অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭২
সাজিয়া জাহান সুবহা
প্রকৃতি জুড়ে শীত শীত আমেজ। ঘন কুয়াশায় ঢাকা চতুর্দিক। রাত্রির মধ্যভাগে শীতের প্রকোপ বাড়ে দ্বিগুণ। এই মুহুর্তেও বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে প্রকৃতি। বারো তলা বিল্ডিং টার, আট তলার নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট-টিতে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে মাত্রই। ঘড়িতে তখন ১২:৪৫ মিনিট। বিশাল কক্ষটির দরজা, থাই গ্লাস সব আটকানো। কিঞ্চিৎ ফাঁকফোকর রাখেনি, যা দিয়ে রাত্রি বেলা শীতল হাওয়া ঘরে ঢুকবে। নীল শেইডের ড্রিম লাইট জ্বলছে। তাতেই বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে কক্ষটি। চোখ ভাঙ্গা ঘুম নিয়ে বিছানার মধ্যখানে বসে রয়েছে ইরা। বুকের মধ্যিখানে জড়িয়ে রেখেছে মাহবীর কে। পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে ঘুম পারাচ্ছে তাকে। দীর্ঘক্ষণ কান্না করে মাত্রই শান্ত হয়েছে বাচ্চাটা। এখন সে ঘুমিয়েছে, তা বুঝতে পেরে স্বস্তির শ্বাস ফেললো ইরা। বড় সাবধানে উঠে আসলো বিছানা ছেড়ে। বিছানার পাশেই একটি দোলনা রাখা। বার দুয়েক পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে মাহবীর কে দোলনায় শুইয়ে দিলো সে। দোলনার ছোট্ট বেডটির সঙ্গে এডজাস্ট মশারীটি তুলে দিয়ে একটু দোল দিলো। মাহবীরের ঘুম ভাঙ্গেনি দেখে এবারে লম্বা দম নিলো সে। তার শরীর ভেঙ্গে আসছে ক্লান্তিতে। আর এক সেকেন্ড ও বিলম্ব না করে চটজলদি বিছানায় শুয়ে পড়লো সে। চোখে নেমে আসলো রাজ্যের ঘুম।
ঠিক কতক্ষণ কেটে গেলো ইয়ত্তা নেই কোনো। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন ইরা’র কানে বেজে চলেছে ছেলের চিকন কন্ঠের কান্নার সুর। সে শুনছে ঠিক, কিন্তু চোখ মেলে তাকানো দায় হয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেনো স্বপ্ন দেখছে। এইতো মাহবীর তার কোলে। সে সামলাচ্ছে তাকে। স্বপ্নে বিভোর থাকতে থাকতে আচমকা ঝংকার দিয়ে গেলো দেহ। মাহবীরের কান্না যে থামছেই না। ধরফরিয়ে চোখ খোলা মাত্র বিছানা ছাড়তে উদ্যত হলো ইরা। এবং পরমুহূর্তেই, আকস্মিক থমকালো সম্মুখের দৃশ্যটুকু দেখে। নীলাভ আলোয় দেখা যাচ্ছে জাদিদের পুরুষালি অবয়ব। রুম জুড়ে হাঁটছে সে। দুই হাতের মাঝে মাহবীরকে নিয়ে রেখেছে। দোল দিচ্ছে মৃদু মৃদু। বাচ্চাটা কাঁদছে তখনো। এবারে তাকে সামনাসামনি কোলে নিয়ে নিজ গালের সঙ্গে বাচ্চাটির কোমল গাল স্পর্শ করলো জাদিদ। সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে লাইট জ্বালিয়ে দিলো। পেছন ফিরে ইরা’কে অবলোকন করতে উদ্যত হওয়ামাত্র তৎক্ষনাৎ চোখ বুজল ইরা। জানতে দিলো না, যে সে জেগে আছে। জাদিদ বেশ স্বস্তি পেলো তা দেখে। পুণরায় মত্ত হলো, ছেলেকে শান্ত করার প্রচেষ্টায়। ইরা লুকোচুরি নজরে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে বাবা-ছেলেকে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সফেদ লাইটের স্বচ্ছ আলোয় জাদিদের দেখা পেয়ে মাহবীর শান্ত হয়ে গিয়েছে। তাকিয়ে আছে নিভু নিভু দৃষ্টিতে। সেই দৃষ্টি দেখে জাদিদ হেসে ফেলে। দুহাতে মাহবীর কে উঁচু করে তার কোমল দুই গালে চুমু খেলো শব্দ করে। আদুরে স্বরে আওড়াল,
‘ কাউকে না দেখলেই এমন কাঁদতে হয়? মা যে ঘুমাচ্ছে দেখেননি? আর কতোক্ষণ জেগে থাকবে আপনার জন্য! হুহ? ‘
বাবার কথা না বুঝা স্বত্তেও গোলগাল চোখে তাকিয়ে রইল মাহবীর। পলক ফেললো না একবারও। জাদিদের হাসি প্রসারিত হলো এতে। পুণরায় এদিক সেদিক হাঁটতে হাঁটতে বললো,
‘ আপনি ভারী দুষ্টুমি শিখেছেন, বীর! এই এক সপ্তাহে মা-বাবাকে একটুও ঘুমাতে দিচ্ছেন না৷ এর আগের দিন গুলোতে তো ঠিকই ছিলেন। এখন কেনো দুষ্টুমি করছেন? মা’কে এমন কষ্ট দিতে ভালো লাগছে? ‘
অবুঝ প্রাণটি এবারেও নিরুত্তর। জাদিদ অবশ্য তার উত্তর পাওয়ার আশায় নেই। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে রুম জুড়ে হাঁটাহাঁটি করছে সে। একহাতে মৃদু মৃদু চাপড় দিয়ে ঘুম পারানোর চেষ্টা করছে। মাহবীর চোখ বুজেছে, দেখেই তৎক্ষনাৎ সফেদ লাইটটি নিভিয়ে দিলো সে। আরও একবার সতর্ক দৃষ্টিতে অবলোকন করলো ইরা’কে। চট করে চোখ বুজে ঘুমের ভান ধরলো ইরা। সেভাবেই কেটে গেলো কয়েক সেকেন্ড। যেই না চোখ খুলবে, ঠিক সেই মুহুর্তে অনুভব করলো তার কোমরের উপর ছড়িয়ে থাকা চাদর টা উপরে উঠছে। ঢেকে গেছে একদম গলা অবধি। কাজটা যে কার, তা বুঝতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হলো না ইরা’কে। মেয়েটা নিরবে উপভোগ করলো এই ছোট্ট যত্নটুকু। কিন্তু এতটুকুতেই যে শেষ নয়। চাদর জড়িয়ে দেওয়ার পরমুহূর্তেই তার উষ্ণ কপালে ছুঁয়ে গেল একজোড়া শীতল ওষ্ঠধর। ইরা থমকে গেলো তৎক্ষনাৎ। শ্বাস প্রশ্বাস আটকে, শক্ত হয়ে এলো শরীর। বিষয়টি প্রথম ঘটেছে, এমন নয়। তবুও অসাড় হয়ে রইলো সে। বুকের ভিতরটা ছটফটিয়ে উঠলো স্নিগ্ধ এক অনুভূতির ঝাপটায়।
জাদিদ সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। পুণরায় হাঁটছে পূর্বের মতোন। তার নিজেরও চোখ জ্বালা করছে। রাত তো কম হলোনা। ঘড়ির কাঁটায় ১টা বেজে ২৫ মিনিট এখন। হাঁটা থামিয়ে লম্বাটে ডিভানে গিয়ে আধশোয়া হলো সে৷ বুকে তখনো চুপটি মেরে আছে মাহবীর। সে ঘুমিয়েছে দেখে তাকে দোলনায় শুইয়ে দিতে উদ্যত হলো জাদিদ। কিন্তু ভাগ্য খারাপ! বুক হতে সরিয়ে নেওয়া মাত্র কান্নার প্রস্তুতি জুড়ে দিলো বাচ্চাটা। জাদিদের মুখজুড়ে হতাশা ছেয়ে গেলো। দুজনের দিকে নিরবে তাকিয়ে থাকা ইরাও বড্ড হতাশ। জাদিদের মুখ দেখে হাসিও পেলো তার। ছেলের কান্না কান্না ভাব দেখে দ্রুত তাকে পূর্বের ন্যায় বুকে জড়িয়ে নিলো জাদিদ। ডিভানে সটান শোয়ে পড়লো। ছোট্ট পিঠটাতে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
‘ ঘুমাচ্ছেন না কেনো,বাবা! আমার তো হাসপাতালে যেতে হবে কাল। ঘুমাতে দিবেন না নাকি? ‘
জিহ্ব দিয়ে অস্পষ্ট শব্দ করে, জাদিদের টি-শার্ট খামচে ধরেছে মাহবীর। বাবার উষ্ণ বুকেই যেনো আয়েশ পেয়েছে ভীষণ। ফলস্বরূপ আরামে চোখ বুজল সে। তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জাদিদের চোখ জোড়াও বুজে আসলো আপনা আপনি। একটা সময় হাতটা স্থির হয়ে এলো। কেবল জড়িয়ে রাখলো ছোট্ট দেহটি৷ বাবা-ছেলের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকা ইরা ধীরে উঠে বসলো এবারে৷ জাদিদ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়েছে দেখে কাবার্ড হতে নিঃশব্দে বের করে আনলো একটি চাদর। জড়িয়ে দিল বাবা-ছেলের উপরে। জাদিদের চোখ হতে চশমাটাও খোলে নিল। অতঃপর, মিনিট কয়েক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
মুগ্ধতার রেশ যেনো সরছেই না দুই চোখ থেকে। প্রেগ্ন্যাসির সময়ের চেয়েও মাহবীর আসার পর থেকে জাদিদের যত্ন বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। গোটা একটা মাসের ছুটিতে রয়েছে সে। ইমার্জেন্সি ব্যাতীত যায় না হাসপাতালে। কতো সুন্দর করে সামলে নিচ্ছে বউ বাচ্চাকে! শুরুর দুই দিন মিতু থাকতো ইরার সঙ্গে৷ যেন মাঝরাতে মাহবীর কাঁদলে তাকে নিয়ে হাঁটতে পারে৷ কিন্তু বাচ্চার কান্না শোনামাত্র জাদিদের ছুটে আসা দেখে মিতু থাকা বাদ দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনকে প্রাইভেসি দেওয়াটায় যেনো মোক্ষ উদ্দেশ্য তার। মাহবীর কে ঘুম পাড়িয়ে রোজ নিজ রুমে ফিরে গেলেও, আজ ক্লান্তিতে ইরা’র রুমেই ঘুমিয়ে পড়েছে জাদিদ। বিয়ের প্রথম দুই রাতের পর, এই বুজি তৃতীয় বারের মতো একই রুমে অবস্থান করছে তারা! ব্যাপারটা লক্ষ্য করে কেমন এক অনুভূতি ঘিরে ধরলো ইরাকে। আবছা আলোয় জাদিদের মুখখানার দিকে তাকিয়ে অনেক কিছুই ভাবলো সে। ঠিক এই মুহুর্তে, একই বিছনায় যদি তিনজন অবস্থান করতো। তবে কেমন হতো দৃশ্যটি? হতে পারতো, মাহবীরের মতো সেও জাদিদের বুকের উষ্ণতায় ডুবে আছে। ইশ! কল্পনারা কোথায় গিয়ে থমকাচ্ছে! আরক্তিম হচ্ছে দুই গাল। ছেলের মা যে আড়ালে-অবডালে ছেলের বাবার প্রেমে ডুবছে, তা বুজি টের পেলো নিজে!
গোধূলি বিকেল। শীতের দিনের মিঠা রোদ ছড়িয়ে আছে সর্বত্রে। গ্রীণ ভ্যালির পুল সাইডে আসর বসেছে চার বন্ধুর। ফাইনাল এক্সাম শুরু হতে মাত্র সপ্তাহ খানিক বাকি। আবরার ফিরে যাবে চট্টগ্রামে। সকলে ব্যস্ত হয়ে গেলে সময়, সুযোগ হয়ে উঠবে না বলেই আজ সময় বের করেছে তারা। পুলের নীলচে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে রয়েছে পাশাপাশি। স্প্রিরিট এর ক্যানে চুমুক দিয়ে আবারারের উদ্দেশ্যে জিমন বললো,
‘ আজই চট্টগ্রামে ব্যাক করবি? পরশু যে ইরা’র বাসায় দাওয়াত। আসবি না? ‘
‘ দেখি। সম্ভব হলে সেদিনই আসবো। ‘
আবরারের ক্ষীণ প্রতিউত্তর। বিপরীতে বাকিরা চুপ রইলো কয়েক সেকেন্ড। নিরবতা ভেঙ্গে রায়ান ফিচেল হেসে বলে উঠলো,
‘ আসিস না। তুই না থাকলে বরং অনেকের জন্য সুবিধায় হবে। তাই না, সা-ফ-ও-য়া-ন? ‘
নামটা টেনে টেনে ডাকলো সে। জিমন না চাইতেও ফিক করে হেসে ফেললো। সাফওয়ান চোখ গরম করে তাকালো রায়ানের দিকে। ছেলেটার চোখে ভয়ডর নেই কোনো। বরং বেশ মজা পাচ্ছে যেনো। আবরার বুঝে উঠতে পারলো না ঘটনা। অবুঝ কন্ঠে শুধালো,
‘ কার সুবিধা হবে? আমি কেনো কারো অসুবিধা করবো! ‘
রায়ান এবং জিমন পুণরায় হাসলো। কিন্তু সাফওয়ান নিশ্চুপ। আবরার একই সুরে ফের বলে উঠলো,
‘ আমি এখানে থাকিই তো মাত্র এক বা দুই দিন। কারো অসুবিধা করার কথা ভাবার আগেই দিন শেষ। ‘
জিমন মাথা নেড়ে সায় জানায়। আবরারের কাঁধ চাপড়ে বলে,
‘ ঠিক বলেছিস। এদিকে যে কতো কি ঘটে যাচ্ছে, তুই ব্যাটা সব মিস করে দিচ্ছিস। ‘
আবরার নিজেও হতাশা প্রকাশ করে একথা শুনে। পরক্ষণেই আবার কৌতুহলী হয়ে জানতে চায়,
‘ কি ঘটে যাচ্ছে? তোরা থাকতে কিছু মিস করার প্রশ্ন উঠছে কেনো? ‘
‘ জানাতে পারলে কি আর এতগুলো মাস চুপ থাকতাম? এদিকে কথা চালান দিব, ওদিকে আমার গর্দান যাবে। এখনো বিয়েও করতে পারিনি। ভার্জিনিটি নিয়ে মরার শখ নাই, ভাই। তুই অজানাতেই থাক। এমনিতেও তোকে ছাড়া তো বিয়েই হবে ন…আহহহহহ! ‘
কথার সমাপ্তি টানার আগমুহূর্তে পিঠে এক শক্ত ঘুসি পড়লো। দানবীয় হাতের এহেন আক্রমণে ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলো জিমন। তা দেখে আবরার সন্দিহান চোখে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। বললো,
‘ মারলি কেনো? কি লুকাতে চাইছিস আমার কাছ থেকে? ‘
ক্যানে চুমুক বসিয়ে নির্লিপ্ত কন্ঠে সাফওয়ান জবাব দিল,
‘ প্রেমট্রেম তো আর করছি না যে লোকাবো। খুন খারাবি করলে সবার আগে তুই-ই খবর পেতি। ‘
এমন নির্লিপ্ত কন্ঠের ডাহামিথ্যে শুনে জিমন-রায়ান হো হা করে হেসে উঠলো। আবরার মুখ কুঁচকে বললো,
‘ তোকে নিয়ে প্রেম ভালোবাসার প্রশ্ন উঠবেই না শালআ নিরামিষ। তোর সঙ্গে কোন মেয়ে ঠিকবেও না বেশিদিন। না জানি কোন অভাগীর কপালে আছোস। বড্ড আফসোস হয় ভাবলে.. ‘
আবরারের কথা শুনে গলায় তরল পানীয় আটকে খুকখুক করে কেশে উঠলো সাফওয়ান। বুকে হাত চেপে ঢ্যাবঢ্যাব চোখে তাকালো আবরারের দিকে। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে, গমগমে গলায় শুধালো,
‘ অভাগী! পার্টনার হিসেবে আমি এতো খারাপ তা তুই বলতে পারলি কীভাবে? ‘
‘এই দেখ কেমন করে তাকাচ্ছে! দেখ..এমন চোখে তাকালে কোন মেয়ে ঠিকবে আদৌ? তোর কন্ঠ শুনেই তো হার্ট ফেইল করবে বেচারি। না দেখেই ওই মেয়ের জন্য করুনা হচ্ছে আমার। তার কপালে বহুত দুঃখ আছে। চু চু.. ‘
কথার শেষে আফসোসের সুর তুললো আবরার। সাফওয়ানের গুরুগম্ভীর মুখশ্রী দেখে জিমন এবং রায়ানের হাসি মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তাদের দিকে বিরক্তিকর চাহুনিতে তাকিয়ে আবরারের দিকে খালি ক্যানের বোতলটা ছুড়ে মারলো সাফওয়ান। রাশভারী কন্ঠে বললো,
‘ আমার বউ নিয়ে তোকে অতো ভাবতে হবে শা..লা। নিজের টা নিয়ে ভাব। ছ্যাকা খেয়ে ফুটেজ ডাউন করে রেখেছিস। তোর কপালে ওসব সেকেন্ড হ্যান্ড ই জুটবে, দেখিস। ‘
ক্যানের খালি বোতল টা নাকে লাগার আগমুহূর্তে তা ক্যাচ করে নিলো আবরার। তার টাচি টপিক নিয়ে কথা বলছে দেখে যরাপণাই বিরক্ত হলো সে। আড়চোখে লক্ষ্য করে দেখলো, রায়ান চুপ মেরে গেছে। প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টায় আবরার ধমকের সুরে বললো,
‘ শালা বলে ডাকবি না হারামজাদা! তোর কাছে বোন বিয়ে দিব না আমি। ‘
পানিতে ডুবিয়ে রাখা দুই পা তুলে নিতে গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে, ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো সাফওয়ান। জিমন এবং রায়ান ও বড়ো আগ্রহী চোখে তাকিয়ে। প্রতিউত্তর করেই আবরার ফোনে মশগুল হলো। তৎক্ষনাৎ এক মগ সমান পানি ছিটকে পড়লো তার শরীরে। আবছা ভাবে কানে এলো সাফওয়ানের দাম্ভিক কন্ঠস্বর,
‘ ভাব দেখে মনে হচ্ছে তোর পারমিট নেওয়ার জন্য হাতে পায়ে ধরবো আমি! শালা, তুলে নিয়ে যাবো টের ও পাবি না। ‘
শার্ট হতে পানি ঝারতে থাকা আবরার ঠিকঠাক ঠাহর করে উঠতে পারলো না সাফওয়ানের বলা কথাটুকু। ‘কি বললি?’ প্রশ্ন তুললেও পুণরায় ফিরে তাকালো না সাফওয়ান। ধুপধাপ পা ফেলে স্থান ত্যাগ করলো। নিরবে বিনোদন নিতে থাকা অন্য দুই বন্ধু আবরারের দুই বাহু ঘেঁষে বসলো। তাকিয়ে রইল নিরব চোখে। দুজনের এমন চাহনিতে ভড়কে গেল আবরার। ডানে, বামে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ হয়েছে কি? ‘
সহসা মাথায় এক চাপড় পড়লো জিমনের হাতের। শোনা গেল তার ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠ,
‘ কতো কিছুই তো হচ্ছে। তুই তোর চাঁদ বদনখানা চট্টগ্রাম থেকে এখানে শিফট না করলে জানবি কীভাবে! ‘
‘ হ্যাঁ তো তোদের রেখেছি কি ঘাস কাটার জন্য? তোরা জানা.. ‘
‘ বললাম না, ভার্জিনিটি নিয়ে প্রাণ ত্যাগ করতে ইচ্ছুক নয়। জানের মায়া সবার আগে। ‘
জিমনের দিক থেকে এহেন জবাব পেয়ে শেষ আশা হিসেবে রায়ানের দিকে ফিরে চাইলো আবরার। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়লো রায়ান। দ্রুত গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ অসম্ভব! আমি কিছু বলেছি জানলে নীতি ভীষণ রাগ করবে। এমনিতেই বারো মাসের আট মাস ব্রেকাপে থাকি। এখন শান্তিতে আছি, থাকতে দে ভাই। ‘
আবরার না চাইতেও হেসে ফেললো এবারে। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ বড় বাঁচা বাঁচলাম! ‘
শুক্রবার সকাল৷ বেলা বাজে সাড়ে দশটা। কিন্তু প্রকৃতি জুড়ে ঘন কুয়াশার ছড়াছড়ি। সূর্যের দেখা নেই বললেই চলে। ঘন কালো মেঘ জমে আছে আকাশ জুড়ে। চতুর্দিকে গুমোট ভাব। বলা চলে, একটি অলস দিন। কিন্তু আলসেমি দেখানোর নূন্যতম সুযোগ নেই। জাদিদ-ইরার ফ্ল্যাটে আজ বেজায় কাজের তোরজোর। বারো তলা বিল্ডিং টার সব ভাড়াটিয়া সহ জাদিদের বন্ধুবান্ধব, কলিগ এবং ইরার বন্ধুদের নিয়ে বেশ বড়সড় এক দাওয়াতের আয়োজন চলছে আজ। রান্নাবান্না সহ অন্যান্য সকল কাজের জন্য কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে জাদিদ। ছোট্ট মাহবীর কে নিয়ে ইরা এতকিছু যে সামলাতে পারতো না। তবুও, সংসারের কর্ত্রী হিসেবে ইরা’র দ্বায়িত্ব ও কম নয়। বিগত দুটো দিন যাবত বেজায় ব্যস্ততায় কাটছে দিন। তন্মধ্যে আজ ভোর হতে মাহবীর শুরু করেছে নতুন কান্ড। মায়ের কোল ছাড়া থাকছেই না।
মিতু,জাদিদ নিজেরাও শ’খানের কাজে মশগুল। অগত্যা বাচ্চা সমেত ইরাকে টুকটাক কাজে হাত বাড়াতে হচ্ছে। আধ ঘন্টা হলো ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে স্নান ছেড়ে এসেছে সে। এমন দিশেহারা হতে হবে তা আগেই আন্দাজ করেছিলো বলে, সে নিজের বন্ধুদের বলেছে যেনো সকাল সকালই চলে আসে। নীতি,সায়েরী,সাফ্রিন তারা থাকলে মাহবীর কে নিয়ে বাড়তি কষ্ট পোহাতে হবে না। ওরাই সামলে নিবে। সেই সঙ্গে ইরার ও সহযোগিতা হবে কিছুটা। হিসেব মতো এতোক্ষণে হয়তো তারা রওনা দিয়ে দিয়েছে। তাইতো, তাড়াহুড়ো করে তৈরি হচ্ছে ইরা। গত সপ্তাহে জাদিদ শপিং করেছিলো। জলপাই রঙের চমৎকার একটি শাড়ি কিনেছে ইরা’র জন্য। সেই সঙ্গে নিজের এবং মাহবীরের জন্যও ম্যাচিং কালার শার্ট নিয়েছে। সোনালী পাড়ের সবুজ শাড়িটি আজ গায়ে জড়িয়েছে ইরা। কোন রকম গায়ে পেচিয়ে, চট জলদি বেরিয়ে এসেছে ওয়াশরুম হতে। প্রচন্ড তাড়াহুড়ায় ব্লাউজের ফিতে আটকাতে গিয়ে চুলের সঙ্গে হুট পেচিয়ে ফেললো সে। এলোমেলো কুচি সামলাতে গিয়েও যাচ্ছেতাই অবস্থা। বিরক্তিতে মেজাজ খিচে আসলো তার। ভেজা তোয়ালে টুকু চুল হতে খোলে রাখলো। আড়চোখে ঘুমন্ত মাহবীরের দিকে লক্ষ্য করে, পুণরায় মত্ত হলো হুকের সঙ্গে আটকে থাকা চুলগুলো ছাড়িয়ে আনার চেষ্টায়। ঠিক সেই মুহুর্তে, কক্ষের নিরবতা ছেদ করে, খট করে খুলে গেলো দরজাটা। শোনা গেল জাদিদের ব্যস্ত কন্ঠ,
‘ গেস্ট-রা আসার সময় হয়ে গিয়েছে, ইরা। আপনি এখনো তৈরি হতে পারেন নি! ‘
বলতে বলতে রুমে প্রবেশ করলো সে। চোখ তুলে তাকালো সম্মুখে। এবং তার ব্যস্ত পদচারণ থমকালো তৎক্ষনাৎ। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে তার আগমনে ইরা নিজেও ভরকে গিয়েছে। চট করে পেছন হতে সামনের দিকে ফিরে, ঢ্যাবঢ্যাব চোখে তাকিয়ে আছে জাদিদের দিকে। জাদিদ কখনোই অনুমতি ব্যাতীত ইরা’র রুমে প্রবেশ করে না। তাইতো, আজকের এহেন ঘটনায় দুজনেই অপ্রস্তুত হলো ভীষণ। জাদিদ কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু বউয়ের এই সিক্ত, স্নিগ্ধ অবয়ব দেখে সব গুলিয়ে বসলো সে। তার মুগ্ধ নয়ন স্থির হয়ে রইলো ইরা’র দেহশ্রী জুড়ে। সেই মোহনীয় দৃষ্টির কবলে পড়ে ইরা’র শ্বাস আটকে আসার উপক্রম। ঘনঘন পলক ঝাপটে নিজেকে শান্ত দেখাল সে৷ জাদিদের ঘোর কাটানোর প্রচেষ্টায়, আটকে আসা কন্ঠে বললো,
‘ এ-এইতো হয়ে গেছে। আ-আসলে ব্লাউজের ফিতের সঙ্গে চুল আটকে গিয়েছে৷ হুট টাও লাগাতে পারছি না৷ আপ-আপনি একটু মিতুকে ডেকে দিন না.. ‘
ইরা’র কন্ঠে জাদিদের ঘোর কাটলো। সহসা দৃষ্টি নামিয়ে নিলো সে। দরজার হাতলে হাত রাখলো পুণরায়। জাদিদ চলে যাচ্ছে ভেবে স্বস্তির শ্বাস নিতে উদ্যত হলো ইরা। কিন্তু বিধিবাম! মৃদু শব্দে দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো সে। বিষ্ময়ভরা দুই চোখে দেখলো বাম হাতে ঠেলে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে জাদিদ। লেমন কালারের শার্টটার স্লিভ গুটিয়ে নিতে নিতে নিঃশব্দে কদম এগিয়ে আনলো ইরা’র দিকে। বেশ অনেকটা দেহ ছুঁই ছুঁই হয়ে এসে থমকালো। ইরা’র চমকিত নজরে নজর রেখে, ভীষণ রকমের শান্ত, কিন্তু অদৃশ্য এক অধিকারবোধ নিয়ে সে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আপনার হাসবেন্ডের দুই হাত এখনো যথেষ্ট সক্রিয় আছে, মিসেস এহমাদ। কাম, লেট মি হেল্প ইউ.. ‘
অপরিচিত এক অনুভূতির বেড়াজালে আটকে থাকা রমনী থমকালো এবারে। স্বয়ং স্বামী নামক পুরুষটার পক্ষ হতে, এই মিষ্টি সম্বোধন টুকু পেয়ে শিরশির করে উঠলো সর্বত্র। মিসেস এহমাদ! মনে মনে বার দুয়েক বিড়বিড় করলো এই সম্বোধন। এতো সুন্দর লাগছে কেনো শুনতে! একই সঙ্গে “আপনার হাসবেন্ড” এই ছোট্ট স্বীকারোক্তি টুকু ও তনু মনে দোলা লাগিয়ে দিয়েছে৷ ইরা কি জানে না যে জাদিদ তার বর! এমন চড়া গলায় স্বীকার করে, এই নাজুক মনে এমন প্রভাব ফেলার কি মানে! জাদিদ টা আজকাল বড্ড বাড়াবাড়ি রকমের কান্ড ঘটাচ্ছে। হোক তা অতি সামান্য৷ কিন্তু ইরা’র কাছে বাড়াবাড়ি বলেই মনে হচ্ছে৷ অতি সামান্য কিছুতেও সে নুইয়ে পড়ছে লাজুক কিশোরীর মতোন। অথচ সে এখন এক বাচ্চার মা। ব্যাপার গুলো কি আদৌও তার সঙ্গে মানায়!
‘ ইরা!!! ‘
জাদিদের ভরাট কন্ঠের ডাকে হুশ ফিরলো মেয়েটার। হকচকিয়ে ফিরে তাকালো। দেখলো, জাদিদ ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সে বলে উঠলো,
‘ আপনি এমন লাল, নীল হয়ে যাচ্ছেন কেনো? কি ভাবছেন? ‘
আরেকদফা বিভ্রান্তিতে ডুবল মেয়েটা। দ্রুত মাথা নেড়ে বললো, ‘ ক-কিছু না, কিছু না ‘
অতঃপর ইতস্তত ভঙ্গিতে পেছন ঘুরলো। অর্ধ উন্মুক্ত, সিক্ত পৃষ্ঠদেশ মেলে ধরলো জাদিদের সম্মুখে। সেই খোলা পিঠের দিকে অসংযত নজর স্থির হতেই জাদিদের দেহজুড়ে উষ্ণতা ছড়িয়ে গেলো। গলার কাছে আটকে আসা শ্বাস টুকু ত্যাগ করে বড় কষ্টে দৃষ্টি সংযত করলো সে। মনযোগ দিলো ব্লাউজের হুক হতে ইরা’র ভেজা চুল টুকু ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টায়। পূর্ব হতেই শীতে, অনুভূতিতে টালমাটাল ইরা এবারে শীতল হাতের স্পর্শ পেয়ে পুরোপুরি জমে গেলো। শ্বাস আটকে থম মেরে রইলো। জাদিদ ব্যস্ত হাতে চুল ছাড়িয়ে নিয়ে, ফিতে দুটো লাগিয়ে দিলো। একই সঙ্গে আটকে দিলো হুক। সঙ্গে সঙ্গে তার কাছ থেকে ছিটকে সরে আসলো ইরা। দুই হাত সমান দুরত্বে দাঁড়িয়ে হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ আ-আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবো। আপ…আপনি ছাদে গিয়ে দেখুন সব ঠিকঠাক আছে কিনা। ‘
যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেও জাদিদ গেল না। বরং পুণরায় ইরা’র কাছাকাছি এসে হাঁটু গেড়ে বসলো। এলোমেলো কুচিগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বললো,
‘ আমার ফ্রেন্ডস,কলিগরা মিলে দশ-পনেরো জন আসবে। মাহবীরের ব্যাপারে ওরা বেশিকিছু জানে না। তবে অনেক কিছু সন্দেহ করতে পারে। আপনাকে হয়তো কিছু না কিছু প্রশ্ন করে বিব্রত করতে চাইবে। ইগনোর করবেন। বেশিকিছু বললে আমাকে জানাবেন। টেন্সড বা মন খারাপ করবেন না, ঠিক আছে? ‘
শেষের প্রশ্নটুকু করেই ইরার দিকে চোখ তুলে তাকালো সে। প্রতিউত্তর স্বরূপ মাথা দুলিয়ে সায় জানালো ইরা। জাদিদ দাঁড়িয়ে পড়লো এবারে৷ চলে যেতে উদ্যত হয়েও কি যেনো ভেবে পুণরায় ফিরে তাকালো। ইরা তাকিয়ে আছে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে। সেই অবুঝ নজরে নজর মিলিয়ে মাথা নুইয়ে আনলো জাদিদ। মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে থেকে একহাত বাড়িয়ে গাল ছুঁল ইরা’র। শীতল গলায় আওড়াল,
‘ আমি যতটা কল্পনা করেছিলাম, এই শাড়িতে আপনাকে তার চেয়েও বেশি স্নিগ্ধ লাগছে, মাহবীরের আম্মু! ‘
বেলা এগারোটা। প্রকৃতি জুড়ে তখনো গুমোট ভাব। সূর্যের দেখা বোধহয় আজ পাওয়া যাবে না। সন্ধ্যা ৬টার সময়কার মতোন, এখনো আবছা কুয়াশাজড়ানো পরিবেশ। শিশিরে সিক্ত ঘাস,পাতা। এই শীত শীত হাওয়া গায়ে মেখে ব্যস্ত সড়কে মিডিয়াম গতিতে ছুটছে সাফওয়ানের চকচকে কালো টয়োটা গাড়িটি। বাদামি মণির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সড়কপথে। নীলচে রগ ফুলে থাকা, শক্তপোক্ত, বলিষ্ঠ ডান হাত স্টিয়ারিংয়ে চেপে রয়েছে। দক্ষতার সঙ্গে একহাতেই ঘুরাচ্ছে স্টিয়ারিং। অন্যহাতে কানে চেপে রেখেছে লেটেস্ট মডেলের আই ফোনটি। মাত্রই কল করেছে ইরা। জানতে চাইছে, কতদূর এলো। সামান্য কয়েকটা বাক্য বিনিময় করে ফোনকল বিচ্ছিন্ন করলো সাফওয়ান। পরমুহূর্তেই নির্দিষ্ট দোতলা বাড়িটির সম্মুখে এসে ব্রেক কষলো। তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে উঠলো ফ্রন্ট সিটে অবস্থানরত সাফ্রিন। গাড়ির ধার খুলতে খুলতে মৃদু কন্ঠে জানালো,
‘ আমি ডেকে নিয়ে আসছি, ভাইয়া। ‘
সাফওয়ান মাথা নেড়ে সায় জানালো কেবল। সাফ্রিন ঘরে ঢুকতেই মেরুদণ্ড সোজা করে হেলান দিয়ে বসলো সে। কব্জি হতে খানিকটা উপরে গুটিয়ে থাকা টি-শার্টের হাতা দুটো নামিয়ে নিলো। অতঃপর, ব্যাক সিট হতে তুলে নিলো নিজের ধূসর-সাদা লেদার জ্যাকেট-টি। এতক্ষণ যাবত গাড়ির সবকটি কাঁচ বন্ধ ছিলো বিধায় শীত লাগেনি। কিন্তু সায়েরী আসলেই জোর করে কাঁচ নামিয়ে রাখবে। মেয়েটাকে আগাগোড়া মুখস্থ বলেই, পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে সে। জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে পুণরায় মশগুল হয়েছে ফোনে। অপেক্ষায় রইলো সাফ্রিন-সায়েরীর। গুণে গুণে সময় পার হলো এগারো মিনিট। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গেইট পেরিয়ে বের হলো দুই রমনী। শব্দ শুনেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো সাফওয়ান।
প্রথমেই তার নির্লিপ্ত দৃষ্টি স্থির হলো সায়েরীতে। আবদার রক্ষার্থে, তারই দেওয়া নেভি রঙের ড্রেসটি পরেছে মেয়েটা। ডার্ক ব্লু রঙ, মখমলের অতি সাধারণ একটি গোল ড্রেস। অনেকটা ঘেরযুক্ত। লম্বায় ঠিক ঠিক পায়ের গোড়ালি ছুঁয়েছে। কনুই অবধি হাতা,সিম্পল ভি নেক। কোমরের কাছে একটি সরু হোয়াইট লেদার বেল্ট ব্যাতীত অন্য কোনো ডিজাইন নেই। অতি সাধারণ ডিজাইন। কিন্তু কাপড়টুকু বেশ আরামদায়ক। এই ধরনের গোল জামায় সায়েরীর ছোট খাটো দেহশ্রী বেশ আদুরে লাগে দেখতে। তন্মধ্যে রঙটি অনেকটাই ডার্ক। যেটায় মেয়েটার উজ্জ্বল শ্যামলা তনু দেখতে ফর্সা মতোন লাগে। তাইতো, এক দেখাতেই বেশ চড়া দামে জামাটি কিনে নিয়েছিলো সাফওয়ান। এবং যেমনটি কল্পনা করেছিলো, তেমনই মোহনীয় লাগছে মেয়েটাকে। সাইড সিথি করে, ডান পাশে ছোট্ট একটি বিনুনি সঙ্গে ক্লিপ লাগিয়েছে।
বাম দিক হতে পিঠময় ছড়িয়ে রেখেছে এলোকেশগুলো। প্রগাঢ় নয়নে ঢেউ খেলানো চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল সাফওয়ান। পরমুহূর্তেই তার নজর নেমে এলো নিচের দিকে। অন্যান্য সময়ের মতো আজকেও সায়েরীর চয়নে হাই হিল দেখে ভ্রুঁ যুগল কুঁচকে গেলো তার। গম্ভীর হলো মুখাবয়ব। কঠোর চাহনিতে চোখ তুলে চাইতেই চোখাচোখি হলো দুজনার। সাফওয়ানের এই কঠোর চাহনির বিপরীতে সায়েরীর নজরে ফুটে উঠেছে একছত্র ভয়। চুপসে আছে মেয়েটা। চোখাচোখি হওয়ার ন্যানো সেকেন্ডের মাঝেই নামিয়ে নিয়েছে দৃষ্টি। অমন ভষ্ম করা চাহনিতে দৃষ্টি মিলিয়ে রাখা যে বড্ড দুষ্কর।
সায়েরী এবং সাফ্রিনের ঠিক পেছনেই এগিয়ে আসছেন সায়েরীর বাবা৷ উনাকে লক্ষ্য করামাত্রই গাড়ি থেকে নেমে এলো সাফওয়ান। দ্বায়িত্ব বোধ থেকে প্রথমেই ব্যাক সিটের ধার খুলে দিলো। অতঃপর এগিয়ে গেলো কয়েক কদম। সালাম বিনিময় শেষে সোলাইমান সাহেব বেশ চিন্তিত গলায় বললেন,
‘ মেয়েটাকে নিয়ে মোটেও স্বস্তি পাচ্ছি না, বাবা। দুদিন আগে ঘুরতে গিয়েও চোট নিয়ে ফিরেছে। জানো নিশ্চয়ই? এজন্যই আপাতত কোথাও যেতে দিতে চাইনি। তাছাড়া আবরারও নেই। কিন্তু ইরা এতো করে বলেছে যে না দিয়েও পারছি না। ‘
‘ আবরারও বলেছে যেনো যেতে দিই। তোমরা আছো কিনা। ও আজ দুপুরেই আসবে বললো। তাই যেতে দিচ্ছি। আর তুমিও আছো। সাফ্রিনের সাথে ওকেও একটু দেখে রেখো, বাবা। সায়েরী তো তোমার ছোট বোনের মতোই। ‘
শুরু থেকে সব কথা মনযোগ দিয়ে শুনছিলো সাফওয়ান। কিন্তু শেষের এই বাক্যটুকু কর্ণধার হতেই বিষম খেয়ে গেলো বেচারা৷ কেশে উঠলো খুকখুক করে। কোন রকমে জবাব দিলো,
‘ চিন্তা করবেন না, আঙ্কেল৷ আমি আছি তো। ‘
সোলাইমান সাহেব আবেগে আপ্লুত হয়ে সাফওয়ানের কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন,
‘ তুমি আছো বলেই তো যেতে দিচ্ছি। এতগুলো বছর আবরার না থাকা অবস্থায় তুমি ই তো ওকে বড় ভাইয়ের মতো আগলে রেখেছো। ‘
চরম অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করে উঠলো সাফওয়ান। জবাব দেওয়ার কোনো ভাষা খুঁজে পেলো না। সোলাইমান সাহেবের এমন গর্বিত মুখাবয়ব দেখে তার বলতে ইচ্ছে হলো,
‘ জ্বি জ্বি। কেমন করে আগলে রেখেছি, তা যদি আপনাকে দেখাতে পারতাম! ‘
কিন্তু বুকের কথা মুখে ফুটলো না। বড় কষ্টে ঠেলেঠুলে, একটুখানি হাসার চেষ্টা করলো। তার অবস্থা বুঝেই হয়তো, গাড়ির মধ্য হতে ভেসে এলো সায়েরীর রিনরিনে কন্ঠস্বর,
‘ আমাদের দেরি হচ্ছে তো, আব্বু! ‘
সোলাইমান সাহেব তড়িৎ মাথা দুলিয়ে সায় জানালেন। উনাকে বিদায় জানিয়ে গাড়ির নিকট পৌঁছালো সাফওয়ান। দেখলো, ব্যাক সিটেই আসন পেতেছে দুই বান্ধবী। এক মুহুর্তের জন্য নিজেকে এই দুই রমনীর ড্রাইভার বলে মনে হলো তার। কিন্তু কিচ্ছুটি বললো না। চুপচাপ উঠে বসলো ড্রাইভিং সিটে। চাকা ঘুরলো সড়কপথে। ব্যাক সিটে তখন নাক মুখ কুঁচকে বসে আছে সায়েরী। ঠিক তার পাশ ঘেঁষে অবস্থানরত সাফ্রিন। মেয়েটা একহাতে নিজের মুখ চেপে রেখেছে। পেটে খিল ধরানো হাসিটুকু আটকে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে বড় কষ্টে। সায়েরী চোখ গরম করে তাকাতেই ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো সে। চট করে কাছাকাছি এসে দুইহাতে জড়িয়ে নিল বান্ধবীর সরু কোমর। কাঁধে থুতনি রেখে, কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
‘ তুই আর আমি তো বোন বোন হয়ে গেলাম রে সায়ু। আমার ভাই যে তোরও ভাই হয়, তা তো আগে জানতাম না। ‘
মজার ছলে কথাটুকু বলে পুণরায় ফিক করে হেসে দিলো সে। সায়েরীর কাঁধে ঠেকাল কপাল। তার এমন ফাজলামো তে সায়েরী বেজায় বিরক্ত, বিভ্রান্ত। সাফ্রিন পুণরায় বললো,
‘ ভাই হিসেবে আমার ভাইয়া কতটা রেসপন্সিবল দেখেছিস! তোর সার্ভিসে সদা এক্টিভ। আঙ্কেল তো জানলোই না তোর ব-ড় ভা-ই কতোটা আগলে রেখেছে। ইশ!! বললি না কেনো? ‘
সায়েরীর ফুলো গাল রক্তিম হয়ে উঠলো এবারে। অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে সাফ্রিনের হাতে আলতো খামচি বসালো সে। লজ্জা মিশ্রিত, মিহি স্বরে ধমকে উঠলো,
‘ চুপ করবি তুই? ‘
সাফ্রিন হাসি হাসি মুখে মাথা নেড়ে বুঝায়, আচ্ছা চুপ করলাম। কিন্তু পূর্বের মতোন ঠিকই জড়িয়ে ধরে আছে। দীর্ঘক্ষণ গাড়ির বাহিরে দৃষ্টি স্থির রাখা সায়েরী এবারে নজর ঘুরালো। ইনসাইড ভিউ মিররে তাকালো আড়চোখে। সেকেন্ডের মাঝেই চোখাচোখি হলো চিরচেনা সেই গম্ভীর দৃষ্টির সঙ্গে। যেই দৃষ্টি জুড়ে আজ কেবল কঠোরতার আভাস। সহসা মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিলো। হাতে হাত ঘষল তীব্র অস্বস্তিতে।
সাফওয়ান তখনো একধ্যানে তাকিয়ে। কপালের মধ্যিখানে ভাঁজ পড়েছে দুটো। সায়েরীর দিক হতে তার নজর ঘুরেফিরে নামলো সাফ্রিনের দিকে। এমন লেপ্টে আছে কেনো! আশ্চর্য! বান্ধবী বলে কি এতো লেপ্টালেপ্টি করে বসে থাকা লাগবে? সাফ্রিনের মুখখানা ঠিকঠিক সায়েরীর ঘাড়ের সঙ্গে লেগে আছে। জড়িয়ে ধরে গাড়ির বাহিরে তাকিয়ে আছে সে। কথা বলছে ফিসফিস করে। সাফওয়ান নাকমুখ কুঁচকে চোখ সরিয়ে নিল। এমন দৃশ্য পূর্বেও বহুবার দেখেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সায়েরী নিজেই লেপ্টে থাকতো সাফ্রিনের সঙ্গে। কিন্তু আজকের এই দৃশ্যে পূর্ব হতেই বিগড়ে থাকা মেজাজ আরও বিগড়ে গেল সাফওয়ানের। বিড়বিড় করে সে আওড়াল, ‘ ডিজগাস্টিং! ‘
নির্দিষ্ট বিল্ডিংটির সুম্মুখে এসে হর্ন বাজাতেই লোহার বিশাল গেইটটি খুলে দিলো দারোয়ান। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি থাকবে বলে সাফওয়ান সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ গাড়িটি পার্কিং এরিয়ায় রাখার। যথাস্থানে পার্ক করামাত্র ঝটপট গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো সাফ্রিন। পরপরই একই দরজা দিয়ে বের হতে উদ্যত হওয়া সায়েরী আকস্মিক থমকালো সাফওয়ানের রাশভারি কন্ঠের আদেশ শুনে।
‘ খবরদার নামবে না। চুপচাপ বসে থাকো। ‘
সায়েরী ভড়কে গেলো এমন আদেশ পেয়ে৷ ভীতু মুখে চোখ তুলে চাইল সাফ্রিনের দিকে। সাফ্রিন নিজেও দ্বিধায় পড়ে গেল একমুহূর্তের জন্য। সে কি থাকবে, না চলে যাবে? একা একা যেতেও যে সংকোচ লাগছে। তার ভাগ্য বোধহয় সহায় ছিলো। তাইতো, গেইট পেরিয়ে হেসেখেলে প্রবেশ করতে দেখা গেলো নীতি,রায়ান এবং জিমনকে। তাদের দেখা পাওয়া মাত্র ছুটে পালালো সাফ্রিন। সেই গমন পথের দিকে তাকিয়ে মুখ ভাড় করে ফেললো সায়েরী। এ কেমন বান্ধবী পালছে সে! তাকে সাক্ষাৎ যমের মুখের ফেলে এভাবে পালিয়ে যেতে পারলো মেয়েটা! একটাবার ফিরেও তাকালো না৷ এ কেমন বেঈমানী!
গাড়ির চারধারের খোলা কাঁচ গুলো ধীরে ধীরে উপরে উঠলো। কিঞ্চিৎ ফাঁকফোকর রইলো না, যেদিক দিয়ে বাহিরে হতে ভেতরের দৃশ্য দেখা যাবে। কালো কাঁচগুলো উঠে যেতেই আবছা আলোয় পরিণত হলো ভেতরটা। আকস্মিক এই পরবর্তনে সায়েরীর বুকের ভিতরটা ছটফটিয়ে উঠলো। চট করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো সে। সাফওয়ান ততক্ষণে ড্রাইভিং সিট ছেড়ে বেরিয়েছে। বিল্ডিংয়ের নিচে মোটামুটি খোলা স্থানটার ঠিক দক্ষিণ পাশেই পার্কিং-এর জন্য বড়সড় গ্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। এদিকটায় মানুষজনের আনাগোনা নেই বললেই চলে। তবুও সতর্ক চোখে চতুর্দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে চট করে ব্যাক সিটের দরজা খুলে ভেতরে গেড়ে বসলো সাফওয়ান। ধপাস শব্দে দরজা বন্ধ হতেই সায়েরীর নাজুক তনু কেঁপে উঠলো। পালনোর জন্য দরজা খুলতে উদ্যত হওয়া হাতখানা জমে গেলো সেই স্থানে। মাথা ঘুরিয়ে ফিরে তাকালো মেয়েটা। একজোড়া নিরব,শান্ত কিন্তু ক্রোধান্বিত দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে তার দিকে। মানুষটা ঝুঁকে আসতে চাইলেই সে তড়িঘড়ি করে সাফাই গাইতে চাইলো,
‘ আ-আমার কথাটা আগে শুনোন.. ‘
সাফওয়ান ঝুঁকে এলো অনেকাংশে। হাত বাড়িয়ে টাশ করে লাগিয়ে দিলো কিঞ্চিৎ ফাঁক হওয়া গাড়ির ধার। তার শীতল চাহনি তখনো স্থির হয়ে আছে বুকের নিচে কাঁচুমাচু মুখে বসে থাকা মেয়েটার উপর। দরজা বন্ধ করামাত্রই বলিষ্ঠ হাতে সায়েরীর সরু কোমর পেঁচিয়ে ধরলো সে। দ্বিধান্বিত নজরে মেয়েটা চোখ তুলে চাইতেই গমগমে গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ যখন বলা উচিত ছিলো তখন বলোনি। এখন শুনে কি করবো? ‘
সায়েরী চুপসে যায়। ঘনঘন পলক ঝাপটে ধাতস্থ করে নিজেকে। আজ এখানে আসার অন্যতম কারণ তো এই রাগী মহাশয়ের রাগ ভাঙ্গানো। তাই হাজার উষ্কানি-ধমকানি হজম করে হলেও রাগ ভাঙ্গাতেই হবে। যেভাবেই হোক না কেনো। আপনমনে সাহস সঞ্চার করে পুণরায় মুখ তুললো সে। মিনমিন কন্ঠে শুধালো,
‘ সাডেন প্ল্যান ছিলো৷ তোহার বার্থডে ছিলো বলে ওর আবদারেই গিয়েছিলাম। সবাই একসাথেই তো ছিলাম। অন্য কোনো সমস্যা হয়নি। শুধু আ-মি.. ম-মানে আমি ওখানের ভবন থেকে নামার সময় সিড়িতে হোচট খেয়েছিলাম এ-একটু.. ‘
নিজের ঘটানো আরও এক গন্ডগোলের বর্ণনা দিতে গিয়ে কথা হারিয়ে ফেললো মেয়েটা। দৃষ্টি লুকিয়ে নিলো অপরাধীর ন্যায়। সাফওয়ান দাঁতে দাঁত পিষে উপচে পড়া ক্রোধ টুকু গিলে নিল। ডান হাত গলিয়ে দিল সায়েরীর বাম ঘাড়ে। চুলের ভাঁজে ঢাকা পড়া ক্ষতচিহ্ন টুকু ছুঁয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
‘ একটুখানি হোচটের নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি। দুটো দিন ঘাড় নাড়াতে পারোনি। আর পা.. ‘
বলতে না বলতেই সরে বসলো সে। ” দেখি পা দেখাও ” একথা মুখে বললেও সায়েরীর দেখানোর অপেক্ষা টুকু আর করলো না। নিজেই টেনে নিলো মেয়েটার ডান পা। হিল পরিহিতা, চোট পাওয়া পা-টা সাফওয়ানের উরুতে ঠাই জমাতেই হকচকিয়ে গেলো মেয়েটা। বিস্মিত হয়ে হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ আল্লাহ্! ক-কি করছেন কি? পায়ে হাত দিচ্ছেন কেনো? ‘
তার এমন প্রতিক্রিয়ার দিকে বিন্দুমাত্র ধ্যান দিলো না সাফওয়ান। বরংচ গোড়ালি হতে হিলের বেল্ট খুলতে গিয়ে এক ঝাড়ি মারলো,
‘ এই চোট নিয়েও হিল পরতে কে বলেছে তোমাকে? ডাক্তার বলেছিলো না বেড রেস্টে থাকতে? তাহলে এসব ফালতু জুতা পরেছ কেনো? ‘
পুণরায় এমন ঝারি শুনে গুটিয়ে গেল সায়েরী। আমতাআমতা করে বললো,
‘ ও-ওখানে শুধু একটু কেটে গিয়েছি। মোচ লাগেনি। ‘
প্রতিউত্তর শুনে ভ্রুঁ কুঁচকে এলো সাফওয়ানের। ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে রাখা স্থানে বুলিয়ে দেওয়া আঙ্গুলের সঞ্চালন থামলো। সন্দিহান কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
‘ আমাকে তবে মিথ্যে বলেছিলে? ‘
ধরা পড়ে গিয়ে এদিক সেদিক নজর ঘোরালো সায়েরী। আবছা কন্ঠে জবাব দিল,
‘ তা নাহলে আপনি বাউন্ডারি টপকে আবারো ছাদে চলে আসতেন। এজন্যই তো মিথ্যে বলতে হয়েছে। ‘
জবাব শুনে সাফওয়ানের দুই চোখে কিঞ্চিৎ বিষ্ময় ভাব ফুটে উঠেছে। ফ্যালফ্যাল নজরে বোকাসোকা মেয়েটার পানে চেয়ে সে ভাবলো,
‘ ওরে মাথামোটা! আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে চালাকিও শিখে ফেলছো তবে! ‘
কিন্তু মুখের গাম্ভীর্য ভেদ করে একথা আর বের হলো না। গম্ভীরমুখে সায়েরীর চোট পাওয়া পা-টা নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলো সে৷ সফেজ ব্যান্ডেজ মুড়িয়ে থাকা গোড়ালিতে আলতো চাপ দিতেই ব্যথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা। সহসা সাফওয়ানের শান্ত মেজাজ পুণরায় ধপ করে জ্বলে উঠলো। চাপা স্বরে গর্জে উঠলো রীতিমতো,
‘ ব্যান্ডেজের উপর এখনো লাল ছাপ দেখা যাচ্ছে৷ আর তুমি বলছো সামান্য চোট! এ্যাঁই তোমাকে ঘুরতে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছিলো কেউ? আমাকে তো দূর, ফ্যামিলিতেও কাউকে না জানিয়ে কোন সাহসে বেরিয়েছিলে? নিজের খেয়াল তো রাখোইনি, ফিরেছো হাতে পায়ে চোট নিয়ে। তারউপর আবার ফোনটাও অফ করে রেখেছো দুই দিন ধরে। এতো বেশি দুঃসাহস বেড়েছে, হ্যাঁ! আমাকে ইগনোর করছো তুমি! আমি তেহজিব খান’কে!! ‘
রাগত্ব স্বরের এহেন গর্জন শুনে অন্তরাত্মা লাফিয়ে উঠলো সায়েরীর। সীমাহীন ভয়ে, তীব্র অভিমানে মেয়েটা ফুঁপিয়ে উঠলো। জেদ দেখিয়ে নিজের পা-খানাও গুটিয়ে ফেললো তৎক্ষনাৎ। এই কান্নায় সাফওয়ানের রাগ বোধহয় আরও খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। চোখের পলকে সে পুণরায় ঝুঁকে এলো। স্বভাবগতভাবেই ডান হাত বাড়িয়ে চেপে ধরলো ক্রন্দনরত মেয়েটার ফুলো গালদ্বয়। নিজের মুখোমুখি টেনে নিয়ে ফের ধমকে উঠলো,
‘ একদম চুপ! কান্না থামাও। বারবার বলেছি, আমার কাছ থেকে পালাই পালাই করলে ফলাফল বড্ড খারাপ হবে। ওয়ার্নিং করেছিলাম না? তা-ও এতো সাহস কোথা থেকে এসেছে? বেশি মাথায় চড়িয়ে ফেলেছি না? আরেকবার যদি এই দুঃসাহস দেখাও, তাহলে মাথায় তুলে আছাড় মারবো। ইডিয়ট! ‘
কান্নার দমকে সায়েরীর তনু কাঁপছে। ঠোঁট জোড়াও কাঁপছে তিরতির। টলমলে নজরে চেয়ে, তীব্র জেদি মেয়েটা আচমকা দুইহাতে ধাক্কা দিলো সাফওয়ানের চওড়া বুকে৷ অটল, বলিষ্ঠ দেহটি বিন্দুমাত্র নাড়তে না পেরে তার ভীষণ রাগ হলো। জোর করে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, নিজের গাল ছাড়িয়ে নিলো সে। ক্রন্দনরত গলায় পাল্টা চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ তা নাহলে আর কি করতাম? আপনি তো জানেন শুধু আমাকে ধমকাতে। সেদিন রাতেও কোন কিছু না জেনে এতগুলো ধমক দিয়েছেন। আমি অসুস্থ ছিলাম, তাও বকেছেন। আমার একটা কথাও শুনতে চাননি। এখনও শুনতে চাচ্ছেন না। আ-আমি কি ইচ্ছে করে নিজের গায়ে চোট টেনে নিয়েছি নাকি! ওটা একটা এক্সিডেন্ট ছিলো। আমার কি দোষ! আমাকে কেনো কথা শোনাচ্ছেন?
সায়েরীর কন্ঠ ভঙ্গুর। অভিযোগের ভীড়ে লুকায়িত আছে একছত্র অভিমান। প্রেমিক পুরুষটা কি ঠাহর করতে পারলো তা! কে জানে। সায়েরী বুঝতে চাইলো না সেসব। বাম হাতের উল্টো পিঠে গাল মুছে নিজের পায়ের দিকে ঝুঁকে এলো সে। জুতোর বেল্ট আটকাতে গিয়ে আপনমনে বিড়বিড় করলো,
‘ আমার ভুল হয়েছে যে আপনাকে বোঝাব বলে এখানে এসেছি। কিছু বলবো না আর। কোনো কৈফিয়ত দিবো না। আম-আমি থাকবই না এখানে। এক্ষুনি বাড়ি ফি.. আহ!!! ‘
আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে দরজা খুলতে উদ্যত হয়েছিলো সায়েরী। তবে পারলো কই! পেছন হতে তার বাহুতে হেচকা টান পড়লো। পূর্বের মতোন ঝুঁকে এসে, কিঞ্চিৎ ফাঁক হওয়া দরজাটা পুণরায় লাগিয়ে দিলো সাফওয়ান। সায়েরী কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল সবে, কিন্তু সাফওয়ানের আরও এক রাম ধমকের নিচে মেয়েটার মিনমিনে কন্ঠস্বর টুকু মিলিয়ে গেলো। কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো পুরুষালী, ভারী কণ্ঠটির হুমকি শুনে,
‘ চুপচাপ বসো, ইডিয়ট! এখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে সত্যিই মাথায় তুলে আছাড় মারবো। ‘
সেই একই সুরের, চিরচেনা হুমকি। সায়েরী শুনেও বিশেষ গায়ে মাখলো না। নাক টেনে টেনে ফোঁপাচ্ছে সে। বাহু ছাড়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি করছে দেখে তা ছেড়ে দিলো সাফওয়ান। কিন্তু মেয়েটাকে একটুও সরে যেতে দিলোনা। বাহু ছাড়ার পরমুহূর্তে একহাতে জড়িয়ে ধরলো ধনুকের মতোন বাঁকানো, পাতলা কটিদেশ। অন্যহাতে সায়েরীর বাম ঘাড়ে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিলো। সুক্ষ্ম চোখে অবলোকন করলো ক্ষতচিহ্ন। বিউটি বোনের তিন ইঞ্চি উপরে একটি ওয়ান-টাইম ব্যান্ডেজ লাগানো। এবং গলা ঘাড় সংলগ্ন স্থানে একটি কালসিটে দাগ। আলতো হাতে সেসব ছুঁয়ে দেখলো সাফওয়ান। ঝুঁকে এলো আরও অনেকটা। ব্যান্ডেজ লাগানো স্থানে আলতো চাপ দিতেই চোখ খিচল সায়েরী। কিন্তু শব্দ করলো না কোন। তার মুখভঙ্গি দেখে, ঘাড়ের কাছে তপ্ত শ্বাস ফেলে সাফওয়ান জানতে চাইলো,
‘ আর কোথায় কোথায় ব্যথা পেয়েছো? ‘
অভিমানে মুখ ফিরিয়ে রাখা মেয়েটা প্রতিউত্তর করলো না কোন। সাফওয়ান আন্দাজে হাত বোলালো তার কোমল পৃষ্ঠদেশে। বাম পাশের ত্রিকোণ হাড়টিতে মৃদু চাপ পড়তেই ব্যথায় অস্পষ্ট আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা। সিড়ির কোণায় পড়েছে বলে হাড়ে মাত্রাতিরিক্ত ব্যথা পেয়েছে। তার চুপসানো মুখভঙ্গি দেখে ফুঁস করে শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। তার নত মস্তক এবারে সম্পূর্ণ নুইয়ে এলো। ঠাই জমালো প্রেয়সীর ছোট্ট কাঁধে। দুইহাতে মেয়েটাকে জড়িয়ে নিলো বুকের মধ্যিখানে। তার কন্ঠ শোনালো আমাবস্যার মতো আবছা,
‘ আমাকে অশান্তিতে রেখে কি মজা পাও তুমি, সুবহা? সামনের উইক থেকে আমার ফাইনাল এক্সাম। সেদিকের স্ট্রেস, তোমাকে আগের মতো রোজ সময় দিতে পারবো না সেই স্ট্রেস, তোমার ক্যারিয়ারের বাড়তি স্ট্রেসটুকু ও আমিই নিয়েছি। সব কিছু ফেলে তোমাকে শুধু নিজের খেয়াল রাখার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। আর তুমি! তুমি সেটাতেও গুরুত্ব দিচ্ছো না। উল্টো আমাকে জেদ দেখিয়ে ফোন অফ করে রেখেছো। এই দুটো দিন কেমন করে কাটিয়েছি কোনো আইডিয়া আছে তোমার? আমাকে আর কবে বুঝবে তুমি? ‘
ক্ষণিক পূর্বে সিংহের ন্যায় তর্জন গর্জন করে, মুহুর্তেই কন্ঠের এহেন পরিবর্তন শুনে সায়েরী স্তব্ধ বনে গেলো। সাফওয়ানের কন্ঠে একবুক হতাশা, আক্ষেপ,অভিযোগ। যার গভীরতা উপলব্ধি করতে পেরে সায়েরী মিইয়ে গেলো। নিজের কোমল দুইহাতে আগলে নিলো প্রসস্থ, বলিষ্ঠ পৃষ্ঠদেশ। নিজের করা ভুলগুলো পুণরায় ঘেটে দেখলো সে। তিন দিন পূর্বে জন্মদিন ছিলো তোহার। আহামরি কোন সেলিব্রেশন করবে না বলেছিলো বিধায় বন্ধুরা কোন আয়োজন করেনি। কিন্তু বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ হুট করে পরিকল্পনা করা হলো ঘুরতে যাওয়ার। নারায়ণগঞ্জের “জিন্দা পার্ক” ছিলো তাদের গন্তব্য। আসতে, যেতে এবং ঘুরতে বড়জোর ৫ঘন্টা লাগতো। কলেজ টাইমেই ফিরে আসা যাবে ভেবেই কেউই পরিবারের কাউকে জানালো না।
কেবল নাজরাত জানিয়ে রেখেছিলো সাদিফকে। বিশেষ কোন বাধা ছিলো না বলেই ছয় বন্ধুবান্ধব ছুটে গিয়েছিলো জিন্দা পার্কে। ঘন্টা দেড়েক ঘুরার পর, সেখানেরই পুরনো এক ভবন পরিদর্শন করে নেমে আসার সময় ঘটলো বিপত্তি। ছটফটে স্বভাবের সায়েরী বেখেয়ালিতে হোচট খেলো। গড়াগড়ি খেয়ে এসে পড়লো সিড়ির শেষ ধাপে। ঘাড়ে, পিঠে এবং পায়ে ভীষণ বাজে রকমের আঘাত পেলো। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ফ্র্যাকচার হয়নি কোথাও। বন্ধুরা তৎক্ষনাৎ চিকিৎসা নিয়েছিলো। ফিরে এসেছিলো যার যার নীড়ে। সায়েরী নিজ থেকে কিচ্ছুটি জানায়নি সাফওয়ানকে। খুব সম্ভবত সাফ্রিন কিংবা আয়ানের মাধ্যমে খোঁজ পেয়েছিলো সে৷ একে তো না জানিয়ে গিয়েছে, তন্মধ্যে ফিরে এসেছে চোট নিয়ে। যার কারণে বেজায় চটে গিয়েছিলো ছেলেটা। ফোনকলে একগাদা বকাঝকা করেছে। ব্যথায় অতিষ্ঠ সায়েরী অভিমানে বাধ্য হয়ে ফোন সুইচড অফ করে রেখেছিলো। তাইতো, সাফওয়ানের রাগের পারদ বৃদ্ধি পেয়েছে আরও একধাপ। সায়েরী বুঝতে পারলো, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করাটা উচিত হয়নি। একাধিক চিন্তার মাঝে আকস্মিক সায়েরীর আঘাত পাওয়ার কথা শুনেই রাগারাগি করেছে কিছুটা। যা তখন বুঝতে না পারলেও এই মুহুর্তে বেশ ভালো করে উপলব্ধি করতে পারলো মেয়েটা। অনুশোচনায় ভুগে সে ক্ষীণ সুরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমি বুঝতে পারিনি এভাবে পড়ে যাবো। অতো বেশি ব্যথাও লাগেনি। কিন্তু আপনি বেশি বেশি বকেছেন কেনো? আমি ব্যথা পেয়েছিলাম। আপনার উচিত ছিলো একটু আদর করে কথা বলা। ‘
সাফওয়ান ধারণ করেছিলো সায়েরী স্যরি বলবে, ঠিকঠাক চলার আশ্বাস দিবে। কিন্তু মেয়েটা কিনা দাম্ভিক সুরে তাকে উচিত অনুচিতের জ্ঞান দিচ্ছে! আশ্চর্য চোখে মুখ তুলে তাকালো সে। তার চাহুনি দেখে বিব্রত হলো সায়েরী। বললো,
‘ এ-এভাবে তাকচ্ছেন কেনো! আচ্ছা.. এবার থেকে খুব খুব কেয়ারফুল হবো। আপনাকে আর কোন বাড়তি স্ট্রেস দিবো না। সত্যিই.. ‘
সাফওয়ান প্রতিক্রিয়াহীন চোখে তাকিয়ে। নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
‘ তোমার কথায় আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। ‘
বিশ্বাস নেই! অকপটে বলা কথাটা শুনে খানিক অপমানিত হলো সায়েরী। অবিলম্বে ঠোঁট ফুলিয়ে মুখ তুললো। দৃঢ় স্বরে ফের বললো,
‘ বিশ্বাস না থাকলে অর্জন করে নিবো। বললাম তো এখন থেকে ঠিকঠাক চলবো। আচ্ছা.. প্রমিস ও করছি। হাত দিন..
বলতে না বলতেই নিজের কোমরে জড়িয়ে থাকা সাফওয়ানের ডান হাতটি টেনে নিলো সে। পুরুষালী হাতের মোটাসোটা আঙ্গুল গুলোর মধ্যে থেকে কনিষ্ঠ আঙ্গুলের সঙ্গে পেঁচিয়ে নিলো নিজেরর সরু, ছোট্ট কনিষ্ঠ আঙ্গুল। মিষ্টি হেসে পুণরায় বললো,
‘ এইতো, পিংকি প্রমিস। আজ থেকে আপনাকে একটুও অভিযোগের সুযোগ দিবোনা। আমার ক্যারিয়ারে স্ট্রেস ও হাফ হাফ ভাগ করে নিবো।চলবে? ‘
নাটক, সিনেমার মতো নাটকীয় কান্ড। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান ভাবলো, এই মুহুর্তে যদি এমন কান্ড অন্য কেউ ঘটাতো, তবে সে নির্ঘাত নাক মুখ কুঁচকে বলতো, ন্যাকামি!
কিন্তু মেয়েটা সায়েরী বলেই তার কাছে বেশ কিউট লাগলো দৃশ্যটা। মেয়েটার কথাগুলো শুনে হাসিও পেলো বেশ। কিন্তু হাসলো না সে। কেবল মাথা নেড়ে সায় জানালো। অর্থাৎ, চলবে।
সায়েরী খুশিতে গদগদ হয়ে গেল এটুকু সম্মতিতে। সরে আসলো সাফওয়ানের বাহুবন্ধনী হতে।
‘ দেরি হচ্ছে তো। চলুন এবার ভেতরে যাই। সবাই কি না কি ভাববে! ‘
চিন্তিত সুরে কথাটা বলে সাফওয়ানের দিকে ফিরে তাকালো সে। মানুষটা এক ধ্যানে তাকিয়ে। এমন মাদক মাদক চাহুনির কবলে পড়লে বরাবরই সায়েরীর নাজুক হৃদয়ে ঝড় বয়ে যায়। আজও ব্যতিক্রম হলো না। গালজোড়া উষ্ণ হয়ে উঠছে বুঝতে পেরে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিলো সে। গাড়ি ছেড়ে বেরুতে চাইলে, এবারেও ব্যর্থ হলো। অনুভব করলো আঘাত প্রাপ্ত ঘাড়ে সাফওয়ানের শীতল হাতের স্পর্শ। পূর্বের চেয়ে যে এই স্পর্শের উদ্দেশ্য ভিন্ন, তা ঠাউর করতে পেরে শিউরে উঠলো মেয়েটা। ফাঁকা ঢোক গিয়ে ফিরে চাইলো সাফওয়ানের দিকে। জড়িয়ে আসা কন্ঠে বললো,
‘ ভ-ভেতরে যাবেন না? ‘
সাফওয়ান ঝুঁকে এলো খানিকটা। সায়েরী ঘাড়ে আঙুল ছুঁয়ে রাখা অবস্থাতেই, শীতল সুরে আওড়াল,
‘ এই পার্পল মার্ক দেখলে আমার বন্ধুরা কি ভাববে বলো তো! ইট সিমস লাইক, আই লেফট মাই সিগন্যাচার অন ইউ। ‘
বাক্যের মর্মার্থ বুঝতে পেরে মুহুর্তেই গাল উষ্ণ হয়ে উঠলো সায়েরীর। কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে। তীব্র লজ্জায় ফুলে উঠেছে দুই গাল। আরক্তিম মুখে গুটিয়ে যেতে চাইলো মেয়েটা। তরতরিয়ে প্রতিবাদ জানালো,
‘ মোটেও এসব উল্টো পাল্টা ভাববে না কেউ। সবাই জানে আমি ব্যথা পেয়েছিলাম। ‘
প্রতিউত্তরে কিঞ্চিৎ ঘাড় বাঁকালো সাফওয়ান। আড়াআড়িভাবে ভ্রুঁ তুলে বললো,
‘ গ্রেট! এমন আরও দুই একটা মার্ক হলেও কেউ কিছু ভাববে না তবে? ‘
‘ উঁহু। কেনো ভাব.. ‘
আনমনে প্রতিউত্তর করতে আচমকা থমকালো সায়েরী। ড্যাবড্যাব চোখে দৃষ্টি ফিরালো সাফওয়ানের দিকে। হকচকিয়ে উঠে বলতে উদ্যত হলো, ‘ ক-কি? কি বললেন? ‘
দুর্ভাগ্য বশত তার বাক্যটুকু আর পূর্ণতা পেলো না৷ ঠোঁটের কোণে দুর্বোধ্য হাসি ফুটিয়ে তাকিয়ে থাকা মানবটা বিনা কোনো সতর্কবার্তা দিয়ে হুট করে হামলে পড়লো সায়েরীর কোমল দেহশ্রীর উপর। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মেয়েটা সিটে পড়ে যেতে উদ্যত হলে, তৎক্ষনাৎ তার পৃষ্ঠদেশ জড়িয়ে ধরলো একটি পুরুষোত্তম, বলিষ্ঠ হাত। যা আগলে নিয়েছে তাকে। অপরদিকে নিজের ভারসাম্য রক্ষার্থে দানবীয় হাতের তালু দিয়ে ভর দিয়েছে গাড়ির কালো কাঁচে। আকস্মিক আক্রমণে দেহের নিয়ন্ত্রণ খুইয়ে ফেলা সায়েরীর দেহের পশম দাঁড়িয়ে গেল, যখন উপলব্ধি করলো বিনা নিমন্ত্রণে সাফওয়ানের শীতল অধর যুগল বিচরণ চালাচ্ছে তার উন্মুক্ত ঘাড়ে। নাক,মুখ সব ডুবিয়ে ভীষণ আবেশে এক গভীর চুমু বসিয়েছে স্থানটাই। স্পর্শের গভীরতা অনুভব করতে পেরে সায়েরী শ্বাস ফেলতেও ভুলে গেলো। আবেশে বুজে এলো আঁখিযুগল। অবচেতনে তার দুইহাত খামচে ধরেছে সাফওয়ানের বাহু, ঘাড়। এক মুহুর্তের জন্য থমকে যাওয়া বক্ষস্পন্দন দ্বিগুণ বেগে ছুটা আরম্ভ করলো, যখন উপলব্ধি করলো সিক্ত অধর যুগল এলোপাথাড়ি চুমু বসাচ্ছে তার গ্রীবাদেশ জুড়ে। এহেন বেসালাম স্পর্শে শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে চলেছে মেয়েটার। এই পর্যায়ে দেহশ্রী জমে এসেছে পূর্বের চেয়েও কঠোরভাবে। তার অবস্থা অবলোকন করে কণ্ঠনালিতে এক গাঢ় চুমু খেলো সাফওয়ান। তপ্ত শ্বাস ফেলে, গ্রীবায় অধর ছুঁয়ে রেখেই হাস্কি স্বরে আওড়াল,
‘ ব্রিথ, সুইটহার্ট! ‘
কন্ঠটা শুনে তৎক্ষনাৎ আটকে রাখা শ্বাস টুকু ছাড়লো সায়েরী। এতক্ষন যাবত মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলো। ঘনঘন শ্বাস ফেলে, এই পর্যায়ে কম্পিত হাতে সে সাফওয়ানের বাহু ঠেলে সরানোর প্রয়াস চালালো। কিন্তু বিন্দুমাত্র সফল হলো না। বরংচ পুণরায় আরও একটি আক্রমণের শিকার হয়ে পূর্বের চেয়েও দ্বিগুণ শক্তিতে খামচে ধরলো প্রেমিক পুরুষটার ঘাড়, বাহু। অস্পষ্ট কন্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো,
‘ উঁ-হ-হু!! লাগছে.. ‘
গলা, ঘাড় সংলগ্ন স্থানে লাল-কালো তিল দুটোর উপর দন্ত স্পর্শের এক কঠিন ছাপ বসিয়েছে সাফওয়ান। তাতেই মেয়েটা আর্তনাদ করে উঠেছে যন্ত্রণায়। কামড় দেওয়া স্থানে ভেজা ঠোঁটে ঝটপট চুমু খেলো সাফওয়ান। কিন্তু মুখ তুললো না তখনো। গ্রীবায় নাক ঘষে, নিবিড়ভাবে মুখখানা ডুবিয়ে নিলো মাখনের ন্যায় নরম ত্বকে। এক গভীর শ্বাস টানার পর শোনা গেলো তার আবছা, নেশাতুর কন্ঠস্বর,
‘ উম্মম.. হাউ ডু ইউ অলওয়েজ স্মেল দিস পারফেক্ট, সুইট চিকস? ‘
সাফওয়ানের কন্ঠটি সমুদ্রের ন্যায় গভীর, অনেকটা ভঙ্গুর। শ্বাস টেনে টেনে বলা কথাটা সায়েরী শুনলো ঠিকই। কিন্তু মন- মস্তিষ্ক জমে আছে বলে সে কিচ্ছুটি ঠাউর করতে পারলো না সে। কেবল ডুবে রইলো টালমাটাল অনুভূতির জোয়ারে। দম আটকে এসেছে ফের একবার। কোমল দেহশ্রীর প্রতিটি লোমকূপ দন্ডায়মান। বন্ধ চোখ দুটোর পাতা কাঁপছে তিরতির। একই সঙ্গে নিউড শেইডের লিপস্টিক লাগানো অধর জোড়াও কাঁপছে। এই শীতের দিনেও উষ্ণতা ছড়াচ্ছে দেহ। তাকে এমন জমে যেতে দেখে মুখ তুলল সাফওয়ান। গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্রুত মেয়েটাকে সোজা করে বসিয়ে দিলো। সহসা বুক ফুলিয়ে এক বৃহৎ শ্বাস টানলো সায়েরী। কিন্তু তখনও সে স্থির নেই। মাত্র দুই একটি গভীর চুম্বনের মাধ্যমে শরীরের সবটুকু শক্তি সাফওয়ান শুষে নিয়েছে, এমনই প্রতিক্রিয়া তার। যা দেখে চট জলদি গাড়ির ধার খুলে নেমে দাঁড়ালো সাফওয়ান। পরপরই তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটির উপর নিজের ছোট্ট হাত গলিয়ে দিয়ে সায়েরীও বেরিয়ে এলো। বদ্ধ গাড়ির বাহিরে কদম ফেলামাত্র, মুক্ত বাতাসে প্রাণ ফিরে পেয়েছে এমন করেই শ্বাস টানলো সে। পুণরায় ঘাড়ে স্পর্শ পেয়ে দৃষ্টি তুলল তৎক্ষনাৎ। পিঠে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো দিয়ে তার ঘাড় ঢেকে দিচ্ছে সাফওয়ান। তার ঠোঁটের কোণে কৌতুকপূর্ণ হাসির আভাস। যেনো সায়েরীর এহেন দশা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। লজ্জায় গাল গরম হয়ে উঠলো সায়েরীর। সাফওয়ানের হাতটা ঝারি মেরে, নিজ ঘাড়ে হাত বুলালো সে। থমথমে গলায় বললো,
‘ ছাড়ুন। চুরি করে মাল ঢাকতে এসেছে! কেউ দেখলে কি ভাববে? আপনি তো ছুঁয়ে দিলেই ছাপ রেখে যান। ‘
অবচেতনে বলা কথাটা শুনে সাফওয়ান মৃদু ছন্দে হেসে ফেললো। ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে একেবারে দেহ ছুঁই ছুঁই হয়ে দাঁড়ালো। পুণরায় সায়েরীর ঘাড়ে দৃষ্টি বুলিয়ে নির্লিপ্ত গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ ভাববে কেনো? তুমিই বলেছিলে, সবাই জানে যে তুমি ব্যথা পেয়েছো। ‘
সায়েরী লজ্জা মুখে আড়চোখে ফিরে তাকায়। গাল ফুলিয়ে মিনমিন কন্ঠে অভিযোগ জানায়,
‘ তাই বলে এখানে..এ-এভাবে!! ‘
প্রেমিকার লাজুক মুখ খানায় দৃষ্টি ফেলে নিজের দেওয়া চিহ্নটিতে আঙ্গুল ছোঁয়াল সাফওয়ান। অত্যন্ত নিচু,কিন্তু ভরাট কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,
‘ তোমার বাটারি স্কিনে সফট অ্যান্ড জেন্টাল টাচ দিয়ে মন ভরে না তো, জান। এজন্যই সবসময় দূরে দূরে থাকি। এই বিউটি বোন আর তিল দুটো কতোটা অ্যাক্ট্রাকটিভ জানো তুমি? চুমু দিতে গিয়ে খে…উমম!! ‘
সাফওয়ানের অশালীন বাক্যটুকু সমাপ্ত হলো না। পূর্বেই লজ্জায় লাল,নীল হয়ে উঠা সায়েরী হাত বাড়িয়ে মুখ চেপে ধরলো তার। মেয়েটার মুখশ্রীতে লালছে আভা স্পষ্ট। ডিম্বাকৃতির ন্যায় বড় বড় চোখের দৃষ্টি। সেভাবেই তাকিয়ে সে হতবিহ্বল গলায় বলে উঠলো,
‘ আ-আপনি এমন নির্লজ্জদের মতো কথাবার্তা বলা কার কাছে শিখেছেন? আর..আর এখানে!
এমন ওপেন প্লেসে এসব উল্টো পাল্টা কথা কীভাবে বলছেন? ‘
নিজের ভদ্র-সভ্য প্রেমিক পুরুষটার এহেন অপরিবর্তিত রূপের দর্শন পেয়ে সায়েরী বিষ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে রইলো। অনেকটা চিন্তিতও বটে। তার সাফওয়ান ভাই তো এমন নন। এ কোন সাফওয়ান ভাই দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে!
প্রেয়সীর এমন প্রতিক্রিয়ায় সাফওয়ান মিটিমিটি হাসে। চোখের কোণেও ধরা দিয়েছে হাসির রেখা। সায়েরী চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকে। তাকে এমন লজ্জা দিয়ে আবার হাসছেও! গাল ফুলিয়ে ফের কিছু বলতে উদ্যত হলো সে। পূর্বেই দৃষ্টি আটকালো তাদের অবস্থান হতে বেশ অনেকটা দূর, মেইন গেইটের দিকে। দন্ডায়মান রমনীটিকে দেখে সায়েরীর মুখভঙ্গি পাল্টে গেলো। নিজেকে সে গুটিয়ে নিলো অনেকাংশে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো সাফওয়ান। গেইটের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে ইরিনা। দুইহাত ভর্তি অনেকগুলো শপিং ব্যাগ৷ মেয়েটা বিবশ দৃষ্টিতে চেয়ে ছিলো সাফওয়ান- সায়েরীর দিকে। দুজন যখন গাড়ির ব্যাক সিট থেকে বেরিয়ে এসেছে, ঠিক সেই মুহুর্তেই গেইট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেছিলো ইরিনা।
সাফওয়ানকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলো অবচেতনে। মিনিট দুয়েকের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সে দেখছিলো এক বুক বিষাদ নিয়ে। সাফওয়ানের হাসি, এমন কোমল আচরণ সবটাই একটা সময় স্বপ্ন ছিলো তার। কিন্তু স্বচক্ষে দেখে সে থমকে গিয়েছে। দুই প্রেমিক-প্রেমিকার মিলিত আউট ফিট টাও নজর এড়ালো না তার। সায়েরীর পরিহিতা নেভি-হোয়াইট ড্রেসটির সঙ্গে মিলিয়ে ড্রেসআপ করেছে সাফওয়ান। সবসময় ফুলহাতা টি-শার্ট পরতে অভ্যস্ত বলে, আজও একটি নেভি রঙের টি-শার্ট গায়ে জড়িয়েছে সে। কোমরের কাছে ব্ল্যাকবেল্ট সমেত হোয়াইট গ্যাবার্ডিন প্যান্টের সঙ্গে ইন করেছে টি-শার্ট। পায়েও একজোড়া হোয়াইট স্নিকার্স। হাতা গুটিয়ে কাছে খানিকটা। ফর্সা, লোমশ বাম হাতের কব্জিতে সেই একই মোবাইল ওয়াচটি। কপালে ছড়িয়ে থাকা ঝরঝরে হালকা বাদামী চুলগুলো। বলিষ্ঠ দেহের সঙ্গে আঁটসাঁট হয়ে চেপে থাকা টি-শার্ট এর উপর দিয়েও ফুলে রয়েছে পেশিবহুল দুই বাহু। ইরিনার চোখের পলক পড়ে না যেনো। স্থান কাল ভুলে যে হা করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো। কিন্তু এই মুহুর্তে দুজনকে তার দিকে তাকাতে দেখে হকচকিয়ে গেলো সে। নজর ঘুরিয়ে গটগট পায়ে প্রবেশ করলো বিল্ডিংয়ের ভেতরে।
সাফওয়ানের মুখশ্রী গম্ভীর হয়ে এলো মুহুর্তেই। কপালে ভাঁজ ফেলে সে এগিয়ে গেলো ড্রাইভিং সিটের দিকে। খুলে রাখা জ্যাকেট খানা তুলে নিয়ে পুণরায় গায়ে জড়িয়ে নিলো। অতঃপর গাড়ির ডিকি খুলে একে একে বের করতে লাগলো ক্রয়কৃত জিনিসপত্র সব। তার দুই হাত ভরে গেলো অগণিত শপিং ব্যাগের ভারে। সায়েরী দুই একবার সাধলেও তার হাতে দিলোনা কিচ্ছুটি। তৃতীয় বারে মাহবীরের জন্য ১৬ ইঞ্চি লম্বাকার রিমুট কন্ট্রোল হেলিকপ্টারের বক্সটি ধরিয়ে দিলো। এটা সায়েরী পছন্দ করেছে দেখেই কিনেছে। নয়তো এতো আগে থেকে কিনতো না সাফওয়ান। মাহবীর খেলার যোগ্য হতে যে এখনো ঢের দেরি৷ সব জিনিসপত্র নেওয়া হয়ে গেলে গাড়ি লক করে দুজনে হেঁটে চললো বিল্ডিংয়ের মধ্যে। যেতে যেতে আকস্মিক সায়েরীর কানে এলো সাফওয়ানের গমগমে কন্ঠস্বর,
‘ আজ কোনো আউটসাইডার যদি মিস বিহেভ করে তবে আমাকে নালিশ করতে আসবে না, সুবহা। সোজা চড় লাগাবে। বাদবাকি যা হবে, আ’ল ম্যানেজ। ‘
কথাটা যে ইরিনাকে ইঙ্গিত করে বলেছে, তা বুঝতে বেগ পেতে হলো না সায়েরীকে। কিন্তু কন্ঠের গাম্ভীর্য উপলব্ধি করে কদম ধিমি হয়ে এলো তার। এ কেমন আদেশ! তার প্রেমিক পুরুষটার রিয়েকশন সিস্টেম দেখি এক্কেবারে অটো। লুতুপুতু করতেও দেরি নেই, আবার চটে যেতেও দেরি নেই।
বেলা বারোটা। এই সময়েই একে একে আগমন ঘটছে মেহমানদের। ইরা’র বন্ধুরা শুরুতেই চলে এসেছিলো বলে মেয়েটা একটুখানি স্বস্তি পেয়েছে। খাবারের আয়োজন করা হয়েছে ছাদে। জাদিদের সঙ্গে মিলে সাফওয়ান, রায়ান,জিমন সহ জাদিদের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু তদারকি করছে সব। ঘরের মাঝে ইরাকে হাতে হাতে কাজ গুছিয়ে দিচ্ছে নীতি এবং সাফ্রিন। সায়েরী বেশ কয়েকবার এগিয়ে আসলেও তাকে কিচ্ছুটি করতে দিলো না কেউ৷ অগত্যা সে চুপচাপ বসে কাজ দেখে যাচ্ছে কেবল। যতটা আগ্রহ নিয়ে মাহবীর কে দেখতে এসেছিলো, সবটাই ভাটা পড়েছে। ইরিনা মাহবীর কে কোল থেকে রাখছেই না। সায়েরীর ও রুচি হলোনা মেয়েটার সঙ্গে কথা বলার। তাছাড়া, সে বললেই যে দিয়ে দিবে এমনটাও তো নয়। বাধ্য হয়ে বিরক্ত মুখে মেয়েটা বসে রইলো ডাইনিং রুমে। বাকিদের সঙ্গে টুকটাক আলাপের মধ্যেই হঠাৎ লিভিং রুম হতে ভেসে এলো সাফওয়ানের কন্ঠস্বর। ভরাট কন্ঠে সায়েরীর নাম ধরে হাক ডাকছে সে। এক মুহুর্তের জন্য হকচকিয়ে উঠলো সায়েরী। নীতি,সাফ্রিনের দুষ্টু চাহুনি দেখে লজ্জাও পেলো খানিক। তাকে এমন থতমত খেয়ে বসে থাকতে দেখে নীতি পিঞ্চ মেরে বললো,
‘ যাও সু-ব-হা! আমার বন্ধুটার গলার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে তো। ‘
বলার ধরণ দেখে ফিক করে হেসে ফেললো সাফ্রিন। ইরা নিজেও মিটিমিটি হাসছে। সায়েরী লাজ মুখে দ্রুত উঠে ছুটে গেলো লিভিং রুমের দিকে। পেছনে তখন তিন তিনটা মাথা উঁকিঝুঁকি মারতে ব্যস্ত। দেখতে চাইছে সাফওয়ান-সায়েরীর মধ্যকার আলাপ।
ভর দুপুরে সূর্য উঠেছে বিধায় ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাফওয়ান। তার ঘর্মাক্ত কপাল, লালছে মুখশ্রী দেখে সায়েরী উদ্বিগ্ন হলো। কিছু বলার পূর্বেই সাফওয়ান নিজের জ্যাকেট টা এগিয়ে দিলো তার দিকে। পরপরই পকেট হাতড়ে মোবাইল দুটো এবং ওয়ালেট বের করে সপে দিলো সায়েরীর হাতে। ব্যস্ত গলায় শুধালো,
‘ ছাদে ভীষণ গরম। মানুষ ও কম না। কখন কে হাতিয়ে নিবে টের ও পাবো না। এগুলো রাখো তোমার পার্সে। তুমি ইউজ করলে কারো ফোন রিসিভ করো না৷ ইউজ না করলে ফ্লাইট মুড অন করে রাখো৷ ‘
চঞ্চল কন্ঠে এটুকু বলে পুণরায় একই পথে ফিরে গেলো সে। সায়েরীকে প্রতিউত্তর করার বিন্দুমাত্র সুযোগ টুকু দিলনা। সাফওয়ানের জিনিসপত্র হাতে নিয়ে সায়েরী হতবুদ্ধির মতোন স্থির হয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো যেনো সাফওয়ান নিজের গিন্নিকে ব্যক্তিগত আমানত রক্ষার দ্বায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে। মন গহীনে হিমশীতল হাওয়া বয়ে গেলো তার৷ জ্যাকেটটা বুকে চেপে লাজ মুখে মৃদু হাসলো সে। সেই অবস্থাতেই উল্টো পথে কদম ফিরিয়ে নিলো। এবং হঠাৎই ভড়কে গেলো দেয়ালের আড়ালে বেরিয়ে আসা তিন তিনটি মন্ডু দেখে। নীতির মাথার উপর ইরা, এবং তার উপর সাফ্রিন। শুধুমাত্র মাথাগুলোয় দেখা যাচ্ছে। আগেপিছে কিছু নেই। হঠাৎ করে এমন দৃশ্য দেখে ভয়ে লাফিয়ে উঠলো সায়েরী। বুকে থু থু দিলো দ্রুত। বললো,
‘ তোমরা এমন হয়ে আছো কেনো? ‘
ধরা পড়ে গিয়ে চট জলদি সোজা হলো তিন রমনী। সায়েরী এগিয়ে গেলো তাদের দিকে। ইরা এবং সাফ্রিন দমে গেলেও দমলো না নীতি। সে মিটিমিটি হেসে বলে উঠলো,
‘ দেখতে চাইলাম তোমার মতোন চুনাপুঁটি কীভাবে বোয়াল মাছটাকে সামলাচ্ছে। আমাদের তো ফোনের স্ক্রিনটুকু দেখতে দেয়না। তোমাকে গোটা মোবাইলটাই সপে দিলো! বলছি, কি খাইয়ে হাত করেছো এই রাগব বোয়ালকে? ‘
‘ উহহো, আপু! তুমি আবারো শুরু করেছো! ‘
সায়েরীর মিহি কন্ঠ। অনেকটা লাজে মুড়ানো। নীতি দ্রুত গলায় বিরোধ জানালো,
‘ আবার মানে! আজ এখনো অবধি কিছুই তো বললাম না। এই যে কেউ কেউ আশেপাশে ম্যাচিং ড্রেস কোড পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি দেখে কিছু বলেছি? এই সাফা! বলেছি কিছু? ‘
সাফ্রিন মাথা নাড়ে বোঝাল, একদম না। সায়েরী চোখ পাকিয়ে তাকালো তার দিকে। দুজনের সঙ্গে হুট করে সঙ্গ দিলো ইরাও। হাস্যজ্বল কন্ঠে সে বলে উঠলো,
‘ তোমাকে একটু আধটু বিরক্ত না করলে চলছেই না সায়েরী। বন্ধু হলেও যার ধমকে আমরা চুপসে থাকতাম, ওকে তোমার মতো পুচকি মেয়ে ডেট করছে ভাবলেই আমি অবাক হয়ে যায়। সাফওয়ানের মতো ছেলের মনের মতো চলা তো চাট্টিখানি কথা না। ওর অপছন্দের কিছু ঘটলেই মারাত্মক চটে যায়। সেখানে এতগুলো মাস ধরে তুমি ওর সঙ্গে আছো কীভাবে? একটুও ভয় লাগে না? ‘
সায়েরী হা করে শুনে গেলো সব কথা। সাফওয়ান ভাই এতো বেশি রগচটা! কিন্তু তাকে তো কখনোই কিছু নিয়ে জোর করেনি সে। সায়েরী যেমন, ঠিক তেমন করেই গ্রহণ করেছে তাকে। একমাত্র পড়াশোনা ব্যাতিত অন্য কোনো বিষয়ে নাক গলায়নি সে। যেখানে গোটা সায়েরীটাই তার মাত্রাতিরিক্ত পছন্দ, সেখানে অপছন্দের আর কিইবা খুঁজবে সে!
‘ তুমি অবশ্য ভীষণ ভাগ্যবতী, সায়েরী। সাফওয়ান শুধু আমাদের পাশে ছিলো বলেই আমরা কখনো কোন বিপদ নিয়ে আতংকিত হইনি। সাফওয়ান হলো আমাদের সাহসের এক জলজ্যান্ত নাম। আর তোমাকে তো সে বুকে আগলে বড় করছে। ভাবো তাহলে, তোমার চেয়ে ভাগ্যবতী আর কে আছে এখনে? ‘
ইরা’র দৃঢ় কন্ঠ। তার বলা কথাগুলো মিথ্যেও নয়। প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে, এবং একজন বিচক্ষণ যুবক হওয়ার দরুণ সাফওয়ান বরাবরই এক স্বস্তির স্থান ছিলো বন্ধুদের কাছে। সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান খুঁজে পেতো যার কাছে। তাইতো, সেই মানুষটার প্রিয় মানুষ হিসেবে সায়েরী একটু বেশিই আদুরে তাদের কাছে। ইরা’র কথায় সায়েরী ভেসে যাচ্ছিলো দূর আকাশে। তার উড়ুউড়ু ভাবনার ডানা কেটে গেলো নীতির কন্ঠে,
‘ আজ এক অ-ভদ্র কে ডেট করছি বলে ভাগ্যবতী হয়ে পারলাম না। ড্যাম! সাফওয়ানের উচিত ছিলো আমাকে ডেট করা। ম্যাচিং কালারের ড্রেস না পরে, ম্যাচিং শার্ট প্যান্ট পরতে পারলাম আমরা। শিট!শিট! ‘
এই পর্যায়ে সাফ্রিন-ইরার সঙ্গে সায়েরী নিজেও উচ্চ কন্ঠে হেসে উঠলো। নীতি পুণরায় মুখ খুলছে দেখে সায়েরী দ্রুত পালিয়ে গেলো গেস্ট রুমের দিকে৷ এখানেই তার পার্স রাখা হয়েছিলো। সাফওয়ানের ওয়ালেট এবং এন্ড্রয়েড ফোনটি পার্সে ঢুকিয়ে নিলো সে। আইফোনটি ও ঢুকাতে গিয়ে কি যেনো ভেবে একটু ঘেটে দেখলো। লক স্ক্রিনে একজোড়া হাতের ছবি। মেয়েলি হাত, একগুচ্ছ সাদা গোলাপের বুকে ধরে রেখেছে।
সায়েরী ফিক করে হেসে দিলো ছবিটি দেখে। লকস্ক্রিন বলে সম্পূর্ণ মুখের ছবি দেয়নি, কিন্তু ঠিকই সায়েরীর ছবি লাগিয়ে রেখেছে। ফেইস শো করানো মাত্র আনলক হলো ফোন। হোম স্ক্রিনেও নিজের ছবি দেখে মিটিমিটি হাসলো সায়েরী। নাজরাতের গায়ে হলুদের দিনের ছবি। শাড়ি পরিহিতা অবস্থায় হলুদে লেপ্টানো দুই গাল, মুখ ফুলিয়ে চুল ঠিক করছে। সায়েরী আরও খানিকক্ষণ ঘেটে দেখলো মোবাইলটা। শেষে এসে থামলো সাফওয়ানের একটি ছবি দেখে। ব্ল্যাক টি-শার্ট, জিন্স,জ্যাকেট পড়ে নিজের কালো বাইকটিতে বসে রয়েছে সাফওয়ান। রাতের সড়কের ঝলমলে সফেদ আলোর নিচে থামিয়েছে বাইকটি। মাথা হতে হেলমেট খুলে এলো চুলে ব্যাকব্রাশ করছিলো, ঠিক সেই মুহুর্তের একটি ক্যান্ডিড ক্লিক। কতো সুদর্শন লাগছে দেখতে! আবেগে আপ্লূত হয়ে সায়েরী চট করে চুমু খেয়ে বসলো ছবিতে। আপনমনে স্বগোতক্তি করলো,
‘ ভাগ্যবতী তো আমি বটেই! ‘
ড. অবনী আমিন। একজন ফিজিওথেরাপিস্ট। জাদিদের বাবার হাসপাতালেরই একজন ডক্টর সে। বেশ অনেক বছরের পরিচয় বলে আজ জাদিদের নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে এসেছে মাহবীর কে দেখতে। ছিমছাম গড়নের, বেশ সুন্দর এক রমনী। এসেছেন মিনিট দশেক হলো। ইরা সানন্দে স্বাগতম করেছে তার। এবং সঙ্গে আসা আরও দুই তিনজন নারী- পুরুষের। সকলেই জাদিদের কলিগ৷ ইরা নিজেই খাবার সার্ভ করলো তাদেরকে। সেই সঙ্গে লক্ষ্য করলো অবনী মেয়েটা এক ধ্যানে দেখছে তাকে। মুখজুড়ে কেমন এক বিষন্নতা তার। ইরা’র অস্বস্তি লাগলো বেশ। তবে গুরুতর কিছু ভাবনায় এলো না। হয়তোবা কলিগের বউকে প্রথম দেখছে বলেই এমন করে তাকিয়ে আছে। অল্প সল্প খেয়ে তারা সকলেই রওনা দিলো ছাদের দিকে। একটু ঘুরে ফিরে দেখবে বলে। ইরা তখন ভেতর ঘরে। মাহবীর ছিলো জাদিদের কাছে। হাতের ট্রে খানা মিতুর হতে ধরিয়ে দিয়ে ইরা পুণরায় লিভিং রুমের দিকে এগিয়ে এলো। ভেবেছিলো সকলে ছাদে চলে গিয়েছে। কিন্তু নাহ। তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো লিভিং রুম হতে ভেসে আসা এক মেয়েলি কন্ঠে। চঞ্চল কদম আকস্মিক থমকালো তার। স্পষ্ট শুনলো অবনী নামক রমনীটির উদাসীন কন্ঠস্বর,
‘ আপনি সেদিন রাজি হয়ে গেলে এমন একটা বেবি আমাদেরও থাকতো, জাদিদ। হয়তো ওর মতোই, কিন্তু আরও খানিকটা বড়ো। ‘
ইরা’র কানে ঝংকার তুললো উক্ত কয়েকটি বাক্য। অজানা এক আতংকে ঝড় উঠলো বুক জুড়ে। কদম এগোনোর সাহস টুকু কেমন মিইয়ে গেলো। তবুও কৌতুহল বশত সে এগিয়ে গেলো কয়েক কদম। দাঁড়ালো পর্দার আড়ালে। লিভিং রুমে তখন জাদিদ-অবনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ছেলেকে কোলে নিয়ে রাখা জাদিদের মুখে স্পষ্ট অপ্রস্তুত ভাব। সে ভাবেনি অবনী এখানে এসেও এসব কথা তুলবে। মাহবীরের দিকে একপলক তাকিয়ে সে শান্ত সুরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আপনি এখনো ওখানে আটকে আছেন, অবনী? আমাদের মাঝে তো কোন সম্পর্ক ছিলো না যে আপনি দ্বিতীয় কাউকে সুযোগ দিতে পারবেন না। প্লিজ মুভ অন। আর আমি পুণরায় সেসব ব্যাপারে কথা বলতে ইচ্ছুক নই। আমার ওয়াইফ শুনলে ইনসিকিউর হতে পারে। পুরনো কথা টানবেন না, প্লিজ। ‘
বউ শুনলে কষ্ট পাবে শুনে অবনী অদ্ভুত ভাবে হাসলো। জাদিদের সুদর্শন মুখপানে চেয়ে উদাস গলায় বলে উঠলো,
‘ নিয়তি কতো অদ্ভুত, তাইনা জাদিদ? বছরের পর বছর একজন তপস্যা করেও কেউ কেউ নিজের ভালোবাসাকে হাসিল করতে পারে না। অথচ, অন্য একজন বিনা চাওয়ায় সবটা পেয়ে যায়। নিয়তি এমন নিষ্ঠুর হয় কেনো? ‘
জাদিদ নির্বিকারে শুনে গেলো সব। বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া সে দেখালো না। এরই মাঝে চিকন সুরে কেঁদে উঠলো মাহবীর। তাকে বুকে জড়িয়ে জাদিদ বলে উঠলো,
‘ আপনার ভাগ্যে লিখিত সঠিক মানুষটির সন্ধান যখন পাবেন তখন বুঝবেন নিয়তি বর্তমানে কেনো নিষ্ঠুরতা করেছে। সবসময় আমাদের চাওয়া পাওয়া অনুযায়ী জীবন চলে না, মিস অবনী। আপনি ম্যাচিউর একজন মেয়ে। এমন ছেলেমানুষী ব্যাবহার আপনাকে মানায় না। আমার ছেলের প্রোগ্রামে এসেছেন। আশা করবো ওকে দোয়া দিয়ে দিনটা উপভোগ করবেন। বিনা দোষে আপনার আক্ষেপের কোন কলহ আমার সংসারে লাগুক, তা আমি চাইছি না। ‘
অবনী বিব্রত হলো খানিকটা। কিন্তু কথাগুলো সে বুঝেছে ভালো। আলতো হেসে পার্স হতে একটি পাঁচশত টাকার নোট বের করলো সে। গুঁজে দিলো মাহবীরের হাতে। ঐ কোমল হাতখানায় ছোট্ট করে আদরও দিলো। অতঃপর চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে জাদিদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ আপনাকে বিব্রত করার জন্য আমি দুঃখীত, জাদিদ। এতগুলো মাস পর দেখা হয়েছে বলে আমার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। আপনার ছেলে,বউয়ের উপর আমার কোন ক্ষোভ নেই। ওরা তো আপনারই অংশ। আপনার সঙ্গে জড়িত কোনো কিছুতেই আমার ক্ষোভ জন্মায় না। আমি শুধু আমার ভাগ্যের উপর নারাজ হয়েছি। আজ
সেটাও ফিকে হয়ে এসেছে। থ্যাংকস টু ইউ। অন্যকেউ হাজার বলা স্বত্তেও, আপনার মুখ হতে কথাগুলো শোনা বড্ড প্রয়োজন ছিলো। আপনি ভালো থাকুন, আমিও আমার ভালো থাকার কারণ খুঁজে নিবো। আজ আসি..আমার স্বপ্ন পুরুষটার স্ত্রীকে একনজর দেখার বড্ড শখ ছিলো বলেই এসেছিলাম। আমার পেশেন্ট-রা হয়তো অপেক্ষা করছে। আসছি, ভালো থাকবেন। ‘
মিষ্টি হেসে কথাগুলো বলেই সোফা হতে নিজের হ্যান্ড ব্যাগ তুলে নিলো ড.অবনী। জাদিদ তাকে আটকালো না। অবনী লিভিং রুম হতে বের হচ্ছে দেখে ইরা চট জলদি আড়াল হতে সরে গেলো। সোজা গিয়ে থামলো নিজ কক্ষে। সকাল হতে যতটা হাসিখুশি, উচ্ছ্বসিত ছিলো সে। সবটা এখন মিলিয়ে গিয়েছে কোথাও। বুকের মাঝে কিসের যেনো হাহাকার। নিজেকে নিয়ে তৈরি হলো এক হীনমন্যতা।
‘ ইরা! দেখুন তো বীরের ডায়াপার চেঞ্জ করতে হবে কিনা। ও এমন করছে কেনো? ‘
ব্যস্ত পদচারণে রুমে ঢুকলো জাদিদ। ইরাকে উক্ত কথাটুকু বলেই সে মাহবীর কে শুইয়ে দিলো বিছানায়। ইরা নির্বিঘ্নে এগিয়ে গেলো। চেক করে দেখলো, সত্যিই ডায়াপার ভিজিয়ে রেখেছে মাহবীর। সেটা খুলতে গিয়ে গলা ফাটিয়ে কান্না জুড়ে দিলো বাচ্চাটা। জাদিদ দ্রুত সামলে নিলো তাকে। নতুন একটি ডায়াপার নিতে গিয়ে ইরা হুট করে বলে উঠলো,
‘ ড. অবনী আমিনের সঙ্গে আপনার কতদিনের পরিচয়, জাদিদ? ‘
জাদিদ হঠাৎই ভীষণ চমকে উঠলো এই প্রশ্নে৷ ইরা কি কিছু শুনেছে? নয়তো এই প্রশ্নের কারণ কি? আরও কয়েকজন ফিমেল ফ্রেন্ড তো এসেছে তার। তাদের ছেড়ে অবনীকে নিয়েই কেনো প্রশ্ন তুলেছে?
ইরা ফিরে তাকালো। পুণরায় এগিয়ে এলো বিছানার কাছে। জাদিদ বরাবরই নির্ভেজাল মানুষ। সে খানিকটা চমকেছে ঠিক, কিন্তু মোটেও ঘাবড়ায়নি। সরল গলায় সে জবাব দিলো,
‘ চার বছর যাবত চিনি তাকে। যবে থেকে আমাদের..মানে যবে থেকে **** হসপিটালে ইন্টার্ন হিসেবে এলো তখন থেকেই। এখন সেই হাসপাতালের-ই ডক্টর সে। ফিজিওথেরাপিস্ট। অল্প বয়সেই বেশ পপুলার হয়ে গিয়েছে। অবশ্য বেশ ব্রিলিয়ান্ট ও বটে। ‘
আপনমনে খানিকটা সুনাম করলো সে ড.অবনীর। ইরা কান খাড়া করে শুনলো সেসব। ক্ষণিক পূর্বে নিজেকে নিয়ে যে হীনমন্যতা জেগে উঠেছিলো মনে, মুহুর্তেই তা দ্বিগুণ হলো। মনে হলো, ওই অবনী মেয়েটার সম্মুখে সে নিতান্তই তুচ্ছ একজন। জাদিদ এমন সরল গলায় কখনোই তার সুনাম করার মতো কিছু খুঁজে পাবে না। কারণ বিশেষ কোন সফলতা যে কুড়ায়নি ইরা। তবে বলবে কোথা থেকে! বিপরীতে, জাদিদ হলো সব দিক দিয়ে পরিপূর্ণ। অ্যা পারফেক্ট ড্রিম ম্যান। কি নেই তার মধ্যে! কোনো গুণেরই কমতি নেই। অবনী যে বললো, জাদিদ তার স্বপ্ন পুরুষ। এমন আরও কতো মেয়ের যে স্বপ্ন পুরুষ সে, তা গণনাতীত। এমন এক গুণসম্পন্ন, নিখুঁত ব্যক্তিত্ব ধারী পুরুষের সঙ্গে, আদৌ কি ইরাকে মানায়?
আচ্ছা, জাদিদ কি আজ তার বন্ধুদের কাছে ইরার পরিচয় দিতে বিব্রত হয়নি? তার মনে কি কোন সংকুচ কাজ করেনি? অবনী মেয়েটার মতো একজন সফল ডাক্তারকে নিজের পাশে দাঁড় করানোর মতো স্বপ্ন কি কখনো বুনেনি সে? ইরা’কে নিয়ে আদৌ জাদিদ সন্তুষ্ট তো? নামমাত্র সংসারটিতে ইরা তো তাকে কিছুই দিতে পারেনি। কিচ্ছুটি না। বুক উজাড় করা ভালোবাসার বিনিময়ে ইরা কখনো দু’টো ভালোবাসাময় বাক্য বিনিময় ও করেনি। এতো এতো অপূর্ণতা নিয়ে জাদিদ কি আদৌও সুখে আছে? সহ্য ক্ষমতা সীমা ছাড়িয়ে গেলে, সে যদি ইরাকে ছেড়ে যায়! জাদিদের মতো ওয়েল স্টাবলিস্টড ছেলের জন্য তো সঙ্গীর কমতি পড়বে না। কিন্তু ইরা! সে তখন কীভাবে পার করবে গোটা জীবন?
‘ ইরা!! ‘
ভরাট কন্ঠে কাঁধ ঝাকিয়ে ডাকতেই ইরা চমকে উঠলো। কতদূর অবধি ভেবে ফেলেছে সে! হঠাৎ করেই কেমন এলোমেলো লাগছে সব। প্রিয়জন, আপনজন হারানোর মতো নরক যন্ত্রণা একবার ভুগ করেছে বলেই হয়তো, এই ভয়টি এখনো ঝেঁকে আছে মনে। জাদিদ আশ্চর্য হলো ইরাকে এমন স্তব্ধ হতে দেখে। চিন্তিত গলায় জানতে চাইলো,
‘ ইরা! কি হয়েছে আপনার? এমন দেখাচ্ছে কেনো? শরীর খারাপ লাগছে? ‘
ইরা’র হঠাৎ কি জানি কি হলো। টলমলিয়ে উঠলো নেত্রপল্লব। সেই ঝাপসা চোখ মেলে সে তাকালো জাদিদের দিকে। ধরা গলায় আওড়াল,
‘ জ-জাদিদ! আপনি জানেন আমার আর মাহবীরের কাছে আপনি ছাড়া কেউ নেই? ‘
জাদিদ হকচকিয়ে উঠলো আচমকা ইরার এহেন প্রতিক্রিয়ায়। চট করে মুখোমুখি দাঁড়ালো সে। ইরা’র গাল ছুঁয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
‘ আপনি কাঁদছেন কেনো ইরা? কি আশ্চর্য! আজকের দিনে এমন ইমোশনাল হওয়ার কি মানে? আর কি সব প্রশ্ন করছেন! আমি তো আছিই আপনাদের জন্য। ‘
টলমলে অশ্রুটুকু সামাল দিতে চেয়েও ব্যর্থ হলো ইরা। ফুঁপিয়ে উঠলো আচমকা। ইঞ্চি দুয়েক দুরত্বে দন্ডায়মান পুরুষটার বুকে মুখ গুঁজে দিলো হঠাৎ করেই। খামচে ধরলো বুকপকেট। ক্রন্দনরত কন্ঠে আকাশসম বিষাদ ঢেলে বলে উঠলো,
‘ আম-আমি জানি না আমার সঙ্গে কি হচ্ছে জাদিদ। আমার ভীষণ অস্থির লাগছে, ভয় লাগছে। আর যা-ই করুন না কেনো, প্লিজ কখনো ছেড়ে যাবেন না। আর কোন আপনজন হারানোর মতো সহ্য ক্ষমতা নেই আমার মধ্যে। আমার ভালোবাসা, আমার পরিবার সবটাই তো হারিয়ে ফেলেছি। এবার আপনাকে হারালে আমি মরেই যাবো। ‘
হতবিহ্বল জাদিদ এক মুহুর্তের জন্য বুঝে উঠতে পারলো না কিছু। কিন্তু ইরা’র কাঁন্নাটুকু সহ্যও হলো না তার। শুরুতে বুঝতে বেগ পেতে হলেও সেকেন্ড কয়েক পর তার বিচক্ষণ মস্তিষ্ক ঠাউর করলো অনেক কিছুই। ইরার পিঠ জড়িয়ে চুলে হাত রাখলো সে। নিম্ন কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ আপনি অবনী আর আমার কথাগুলো শুনেছিলেন, ইরা? ‘
জাদিদের বুকে মুখ গুঁজে রাখা অবস্থাতেই মাথা দুলিয়ে সায় জানালো ইরা। অর্থাৎ, সে শুনেছে। জবাব পেয়ে বুক ফুলিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো জাদিদ। জোর করে ইরা’র মুখ তুললো। হাত রাখলো ডান গালে। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে থাকা বউয়ের ভেজা গাল মুছে দিল সে। ধীর কন্ঠে বললো,
‘ আমাকে নিয়ে ইনসিকিউর হচ্ছেন, সেটা আমার মোটেও ভালো লাগছে না ইরা। আপনাকে কতোটা ভালোবাসি সেটা আর কতোভাবে বুঝালে বুঝবেন আপনি? ‘
‘ যেমন এক পরিস্থিতিতে আপনাকে বিয়ে করেছি। অন্য কেউ হলে ফিরেও তাকাতো না। আমিও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম ঠিক। কিন্তু স্থির থাকতে পারিনি তো। ভীষণ ভালোবাসি আপনাকে ইরা। কেনো বাসি, সেই কারণ টা নাহয় অন্য একদিন বললো। কিন্তু আজকে এই কান্নাকাটি বন্ধ করুন, প্লিজ। এসব নিয়ে পরেও কথা বলা যাবে। আমাদের ছেলের এতো সুন্দর একটা দিন স্পয়েল হোক সেটা নিশ্চয়ই চান না আপনি? ‘
ইরা ফের মাথা নেড়ে বুঝালো, চাইনা। জাদিদের কথাগুলো শুনে সে সন্তুষ্ট-ও হলো বেশ। সবে মাত্র একটু একটু করে জাদিদকে, এই সংসারটাকে আপন করে নেওয়ার জন্য মনস্থির করেছিলো সে। এমন মুহুর্তে অবনী মেয়েটার কথাগুলোই সে ঘাবড়ে গিয়েছিলো ভীষণ। কিন্তু জাদিদ সুন্দর ভাবে বুঝাতেই সে বুঝ পেয়ে গেল। খানিকটা ধাতস্থ হওয়ার পর নিজের অবস্থানের দিকে খেয়াল হতেই খানিকটা লজ্জা পেলো সে। সরে আসতে চাইলো দ্রুত। তবে ততক্ষণে ঢের দেরি হয়ে গিয়েছে। জাদিদের পোক্ত দুহাত বড় আবলীকায় জড়িয়ে নিয়েছে তার কটিদেশ। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ইরা চমকালো বেশ। চোখ তুলে চাইলো শান্তশিষ্ট স্বভাবের সুদর্শন পুরুষটার পানে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই তৎক্ষনাৎ মাথা নুইয়ে আনলো জাদিদ। মিলয়ে নিল দুজনার কপাল। গাঢ় চোখে তাকিয়ে, দুষ্টুমি ভরা কন্ঠে বললো,
‘ মাহবীর সত্যিই আমার লাকি চার্ম হয়ে এসেছে দেখছি। ও আসার পর থেকে আপনি কিন্তু বেশ বদলে গিয়েছেন। এইযে, আজকের এই কান্নাটাকে কি আমি শুধুই ইনসিকিউরিটি বলে ধরে নিবো? না অন্য কিছু..মানে মাহবীরের আম্মু কি তার বাবাইকে ভালোটালো বেসে ফেলেছে নাকি? ‘
ইরা কেমন কেঁপে উঠলো একথায়। তার চোখ দুটোতে স্পষ্ট বিষ্ময়, চেহারা জুড়ে লজ্জার লালিমা। ঠোঁট জোড়া কাঁপলো কিছু ব্যক্ত করার চেষ্টায়। কিন্তু কন্ঠস্বর দিয়ে একটি শব্দও বেরুতে চাইলো না। এতোটা কাছাকাছি থাকাতে লজ্জারা দ্বিগুণ বেড়েছে। ভারী হয়ে উঠেছে শ্বাস-প্রশ্বাস। ইরা’র নিরবতা, আরক্তিম মুখশ্রী এবং কম্পিত অধর পানে চেয়ে জাদিদ আরও খানিকটা দৃঢ় করলো হাতের বাঁধন। দুই নারী-পুরুষ স্বত্তা মিলেমিশে গেলো একে অপরের সঙ্গে। দুই পক্ষের নিরবতার মাঝে ঘন নিশ্বাসের ক্ষীণ শব্দ ব্যতীত কিচ্ছুটি কানে এলো না তাদের। দুই জোড়া অধর যখন একে অপরের চেয়ে মাত্র ইঞ্চি খানিকের দুরত্বে, ঠিক সেই মুহুর্তে আধখোলা দরজা ঠেলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো নীতি। সে একা নয়। সঙ্গে রয়েছে সায়েরী-ও। বিনা বাঁধায় কক্ষে প্রবেশ করামাত্র সম্মুখের দৃশ্যটুকু দেখে বেক্কল বনে গেলো দুজন। থতমত খেয়ে থমকে গেলো উক্ত স্থানেই। নীতি নিজে তো অবাক হয়েছেই, কিন্তু নিজের হতবিহ্বল ভাবের মধ্যেও সে চট করে সায়েরীর চোখ চেপে ধরলো। বিজ্ঞদের মতো করেই বলে উঠলো,
‘ চোখ বন্ধ কর। বাচ্চাদের এসব দেখতে নেই। ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে নীতি এবং সায়েরীর আগমনে জাদিদ-ইরা ছিটকে সরে গেলো একে অপরের কাছ থেকে। দুজনের চেহারাতেই অপ্রস্তুত ভাব। বেশ লজ্জাও পেয়েছে এমন মুহুর্তে ধরা খেয়ে। তাদের কে হাঁসফাঁস করতে দেখে নীতি পুণরায় বলে উঠলো,
‘ স্যরি স্যরি। আমরা বুঝতে পারিনি এখানে সিনেমা চলছিলো। ইউ গাইজ প্লিজ ক্যারি অন..আমরা চলে যাচ্ছি। ‘
জাদিদ লজ্জা পেয়ে কেশে উঠলো এবারে। মাথা চুলকে কোনো রকমে বললো,
‘ আ..আব আমি..আমি তো ছাদে যাচ্ছিলাম। ‘
এইটুকুই। আর কিচ্ছুটি বের হলোনা মুখ দিয়ে। কোনো রকমে নীতিকে পাশ কাটিয়ে সে চলে গেলো। সায়েরী নিজেও লজ্জা পেয়েছে এমন এক দৃশ্যের সম্মুখীন হয়ে। সে নিজেও কেটে পড়লো জাদিদের পরপর। নীতি তাদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে ইরাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ ভাইয়া চলে গেলো কেনো? ডাক দে, আমি বীর কে নিয়ে যাচ্ছি। আর কোনো ডিসটার্বেন্স আসতে দিব ন…আহ!! ‘
কথার মাঝে হঠাৎই নীতির বাহুতে এক চড় লাগালো ইরা। মেয়েটা লজ্জায় পারছে না মাটি ফাঁক করে ঢুকে যেতে। তাকে চোখ গরম করে তাকাতে দেখে নীতি ফের বলে উঠলো,
‘ আজব বেঈমানী! তোমরা মিঞা টিকেট ছাড়া সিনেমা চালিয়ে রেখেছো। আর আমরা পারমিশন ছাড়া হলে ঢুকেলেই দোষ! ‘
প্রতিবেশী হিসেবে বিল্ডিংয়ের সকলকেই আমন্ত্রণ করেছিলো জাদিদ। এবং সকলে এসেছেও। বেলা প্রায় দেড়টা এখন। অধিকাংশরাই খেয়ে চলে গিয়েছে নিজ নিজ কার্যে। ছাদে বর্তমানে উপস্থিত রয়েছে ইরা এবং জাদিদের বন্ধুমহল। সেই সঙ্গে গুটিকয়েক প্রতিবেশী। সায়েরী-সাফ্রিন মাত্রই এসেছে ছাদে। কারণ অ্যাপার্টমেন্ট সম্পূর্ণ খালি। সায়েরীর কোলে রায়ানের ভাইয়ের মেয়ে, আহিয়ানা। মেয়েটা আসার পর সায়েরীকে দেখে দারুণ প্রফুল্ল। আগের বার যে দেখেছিলো,তা এখনো বেশ মনে আছে তার। এবারেও সায়েরীর পাশ ছাড়া হচ্ছে না। বছর তিনেকের নাদুসনুদুস মেয়েটাকে কোলে তুলে ছাদে আসতে গিয়ে সায়েরীর নাজেহাল অবস্থা। সাফ্রিন আগে আগেই পৌঁছে গিয়েছে। সায়েরী পৌঁছাতেই একাধিক অপরিচিত পুরুষদের সমাগম দেখে থমকে গেলো প্রবেশ মুখে। গাঢ় অস্বস্তিতে রীতিমতো হাঁসফাঁস লেগে গেলো কেমন। সাফ্রিন-নীতি সহ পরিচিত সকলে ওইযে ছাদের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে। মাঝে সব অপরিচিত মুখ। তাও আবার অধিকাংশ ছেলে মানুষ। ফাঁক ফোঁকর অবশ্য আছে। কিন্তু সায়েরীর সাহস হলো না তাদের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার। কোলে ঘাপটি মেরে থাকা আহিয়ানা জোর করছে দেখে সে অল্প কয়েক কদম বাড়ালো ঠিক। কিন্তু সুযোগ থাকা স্বত্তেও এটুকু পথ অতিক্রম করতে পারলো না। থমকে গেলো নিজ স্থানেই। আহিয়ানাকে নিয়ে রাখার শক্তিও ফুরিয়ে এসেছে। এভাবে কতোক্ষণ ধরে রাখা যায়!
‘ আরে লিটল বার্ড! তোমার আপু তো হাঁপিয়ে গিয়েছে। নেমে এসো, নয়তো এক্ষুনি পড়ে যাবে। ‘
পুরুষালী কন্ঠটি শুনে সায়েরী চট করে ফিরে তাকায়। অপরিচিত এক পুরুষ দাঁড়িয়ে। দৃষ্টি অবশ্য আহিয়ানার দিকে। কথাটাও আহিকে উদ্দেশ্য করেই বলেছে সে। সায়েরীর মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে যেকোনো মুহুর্তে হাত ফসকে পড়ে যাবে আহিয়ানা। এজন্যই উক্ত কথাটি বলেছিলো যুবকটি। কিন্তু সায়েরীর বিন্দুমাত্র ভালো লাগলো না। সাফওয়ান কেও দেখা গেলো না আশেপাশে। তার বন্ধুদেরও ধ্যান নেই তার দিকে। অগত্যা সে মনস্থির করলো ফিরে যাবে বলে।
‘ এক পিচ্ছি আরেক পিচ্ছিকে কোলে নিয়ে রেখেছে হা হা। এদিকে দিন, এই কিউওটি পাই কে আমি নিচ্ছি। আপনাদের ফ্যামিলি মেম্বার কোথায়? কেউ আসেনি সাথে? ‘
সেই একই পুরুষালী কন্ঠ বেজে উঠলো পুণরায়। সায়েরী আড়চোখে তাকালো। দেখতে তো ভদ্রসভ্য লাগছে। কিন্তু এমন গায়ে পড়ে কথা বলার কি দরকার! প্রথমে প্রতিউত্তর না করলেও, এবারে জবাব দিবে বলে মনস্থির সায়েরী। মুখ খুলেছিলো কেবল। কিন্তু জবাব দেওয়া আর হলোনা। ‘কেউ আসেনি?’ প্রশ্নটার জবাব এলো অন্য এক পুরুষালী গলায়। সায়েরীর চির পরিচিত সেই কন্ঠস্বর। ঠিক তার পাশে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মানুষটা বেশ দাম্ভিক সুরে জবাব দিলো,
‘ উড বি হাসবেন্ড এসেছে। আ’ম হেয়ার টু টেক কেয়ার অব হার। ইউ ডোন্ট নিড টু ওয়ারি, ড. রাজীব। ‘
এই মুহুর্তে সাফওয়ানের আগমন যেনো খরা জনিত জমিয়ে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে ধরা দিয়েছে। এক লাহমায় সায়েরীর দেহ মনের ক্লান্তি,অস্বস্তি সব উবে গেলো। সেই সঙ্গে মেয়েটা বেজায় চমকালো সাফওয়ানের বলা কথাটা শুনে। উড বি হাসবেন্ড! এটা আকাম আবার কবে হলো! আশ্চর্য হয়ে ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে রইলো সে। সাফওয়ান নিজেও ফিরে তাকালো। পরপরই কোলে তুলে নিলো আহিয়ানাকে। তাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ড. রাজীব নামক মানুষটার চোখে মুখেও খানিকটা বিষ্ময় ভাব। তিনি পুণরায় কিছু বলতে চাইলে, পূর্বেই সায়েরীর বাম হাত নিজের হাতের ভাঁজে তুলে নিয়ে উঁচু করে ধরলো সাফওয়ান। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির প্রলেপ টেনে জানালো,
‘ শি ইজ এনগেজড। ‘
অনামিকা আঙ্গুলের চকচকে হীরের আংটি-টির দিকে নজর গেলো রাজীবের। সে প্রতিউত্তর করতে চাইলো এবারেও। কিন্তু পুণরায় তাকে অবজ্ঞা করে সায়েরীর হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেলো সাফওয়ান। পেছন হতে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকা রাজীব বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ আমি কি কারো বউ চুরি করতে এসেছি নাকি? স্ট্রেঞ্জ!এমন পিচ্ছি কাচ্চা মেয়ের দিকে নজর দিয়ে লাভটাই বা কি? অযথা সুগার ড্যাডি খেতাব পাওয়ার কোন ইচ্ছে আমার নেই। ‘
ছাদের দক্ষিণ পাশের একটি খালি টেবিলের চেয়ার টেনে সায়েরীকে বসালো সাফওয়ান। ঠিক তার পাশেই চেয়ার টেনে বসলো নিজেও। আহিয়ানাকে বসিয়ে দিলো টেবিলে পা ঝুলিয়ে। টেবিলের উপর সারিবদ্ধ মিনারেল ওয়াটারের মধ্যে থেকে একটি তুলে নিয়ে, ক্যাপ খুলে তা সায়েরীর দিকে বাড়িয়ে দিলো সাফওয়ান। বললো,
‘ একা একা ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলে কেনো? ছাদে আসারই বা আসার কি প্রয়োজন? ‘
পরপর দুই ঢোক পানি গিলে ক্লান্তি টুকু মিটিয়ে নিলো সায়েরী। নিম্ন কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ ফ্ল্যাটে কেও নেই। একা একা থাকতে ভয় লাগছিলো তাই এসেছি। ‘
সাফওয়ান কিছু বললো না এবারে। টেবিল জুড়ে ততক্ষণে আসন গেড়েছে অনেকেই। রায়ান, জিমন, জাদিদ, মাহাদি, সাফ্রিন, নীতি সহ জাদিদের দুজন ছেলে কলিগ এবং চার জন মেয়ে কলিগ ও সামিল হয়েছে। অপরিচিত মুখগুলোর সম্মুখে খানিকটা অস্বস্তি লাগলো সায়েরীর। চেহারাতেই ফুটে উঠেছে স্পষ্ট সংকোচ বোধ। সাফওয়ান আড়চোখে পরখ করলো তাকে। পরপরই সায়েরীর মুখোমুখি বসিয়ে দিলো আহিয়ানাকে। বাচ্চাটার আড়ালে ঢেকে গেলো সায়েরীর চুপসানো মুখশ্রী। অতঃপর, নিজের চেয়ারটা খানিক চাপিয়ে নিলো সায়েরীর পাশাপাশি। মাঝের দুরত্ব টুকু গুছিয়ে নিয়েছে পুরোপুরি। তার পোক্ত ডান হাত বড় অবলীলায় স্পর্শ করলো সায়েরীর পৃষ্ঠদেশ। নীরবে, শান্ত ভঙ্গিতে বুলিয়ে দিচ্ছে সেথায়। মেয়েটাকে স্বস্তি বোধ করানোর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা যাকে বলে। এবং তা কাজেও দিলো। সাফওয়ানের সংস্পর্শে সায়েরী যে নিজেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত অনুভব করে, এই মুহুর্তেও তেমনই অনুভূতি হচ্ছে তার। মুখশ্রীতে নেমে আসা অমানিশার আবছা কালো ছায়াটুকু মিলিয়ে গিয়েছে ধীরে ধীরে। হাস্যজ্বল চেহারাটি নিজস্বতা ফিরে পেয়েছে পুণরায়।
গোল টেবিলে অবস্থানরত প্রায় সকলেই লক্ষ্য করলো দুজনকে। বন্ধুরা মুগ্ধ চোখে দেখলো, কিন্তু এবারে মোটেও পিঞ্চ করলো না। দুই প্রেমিক যুগলের নিভৃতের এই মিষ্টি মুহুর্ত টুকুতে দুজনকে বিব্রত করতে চায়নি বলেই চুপ করে রইলো তারা।
কিন্তু উপস্থিত এতজন সদস্যদের মধ্যে সকলের মনোভাব যে একই রকমের নয়, তার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ স্বরূপ হুট করে প্রতিক্রিয়া দেখাল ইরিনা। হিংসাত্মক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ যাবত সায়েরীকে নিয়ে সাফওয়ানের আদিক্ষেতা সহ্য করছিলো সে। এবারে আর সহ্য হলো না। ঠাশ করে উঠে দাঁড়ালো সে। কাউকে কিচ্ছুটি বলার সুযোগ টুকু না দিয়ে হনহনিয়ে এগিয়ে গেলো সিড়িপথে। বোনের এহেন প্রতিক্রিয়ায় ইরা বেশ বিব্রত হলো। সবাইকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জোরপূর্বক হাসলো সে।
” আমি দেখে আসছি.. ”
বলেই ইরা ছুটলো ইরিনার পিছু পিছু। গেস্ট রুমে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নিচ্ছিলো ইরিনা। এমন মুহুর্তে রুমে প্রবেশ ঘটলো ইরার। দরজা চাপিয়ে দিয়ে সে গম্ভীর মুখে বলে উঠলো,
‘ এগুলো কেমন অসভ্যতামী, ইরিনা? সবার মাঝ থেকে এমন বেয়াদবের মতো উঠে আসার কি মানে? ‘
বড় বোনের গম্ভীর কন্ঠে ইরিনার বিগড়ানো মেজাজ যেনো আরও বেশি বিগড়ে গেলো। হাতের পার্সটি বিছানায় ছুড়ে ফেলে সে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ তুমি অন্তত আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না, ইরাপু।
জাস্ট বিকজ অব ইউর ব্লাডি ফ্রেন্ডশিপ, আজ আমি সাফওয়ানকে হারিয়েছি। সারাজীবন এই ফ্রেন্ডশিপের দোহায় দিয়ে আমাকে আটকে রেখেছিলে তুমি। বলেছিলে সময় হলে ওকে নিজেই জানাবে আমার কথা। এখন কোথায় গেল তোমার ওয়াদা? আমাকে ধোঁকায় রেখে আজ আমার সামনেই ওই সায়েরী বিচটাকে মাথায় তুলে নাচছো। আবার এক্সপেক্ট করছো আমি বসে বসে তালি বাজাবো বলে? ডু আই লুক লাইক অ্যা জ্যোক টু ইউ? ‘
মনের কোণে বহুদিন যাবত জমিয়ে রাখা অভিযোগ গুলো উগড়ে দিলো ইরিনা। একসঙ্গে এতো কথা বলে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছে সে। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে দৃশ্যমান ক্রোধের তাড়নায়। ইরা নির্বাক হয়ে রইলো ছোট বোনের কথাগুলো শুনে। কয়েক সেকেন্ড অতিক্রম হওয়ার পরেও কণ্ঠনালী দিয়ে টু শব্দ টুকু ও বের হতে চাইলো না তার। প্রায় সেকেন্ড দশেক পর ইরিনাকে হ্যান্ডব্যাগ কাঁধে তুলে নিতে দেখে সে শান্ত সুরে আওড়াল,
‘ ইরু, আমার কথাটা শো.. ‘
‘ এখন আর শোনার জন্য বাকি রেখেছো টা কি? নিজে তো বিনা চাওয়ায় প্রেমিকের সঙ্গে বরও পেয়ে গিয়েছো। একটা যেতে না যেতেই আরেকজনের জনের সঙ্গে সংসার পাতিয়ে বসে আছো। তুমি কি করে বুঝবে আমার অনুভূতি? ‘
পুণরায় ইরিনার ক্রোধান্বিত কন্ঠে ইরা’র কন্ঠস্বর মিলিয়ে গেলো। চরম ব্যথিত হলো হৃদয়। এ কি আসলেও তার বোন? সজ্ঞানে এমন জঘন্য উপাধি কীভাবে দিতে পারলো মেয়েটা তাকে?
নিজের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নিয়ে ইরার মুখোমুখি দাঁড়ালো ইরিনা। কঠোর চোখে চেয়ে ফের বলে উঠলো,
‘ আমার লাইফের বিগেস্ট মিস্টেক ছিলো তোমাকে ভরসা করে এতগুলো বছর চুপ করে থাকাটা। বাট ইট’স অলরাইট। আমিও দেখবো অমন এভারেজ দেখতে, চিপ ক্লাস একটা মেয়ের সঙ্গে সাফওয়ান কতদিন এডজাস্ট করতে পারে। আ’ম টেলিং ইউ..ওদের রিলেশনশিপ কখনোই লং লাস্টিং হবে না। অন্তত আমার অভিশাপে তো হবেই না। ‘
নির্লিপ্ত গলায় ভয়াবহ এক ভবিষ্যৎ বাণী দিলো ইরিনা। ইরা অবাক হওয়ার পাশাপাশি ভীষণ রেগেও গেলো এবারে। কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারলো না কোন। ইরিনা তাকে সেই সুযোগ টুকু দিলোই না। চলে গেলো পাশ কাটিয়ে। সেই গমন পথের দিকে অসন্তুষ্ট নজরে তাকিয়ে রইলো ইরা। ছোট বোনের এই স্বভাব গুলোর কারণেই সে চায়নি সাফওয়ানের মতো একটা ছেলের কাছে মেয়েটা অপদস্ত হোক। ইরিনার স্বভাব কতোটা উগ্র তা কমবেশি সকলেরই জানা। সাফওয়ান তাকে গ্রহণ তো করতোই না, বরং বারবার বিরক্ত করলে ভয়াবহ রেগে গিয়ে যা-তা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলতো। শত হলেও আপন ছোট বোন, ইরা চায়নি মেয়েটা পছন্দের মানুষের কাছে ছোট হোক,অপদস্ত হোক। তাইতো সে চুপ মেরে ছিলো।
কিন্তু ইরিনা আজ যে কথাগুলো বলে গেলো, তা শুনে ইরা’র মনটা সম্পূর্ণ বিষিয়ে উঠেছে। ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়েছে আরও একবার। মাহবীর জন্মের আগ অবধি বেশ কয়েক মাস ইরিনা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। মা-বাবা তো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সেই কবেই। কিন্তু মাহবীর যেদিন জন্মালো, সেদিন ইরিনা হুট করেই এসেছিলো বোনকে দেখতে। ইরার মন সেখানেই গলে গিয়েছিলো। পরবর্তীতে আর দেখা সাক্ষাৎ না হলেও, আজকের দিনে আসার জন্য ইরা কতো যে জোর করেছে মেয়েটাকে। ইরিনা এলো ঠিক, কিন্তু যাওয়ার পথে ইরাকে আরও একবার বুঝিয়ে দিয়ে গেলো, তার ভাগ্যে আপন পরিবার বলতে কেউ নেই। কেউ না। রক্তের সম্পর্কের কোন ব্যক্তির-ই টান নেই তার প্রতি। হয়তোবা আর কখনো হবেও না।
আপন ভাবনার মাঝে গালের সঙ্গে আচমকা তুলতুলে কিছুর স্পর্শ পেয়ে ইরা’র ঘোর কাটলো। ঝাপসা চোখে চট করে ফিরে তাকালো সে। মাহবীর! ছোট্ট, তুলতুলে হাতে মায়ের গাল ছুঁয়ে মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে আছে বাচ্চাটা। ইরা ঝাপসা চোখে হঠাৎ হেসে ফেললো ছেলের মুখ দেখে। সেই ছোট্ট হাত খানায় গভীর চুমু এঁকে চোখ তুলে চাইলো জাদিদের দিকে। মাহবীর কে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। ছেলের হাতখানা উঁচিয়ে ছুঁয়ে দিয়েছে ইরা’র গালে। ইরা’র চোখের ঝাপসা চাহনি দেখে জাদিদের মুখের মিটিমিটি হাসিটুকু হঠাৎ করেই নিভে গেলো। বড্ড অসন্তুষ্ট গলায় সে বলে উঠলো,
‘ আপনি আবারও কাঁদছেন, ইরা? কি আশ্চর্য! আপনি দেখি মাহবীরের চেয়েও বাচ্চা বনে গিয়েছেন। এতো ঘনঘন কাঁদার মানে কি? ‘
‘ এক মিনিট..আপনি কি অবনীর ব্যাপারটা নিয়ে এখনো ইনসিকিউর ফিল করছেন? আল্লাহ্! আপনকে আমি আর কোনভাবে বুঝালে আপনি বুঝবেন.. ‘
জাদিদের ব্যস্ত কন্ঠ অবিরত বাজতেই থাকলো। একই সঙ্গে আরও কতো কি যে বলছে সেসব ইরা’র কানে পৌঁছাচ্ছে না বিন্দুমাত্র। মেয়েটা একধ্যানে তাকিয়ে আছে। মাত্র মিনিট খানিক পূর্বে যে বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো, হুট করেই সেটা মিলিয়ে গিয়েছে। উবে গিয়েছে আক্ষেপ টুকু। এই তো তার পরিবার। এই তো তার রক্ত,তার অংশ, মাহবীর! আর জাদিদ..এই পুরুষটা ছাড়া তো আজকাল কল্পনাও অসম্পূর্ণ রয়ে যায় তার। জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, আপন দুই সত্ত্বার দিকে বিমোহিত নজরে তাকিয়ে রইলো সে। অতঃপর হঠাৎ করেই, বিনা আমন্ত্রণে পায়ের পাতা উঁচু করে সে ঝাপটে ধরলো জাদিদের গ্রীবাদেশ। মিলিয়ে গেলো পোক্ত পুরুষালী বক্ষভাঁজে। দুইহাতে জড়িয়ে ধরে মাথা রাখলো জাদিদের কাঁধে। তার হঠাৎ প্রতিক্রিয়ায় জাদিদ বেক্কল বনে গেলো। কথা থেমে গেলো আচমকা। অবচেতনে একহাত উঠে এলো ইরা’র পিঠে। অন্যহাতে মাহবীরকে নিয়ে রেখেছে। কথা নেই বার্তা নেই, হুট করেই ইরা’র এমন প্রতিক্রিয়ায় জাদিদ বেজার চমকেছে। হতবুদ্ধির মতোন কয়েক সেকেন্ড বোবা হয়ে রইলো সে৷ মস্তিষ্ক খানিকটা সচল হতেই অবাক কন্ঠে বললো,
‘ ইরা! আপনি হুটহাট এসব কেমন কান্ড ঘটাচ্ছেন বলুন তো? শরীর খারাপ করেছে নাকি? ‘
তার কন্ঠটা শুনে জড়িয়ে রাখা অবস্থাতেই হেসে ফেললো ইরা। এবারে মুখোমুখি হলো৷ চিকন ফ্রেমের চশমার আড়ালে জাদিদের চোখ দুটোতে দৃষ্টি মিলিয়ে শীতল গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমার হাসবেন্ড কে আমি জড়িয়ে ধরেছি। এতে শরীর খারাপ করার কি আছে? জড়িয়ে ধরতেও কি পারমিশন লাগবে এখন? ‘
অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেলো জাদিদ৷ ইরা বলেছে একথা! অবিশ্বাস্য! আশ্চর্য চিত্তে বার দুয়েক ফাঁকা ঢোক গিললো সে। কথা খুঁজে না পেলে আমতাআমতা করে জবাব দিলো,
‘ ন..না মানে, ছেলের সামনে জড়াজড়ি করতে তো লজ্জা লাগে। এজন্যই বলছিলাম.. ‘
ইরা শব্দ করে হেসে ফেললো এবারে। মাহবীর সত্যিই গোলগোল নজরে তাকিয়ে আছে৷ তাকে কোলে তুলে নিলো ইরা। জাদিদের দিকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে ব্যস্ত সুরে বললো,
‘ বেলা দুটো বেজে গেলো, অথচ আবরার এখনো পৌঁছাতে পারলো না! ওর তো জন্য সবাই না খেয়ে বসে আছে। ‘
আবরার এসেছে দুপুর দুইটা বেজে দশ মিনিট অতিক্রম হওয়ার পর। তার অপেক্ষাতেই ছিলো বন্ধুরা। সে ফ্রেশ হয়ে আসামাত্র সবাইকেই খাওয়ার জন্য বসিয়ে দিলো ইরা। সার্ভ করে দিয়ে নিজেও বসলো জাদিদের সঙ্গে। সেই ঈদের সময়টার পর, আজ বহু মাস বাদে পুণরায় জমে উঠলো বন্ধুদের আড্ডা। খোশগল্পের মধ্যেই শেষ হলো ভোজন পর্ব। অর্ধেকের বেশি মেহমান খেয়েই বিদায় নিয়ে নিয়েছে। জাদিদের দুজন বেস্ট ফ্রেন্ড এবং তাদের ওয়াইফ সহ ইরার বন্ধুরা থেকে গেলো জোরাজুরিতে। মাহাদী সহ মাহবীরের দাদা-দাদু বিকাল অবধি থাকার কথা থাকলেও বেলা তিনটার দিকে কোন কারণ বশত চলে যেতে হয়েছে। অগত্যা বাকিদের নিয়েই নিজেদের বড়সড় আপার্টমেন্টে আসর জমালো ইরা-জাদিদ। খেয়েদেয়ে মেয়েরা সকলে নিচে নেমে এসেছে। ছেলেরা থেকে গিয়েছে ছাদে। যেহেতু শীতের সময়, তাই বড় জলদি কেটে গিয়েছে মধ্যাহ্নের প্রহর। সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে নিজের মোবাইলের খোঁজে ছাদ থেকে নেমে এলো সাফওয়ান। সঙ্গে এসেছে জিমন। লিভিং রুমে তখন নীতি এবং সায়েরীর অবস্থান। দুজনের উচ্চ শব্দের হাসি,কথার আওয়াজ শুনে সাফওয়ান-জিমন সেদিকেই পা বাড়ালো। দেখলো, মাহবীরকে কোলে নিয়ে ঘরজুড়ে বিচরণ করছে সায়েরী। তার মুখজুড়ে দারুণ উচ্ছ্বাসিত ভাব। সাফওয়ানকে দেখামাত্র মেয়েটা স্থানকাল ভুলে চঞ্চল কদমে এগিয়ে গেলো। প্রফুল্ল চিত্তে বলে উঠলো,
‘ এই দেখুন, মাহবীর এক্ষুনি আমার ডাক শুনে হেসেছে। তাও একবার না, দুই দুইবার। ‘
মেয়েটার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে খুশিতে, বিষ্ময়ে। তার দিক থেকে চোখ নামিয়ে সাফওয়ান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাকালো মাহবীরের দিকে। শান্ত বাচ্চার মতোন মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে চুপ মেরে আছে সে। সাফওয়ান কে তাকাতে দেখে সায়েরী হাত বাড়িয়ে দিলো।
‘ কোলে নিন তো। দেখি আপনার কথা বুঝে কিনা। ‘
‘ আমিইই! ‘ সাফওয়ানের হতবিহ্বল কন্ঠ।
তাকে এমন আশ্চর্য হতে দেখে সায়েরী অবাক হলো৷ এতো রিয়েক্ট করার কি আছে তা বুঝলো না সে। সন্দিহান কন্ঠে শুধালো,
‘ হ্যাঁ। কেনো? আপনি এর আগে কোলে নেন নি ওকে? ‘
সাফওয়ান নিশ্চুপ। তার নিরবতায় জবাব খুঁজে পেলো সায়েরী। এবং তাতেই মেয়েটা চরম আশ্চর্য হলো।
‘ এতগুলো দিনেও আপনি বীরকে কোলে নেন নি? এটা কেমন কথা? আজকেই নিবেন, এক্ষুনি..’
বলতে না বলতে একপ্রকার জোর করেই সাফওয়ানের দুই হাতের মাঝে বীরকে সপে দিলো সায়েরী। সাফওয়ান বড় অপ্রস্তুত হলো৷ হাতদুটো কাঁপছে তার। বাস্তব অর্থে, এতো ছোট বাচ্চা কোলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা তার নেই বললেই চলে৷ তার এক বাহুর সমান ও হবে না, এমন পুচকি দেহ বাচ্চাটার। কোন ফাঁকে হাত গলিয়ে পড়ে যাবে সেই ভয়েই কোলে নেওয়া হয়নি। কিন্তু আজ সায়েরীর জোরাজোরিতে সে বাধ্য হয়ে কোলে নিলো। হাত পা নাড়িয়ে, অস্পষ্ট শব্দ করলো মাহবীর। সাফওয়ান নিরব দেখে গেলো ওই গোলগাল মুখশ্রীটি। সেই অবস্থাতেই পাশ থেকে তার বাহু জড়িয়ে তাতে গাল ঠেকাল সায়েরী। গদগদ ভাব নিয়ে বললো,
‘ কিউট, তাইনা? ‘
‘ হুমম ‘ সাফওয়ানের অস্পষ্ট স্বর৷
দুজনে যখন আপন ভাবনায় মশগুল, সেই মুহুর্তে চাপা গুঞ্জন কানে এলো সাফওয়ানের। সে চোখ তুলে চাইলো। সম্মুখে দন্ডায়মান জিমন নিজের ক্যামেরা তাক করে রেখেছে সাফওয়ান-সায়েরীর দিকে। পাশেই অবস্থানরত নীতি ফিসফিস কন্ঠে কি যেন বলছে, এবং দুজনেই হাসছে। তাদের কান্ড দেখে সাফওয়ান এতক্ষণে গিয়ে লক্ষ্য করলো সায়েরীকে। মেয়েটার ধ্যান জ্ঞান সব এমন ভাবে মাহবীর কে সপে দিয়েছে যে আশেপাশের কিচ্ছুটি খেয়াল করেনি।
‘ ভয় ডর সব উবে গিয়েছে? নাকি এই শীতের সন্ধ্যায় তোমার ভাইয়ের হাতে আমার নাক ফাটাতে চাইছো? ‘
সাফওয়ানের কন্ঠে খানিকটা চমকালো সায়েরী। প্রশ্নবিদ্ধ চোখ মেলে তাকাল সে। জবাব স্বরূপ সাফওয়ান চোখে ইশারা করতেই সায়েরী তাকালো নিজেদের দিকে। এবং হঠাৎ-ই থতমত খেয়ে গেলো সে। ছিটকে সরে আসলো সাফওয়ানের বাহু ছেড়ে। তার প্রতিক্রিয়া দেখে জিমন-নীতি শব্দ করে হেসে উঠলো। সাফওয়ান নিজেও হাসলো,নিঃশব্দে। সায়েরী গুটিয়ে গেলো তীব্র লজ্জায়। এরইমধ্যে উক্ত স্থানে উপস্থিত হয়েছে আবরার সহ অন্যান্য ছেলে সদস্যরা। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান। সায়েরী বুকে হাত চেপে স্বস্তির শ্বাস ফেললো। আবরার আর একটু আগে আসলে সত্যিই বোধহয় সাফওয়ান ভাইয়ের সরু নাকটা থেতলে যেতো। ভেবেই ফাঁকা ঢোক গিললো মেয়েটা।
সাঁঝের প্রহর। লিভিংরুমে আসন পেতেছে ইরার বন্ধুমহল, জাদিদের দুই বন্ধু, তাদের বউ। এবং পার্শ্ববর্তী ফ্ল্যাটের এক নব দম্পতী। সঙ্গে সেই একই ফ্ল্যাটের এক কিশোর ছেলে সহ৷ সোফায়,ফ্লোরে সব যায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে দীর্ঘক্ষণ আড্ডায় মশগুল ছিলো সকলে। শীতের সন্ধ্যায় জমজমাট আয়োজন হিসেবে গরম গরম কফির সঙ্গে কিছু স্ন্যাকসের আইটেম ও রয়েছে।
প্রায় ঘন্টা দেড়েক কেটে যাওয়ার পর আড্ডায় খানিকটা ভাটা পড়লো। যেনো কথা ফুরিয়ে এসেছে। সকলের দেহমন পুণরায় চাঙ্গা করে তুলতে, নীতি হুট করে বলে উঠলো,
‘ অনেক দিন হলো আমাদের আড্ডায় গান টান শোনা হয়নি। সাফওয়ান! একটা গান ধর না.. ‘
তার আবদার শুনে সত্যিই প্রফুল্ল হলো সকলে। কিন্তু সাফওয়ান নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
‘ উঁহুম..গিটার ছাড়া জমবে না তো। ‘
তার কথায় আমেজ প্রায় নিভেই গিয়েছিলো। এমন মুহুর্তে পার্শ্ববর্তী ফ্ল্যাটের কিশোরটি চট করে জবাব দিল,
‘ আমার ঘরেই তো আছে গিটার। নিয়ে আসি? ‘
তার কথা শুনে বন্ধুরা হইহই করে উঠলো গিটারের সন্ধান পেয়ে। তাদের আবদারে ছেলেটা চট জলদি দৌড়ে গেলো নিজেদের ফ্ল্যাটের দিকে। এবং মিনিট খানিকের মধ্যেই ফিরে এলো। গাঢ় বাদামী বর্ণের চকচকে গিটারটি সে সপে দিলো সাফওয়ানকে। সেটা হাতে নিয়ে সাফওয়ান চিন্তা করছিলো কোন গানটি গাইবে। এমন মুহুর্তে জিমন বলে উঠলো,
‘ রোমান্টিক গান শুনবো। ‘
নীতি বললো, ‘ ইয়াপ! ডুয়েট, ডুয়েট.. ‘
‘ ডুয়েট? এখন আবার ডুয়েট গাইবে কে? ‘ আবরার ভ্রুঁ কাঁচকালো।
‘ আর কে! সায়েরী গাইবে। সাফওয়ানের জন্য ওর চেয়ে বেটার পার্টনার আর কে আছে? ‘
আবরারের প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো নীতি।
এবং জবাব দেওয়ার পরক্ষণেই তার খেয়াল হলো, প্রশ্নটি আবরার করেছে। তৎক্ষনাৎ জিহ্ব কাটলো সে। বন্ধুরাও মনে মনে আফসোস করলো আবরারের গুরুগম্ভীর মুখশ্রী দেখে। সায়েরীর বুকের ভিতরটা ধুকপুক ধুকপুক করছে। ভয়ের তোড়ে সে খামচে ধরে সাফ্রিনকে। আবরার কিছু বলতে নিচ্ছিলো, এমন মুহুর্তে হন্তদন্ত গলায় নীতি ফের বলে উঠলো,
‘ আরে তোর মনে নেই! এই বছর আমাদের কলেজ প্রোগ্রামে মিহাদের বদলে সাফওয়ানের সঙ্গেই তো ডুয়েট গেয়েছিলো সায়েরী। কতো সুন্দর কন্ঠ ওর! এজন্যই তো বললাম। ‘
বুঝ পেয়ে মাথা ঝাঁকালো আবরার। তাতেই স্বস্তির শ্বাস ফেললো সকলে। গালিচার উপর বসে থাকা সায়েরীকে হাত ধরে টেনে তুললো নীতি। বসিয়ে দিলো নিজের স্থানে, সাফওয়ানের পাশে। বললো,
‘ এখানে বসে গাও। আমি ভিডিও করবো তো, তাই। ‘
লিভিংরুমের সফেদ এলিডি বাল্ব গুলো নিভিয়ে দিয়েছে জাদিদ। মাঝারি আকৃতির একটি ছোট্ট, কালারফুল ঝারবাড়ি ঝুলছে সিলিংয়ের মাঝ বরাবর। সেটাই জ্বলছে বর্তমানে। আবছা,মিষ্টি আলোয় রোমাঞ্চকর একটি পরিবেশ। বারান্দার ট্রান্সপারেন্ট খোলা দরজা পেরিয়ে ঢুকছে মৃদু মন্দ শীতল হাওয়া। তাতেই নিজেদের মধ্যে খানিকটা গুটিয়ে বসলো সকলে। পাশাপাশি সোফায় বসে সায়েরী আড়চোখে চাইলো সাফওয়ানের দিকে। মাত্র দেড় হাত সমান দুরত্বে বসা মানবটাও ফিরে তাকালো ঠিক সেই মুহুর্তে। এক পলক তাকিয়ে চোখের কোণে ফুটিয়ে তুললো হাসির আভাস। পরপরই তার সরু আঙুল চেপে বসলো গিটারের
ফ্রেডবোর্ডে। টুংটাং ধ্বনিতে মৃদু সুর তুলেছে কেবল, এমন মুহুর্তে নীতি ফের বলে উঠলো,
‘ মুহুর্তটা আরেকটু জমজমাট করলে হয়না? মানে, এতগুলো কাপল মজুদ থাকতে, শুধু গান শুনে যাবো কেনো? একটু হাত পা ও নাড়ান আপনারা। ‘
নীতির কথার মর্মার্থ বুঝতে বেগ পেতে হলো না কাউকে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসলো তারা। কিন্তু লজ্জায় কেউ-ই এগিয়ে এলো না। সকলের দিকে তাকিয়ে জাদিদ হাত বাড়িয়ে দিলো ইরা’র দিকে। সরল গলায় আবদার করলো,
‘ চলুন, মুহুর্ত টা আরেকটু জমজমাট বানাই। ‘
ইরা বিমূঢ় হলো এক পলকের জন্য। লজ্জাও পেয়েছে বেশ। চোখের ইশারায় শাসালো জাদিদকে। তা দেখেও নির্লিপ্ত জাদিদ। বরং ক্ষীণ স্বরে বললো,
‘ বাবা হয়ে গিয়েছি বলে কি আমার রোমান্টিসিজম কমে গিয়েছে বলে ভাবছেন আপনি? মোটেও কমেনি। মনের দিক থেকে আপনার হাসবেন্ড এখনো যথেষ্ট চাঙ্গা আছে। আসুন.. ‘
বলতে না বলতেই ইরার হাত ধরে টেনে তুললো সে৷ উপস্থিত হলো রুমের মধ্যভর্তি স্থানে। তাদের উঠতে দেখে হইহই করে চেঁচিয়ে উঠলো বাকিরা। তাদের দেখাদেখিতে জাদিদের দুই বন্ধু ও উঠে এলো বউ নিয়ে। সঙ্গে প্রতিবেশী নব দম্পতী।
তাদের দিকে তাকিয়ে অন্যরা হাসছে। হাসি হাসি মুখে সায়েরী পাশ ফিরতেই অকস্মাৎ চোখাচোখি হলো চিরচেনা বাদামী মণির সুগভীর দৃষ্টির সঙ্গে। কেমন ধ্যানমগ্ন হয়ে দেখছে তাকে! সায়েরীর বুকের ভিতরটায় মাঘ মাসের ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে তখন। জমে উঠেছে দেহশ্রী। তার লালিমা ছেয়ে যাওয়া মুখটির পানে তাকিয়ে মাথা নুইয়ে নিলো সাফওয়ান। ঝরঝরে চুলগুলো লেপ্টে গেলো কপালে। ঠোঁটের ডগায় ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটিয়ে গিটার ধ্বনিটুকু জোড়ালো করলো সে। অতঃপর, পুণরায় আড়চোখে দৃষ্টি তাক করলো প্রেয়সীর মায়াময়ী মুখশ্রীতে। হৃদয়ের সবটুকু অনুভূতি ঢেলে স্বচ্ছ গলায় সে গেয়ে উঠলো,
Dekha hazaron dafa aapko
Phir beqarari kaisi hai
Sambhale sambhalta nahi ye dil
Kuch aap mein baat aisi hai
পিনপতন নীরবতা ছেদ করে সাফওয়ানের ভরাট কন্ঠের সুরে সকলেরই হৃদয়ে দোলা লেগে গেলো। চার চারটি জুটি মৃদু ছন্দে গা দুলিয়ে মিশে রইলো একে অপরের মাঝে। কথা চললো চোখে চোখে,অনুভূতি কথন ঘটলো নীরব চাহনিতে৷ সুন্দর, রোমাঞ্চকর এই মুহুর্ত টুকু ক্যামেরা বন্ধি করছে জিমন। ফ্রেডবোর্ডে তখনো আঙ্গুল সঞ্চালন অব্যাহত রেখেছে সাফওয়ান। মিষ্টি একটি ধ্বনি বেজে চলেছে। সেই ধ্বনির তালে তালে সায়েরীর কোমল মনেও বেজে চলেছে অনুরাগের সুর। সাফওয়ানের নেশাতুর কন্ঠস্বর এতো কাছ থেকে শুনে, ঐ মাদক চাহনির অর্থ বুঝে তার ভেতরটা কাঁপছে। আড়চোখে পূণরায় ফিরে তাকালো সে। এবারেও ধরা পড়লো পূর্বের মতোন। কিন্তু লজ্জা পেলো না। একপলক তাকিয়েই চোখ বুজলো, প্রেমিক পুরুষটাকে উৎসর্গ করে, মিহি স্বরে গেয়ে উঠলো পরবর্তী লাইনগুলো,
Lekar ijazat ab aap se
Saansein ye aati jaati hain
Dhoondhe se milte nahi hain hum
Bas aap hi aap baaki hain
কি মোলায়েম, সুরেলা কন্ঠ! একবার শুনেই মন-দিল প্রশান্তিতে ভরে উঠলো সকলের৷ সাফওয়ান মন্ত্রমুগ্ধের মতোন শুনতে গিয়ে একটুখানি তাল হারালো, পরমুহূর্তেই আবার সামলে নিলো নিজেকে। বুকের বা পাশের চিনচিনে মিষ্টি ব্যথাটা ফের উদয় হয়েছে। সায়েরী নামক আপন মায়াপরীটির দিকে তাকিয়ে একটি শক্ত ঢোক গলঃধরণ করলো সে। আবারো তাল হারাবে সেই ভয়ে চোখ ফেরালো দ্রুত। নিদারুণ এক সুখানুভূতি-তে ভেসে যাওয়া হৃদয়ের আবেগটুকু ঢেলে ফের গাইলো,
Pal bhar na doori sahein aap se
Betaabiyan yeh kuch aur hain
পরবর্তী সুর টানলো সায়েরী~
Hum door hoke bhi paas hain
Nazdeekiyan yeh kuch aur hain
এবারে বুক ফুলিয়ে টানটান ভঙ্গিতে বসলো সাফওয়ান। পূর্ণ নজরে সায়েরীর দিকে তাকিয়ে সেই একই সুরে গেয়ে উঠলো,
Dekha hazaron dafa aapko
Phir beqarari kaisi hai
ফিরে তাকালো সায়েরী। দুই জোড়া মুগ্ধ মিলিত হলো একে অপরের সঙ্গে। ঘোরে ডুবে সায়েরী সমাপ্তি টানলো পরবর্তী লাইনের,
Sambhale sambhalta nahi ye dil
Kuch pyar mein baat aisi hai
সাফওয়ান-সায়েরীর মুগ্ধ কন্ঠের এমন স্নিগ্ধ, সুন্দর গানটিতে সকলে বিমোহিত প্রায়। এতো সুন্দর করে কীভাবে গাইলো? একে অপরকে অনুভব করে গেয়েছে বলেই কি আজকের গানটি এতোটা ঘোর লাগিয়ে দিয়েছে সবাইকে!
একই রঙের পোশাক পরনে দুই প্রেমিক যুগলের দিকে তাকিয়ে ছিলো ইরা। তার দুই চোখে গাঢ় মুগ্ধতার রেশ। কি সুন্দর মানিয়েছে দুজনকে! একে অপরকে উৎসর্গ করে গাওয়া এই গানটাও কতো মনোমুগ্ধকর ছিলো! ইরা আপনমনে দোয়া করলো, এই সুন্দর সম্পর্কটি আজীবন টিকে থাকুক। ভালোবাসা হারানোর কষ্ট সে ভোগ করেছে, করছে। অন্তত সাফওয়ান কিংবা এই বাচ্চা মেয়েটা কখনো ভোগ না করুক সেই যন্ত্রণা। ইরিনার দেওয়ার অভিশাপের আঁচ না লাগুক এই সম্পর্কে। কিন্তু চাইলেই কি সব দোয়া কবুল হয়! কে জানে আগাম ভবিষ্যতের কথা! নিয়তির লেখনী সম্পর্কে কারো ধারণা নেই। হতে পারে সম্পর্ক টিকে গেলো, আবার.. হতে পারে এইদিনের মতো এমন সুন্দর, স্নিগ্ধ মুহূর্ত তাদের জীবনে আর এলোই না।
গান শেষ হতে না হতেই, মিনিট খানিকের মাথায় নীতি এসে হাত টেনে তুললো সাফ্রিন এবং সায়েরীকে। সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে আদেশ দিলো,
‘ এই ঝিল্লু, গান দে.. ‘
সাফওয়ান সহ উপস্থিত সকলে উচ্চ শব্দে হেসে উঠলো তা শুনে। কাপল ডান্সের পরিবর্তে এবারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল সকলে। সাফ্রিন এবং নীতির সঙ্গে খিলখিল হাসিতে মত্ত মেয়েটার দিকে তাকিয়ে গিটারের সুর পাল্টালো সাফওয়ান। তীব্র হলো ধ্বনি,বদলে গেল পরিবেশ। নিজেদের আগাম ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত দুই স্বত্তা কেবল মেতে রইলো এই মুহুর্তে, এই শীতের সন্ধ্যায়, একে অপরের দিকে লুকোচুরি চাহনির মিষ্টি খেলায়। প্রেয়সীর হাস্যজ্বল বদনে প্রগাঢ় দৃষ্টি স্থির করে সাফওয়ান সুর বদলালো৷ নতুন এক গানের, পছন্দসই কিছু লাইন আওড়াল কেবলমাত্র তার বোকাপাখি-কে উৎসর্গ করে। সকলের মৃদু গুঞ্জনের মাঝে শোনা গেল তার ভরাট কন্ঠস্বর,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭০+৭১
Lagta hai nigaahon mein teri
Bin doobe rehna hi nahi
Mujhe ishq yeh karne se
Ab koi bhi na rok sakeya
O haareya main dil haareya
O haareya main dil haareya
O haareya main dil haareya
Main haara tujhpe o
