্টি ঝড়া প্রকৃতির মাঝে রোদ দেখা যায় হঠাৎ।মেঘ সরে মৃদু রোদ আসাতে দু’জনেই তাকাল সূর্যের দিকে।শেহজাদা মসৃণ হেসে বলল “অন্ধকার আবহাওয়াতে রোদ। হঠাৎ মেঘালয় রাজ্যে সূর্যের আগমন। যেমন করে আমার শূন্য জীবনে তোমার আগমন ছিল পূর্ণতার বৃক্ষের মতন।” বলে থেমে পাশ পরিবর্তন করে অপরপাশে গিয়ে ছাতা ধরে।মায়া হতভম্ব হয় শেহজাদার প্রতিটি বাক্যে।সে শেহজাদার জাদুকরী চোখ দুটো দেখে।শেহজাদা তাঁকে পথে ইশারায় সামনে এগোতে বলে।

মিনিট কয়েক পর চৌধুরী বাড়ির চৌহদ্দির সামনে তাঁরা পৌঁছে যায়।শেহজাদা বলল “চলে যাও। দ্রুত ভেজা কাপড় বদলে নিও।” থেমে দৃষ্টি মাটিতে নিবদ্ধ করে পুনরায় মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল “আগামীকাল তোমার দেখা পাব তো?”
শেষ অনুরোধ টা করুণ শোনাল শেহজাদার।নরম কণ্ঠ। মায়া মাথা আওড়ালো। না!
“আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব। যদি না আসো তবে তোমার বাড়িতে চলে আসব। এবং কালই বিয়ের প্রস্তাব দেব।”
মায়া কিছু বলে না। তৃষ্ণা আগ বাড়িয়ে তাঁদের মাঝে বলল ‘এত তাড়া কিসের! আমাদের অবস্থা এখন ঠিক কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারছেন!”
শেহজাদা ক্ষিপ্ত স্বরে বলল “এটা তোর মনের কথা।ওর না। অন্যদিকে এক ভাগীদার কখন ছুটে যায় কে জানে!” শেষ বাক্যটি অস্পষ্ট ভাবে বলল শেহজাদা।

“কিছু বললেন?’
“গলার কাছে বেজে থাকা একটা কাঁটা। তুমি বুঝবে না। ভেতরে যাও।মায়ার যত্ন নিও।”
তাঁরা বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।শেহজাদা ছাতা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।মায়ার যাওয়ার পানে দেখছে। ভাবছে মায়া যদি একবার পেছন ফিরে তাকাত!করুণ স্বপ্ন ও আশা যেন।যা পূরণ হওয়ার নয় ভাবছে শেহজাদা। ঠোঁটের ফাঁকে একফালি ব্যর্থতার হাঁসি ফুটে।চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দম ফেলল ভারী। নিঃশ্বাস টুকুর সাথে আপাতত সমস্ত কষ্ট বিসর্জন দিল।নিজ গন্তব্যে ফেরা দরকার। তাঁর পথে পা ফেলার আগে আর একবার তীব্র আকাঙ্ক্ষার ঐ চোখ দুটো ফেলে মায়ার দিকে।ঠিক সে-ই মুহূর্তে মায়া এক নজর দীর্ঘ সময়ের জন্য পেছন ফিরে তাকায়। শেহজাদা চোখ কচলে তাকাল।ভুল ভেবেছিল, কিন্তু ভুল নয়।মায়া তারপানে দেখছে। শেহজাদা একগাল হেসে উঠল।

সন্ধ্যের দিকে এক অনুচর খাবার এর থালা নিয়ে মীর এর বন্দিশালায় উপস্থিত হয়। একহাতে জল।ও এসে মীর এর সামনে খাবার টা রাখে।মীর খেয়াল করল অনুচর ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই দরজাটা কেমন আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল। পাথরের মত শক্ত।কোন ছিটকিনি নেই ভেতর থেকে। নিশ্চয়ই বাইরে থেকে আটকানো থাকে।অনুচর খাবার রেখে বলল “আপনার হাত খোলার তো নিয়ম নাই।আইজ ওস্তাদ নাগ।(কাবির)আমাকেই খাইয়ে দিতে হইবো।”
মীর এক ভ্রুকুটি উঁচিয়ে বলল “খাব না। বিশেষ করে তোর হাতের খাওয়ার ইচ্ছা নেই।”

“এমন কইরেন না স্যার। আপনারে না খাওয়াইতে পারলে ওস্তাদ কথা শোনাইব।”
“এদের সাথে কাজ করে কত টাকা পাস?”
“চলি কোনরকম।বউ সংসার আছে।ছোডো একটা মাইয়া আছে।”
মীর হেঁয়ালিপূর্ণ ছাপে গভীর শ্বাস ভেতরে নিয়ে ছেড়ে বলল “তোর তো মেয়েও আছে‌।আর আমি বিয়ের পর বাসরঘর অবধি যেতেই পারিনি।কপাল।”
“ক্যা স্যার?
“তোর ওস্তাদ,বড় শয়তান আমায় ধরে নিয়ে আসছে। আমার বউয়ের উপর নজর পড়েছে ওদের।শালা বান্দর ওই শেহজাদা।দেশে কি মেয়ের অভাব ছিল! আমার বউকেই কেন!”
অনুচর খাবার হাতে তুলছিল।ফের রেখে দেয়।বলল “আপনার বউরে ওঁরা কি করছে!

“কিছু এখনো করেনি। কিন্তু কখন কি করে বসে সে-ই চিন্তায় দিল ফাটছে আমার।”
“তারমানে মাইয়া কেস?
“হুঁ। মেয়েলি কেস।তোকে দেখে আমার বন্ধু আহির, রাফিদ ওদের কথা খুব মনে পড়ছে। ওঁরা থাকলে ঠিক আমায় বাঁচিয়ে নিত।”
“আপনার বন্ধুরা কুমমে!(কোথায়)?
“আছে বাড়িতে হয়ত। আমার মৃত্যুর শোক পালন করছে।”
“আপনি মারা গেছেন?” ওঁর চোখ দুটো ফুটে উঠল।

মীর বলল “ভয় পাস না। আমি আত্মা না।তোর ওস্তাদ আর ওই বড় শয়তান আমার পরিবারের কাছে আমাকে মৃত প্রমাণ করেছে। আমার পরিবার ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। বিশেষ করে আমার বউ।”
“আপনার বউর জন্য আপনার কষ্ট হয়?” অনুচর এর ফালতু প্রশ্নের উত্তর দিতে মোটেই ভালো লাগছে না মীর এর।তবু ওকে কথার জালে ফাঁসিয়ে হাত দুটো খোলার চেষ্টা।এরপর পালানোর পরিকল্পনা।
“খুব কষ্ট হয়।কেন তোর হয় না?
“হুঁ হয়। কিন্তু কি আর করার..!”
অনুচর এর মুখটা ধোঁয়াশা হয়ে গেল।মীর বলল “কি হয়েছে? বউয়ের কাছে যেতে পারছিস না বলে মনে খারাপ?”
ও মাথা নাড়ায়। হ্যাঁ

“তবে শোন,তুই তোর বউয়ের কাছে চলে যা,আর আমাকে আমার বউয়ের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দে”
“না স্যার। ওস্তাদ জানলে আমারে শেষ কইরা ফেলব।”
“তোর ওস্তাদ জানব না। তোকে এত টাকা দেব বাকি জীবনটা বসে খেতে পারবি।”
অনুচর চুপচাপ।মীর ওঁর অভিব্যক্তি দেখে জিজ্ঞেস করে “আচ্ছা তোর নামটা কি!
“জ্বে! মাহফুজ।”
“ মফিজ।”
“না স্যার, মাহফুজ।”
“তুই অনেক ভাগ্যবান রে মাহফুজ।”
“কেমনে?
“এই যে তুই সন্তান ও বানিয়ে ফেলেছিস।”

The Silent Manor part 76

মাহফুজ লজ্জায় পড়ল। লজ্জা কাটিয়ে বলল “আপনার প্রেম কাহিনী শুনবার চাই। বিয়ে হইলো তারপর বন্দি আমগো কাছে,বউ নিয়ে টানাটানি, একদম শুরু থেইকা শুনতে চাই।”
“আচ্ছা, তাহলে হাতটা খুলে দে, খাবার খেতে খেতে দু’জনে সে-ই আলোচনায় বসি।”
মাহফুজ হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল “আইচ্ছা…..

The Silent Manor part 78