না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯ (৩)
মাইশা জান্নাত নূরা
ওয়াশরুমের ভিতর থেকে সারফারাজই আগে বেরিয়ে এসেছে কোমরে সাদা টাওয়াল পেঁচিয়ে। ওর ভেজা চুল থেকে এখনও টুপটাপ করে পানি ঝরে পড়ছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চিরুনিটা হাতে তুলে নিতেই সারফারাজের চোখ পড়লো ওয়াশরুমের বন্ধ দরজাটার দিকে। সারফারাজ ওর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে চুল আঁচড়াতে শুরু করলো।
কিয়ৎক্ষণ পর ওয়াশরুমের দরজা সামান্য ফাঁকা করে সেই ফাঁক দিয়ে পিহু ওর মাথা বের করে সারফারাজের দিকে তাকিয়ে নিচু ও লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বললো…..
—“শুনছেন!”
সারফারাজ আয়নার দিকেই তাকিয়েই স্বাভাবিক স্বরে বললো…..
—“হুম। বলো।”
পিহু কিছুটা সংকোচ নিয়ে বললো….
—“আলমারী থেকে আমায় পরিধান উপযুক্ত একসেট কাপড় দিন। এখানে আমার কোনো কাপড় আনা হয় নি।”
সারফারাজ ওর ঠোঁটে বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললো….
—“কাপড়ের কি প্রয়োজন এখন?”
পিহু চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বিরবিরিয়ে বললো…..
—”কি ভেবেছেন আপনার এমন না বুঝতে পারার ভান ধরা এই রূপ আমি চিনতে পারবো না!”
ভাবনা থেকে বেড়িয়ে পিহু বললো….
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—”কাপড় নিয়ে কি করে মানুষ? খাওয়া তো সম্ভব না। পড়বো জন্যই চেয়েছি। দিন তো।”
সারফারাজ চিরুনিটা তার জায়গায় রেখে পিহুর দিকে ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে বুকের সাথে দু’হাত ভাঁজ করে বললো…..
—“বাসর সারলাম পরপর দুইবার। এখনও তোমার আর আমার মাঝে লজ্জা-শরমের কিছু বাকি আছে নাকি? তাই ওভাবেই বেরিয়ে এসে নিজে কাপড় বের করে পরে তা পরিধান করো।”
পিহুর কান দু’টো যেনো লজ্জায় গরম হয়ে গেলো সারফারাজের এমন কথায়। পিহু বললো….
—”আপনাকে ভালো ভেনেছিলাম কিন্তু এখন হারে হারে বুঝতে পারছি যে আপনি আসলে একজন আস্ত অ*সভ্য!”
সারফারাজ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো…
—“অফিশিয়ালি স্বামী হলে বউয়ের সাথে এসব অ*সভ্যতা করা জায়েজ হয়ে যায়।”
পিহু এবার একটু চাপা রাগ নিয়ে বললো……
—“আপনি যদি এইমূহূর্তে আমায় কাপড় না দেন তাহলে আমি এভাবেই ভেজা কাপড়ে ওয়াশরুমেই বসে থাকবো। এরপর ঠান্ডা বেঁধে গেলে কিছু বলতে আসবেন না যেনো।”
অতঃপর সারফারাজ ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে ‘ঠিক আছে দিচ্ছি বলে’ আলমারির দিকে এগোলো। আলমারি খুলে সেখানে কয়েক সেকেন্ড ঘাঁটা-ঘাঁটির পর নিজের একটা শার্ট বের করে নিয়ে ওয়াশরুমের দরজার দিকে তা এগিয়ে দিয়ে বললো……
—“নাও।”
পিহু শার্টটা দেখে চোখ বড় বড় করে সারফারাজের দিকে তাকিয়ে বললো….
—“এটা! এটা তো আপনার শার্ট! আমি তো আমার পড়ার জন্য কাপড় চাইলাম!”
সারফারাজ একেবারে নিরীহ মুখ করে বললো…..
—“তুমি তো ‘পরিধান উপযুক্ত কাপড়’ই চেয়েছিলে। আমি সেটাই দিয়েছি। তখন তো উল্লেখ করো নি সালোয়ার-কামিজ লাগবে নাকি শার্ট! আমার যেটা ভালো লেগেছে আমি সেটাই দিলাম।”
পিহু খপ করে শার্টটা নিলো সারফারাজের হাত থেকে। সারফারাজ শিঁষ বাজাতে বাজাতে বিছানায় গিয়ে বসলো। পিহু ঠাস করে ওয়াশরুমের দরজাটা বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বললো…..
—”আমার কথা আমাকেই ফেরত দেওয়া হলো! তখন উনি আমার থেকে চুমু চাইলে আমি বলেছিলাম যে, কোথায় দিতে হবে শর্তে তা উল্লেখ করেন নি, তাউ আমার যেখানে ইচ্ছে হয়েছে আমি সেখানে দিয়েছি। এখন তারই প্রতিশোধ নিলেন উনি!
পরক্ষণেই পিহু উচ্চস্বরে বললো….
—“বেশ তো। বারবার আমাকে ফাঁ*সি*য়ে আপনি জিতে যাবেন ভেবে থাকলে সেটা আপনার ভুল ধারণা। আমি এই শার্ট পড়বো না। এভাবেবাহিরে বের হওয়া তো দূর। আমাকে আমার কাপড় দিবেন না যতোক্ষণ ততোক্ষণ আমি ভিজা অবস্থাতেই থাকবো। দেখি এবার কী করেন আপনি!”
সারফারাজ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ব্লাক কালার ট্রাউজারটা পড়তে পড়তে বললো…..
—“আমি ১ থেকে ৩০ পর্যন্ত কাউন্ট করবো। এর মধ্যে যদি ভেজা কাপড় ছেড়ে আমার দেওয়া শার্টটা পড়ে ওয়াশরুম থেকে বের না হয়েছো তাহলে আমি আবার ওয়াশরুমে যাবো।”
সারফারাজের এরূপ কথা শুনে পিহুর বুকটা ধ*ক করে উঠলো। পিহু ঢোক গিলে বিরবিরিয়ে বললো…..
—“তা-তারপর?”
সারফারাজ কণ্ঠ হালকা নামিয়ে স্পষ্ট হুমকির স্বরে বললো…..
—“তারপর তোমার শরীর থেকে ভেজা কাপড়গুলো নিজ হাতে আমি খুলবো। আর তারপর…..!”
পিহু সারফারাজকে বাকি কথা শেষ করতে না দিয়ে বললো…..
—“থামুন, থামুন! আর কিছু বলতে হবে না আপনাকে। আমি পড়ছি। এই তো আপনার দেওয়া শার্টটাই পড়ছি আমি!”
সারফারাজ ঠোঁট কাঁমড়ে নিঃশব্দে হাসতে হাসতে উল্টো দিক থেকে গুনতে শুরু করলো…..
—“৩০, ২৯, ২৮, ২৭, ২৬, ২৫…….”
পিহু শার্টের বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে বললো…..
—“আরে আস্তে গুনুন না! এতো জোরে তো ঘড়ির সেকেন্ডের কাটাও দৌঁড়ায় না!”
সারফারাজ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ওর বুকটা এখনও উন্মুক্ত। ফর্সা লোমশ বুকটা আকর্ষণ ছড়াচ্ছে। লোমকূপগুলোতে বিন্দু বিন্দু পানির কণা এখনও চিকচিক করছে। সারফারাজ ধীরপায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোতে এগোতে বললো……
—“সেটা আমার বিষয়। আমি কিভাবে গুনবো, কিভাবে না।”
পিহু বিরবির করে বললো…..
—“আল্লাহ, আপনার এই নিষ্পাপ বান্দাকে এমন দ*জ্জা*লের হাতে না ফেললেও পারতেন আপনি!”
—“আর কিন্তু ১০টা সংখ্যা বাকি।”
পিহু তড়িঘড়ি করে বোতাম আটকে নিয়ে নিজের দিকে তাকালো একবার। শ্যমরঙা স্লিম শরীর ওর। সারফারাজের ঢোলা শার্টটা মোটামুটি লম্বা হলেও তা পিহুর হাঁটুও ছুঁতে পারছে না। ফলস্বরূপ হাঁটুর একটু উপর থেকে সম্পূর্ণ পা উন্মুক্ত হয়ে আছে। পিহু বললো….
—”ইয়া আল্লাহ এই অবস্থায় ঐ ব*দ লোকটার সামনে যেতে হবে আমায়! পিহুরে তোর রেহাই নেই আর।”
সারফারাজ ২ পর্যন্ত কাউন্ট করতেই খট করে ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেলো ওর সামনে। পিহু ওর একহাত দিয়ে শার্টের নিচের অংশ টেনে টেনে বাকি অংশ ঢাকার বৃ*থা চেষ্টা করছে। পিহু ওর হাঁটু ছুই ছুই লম্বা ঘন চুলগুলো গলার দু’পাশ দিয়ে নিয়ে রেখেছে। লজ্জায় ওর শ্যমরঙা গাল টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। কান দিয়ে অদৃশ্য গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে যেনো। সারফারাজ এক স্থানে থেমে দাঁড়িয়ে নিষ্পলক দৃষ্টিতে পিহুর দিকে তাকিয়ে আছে। সারফারাজের এই দৃষ্টি পিহুকে আরো সিঁটিয়ে ফেলছে। সারফারাজ ধীর স্বরে বললো……
—“নিজের দিকে একবার তাকিয়ে বলো তো শার্টটা কি সত্যিই তোমার পরিধান উপযুক্ত না?”
পিহু ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে আলমারীর দিকে অগ্রসর হতে হতে বললো…..
—“বেশি কথা বলবেন না আপনি।”
পিহু আলমারীর দরজা খোলার জন্য হাত বাড়াতেই সারফারাজ হাওয়ার মতো ওর সন্নিকটে এগিয়ে এলো। পিহুকে আলমারীর সাথে হালকা ভেবে চেপে ধরলো। পিহুর দু’হাত ওর মাথার উপর দিয়ে আলমারীর সাথে ঠেকিয়ে সারফারাজারের একহাতের মুঠোয় বন্দী হয়ে আছে। সাটফারাজের অন্য হাত বিস্তার করছে পিহুর কোমরের উপর। আকস্মিকতায় পিহু ওর হরিণের ন্যায় আকর্ষণীয় চোখজোড়া খিঁ*চে বন্ধ করেছে। সারফারাজের গাঢ় নীলাভ মণিবিশিষ্ট চোখজোড়া এই মুহূর্তে পিহুর উপর স্থির হলেও তা অন্য অর্থ প্রকাশ করছে। কিয়ৎক্ষণ ওভাবেই কেটে গেলো। পিহু পিটপিট করে চোখ মেলে সারফারাজের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে নিতেই সারফারাজ পিহুর ঠোঁট জোড়ায় নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিলো। প্রায় মিনিট পাঁচেক সময় নিয়ে গভীর ভাবে চুমু খেলো সে। অতঃপর সারফারাজ পিহুর ঠোঁট ছেড়ে দিলে পিহু ওর মুখ বাম পার্শে ঘুরিয়ে নিলো। সারফারাজ ওর মাথা পিহুর মাথার সাথে ঠেকিয়ে রেখেছে। দু’জনেই একসাথে শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলছে। সারফারাজের প্রতিটি নিঃশ্বাস যা পিহুর গালে-গলায় আঁ*ছ*ড়ে পড়ছে তাতে পিহুর সর্বশরীরে শিহরণ জাগছে। পিহু ওর পরণে থাকা শার্টের নিচের অংশ দু’হাতে খাঁ*ম*চে ধরে মনে মনে বললো…..
—”এ কোন চাদরে ক্ষণে ক্ষণে জড়িয়ে নিচ্ছেন আপনি আমায় এমপি সাহেব। আমি যে নিজেকে আর নিজের মাঝে খুঁজে পাই না। হারিয়ে যাই কোন যেনো অজানায়।”
ভাবনার জগৎ থেকে বেড়িয়ে পর পিহু ধীর স্বরে বললো…..
—”ছাড়ুন আমায় এমপি সাহেব।”
—”ছাড়তে যে মন চায় না তোমায়। বারবার খুব কাছে, আরো কাছে আঁকড়ে ধরে রাখতে মন চায় তোমায় বউ।”
—”নিচে যেতে হবে এবার। নয়তো সবাই কি ভাববে বলুন তো!”
সারফারাজ পিহুর হাত ছেড়ে দিয়ে ওকে নিজের আরো সন্নিকটে বুকের সাথে চেপে ধরে ভ্রু নাচিয়ে বললো……
—”কি আর ভাববে! তাঁদের জন্য নাতী-নাতনী আনার ব্যবস্থা করছি আমরা এই তো।”
পিহু চোখ বড় বড় করে বললো….
—”কিহ্!”
—”অবাক হচ্ছো যে! তুমি চাও না নাকি আমাদের ঘর আলো করে ফুটফুটে একজোড়া তুমি-আমি আসুক!”
পিহু চোখ নামিয়ে বললো…..
—”সে আবার চায় না কে!”
—”তাহলে আজ আর ঘরের বাহিরে গিয়ে কাজ নেই আমাদের। শুভ কাজটা আজই সেরে ফেলতে হবে।”
—”আজই মানে! এই আপনার যে মাথা খা*রাপ হয়ে গিয়েছে সে খবর কি জানেন? ছাড়ুন তো আপনি আমায়। অ*সভ্য – যাচ্ছেতাই লোক কোথাকার।”
এই বলে পিহু নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মোচরা-মুচড়ি করতে শুরু করলো। সারফারাজ বললো….
—”ঠিক আছে ছাড়ছি আজকের মতো। ধকল তো কম গেলো না। তবে খুব শীঘ্রই শুভদিন দেখে শুভকাজটা সেরে ফেলবো। আমার আবার অপেক্ষা জিনিসটা ভালো লাগে না একদমই।”
এই বলে সারফারাজ পিহুর ডান গালে শব্দ করে একটা চুমু খেয়ে ওকে ছেড়ে দিলো। ছাড়া পাওয়া মাত্র পিহু ওর গালের উপর যেই না হাত রাখতে যাবে ওমনি সারফারাজ বললো…..
—”যদি চুমুর জায়গায় হাত ঘষামাজা করা হয়েছে তাহলে কিন্তু কোনো বিরতি আর মানবো না। আজই ডিরেক্ট এ্যকশনে নেমে যাবো।”
পিহু সঙ্গে সঙ্গে হাত নামিয়ে দ্রুত আলমারি খুলে একসেট থ্রি-পিচ নিয়ে ওয়াশরুমের ভিতরে চলে গেলো। সারফারাজ পিহুর এমন অবস্থা থেকে হাসতে শরু করলো। কিয়ৎক্ষণ পর পিহু ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে এলো। পিহু হাতে ধরা নিজের শার্টটা সারফারাজ নিয়ে পড়তে শুরু করলো। পিহু তা দেখে বললো….
—”আরে কি করছেন, শার্টটা একটু একটু ভিজে গিয়েছে তো। আর নিচের অংশটুকুও কেমন কুঁচকে গিয়েছে। ওভাবেই পরে নিচ্….!”
পিহুকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়েই সারফারাজ বললো…..
—”একটু আগে পর্যন্ত এই শার্টটা তোমার শরীরে ছিলো। এখন এতে তোমার স্পর্শ, তোমার শরীরের গন্ধ লেগে আছে। তাই ভেজা থাক বা কুঁচকানো এতে আমার সমস্যা নেই।”
সারফারাজের এরূপ কথায় পিহুর ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। পিহু ড্রেসিং টেবিলের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চিরুনিটা হাতে নিয়ে চুল চিরুনি করতে ব্যস্ত হলো। মূলত এটা ছিলো ওর লজ্জা লুকানোর প্রচেষ্টা। সারফারাজ পিহুর পিছনে দাঁড়িয়ে বললো…..
—”চিরুনিটা আমায় দাও, আজ আমি তোমার চুল চিরুনি করে দিতে চাই।”
পিহু ওর সামনে থাকা আয়নার মাধ্যমেই সারফারাজকে দেখে কিছুটা অবাক স্বরে বললো…..
—”আপনি পারবেন?”
—”পারবো না কেনো? চুল-ই চিরুনি করতে হবে। এ এমন কি কঠিন কাজ?”
পিহু কথা না বাড়িয়ে চিরুনিটা সারফারাজকে দিয়ে বললো….
—”বেশ তো করে দিন চিরুনি। তবে সতর্ক করে দিচ্ছি, আমার একটা চুলও যেনো না ছিঁ*ড়ে চিরুনি করতে গিয়ে।”
—”হুম হুম, ছিঁ*ড়বে না একটা চুলও৷”
পিহু ঠোঁট চেপে হেসে মনে মনে বললো…..
—”চিরুনি করতে গেলে চুল একটু-আধটু ছিঁ*ড়বেই যে সেটা আমি জানি। এমপি সাহেব বরাই করতে গিয়ে এবার আপনিই ফেঁ*সে গেলেন। দেখুন কেমন লাগে।”
সারফারাজ খুব যত্ন নিয়ে, সময় নিয়ে অল্প করে চুল নিয়ে তাঁতে লেগে থাকা খুব হালকা-পাতলা জ*ট গুলো ছাড়াচ্ছে। পিহুর তাতে নূন্যতম ব্য*থাও অনুভব হচ্ছে না। প্রায় অর্ধেক চুল চিরুনি হওয়ার পরও সারফারাজ নির্বিঘ্নে ভাবে বাকি চুলগুলো চিরুনি করতে ব্যস্ত হলে পিহু মনে মনে বললো…..
—”কি আশ্চার্য! আমি চিরুনি করতে গেলে আমার নিজেকে ‘জট মাতা’ বলে মনে হয় অত্যাধিক জট লাগার কারণে। আর এই লোক চিরুনি করছে অথচ কোনো জট এর বালাই-ই নেই চুলে আজ মনে হচ্ছে! তাহলে আমার নিজের চুল-ই কিনা আমার নিজের সাথেই মিরজাফরী করে আসছে এতোকাল! ছি ছি ছি*হ্।”
—”হয়ে গিয়েছে চিরুনি করা। দেখো চিরুনিটা একটা চুলও ছিঁ*ড়ে নি কিন্তু।”
সারফারাজের কথায় পিহুর ধ্যন ভাঙলো। পিহু সারফারাজের হাত থেকে চিরুনিটা নিয়ে তাতে লক্ষ্য করতেই ওর মুখ হা হয়ে গেলো। পিহু বললো…..
—”আপনি কি জাদু জানেন এমপি সাহেব! এতো দক্ষতার সাথে একটা চুলও না ছিঁ*ড়ে চিরুনি করলেন কিভাবে?”
সারফারাজ হেসে বললো…..
—”তোমার স্বামী যে আরো কতো কতো দিক থেকে গুণবান তা আস্তে আস্তে জানবে এরপর আরো বেশি অবাক হবে বুঝলে!”
পিহু নিঃশব্দে হাসলো কেবল। কিয়ৎক্ষণ পর ওদের রুমের দরজায় নক পড়লে সারফারাজ এসে দরজা খুলতেই দরজার সামনে নিজের ছোট ২ গু*ণ*ধর ভাই ও ১ বোনকে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো….
—”কি ব্যপার তোরা একসাথে এখানে কি করছিস?”
নির্ঝর ও নীরা তেজের দিকে তাকলো। ওদের ৩ জনের মাঝে সারফারাজের সামনে দাঁড়িয়ে দু’টো কথা বলার মতো কিন্ঞ্চিত পরিমাণ সাহস কেবল তেজেরই আছে। নির্ঝর আর নীরা একসাথে বললো…..
—”তেজ ভাই জানে কেনো এসেছি আমরা।”
তেজ অবিশ্বাস্য চোখে নির্ঝর নীরাকে দেখে নিজের বুকে আঙুল ছুয়ে বললো…
—”কে আমি? আমি কি জানি?”
নির্ঝর হেসে বললো…..
—”তেজ ভাই বড় ভাইয়ার সামনে এসে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ভুলে গেলে সব!”
তেজ শুকনো ঢোক গি*ল*লো একবার। মনে মনে বললো…..
—”নি*মো*ক*হা*রামের দল সব ভার আমার উপর চাপিয়ে নিজেরা দাঁত কেলাচ্ছিস! একবার পরিস্থিতি সামলে নেই তারপর তোদের অবস্থাও যদি ছেড়ে দে মা কেন্দে বাঁচি এর মতো না করেছি আমার নামও তেজওয়ার খান তেজ না।”
সারফারাজ কিছুটা ধ*ম*কে উঠে বললো…..
—”কোন নতুন গোল-যো*গ পাঁকিয়ে এসেছিস তোরা সত্যি করে বল। এর আগের মা*রের কথা ভুলে যাস না। যদি বাড়াবাড়ি কিছু বুঝেছি তাহলে এবার আর নিস্তার পাবি না তোরা।”
সারফারাজের ধ*ম*কে বলা কথাগুলো শোনা মাত্র অটোমেটিক নির্ঝরের একটা হাত ওর পশ্চাৎদেশের উপর চলে গেলো। চাপা স্বরে ‘আহহ’ বলে উঠলো সে। নীরা তেজ ও নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”মেজো ভাইয়া, ছোট ভাইয়া! তোমরা বড় ভাইয়ার হাতে উ*দু*ম কে*লানী কবে খেলে বললে না তো আমায়!”
নির্ঝর দাঁত কিড়মিড় করা নজরে নীরার দিকে তাকালে তৎক্ষনাৎ নীরা ওর মুখের উপর ডান হাতের শাহাদত আঙুল ঠেকিয়ে বুঝালো সে নিজের মুখে তালা বসিয়েছে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করবে না। তেজ বললো…..
—”ভাইয়া! ভাবী আছেন ভিতরে?”
সারফারাজ ছোট্ট করে ‘হুম’ বললো। তেজ বললো….
—”ভিতরে আসি আমরা! তারপর বলি সব?”
সারফারাজ দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। পিহু থ্রি-পিচের ওড়না ভালোভাবে শরীরের সাথে জড়িয়ে নিয়েছে। তেজ, নির্ঝর ও নীরা রুমের ভিতরে প্রবেশ করলে সারফারাজ দরজাটা বন্ধ করে দিলো ভিতর থেকে কিছুটা শব্দ করেই। সেই শব্দের ওরা তিন জন একসাথে কেঁপে উঠলো মৃদুভাবে। নীরা ওর হাত দিয়া গলায় হালকা ভাবে টান মে*রে বুঝালো ‘আজ ওরা শেষ।’ সারফারাজ ওদের তিনজনের সামনে এসে দাঁড়ালো। পিহু সারফারাজের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। পিহু ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় জানতে চাইলো ‘কি ব্যপার’। প্রতিত্তরে ওরা তিনজন পিহুর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো কেবল। সারফারাজ গম্ভীর কন্ঠে বললো…..
—”বল এবার।”
তেজ শব্দ করে দম ফেলে বললো…..
—”ভাইয়া আমি আর নির্ঝর দু’জনে দু’টো মেয়েকে পছন্দ করে বসেছি। এখনও কেউই ওদের নিজেদের মনের কথা বলতে পারি নি। ওরা আমাদের বাংলো বাড়িতে আছে। আজ রাতটা ওখানে থাকবে। কিন্তু ওরা ওখানে থাকতে ভরসা পাচ্ছে না আমরা ২জন ছেলে মানুষ থাকার কারণে। তাই ভাবী আর নীরাকে আমাদের সাথে বাংলো বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই আজ রাতের জন্য। ভাবী আর নীরা ওখানে থাকলে ওরা দু’জন ভরসা পাবে।”
নির্ঝর আর নীরার মুখ একসাথে হা হয়ে গিয়েছে তেজের কথা শুনে। এখানে আসার আগে পর্যন্তও নির্ঝর নিম্নে হলেও ১০০ বার তেজের কানে কানে জপ করেছে সে আর যাই হোক নির্ঝর যে অনুকে পছন্দ করে এই বিষয়টা যেনো এখনই সারফারাজের কানে না তুলে। কিন্তু এখানে আসার পর সারফারাজের সামনে দাঁড়িয়ে একেবারে টেপরেকর্ডার মতো ভরভর ভরভর করে সব উকলে ফেললো তেজ। সারফারাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওদের তিনজনের দিকে তাকিয়েই। তেজ নিজের দু’গালের উপরেই হাত দিয়ে রেখেছে। সারফারাজের তরফ থেকে ভালোবাসাটা ঠা*স করে কখন বর্ষণ হতে পারে তার তো গ্যরান্টি নেই। পিহুর একহাতে কপাল চাপড়ালো কেবল। সকলকে অবাক করে দিয়ে সারফারাজ শান্ত কন্ঠে বললো…..
—”নাম কি মেয়ে দু’টোর?”
তেজ ওর গালের হাত রাখা অবস্থাতেই ঘাড় হালকা বাঁকিয়ে নির্ঝরের দিকে তাকালো এক পলক। পরপরই সারফারাজের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”ইলমা ও অনু।”
—”ইলমা কার আর অনু কার?”
তেজ ওর এক গালের উপর থেকে হাত সরিয়ে তা উঁচু করে ধরে মিনমিনে স্বরে বললো…..
—”ইলমা আমার।”
পিছন থেকে নির্ঝরও ওর হাত উঁচিয়ে বললো….
—”অনু আমার।”
সারফারাজ বললো….
—”পরিচয় দে ওদের দু’জনের। কিভাবে পরিচয় হলো, কবে থেকে এসব চলছে সব জানতে চাই আমি।”
তেজ আর নির্ঝর হালকা ভাবে ইলমা আর অনুর সম্পর্কে বললো সব। নীরা মনে মনে বললো…..
—”বাহ বাহ আমার দুই ভাই তো দেখি পুরাই সুপারওস্তম নিকলা।”
সারফারাজ শব্দ করে একবার নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো…..
—”বড় কোনো অ*ঘ*টন না ঘটিয়ে যে সব সত্য আমাদের জানালি এ কারণে তোদের উপর আর রাগ নেই আমার এ বিষয়ে। তবে পিহু আর নীরা একা যাবে না তোদের সাথে আমিও যাবো।”
তেজ আর নির্ঝর একসাথে চোখের আকৃতি অস্বাভাবিক ভাবে বড় করে বললো…..
—”কিন্তু ভাইয়া ওরা তো জানে না আমাদের মনের খবর!”
নীরা বললো…..
—”পেয়ার কিয়া তো ডারনা কেয়া? মনের ভাব প্রকাশ করতে হবেই আজ নয়তো কাল। শুভ কাজে দেড়ি করা ঠিক না।”
সারফারাজ বললো…..
—”আমি আগে ওদের দু’জনের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করবো তারপর তোদের বলবো তোরা সামনে আগাবি নাকি ওখান থেকে সরে আসবি। আর আমি যে সিদ্ধান্ত নিবো সেটাই তোদের মানতে হবে কোনো প্রশ্ন ছাড়া সেটা এখনই ক্লিয়ার করে বলে দিলাম।”
সারফারাজের এরূপ কথা শুনে তেজ আর নির্ঝরের মুখ কিছুটা ফ্যকাসে হলেও ওরা বললো…..
—”আমরা জানি ভাইয়া তুমি আমাদের জন্য যেই সিদ্ধান্তই নাও না কেনো সেটা ভালো ভেবেই নিবা। তাই তোমার সিধান্ত যা হবে তাই মেনে নিবো আমরা।”
—”হুম, চল এখন।”
অতঃপর পিহু, সারফারাজ, তেজ, নির্ঝর, নীরা ৫ জনই একসাথে রুম থেকে বের হলো। সিঁড়ি বেয়ে নিচে আসতেই ড্রয়িংরুমে বসে থাকতে দেখলো আতুশি ও শিউলি খানকে। শিউলি বললেন……
—”এ বাড়িতে যে আমাদের আরো দু’জন ছেলে সন্তান আছে আমরা তো সে কথা ভুলতেই বসেছিলাম। তারা নিজেদের লাইফ নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত যে নিজেদের পরিবার-পরিজনদের সাথে প্রতিদিন সাক্ষাৎ হয় না, কথা হয় না, কল করে ফোন উঠাতে পারে না।”
আতুশি বললেন…..
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯ (২)
—”ঠিক বলেছো তুমি মেজো আপা। এখন আর তেজ বাবার আমার হাতে তৈরি করে দেওয়া গরম দুধ খেয়ে শক্তি বাড়াতে হয় না। নির্ঝর বাবার আমার হাতে বানানো পাস্তা-নুডুলস খাওয়ার শখ হয় না। পুরোনো অভ্যাস থেকে ওরা নিজদের ছাড়িয়ে নিয়েছে বললেই চলে।”
নির্ঝর আর তেজ বুঝলো আতুশি ও শিউলি দু’জনেই ওদের উপর বড্ড অভিমাণ করে বসেছেন। কারণ ওনারা দু’জনেই তেজ ও নির্ঝরকে বড্ড ভালোবাসেন, আদর করেন। পারেন তো সবসময় কলিজার মাঝেই বসিয়ে রাখবেন।
