Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ২২

নীতিহীন রাজ পর্ব ২২

নীতিহীন রাজ পর্ব ২২
আশিকা আক্তার সোহাগী

বুদ্ধিজীবিরা এখন বিভক্ত তিনভাগে। ভন্ড ,ভন্ডতর,ভন্ডতম -হুমায়ুন আজাদের এই কথাটা নিবিড়ের মাথায় ঘুরছে সেই তখন থেকে।জিয়ানাদের বাসা থেকে বের হয়ে নিবিড় পার্টি অফিসে আসে। রেজাউল সরকারের জরুরী তলব। সেখানে উপস্থিত দেশের নামীদামী কিছু বুদ্ধিজীবী। প্রতিটাই শু*য়রের বাচ্চা।যারা দিনে বুদ্ধি বেঁচে খায় সে আর রাতে বুদ্ধির কাছে নিজেকে বেঁচে। এরা আবার কিসের বুদ্ধিজীবী?

বুদ্ধিজীবী ছিলেন মুনির চৌধুরী ,গোবিন্দ চন্দ্র দেব,মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ,আনোয়ার পাশা,সিরাজুল হক প্রমুখ ব্যাক্তিগন। যাদের কৃতিত্ব আর ত্যাগে আজও দেশ কাদে। যাদের হারানোর শোক কখনোই কাটে না।উনারা শহীদ হওয়াই মনে করা হয় দেশ একশো বছর পিছিয়ে গেছে।বর্তমানে আছে কেউ এমন বুদ্ধিজীবী? থাকলে তারা কোন রাজনীতি নেতার পা চাটে না।আর বর্তমানে যারা চাটাচাটি জানে না তারা বুদ্ধিজীবীর স্বীকৃতিও পায় না।
রেজাউল সরকার নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-শুনো নিবিড় একটা তিতা কথা বলি। জেল না খাটলে খাটি রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। আমি জেলে গেছি প্রায় ৩৭বার।যতবার জেলে গেছি ঠিক ততবার নিজের চরিত্র ঝালাই করার সুযোগ পেয়েছি।প্রথমে আমি তোমার মতো নীতি নীতি করতাম। পরে যখন রাজনীতির আসল ধারা ধরতে পারলাম এইসব নীতি ফিতী গুল্লি মেরে নেতাদের বি*চি চাটা শুরু করলাম ,ঠিক তারপর থেকে তড়তড় করে পদের উন্নয়ন হলো।
তবে নেতাদের চেয়ে নেতার বউরা আরও বড় বে*শ্যা।এদের চেটে নেতাকে ফু মেরে সরিয়ে ফেলা যায়।অত বেশি দূরে কেন তোমার আম্মাকে ধরে রূপক মন্ডল তো প্রায় এই এলাকার আসন জয় করেই ফেলছিলো।
বলে অট্টহাসি দিয়ে উঠলো।সাথে পাশের জানোয়ার গুলাও কুটিল হেঁসে যাচ্ছে সমান তালে। রেজাউলের নতুন পিএ ট্রে ভর্তি ছোট ছোট গ্লাসে নিষিদ্ধ তরল এনে সার্ভ করলো।নিবিড় ইশারা করলো বোতল আন। পিএ রেজাউলের দিকে তাকিয়ে অনুমতি চাইলো।সেও ইশারায় অনুমতি দিলো।সিংহকে খেপিয়ে দিয়েছে। রেজাউল জানে কে কোথাও আটকা আছে।নিবিড় মাথা গরম করে কখনো কোন ডিসিশন নেয় না।তবে একবার মাথা গরম হয়ে গেলে কিচ্ছু পরোয়া করে না।

রেগুলার শেপের একটা ৭৫০মিলি জ্যাক ডেনিয়েল’স হুস্কির বোতল এনে সামনে রাখলো। সাথে বোতল ওপেনার ধপ শব্দ করে পাশে রাখলো।নিবিড় লাল চোখে চেয়ে দেখলো শুধু একবার।ওপেনারটা ডান হাতে নিয়ে বা হাতে বোতল ধরে একটানে খুলে ফেললো।তারপর একমুঠো বরফ গ্লাসে খামচি দিয়ে নিয়ে ৪আউন্স জ্যাক ৬আউন্স সাইডার দিয়ে মিশিয়ে গোল গোল করে নাড়াচাড়া করলো যতক্ষণ না বরফ মেল্ট হয়।তারপর পুরো মিশ্রণটাই গলায় ঢেলে দিলো।গরম মিশ্রণ বরফেও যেনো কাবু করতে পারে না।গলার থেকে শুরু করে কলিজা বেধ করে পাকস্থলীতে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। সেইসাথে মস্তিষ্কের স্থিরতা রাশ পেতে থাকে ক্রমশ।ফট কিরে উঠে দাঁড়ালো। তারপর পিএর গলা একহাতের কনুই দিয়ে ভাজ করে শক্ত ভাবে চেপে ধরে বলে,

-তুইও কি আমার মতো জা*য়ড়া বে? শার্ট প্যান্ট পড়ে নিজেকে কি লাট সাহেব ভাবছিস? গোড়ালি সহ খাৎনা করে খোজা করে দিবো।ফার্দার নো বেয়াদবি। মাথায় থাকবে?
নিবিড়ের কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। আবার ধপ করে বসে পড়লো নরম সোফায়।
রেজাউল হোঁ হোঁ করে হেঁসে বলে উঠলো ,
-দেয়ার ইজ নো নিড টু ডো দিস এনিমোর।তার ন্যাচারাল খোজাকরন করা। হি এজ আ গে।
আবার খেকখেক করে হেঁসে উঠলো। তারপর আবার বলল,
-যে দরকারে ডেকেছি।আমার আসনে তোমার ম্যান পাওয়ার বেশি। তাই নিজের ম্যান পাওয়ার এইবার কাজে লাগাও।রি*ভালবার তো শোক্যাচে উঠিয়ে রাখার জন্য নয় ছেলে।একটা গুলিও তো খরচ করতে পারলে না এখন পর্যন্ত।
পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সামনে টেবিলের উপর রেখে বলে,

-দেস স্কাউন্ড্রেলস হেভ কন্সপাইয়ার্ড এগেনষ্ট মি। আই ওয়ান্ট টু মেইক ইচ অফ দেম পে।
নিবিড় কাগজটা হাতে নিয়ে বলে
-হয়ে যাবে।কিন্তু ওভার ব্রিজের কাজটা আমার চাই। আর কমিটি সাতদিনেই গঠন করবেন।ছেলেরা আর অপেক্ষা করতে চাচ্ছে না।ও হ্যাঁ সাথে দোয়া। নতুন বিয়ে করেছি আজ।
বলে ঝুকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো। রেজাউল সরকার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন ,
-আরেহ ব্যাস। প্রতিদিন নতুন নতুন বিরিয়ানিতে হচ্ছে না তোমার? এইবার ডাল ভাত চাই? ভালো ভালো। বউ মাকে এনো একদিন দোয়া আশির্বাদ করবোনি।
খুবই ভাজে ইঙ্গিত করে যে বলেছেন সেটা উপস্থিত সবাই টের পেলো সাথে মজাও। নিবিড় বাকা হেঁসে বলল ,

-জরুর। আশির্বাদ তো লাগবেই তবে সেটা আমার বউয়ের না। যে আশির্বাদ করতে চাইবে তার। আফটার অল মিসেস সুখনীল নিবিড় বলে কথা।আসছি তাহলে।
কপালে দুই আঙুল ঠেকিয়ে সালাম দেখিয়ে বের হয়ে গেলো। বাহিরে মক্কু সহ প্রায় বিশ পঁচিশজন ছেলেপেলে নিবিড়ের জন্য অপেক্ষা করছিলো। সবাই হুড়মুড় করে নিবিড়ের কাছে গিয়ে মক্কু জিজ্ঞেস করলো
-ভাই কি বলল?
নিবিড় উত্তর দিলো না সোজা গিয়ে বাইকে বসে স্টার্ট করলো।মক্কু একপ্রকার দৌঁড়ে পেছনে বসা মাত্রই হাই স্পিডে রান করলো বাইক।আর নেশার ঘোরে রাস্তা একসাথে চার পাঁচটা দেখছে।ফলে হাত কাপাকাপি শুরু করলো। মক্কু বারবার সাবধান করছিলো। কিন্তু নিবিড়ের এখন কথাও কানের যাচ্ছে না।তার কাছে মনে হচ্ছে একপাল শু*য়োর তার দিকে তাকিয়ে খ্যাকখ্যাক করে হেঁসে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। তারপর দেখলো শু*য়রের দলের মাঝে তার মা স্বপ্না আর ঠিক পাশেই জিয়ানা দাঁড়িয়ে। হাতের ব্রেক শক্ত করে চেপে ধরার সাথে সাথে বাইক নিয়ে ধুম করে ছিটকে পড়লো দুইজনই পাশের ফুটপাতে।

“আমি কারো কোন ক্ষতির কারণ হবো না।যদি এই নিয়ত করে চলিস তবে সৃষ্টিকর্তা বলবেন, আমি তোমাকে সমস্ত ক্ষতি থেকে রক্ষা করবো।”
এটা আমার কথা না।বিভিন্ন মনিষী বিভিন্নভাবে এই একই কথাটা বলেছেন।
বলে জিয়াউল জিয়ানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
জিয়ানার ঘুম না আসায় জিয়াউলের রুমে আসে। আর কথাবার্তা ছাড়াই জিয়াউলের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। আঞ্জুমান রাগ করে জেনির রুমে শুয়েছে।তাকে আর কেউ ঘাটতে যায়নি।থাকুক কিছু সময় নিজের মতো করে।
জিয়ানা মাথা উঁচু করে দেখলো ভেঙে যাওয়া স্বাস্থের জিয়াউলকে। তারপর প্রশ্ন করলো ,
-হঠ্যাৎ এই কথা কেনো আব্বু?আমরা কারো কি ক্ষতি করেছি?তানাহলে আমাদের এত বড় ক্ষতি কেনো হলো?
-সৃষ্টিকর্তার উপর থেকে বিশ্বাস আর নিজের উপর থেকে কখনো আত্মবিশ্বাস হারাবে না আম্মু।
এরচেয়েও খারাপ কিছু হতে পারতো। আমি আর জেনি মারাও যেতে পারতাম।আর আজ আমি নিবিড়ের মাঝে যে দৃঢ়তা দেখেছি। সেই দৃঢ়তা বেধ করে কেউ তোর চুলটা পর্যন্ত ছুঁতে পারবে না।নিবিড়ই সৃষ্টিকর্তার দেয়া রক্ষাকবচ তোর জন্য।

-সব জেনেশুনে এই কথা বলছো আম্মু? অন্যকোন সম্পর্ক হলেও মেনে নিতাম স্বামী স্ত্রীর মতো সম্পর্ক উনার সাথে কিভাবে ক্যারি করবো? শ্যামল হাসান কি বলেছে শুনোনি? উনি প্রচন্ড মিসোজিনি। এমন একজন সাইকোর আমাকে করবে রক্ষা?
-কোন মানুষের রক্ষা করার ক্ষমতা আসলে নেই।সে শুধু একটা ওসিলা হয়।আর নিবিড় হচ্ছে ওসিলা মাত্র।অনেক সময় হয় না ,আমরা যা দেখি বা জানি সেটা সত্যি না। নিবিড়কে আমার খুব জটিল মনে হয়।ওর মাথায় সব সময় কিছু চলে। ফট করে তোকে বিয়ে করার মতো সিদ্ধান্ত নেয়ার ছেলে সে না।
-ফট করে নিবে কেনো? ফ্রেম পাওয়ার জন্য করেছে।আনিস মামা জনসম্মুখে প্রশ্ন করেছে। তারা তো সেখান থেকে পিছানোর সুযোগ পায়নি।এমন কাজ করে তাদের জনপ্রিয়তা দেখবে হুড়হুড় করে বেড়ে যাবে আরও। আর নীলুফা চাচি.. দুঃখীত আম্মুকে মনে হয় সুখ খুব সম্মান করে।

-হতে পারে অনেক কিছুই। এরমাঝে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় যেটা হচ্ছে উনাদের সকল সম্পত্তি যদি নীলুফার নামে লেখা থাকে সেক্ষেত্রে উত্তাধিকার সূত্রে সবকিছুর মালিক তুই।ওদের পরিবারে ওপেন সিক্রেট এটা একপ্রকার। তাহলে মামুন ইসলামের জন্য তুই মাইন বোম টাইপ। সর্বোচ্চ সতর্ক হয়ে চলাফেরা করবি। আর সময় হয়ে গেছে তোকে সব বুঝিয়ে দেয়া।যেহেতু জেনেই গেছিস সব।
চড়াৎ করে উঠে বসে জিজ্ঞেস করলো ,

-আব্বু ভুল করে কি আমি কোন নাটক সিনেমায় ঢুকে গেছি? এমন নাটকীয় লাগছে কেনো সব? আর কি সিক্রেট বাকি আছে? আমি কি মানুষ না? আমি কি সংকর প্রজাতির অন্য কোন প্রাণীর বংশধর? আমার বিশেষ কোন ক্ষমতা আছে?
অত্যন্ত মন খারাপের মাঝেই হোঁ হোঁ করে হেঁসে দিলেন জিয়াউল হক।এই এক মেয়ে যে নিজেও মন খারাপ করে থাকে না। আর আশেপাশের কাউকেই মন খারাপ উপভোগ করতে দিবে না।

-নারে মা। তুই আমার বংশধর। আমার মেয়ে। আমার হাতেই তোকে একটু একটু করে বড় করেছি। এই যে এত এত প্রোটোকলের মাঝে তোকে বড় করেছি কারণ তোর জীবন আমাদের সাধারণ কারো মতো না। আজ অনেক ধকল গেছে অন্য একদিন সব বলবো।মাথা ঠান্ডা রেখে চলবি।আর নিবিড়কে অত হালকা ভাবে না নিয়ে বুঝার চেষ্টা করতে হবে।আজ আরও একটা জিনিস বুঝলাম নিবিড় আর তার পিতার মাঝে কোন ক্ল্যাশ আছে। কি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধ খোজে বের করতে পারবি না?
-পারবো।তবে ভণ্ড নেতার চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না আব্বু।চোখ দিয়েই খুন করে ফেলে। আর অতি খ্যাতিমান পিতারা সন্তানদের সময় দিতে পারে না।তাই হইতো পিতা পুত্রের মাঝে একটা দূরত্ব।তাছাড়া সামাজিক অসামাজিক সকল কাজেই তো একসাথে দেখি তাদের।
-অবজারবেন্ট মানুষের নজর হয় তীক্ষ্ণ। এরা বাজপাখির চেয়েও শার্প দেখে।তুই কথা বলার জন্য হা করবি এরা পুরা বাক্য ধরে ফেলবে। ভেতর গত কিন্তু বের করা তোর জন্য এখন ইজি হবে।জিনিস যেটা যত দৃঢ় হবে ভাঙ্গার পর ঠিক ততটাই ভঙ্গুর।

-এই লোকটাকে আমার ফেইক লাগে।নিজের রেপুটেশন ইচ্ছা করে খারাপ বানায়।প্লাস উপকার যা করে সেগুলো গোপন রাখে। প্লাস চেয়ারম্যান নিজেও কেমন যেনো মেকি একটা হাঁসি ঝুলিয়ে রাখে সবসময়।
-আমি নিশ্চিত নিবিড় তার প্ল্যান ছাড়া কিছু করে না আর মামুন ইসলামের একটা আলাদাই ব্যাপার আছে।নিবিড়ের সাথে আপাতত সমীহ করেই চলতে হবে। যেভাবে চলছে চলতে দে।
-তুমি কি আমাকে তার সাথে এক্টিং করতে বলছো? আমি সম্পর্ক নিয়ে কিংবা ইমোশন নিয়ে কোন গেইম খেলতে পারবো না।এই কয়েকদিনে তার অর্জিনাল কালার দেখে আমার মনে তার জন্য একটা স্ফট কর্ণার তৈরি হয়েছে।তাছাড়া এখন জামাই হয়ে গেছে কবুলের পাওয়ারে ভণ্ড নেতাকে যদি আমি ভালোটালো বেসে ফেলি। না আব্বু রিস্কি নিতে পারবো না।ভালোবেসে মানুষ অনেক বোকা হয়ে যায়।

-আমার তো মনে হচ্ছে তুমি অলরেডি তার মোহে পড়েই গেছিস।তানা হলে আমার জিয়ানা একজন রাজনৈতিক নেতাকে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে বাঁচাতে যায়? শোন কিছু জিনিস কুদরতি। সেটা মানুষের হাতে থাকে না।জন্ম ,মৃত্যু ,বিয়ে এই তিনটা বিশেষ করে। যদি আমাদের টার্গেট আর নিবিড় অপজিট হয় তুই নিজেই বুঝতে পারবি। আর যদি একই রাস্তার পথিক হয় তবে সব সহজ হয়ে যাবে। সম্পর্ক এগুবে আলোর গতিতে। সেখানে থাকবে না কোন মিথ্যা কিংবা জড়তা।
-কিভাবে বুঝবো একই পথের পথিক আমরা?
জিয়াউলের মুখ এইবার শক্ত হয়ে উঠলো। তারপর বলে

– এক নীলুফাকে বুঝতে হবে।দুই নিবিড়কেও জানতে হবে।
তাদের গল্পের মাঝখানে জেনি এত একপ্রকার ঝড়ের গতিতে।
-জিয়ু চল চল।নিবিড় ভাই আর মুসাদ্দিকের এক্সিডেন্ট হয়েছে। আকাশ নামের ছেলেটা আমাকে ফোন দিয়েচ্ছে মাত্র।
জিয়ানা জিয়াউলের কোল থেকে সরে বালিশে ভালোভাবে শুতে শুতে জিজ্ঞেস করে ,
-এক্সিডেন্ট হয়েছে হাসপাতালে যাবে।আমরা গিয়ে কি করবো আমরা কি ডাক্তার?
-এটা কেমন হেয়ালি জিয়ু? আমাদের বর এক্সিডেন্ট করেছে আমরা যাবো না।
বর কথাটা শুনে জিয়ানা উঠে বসে আড়মোড়া ভেঙে বলে ,
-উপস সরি সরি ভুলেই গেছিলাম আমরা বিয়াইত্তা বেডি মানুষ।চলো তাহলে জামাই সেবা করে আসি।

রাতের ১২ঘন্টার মাঝে ৬ঘন্টা শেষ। এই গভীর রাতে অন্য মেয়েরা যেখানে বাড়ির উঠানে নামতে ভয় পায়। সেখানে দুইজন মেয়ে সাইকেলে চেপে স্বাচ্ছন্দ্যে উক্ত ঠিকানা খোজে চলেছে।রাস্তায় তেমন লোকজন নেই দেখে বাড়ির নাম্বার মিলিয়ে এগোচ্ছে জিয়ানা।ত্রিশ মিনিট পর খোঁজে পেয়ে লোহার গেইটের শব্দ করলো।কিছুক্ষণ পর হেলতে দুলতে একটা হ্যাংলা পাতলা গার্ড এগিয়ে এলো।প্রথম দেখায় মনে হবে দাঁত কেলিয়ে অযথাই হাঁসছে লোকটা।আসলে তার দাঁতই উঁচু। তাই ঠোঁট মনে হয় বন্ধ হয় না।তাকে দেখে জেনি জিজ্ঞেস করলো ,

-সুখনীল নিবিড়ের ফ্ল্যাট নাম্বার কত?
-কি দরকার?
-কি দরকার সেটা তাকেই বলবো। নাম্বার বলুন।জিয়ানা গলা উঁচু করে বলল।
-কি দরকার সেটা আগে বলুন।
-ওও বেটা ওই তুই কি নিবিড় বে?তোকে কেনো বলব?
-আহা জিয়ু থাম তুই।
তারপর গার্ডের দিকে তাকিয়ে আবার বলে
-আমরা উনার আত্মীয়। উনি অসুস্থ দেখতে এসেছি।
-আজ পাঁচ বছর থেকে চাকরি করি ,উনার কোন মেয়ে আত্মীয় তো কোনদিন আসে নাই এইখানে।আপনাদের হাবভাবে ভালো ঠেকতাছে না।
জিয়ানা এগিয়ে এসে লোহার ফাঁকা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলে,

-সার্জারি ছাড়াই তোর সামনের উঁচু দাঁত নিচু করতে না চাইলে ফটাফট গেইট খোল ।আমি নিবিড়ের বউ।যেনো তেনো বউ না বাহাত্তর কবুলে বিয়ে করা বউ।
গার্ড ছেলেটা ঘাবড়ে গেলেও দমে গেলো না।সেও বলল,
-ভাই বিয়ে করবো আর আমি জানমু না।যান তো ভাগেন। রাত বিরাতে যত নাটক।
জেনি বুঝলো একে বলে কাজ হবে না।ফোন বের করে আকাশের নাম্বারে ফোন দিয়ে নিচে নামতে বলে।
মিনিট পাঁচেক পর আকাশ এসে তাদের নিয়ে যাওয়ার সময় জিয়ানা চোখ দিয়ে ভষ্ম করে দিয়ে গেলো গার্ডকে। নিবিড়ের ফ্ল্যাটে জেনি ঢুকেই সোফায় কাত হয়ে শুয়ে থাকা মক্কুর দিকে এগিয়ে যায়। আর জিয়ানা ঘুরে ঘুরে দেখে ফ্ল্যাটের সব।
বিশেষ কিছু নেই। একটা সোফা ,সেটাও খুবই সিম্পল ডিজাইনের ডিভান টাইপ। একটা টিভি।তবে ওয়াল আর সোফা সব ঝকঝকে পরিষ্কার। নতুন হইতো। আকাশ বলে,

-ভাই এই রুমে।কোন ওষুধ তো খায়ই না সাথে পা আর হাত ছিলে গেছে মলম পর্যন্ত লাগায় না।
জিয়ানা সেই রুমে এগিয়ে যায়। বিশাল একটা বেডরুম তবে কেমন ফাঁকা ফাঁকা। একটা ম্যাট্রেস বিছানো ,আর একটা কাবার্ড। বিছানায় চারহাত পা মেলে নিবিড় শুয়ে আছে। জিয়ানা কাছে গিয়েই নাক চেপে ধরলো। বিচ্ছিরি গন্ধে পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার যোগাড়। নাক চেপেই পা দিয়ে নিবিড়ের পায়ে টেপ করে জিজ্ঞেস করলো ,
-কাবলিওয়ালা আপনি কি আমাকে বিয়ে করার সুখে ডেট এক্সপায়ার্ড ম*দ খেয়েছেন নাকি?বাচ্চাদের পটিও এরচেয়ে ভালো গন্ধ।
নিবিড়ের কোন সাড়াশব্দ নেই দেখে ঝুকে কপাল থেকে লম্বা চুল সরিয়ে জ্বর চেইক করলো। গা প্রচন্ড গরম। এমন দানব আকৃতির মানুষ নেতিয়ে আছে দেখে অল্প মায়া হলো। সাইডে কিছু একটা নড়াচড়া করছে দেখে সেদিকে ফিরে জিয়ানা মৃদ্যু চিৎকার করে ডেকে উঠলো,

-স্যাসি?
রাফিনের বিয়ে তে দেয়া ছোট পার্সিয়ান ক্যাটটা এখন বেশ গুলুমুলু হয়ে বড় হয়েছে কিছুটা।কোলে নিয়ে আদর করবে কিন্তু সে জিয়ানাকে পাত্তা না দিয়ে নিবিড়ের বুকে উঠে মুখ ঘষা শুরু করলো।
-আচ্ছা নতুন মনিবকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেছিস? তোকে ভালোভাবে যত্ন করার জন্য আজ এই ভণ্ড নেতাকে একটু সেবা করাই যায়। কি বলিস?

উঠে আবার ড্রয়িং রুমে এসে তাকিতুকি করে রান্নাঘরে ছুটলো।রান্নাঘরে গিয়েও জিয়ানা পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা দেখে অবাকই হলো।কি সুন্দর সব সাজানো গুছানো। নিট এন্ড ক্লিন। একটা ব্যাচেলর বাসা থাকবে নোংরা। এখানে কাপড় ,সেখানে টাওয়াল ঝুলানো।আন্ডারওয়্যার থাকবে সোফায়। রান্নাঘরের বেসিংয়ে এটো থাল বাসন থাকবে।মসলার কৌটা এলোমেলো ,এদিক সেদিন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকবে। তানা এই বেটা নিজের চুলের মতো সব জিনিস সুবিন্যস্ত সাথে পরিস্কার করে গুছিয়ে রেখেছে।মেয়ে হয়ে জিয়ানার লজ্জা পাওয়া উচিত। কিন্তু লজ্জা যে তার সিস্টেমের বহির্ভূত। পাবে না সে লজ্জা।

ফ্রিজ খুলে কিছুক্ষণ খোঁজে লেবু বের করলো। লেবু কেটে চা কাপের হাফকাপ রস বের করে একটা কাপে ঢেলে নিলো।তারপর একটা বড় বোল অন্যহাতে নিয়ে আবার নিবিড়ের রুমে যায়। দুইবার টেনেও নিবিড়কে একচুল নড়াতে পারলো না যখন তখন আকাশকে ঢেকে বলল উঠিয়ে বসাতে। দুইজন মিলে অল্প একটু উঠিয়ে সম্পুর্ন লেবুর রস নিবিড়কে খাইয়ে দেয়। প্রচন্ড টকে নিবিড় সাথে সাথেই বমি করে ফেলে। জিয়ানা আগে থেকেই বোল নিয়ে সামনে ধরে ছিলো।
-আরেহ বাহ, ভাবি আপনি তো হেব্বি কাজের।
এক ব্রু উঁচু করে জিয়ানা একটা বাঁকা হাঁসি দিলো। আকাশকে বলল,
-অনেক জ্বর উনার শরীরে। একটা বালতিতে পানি এনে রেখে উনার ড্রেস চেইঞ্জ করে দেন তাড়াতাড়ি । আমি কুসুম গরম পানি আনছি।

-আরেহ আরেহ। আপনি বউ থাকতে এইসব আমি কেনো করবো? ভাইয়ের শরীরের হাত দিলে কাল সেই হাত আর আমার কাছে থাকবে না।মার্জনা করেন ভাবি।আমি খাবারের ব্যবস্থা করছি।
বলে একপ্রকার ছুটে বের হয়ে গেলো আকাশ।এদিকে জিয়ানা ব্রু কুচকে চেয়ে আছে নিবিড়ের দিকে।তার মন চাচ্ছে এই সুযোগ দুই চারটা থাপ্প*ড় মারতে। পকেট থেকে ফোন বের করে নিবিড়ের দাড়িযুক্ত পাতলা গাল টেনে কয়েকটা সেলফি উঠালো। তারপর ছুটলো বাথরুমের দিকে।

পড়নের জামার নিচে নিচেই শরীর স্পঞ্জ করে দিলো বার কয়েকবার।পানি নিগড়ানোর সময় খুবই নিচু করে করলো কাজটা। পানির শব্দে বিরক্ত না হয় এই জন্য।তার হাত বারবার নিবিড়েত শরীরের স্পর্শ করায় জিয়ানার কেমন কেমন যেনো একটা ইতস্ততবোধ হলো। তবুও কাজ চালিয়ে গেলো। মুখে স্পঞ্জ করার সময় খেয়াল করলো ,নিবিড়ের ব্রু দুটো অনেক ঘন।আর চোখে সুরমা ভেবে ভুল করেছিলো। লোকটার চোখের পাপড়ি ফলস পাপড়ির মতো অনেক ঘন। তাই ন্যাচারাল কালো অনেক। সাথে নাকটা বেশ সুচালো। আলতো করে নাকে একটু ছুঁয়ে ,নিজের নাক স্পর্শ করলো। হঠাৎ মনে হলো নিবিড়ের নাকে মাটি বেশি দেয়াই জিয়ানার নাকে মাটি কম পড়েছিলো। নিজের বোকা বোকা চিন্তায় কড়া একটা ধমক দিলো “হোপ বেডি” বলে। তারপর আবারও সারা শরীর স্পঞ্জ করলো।

জেনি বার কয়েক উঁকি মেরে দেখে গেছে জিয়ানার একমনে সেবার করার দৃশ্য।স্বভাবতই জিয়ানা অনেক যত্নশীল। অসুস্থ ব্যাক্তির সেবা সে পরম যত্ন নিয়ে করবে।হোক সেটা বন্ধু কিংবা শত্রু।মুখে চটাং চটাং কথা বললেও অতি কোমল একটা হৃদয়ের অধিকারী এই মেয়ে।জেনি মুচকি হেঁসে সরে গেছে নিরবে।
আলতো করে প্যান্ট সরিয়ে পায়ের ছিলে যাওয়া অংশে প্রথমে ভালো ভাবে পরিস্কার করলো তারপর অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিলো।হাতের কনুইতেও একইভাবে পরিস্কার আর অয়েন্টমেন্ট দিলো।
শরীরের বোধহয় যখন আরাম হলো, তখন নিবিড় বিড়বিড় করে কিছু বলল।
জিয়ানা শোনার জন্য কান নিয়ে গেলো ঠোঁটের কাছে।নিবিড় ফু-আম্মু বলেছে। কিন্তু জ্বরের ঘোরে ফু টা বুঝা যাচ্ছে না।শুধু আম্মু টা একটু স্পষ্ট।
চরাক করে জিয়ানা উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো।

নীতিহীন রাজ পর্ব ২১

-উনি কি ছোটবেলায় ফেরত গেলো নাকি।আম্মু আম্মু করছে। এখন যদি তাদের পাশের ফ্ল্যাটের বাবলুর মতো বলে আম্মু ডুডু খাবো।
ফট করে নিজের বক্ষপ্রদেশে দুইহাত দিয়ে ক্রস করে ঢেকে ফেললো। সময় নষ্ট না করে ছুটলো বসার ঘরের দিকে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ২৩