Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪ 

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪ 

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪ 
জান্নাত চৌধুরী

রাত পেরিয়ে আরাধ্য ফিরলো ভোরের দিকে। এলোমেলো চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো। পুরো ঘর ফাঁকা , ঠিক যেন খা খা করছে। কপাল কুঁচকে দুই একবার ডাকলো আরাধ্য ,
” ইরা …ইরাহ”।
কোনো জবাব এলো না। অথচ মেয়েটাকে ডাকার আগেই কাছে এসে ভিরে। আরাধ্য পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে বেলকনির দিকে তাকালো। ওদিক টাও ফাঁকা দেখাচ্ছে। যথারীতি বেলকনিতে আর গেলো না সে , ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়লো , ছাদের দিক দেখা প্রয়োজন তার।

গুনগুন করতে করতে ছাদের দিকে হাঁটছে ,
আমি এক ফেরিওয়ালা ভাই,
স্বপ্ন ফেরি করে বেড়াই।
আমি এক ফেরিওয়ালা ভাই,
স্বপ্ন ফেরি করে বেড়াই।
হরেক রকম স্বপ্ন পাবে,
আশা কিংবা নিরাশার।
জন্মভূমি মক্ত করার কিংবা প্রিয় প্রেমিকার
আমার স্বপ্ন কিনতে হলে আস্ত পাগল হ‌ওয়া চাই।
আমি এক ফেরিওয়ালা ভাই,
স্বপ্ন ফেরি করে বেড়াই।
ছাদে এসে দাঁড়ালো , পুরো ছাদ ফাঁকা। ভোরের আলোতে একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে প্রকৃতি। চারদিক পাখির দল ক্যাচ ক্যাচ করছে;

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

এটা তাদের নিত্যদিনের কাজ। আরাধ্য ছাদ থেকে বাগানের দিকে তাকলো ওইদিকটাও ফাঁকা লাগছে। বিরবির করে কিছু একটা বললো, এরপর চিলেকোঠার ঘরের দিকে গেলো। কী জানি ভেবে বেশ সাবধানে মাটির নিচের পথ দিয়ে এলো কালকাঠুরিতে। আরাধ্য মন বলছিলো মেয়েটা এ ঘরে আসতে পারে। এই বন্দিশালা ঘিরে বড্ড কৌতুহল তারে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে। কাল কুঠুরির‌ ঘরে এসেও চমকিত হলো। ইফরাহ আসে নি কুঠুরি ‌ঘরে। দুজন নতুন লোক রাখা হয়েছে কুঠুরি ঘরে। ইরফাদ নেই, কে রাজধানীতে পাঠিয়েছে আরাধ্য। তার যাবার কথা ছিলো, তবে ইফরাহর নিরাপত্তা ভেবেই যাওয়ার সাহস হয়ে ওঠেনি‌।

কুঠুরিতে এসেই হাক ছাড়লো , “নূরুজ্জামান … নূরুজ্জামান।”
আরাধ্যের ডাকে এক যুবক বেড়িয়ে এলো। গায়ের রং তামাটে‌, চুলগুলো ভেড়ার লোমের মতো কোকড়ানো। পড়নে এক লুঙ্গি আর সাদা রঙ্গের এক গেঞ্জি। পোশাকের উপরে কালো এক শাল জড়িয়েছে। কুঠুরি ঘরের শীততাপ হতে রক্ষার্থে শাল কে হাতিয়ার করেছে। আরাধ্য জিজ্ঞেস করলো, “ কেউ এসেছিলো?”
নূরুজ্জামান বলল , “ নাতো ছোট নবাব , কারো আসার কথা রয়েছে?”
আরাধ্য এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল , “কেউ আসে নি?”
-“আগ্গে না ছোট নবাব!”
আরাধ্যের কপালে চিন্তার ভাজ ফুটলো সে আবারো জিজ্ঞেস করল,
“ সত্যি বলছো , কেউ আসে নি?”
বারবার এক‌ই প্রশ্নে খানিক বিচলিত হলো নূরুজ্জামান। শুষ্ক ঢোক গিলে বলল , “ কসম ক‌ইতাছি কেউ আসে নি ছোট নবাব।”

আরাধ্যের গলা শুকিয়ে এলো। কন্ঠের কথাগুলো দলা পাকিয়ে আঁটকে রয়েছে। এ কেমন অনুভূতি হচ্ছে সত্যি সে বুঝে উঠতে পারছে না। একটু সরে গিয়ে মাটি খাটের উপর বসে পড়লো। নূরুজ্জামান প্রশ্ন করল, “ আপনি কী অসুস্থতা অনুভব করছেন ছোট নবাব?”
আরাধ্য কেমন দৃষ্টিতে জানি তাকালো। নূরুজ্জামান এই দৃষ্টির হাথে পরিচিত নয়।আরাধ্য কাঁপা গলায় বলল, “ এক .. এক গ্লাস পানি আনো নূরুজ্জামান। পানি খাবো!”
নূরুজ্জামান পানি আনতে ছুটলো। আরাধ্য করলো কী চিত হয়ে শুয়ে পড়লো। অস্থিরতায় শরীর ঘেমে উঠছে, কুঠিরের শীতলতা তাকে স্পর্শ করছে না হয়তো। কাপলে ঘামের বিন্দু বিন্দু ফোঁটা। নূরুজ্জামান পানি এনে ডাকল , “ছোট নবাব!”

-“এনেছো ?”
-“এনেছি ছোট নবাব। ”
আরাধ্য উঠে বসলো। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে এক‌‌ নিঃশ্বাসে পানি টুকু শেষ করলো। নূরুজ্জামান আবার বলল , “ একখান কথা বলি ছোট নবাব।”
আরাধ্য নূরুজ্জামানের চোখে দিকে তাকলো। নূরুজ্জামান বলল , “ রেজা ভাইয়ের খবর কী ছোট নবাব। আইজ গোটা দিনে একবারেও আইলো না।”
-রেজা কামে গেছে, শেষ হ‌ইলেই আসবো। তুমি এদিকের খেয়াল রেখো। আমি উঠছি;
রেজা পুলিশের হাতে , এটা আড়াল করলো আরাধ্য। রেজাকে নিয়ে কারো কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নয় সে। এটা তাদের সম্পর্কের কাতারে পড়ে না। মনে এক তীব্র অস্থিরতা নিয়ে বেরিয়ে গেলো কুঠুরি ছেড়ে। অস্থিরতার কারণ কী শুধুই ইরা নাকি আরো কিছু সংযোগ রয়েছে এতে। আরাধ্যের চেহারা দেখে অন্তত এটা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

সোয়া চাঁন পাখি আমার,
সোয়া চাঁন পাখি।
আমি ডাকিতাছি , তুমিই ঘুমাইছো নাকি?
আমি ডাকিতাছি , তুমিই ঘুমাইছো নাকি?
তুমি -আমি জনম ভরা, ছিলাম মাখামাখি।
তুমি -আমি জনম ভরা, ছিলাম মাখামাখি।
আইজ কেন হ‌ইলা নীরব, মেলো দুটি আঁখি রে পাখি
আমি ডাকিতাছি , তুমিই ঘুমাইছো নাকি?

অন্ধকার ঘরখানা মুখরিত হয়ে উঠেছে গানের শব্দে। প্রতিটি শব্দ যেন দেয়ালে বারি খেয়ে কম্পিত হচ্ছে ঘরে। ধীরে ধীরে পিটপিট করে চোখ খুলে ইফরাহ। তার কানে বাজছে কোথাও যেন কেউ কাঁদছে। পুরুষের কন্ঠের গানের সাথে কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে। ইফরাহ আস্তে আস্তে উঠে বসলো। ঝিম ধরা মাথায় সামনের দিকে তাকাতেই হারিকেনের হলুদ আলোতে একটা আবছা মানবের দেখা পেলো। তখনো গান গাইছে লোকটি! ফোঁপানি শব্দ স্পষ্ট কানে আসছে। কী করুণ স্বরে গান ধরেছে সে। মুগ্ধ হয়ে শুনলো কিছু সময়। হঠাৎ কী হলো কে জানে ? ইফরাহ কাঁপা গলায় বলল , “ কে .. কে আপনি?”
গান থেমে গেলো। তবে নড়লো না লোকটি , ইফরাহ আবারো জিজ্ঞেস করলো , “ কথা বলছেন না কেনো ? সামনে আসুন , চেহারা প্রদর্শন করুন। ”

উঠে দাড়ালো লোকটি হারিকেনের আলোর দিকে ঝুঁকে গিয়ে এক মোমবাতি ধরিয়ে নিলো। লোকটার পড়নে সাদা পাঞ্জাবি , গায়ে শালের মতোন কিছু একটা আছে হয়তো? ইফরাহ অন্ধকারের বুঝলো না। সে এখন অব্দি এটাও বুঝতে পারছে না এখন রাত নাকি দিন? যদি দিন হয়ে থাকে তবে এত অন্ধকার কেনো ? কোথায় রয়েছে সে ?
লোকটি এগিয়ে আসছে , যত কাছে আসছে হলুদ মোমের আলোতে স্পষ্ট হচ্ছে তার অবয়। একটু একটু করে এসে দাড়ালো ইফরাহর কাছে শাল দিয়ে মুখের এক অংশ বেশ করেই আড়াল করা। লোকটি একবার ইফরাহর আশে পাশে চক্কর কেটে আবারো সামনে এসে দাড়ালো। ইফরাহ শান্ত হয়ে পর্যবেক্ষণ করলো লোকটির অবস্থান। ঠিক যে মূহুর্তেই লোকটি স্থির হয়ে দাড়লো। ইফরাহ বেশ চতুর বুদ্ধি আর দক্ষ যোদ্ধার ন্যায় এক টানে খুলে ফেললো লোকটির মুখ আড়ালে রাখা শাল টি।
স্পষ্ট হলো এক হলদে ফর্সা চেহারা। ইফরাহ আবাক কন্ঠে আওরালো ,

“ছোট খন্দকার আপনিই ।”
উড়ান শান্ত হয়ে তাকিয়ে আছে ইফরাহ দৃষ্টির পানে। তার চেহারা কোনো ভাবনা প্রকাশ পেলো না। নীবরে কাটলো কিছু সময় , দুই এ জোড়া চোখে মুগ্ধতা। অপর চোখজোড়ায় কেবলি আবাকের রেশ। খানিক সময় বাদেই শক্ত হয়ে এলো ইফরাহর চিবুক। দাঁতে দাঁত চেপে বলল , “ কোন মতলবে এনেছেন আমায়? এটা কোন জায়গা ?”
উড়ান কথা বলছে না ক্রোধ আরো বৃদ্ধি পেলো , “ উত্তর করুন ছোট খন্দকার। কোন সাহাসে আপনি তুলে এনেছে আমায়?”

উড়ান এড়িয়ে গেলো ইফরাহর প্রশ্ন। পকেট হতে ফোন বের করে কাউকে একটা কল করলো । মিনেটের মধ্যেই ঘরের দরজা খুলো প্রবেশ করল একজন পুরুষ। বাহিরের খানিক আলো নজরে এসেছিলো দরজা খুলার পর। ইফরাহ নিশ্চিত হলো , দিনের আলো ফুটেছে ধরনীতে। দুটো প্লেট এনে রেখে যায় লোকটি। আবারো অন্ধকার হয়ে যায় ঘরটি। এ কেমন স্থান , ইফরাহ আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে বুঝতে চাইলো‌ তবে উপায় নেই অন্ধকারের দৃষ্টি বেশি একটা কুলিয়ে উঠলো না।

উড়ান খাটের একপাশে মোমবাতি রাখলো। হাত ধুয়ে খেতে বসল। বড় বড় লোকমা তুলে খাচ্ছে লোকটি। ইফরাহর গা ঘিন ঘিন করছে তার খাওয়া দেখে। বড় বড় হাতে বড় বড় লোকমা তুলছে। দেখে মনে যেন কত বছর খায়না সে ? ইফরাহ দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিতে গিয়েও পারলো না। একে একে প্লেটে সব তরকারি একত্রে করে চটকিয়ে খাবার মুখে তুলছে উড়ান। ইফরাহ মনে হলো সে একজন বদ্ধ উন্মাদ।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৩

অতি দ্রুত খাবার শেষ করলো উড়ান। ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি পান করে এলো ইফরাহর নিকটে। কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই তাকে টেনে নিয়ে বসালো বিছানায়। ২য় প্লেটের ভাত
মাখিয়ে ছোট ছোট লোকমায় তুলে‌ ধরলো ইফরাহর মুখে সামনে। ইফরাহ চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে। খানিক আগের উন্মাদনা স্বরণে আসতেই গা গুলিয়ে এলো। উড়ান ভাতের লোক মা সামনে‌ রেখেই বলল, “ খেয়ে নাও প্রিয়তমা। ভাতের উপর রাগ করতে নেই। ”
ইফরাহ হাত সরিয়ে দেয় উড়ানের। কড়া গলায় বলে , “ আমাকে এখানে কেনো এনেছেন ছোট খন্দকার।আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪ (২)