Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ২৪

নীতিহীন রাজ পর্ব ২৪

নীতিহীন রাজ পর্ব ২৪
আশিকা আক্তার সোহাগী

“চোখের সামনে কোন ঘটনা যদি বেঠিক মনে হয় তাহলে খুব সহজেই দ্বায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যায়।আবার সঠিক মনে হলে উল্টোটাই ঘটে।”
উপর তলার আন্টি এসে নিবিড়ের ফ্ল্যাটে সাহায্য চান।উনার কন্যা সুইসাইড এটেম্পড করেছে।দরজা ভাঙ্গতে হবে।নিবিড়ের কোন হেলদোল হলো না।সে নিচের গার্ডদের ডাকতে বলল।আরও জানালো সে নিজেই এক্সিডেন্ট করে আহত।
জিয়ানা পাশ থেকে শুনে এগিয়ে গিয়ে বলল,

-চলুন আমি দেখছি।
নিবিড় হাত টেনে ধরে নিচু গলায় বলে ,
-রাত বাজে দুইটা। তুমি নাচতে নাচতে অপরিচিত এক বাসায় যাচ্ছো বেকুব কোথাকার।
তখনই জিয়ানা উপরোক্ত কথাটা বলে,
-ঘটনা এড়িয়ে গেলে দ্বায়িত্ব থেকে কেটে পড়া সহজ। একটা মানুষের জীবন মরণ প্রশ্ন। তাছাড়া মনে হচ্ছে আমি আর আপনি দুইজনই দ্বায়ী এই ঘটনায়।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

নিবিড় কপালে ভাজ করে ফেললো কিন্তু কারণ জিজ্ঞেস করার আগেই জিয়ানা সেই আন্টির পেছন পেছন চলে গেলো।জেনি কখন জানি ঘুমিয়ে পড়েছিলো সোফাতেই। সবার কথায় ঘুম ভাঙে। আর জিয়ানার পেছনে সেও আগালো।শেষে বাধ্য হয়ে নিবিড় ,মুসাদ্দিক আর আকাশও গেলো সেদিকে।
মুসাদ্দিক আর আকাশ দুইজনি ফিসফিস করে একটু আগের ঘটনা বলছে। বেঁচে থাকতে তারা নিবিড়ের রোমান্স দেখতে পারবে এই যেনো অকল্পনীয়। দুইজনই নিবিড়ের গর্জনে ভেবেছে ,জিয়ানার কাহিনী খতম। মেরে ভস্কিয়ে ফেলে রেখেছে হইতো। কিন্তু গিয়ে দেখে সম্পুর্ন উল্টা ঘটনা।

জিয়ানা গাইগুই করছে আর ঠেলছিলো নিবিড়ের কাধ ধরে । নিবিড়ের নড়াচড়া নেই দেখে বলে উঠে,
-আমি আশি কেজি পর্যন্ত ওয়েট নড়াতে পারি। আপনার ওয়েট কি দেড়শো কেজি নাকি? আরেহ উঠুন। আমি ভর্তা হয়ে গেলাম। সাম ওয়ান হেল্প মি।এই লোক আমাকে পিষে মেরে ফেললো। এই বেটা ভোম্বল উঠ।
জিয়ানার চিৎকারে তাকে আরও জ্বালনোর জন্য নিবিড় আরও একটু চেপে ধরে বলে,
-খুব তো অধিকার দেখাচ্ছিলা। এখন কেমন লাগে? জামায়ের ওয়েট যতই হোক বউকে সেটা সহ্য করতেই হয়। আজ এইভাবেই থাকবো।

জিয়ানার মুখের কাছে নিবিড়ের ডান বাহু পড়ায় সেখানে কামড় বসালো।নিবিড় একটু নিচে নেমে এসে সেও জিয়ানার নেক কামড়ে ধরলো।ফোরপ্লের সময় এই অংশটা মেয়ের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। জিয়ানার দন্তপাটি উন্মুক্ত হয়ে গেলো নিবিড়ের স্পর্শে। এতক্ষণ যে দুষ্টুমির মুডে ছিলো সেটা গায়েব হয়ে স্ট্যাচু হয়ে জমে রইলো।
এমন অনুভূতির সাথে প্রথম সাক্ষাৎ তার।চোখের কোনে জল নামের তরল উঁকি দিলো।মেয়েরা নিজের প্রথম অনুভূতি গুলো সবসময় মনে মনে যত্ন করে লালন করে থাকে।কিন্তু জিয়ানার ক্ষেত্রে দুইবারই এক্সিডেন্টাল। ভালোবাসা ছাড়া ছেলেরা আগাতে পারে। কিন্তু মেয়েরা যতক্ষণ না নিজের অনুভূতি নিয়ে নিশ্চিত হয় ততক্ষণ তারা সকল স্পর্শকে অযাচিত বলে মনে করে।

নিবিড়ের এই আচরণ জিয়ানার কাছে মনে হচ্ছে সেক্সু*য়াল টিজিং।এইবার তার ব্রেইনের রেড সিঙ্গনাল জ্বলে উঠলো।নিজের মাথা দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে নিবিড়ের কপালে আঘাত করলো।
নিবিড় এতক্ষণ কি করছিলো নিজেও জানে না।কপালে ঠুকা খেয়ে হুট করে জিয়ানাকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে যায়।আর জিয়ানা যেনো চুপসানো কাগজ থেকে ভাজ মেলে সোজা হলো।
নিবিড় হালকা গলা খাকি দিয়ে বলে,
-তুমি না কামড়ালে আমিও কামড়াতাম না। শোধবোধ ওকে?
জিয়ানা কোন প্রতিউত্তর করেনি।বসে নিজের নেক চেইক করে দেখে রাক্ষসটা কি করেছে।ওড়না ভালো করে পেচিয়ে দরজায় হাত দেয়ার আগে দেখে আকাশ উঁকি মেরে দেখছিলো তাদের।

মিনালের দরজায় বারকয়েক নক করলো সবাই। কোন সাড়াশব্দ না পাওয়াই। আকাশ মক্কু দরজায় আঘাত শুরু করলো। কিন্তু দরজা অনড়। মক্কু মিসেস রেশমার দিকে তাকিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করলো ,আরও বানান শক্ত দরজা।
নিবিড় দুইজনকে সরিয়ে সুস্থ পা দিয়ে তিন লাত্থি দিয়ে দরজা ছুটালো।এমন অবস্থাতেও জিয়ানা হাত তালিয়ে দিয়ে নিবিড়ের কাধে টেপ করে বলে ,
-সাব্বাস। এই না হলে জিয়ানার হাজবেন্ড।
নিবিড় একপ্রকার ঝটকা মেরে জিয়ানার হাত সরিয়ে দিলো।
সবাই ভেতরে গিয়ে দেখে মিরাল হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। নিবিড় দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছে।তার এইসব ইঁচড়ে পাকা মেয়েদের একদম পছন্দ না।সব সময় গায়ে পড়া সস্তা আচরণ করে।প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে সে দেখে যাচ্ছে ভেতরের দৃশ্য।
মিসেস রেশমা আর্তনাদ করে উঠলো।ঘুমের এক ফাইল টেবলেট খালি পড়ে আছে পাশে।

– আল্লাহ। কি সর্বনাশ হলো আমার। এটা কেনো করলি মা? ওকে হাসপাতালে নিয়ে চলো। তাড়াতাড়ি চলো।মরে যাচ্ছে আমার বাচ্চাটা।
জেনি গিয়ে উনাকে ধরলো।জেনির চোখে পানি কুলকুল করে পড়ছে।জিয়ানা এদের দিক থেকে নজর হাটিয়ে মিরালের কাছে গিয়ে চোখ টেনে আর হাত শুকে বলল,
-আমার কাছে একটা ট্রিটমেন্ট আছে।হাসপাতালে যাওয়া ছাড়াই কাজ হবে।ওকে ন্যাচারাল ওয়াশ করাতে হবে।মানে কঠিন বমি করলে পেট থেকে সব মেডিসিন বের হয়ে যাবে।বেশিক্ষ্ণ হয়নি খেয়েছে।এখনো তেমন রিয়েকশান করেনি।
মিসেস রেশমা আর্তনাদ করেই বলে উঠলো ,

-হ্যাঁ। প্রায় বিশ মিনিট আগেও আমার রুমে গিয়েছিলো।তোমরা ওকে বাঁচাও। আমার কেউ নেই এই মেয়েটা ছাড়া।
-আচ্ছা আকাশ ভাই ,নিচে উনার রুমে বিড়ালের পটি পটে স্যাসি মানে বিড়ালটার পটি আছে। সেটা আনোন তাড়াতাড়ি।
সবাই অবাক সাথে বিরক্ত হয়ে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু নিবিড় মিটিমিটি হাসছে।জেনি ধমকে উঠলো,
-জিয়ু প্লিজ এমন সময়ে রসিকতা করতে নেই।আকাশ ভাই মেয়েটাকে উঠান নিচে যেতে হবে।
-ওয়েট ওয়েট। ব্যাস্ত হতে হবে না।আমি ফাজলামি করছি না।মানুষের গু হলে বেশি কাজে দিতো।এখন যেহেতু সেটা নেই তাই বিড়ালের টা দিয়েই চলবে।পানিতে বিড়ালের গু গুলিয়ে ওকে খাইয়ে দিলে বমি হবে।পেটের সব বের হয়ে যাবে। হাসপালের ওয়াশের চেয়ে কষ্ট কম হবে এতে। আন্টি আপনি রাজি?

-যা ইচ্ছা করো মা। আমার মেয়েকে বাঁচাও বলে উনি ফ্লোরে বসে পড়লেন।ভদ্র মহিলা ঘেমে যাচ্ছেন।জেনি খুবই বিরক্ত জিয়ানার উপর। সব সময় এমন হেয়ালি করলে চলে।আজ বাসায় গিয়ে এতদিন যেটা করেনি আজ সেটা করবে। প্যাদানী দিতে হবে এই মেয়েকে।
কেউ যাচ্ছে না দেখে জিয়ানা বলল,
-আমি গিয়ে নিয়ে আসি।
মিনিট পাঁচেক পর জিয়ানা ফিরে আসে একটা কাচের গ্লাসে কালচে গাঢ়ো কুৎসিত এক তরল নিয়ে। সবার আগে আকাশ ব্ল্যা করে রুমের এটাস বাথরুমে ঢুকে গেলো।অন্যদিকে মিসেস রেশমা জিজ্ঞেস করলো ,

-সত্যি সত্যি এটা ওকে খাওয়ালে বমি হবে? ক্ষতি হবে নাতো?
নিবিড় দরজা থেকে বলল,
-অবশ্যই কাজ হবে।আপনারা ভালো ভাবে হাত পা চেপে ধরুন।
জিয়ানা এগিয়ে গিয়ে বিছানায় একপা উঠিয়ে বসে সেই মিরালের কাছে ঘেঁষেছে ওমনি মেয়েটা লাফ দিয়ে উঠে বলে ,
-আমি কিছু খাইনি।আমি কিছু খাইনি।একটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছি শুধু। বাকিগুলা কমোডে ফ্লাশ করেছি।
মিসেস রেশমা ফ্লোর থেকে উঠে কষিয়ে একটা চর মারলেন। বাকিরা হতভম্ব। মিরাল গাল ধরে চিৎকার করে কান্না করে বলে উঠলো ,

-নিবিড় ভাইকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।উনি কেনো অন্য মেয়েকে বিয়ে করবে।আমি উনাকে ভালোবাসি।আজ দুইবছর থেকে উনার জন্য নিজেকে পরিবর্তন করে চলেছি।তবুও কেনো উনি আমার দিকে তাকান না?
এবার আকাশ আর মক্কুর চোয়াল ঝুলে পড়লো।এইটুকু পুচকি মাইয়া বলে কি? মক্কু একবার নিবিড়ের দিকে তাকালো।নিবিড় প্রতিক্রিয়াহীন দাঁড়িয়ে। জিয়ানা হাতের গ্লাসটা সাইড টেবিলে রেখে মিরালের থুতনি ধরে বলে,
-আমাদের স্বাভাবিক বিয়ে হয়নি।আর স্বাভাবিক বিয়ে হলেও তুমি এত ভেঙে পড়ছো কেনো পাগল মেয়ে। আরও তো তিনটা সিট খালি আছে।উনার আরও তিনটা বিয়ের অনুমতি আছে।তোমার বয়স অনুযায়ী তুমি তিন নাম্বার বিবি হতে পারবে।ফিকার নট প্রিটি লেডি।
জেনি এগিয়ে এসে জিয়ানার পিঠে আলতো চর মেরে বলে ,

-উল্টাপাল্টা কথা বলিস নাতো। এমনিতে অল্প বয়স ফ্যান্টাসিতে ভোগে বেশি।এইসব বললে আরও বিগড়ে যাবে।
মিরালের দিকে তাকিয়ে বলে,
-শোন মেয়ে তুমি যথেষ্ট সুন্দরী একটা মেয়ে।বয়সও অল্প। উনার চেয়ে আরও ভালো কাউকে পাবে।আর এইসব নাটক করবে না কখনো।রাখাল আর বাঘের গল্পটা জানো তো?পরবর্তীতে তোমার সত্যি সত্যি কিছু হলে আর কেউ বিশ্বাস করবে না।আর তোমার আম্মুর অবস্থা অনেক বেশি খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।যদি স্ট্রোক করতেন? তোমার কি হতো?
মিরাল কান্নার গতি বাড়িয়ে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে ,

-তুমি ওকে ডিভোর্স দিয়ে দাও। আমি সত্যি ওকে খুব ভালোবাসি।তাকে আমি অনেক ভালো রাখবো। বিশ্বাস করো। আমি অত ছোট না।সব বুঝি আর পারিও।
জিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এই হলো তার কপাল যার না গোপাল। কোন কিছু শুরুর আগেই শেষ হয়ে যায়। নিজে ইচ্ছে করে না আগালেও নিয়তি ঠেলে ধাক্কিয়ে এক জায়গায় জোড়া লাগাবে। আবার পরক্ষণেই টেনে হিচড়ে সব ছিন্নভিন্ন করবে।
জিয়ানা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

-তোমার ওও যদি রাজি থাকে আমার আপত্তি নেই।
তারপর রুম থেকে বের হওয়ার জন্য নিবিড়কে ডিঙিয়ে যাওয়ার সময় নিবিড় সামনে দাঁড়িয়ে থামালো তাকে।কথাবার্তা ছাড়াই নিজের বড় থাবা দিয়ে জিয়ানার ছোট চোয়াল চেপে ধরে বলে,
-বলেছি না অতিরিক্ত কথা বলবে না?
জিয়ানা চোয়ালে বাঘের থাবা নিয়েই রক্তচক্ষু করে তাকিয়ে বলে,
-কথায় কথায় মারা আপনার মুদ্রাদোষ নাকি? এখন একটা খেয়ে দেখুন কেমন লাগে।
বলে নিজে হাত উঠালো কিন্তু গাল পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই নিবিড় হাত আটকিয়ে ফেলে। হাত ঝটকায় ছাড়ানোর সাথে সাথেই মিরাল দৌঁড়ে এসে নিবিড়কে জড়িয়ে ধরেছে। এখন জিয়ানার নিজেকে ক্যাবলা ক্যাবলা লাগছে। তাই আস্তে করে সেখান থেকে সরে এলো।
জিয়ানার চোখের অপটিক নার্ভ আর মস্তিস্ক যেখানে মিলিত হয় যেখানে একটা চিলিক টাইপ কিছু অনুভূব করলো।সেদিকে বিশেষ নজর না দিয়ে বের হয়ে গেলো। আর নিজেকে শান্ত করতে গুনগুন করে গান গাইলো ,
“পাগলা তিতা মিঠা বুঝে না
পাগলারে জিলাপি দিয়ো না”

দশ বারো জন উলঙ্গ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ শরীরে লাল রং নাকি রক্ত মাখা বুঝা গেলো না। কিন্তু মুখে কালো মুখোশ পড়া।বিরাট বড় একটা বদ্ধ কামরায় মাঝখানে শুধু একটা মোমবাতি জ্বলছে।অবছা অন্ধকার ঘরের কোনায় একটা বেদী আর মাঝখানে পেন্টাগনের চিহ্ন।উপস্থিত সকলেই মাথা ঝাকিয়ে কি যেনো একাধারে ঝপে যাচ্ছে।
সামনে ছাগলের মাথার মতো শিং ওয়ালা হেল স্যাটানের মুর্তি। তার চারপাশে বাইবেলের ছেড়া পাতা বিছানো।যার মানে হচ্ছে এখানে উপস্থিত সবাই খ্রিষ্টান ধর্ম থেকে বের হয়ে শয়তানের শিষ্য হয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পর একজন লোক একটা কিশোরী মেয়েকে কালো আলখাল্লা পড়িয়ে শয়তানের পায়ের কাছে নীলডাউন করে বসালো।পাশের সবার ঝপাঝপি আরও বেড়ে গেলো। সাথে সাথে বয়স্ক লোকটাও উচ্চারণ করতে থাকলো সেই সব নিষিদ্ধ মন্ত্র। শয়তানের পায়ের কাছ থেকে একটা ভোতা মাথাহীন অস্ত্র বের করে এক কোপে কিশোরী মেয়েটাকে বলি দিলো।

হইহই করে উঠলো উপস্থিত সকলেই। পাশ থেকে একজন এসে কিশোরীর শরীরের রক্ত সংগ্রহ করলো একটা পাত্রে।তারপর সে গরম রক্তের অর্ধেক দিয়ে বয়স্ক লোক নিজে গোসল করলো আর বাকিটুকু নিয়ে গোপন কামরায় প্রবেশ করলো। এবং পূর্বের মতই নান্দনিক কক্ষের মাঝখান থেকে বের হয়ে এলো এক রাজকীয় কাফিন আর ঘুমন্ত এক রমনী। তাকেও মাখানো হলো সেই রক্ত দিয়ে।
জগতের জঘন্য মস্তিষ্কের উন্মাদনায় বলি হয় নিরীহ কিছু প্রাণ। নাপাক কোন ধর্মের বিশেষত হতে পারে না।শয়তান কোন প্রভু হতে পারে না।সকল ধর্মেই যেখানে পাক পবিত্রতার কথা বলা হয়েছে। সেখানে কিছু বিকৃত মস্তিষ্ক অপবিত্রতাকে বেছে নিয়েছে।
নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে কত শত অন্যায় করে যাচ্ছে উক্ত শয়তান পূজারী ব্যাক্তিটি। নাকি কোনকিছুর মোহে সম্পুর্ণ অন্ধ হয়ে করে কাঠের পুতুলের মতো চালিত হচ্ছে শক্তিশালী কোন চক্রের মাধ্যমে?

পৃথিবীতে সবাই সবকিছু পায় না।অনেকেই কোন কিছুই পায় না।যারা কিছুই পায় না,তাদের আবার পাওয়ার অত তাড়াহুড়ো নেই।খোলা আকাশের নিচে একটা জীবন তারা আজ আছে কাল নেই ভেবে কাটিয়ে দিতে পারে।তেমনই জিয়ানা একজন। এদেশে পালক সন্তানকে বাবা মা না জানালেও আশেপাশের মানুষ আত্মীয় স্বজন প্রতিনিয়ত ইশারা ইংগিতে বুঝাবে এই পালিত সন্তান।একটু বুঝনা ওয়ালা হলেও পালিত যে সে নিজেও বুঝতে পারে নিজের পরিচয়। জিয়ানা একসময় এটা সেটা নিয়ে জিয়াউলের কাছে খুবই বায়না করতো।বায়না করার লোক সেই একজনই।জিয়াউলের থিসিসে জিয়ানা অবশ্য বুঝতোও সব।শুধু বুঝেনি তার জার্নালিস্ট হওয়ার ব্যাপারটা।

জিয়ানা ভালো স্টুডেন্ট। তার মানুষের সেবা করতে ভালো লাগে। ছোটবেলায় সব বাচ্চারা যেমন বলতে পছন্দ করে “আমি বড় হয়ে ডাক্তার হবো ” ঠিক তেমনই জিয়ানারও ইচ্ছা ছিলো ডাক্তার হবে।মানুষের ব্যাধি সাড়াবে। কিন্তু এইচএসসির পর তাকে মেডিক্যালের ফর্মটা পর্যন্ত ফিলাপ করতে দেয়নি। জিয়ানা অনেক চিল্লাচিল্লি করেছিলো। ওইটাই শেষ বায়না ছিলো।
তাই জিয়ানা কারো কাছে আশাভরসা রাখে না।তবে মানুষ্য প্রজাতি হওয়াই মনের সংগোপনে লালিত একটা সুপ্ত ইচ্ছা তারও রয়েছে।জীবনে একবার শুধু নিজের মাকে ছুঁয়ে দেখতে চায়।মায়ের বুকে একবার মাথা রাখতে চায়। হঠাৎ মনে হলো তার তো আসল বাবাও আছে।উনার কথা কেউ বলে না কেন? এমনকি জিয়ানাও জিয়াউল হকের আদরে সে নিজ পিতার কথা মাথাতেই আনেনি কখনো।

এমন যদি একটা মিরাকল হতো ,তার বাবা মা দুইজনই ফিরে আসতো। হতে পারে না? হলে কি ক্ষতি হবে কারো?নিশ্বাস ভারি হয়ে উঠলো জিয়ানার।কাল পর্যন্ত তো একাই ছিলো। উদ্দেশ্য একটাই অন্যায়ের সাথে কোন আপোষ না। আগে পিছে কেউ নেই। কারো উপর বিন্দু মাত্র আশা নেই।নিজের একান্ত বলতে কেউ নেই। শুধু একা জিয়ানা নিজেই নিজের পরমাত্মীয়। আজ নিবিড়ের বুকে অন্য মেয়েকে দেখে কেমন যেনো একটা লাগলো জিয়ানার। নিবিড়ের সাথে তার স্বাভাবিক সম্পর্ক কখনোই হবে না।নিবিড় আগাবে না। আর নিবিড় না আগালে জিয়ানার আগানো প্রশ্নই উঠে না।

নিচু মাথা উঠিয়ে গগন পানে চাইলো।মেঘলা চাঁদহীন কালো আকাশ। আচ্ছা জিয়ানা যদি তারা হতো। এই তুচ্ছ ক্ষুদ্র মানবী হয়ে কি লাভ? পৃথিবীর অক্সিজেন আর খাবার নষ্ট ছাড়া সে কি কোন কাজে আসবে? তার চেয়ে ওই দূরের নক্ষত্র হওয়াই ঢের ভালো। দিনে হাপিস ,রাতে টিমটিম করে জ্বলবে আর মহাকাশে মনের সুখে নেচে বেড়াবে।
জ্ঞানী গুনিরা বলেন ,সৃষ্টিকর্তা যাকে ভালোবাসেন তাকে দুনিয়ার জীবনে অনেক বেশি কষ্টে আর নিঃসঙ্গ রাখেন।জিয়ানা তারাদের থেকে নিজর দৃষ্টি সরিয়ে ফাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে তর্জনী আঙুল সোজা করে বলে,
-আল্লাহ আমাকে এত ভালোবাসো কেনো?
হাতে অল্প খুচা জাতীয় কিছু অনুভব করে নিচু হয়ে তাকিয়ে দেখে একটা মশা রক্ত খেয়ে পেট ঢোল বানিয়ে ফেলেছে।

-এই যে ক্ষুদ্র চোর? আয়ু মাত্র বাহাত্তুর ঘন্টা নিয়ে দেদারসে অন্যের জিনিস চুরি করে খাচ্ছিস।আর আমি বেশ লম্বা একটা আয়ু নিয়েও নিজের জিনিসে অধিকার দেখাতে পারি না। অনেক খেয়েছিস এবার হাট।নাহলে তোর পেট ফাটিয়ে দিবো।
বলে অল্প একটু ফুঁ দিলো।এতে মশাটা নড়ে উঠলো কিন্তু অধিক পরিমাণে রক্ত খাওয়াই সে উড়তে পারছে না দেখে জিয়ানা খিলখিল করে হেঁসে দিলো।
পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চেয়ে দেখে নিবিড় দাঁড়িয়ে।
-আই থিংক দ্যার ইজ সাম থিং রং ইন ইউর হেড। রাত প্রায় তিনটা কেউ এমন ভূতের মতো বাহিরে বসে থাকতে পারে? সারা বিল্ডিং খোঁজে আমরা হয়রান আর তুমি এখানে বসে পাগলের মতো হাঁসছো?
-আমাকে খোঁজতে হবে কেনো?আপিকে টেক্সট করেছি নিচে আছি। সে এখনো আসছে না কেনো? ঘুম পাচ্ছে আমার। একদিন চূড়ান্ত লেবেলের সমাজসেবা করেছি।আগামী একমাস রেষ্ট নিতে হবে শুধু।
-হুম বিখ্যাত সমাজসেবী মিসেস নিবিড় তো আপনি বুঝলেন কিভাবে ওই মেয়ে নাটক করছে?
-সেজেগুজে কে সুইসাইড এটেম্পড কর?
-মানে?

-প্রথমে সব টেবলেট বাথরুমে ফ্লাশ করেছে।তারপর ফেসওয়াস দিয়ে মুখ ধুয়ে কমপেক্ট পাউডার মেখেছে।আমি হাত শুঁকে মেডিসিনের বদলে প্রসাধনীর গন্ধে বুঝেছি।তারপর মাস্কারা সহ লিপ গ্লোজ সব এপ্লাই করেছে।কারণ সে জানে তার মা আপনার কাছে সাহায্য চাইতে যাবে।আর আপনি আসবেন।আপনার চোখে নিজেকে সুন্দর প্রমাণ করতে এইসব এক্সট্রা কারিকুলাম। বুঝেছেন?
-ভালোই সাজগোছ সম্পর্কে জানো দেখছি।আমি তো ভেবেছিলাম ওইসবে কোন আগ্রহ নেই তোমার।
-এসব জানার জন্য ডিপ্লোমা করা লাগে না।ওই দেখুন আপনার বুকের কাছে সাদা পাউডার লেগে আছে।
নিবিড় পাঞ্জাবি ঝাড়া শুরু করলো দেখে জিয়ানা তিরস্কার করে বলে,

-আহা ঝাড়ছেন কেন? আপনার তিন নাম্বার বউয়ের স্মৃতি।
নিবিড় জিয়ানার বাহু ধরে হেচকা টানে দাড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-ভেতরে যাবে নাকি রাস্তায় রেখে আসবো?
-শুকরিয়া। বহাত চিন্তা করেছেন আব মেহেরবানী করে আপিকে একটু বলবেন সে যদি আর পাঁচ মিনিটের মাঝে না আসে আমি একাই চলে যাবো।
-এতরাতে রাস্তায় কি হতে পারে তোমার আইডিয়া আছে? নিজেকে ওয়ান্ডার ওমেন ভাবা বাদ দাও। অহেতুক তর্ক আমার পছন্দ না। দুইমিনিটের মাঝে ভেতরে আসবে।
-যাবো না আমি আপনার বাসায়। কি করবেন? যান আপনার তিন নাম্বার বউকে নিয়ে আসুন।
হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে বলে উঠলো জিয়ানা।

-ওয়েট আ মিনিট। তুমি কি জেলাস?
-জেলাস মাই ফুট।আপনারা ঝাপটা ঝাপটি করুন কিংবা বাসর সেড়ে বাচ্চা ফুটিয়ে ফেললেও আই ডোন্ট কেয়ার। ঘ্যানঘ্যান করবেন নাতো। যান ফুটোন।
জিয়ানার সুর চাপা হলেও ঝাঁঝ অত্যন্ত কড়া।
-জিয়ানা ফার্দার আমার সাথে একদম বেয়াদবি করবা না।এখনো তুমি নিবিড়কে চিনোনি।
বলে কপট রাগ দেখিয়ে চলে গেলো নিবিড়। জিয়ানা আবার বসে পড়লো সেখানে। ভালো লাগছে না তার।কেনো লাগছে না জানে না।সব সময় ভালো যে ভালো লাগতেই হবে তার মানে নেই।

গভীর রজনী। চারপাশ সুনসান নীরবতা। বাতাসে বৃক্ষরাজির গুনগুন। চাঁদহীন কালো রাতে কালো পোশাকদারি জনা পাঁচেক লোক একটা দোচালা টিনের ঘরে বৈদ্যুতিক তার কানেক্টড করে দিলো। যার ফলে ওভারকারেন্ট বা সর্ট সার্কিটের কারণ হলো।এতে করে উচ্চ কারেন্ট প্রবাহিত হওয়া শুরু করলো টিনের ঘরের প্রতিটি কোণা।
প্রফেশনাল ইলেক্ট্রিশিয়ান ছাড়া এই কাজ অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ। অপরদিকে ঘরের মাঝে নিশ্চিন্তে ঘুমন্ত একজন সাধারণ গ্রেডের পিওন আনিস আর তার পুরো পরিবার।
একজন মুখোশদারি ইশারা করলো কারেন্ট কমিয়ে দিতে। যেনো মনে হয় ব্যাপারটা একেবারেই কাকতালীয় ভাবে ঘটেছে।

সকাল আর আসবে না কোনদিন এই পরিবারের। আহা ক্ষমতার জন্য ছোট একটা বয়ানে অকালে ঝরে যায় কত প্রাণ।তাই তো বলে ক্ষমতা যত বেশি তার অপব্যবহার ঠিক ততবেশি।
অথচ হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) বলেছেন,
দূরবর্তী একটা নদীতীরে একটা চর্মরোগগ্রস্থ ছাগী যদি মালিশ করার মত তেলের অভাবে কষ্ট পায় ,তাহলে হাশরের দিন সে সম্পর্কেও রাষ্ট্রপ্রধানকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
আর আমাদের দেশে ছাগী না সরাসরি মানুষ মারা যেনো রাজনীতিবিদ দের কাছে একটা শিল্প।অথচ আজকের ক্ষমতার চেয়ার কাল ক্ষমতা হারালে আর কাউকে চিনে না।

ভোর রাত পনে পাঁচটা। জিয়ানা এখনো সেই বিল্ডিংয়ের নিচে ফুটস্টেপ ওয়েতে বসেই আছে।জেনি এসে টেনে গেছে। মক্কু আর আকাশ এসেও কতক্ষন বসে থেকে শেষে মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে ফিরে গেছে।নিবিড় আসেনি আর একবারও। তবে তিনতলার বারান্দায় বসে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো জিয়ানার দিকে।
কত জেদি আর একরোখা একটা মেয়ে হলে এই সারারাত বাহিরে বসে মশার কামড় খেতে পারে।শেষে বাধ্য হয়ে একটা অয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিবিড় নেমে এলো।তার নিজের শরীরের নাজেহাল অবস্থা। পা ফুলে গেছে। হাতে চিনচিন ব্যাথা আছেই।তবুও মনের কোথাও একটা শান্তি শান্তি ভাব বিরাজমান। একান্তভাবে অর্জন করে নেওয়া এই পাগল নারী তার বউ ভাবলেই শরীরে শিহরণ জাগে যেনো। পাগলটাকে ভাগে আনতে যে তার ভালোই ধকল যাবে হাড়েমজ্জায় টের পাচ্ছে।

-বিয়ের শপিংয়ের আগে তোমাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো উচিত।
-চলুন একসাথে যায়।
-যে পাগল সে সবাইকে পাগল ভাবে শুধু নিজেকে ছাড়া।
-সেইম টু ইউ।
নিবিড় বুঝলো এর সাথে তর্ক করে লাভ নেই। নিজেও পাশে বসে পড়ে জিয়ানার হাত কাছে টেনে নিলো।মশার কামড়ে ফর্সা হাত লাল লাল হয়ে গেছে।
-দেখুন কত মায়া আমার মনে।দয়ার সাগরী। আপনার এলাকার মশাদের সারারাত আহার করালাম।
-বাকুয়াজ।
-শুকরিয়া।তবে আবার প্রমাণ হয়ে গেলো আপনি কিপটা।মশাদের যদি খাওয়ার ব্যবস্থা থাকতো আমাকে এভাবে কামড়াতে পারতো?
নিবিড় দুই আঙুল দিয়ে জয়ানার ঠোঁট টিপে বন্ধ করে রাখলো।টেপ রেকর্ডার একবার চলা শুরু করলে আর থামেই না।

তিমির কেটে যাওয়াই জিয়ানার নজরে আসলো নিবিড়ের কপালের সাইডেও অল্প আঘাত পেয়েছে।ক্ষত হাত নিয়েই জিয়ানাকে ফানজিডাল অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিচ্ছে যেনো ইচিং বন্ধ হয়।সত্যি জিয়ানার আরাম বোধ হলো। রাত জেগে আঘাতপ্রাপ্ত নিবিড়ের চোখ রক্তিম। সাথে সারা মুখেও কেমন ক্লান্তি ভাব। জিয়ানার মায়া হলো।আবার হাঁসিও পেলো।

-আমাদের লাইফের সেরা রজনী ছিলো এটা তাই না?
-সেরা রজনী যেদিন আসবে সেদিন তুমি অন্যরকম গ্লো করবে।
-হুম?
-কিচ্ছু না।তোমার জন্য সবাই জেগে ছিলাম।এমন উদ্ভট মস্তিষ্ক নিয়ে চলাচল করো কিভাবে? সারারাত এখানে বসে থাকার মানে কি?
-একমাত্র খুলা আকাশটাই আমার আপন আর নিজের লাগে। গোলমেলের জীবনে এক আকাশ আমার ঘর বাড়ি ,আত্মীয় স্বজন সব।আজই প্রথম না। আমি প্রায়ই সারারাত এইভাবে তারা দেখে কাটাই।আমার ভালো লাগে। আপনার ফ্ল্যাটটা সুন্দর তবে বড্ড ফাঁকা ফাঁকা। আমার কাছে এমন ফাঁকা ঘর নিঃসঙ্গ লাগে খুব।তাই যাইনি। তাছাড়া বিশেষ কিছু না।
জেনি নেমে এলো তখন। পেছনে মক্কু। আকাশ সোফাতে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।

-চলেন মহারানী।
তখনই মক্কুর ফোনে কল এলো।মক্কু বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,
-এত সাঝ সকালে কোন বা*লে ফোন দেয় রে।
হ্যাঁ বল।ভাইয়ের ফোন কাল এক্সিডেন্টের সময় ভেঙে গেছে। পাশেই আছে নে কথা বল।
ফোন হাতে নিয়ে বলে,
-ভাই মলয় ফোন দিছে আর্জেন্ট নাকি।
নিবিড় ফোন নিয়ে কানে ধরে দাঁড়িয়ে গেলো। থমথমে মুখ করে ফোন মক্কুর দিকে বাড়িয়ে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো ,

নীতিহীন রাজ পর্ব ২৩

-আমাদের হাওয়া হাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক বিয়ে না জিয়ানা।আমাদের বিয়ের জন্য গোটা একটা পরিবার জীবন দিয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী আর ত্যাগী বিয়ে এটা।
বলে মক্কুকে বলল,
-আনিস মামার বাড়ি সর্ট সার্কিটের কারণে আগুনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ভেতরে পুরো পরিবার ছিলো। পাশের দুইটা বাড়িতেও আগুন ছড়িয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি চল।

নীতিহীন রাজ পর্ব ২৫