Home কি করিলে বলো পাইবো তোমারে কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৬+৭

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৬+৭

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৬+৭
মুনমুন বুড়ি

হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিহি। এটা কি শুনলো সে। অভ্র এটা করেছে অভ্র? তিহি পুনরায় জিজ্ঞেস করলো মিহিকে—
— মিহি তুই কি বলছিস এইসব। তুই জানিস তুই কি বলছিস?
— আপু তুমি বিশ্বাস করো আমি সত্যি বলছি। অভ্র ভাইয়া ভালো মানুষ না, উনি অনেক খারাপ, অনেক অনেক। উনি তো আমাকে—
আর বলতে পারলো না মিহি। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল মিহি।
তিহি অবাকতার সুরে বললো—

— তোকে কি? তোকে কি করেছে অভ্র? বল।
— উ উনি আমাকে ধ ধর্ষণ—
ঠাস!
মুহূর্তেই মিহির গালে একটা সজোরে চড় পড়ল। মিহি ছলছল চোখে তাকালো তিহির পানে—
— আপু—
— চুপ। একদম চুপ। তুই কি ভেবেছিস, তুই যা তা বলছিস আমি সব বিশ্বাস করবো? ছোটবেলা থেকে তুই আমার সুখ দেখতে পারতিস না। মা বা বাবা কাউকে যদি আমাকে একটু কোলে নিত, তুই কান্নাকাটি শুরু করে দিতিস। মা বাবা সবকিছু সমান সমান, সব জিনিস যা আমাকে দিত তা তোকে দিত। তারপরও তোর আমার জিনিসের উপর নজর থাকতো। এতকিছুর পরও আমি তোকে ভালোবেসেছি। কিন্তু তুই তার কি প্রতিদান দিলি? ছি মিহি ছি।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— আপু তুমি আমাকে ভুল ভাবছো—
— ভুল? কি ভুল? কোনটা ভুল? তুই অভ্রর উপর এইসব অপবাদ দিচ্ছিস। আরে অভ্র তো তোকে ওই জংলি জানোয়ার এর কাছ থেকে বাচিয়েছ নইলে তো কবেই ওরা ছিঁড়ে খুঁড়ে খেত তোকে। আর কৌশিক? ওকে না ভালোবাসতিস তুই? ওর কথাও এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি? কিভাবে পারলি মিহি? এত নিচে নামতে কিভাবে?
তিহিকে বোঝানোর উদ্দেশ্যে মিহি তিহির কাছে আসতে চাইলে তিহি মিহিকে বাধা দিয়ে বলে উঠে—

— দূরে থাক আমার থেকে তোর ওই নোংরা শরীর নিয়ে। কি জানি কার সাথে কি করে এসে অভ্রর নাম দিচ্ছিস?
— আপু!
— নেকামি করবি না একদম। আপু ডাকার দরকার নেই আর। যদি আমাকে সত্যিই আপু মানতিস, তাহলে কখনো আমার সাথে এটা করতে পারতিস না। আমার সামনে বা অভ্রর সাথে যেন তোকে আর না দেখি।
কথাগুলো বলেই তিহি ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তিহি কিন্তু পথিমধ্যেই থেমে গিয়ে বলে উঠে—
— আর শুনে রাখ মিহি, আজকেই প্রথম আর আজকেই শেষ। বারবার একই কথা বলবো না আমি। যদি কখনো এইসব কথা চার দেওয়াল আর বাইরে বের হয়, তাহলে তোকে খুন করতেও আমি দু’বার ভাববো না।
বেরিয়ে যায় তিহি ঘর থেকে। খালি ঘরে একা দাঁড়িয়ে থাকে মিহি। আজকে যেন জীবন নিজেই উপহাস করে বলে উঠে—
— কেউই কারো আপন হয় না রে মিহি। সে যতই আপন হোক না কেন। স্বার্থে আঘাত পড়লে সবাই নিজের আসল রূপ দেখিয়ে দেয়।

অন্ধকার রুমে রকিং চেয়ারে বসে আছে কেউ একজন। হাতে তার কয়েকটা ছবি। মুখ দেখে ঠাহর করার উপায় নাই ব্যক্তিটির অভিব্যক্তি। এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ছবিটির দিকে। কি দেখছে লোকটা? কি আছে ওই ছবিতে? ওই তো একটা বাচ্চা মেয়ের ছবি।বয়স কত হবে এইতো ৬ কিংবা ৭ ওটা এত দেখার কি আছে? আছে হয়তো মূল্যবান কিছু। যদি মূল্যবানই না হতো, এত সংগ্রাম, পরিকল্পনা, আর্তনাদ, হাহাকার তো থাকতো না।
হঠাৎ করে নিস্তব্ধ পরিবেশে ফোনটা বেজে উঠলো—হয়তো অশনির আগাম বার্তা।
গম্ভীর মুখে ফোনটা রিসিভ করলো লোকটা। এপাশ থেকে নিশ্চুপ। ওপাশে কি কথা হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না।
হঠাৎই শোনা গেল লোকটির গম্ভীর কণ্ঠ—
— কী হয়েছে?

মূহূর্তেই গগন কাপিয়ে চিৎকার করলো লোকটা
— মিহিহিহিহিহিহিহিহি!

চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে মিহিকে।
আইসিইউতে রাখা হয়েছে, অবস্থা সংকটাপন্ন।
হঠাৎ করে এসব কী হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারছে না মিহির বাড়ির লোকজন। আইসিইউর বাইরে মিহির পুরো পরিবার দাঁড়িয়ে আছে। রিনা বেগম সেই কখন থেকে কাঁদছে। তিনি তো এই পর্যন্ত ২ বার সেন্সলেস হয়ে গেছেন যখন থেকে মিহির এই অবস্থা দেখেছেন।

কিছুক্ষণ আগের ঘটনা….
রিনা বেগম শপিং থেকে আসার পর মেয়ের সাথে একবারও দেখা করেনি। রাতে খাবার খাওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার ডাকলেও আসেনি মিহি। তাই অগত্যা রিনা বেগমই মিহির রুমের সামনে যায় কিন্তু এসে দেখে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
রিনা বেগম বেশ কয়েকবার ডাকেন মিহিকে। কিন্তু মিহি কোনো সাড়া দেয় না। শেষমেষ না
পেরে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে রিনা বেগম। আর ভেতরের দৃশ্য দেখে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে রিনা বেগমের।

মিহি মেঝেতে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। মুখ দিয়ে সাদা ঝাঁজ বের হচ্ছে। বাঁ হাতের কবজি থেকে অজোরে রক্ত বের হচ্ছে। মিহির পাশে ঘুমের ওষুধের শিশি পড়ে আছে। রিনা বেগম
মেয়ের এই অবস্থা দেখে গগনবিদারী এক চিৎকার দেয়। দৌড়ে গিয়ে মিহিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন তিনি।
রিনা বেগমের চিৎকারে আলতাফ শেখ, সিয়াম আর তিহি দৌড়ে আসে মিহির রুমে। তিনজনই অবাক হয়ে যায় মিহির অবস্থা দেখে। এরপরই মিহিকে নিয়ে আসা হয় হাসপাতালে।
ডাক্তারকে বেরিয়ে আসতে দেখে আলতাফ শেখ আর সিয়াম ডাক্তারের কাছে যায়।
আলতাফ শেখ অস্থির হয়ে ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করে—

— ডাক্তার, কেমন আছে এখন আমার মেয়ে?
— অবস্থা ভালো না। দ্রুত তিন ব্যাগ রক্ত লাগবে। ও নেগেটিভ। ও নেগেটিভ রক্ত খুব রেয়ার। আমাদের ব্লাড ব্যাংকে অ্যাভেইলেবল হবে না। আপনারা প্লিজ দ্রুত রক্ত অ্যারেঞ্জ করুন। নইলে পেশেন্টকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে যাবে।
ডাক্তারের কথা শুনে সিয়াম দ্রুত বলে ওঠে—
— আমার ও নেগেটিভ রক্ত ডাক্তার। আপনি আমার থেকে রক্ত নিন। কিন্তু আমার বোনকে বাঁচান ডাক্তার, প্লিজ।
— আপনি একা তিন ব্যাগ রক্ত দিতে পারবেন না মিস্টার। এটা আপনার জন্য ক্ষ—
ডাক্তারকে শেষ করতে না দিয়ে সিয়াম অধৈর্যের ন্যায় বলে ওঠে—
— কোনো প্রবলেম হবে না ডাক্তার। আপনি আমার থেকে যত ইচ্ছা রক্ত নিতে পারেন। শুধু আমার বোনটাকে বাঁচান প্লিজ।

— আপনি বুঝতে পারছেন না, এটা—
— আমি দেব রক্ত।
ডাক্তার আর সিয়ামের কথার মাঝে মুহূর্তে কথাটা বলে ওঠে একজন।
সিয়াম আর আলতাফ শেখ পিছনে ফিরে দেখে অভ্র আর ওর মা নাসরিন আহমেদ দাঁড়িয়ে আছেন।
অভ্র এগিয়ে এসে ডাক্তারকে বলে—

— আমার রক্তও ও নেগেটিভ। আপনি আমার থেকে রক্ত নিতে পারেন। দ্রুত ব্যবস্থা করুন।
ডাক্তার অভ্রর কথায় সায় জানিয়ে অভ্র আর সিয়ামকে সাথে নিয়ে যায়।
রিনা বেগমকে একা তিহি সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে। ও তো নিজেই ঠিক নেই। তখন মিহিকে ওইসব বললেও মিহির এই অবস্থা দেখে অঝোরে কেঁদেছে তিহি। কোথাও না কোথাও তিহির মনে হচ্ছে ওর জন্যই এসব হয়ে গেছে।
নাসরিন আহমেদ রিনা বেগমের পাশে বসে সান্ত্বনার সুরে বলতে থাকে
— আপা আর কান্না করবেন না। আল্লাহ আছেন। উনি এত নিষ্ঠুর কখনোই হবে না। আপনি একটু শান্ত হন আপা।
— এমনটা কেন হলো আমার মেয়েটার সাথে আপা? কেন হলো? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। ওর কিছু হলে আমি বাঁচবো না আপা।
— এমন কথা বলো না আপা। ছি! সব ঠিক হয়ে যাবে। সব।
নাসরিন বেগম সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন রিনা বেগমকে শান্ত করতে কিন্তু এত সহজে কি আর শান্ত করা যায় একজন মাকে?

অভ্র আর সিয়ামকে রক্ত দেওয়ার জন্য রেডি করা হচ্ছে। সিয়ামের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে ও কতটা টেনশনে আছে। তবে অভ্রকে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই।
হঠাৎ সিয়াম বলে ওঠে—
— ভাইয়া, আমার বোনটা সুস্থ হয়ে যাবে তো? যদি ওর কিছু হয়ে যায়—
অভ্রর মাথায় হোঁচট খেলো কথাটা। সিয়াম আরও অনেক কথা বলছে কিন্তু অভ্রর কানে কিছু পৌঁছাচ্ছে না। চোখের সামনে ভেসে উঠলো কিছু বিভৎস অতীত, কিছু ভয়ংকর দৃশ্য, আর্তনাদ।
— চুপপপপ!
হঠাৎই চিৎকার করে ওঠে অভ্র। সিয়াম বুঝতেপারে না কী হয়ে গেছে। অভ্র নিজেকে সামলে বলে ওঠে

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৫

— চুপ। এসব কথা বলিস না। কিছু হবে না
মিহির।
সিয়াম মাথা নেড়ে সায় জানায়। পুনরায় বলে ওঠে
— ভাইয়া, কৌশিক কোথায় তুমি জানো? ওকে
আমি ফোন দিলাম ধরলো না।
কৌশিকের কথা শুনে অভ্রর মুখটা বদলে যায় অদ্ভুতভাবে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে—
— জানি না।

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৮