অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮০
সাজিয়া জাহান সুবহা
এইস এস সি পরীক্ষা চলাকালীন প্রথম একটি মাস বাপের বাড়ি অবস্থান করার অনুমতি পেয়েছিলো নাজরাত। যেহেতু দীর্ঘ প্রায় তিন মাসব্যাপী পরীক্ষা চলবে। তাই গ্যাপ দেখে দুই বাড়িতে আসা যাওয়া করা যাবে, এমন পরিকল্পনা ছিলো সকলের। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হওয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহেই অপ্রত্যাশিত খুশির খবরটি শুনে দুই বাড়ির সদস্যদের আনন্দ যেনো সীমা ছাড়িয়ে গেলো। হাসপাতাল থেকে নিজ বাড়িতে ফিরে নাজরাত-সাদিফ দুজনের পক্ষ হতে খবরটি শুনে রমরমা হয়ে উঠলো পরিবেশ। কিন্তু নাজরাতের আর মাসব্যাপী বাপের বাড়িতে অবস্থান করার সৌভাগ্য হলো না। কিছুটা ক্ষুণ্ণ মনে সাদিফের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেলো সে।
বাড়ির চৌকাঠে কদম ফেলতে না ফেলতেই সেই কিঞ্চিৎ মন খারাপের রেশ ও কেটে গেলো ধুম করে। দুই শ্বশুর – শাশুড়ি সহ পরিবারের ছোট বড় সদস্য সকলে দারুণ উচ্ছ্বসিত হলো তাকে দেখে। সাদিফের মা শুরুতেই মরিচ পুড়িয়ে নজর তুলে নিলেন দুজনের। দুই শ্বশুর এবং একমাত্র ভাসুর ইফাজ সচরাচর এই অসময়ে বাড়িতে থাকে না। কিন্তু আজ তারাও উপস্থিত। বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সকলের এমন আহ্লাদ দেখে নাজরাত লজ্জায় মাথা তুলতেও পারলো না। কেউ সরাসরি নতুন সদস্যের আগমন বিষয়ক কোন কথা উল্লেখ না করলেও, তাদের আদর যত্নে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে সব। নাজরাতের লজ্জায় মরিমরি অবস্থা দেখে নিশি ওকে রেহাই দিলো। নিজেদের রুমে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া মাত্র নাজরাত আর এক সেকেন্ড বিলম্ব করলো না। তৎক্ষনাৎ প্রায় ছুটে আড়াল হলো সকলের দৃষ্টিসীমা হতে। সে কক্ষে প্রবেশ করার কিছু মুহূর্তের মধ্যে সাদিফও ফিরলো কক্ষে। যেনো কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব নিয়ে ভাব নিয়ে সে বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘ কাবার্ড থেকে টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে দাও তো। এই গরমে এমন ক্যাজুয়াল শার্ট, প্যান্ট পরে আর থাকা যাচ্ছে না। ‘
সত্যি অর্থে গরম পড়ছে বেশ। সাদিফের হালাত দেখে নাজরাত বিনা প্রতিউত্তরে কাবার্ড খুলল। বিশাল কাবার্ডের প্রায় অর্ধেকের বেশি স্থান জুড়ে নাজরাতের আধিপত্য। অবশিষ্ট অংশে সাদিফের জামা কাপড় রাখা। ঠিক সেখানটাতে হাত বাড়াতে গিয়ে র্যাপিং পেপারে মোড়ানো একটি লম্বাটে, সরু বক্স দেখে নাজরাতের কপালে ভাঁজ পড়লো। কৌতুহলী চিত্তে হাতে তুলে নিলো বক্সটি। আনমনে প্রশ্ন করে বসলো,
‘ এটা কি? ‘
সাদিফের পক্ষ হতে প্রতিউত্তর না পেয়ে পেছন ঘুরতে উদ্যত হলো সে। ঠিক সেই মুহূর্তে টের পেলো তার পিঠ ঘেঁষে রয়েছে সাদিফের বুকের সঙ্গে। মাথা তুলে চাইতেই দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললো দুজনার। অবিলম্বে সাদিফের দুই হাত জড়িয়ে গেলো নাজরাতের উদরের চতুর্দিকে। ছোট্ট করে জবাব দিলো, ‘ খুলে দেখো ‘
নাজরাত বিনাবাক্যে বক্সটি খুলল। ভেতর হতে উঁকি দিলো পেন্ডেন্ট সহ একটি চেইন। গোল্ড চেইন! নাজরাত অবাক হলো বেশ। পুণরায় প্রশ্ন তোলার পূর্বে সাদিফ নিজ থেকেই জানালো,
‘ উডবি জুনিয়র শাহরিয়ারের বাবাইয়ের তরফ হতে তার মাম্মামের জন্য ছোট্ট গিফট। এটি গ্রহণ করে শাস্তি মওকুফ করুন, মিসেস শাহরিয়ার। প্রথমবার বলে সুখবরটা শকিং হয়ে গিয়েছে। পরের বার আর এই ভুল হবে না। ফুল প্ল্যানিং করে তবেই মাঠে নামবো, কেমন? ‘
উপহার পেয়ে, সাদিফের বলা প্রথম বাক্য দুটো শুনে নাজরাত কেবলমাত্র পুলকিত হয়ে উঠেছিলো। অমনি শেষ বাক্যগুলো শুনে তার আনন্দটুকু ফুরুৎ করে জানলা দিয়ে উড়াল দিলো। তীব্র লজ্জায় ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো কান জোড়া। স্তম্ভিত চিত্তে নাক, মুখ কুঁচকে কনুই দ্বারা আঘাত করলো সাদিফের পেটে। সমানতালে বললো,
‘ ছিঃ বাবা হতে যাচ্ছো। এখন অন্তত শরম করো। ‘
হাত দ্বারা পেট মালিশ করে মৃদু ছন্দে হেসে উঠলো সাদিফ। পুণরায় দুই হাতের বেড়াজালে আটকে ফেললো নাজরাতের দেহশ্রী। মুখোমুখি তাকিয়ে, দুষ্টুমি কন্ঠে তৎক্ষনাৎ প্রতিউত্তর করলো,
‘ ওতো লজ্জা শরম করলে বাবা হতেই পারতাম না। তোমার উচিত আমাকে আরও এপ্রিশিয়েট করা। বিয়ের এক বছরের মাথাতেই প্রমোশন করিয়ে দিলাম। বউ থেকে বাচ্চার মা। অনুভূতি টা চমৎকার না? ‘
সীমাহীন লাজে নাজরাতের গালজোড়া উষ্ণতা ছড়াচ্ছে তখন। মেয়েটা সাদিফের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলাতেও ব্যর্থ হলো। চোখ পাকিয়ে বললো,
‘ দুই দুইবার প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে এখন আমাকে ঘুষ দিচ্ছো? ‘
সাদিফ অপ্রস্তুত হেসে ঘাড় চুলকায়। তাদের আনুষ্ঠানিক বিবাহের হঠাৎ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিলো যেদিন। সেদিন সে নাজরাতকে বলেছিলো, তার এক্সামে কোন প্রকারের ডিস্টার্বেন্স সে আসতে দিবে না। কিন্তু এখন কি হলো! ডিসটার্বেন্স সোজা নাজরাতের ভেতরে গেড়ে বসেছে। এই মামলা কি আর যেনতেন ভাবে সমাধান করা যায়! অপ্রস্তুত ভঙ্গিমায় মৃদু হেসে সাদিফ পুণরায় বেলাজ সুরে বললো,
‘ প্রথম প্রথম এমন একটু আধটু ভুল সবারই হয়। বললাম তো, পরবর্তীতে সম্পূর্ণ প্ল্যানিং ক…আউচ!! ‘
দ্বিতীয় বারের মতো পেটে আঘাত লাগতেই অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো সাদিফ। পরমুহূর্তেই হেসে ফেললো। সে পুণরায় মুখ ফুটে কিছু বলতে চাচ্ছে দেখে ইতোমধ্যে লজ্জায় গুটিয়ে যাওয়া নাজরাত হাঁসফাঁস চিত্তে সাদিফের বুকে হাত ঠেকিয়ে দূরে সরানোর চেষ্টা করে, কথা ঘুরিয়ে বললো,
‘ বাজে কথা রাখো। তুমি না শাওয়ার নিতে যাচ্ছিলে? এখন গরম লাগছে না? ‘
বুঝবার ন্যায় মাথা দোলাল সাদিফ। কাবার্ড হতে প্রয়োজনীয় বস্ত্র কাঁধে ঝুলিয়ে, পরমুহূর্তেই পাজা কোলে তুলে নিলো বউকে। হকচকিয়ে ওঠা নাজরাতের প্রতিক্রিয়া দেখে সে বড় নির্বিকার গলায় আওড়াল,
‘ তোমারও গরম লাগছে তাইনা? চলো, একসাথে ফ্রেশ হয়ে আসি। ‘
‘ একদম না। নামাও আমাকে। তোমার গরম লাগছে বলে আমারও লাগতে হবে এমন কোন রীতি আছে নাকি? ‘
‘ লাগবে না কেনো? তুমি আমি মিলেমিশেই তো বাবা-মা হচ্ছি। আমার গরম লাগছে মানে তোমারও লাগছে। চলো এখন.. ‘
এহেন নির্বিকার কন্ঠের বেফাঁস কথাটা শুনে মেয়েটা আরেকদফা লজ্জা পেলো। মিলেমিশে বাবা মা হচ্ছে মানে!
প্রথম প্রেগন্যান্সি জার্নি বলে নাজরাত স্বভাবতই বেশ ভীত হয়ে ছিলো নিজেকে নিয়ে, বাচ্চাকে নিয়ে। তন্মধ্যে চলছে বোর্ড এক্সাম। সব দিকের চিন্তা, অস্থিরতা মিলিয়ে সে বেশ গুটিয়ে গিয়েছিলো। খাওয়ার অরুচি, হুটহাট বমি, সারাক্ষণ ক্লান্তি ক্লান্তি ভাব। সব মিলিয়ে তার অবস্থা নাজেহাল হয়ে উঠেছিলো। ভাবনা চিন্তার ঊর্ধ্বে গিয়ে একেক দিন একেক রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। অযাচিত মুড সুইং, অযথা রাগ সবকিছুর ভার সাদিফের উপর ঢেলে দেওয়ার পর সে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যায়। আশ্চর্য হয় সাদিফের হাসিমুখ দেখে। ভাগ্য গুণে এই সুপুরুষটাকে পেয়েছিলো বোধহয় সে। এমন পরিস্থিতিতেও নাজরাতকে কতটা শান্ত ভাবে সামলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। যত দিন এগোয়, সাদিফের প্রতি নাজরাতের অনুভূতির মাত্রা তত গাঢ় হয়ে উঠে। অবচেতন মনে প্রত্যাশা করে বসে, তাদের অনাগত বাচ্চাটি ঠিক যেনো সাদিফের মতো হয়। ছেলে-মেয়ে যে-ই আসুক না কেনো, স্বভাব চরিত্রে ঠিক সাদিফের মতোন হলে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধহয় আর কিছু হবে না।
এপ্রিল – মে – জুন। টানা প্রায় তিনটি মাস জুড়ে এইস এস সি পরীক্ষা নামক যুদ্ধটি কাটিয়ে অবশেষে স্বস্তির শ্বাস ফেলেছে সায়েরী। সে বেজায় চিন্তিত ছিলো নিজের প্রিপারেশন নিয়ে। কিন্তু প্রতিটি এক্সাম শেষে সেই চিন্তা কোথায় যেন মিলিয়ে যেতো। প্রত্যাশার চেয়েও অধিক ভালো আন্সার করতে পেরেছিলো প্রতিটি সাবজেক্টে। বাদ বাকি রেজাল্ট আসলেই জানা যাবে তার চেষ্টা কতটুকু সফল হয়েছে। কিন্তু সাফওয়ান ভাইয়ের পরিশ্রম যে সে বৃথা হতে দেয়নি, এটুকু ব্যাপার নিয়ে সে নিশ্চিত। বরং তার চেয়েও বেশি নিশ্চিত সাফওয়ান নিজে। প্রথম পরিক্ষার দিনেই তো সে বলে দিয়েছিলো একথা। আশ্চর্যজনক ভাবে এখন সবকটি পরীক্ষা শেষ করে সায়েরী নিজেও উপলব্ধি করতে পারছে সাফওয়ানের আত্মবিশ্বাসের গভীরতা। এবার শুধু ফলাফল প্রকাশের পালা।
পরীক্ষা শেষ হয়েছিলো জুন মাসের ২৭ তারিখ। বছরের শুরু থেকে সায়েরী ঘোষণা দিয়ে এসেছিলো, এক্সাম শেষ হওয়ার দিনেই সে চট্টগ্রামে নিজ দাদাবাড়ী যাবে। কাছেই তো তার মামাবাড়ি। সেখানে দীর্ঘদিন ছুটি কাটাবে, আরও কত কি। কিন্তু এক্সাম শেষ হয়ে সপ্তাহ দুয়েক কেটে যাওয়ার পরেও কেউ তার মুখে একথা শুনেনি। কোথাও যাওয়ার, ছুটি কাটানোর কোনরূপ আবদার কারো কাছে করেইনি মেয়েটা। বিষয়টি আশ্চর্যজনক বটে। স্বয়ং আবরার চট্টগ্রাম হতে ফিরে দুই সপ্তাহ ছুটি কাটিয়ে গেলো। কিন্তু সায়েরী একটাবার বায়না করলো না কোথাও বেড়াতে যাওয়ার। যেদিন আবরার পুণরায় চট্টগ্রাম ফিরে যাওয়ার কথা, ঠিক তার আগের দিন সকালে ঘটেছিলো এক বিরল ঘটনা। সায়েরী বিনা কারো ডাকাডাকিতে ঘুম ছেড়ে উঠেছিলো সকাল সাড়ে আটটায়। নাশতা করে পিউদের বাড়ি থেকে ঘুরেফিরে এসে বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ হুট করে তার মা এবং বড় মায়ের মাঝে নাক গলাল রান্নাঘরে। বড় আগ্রহী কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ আজ কি রান্না করবে, বড় মা? ‘
‘ আলু দিয়ে মুরগী রান্না করছি। ডাল-ও রান্না করবো। তোদের জন্য তো আর কিছু লাগে না। ‘
সায়েরীকে উশখুশ করতে দেখালো তখন। রয়েসয়ে বললো,
‘ গরুর মাংস রান্না করবে, বড় মা? ঝাল ঝাল কষা মাংস যেটা তুমি রান্না করো ওটাই। ‘
কথাটা শুনে উপস্থিত মহিলা দুজনের কর্মে ব্যস্ত হাতজোড়া থমকে গেলো হঠাৎ। অবাক সুরে আবরারের মা তৎক্ষনাৎ প্রতিউত্তর করলেন,
‘ ঝাল ঝাল কষা মাংস? তুই তো রান্না করলেও ঝালের জন্য কখনো ভালো করে মুখেই তুলিস না। আজ মুরগী না রেঁধে কষা মাংস রান্না করতে বলছিস কেনো? ‘
সায়েরী ফের আমতাআমতা করে। কোন রকমে নিজেকে নির্বিকার দেখানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে বলে,
‘ আজ খেতে ইচ্ছা করছে বলেই বলছি। ভাইয়াও চলে যাবে কাল। ভাইয়া আর আব্বুরা না খুব পছন্দ করে? রাঁধ না প্লিজ। আমি হেল্প করবো। ‘
আরেকদফা ভিরমি খেলেন দুজনে। রান্নায় হেল্প করবে? তা-ও কিনা তাদের আদরে বাঁদর, অকর্মা, ঝামেলার বস্তাটা? মেহরিন বেগম এই পর্যায়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারলেন না। শাড়ির আঁচলে হাত মুছে সায়েরীর কাছে গিয়ে কপালে, গলায় হাত ছুঁয়ে দেখলেন। বড় চিন্তিত গলায় আওড়ালেন,
‘ তোর শরীর খারাপ লাগছে? কেউ কিছু বলেছে নাকি? কি হয়েছে? আবুল তাবুল বকছিস কেনো? ‘
সায়েরী তখন ভেতরে ভেতরে বেজায় বিব্রত, অপ্রস্তুত। একই সঙ্গে মহা বিরক্ত। সরাসরি বলতে পারছে না দেখে কত মিথ্যের আশ্রয় নিতে হচ্ছে তার! মায়ের প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচতে সে নির্লিপ্ত গলায় ফের বললো,
‘ কি আজব বিহেব করছো তোমরা! আমি কি কখনো রান্নায় তোমাদের হেল্প করিনি? অনেকবার পেঁয়াজ কেটে দিয়েছি, আমার কিন্তু মনে আছে। আরও কিছু না কিছু করেছি হয়তো। ঠিক মনে পড়ছে না। এতটা অকৃতজ্ঞ তোমরা!
‘ আচ্ছা যা-ই হোক, আমার তো পড়া নেই, কলেজ নেই আর কোচিং-ও নেই। বাসায় বসে বোর হওয়া থেকে ভাবলাম তোমাদের একটু হেল্প করি। নিজেও একটু শিখে আব্বুদের খাওয়াই। তোমরা হেল্প চাওনা বললেই পারো। আমি বরং যাই, গিয়ে একটু ক্রিকেট খেলে আসি.. ‘
হাঁটুর বয়সী বাচ্চা গুলোর সঙ্গে হইহট্টগোল করে ক্রিকেট খেলার বিষয়টা মেহরিন বেগমের একেবারে অপছন্দ। সায়েরীকে যেতে না দিয়ে তিনি স্বাভাবিক ভাবেই সায় জানালেন মেয়ের কথায়। সম্মতি পেতেই সায়েরীর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ফটাফট পটু দুই হাতের মাঝে দীঘল চুলগুলো পেঁচিয়ে খোপা করে নিলো। পরনের লেডিস টি-শার্টের লম্বা হাতা গুটিয়ে নিলো কনুই অবধি। অভিজ্ঞ কোন শেফ-এর ভঙ্গিমায় আওড়াল,
‘ কি করতে হবে বলো দেখি। ‘
তার প্রতিটি প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত দুই ভদ্রমহিলা ক্ষণে ক্ষণে আশ্চর্য হচ্ছিলেন। তবুও আর বাড়তি কথা বললেন না কোন। অকর্মা মেয়েটা কাজের কিছু শিখতে চাচ্ছে যখন, এতে আর দ্বিমত করার মানে হয়! সেদিন আবরারের মায়ের সঙ্গে টানা চারটে ঘন্টা বিনা বিরক্তিতে রান্না ঘরে কাটালো সায়েরী। প্রতিটি পদক্ষেপ দেখল, শিখল বড়ো আগ্রহের সঙ্গে। তার আগ্রহ, মনযোগ দেখে মেহরিন বেগমের আশ্চর্যের সীমা রইলো না। সেদিনের প্রায় তিন সপ্তাহ পর একদিন সায়েরী নিজ থেকে আর্জি জানালো এবারে সে নিজে কষা মাংস রান্না করবে। এবং করলো ও তাই। হাত কাটলো, গরম কড়াইয়ে স্পর্শ লেগে চামড়া ছিলে গেলো। তবুও সেদিন সকাল হতে দুপুর অবধি পরিশ্রম করে মাংস রান্না করলো বড় মায়ের সাহায্যে। তার প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিবারের সকল সদস্য প্রসংশা ও করলো বেশ। মেয়েটা সে কি আনন্দিত হয়েছিলো তখন! এরপর, তৃতীয় বারের মতো আরও একদিন একই পদ রান্না করেছিলো সম্পূর্ণ নিজ অভিজ্ঞতা থেকে। তার কাজ দেখে মনে হচ্ছিলো, যেনো এই এক টপিকের উপর তার পি এইস ডি ডিগ্রি চায়। বিন্দুমাত্র ত্রুটি থাকা যাবে না।
জুন মাসের পর জুলাই-আগস্ট দুটি মাস কেটে গেলো এভাবেই। এই দুটি মাসের ৬০দিনের মধ্যে ৪০টি দিন সায়েরী বোধহয় রান্না ঘরেই কাটিয়ে দিয়েছে। গরুর কষা মাংস-সহ স্পেসিফিক ভাবে আরও তিনটে পদ রান্না করলো বেশ কয়েকবার। মনযোগ সহকারে শিখলো কেবল এই চারটি পদ রান্নার পদক্ষেপ। সঙ্গে দুটি মিষ্টান্ন। এইতো, ঝামেলা পাকানো মেয়েটা দুটো মাসে রান্না পাকানো-ও শিখে গেলো অদ্ভুত ভাবে। অন্য কোন রান্না নয়। ঘুরেফিরে ঐ চার পদ , এবং দুটি মিষ্টান্ন-ই তৈরি করেছে প্রায় ৪-৫ বার করে।
প্রথম দুই বারে একটু উনিশ-বিশ হয়েছিলো ঠিক। কিন্তু শেষ দুই বারে এতোটা পারফেক্ট রাঁধল যে মেহরিন বেগম নিজে বিশ্বাস করতে পারলেন না উনার মেয়ের রান্নার হাত এতোটা দারুণ হতে পারে। আশ্চর্য! মেয়েটা একদম হুট করে এতটা মনযোগ দিয়ে, এমন ভালোবেসে রান্না করাটা কেনো শিখলো?
সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ভোর সেদিন। কোন এক কারণ বশত বেশ সকালে ঘুম ছুটে গেলো সায়েরীর। কিংবা বলা যায়, মেয়েটা রাতভর ঠিকঠাক ঘুমায়নি। ভোরের দিকে যেই একটু চোখ লেগে এসেছিলো, সূর্যের কিরণ চোখে পড়তেই ধরফরিয়ে উঠলো শোয়া থেকে। মোবাইল হাতড়ে দেখলো সাড়ে আটটা বাজতে চলেছে। সায়েরী আৎকে উঠলো সময় দেখে। বিদ্যুৎ গতিতে ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে এলো দ্রুত। একই সাথে জামা পাল্টে জিন্সের সঙ্গে ক্রপ টপ গায়ে জড়ালো ঝটপট। চুলে হাই পোনিটেল করে স্কার্ফ পেঁচিয়ে নিলো গলায়। ব্যাগ, মোবাইল এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তুলে যখন বেরুতে উদ্যত হলো তখন মেহরিন বেগমের জেরার মুখে পড়তে হলো তাকে। স্নিকার্স জোড়া পায়ে গলিয়ে নিতে নিতে সায়েরী ব্যস্ত সুরে জবাব দিলো,
‘ তোহার বাসায় যাচ্ছি আম্মু। তোমায় জানিয়েছিলাম না আমরা সব বন্ধুরা একটু আড্ডা দিবো সেখানে! কিছু কেনাকাটা ও করতে হবে। তাই সকাল সকাল বেরুতে বলেছে। ‘
মেহরিন বেগম আপত্তি করলেন না কোন। কিন্তু খালি মুখে সায়েরীকে বাড়ি থেকে বের হতেও দিলেন না। একপ্রকার বাধ্য হয়েই নাকে মুখে যুদ্ধ চালিয়ে অল্প খাবার পেটে চালান করে দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো সায়েরী। শুরুতেই ছুটলো পিউ’র কাছে। পিউ তখন ঘুমাচ্ছে। সায়েরীর ধাক্কাধাক্কিতে কোনরকমে উঠে নিজ কাবার্ড হতে চারটে শপিং ব্যাগ বের করে দিলো সায়েরীকে। ঘুমঘুম চোখে সায়েরীর উচ্ছ্বসিত মুখশ্রীতে চোখ বুলিয়ে গাল টেনে দিলো। মিষ্টি করে বললো,
‘ অল দ্য বেস্ট, সায়ু। ‘
সায়েরী লজ্জা পেলো কিঞ্চিৎ। পরমুহূর্তেই ঝাপ্টে ধরলো পিউকে। আমোদিত গলায় বললো,
‘ থ্যাঙ্কিউ দি! এত সুন্দর আইডিয়া দেওয়ার জন্য। আর শপিং করতে হেল্প করার জন্য। ‘
পিউ শব্দ করে হেসে সায়েরীর চুলে হাত বুলিয়ে দিলো। ফিসফিস ছন্দে আওড়াল,
‘ আমি কিন্তু ইচ অ্যান্ড এভ্রি ডিটেইল শুনতে চাই।’
সায়েরী ফের লজ্জা পেলো। কোনরূপ প্রত্যুত্তর না করে পিউকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। আরও একবার সময় দেখলো। ইতোমধ্যে সাড়ে ন’টা অতিক্রম হয়ে গিয়েছে। ইশ! এত দেরি। কতশত কাজ বাকি এখনো! হোয়াটসঅ্যাপে সাফ্রিনের আইডি হতে আসা গত রাতের আনসিন মেসেজগুলো চেক করলো সে। রাত ১১:৪৫ এর দিকে ছবি পাঠিয়েছে। ছবিতে সাফওয়ান, সাফ্রিন, সাম্য এবং সামান্তা চারজন থিয়েটারে পাশাপাশি সিটে বসে মুভি দেখছে। আরও টুকটাক কিছু ছবি। শেষের দিকের ছবি গুলো রাত প্রায় ১টা নাগাদ। লং ড্রাইভে, গাড়িতে গান বাজছে। সামান্তা লাফাচ্ছে, সাম্য উরাধুরা নাচছে। সায়েরী হিসেব করে দেখলো গত রাতে হয়তো ওরা বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দুটো বাজিয়েছে। অর্থাৎ, সাফওয়ান ভাই খান ভিলা-তে ছিলো রাতভর। ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে পেরে সায়েরী লম্বা শ্বাস টানে। আর দেরি না করে রিকশা ডেকে ঝটপট উঠে বসলো তাতে। গন্তব্য, গ্রিন ভ্যালি..
সায়েরী যখন গ্রিন ভ্যালি পৌঁছাল, ঘড়ির কাটা তখন বেলা দশটা ছুঁইছুঁই। শিউলি এবং তার মা দাঁড়িয়ে ছিলো বাগানে। যেনো অপেক্ষারত ছিলো সায়েরীর। কাঙ্ক্ষিত সময়ে মেয়েটার দেখা মিলতেই মা-মেয়ের মুখে হাসি ফুটল। বিনিময়ে সায়েরী-ও হাসিমুখে এগোল দ্রুত। বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে হাতের ব্যাগ সব রাখলো লিভিং রুমের কাউচের উপর। ব্যস্ত সুরে জানতে চাইলো,
‘ আমি যা যা বলেছিলাম সব জিনিসপত্র কেনা হয়েছে তো, খালা? কিছু কি বাদ পড়েছে? ‘
‘ না না। সবই আনাইছি। তুমি দেইখা লও সব ঠিকঠাক আছে কিনা। ‘
‘ আচ্ছা, দেখব। আগে বলো ডেকোরেশনের কি হলো? সাফওয়ান ভাই কি কাল এসেছিলেন এখানে? কিছু দেখেনি তো? ‘
‘ কিছু দেহেনাই। কাইল সারাদিনেও ছোট মালিককে আসতে দেহিনাই এহানে। তুমি গিয়া দেইখা আসো ওরা সব ঠিক কইরা করছে কিনা। ‘
সায়েরী মাথা দুলিয়ে সায় জানায়। শিউলি এবং তা মা ছুটে রান্নাঘরে। সায়েরী ফিরে আসে কিছু মুহূর্ত পর। পোনিটেল আরেকটু টাইট করে নিয়ে ক্রপ টপের হাতা গুটিয়ে নিলো সে। কিচেন ক্লথ গায়ে জড়াতে নিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে নির্দেশ দিলো,
‘ আমাকে সবজি সব কেটে দিন খালা। সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছে প্রায়। অনেক কাজ বাকি। ‘
নির্দেশ মতো মা-মেয়ে দুজনে কাজে লেগে পড়লো। একই সঙ্গে সয়েরী নামলো রান্নার যুদ্ধে। বিগত দুই মাসে রপ্ত করা চার পদ মশলাদার খাবার আজ রাঁধবে সে। একই সঙ্গে ডেজার্ট হিসেবে যেই দুটো মিষ্টান্ন শিখেছিলো সেই দুটিও তৈরি করবে। শিউলি এবং তার মা যখন সবজি সব কেটে কুটে নিচ্ছে। সায়েরী তখন ডেজার্ট দুটি তৈরি করে নিলো। শুরুতেই সেগুলো বানিয়ে সাবধানে রেখে দিলো একপাশে। অতঃপর কোমর বেঁধে নামলো মূল রান্নার যুদ্ধে।
কর্মে ব্যস্ত সায়েরীর সম্পূর্ণ মনযোগ রান্নায় হলেও, বুকের ভেতর ঢিপঢিপ কাঁপছে অজানা আশংকায়, উত্তেজনায় এবং অস্থিরতায়। যার উদ্দেশ্যে এতকিছু করছে আদৌ তার মন মতো সব হবে কিনা সেটা ভেবেই বার বার ঘেমে উঠছে সে। অসাবধান বশত তেলে পেঁয়াজ দিতে গিয়ে গরম তেল ছিটকে এসে হাতে পড়লো তার। বেশ কয়েক জায়গায় তেলে ছিটা লেগে মুহূর্তেই হাত লাল হয়ে গেলো। শিউলি ছুটে গিয়ে আইস কিউব বের করে উক্ত স্থানে চেপে ধরলো। সায়েরী তখনও ঘড়িতে চোখ বুলাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেলা ১টা বাজতে চলেছে। এসব ছোটখাটো ব্যথা নিয়ে বসে থাকার সময় নেই। আইস কিউব পাশে ফেলে পুণরায় তাড়া দিলো সে। তিনজনে মিলে যত দ্রুত সম্ভব রান্নার কাজ সামলে নিতে উদ্যত হলো।
যেমনটা আশা করেছিলো ঠিক তেমন পারফেক্ট ভাবেই রান্নার কাজ সম্পন্ন হলো। সায়েরী তখন ঘেমে-নেয়ে একাকার। কিন্তু চেহারা জুড়ে জ্বলজ্বল হাসি। শিউলির মা সায়েরীর চুলে হাত বুলিয়ে বললো,
‘ মেলা কাম করছো। গিয়া দুরুত গোসল কইরালাও। বাকি সব আমরা গুছাইয়া নিতাছি। ছোট মালিককে আসতে কইবানা? ‘
কিচেন ক্লথটি মাথা গলিয়ে বের করে নিতে নিতে সায়েরী সম্মতিসূচক মাথা দুলাল। বললো,
‘ আমি বরং গোসল করতে যাই। যেভাবে বলেছিলাম সেভাবে এগুলো প্লেটে সাজিয়ে টেবিলে রেখে আসো খালা। আমি যখন বলবো তখন সাফওয়ান ভাইকে কল দিবে, ঠিক আছে? ‘
শিউলির মা সম্মতি জানাতেই সায়েরী লিভিং রুম হয়ে শপিং ব্যাগ গুলো তুলে নিয়ে একছুটে উঠে গেলো দোতলায়। তার জন্য বরাদ্দ কৃত রুমে ঢুকলো ঝটপট। মোবাইল চেক করতে গিয়ে আৎকে উঠলো সাফওয়ানের প্রায় ত্রিশটি কল এবং অসংখ্য মেসেজ দেখে। এইতো, ১:২০ এর দিকে লাস্ট মেসেজ এসেছে,
‘ Subha? Why aren’t you picking up my call, damn it? ‘
সায়েরী ফাঁকা ঢোক গিললো ছোট্ট মেসেজটা দেখে। মেসেজটা ছোট হলেও স্পষ্ট ধমকের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সে খাকড়ি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিলো। জবাবটুকু দিলো ভয়েস ম্যাসেজ আকারে,
‘ আমার মোবাইল রুমে ছিলো, সাফওয়ান ভাই। আমি আম্মুর সঙ্গে কিচেনে ছিলাম তো। ফোন সাইলেন্ট ছিলো বলে রিংটোন শুনতে পাইনি। আপনি এতবার কল করেছেন কেনো? কিছু হয়েছে? ‘
ভয়েস ম্যাসেজটি ডেলিভার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিন ও হলো। তৎক্ষনাৎ কোন জবাব এলো না। সায়েরী মোবাইল রাখতেই যাচ্ছিলো। এমন মুহূর্তে পুণরায় নোটিফিকেশনের শব্দ হলো,
‘ You really don’t remember anything? ‘
সায়েরী মিটিমিটি হেসে টাইপ করলো,
‘ না তো। কি মনে রাখার কথা বলছেন? ‘
সাফওয়ানের আর জবাব নেই। সায়েরী আপনমনে হেসে অফলাইন হয়ে গেলো। ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকলো দ্রুত। সব কাজ শেষ হয়েও পুরোপুরি শেষ হয়নি এখনো। আরও টুকটাক ডেকুরেশন বাকি, মূল কথা আগে নিজেকে সাজানো বাকি।
বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে ভর দুপুরে গ্রিন ভ্যালিতে সাফওয়ানের আগমন ঘটলো। বেলা তখন আড়াইটা প্রায়। গরমে ঘেমে-নেয়ে তার অবস্থা হয়েছে বোম্বাই মরিচের মতো। একে তো কাল সারাটাদিন তার ভাই বোনেরা মিলে আবদার জুড়ে বসেছিলো ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেই ঘুরাঘুরির ইতি ঘটেছিলো রাত দুইটার পর। অগত্যা খান ভিলাতে ঘুমিয়েছিলো সে। রাত ১২ টা হতে দুইটা অবধি সময়টা কেটেছে অদ্ভুত বিরক্তিকর ভাবে। আজকের দিনটা তার জন্মদিন। এই পঁচিশ বছরের জীবনে কখনো সে কারো পক্ষ হতে বার্থডে উইশ পাওয়ার আশায় মরিয়া হয়নি। কিন্তু এই জন্মদিনে, এমন দামড়া বয়সে সে আশায় ছিলো হয়তোবা সায়েরী তাকে সবার আগে উইশ করবে। কিন্তু কোথায় কি! ভুলে বসেছিলো, যে তার বোকাপাখি টা মহা ঘুমকাতুরে। আচ্ছা যাক, রাতে না হোক। কিন্তু সকাল পেরিয়ে বেলা দুইটা বেজে গেলো। এখনো মেয়েটার কোন পাত্তা নেই।
সাফওয়ান নিজ থেকে কল করেও আহামরি পাত্তা কুড়াতে পারলো না। এমন অবিচার মানা যায়? সে পরিকল্পনা করে রেখেছিলো আজকের দিনটা সায়েরীর সঙ্গে কাটাবে। কিন্তু সকাল থেকে শ’খানেক বার কল করেও ম্যাডামের খোঁজ পাওয়া গেলে তো! তন্মধ্যে তার বন্ধু গুলো পাকিয়েছে আরেক ঝামেলা। জিমন এবং রায়ান সেই সকাল থেকে তার সঙ্গে আটার মতো চিপকে রয়েছে। অন্যান্য সময়ে ট্রিট চেয়ে গলার পানি শুকিয়ে ফেলে। কিন্তু স্বয়ং সাফওয়ান আজকের লাঞ্চটুকু ট্রিট দিতে চাইলে ওরা মানা করে দিলো! এমন আশ্চর্যজনক ঘটনা পৃথিবীর কোণে আর দ্বিতীয়টি ঘটেনি বোধহয়। যেখানে বন্ধু নামক মিসকিনরা যেচে আসা ট্রিট গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। অগত্যা তাদের সঙ্গে থেকে সাফওয়ান-ও খিদে পেটে ঘুরে বেরিয়েছে দুপুর অবধি। এইতো, বেলা দুইটা বাজার কিছু মুহূর্ত পূর্বে গ্রিন ভ্যালি হতে করিম চাচার ফোন এলো। ভীষণ ব্যস্ত সুরে কোন অসুবিধার কথা উল্লেখ করছিলেন তিনি। কি সমস্যা তা নিয়ে কিচ্ছুটি খুলাসা করলেন না। বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন, যেনো সাফওয়ান নিজে এসে দেখে যায়।
একপ্রকার বাধ্য হয়েই তৎক্ষনাৎ বাইক ঘুরিয়ে গ্রিন ভ্যালি হাজির হতে হয়েছে সাফওয়ানকে। তার বিক্ষিপ্ত মেজাজ আরেকদফা বিগড়ে গেলো, যখন গ্রিন ভ্যালির পাশের ছোট্ট কটেজে করিম চাচা কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের কোন অস্তিত্বের দেখা পাওয়া গেলো না। কি আজব মুসিবত! তাকে ডেকে এনে এভাবে ঘরে তালা ঝুলিয়ে ওরা গেলো কোথায়? কল করেও কোনভাবে রিচ করা গেলো না। গ্রিন ভ্যালির সদর দরজা খোলা দেখে সাফওয়ান আশ্চর্য হলো বেশ। এমন তো কখনো হয়না। করিম চাচা কখনো দ্বায়িত্বের হেরফের করে না৷ তবে আজ সব এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে কেন?
বাড়ির অভ্যন্তর মৃদু আলোয় নিমজ্জিত। রুম ফ্রেশনারের কড়া ঘ্রাণে ম-ম করছে চারপাশ। এসেছে যখন একেবারে ফ্রেশ হয়ে, খাবার অর্ডার করে খেয়ে তবেই বেরুবে। এমন পরিকল্পনা করে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলো সাফওয়ান। দোতলার দিকটা প্রায় অন্ধকারে ঘেরা বললে চলে। সচরাচর যে বাতিগুলো জ্বালানো থাকে, আজ সব বন্ধ করে রাখা হয়েছে। করিডরের শেষ মাথায় খোলা বারান্দার দরজাটাও আটকানো। ফলস্বরূপ ঝাপসা অন্ধকারে ডুবে রয়েছে সব। সাফওয়ান বিশেষ ভাবলো না সেসব নিয়ে। স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় নিজ বেডরুমের বন্ধ দরজার হাতল চাপলো সে। প্রবেশ করলো গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত কক্ষটির অভ্যন্তরে। অভ্যাস স্বরূপ, শুরুতেই বাম হাতে ঠেলে দরজা লাগিয়ে দিয়ে, ডান হাত উঁচু করে ছুঁল সুইচবোর্ড। এবং তৎক্ষনাৎ তার সকল ইন্দ্রিয় অবশ হয়ে গেলো। একদম আচানক। তুখোড় মস্তিষ্ক এই দুই-তিন সেকেন্ডে বুঝে ফেলেছে কক্ষে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির উপস্থিতি রয়েছে।
মিষ্টি কোন ফুলের সুবাস এসে নাকে ধাক্কা লেগেছে তার। এক সেকেন্ড মতো থমকে, পুণরায় সে সুইচ চেপে বাতি জ্বালাতে উদ্যত হলো। অমনি সম্মুখে এক টুকরো হলদে আলো জ্বলে উঠলো ধুম করে। কমলাটে অগ্নিশিখায় স্পষ্ট হলো চিরপরিচিত মায়াময়ী মুখশ্রীটি। সাফওয়ান ভড়কালো, থমকালো, চমকালো বেশ। একাধিকবার চোখের পলক ঝাপটে বোঝার চেষ্টা করলো, এটা কি ভ্রম! না সত্যিই সুবহা দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। দিন দুপুরে হ্যালোসিনেশন হচ্ছে না তো!
সাফওয়ানের বিবশ প্রতিক্রিয়া দেখে সায়েরীর রাঙানো ঠোঁট জোড়া প্রসারিত হলো। হাসির তালে কাজল রাঙানো চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে এলো তার। বাম গালের আবছা টোল পড়লো। বদন জুড়ে জ্বলজ্বল করা গোল্ডেন সিল্ক শাড়িটার কুচি নড়লো কদম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে। রিনিঝিনি চুড়ির শব্দের তালে সাফওয়ানের হৃদপিণ্ড ও কাঁপলো ধুকপুক ধুকপুক করে। ঢেউ খেলানো দীঘল খোলা চুলগুলো উড়লো মৃদু হাওয়ার তালে। মেয়েটা এগিয়ে এসেছে ধীর কদমে। এতক্ষণ যাবত সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকলেও এই পর্যায়ে নিজ দুইহাতে মাঝে ধরে রাখা রেড ভেলভেট কেকটার দিকে একপলক তাকালো সে। কেকের মাঝে জ্বলতে থাকা একটিমাত্র মোমবাতি-টির অগ্নিশিখার দিকে একপল চেয়ে পুণরায় চোখ তুললো। মিষ্টি হেসে, মিহি সুরে আওড়াল,
‘ হ্যাপি বার্থডে, সাফওয়ান ভাই! ‘
স্তব্ধ সাফওয়ানের কানে বেশ কয়েকবার প্রতিধ্বনিত হলো বাক্যটি। ঘোর কাটলো তৎক্ষনাৎ। তার চতুর মস্তিষ্কে একে একে কাল এবং আজকের সব অদ্ভুত, বিরক্তিকর কান্ডের কথা স্মরণে এলো। এক ঘটনার সঙ্গে অন্য ঘটনা তাল মিলিয়ে শেষে কিনা এমন চমক! সাফওয়ান সত্যিই চমকেছে। ভীষণ ভীষণ চমকেছে। তার প্রলুব্ধ, মুগ্ধ দৃষ্টি সায়েরীর উপর হতে সরছেই না। তার গিফট করা গোল্ডেন শাড়িটা আজ আবারও পরেছে মেয়েটা। আহামরি কোন সাজসজ্জা নেই আজ। কিন্তু আগের বারের মতোই নোজপিন পরেছে। চিকন কাজলের প্রলেপ টেনেছে চোখে। ঠোঁটে বোধহয় লিপ গ্লস লাগিয়েছে। তাইতো, মোমবাতির কমলাটে আভায় ঠোঁট জোড়া চিকচিক করছে তার। সাফওয়ান শুকনো ঢোক গিলে। গরম বোধহয় হঠাৎ করেই আরও কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গিয়েছে। বুকের ভেতরটা তিরতির কাঁপছে। চিনচিনে ব্যথাটা এইতো সুযোগ বুঝে বেড়ে যাচ্ছে। এতো জ্বালা!
সায়েরী আশা করেছিলো সাফওয়ান ভাই হয়তো আশ্চর্য হবে। কিন্তু এমন ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়েই থাকবে এমন কিছু সে মোটাও আশা করেনি। তার এতঘন্টার পরিশ্রমের বিনিময়ে কিনা এমন কোল্ড রিয়েকশন! তার প্রেমিক-টা আর কবে প্রেমিকের মতো প্রেমিক হবে খোদা! এই আনকমন চিজ কি তার কপালেই জুটার ছিলো? হতাশ গলায় মেয়েটা বলে উঠলো,
‘ দাঁড়িয়ে-ই থাকবেন শুধু? ক্যান্ডেল ব্লো করবেন না? ‘
মিনমিন সুরে ফের বললো, ‘ সারপ্রাইজ পছন্দ হয়নি? ‘
সাফওয়ানের সম্বিৎ ফিরলো। এগিয়ে এলো সায়েরীর কাছাকাছি। বাহু টেনে সায়েরীর পিঠ ঠেকাল নিজ বুকে। দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থুতনি চাপলো কাঁধে। শক্ত আলিঙ্গন শেষে লন্বা শ্বাস টানলো সে। নরম গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো, ‘ তোমার মনে ছিলো? ‘
সায়েরী গালভরে হাসে। মাথা ঘুরিয়ে সাফওয়ানের চোখে চোখ রেখে হাসিমাখা গলায় ঝটপট জবাব দেয়,
‘ আপনি কীভাবে ভাবলেন আজকের দিনটার কথা আমি এভাবেই ভুলে যাবো, হুহ? আমি কত আগে থেকে এই দিনের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম জানেন? কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আপনাকে চমকে দেওয়ার জন্য। উফফ্!! ফাইনালি আমি সাকসেস। ‘
কথাটা বলেই হেসে ফেললো সে। পরমুহূর্তেই সাফওয়ানের কঠোর চোয়ালে নরম ঠোঁট জোড়া চেপে চুমু খেলো চট করে। পুণরায় কোমল কন্ঠে বলে উঠলো, ‘ হ্যাপি বার্থডে টু মাই ম্যান ‘
সাফওয়ানের বুকের ভেতরটায় সুখ পাখিরা ডানা ঝাপটাচ্ছে তখন। গত রাত থেকে ক্ষণিক পূর্ব অবধি যতটা উদাসীনতা জমে ছিলো বুকের মাঝে। সব কেমন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো এটুকু শুভেচ্ছায়। অথচ তার এমন কোন এক্সপেকটেশন ছিলো না। এবং ছিলো না বলেই হয়তো, অন্তঃকোণে সুখের হাওয়া বইয়ে তীব্রভাবে। সায়েরীর চুলের ভাঁজে এবং কপালে চুমু খেলো সে। ভারিক্কি গলায় প্রতিউত্তর সরূপ একটিমাত্র শব্দ আওড়াল, ‘ থ্যাঙ্কিউ। ‘
সায়েরী জানে এটুকু শব্দের পেছনে সাফওয়ানের অভ্যন্তরের অনুভূতি ঠিক কতটা গভীর। মেয়েটা প্রফুল্লচিত্তে কেকটার দিকে ইশারা করে বলে,
‘ তাড়াতাড়ি ক্যান্ডেল ব্লো করুন। আরও অনেক কিছু বাকি তো। ‘
‘ কেমন কিছু? ‘
‘ দেখানোর জন্যই তো বলছি।আগে উইশ করুন। ‘
সাফওয়ান সেকথা শুনলো না। সায়েরীকে জড়িয়ে রেখে ফের বললো,
‘ তুমি উইশ করে নাও। ‘
‘ আমি! আমি কীভাবে? বার্থডে আপনার, কেক আপনার। উইশ-ও আপনার হওয়া চাই। ‘
সায়েরীর চঞ্চল মুখশ্রীতে দৃষ্টি রেখেই সাফওয়ান জবাব দিলো,
‘ আমার বিগেস্ট উইশটা তো আমি আগেই পূরণ করে নিয়েছি। এখন উইশ সব তোমার, আর পূরণ করার দ্বায়িত্ব আমার। ‘
সায়েরী এক মুহুর্তের জন্য থমকায়। ফ্যালফ্যাল নজরে চেয়ে রয় সাফওয়ানের দিকে। মোম গলে যাচ্ছে বলে সাফওয়ান সতর্ক করলে তখনই নজর সরাল মেয়েটা। চোখ বুজে ফু দিয়ে মোম নিভিয়ে দিলো। চতুর্দিক ডুবে গেলো আঁধারে। সাফওয়ান হাত বাড়িয়ে সুইচ চেপে লাইট জ্বালিয়ে দিলো। তার একহাত তখনো সায়েরীর কোমর জড়িয়ে রেখেছে। রুম আলোকিত হতেই সাফওয়ান কেকটা টি-টেবিলের উপর রেখে এবারে সামনে থেকেই জড়িয়ে ধরলো সায়েরীর কটিদেশ। জানতে চাইলো,
‘ কি উইশ করলে? ‘
‘ বলে দিলে উইশ পূরণ হয়না, জানেন না? ‘
‘ না বললে পূরণ করবো কীভাবে? ‘
‘ হু? ‘ সায়েরী চমকিত নজর মেলে তাকালো। সাফওয়ান ভ্রুঁ তুলে জিজ্ঞাসা স্বরূপ। পুণরায় বলে,
‘ বলো, কি চাও? ‘
সাফওয়ানের পিঠ জড়িয়ে ধরে বুকে থুতনি ঠেকাল সায়েরী। জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে, সরল গলায় জানালো,
‘ আমি চাই আজ এই মুহূর্ত থেকে আপনার আগামী সব জন্মদিনে যেনো আমরা একসঙ্গে থাকতে পারি। আমি প্রতিবার এভাবেই আপনাকে সারপ্রাইজ দিতে চাই। এই দিনটা ভীষণ ভীষণ স্পেশাল ভাবে কাটাতে চাই। ‘
সাফওয়ানের মুখের মৃদু হাসির রেখেটা মিলিয়ে গেলো হঠাৎ করে। বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপলো। সায়েরীর নিষ্পাপ চোখজোড়া এক বুক আশা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। যেনো এক্ষুনি উত্তর শুনতে মরিয়া হয়ে আছে সে। কিন্তু সাফওয়ান জবাব দিতে পারলো না। তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠকাঠ হলো। সায়েরীর কপালের মধ্যিখানে ঠোঁট ছুঁয়ে সে কোনরকমে বললো,
‘ ঠিক আছে। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি? ‘
সায়েরী সম্মতি জানিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। বোকা মেয়েটা বুঝলো-ই না যে সাফওয়ান তার আবদারটা এড়িয়ে গিয়েছে। সে স্বাভাবিকভাবেই বিছানার দিকে ইশারা করে বললো,
‘ ওইযে, শপিং ব্যাগটাতে আপনার ড্রেস রাখা আছে। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ওটা পরে আসুন। আমি অপেক্ষা করছি। ‘
কেকটি নিয়ে বেরিয়ে গেলো সায়েরী। সে যেতেই সাফওয়ানের মুখজুড়ে আঁধার ছেয়ে গেলো। কাবার্ড খুলে ড্রয়ার হতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ বের করলো সে। সেসবের দিকে তাকিয়ে তার বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরুলো। নিজেকে অনেক সাহসী বলেই চিনতো সে। কিন্তু বিগত কয়েক মাস যাবত প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করতে পারছে, সাফওয়ান খান আসলে ভীষণ ভীতু।
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৯
নির্দিষ্ট এক রমনীর সম্মুখে তার বুক কাঁপে ভয়ংকর ভাবে। মেয়েটাকে হারানোর, কাঁদানোর, কষ্ট দেওয়ার ভয় তাকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে প্রতিদিন। গত দেড় মাস যাবত সে সায়েরীকে কিছু কথা বলতে চেয়েও সাহস করে উঠতে পারছে না। যেদিনই বলবে বলে সীদ্বান্ত নিতো, সায়েরীর হাস্যজ্বল চেহারাটা দেখে গলা দিয়ে একটা শব্দও বের হতো না তার। আজও ব্যক্তিক্রম নয়। সে ভেবেছিলো অন্তত আজ হলেও সাহস করে মনে জমে থাকা কথাগুলো সে বহি:প্রকাশ করবে। কাছ থেকে, একটু আদর – আহ্লাদ করে বুঝালে নিশ্চয়ই সুবহা বুঝবে তাকে। কিন্তু আজকে তা করা একেবারেই অনুচিত। সায়েরী কতটা আনন্দিত আজ! কতগুলো দিনের পরিকল্পনা, পরিশ্রমের পর গিয়ে এই দিনটা স্পেশাল করতে চাইছে সে। বোকাপাখির পরিকল্পনা করা এত সুন্দর দিনটা সাফওয়ান স্পয়েল করে দিতে পারবে না। তার পক্ষে সম্ভব নয় এই সুন্দরতম দিনে মেয়েটাকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া।
