নীতিহীন রাজ পর্ব ৩০
আশিকা আক্তার সোহাগী
হিউম্যান সাইকোলজির সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আমি যাকে ছেড়ে ভালো আছি,তাকে অন্য কারো সাথে ভালো থাকতে দেখলে আমি ভালো থাকি না।
সজীবের অবস্থাও সেইম।ছেড়ে গেছে কয়েকমাস হয়ে গেছে।বিয়ে করে রীতিমতো সংসারী হয়ে উঠেছে।প্রতিরাতে বউয়ের ছায়াই শীতল করে তনু মন।তবুও আজ জেনির হাস্যজ্বল মুখ তার সহ্য হলো না।জেনি না সজীবকে ভালোবাসে? সে কেনো তাহলে তাকে ছাড়া এত সুখী।
মক্কুর কাছ থেকে টান দিয়ে জেনিকে সরিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-ভরা মলে লোকজনের সামনে এইভাবে হাহা হিহি করতে লজ্জা করছে না ?ঠিকই তো বলেছিলে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে কখনই মেনে নিতে পারবে না।সেগুলো তাহলে শুধু কথার কথা ছিলো তাই না?
হঠাৎ এমন হেচকা টানে মক্কু আর জেনি দুইজনই হকচকিয়ে যায়।জেনি সজীবকে দেখে অবাকের চূড়ায় পৌঁছে গেলো।এই কোন সজীবকে সে দেখছে? স্বাস্থ্য ভেঙে অর্ধেক হয়ে গেছে।মাথা ভর্তি চুল যেনো সব বিলীন হয়ে গেছে অতলে।মাত্র তিনমাসে কারো এমন অবস্থা হয়? কিন্তু ধাতস্থ হওয়ার আগেই সজীবের ধারালো কথার ফলায় জেনির মগজে যেনো রক্ত টগবগিয়ে ফুটা শুরু করলো।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মক্কু সজীবকে দেখে একপ্রকার নেতিয়ে গেলো।জেনির দিকে তাকানোর সাহস পেলো না।যতই হোক চার বছরের সম্পর্কের প্রতিটা দিনের সাক্ষী সে নিজেই।কতবার জেনিকে গিয়ে বলে আসছে” সজীব ভাই ডাকে। সজীব ভাই ওইখানে অপেক্ষা করছে। ” নানা কথার বার্তা বাহক ছিলো।আজ কেনো যেনো সেই সবকিছুর জন্য বেশ হীনমন্যতায় ভোগছে।তাই আস্তে করে সরে আসবে বলে পেছনে ঘুরলো। কিন্তু এক পাও নড়তে পারলো না।জেনি হাত শক্ত করে আবার টেনে ধরেছে। তারপর গলায় কারেন্টের মতো তেজ নিয়ে বলে উঠলো ,
-মাইন্ড ইউর ল্যাজ্ঞুয়েজ মিষ্টার। আমরা হাহাহিহি করি কিংবা চুমাচুমি করি দ্যাটস নট ইউর কন্সার্ন।তোমার সাহস কি করে হলো পরপুরুষ হয়ে আমাকে টাচ করার?
সজীব অবাকের উপরে পৌঁছে গেলো। জেনি তাকে পরপুরুষ বলছে?গলা উঁচু করে শাসাচ্ছে।নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। জেনির দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-জেনি তুমি আমার সাথে এমন ব্যবহার করতে পারছো? আমাকে তুমিই বারবার ফিরিয়ে দিয়েছো। আম্মার হাই ব্লাড প্রেসার তাই উনি ছেলের বউ দেখতে চেয়েছেন বলেই আমি দ্রুত বিয়ে করেছি।আমাদের বিচ্ছেদে আমার কতটুকু দোষ ছিলো?
জেনি হাত উঠিয়ে সজীবকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
-সেসব অতীত।এখন আমাদের দুইজনেরই বর্তামান আছে।আমি অনেক সুখী আলহামদুলিল্লাহ মুসাদ্দিককে পেয়ে।আমার জন্য মুসাদ্দিকের চেয়ে উত্তম আর কেউ হতেই পারে না এটাও বিশ্বাস করি।কারণ তারই বাম পাজরের হাড় দিয়েই আমি তৈরি।আশা করি তুমিও সুখী তোমার সংসারে।দোয়া করি আরও অনেক সুখী হও। আর একটা কথা শুনেছিলাম “বিচ্ছেদ সব সময় একতরফা হয়। একজন বিচ্ছেদ চায়। আর একজন চুপচাপ মেনে নেয়।”
-তুমি যদি আমাকে না ফিরাতে তাহলে তো আজ পরিনতি অন্যকিছু হতো।তুমি নিজেই চাওনি জেনি।
-হ্যাঁ চাইনি।এইজন্য আল্লাহর চাওয়াটাই বেষ্ট হয়েছে।যদি আমাদের পরিনতি অন্য হতোও তুমি কি মন থেকে খুশী হতে সজীব? নাকি মুসাদ্দিকের মতো অন্তর থেকে মেনে নিতে পারতে?
কখনো কখনো গায়ের জোর কাজ না করলে গলার জোরই একমাত্র ভরসা।ঠিক আবার কখনো সবকিছু ছাপিয়ে যায় মনের জোরে। সজীবের এখন গায়ের জোর ,গলার জোর কিংবা মনের জোর কোনটাই নেই। না তখন ছিলো।মায়ের কথায় লক্ষ্মী ছেলের মতো মেনে নিয়েছে।এটা ঠিক মন থেকে জেনির প্রতি টান ছিড়ে গিয়েছিলো।সামাজিকতা কিংবা মানুষিকতার লেবেলের দিকে সজীবের অবস্থান হইতো সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
মক্কুর চোখে নিজের ওয়েট ধরে রাখতে তবুও বলল,
-দেখো আমি মক্কুর বড় তবুও তুমি আমাকে এখনো তুমি সম্মোধন করছো আর মক্কুকে আপনি বলে সম্পর্কের দূরত্ব বুঝাচ্ছো।অথচ কি সহজেই আমাকে পরপুরুষ বলে দিলে?
প্রশ্নটা করেই সজীবের কাছে মনে হলো নিব্বা মার্কা কথা বলে ফেলেছে।একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এমন লেইম যুক্তি কোন দিক দিয়েই যাচ্ছে না।
এবার মক্কু চোখ উঠিয়ে জেনির দিকে তাকায়।কি উত্তর দিবে সেই আশায়,
-কারন আমার স্বামী আমার কাছে অনেক সম্মানের।সে আমার মাথার তাজ।তাকে আমি সম্মানের সহিত আপনি বলে সম্মোধন করি।ভালো থাকবে।আর আমদের জন্যও দোয়া করবে।আল্লাহ হাফেজ। আসি।
বলে মক্কুকে একপ্রকার বগলদাবা করে হাটা ধরলো সামনে।সজীবের বুক কামড়ে উঠলো।সেদিন আম্মার কথাতে হ্যাঁ তে হ্যাঁ না করলে এই চমৎকার মেয়েটা তার হতো।অল্প চাহিদার সংসারী লক্ষ্মীমন্ত যেমন বউ পুরুষের কাম্য জেনি এক কথায় ঠিক তেমনই।
কিছুটা এসেই জেনি মক্কুর হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো।মক্কু হাত উপরে উঠিয়ে আগেই সারেন্ডার করে বলে,
-আমি কিছু করি নি মহারানী।আমি নির্দোষ।
জেনির রাগ পড়ে গেলেও হার মানলো না।গলায় তেজ নিয়েই প্রশ্ন করলো ,
-আপনার সামনে আপনার স্ত্রীকে অন্য কেউ বাজে কথা বলল ,আর আপনি ওন্দা বিলাইয়ের মতো না সরি প্যাঁচার মতোশুধু তাকিয়ে দেখলেন?
আগামী পনের দিন আপনার সাথে ব্রেকাপ।খুব শখ না আপনার বাসর করার? কাল রাতের স্বপ্নের মতোই স্বপনেই করুন সেটা। বাই
বলে গটগট করে চলে গেলো মক্কুকে ফেলে।
রাতে ফ্ল্যাটের খালার হাতে অখাদ্য খাবার খেয়ে চ্যাং মাছের মতো মুখ করে শুয়ে আছে জিয়ানা।জেনি আর তামান্না দুইজনই নিজ নিজ পতিদের সাথে বাহিরে খেয়ে এসেছে।এদিকে বেচারি জিয়ানা নিজে রান্নার র ওও জানে বিধায়, খালার কুখ্যাত টেলটেলে ডাল আর কাচাকাচা পিয়াজের ডিম ভুনা দিয়ে কোন প্রকার গিলেছে। আর মনে মনে নিবিড়কে গালিগালাজ করেছে ।
কমছে কম একশো বার শ্লার জামাই বলে গালি দিয়েছে।একদিনও বলল না ,কেমন আছো কিংবা কি খাচ্ছো? নিজে নিশ্চয়ই সব ভালো ভালো খাবার খাচ্ছে।খাক তার বদ হজম হোক। মিথ্যা হলেও তো একটু অভিনয় মানুষ করতে পারে। হাজার হলেও নতুন বউ। দূর ভাল লাগে বলে জিয়ানা উঠে বসে পড়লো।
জেনি জিয়ানার উসফিস লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলো ,
-কি রে এমন মুচড়া মুচড়ি করছিস কেন? পেট ব্যাথ?
-দূর পেট ব্যাথা না মনের ব্যাথা আপি।বুঝবা না।নিজেরা তো ডেট করে খেয়ে দেয়ে আসলা।আমাকে ফেলে গেছো টেলটেলে ডালের জগতে।কত্ত স্বার্থপর তোমরা ছ্যাহ।
পাশ থেকে তামান্না বলল,
-আমাকে ডেটের কথা বলো না ভাই।আমি গিয়েছিলাম বুড়োর সপ্তাহিক ওষুধ পত্র আর ফলোয়াপ ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা চেইক করতে। জীবন যৌবন এইভাবেই যাচ্ছে।তা তোমার তো ফাষ্টক্লাস একখান যৌবন পূর্ণ তনু আছে।এইভাবে ওয়েষ্ট করছো কেনো? নিবিড়কে বশ করে ফেলো।
-আমার যৌবনে ঠাডা পড়ে ভস্কায় গেছে।পোড়া যৌবন সুখের চোখে পড়ে না।
বলে হেঁসে কুটোকুটি হলো জিয়ানা।পাশ থেকে জেনি আর তামান্না সমসুরে একপ্রকার চিল্লিয়ে উঠলো,
-সুওওওওওখ!!!
জিয়ানা কপাল ভাজ করে জিজ্ঞেস করে ,
-এইভাবে টেনে চিল্লিয়ে উঠার মানে কি?
-নাহ না কোন মানে নেই।বিয়ের সাতদিনেই আমাদের জিয়ু হাড্ডাগোড্ডা নেতার নাম সরাসরি সুওওখ বলে সম্মোধন করছে। পুরাই হট ব্রেকিং নিউজ।
বলে মুখ টিপে হাসলো জেনি।
-বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো না?উনার নিবিড় নামটা আমার পছন্দ না।মানুষের নামের অর্থ কেনো কঠিন হবে।সুখটা ভালো প্লাস ছোট সাথে কিউট।নিইইবিইইড় কেমন নাম?
-ওকে ওকে। তোমার হাজবেন্ড তুমি সুখ দুখ যা ইচ্ছা ডাকো।আমাদের এতে কোন মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু তোমরা এমন এলিয়েনের মতো বিহেভ করছো কেনো? সারাদিনে একবারও কথা বলতে দেখলাম না নিবিড়ের সাথে। দুইজনই যদি মুখ ফিরিয়ে থাকো সম্পর্ক বিল্ডাআপ হবে কিভাবে?
তামান্না বেশ সিরিয়াস হয়ে প্রশ্ন করে জিয়ানাকে।
-আমাদের সম্পর্ক ড্রাইভওয়েতে পার্ক করা।কোন দিন যদি তুষারপাত হয় তবে হইতো জমবে। নইতো তোমার এই কথার বাস্তবিক চিত্র অলীকসম কল্পনা ছাড়া আর কিছু না গো তামান্না।
-কবুল বলেছো না মেয়ে।কবে কিভাবে পা পিছলে পড়বে নিজেও বুঝবে না।এই একটা শব্দের যে কি ক্ষমতা হাড়েমজ্জায় টের পাবে।কবে যে সে ফেটিসে পরিনত হবে গায়ের লোমকূপ পর্যন্ত টের পারবে না।
-আমি আসলে প্রচন্ড স্বার্থপর জানো?কারণ আমি মনে হয় কাউকেই গভীর ভাবে ভালোবাসিনি।এইজন্য গভীর ভাবে আঘাত পাওয়ারও পসিবিলিটি নাই।আশাহীন সম্পর্ক হয়? ভরসা ছাড়া সম্পর্ক বিল্ডাপ হয়? কোন প্রকার মনের টান ছাড়া দাম্পত্য জীবনের শুরু করা যায়?
-টান নেই তোর? সারারাত জেগে শুধু শুধু সেবা করেছিস সেটা এমনিতেই? সবকিছু এত জটিল করে যদি দুইজনই ভাবিস তাহলে বিবাহিত ট্যাগ নিয়ে ঘুরার দরকার নাই জিয়ু।মাসখানেক গেলেই মিউচুয়াল ডিভোর্স নিয়ে নিবি।তোর লাইফ পড়েই আছে।নরমাল একটা বিবাহিত জীবন কে না চায়?
বেশ বিরক্তমাখা কন্ঠে জেনি প্রশ্ন করলো। ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে দেখে তামান্না বলল,
-আস্তে আস্তে।মাত্র বিয়ে হয়েছে।একজন স্যাডিস্ট আরেক জন বাস্তবিষ্ট।এদেরকে নিজের মতো ছেড়ে দেয়াই ভালো।জিয়ানা কাল আমার একটা উপকার করবে প্লিজ?
-হুম নিশ্চয় বল।
-কাল আমার হয়ে বিউটি কম্পিটিশনের টোকেনটা কালেক্ট করে তুমি লাইনে দাঁড়িয়ে থেকো।আমার একটু কাজ আছে। কাঞ্চনদের ফ্যামিলি প্রোপার্টি উইল হবে কাল। আমার থাকতেই হবে সেখানে।পারবা না?
-আপি যাবে।আমার এই ঢংভং পছন্দ না গো। এককেজি রং মেখে কত্তগুলা মেয়ে হুদাই দাত কেলিয়ে সবার এটেনশন পাওয়ার জন্য হেলবে দুলবে, এতে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে।পরে থাবড় টাবড় মেরে বসবো।অহেতুক ক্যাচাল লেগে যাবে।মাফ করো আমাকে বইন পিলিজ।
দুইহাত দিয়ে ক্ষমা চাওয়ার মতো করে বলল জিয়ানা।
-আমি কিভাবে যাবো?আমার সেইম টাইমে ডিবেট কমপিটিশন আছে না? এইটুকু সহ্য করতে পারবি না?
-ওকে ওকে নিবো টোকেন।লেট করো না হ্যাঁ? আমার এলার্জি আছে এইসব কমপিটিশনে।
-লেট যদি হয়েই যায় তুমি একটু লাইনে অপেক্ষা করো ঠিক আছে? মেকাপ রুম পর্যন্ত চলে যেয়ো।আশা করি ততক্ষনে আমার হয়েই যাবে।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বড্ড অনিহা নিয়েই জিয়ানা রাজি হলো।
ইদানীং ভাইরাল একটা কথা শুনেছিস? “বন্ধুবান্ধব হইলো কু*ত্তার বাচ্চার মতো। হওয়ার সময় চৌদ্দটা হয় কিন্তু শেষ মেষ টিকে দুই তিনটা ”
সজীবের উদ্দেশ্যে নিবিড় বলল।সজীব জেনির এক্সিডেন্টের পর আর দেখা করেনি নিবিড়ের সাথে।এমনকি নিবিড় জেলে যে তিনমাস ছিলো সজীব একটা বারও খোঁজ নেয়নি।আজ হঠাৎ প্রোগ্রামের আগে এসে হাজির সে।
সজীব কাচুমাচু করে বলল,
-হ্যা রে ভাই ঠিকই বলছিস।তবে আমার নতুন চাকরি স্টেশন লিভ নিষেধ থাকায় এলাকায় আসতেই পারি নাই।তুই যে জেলে পড়লি তার পরেরদিন আমার জয়েনিং ছিলো।তারপর এই প্রথম এলাকায় আসলাম।তোরা সবাই এমন আচরণ করছিস যেনো আমি প্রচন্ড পর হয়ে গেছি।
বেশ হতাশ শোনালো সজীবের গলা। নিবিড় তার দিকে না তাকিয়ে বলল,
-ব্যাস্ত লাইফে সময় করে এসেছিস এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। সন্ধ্যায় এসে খেয়ে দেয়ে যাস।
তারপর বাহিরে বের হয়ে গেলো।সজীবের কাছে মনে হচ্ছে এই জায়গা তার পরিচিত না।আকাশ একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল,
-বসেন ভাই।কিছু নিবেন? নাকি ভাবি মারবে? যদি মারে তাইলে যানগা।হুদাই সংসারে অশান্তি কইরা লাভ নাই।
মক্কু এগিয়ে এসে সজীবকে হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরে বলে,
-ধন্যবাদ ভাই।অন্য কারো আপনার উপর কি অনুভূতি জানি না।তবে আমি আপনার উপর কৃতজ্ঞ।
তারপর সেও বের হয়ে যায় নিবিড় যেদিকে গিয়েছে সেদিকে।
জীবন ঠিক এমনই। এখানে বাস্তবতার ধার ধারতে গেলে মায়ার সম্পর্ক ছাড়তে হয়।মায়া্র সম্পর্ক গুলো প্রচন্ড স্বার্থপর হয়।সে অত বাস্তবতা বুঝে না। এখন স্বীদ্ধান্ত একান্তই নিজের উপর।মায়াকে জড়িয়ে ইন্টার্নাল শান্তিকে গ্রহণ করবো।নাকি বাস্তবতা মেনে এক্সটার্নাল হেপি ম্যান হিসেবে বাঁচবো।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সজীব নিবিড় যেদিকে গেছে সেও পা বাড়ায় সেদিকে।দুনিয়া ভেসে যাক নিবিড় তার আত্মার বন্ধু।দীর্ঘদিনের বেকার জীবনের একমাত্র সাহারা ছিলো।বাবাহীন বয়স্ক মাকে নিয়ে এই সমাজে টিকে থাকা অত সহজ হতো না ,যদি নিবিড় সাহায্য না করতো। কতদিন পিকনিকের নাম করে ব্যাগে ব্যাগে বাজার করে নিয়ে চলে যেতো।হইহই করে সজীবের মায়ের হাতের রান্না খেয়ে চলে আসতো।সজীব সবই বুঝতো সরাসরি বাজার সদাই দেয়া ভালো দেখাই না বিধায় নানা অযুহাত দিতো।মাঝেমধ্যে নিজের জন্য অহেতুক বেশি বেশি কিনে ফোন দিয়ে বলতো এত দিয়ে কি করবো। নষ্ট হবে। তুই এসে নিয়ে যা।
সজীবের জয়েনিং এর একসপ্তাহ পরেই কঠিন টাইফয়েড ধরা পড়ে। অনেকদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়।টায়ফয়েডে মাথার চুল অর্ধেক পড়ে গেছে। অল্পবয়সী বউ ধানাইপানাই শুরু করেছে প্রথম থেকেই। আন্ডারস্ট্যান্ডিং শূন্য থেকে মাইনাসের দিকে যাচ্ছে। সেদিন যখন জেনি জিজ্ঞেস করেছিলো “তোমার আম্মা কি মানবে? উনাকে সব ক্লিয়ারলি বলার পর উনি যদি রাজি থাকে তবে আমার আপত্তি নেই।”
এরপর আর সজীব যোগাযোগ করেনি।এটা কখনই সম্ভব না।কোন মা তার ছেলের জন্য ধর্ষি*তা মেয়ে বউ করে নিবে না।নিজেকে দিয়েও চিন্তা করা যায় না।বাস্তবতা বড্ড কঠিন।
ক্যাম্পাসে ঢোকার সময় গেইটের কাছে থেমে গেলো জিয়ানা।কালচারাল ফেষ্টের জন্য ছোটখাটো মেলাও বসেছে। গেইট বরাবর রাস্তার ফুটপাত ধরে চারপাঁচ টা দোকান।
কাচের চুড়ির দোকানে সব ঝলমলে চুড়ি দেখে মুচকি হাঁসলো। এই ভয়ংকর জিনিস মানুষ কেমনে পড়ে।একে তো কাচের তারপর আবার চেপে পড়তে হয়।হঠাৎ নারী মন ভেতর থেকে বলে উঠলো “একবার ট্রাই করেই দেখ। ”
নিজের দিকে তাকিয়ে ইচ্ছাটা গিলে ফেললো।ট্রি-শার্ট আর র্যাম্পারের সাথে কাচের চুড়ি নিশ্চয়ই খুবই হাস্যকর কম্বিনেশন।
জিয়ানাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে দোকানী জিজ্ঞেস করলো ,
-নিবেন আফা?
-কত করে মামা?
-ষাট টাকা করে।
জিয়ানা ভাবলো নিজের কিউরিওসিটির জন্য অহেতুক ষাট টাকা খরচের দরকার নাই।এই ষাট টাকা দিয়ে রাব্বির সকালের নাস্তা হয়ে যাবে।তাছাড়া জিয়ানা এখন দরিদ্র সীমার নিচে অবস্থান করছে।অহেতুক বিলাসিতা তার মানায় না।
মুচকি হেঁসে বলল,
-জীবনে দেখছেন আমার মতো কেউ আপনার কাস্টমার? ওই যে ন্যাকোঢ্যাকুরা আসছে তারা কিনবে।
সেখান থেকে এসেই টোকেন নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ায়।অনেকেই আড়চোখে দেখছে তাকে।কেউ কেউ মুচকি মুচকি হাঁসলো। ওইসবে জিয়ানার পাত্তা নেই।
পঁচিশ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়েই জিয়ানা সাতটা ফোন পেয়েছে।সবগুলা টিউশনি রিলেটেড। অদ্ভুত ব্যাপার সবগুলোই ছোট ছোট বাচ্চার প্রাইভেট। থ্রি ফোর ফাইভ পর্যন্ত। আবার সেলারি বেশ ভালো।জিয়ানা বারবার নিজের নাম্বার বলে তাদের কাছে কনফার্ম করছে।কোথাও ভুল হলো নাতো।
প্রথম তিনটা কনফার্ম করলো।বাকিগুলা পরে জানাবে বলেছে।টোকেন নিয়ে আবার ভেতরে মেকাপের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।দুইবার তামান্নাকে ফোন দিয়েছে।মৌসুমী আর মিম দুইজনকে কয়েকবার ফোন দিয়েছে কিন্তু কেউ রিসিভ করেনি।মনে মনে বলল,
-চুন্নি গুলা সব আজ লাপাতা।আমাকে এমন বেকায়দায় ফেলেছে।আজ তাদের রাজ্যের কাজ একসাথে পড়েছে।কু*ত্তির অর্জিনাল ভার্সন সব।
আচম্বিতে কারো উপহাসে জিয়ানার মাথা গরম হয়ে উঠলো ,
-একি আমাদের টম বয়ের কি মিস ক্যাম্পাস হওয়ার ইচ্ছা হলো নাকি?
পাশ থেকে আরেক টিজ করে বলে উঠলো ,
-মিস না মিসেস হবে।ব্রুইট শুনিস নি?
-সেসব বাদ দে।কেউ নিজেকে একবার মিররে দেখলেই তো বুঝে যায় কার স্থান কোথায়!
জিয়ানাকে যে তারা খুচাচ্ছে সেটা সে খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারলো।এতক্ষণ সে চুপচাপ শুনে আসলেও শেষের কথাটা আর নিতে পারলো না।
-আরেহ আরেহ সত্যি সত্যি যদি নেতার বউ হয়েই যায় তবে দেখবি এইসব ছোটখাটো বিউটি কম্পিটিশন কেন সে মিস ইউনিভার্সেও উইন হচ্ছে।
বলে হোঁ হোঁ করে হেঁসে উঠল মেয়ে তিনটা। জিয়ানা মাস্ক খুলে ব্যাগে রাখলো আর ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলো তিন নমুনাকে।
একটা একেবারেই শর্ট। পাঁচ ইঞ্চির হাই হিল পড়া। দ্বিতীয়টার স্কিনের অনেক একনি। মেকাপ দিয়েও ঢাকতে পারেনি।তৃতীয়টা ঠিকঠাক কোন সমস্যা নেই। কিন্তু চিকন ফিতার ফ্রক পড়া। ঘাড়ের কাছে ফিতায় ফসকা গিট দেয়া।
হঠাৎ জিয়ানা আমরা করবো জয় গানের শিষ বাজানো শুরু করলো। জিয়ানার চিল মুড দেখে খোচানি গ্রুপ আশা হতো হয়ে চুপসে গেলো।
পানি খাওয়ার নাম করে ব্যাগ থেকে বোতল বের করে অর্ধেক পানি ফেললো দ্বিতীয় মেয়েটির মুখে। হকচকিয়ে উঠে সবাই যখন ছিটকে পড়লো। গোপনে প্রথম মেয়েটির হিল বরাবর জিয়ানার জুতার মাথা দিয়ে একটা ছোট কিক করায় একটা হিল পুট করে ভেঙে গেলো।আর জিয়ানার সমান মেয়েটা হঠাৎ জিয়ানার কাধ সমান হয়ে গেলো।
এসব হটকারিতায় তৃতীয় মেয়েটির ডানপাশের ফিতাটা অল্প বাজিয়ে রেখে টান দিয়েছে সংগোপনে।যেকোন মুহূর্তে সেটা খুলে যেতে পারে।
হটকারিতা থামলো মাইকের এনাউন্সমেন্টের মাধ্যমে,
“সবাই সবার পরিধেয় পোশাকেই স্ট্যাজে হাজির হবেন। শুধু গতবারের প্রথম তিনজনের জন্য আলাদা ব্যাবস্থা আছে। তারা ডান সাইডের মেকাপ রুমে ঢুকে মেকাপ কমপ্লিট করুন।আর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেজ শো শুরু হবে।
জিয়ানা পড়েছে বিপদে। একজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো ,
-তামান্না আপনাকে পাঠিয়েছেন না? আসুন আমার সাথে।
বাধ্য হয়েই জিয়ানা উনার পেছন পেছন গেলো।
তাবু দিয়ে আলাদা আলাদা ছোট্ট খুপড়ির মতো অস্থায়ী মেকাপরুম বানানো হয়েছে স্টেজের পাশেই।জিয়ানা কাচুমাচু করে বলল,
-আর একটু পরেই চলে আসবে তামান্না।তার অত সময় লাগবে না মেকাপ নিতে।সে এমনিতেই বেশ সুন্দরী।
বোকা হেঁসে উঠলো বলেই।ভদ্রমহিলা জিয়ানার থুতনিতে হাত দিয়ে বলল,
-তোমার চেহারা তো মাশা-আল্লাহ।একেবারেই আর্ট করা।একটা রিকুয়েষ্ট করবো রাখবে? প্লিজ?
-জিয়ানা এত আন্তরিকতায় না করতে পারলো না।আস্তে করে উত্তর দিলো ,
-সম্ভব হলে অবশ্যই রাখবো।
-তামান্না আসতে আসতে আমি তোমাকে একটু মেকাপ করতে চাই। প্লিজ? এত সুন্দর স্কিন আর চোখ মুখের মানুষ খুব কম পেয়েছি।তোমাকে আর্টিফিশিয়াল কিছু তেমন দিতে হবে না।আমার ক্যারিয়ারে অনেক ছোট বড় অনেক মডেলদের মেকাপ করেছি তবে তোমাকে মেকাপ করতে খুব লোভ হচ্ছে। করে দেই প্লিজ?
জিয়ানা লাফিয়ে উঠে বলল,
-এ মা না না।শুধু শুধু ওয়েষ্ট হবে আপনার সময় আর মেকাপ।আমি মেকাপ নিয়ে বাহিরে যেতে পারবো না দুঃখিত।
ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে হাত ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বলল,
-আমি নিজেই মুছে দিবো। তোমাকে শুধু একটু দেখবো কেমন লাগে প্লিজ?
অনুরোধের জন্য নাকি মাঝেমধ্যে ঢেকিও গিলতে হয়। আজ জিয়ানা না হয় মেকাপ করলো। তারপর আস্তে করে বলল,
-ঠিক আছে।
ভদ্রমহিলা জিয়ানাকে উপরের ড্রেস খুলে একটা মিনি গাউন টাইপ সিল্কের একটা ড্রেস দিলো। অযুহাত হিসেবে বললো কালো ড্রেস মেকাপে নষ্ট হয়ে যাবে। গাইগুই করেও জিয়ানা সেটা পড়ে বসলো চেয়ারে।
বিকট একটা চেহারা জিয়ানার চোখের সামনে যতবার ঝুকে আসে ততবার সে আল্লাহ আল্লাহ করে।না জানি কি করছে তার সাথে।মোটা ব্রাশ ,চিকন ব্রাশ, ফোমের মত গোল গোল ব্রাশ ,কালো ,লাল ,নোড ,ব্রাউন কত কালার ,কত জিনিস যে পড়লো মুখে সে হিসেব জিয়ানা রাখতে পারলো না।
ত্রিশ মিনিট পর ভদ্রমহিলা জিয়ানার হাত ধরে বলে উঠলো ,
-চলো চলো লেইট হয়ে যাচ্ছে।তামান্না স্টেজে চলে এসেছে।
জিয়ানা বেক্কেল হয়ে বলল,
-মানে? স্টেজে কখন গেলো।আর আমরা কোথায় যাবো?
ভদ্রমহিলা কোন উত্তর দিলো না।জিয়ানাকে টেনে তাবু থেকে বের করে সোজা নিয়ে দাঁড় করালো স্টেজে।যেখানে তামান্না আগে থেকেই দাঁড়িয়ে। জিয়ানাকে দেখে মুচকি হেঁসে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলল,
-চাঁদ নাকি কোন আসমানের পরী আমার সামনে দাঁড়িয়ে?
নীতিহীন রাজ পর্ব ২৯
জিয়ানার এতক্ষণে খেয়াল হলো স্টেজের সামনে অসংখ্য মানুষ। আর তারা সবাই তাদের দিকেই তাকিয়ে।জিয়ানা নিজেকে উল্টো ঘুরে যেই পালাবে ওমনি তামান্না খপ করে হাত ধরে হেলেদুলে আগাতে থাকলো সামনের দিকে।
ঠিক সামনাসামনি বিচারের আসনে বসা একজন দাঁড়িয়ে গেলো। হাত থেকে কলম পড়ে গেছে অনেকক্ষণ হয়।ঢোক গিলবে না শ্বাস নিবে সেটাও ভুলে গেলো বিচারক সুখনীল নিবিড়।
